অধ্যায়-১৯, শহিদ যতীন্দ্রনাথ দাশ

উত্তর:-বিপ্লবী শচীন সান্যাল ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ‘হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ নামক একটি সংস্থা গড়ে তোলেন।

এই বিপ্লবী সংস্থাটি গড়ে তোলার পিছনে তাঁর একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। এই সংস্থাটির মাধ্যমে তিনি ভারতের সব প্রান্তের বিপ্লবীদের একটি ছাতার তলায় আনতে চেয়েছিলেন।

 

উত্তর:- খিদিরপুরের ডক অঞ্চলে, যতীনের পূর্ণ সক্রিয়তায় এবং বিপ্লবী হরিনারায়ণ চন্দ্র, দেওঘরের বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়, রাজেন লাহিড়ি, পাঞ্জাবের ইন্দার সিং নারায়ণ প্রমুখ উগ্রবাদী সহযোদ্ধাদের সহায়তায় গড়ে ওঠে একটি বোমা-পিস্তলের গোপন দোকান।

 

উত্তর:- দক্ষিণেশ্বরের বাচস্পতিপাড়ার একটি বাড়ি বিপ্লবী যতীন দাশের বিপ্লব সম্পর্কিত কাজকর্ম শেখানোর কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেখানে তিনি কীভাবে বোমা তৈরি করতে হয় শেখাতেন। এ ছাড়াও আরও অন্যান্য বিষয়েরও ট্রেনিং দান চলত। সেই সংবাদ পুলিশের কানে পৌঁছোলে, যতীন দাশকে ধরার উদ্দেশ্যে ১৯২৫ | খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর তারা বাড়িটি ঘিরে ফেলে।

 

উত্তর:-ময়মনসিং জেলে অনশন করার অপরাধে যতীন দাশকে নিয়ে যাওয়া হয় পাঞ্জাবের মরু অঞ্চলের দুর্গম ও ভয়াবহ মিয়ানওয়ালি জেলে। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে সেখান থেকে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে এসে মুক্তি দেওয়া হয়।

বিপ্লবী যতীন দাশের ভগিনীর নাম লাবণ্যপ্রভা দেবী ।

১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে তাঁর মৃত্যু হয়।

 

উত্তর:- ‘সাইমন কমিশন’ বিরোধী আন্দোলনে একসময় ভারত উত্তাল হয়ে ওঠে। দিকে দিকে এই আন্দোলনের পথ রুদ্ধ করার জন্য চলতে থাকে প্রবল পুলিশি নির্যাতন এবং লাঠিচার্জ। পাঞ্জাবে এই দমননীতির বলি হন পাঞ্জাবকেশরী লালা লাজপত রায়। এই অগ্রগণ্য জাতীয় স্তরের নেতার মৃত্যু বিপ্লবী ভগৎ সিংকে প্রতিশোধে উন্মত্ত করে তোলে। এই প্রতিশোধ মেটাতেই তিনি পাঞ্জাবের পুলিশপ্রধান মি. স্কটের সহকারী মি. সন্ডার্সকে হত্যা করে কলকাতায় পালিয়ে আসেন।

 

উত্তর:- পাঞ্জাবের ভগৎ সিং ছিলেন দুর্ধর্ষ বিপ্লবী তথা স্বাধীনতা যোদ্ধা। বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্তকে সঙ্গী করে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ৮ এপ্রিল দিল্লিতে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশন চলাকালে, সভ্যদের আসনের পাশেই তাঁরা অকস্মাৎ একটি শক্তিশালী বোমা ফাটান। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তের আজীবন কারাদণ্ড হয়েছিল।

 

উত্তর:- ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর বিপ্লবী যতীন দাশকে তাঁর গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে ‘বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স’ প্রয়োগ করে তাঁকে বলপূর্বক আটকে রাখা হয়েছিল। মেদিনীপুর জেলের এক কনডেমড সেলে। শরীর খারাপের কারণে তাঁকে ময়মনসিং জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। এখানে থাকাকালীন স্বদেশি বিপ্লবীদের উপর অকথ্য অত্যাচার চলতে দেখেন যতীন দাশ। তাই তিনি সেখানে জেল-সুপারের বিরুদ্ধে অনশন শুরু করেন।

 

উত্তর:- একদা পলাশির প্রান্তরে বিশ্বাসঘাতক মিরজাফরের পাপে ভারতের স্বাধীনতা-সূর্য চিরতরে ডুবে যায়। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে তৎপর হয়েছিলেন বিপ্লবী যতীন দাশ। এই ছিল তাঁর জীবনের মন্ত্র আর ছিল তাঁর অটুট দেশপ্রেম। যা ভুলতে পারেননি বলেই ।

 

উত্তর:- ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী যতীন দাশ ভবানীপুরের মিত্র ইন্সটিটিউশন থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পাস করেন। এরপর ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে যখন তিনি আইএ পরীক্ষা দেন, তাতেও তিনি প্রথম ডিভিশন লাভ করেন। এরপর তাঁর পড়াশোনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে বঙ্গবাসী কলেজ। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দেই তিনি ওই কলেজের থার্ড ইয়ার বিএ ক্লাসে ভরতি হন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতির প্রতি তাঁর যে একটা ইতিবাচক আকর্ষণ ছিল, তার প্রমাণ—‘ছাত্র-সংসদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন’ তিনি।

 

উত্তর:- ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী যতীন দাশ ভবানীপুরের মিত্র ইন্সটিটিউশন থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পাস করেন। এরপর ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে যখন তিনি আইএ পরীক্ষা দেন, তাতেও তিনি প্রথম ডিভিশন লাভ করেন। এরপর তাঁর পড়াশোনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে বঙ্গবাসী কলেজ। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দেই তিনি ওই কলেজের থার্ড ইয়ার বিএ ক্লাসে ভরতি হন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতির প্রতি তাঁর যে একটা ইতিবাচক আকর্ষণ ছিল, তার প্রমাণ—‘ছাত্র-সংসদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন’ তিনি।

মাত্র ১৫-১৬ বছর বয়সেই যতীন দাশকে কারাবরণ করতে হয় কেন? পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কেন? 3

উত্তর:- অল্পবয়সেই একজন কিশোর বিপ্লবী হিসেবে যতীন্দ্রনাথ দাশের সর্বত্রব্যাপী একটা পরিচয় গড়ে ওঠে। তখন ১৯১৯-২০ খ্রিস্টাব্দ, যতীন দাশের বয়সও মাত্র ১৫-১৬ বছর। একটি বিলাতি কাপড়ের দোকানে পিকেটিং করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা। পড়ে যান। বিচারে তাঁর ছয় মাসের জেল হয়।

* জেলে কয়েদিদের জন্য বরাদ্দ অখাদ্য-কুখাদ্য যতীনের সহ্য হয়নি। অবশেষে কঠিন আমাশয় রোগে আক্রান্ত হন তিনি। তাই ডাক্তারের নির্দেশে মেয়াদ শেষের আগেই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

 

উত্তর:- ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং জওহরলাল নেহরু 'ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে যখন ‘সাইমন কমিশন’-বিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে, সে সময়ই জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দেয়, তখনই জাতীয় ঐক্য বজায় রেখে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী সদস্যদের অবস্থানকে চাঙ্গা করে তোলার চেষ্টা হয়। দুই শীর্ষ নেতা জওহরলাল নেহরু এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এই উদ্দেশ্যেই 'ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লিগ’ বা ‘ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন। বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাশও তখন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে এবং তাঁর পথকেই শ্রেষ্ঠ পথ বিবেচনা করে ‘ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘ’-কেই স্বাগত ও সমর্থন জানান।

 

উত্তর:- ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা মারেন, বিচারে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। কিন্তু এই ঘটনার পিছনে ভারতব্যাপী এক বিশাল পরিকল্পনা আছে সন্দেহ করে তদানীন্তন ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান মি. প্যাট্রি নিজে পুনরায় তদন্ত শুরু করেন এবং এই তদন্তের ফলে ৩০ জনের নামের একটি তালিকা তৈরি হয়। তাদের মধ্যে বিপ্লবী যতীন দাশও ছিলেন। এইভাবে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় যতীন দাশকে জড়িয়ে, পুলিশ তাকে গ্রেফতার

 

No Content

উত্তর:- আশিসকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘শহিদ যতীন্দ্রনাথ দাশ’ নামক গদ্যাংশ থেকে বিপ্লবী যতীন দাশ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যায়। আলোচ্য প্রবন্ধ থেকে জানতে পারি ১৯২২-২৫ এই সময়ে জাতীয় কংগ্রেসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রাধান্য ছিল, তখন দেশবন্ধুর দক্ষিণ হাত ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। আর এই সময়েই দলের শৃঙ্খলাপরায়ণ কর্মী ও মানুষ হিসেবে নেতাজির স্নেহভাজন হয়ে উঠেছিলেন বিপ্লবী যতীন্দ্ৰনাথ দাশ।

যতীন্দ্রনাথ দাশ সম্পর্কে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর “Indian Struggle” নামক গ্রন্থে সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছেন। উক্ত গ্রন্থ থেকে জানা যায়–দলের প্রত্যেককে সামরিক পদ্ধতিতে ড্রিল, মার্চপাস্ট, অভিবাদন ইত্যাদি করানো হত। আর এই ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতেন যতীন দাশ। তা ছাড়া যতীন দাশ যে সাউথ ক্যালকাটা ন্যাশনাল স্কুলে অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে ছাত্রদের ড্রিল শেখাতেন, তাও নেতাজি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। যতীন দাশ সম্পর্কে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের এমন মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বিপ্লবী যতীন দাশের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর খুব হৃদ্যতার সম্পর্ক বজায় ছিল। এই কারণেই যতীন দাশও নেতাজির পথকেই স্বাধীনতা লাভের শ্রেষ্ঠ পথ হিসেবে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

 

উত্তর:-২৫ জুন ১৯২৯ যতীন দাশকে ‘লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা’-র আসামি হিসেবে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি দেখেন তাঁদের উপর যে অমানুষিক পুলিশি নির্যাতন চলছে, তার তীব্র প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন। এজন্য তাঁরা সেখানে অনশন শুরু করেন ১৩ জুলাই। যতীন দাশের অনশন ছিল ‘আমরণ'। ১৩ থেকে ১৯ তারিখ, যতীন দাশের অনশন-এর সাতটি দিন বেশ নিরুপদ্রবেই কেটে যায়। ২০ জুলাই ভোরবেলা জেল-সুপার জেল-ডাক্তারসহ জনা আষ্টেক চেহারাবান পাঠানকে নিয়ে হঠাৎ যতীনের সেলে প্রবেশ করেন, উদ্দেশ্য তাঁকে দুধ পান করিয়ে জোর করে অনশন ভঙ্গ করা। তাই কোনোরকম ইঙ্গিত ছাড়াই হঠাৎ ওই আটজন পাঠান অভুক্ত শরীরের দুর্বল যতীনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডাক্তার তখন তাঁর নাকের মধ্য দিয়ে একটি সরু নল ঢুকিয়ে দুধ ঢালতে শুরু করেন। ইচ্ছা করেই যতীন তখন জোরে বারকয়েক কেশে উঠলে নলটি তাঁর খাদ্যনালী থেকে শ্বাসনালীতে ঢুকে যায়, ফলে কিছুটা দুধ তাঁর ফুসফুসের মধ্যে ঢুকে যায়। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পরে তাঁর জ্ঞান ফিরে এলেও, তাঁর কথা বলার শক্তি চলে যায়। ক্রমে তাঁর সারা শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

যতীন দাশ জীবন্মুত হয়ে পড়েছিলেন। তবুও ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়নি। শর্তসাপেক্ষে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে চাইলে, তাঁর পিতা বঙ্কিমবিহারী দাশ এবং ভাই কিরণ দাশ সেই প্রস্তাব ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর সরকার এক গুপ্তচরকে দিয়ে যতীন দাশের জামিনের আবেদন জানানোর উদ্যোগ নেয়। আসলে সরকার যতীনের দায় ঘাড় পেতে নিতে চায়নি। সেই জামিনের আবেদনের সূত্রে জেলের সুপার-ডাক্তার, পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স-এর সাহায্যে জেল থেকে যতীনকে বের করে আনতে চায়। এ সংবাদ তাঁর সহযোদ্ধাদের কানে গেলে, যতীনকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আটকাতে, তাঁর সেলের চারপাশে পথ অবরোধ করে তাঁরা শুয়ে পড়েছিল। পরের সাত দিন সারা দেশের মানুষ যতীন দাশকে নিয়ে চরম উৎকণ্ঠিত দিন কাটায়। তাঁর শরীরের দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। অবশেষে অনশনের ৬৩ তম দিনে ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৯, শনিবার দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে বীর বিপ্লবী যতীন দাশ চিরবিদায় নেন।