অধ্যায়-১, ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক

অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ বিপ্লব-পূর্ববর্তী ফ্রান্সকে ‘ভ্রান্ত  অর্থনীতির জাদুঘর বলে অভিহিত করেছেন। এই ভ্রান্ত অর্থনীতির অন্যতম দিক ছিল দেশের বৈষম্যমূলক ও বিভ্রান্তিমূলক করব্যবস্থা। কেননা, করব্যবস্থায়  ‘অধিকারভোগী’ যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় এবং ‘অধিকারহীন’ তৃতীয় সম্প্রদায়ের কৃষকদের জন্য পৃথক নীতি ছিল ।

বিপ্লবের আগে ফ্রান্সের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ;

১। অধিকারভোগী শ্রেণি: ‘অধিকারভোগী’ যাজক ও অভিজাতদের হাতে ফ্রান্সের ৫০ শতাংশেরও বেশি কৃষিজমি ছিল | অথচ এই বিপুল পরিমাণ জমির জন্য তারা সরকারকে কোনো প্রকার কর প্রদানে বাধ্য ছিল না। তারা রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে যেসব বিশেষ সুবিধা ভোগ করত তার জন্যও তাদের কোনো কর দিতে হত না।

২। অধিকারহীন শ্রেণি: অধিকারভোগী সম্প্রদায়গুলি কর প্রদান থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় দরিদ্র কৃষক সম্প্রদায়কে করের বিপুল বোঝা বহন করতে হত। ঐতিহাসিক লাব্রুজ বলেছেন যে, “অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের কৃষকরা ছিল সর্বাপেক্ষা শোষিত শ্রেণি।” দেশের সমগ্র রাজস্বের ৯৬ শতাংশই তৃতীয় সম্প্রদায়কে দিতে হত।

৩। বিভিন্ন কর:  রাষ্ট্র সামন্তপ্রভু ও গির্জা তৃতীয় শ্রেণির কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর আদায় করত। করগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—[i] ‘টাইলে’ বা ভূমিকর, [ii] ‘ক্যাপিটেশন’ বা উৎপাদন কর, [iii] 'ভিটিংয়েমে' বা আয়কর, [iv] ‘গ্যাবেলা’ বা লবণ কর, [v] ‘টাইদ' বা ধর্মকর এবং [vi] ‘করভি’ বা বাধ্যতামূলক বেগার শ্রমদান প্রভৃতি। এত রকম কর মিটিয়ে কৃষকের হাতে তার মোট আয়ের মাত্র ১/৫ অংশ অবশিষ্ট থাকত যা দিয়ে তার পরিবারের ভরণ- পোষণ চলত না।

ফরাসি বিপ্লব সৃষ্টিতে বৃরবো রাজবংশের ভূমিকা ;

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে বুরবোঁ  রাজবংশ রাজত্ব করত। ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বিশ্বাসী এই রাজতন্ত্রে রাজাই ছিলেন সর্বময়কর্তা, শাসনব্যবস্থায় জনগণের কোনো ভূমিকা ছিল না। ঐতিহাসিকদের অনেকেই মনে করেন, রাজতন্ত্রের বিভিন্ন ত্রুটিবিচ্যুতিই ফরাসি বিপ্লবের প্রধান কারণ। তাঁদের মতে বুরবোঁ শাসকদের দুর্বলতা, অস্থির মনোভাব এবং অদূরদর্শিতাই এই বিপ্লবের জন্য অনেকাংশে দায়ী।

১/  বুরবো রাজাদের অমিতব্যয়িতা:

বুরবো রাজাদের প্রত্যেকেই ছিলেন অত্যন্ত বিলাসপ্রিয়। চতুর্দশ লুই, পঞ্চদশ লুই এবং ষোড়শ লুই এর আমলে সম্রাট-সহ রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা এবং বিলাসিতা চরমে পৌঁছোয়। এর ফলে ফরাসি রাজকোশ প্রায় সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায় এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও তাঁরা বার বার ব্যয়বহুল যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তোলে। এই অবস্থায় দেশবাসীর মনে এক গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি হয় যা বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করে।

২/  রাজন্যবর্গের দুর্বলতা:

ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই ছিলেন অত্যন্ত স্বৈরাচারী। তাঁর শাসনের কোনো গণভিত্তি ছিল না। তিনি বলতেন "আমিই রাষ্ট্র”। পরবর্তী বুরবোঁ রাজা পঞ্চদশ লুই ছিলেন অলস এবং শ্রমবিমুখ। শাসনকার্যে তাঁর দুর্বলতার সুযোগে রাজকর্মচারীরা দেশে যথেচ্ছাচার শুরু করে। এরপর ষোড়শ লুই সিংহাসনে বসলে রাজতন্ত্রকে অবক্ষয়ের শেষ সীমায় নিয়ে যান। বুরবোঁ রাজাদের এই চরম দুর্বলতা বিপ্লবকে প্রবলভাবে ইন্ধন দেয়।

৩/  প্রশাসনিক ত্রুটি:

বুরবোঁ শাসনব্যবস্থায় প্রশাসনে অভিজাতদের আধিপত্য প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রশাসন প্রচণ্ড দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। 'লেতর দ্য কাশে'র অপব্যবহার, ইনটেনডেন্ট নামক রাজস্ব আদায়কারীদের শোষণ ফ্রান্সের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এ ছাড়াও দেশের আইনকানুনও ছিল ত্রুটিপূর্ণ, জটিল ও দুর্বোধ্য। শুধু তাই নয় আইনগুলি ছিল অত্যন্ত নির্মম। সাধারণ অপরাধের জন্যও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত। ফলস্বরূপ দেশের জনগণ রাজতন্ত্রের ওপর বিশেষ বিদ্বেষ প্রকাশ করে বিপ্লবের পথ সুগম করে তোলে।

৪/  রাজস্ব ব্যবস্থার ত্রুটি :

ফ্রান্সের ৯৫% সম্পদ যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে থাকলেও তাঁদের কোনো কর দিতে হত না। পরিবর্তে যাবতীয় করের বোঝা বহন করতে হত দেশের ৫% সম্পদের মালিক তৃতীয় সম্প্রদায়কে । রাজকীয় কর-সহ সামন্তপ্রভু ও চার্চকেও বিভিন্ন কর দিতে হত তাদের। ফলে এই বৈষম্যমূলক করব্যবস্থায় তারা প্রচণ্ডভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তাদের মনে বিপ্লবের বীজ রোপিত হয়।

ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি.) আগে মধ্যযুগীয় যাজকতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, স্বৈরাচারী দৈব রাজতন্ত্র, সামাজিক বৈষম্য প্রভৃতি বিষয়গুলি ফ্রান্সের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দৃঢ়ভাবে চেপে বসেছিল।ফ্রান্সের এই মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা সাধারণভাবে ‘পুরাতনতন্ত্র’ বা ‘অঁসিয়া রেজিম' ('Old Regime') নামে পরিচিত। অঁসিয়া রেজিম বা পুরাতনতন্ত্র ফরাসি অঁসিয়া রেজিম বা পুরাতনতন্ত্রের বিভিন্ন দিক ছিল। যেমন—১/  স্বৈরাচারী দৈব রাজতন্ত্র;

ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজবংশের অধীনে তীব্র স্বৈরাচারী দৈব রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজারা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে মনে করতেন। এজন্য তারা নিজেদের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন না। পুরাতনতন্ত্রের ধারক ও বাহক বংশের রাজাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ত্রয়োদশ লুই, চতুর্দশ লুই ,ষোড়শ লুই প্রমুখ।.

২/ সামাজিক শ্রেণিভেদ:

সমাজে শ্রেণিভেদ ও সামাজিক বৈষম্য তীব্র আকার ধারণ করেছিল। সমাজ মূলত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা—মাজক শ্রেণি, অভিজাত শ্রেণি এবং বুর্জোয়া, মধ্যবিত, দরিদ্র, সাঁকুলো অনুষদের নিয়ে গঠিত তৃতীয় শ্রেণি।যাজক ও অভিজাতরা ছিল বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি এবং তৃতীয় শ্রেণি ছিল সুবিধা বঞ্চিত। ও নিপীড়িত শ্রেণি।

৩/  যাজক ও অভিজাতদের আধিপত্য;

যাজক ও অভিজাতরা বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও এর জন্য তারা সরকারকে কোনো কর দিত না। তৃতীয় সম্প্রদায়ের কাছ থেকে যাজকরা ‘টাইঙ্গ' বা ধর্মকর, অভিজাত প্রভুরা 'করডি' বা শ্রমকর-সহ বিভিন্ন সামন্তকর আদায় করত।

ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯ খ্রি.) আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ঐতিহাসিক কোবান ফরাসি বিপ্লবকে অসংখ্য ছোটো-বড়ো খরস্রোতা নদীর সমন্বয়ে ছড়িয়ে-পড়া ভয়ানক বন্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ;

বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণ ফরাসি বিপ্লবের জন্য বিশেষভাবে দায়ী ছিল। যেমন—

1. সরকারি অপবায়: ফরাসি রাজপরিবার অকাতরে অর্থব্যয় করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দেন। চতুর্দশ লুই (১৬৪৩ -১৭১৫ খ্রি.), পঞ্চদশ লুই (১৭১৫-৭৪ খ্রি.) ও ষোড়শ লুই-এর (১৭৭৪-৯৩ খ্রি.) আমলে সম্রাট সহ রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা ও বিলাসিতা চরমে পৌঁছোয়। ফলে ফরাসি রাজকোণ শূন্য হয়ে যায়।

2. ব্যয়বহুল যুদ্ধ: চতুর্দশ ও পঞ্চদশ লুই বিভিন্ন ব্যয়বহুল যুদ্ধে অংশ নিয়ে বিপুল অর্থব্যয় করেন। ষোড়শ লুই আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়ে বিপুল অর্থ বায় করেন। ফলে দেশে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়।

3 . অধিকারভোগীদের আয়: ফ্রান্সের প্রায় অর্ধেক  কৃষিজমিই ছিল যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে। জমি থেকে বিপুল আয় সত্ত্বেও তারা সরকারকে টাইলে বা ভূমিকর, ক্যাপিটেশন বা উৎপাদন কর ভিটিংয়েমে বা আয়কর প্রভৃতি কর দিত না। তা সত্ত্বেও তারা রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের সুযোগসুবিধা ভোগ করত।

4. তৃতীয় শ্রেণির করের বোঝা : রাষ্ট্র, গির্জা ও জমিদাররা তৃতীয় শ্রেণির কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর আদায় করত। টাইলে, ক্যাপিটেশন, ভিটিংয়েমে প্রভৃতি প্রত্যক্ষ কর ছাড়াও তারা সরকারকে গ্যাবেলা বা লবণ কর, ভোগ্য পণ্যের ওপর কর, যাজকদের টাইদ বা ধর্মকর, এইডস বা মদ, তামাক প্রভৃতির ওপর কর, করভি বা প্রভুর জমিতে বেগার প্রমদান, সামন্তপ্রভুদের পথঘাট ব্যবহার, শস্য ভাঙানো ও জমি হস্তান্তরের জন্য কর, অন্যান্য অতিরিক্ত কর প্রভৃতি দিতে বাধ্য হত। এত রকম কর মিটিয়ে কৃষকের হাতে উৎপন্ন ফসলের মাত্র ২০ শতাংশ অবশিষ্ট থাকত ।

5. মধ্যবিত্তদের দুরবস্থা ;  অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ মনে করেন যে, বিপ্লবের আগে ফ্রান্স ছিল “ভ্রান্ত অর্থনীতির জাদুঘর"। ত্রুটিপূর্ণ অর্থনীতির জন্য দেশে দ্রব্যমূল্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে দরিদ্র মানুষ সীমাহীন দুর্দশার মুখে পড়ে। খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের মূল্য গরিব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে ধনী বুর্জোয়া, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা স্বাধীন ও অবাধ বাণিজ্যের জন্য শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ লোপের দাবি জানায়।

মূল্যায়ন;

ঐতিহাসিক মার্সেল রাইনার বলেছেন যে, “ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি বাদ দিয়ে এই বিপ্লবের প্রকৃত কারণ বোঝা যায় না।” ঐতিহাসিক মর্স স্টিফেন্স বিপ্লবের জন্য অর্থনৈতিক কারণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন যে, “এই বিপ্লবের প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক—দার্শনিক ও সামাজিক নয়।”

ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯ খ্রি.) আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ঐতিহাসিক কোবান ফরাসি বিপ্লবকে অসংখ্য ছোটো-বড়ো খরস্রোতা নদীর সমন্বয়ে ছড়িয়ে-পড়া ভয়ানক বন্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ;

বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণ ফরাসি বিপ্লবের জন্য বিশেষভাবে দায়ী ছিল। যেমন—

1. সরকারি অপবায়: ফরাসি রাজপরিবার অকাতরে অর্থব্যয় করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দেন। চতুর্দশ লুই (১৬৪৩ -১৭১৫ খ্রি.), পঞ্চদশ লুই (১৭১৫-৭৪ খ্রি.) ও ষোড়শ লুই-এর (১৭৭৪-৯৩ খ্রি.) আমলে সম্রাট সহ রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা ও বিলাসিতা চরমে পৌঁছোয়। ফলে ফরাসি রাজকোণ শূন্য হয়ে যায়।

2. ব্যয়বহুল যুদ্ধ: চতুর্দশ ও পঞ্চদশ লুই বিভিন্ন ব্যয়বহুল যুদ্ধে অংশ নিয়ে বিপুল অর্থব্যয় করেন। ষোড়শ লুই আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়ে বিপুল অর্থ বায় করেন। ফলে দেশে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়।

3 . অধিকারভোগীদের আয়: ফ্রান্সের প্রায় অর্ধেক  কৃষিজমিই ছিল যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে। জমি থেকে বিপুল আয় সত্ত্বেও তারা সরকারকে টাইলে বা ভূমিকর, ক্যাপিটেশন বা উৎপাদন কর ভিটিংয়েমে বা আয়কর প্রভৃতি কর দিত না। তা সত্ত্বেও তারা রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের সুযোগসুবিধা ভোগ করত।

4. তৃতীয় শ্রেণির করের বোঝা : রাষ্ট্র, গির্জা ও জমিদাররা তৃতীয় শ্রেণির কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর আদায় করত। টাইলে, ক্যাপিটেশন, ভিটিংয়েমে প্রভৃতি প্রত্যক্ষ কর ছাড়াও তারা সরকারকে গ্যাবেলা বা লবণ কর, ভোগ্য পণ্যের ওপর কর, যাজকদের টাইদ বা ধর্মকর, এইডস বা মদ, তামাক প্রভৃতির ওপর কর, করভি বা প্রভুর জমিতে বেগার প্রমদান, সামন্তপ্রভুদের পথঘাট ব্যবহার, শস্য ভাঙানো ও জমি হস্তান্তরের জন্য কর, অন্যান্য অতিরিক্ত কর প্রভৃতি দিতে বাধ্য হত। এত রকম কর মিটিয়ে কৃষকের হাতে উৎপন্ন ফসলের মাত্র ২০ শতাংশ অবশিষ্ট থাকত ।

5. মধ্যবিত্তদের দুরবস্থা ;  অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ মনে করেন যে, বিপ্লবের আগে ফ্রান্স ছিল “ভ্রান্ত অর্থনীতির জাদুঘর"। ত্রুটিপূর্ণ অর্থনীতির জন্য দেশে দ্রব্যমূল্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে দরিদ্র মানুষ সীমাহীন দুর্দশার মুখে পড়ে। খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের মূল্য গরিব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে ধনী বুর্জোয়া, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা স্বাধীন ও অবাধ বাণিজ্যের জন্য শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ লোপের দাবি জানায়।

মূল্যায়ন;

ঐতিহাসিক মার্সেল রাইনার বলেছেন যে, “ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি বাদ দিয়ে এই বিপ্লবের প্রকৃত কারণ বোঝা যায় না।” ঐতিহাসিক মর্স স্টিফেন্স বিপ্লবের জন্য অর্থনৈতিক কারণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন যে, “এই বিপ্লবের প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক—দার্শনিক ও সামাজিক নয়।”

ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণ ;

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লব সৃষ্টিতে রাজতন্ত্রের বিভিন্ন ত্রুটিবিচ্যুতি ও রাজতন্ত্রের দায়িত্ব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

1. রাজাদের দুর্বলতা: ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই (১৬৪৩-১৭১৫ খ্রি.) ছিলেন চরম স্বৈরাচারী। তিনি বলতেন "আমিই রাষ্ট্র। অলস ও বিলাসী রাজা পঞ্চদশ লুই (১৭১৫-৭৪ খ্রি.) তাঁর উপপত্নী মাদাম দা পম্পাদুর এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শাসন পরিচালনা করলে প্রশাসন দুর্নীতি ও স্বজনপোষণে ছেয়ে যায়। এরপর অযোগ্য রাজা ষোড়শ লুই (১৭৭৪- ৯৩ খ্রি.) রাজতন্ত্রকে অবক্ষয়ের শেষ সীমায় নিয়ে যান।

2. অভিজাতদের আধিপত্য: প্রশাসনে অভিজাত সম্প্রদায়ের আধিপত্য শাসনব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। প্রশাসন প্রচন্ড দুর্নীতিগ্রস্ত  হয়ে পড়ে। ‘ইনটেনডেন্ট' নামে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীরা খুবই ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। অভিজাত রাজপুরুষরা 'লেতর দ্য ক্যাশে' নামে এক রাজকীয় পরোয়ানার দ্বারা যে-কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করে রাখার অধিকার পায়।

3.ত্রুটিপূর্ণ  আইন ; অষ্টাদশ শতকে ফরাসি আইন ছিল অত্যন্ত পূর্ণ জটিল ও দুর্বোধ্য। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের আইন ও দণ্ডবিধি প্রচলিত ছিল। আইনগুলি ছিল অত্যন্ত নির্মম। সাধারণ অপরাধের জন্যও অনেকসময় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত।

4. বিচারব্যবস্থায় ত্রুটি ;  ফরাসি বিচারব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জঠিল ব্যায়বহুল ও দুর্নীতিগ্রস্ত। অধিকাংশ বিচারক ছিলেন অসং দুর্নীতিপরায়ণ। অপরাধীদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ, জরিমানা আদায় প্রভৃতির দ্বারা দুর্নীতিপরায়ণ বিচারকরা বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন।

5. অমিতব্যয়িতা;  ফরাসি রাজপরিবার ছিল সীমাহীন অভিবাসী। রাজপরিবারের সেবাকার্যের উদ্দেশ্যে ভার্সটি রাজপ্রাসাদে ১৮ হাজার কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। রানি মারি আঁতোয়ানেতের ব্যক্তিগত কর্মচারীর সংখা ছিল ৫০০ জন। রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা দেশের অর্থসংকট তীব্রতর করলে দেশবাসীর মনে না বিরূপ প্রভাব পড়ে।

6. ত্রুটিপূর্ণ রাজস্বব্যবস্থা;  ফ্রান্সের ৯৫ শতাংশ সম্পদ যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে থাকলেও এর জন্য তাদের কাছ থেকে কোনো কর আদায় করা হত না। ফলে যাবতীয় করের বোঝা বহন করতে হত দেশের মাত্র ৫ শতাংশ সম্পদের মালিক তৃতীয় সম্প্রদায়কে। রাজকীয় কর ছাড়াও সামন্তপ্রভু ও গির্জা তৃতীয় সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর আদায় করত।

7. ষোড়শ লুই-এর ভূমিকা:  দেশের অর্থনৈতিক সংকট অত্যন্ত হয়ে উঠলে রাজা ষোড়শ লুই-এর উচিত ছিল যাজক ও অভিজাতদের বিশেষ অধিকার খর্ব করে এবং তাদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে পরিস্থিতির সামাল দেওয়া। কিন্তু ষোড়শ লুই একাজে জোরাজে পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনগণ অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হয়।

ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি.) আগে ফ্রান্সের সামাজিক অবস্থা ছিল মধ্যযুগীয়, সামন্ততান্ত্রিক এবং অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। সমাজের মানুষ সাধারণত তিনটি সম্প্রদায় বা 'এস্টেট'-এ বিভক্ত ছিল। যথা-১/ যাজকদের নিয়ে গঠিত প্রথম সম্প্রদায়, ২/ অভিজাতদের নিয়ে গঠিত দ্বিতীয় সম্প্রদায় এবং ৩/  বুর্জোয়া, মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, দরিদ্র কৃষক-শ্রমিক ও সর্বহারাদের নিয়ে গঠিত তৃতীয় সম্প্রদায় |

১৭৮১ খ্রিস্টাব্দের আগে ফ্রান্সের সামাজিক অবস্থা;

1. প্রথম সম্প্রদায় ; যাজক সম্প্রদায় ছিল সমাজের সবচেয়ে সুবিধাভোগী শ্রেণি | তাদের মোট জনসংখ্যা ১ শতাংশের কম হলেও দেশের ১/৫ অংশ কৃষিজমিই ছিল তাদের হাতে। এর জন্য তারা রাজাকে কোনো কর দিত না। গির্জার আয় এবং আদায় করা ধর্মকর, মৃত্যুকর, বিবাহকর প্রভৃতি বায় করে তারা অত্যন্ত বিলাসিতায় দিন কাটাত।

2. দ্বিতীয় সম্প্রদায়; অভিজাতরা ছিল অপর সুবিধাভোগী শ্রেণি। অভিজাতদের মোট জনসংখ্যা মাত্র ১.৫ শতাংশ হলেও দেশের ১/৩অংশ কৃষিজমিই ছিল তাদের হাতে। এর জন্য তারা রাজাকে কোনো ভূমিকর দিত না। তারা প্রজাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সামন্তকর আদায় করত এবং প্রশাসন ও বিচারবিভাগের উচ্চপদগুলি দখল করত।

3. তৃতীয় সম্প্রদায় ; বুর্জোয়া, ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ব্যাংক মালিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক, শ্রমিক, সর্বহারা ভবঘুরে বা সাঁকুলো প্রমুখ ছিল তৃতীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। দেশের অন্তত ৯৮ শতাংশ জনসংখ্যা হওয়া সত্ত্বেও তারা কোনো সুযোগসুবিধা পেত না। তারা বিভিন্ন ধরনের করভারে জর্জরিত ছিল।

বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি.) আগে ফরাসি সমাজে যে তিনটি প্রধান সম্প্রদায় ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল যাজকদের নিয়ে গঠিত প্রথম সম্প্রদায়।

1.যাজক সম্প্রদাআ;

ফরাসি সমাজে যাজক সম্প্রদায়ের কতকগুলি বিশেষত্ব ছিল, যা হল-

1. জনসংখ্যা:  ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে যাজকদের মোট সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ২০ হাজার, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.৫ শতাংশ। অতি অল্প জনসংখ্যা হলেও সমাজ ও রাষ্ট্রে যাজকদের সীমাহীন প্রতাপ ছিল।

2. জমি থেকে আয়:  যাজকদের জনসংখ্যা অতি সামান্য হলেও ফ্রান্সের মোট কৃষিজমির ১/৫ % অংশই ছিল তাদের অধীনস্থ গির্জার হাতে। এই জমির জন্য তারা সরকারকে কোনো কর দিত না। তারা 'কনট্রাক্ট অব পোইসি' নামে এক চুক্তি অনুসারে রাজাকে একটি স্বেচ্ছাকর দিত। গির্জার এই জমি থেকে বছরে প্রায় ১৩ লক্ষ লিভর আয় হত।

3 .কর আদায়:  যাজকরা জনগণের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর আদায় করত। এসব করের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল 'টাইদ' বা ধর্মকর, মৃত্যুকর, বিবাহকর প্রভৃতি।

4. যাজকদের বিভাগ: যাজকরা মূলত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা— বিশপ, ক্যানন, মঠাধ্যক্ষ প্রমুখদের নিয়ে গঠিত উচ্চ যাজক এবং গ্রামের দরিদ্র সাধারণ পাদরিদের নিয়ে গঠিত নিম্ন যাজক। উচ্চ যাজকরা গির্জার আয়ের বেশিরভাগই ভোগ করত এবং অত্যন্ত বিলাসব্যসনে জীবন কাটাত। এজন্য নিম্ন যাজকরা তাদের ঈর্ষা ও ঘৃণা করত।

বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি.) আগে ফরাসি সমাজে যে তিনটি প্রধান সম্প্রদায় ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল অভিজাতদের নিয়ে গঠিত দ্বিতীয় সম্প্রদায় | কোনো অভিজাত সম্প্রদায় আদায় ফরাসি সমাজে অভিজাত সম্প্রদায়ের কতকগুলি বিশেষত্ব ছিল, যেগুলি হল-

১/ জনসংখ্যা : ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে অভিজাতদের মোট সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ৫০ হাজার, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.৫ শতাংশ। এই স্বল্প জনসংখ্যা সত্ত্বেও অভিজাত সম্প্রদায় ফরাসি সমাজ ও রাষ্ট্রে সীমাহীন প্রভাব-প্রতিপত্তি ভোগ করত।

২/ আয়;   স্বল্প জনসংখ্যা সত্ত্বেও ফ্রান্সের মোট কৃষিজমির ১/৩ % অংশই ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে। এই বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির জন তারা সরকারকে কোনো ভূমিকর দিত না। এমনকি ভিটিংয়েমে বা ক্যাপিটেশন করও না। বরং তারা প্রজাদের কাছ থেকে বিভিন্ন জরিমানা, বানালিতে, করভি সহ বিভিন্ন ধরনের সামন্তকর আদায় করে বিপুল অর্থ উপার্জন করত।

৩/ প্রতিপত্তি;  ফরাসি সমাজে অভিজাত সম্প্রদায়ের সীমাহীন প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। তারা রাজদরবার থেকে বিভিন্ন ভাতা, পুরস্কার ও অন্যান্য সুবিধা আদায় করত। বিচারবিভাগ ও প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চপদে এবং সরকারি চাকরির নিয়োগে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল।

বিপ্লবের (১৭৮৯) আগে ফরাসি সমাজে বিদ্যমান তিনটি  প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্যতম ছিল বুর্জোয়া, কৃষক, শ্রমিক, সর্বহারা ভবঘুরে বা সাকুলোত প্রমুখদের নিয়ে গঠিত তৃতীয় সম্প্রদায়। মাসি সমাজব্যবস্থা তৃতীয় সম্প্রদায়।

ফরাসি সমাজব্যবস্থায় তৃতীয় সম্প্রদায়;

ফরাসি সমাজে তৃতীয় সম্প্রদায়গুলির বিশেষত্ব হল-

১। জনসংখ্যা: ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে তৃতীয় সম্প্রদায় ছিল দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৮ শতাংশ। এই বিপুল জনসংখ্যা সত্ত্বেও তৃতীয় সম্প্রদায় ফরাসি সমাজ ও রাষ্ট্রে কোনো অধিকার পেত না।

২। শ্রেণিবিভাগ: ফ্রান্সে তৃতীয় সম্প্রদায় মূলত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা—[i] ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ব্যাংক মালিক, প্রমুখ ছিল উচ্চ বুর্জোয়া। [ii] আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক প্রমুখ ছিল মধ্য বুর্জোয়া। [iii] কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক প্রভৃতি ছিল নিম্ন বুর্জোয়া |

৩।সামাজিক অবস্থা : বুর্জোয়া সম্প্রদায়ের ধনী অংশ বিদ্যা-বুদ্ধি বা অর্থসম্পদে অভিজাত সম্প্রদায়ের চেয়েও অগ্রসর ছিল। কিন্তু অভিজাতদের মতো বংশকৌলিন্য তাদের না থাকায় তারা সমাজ ও রাষ্ট্রে নানা অবিচারের শিকার হয়েছিল। তারা অভিজাত সম্প্রদায়ের ঘৃণার পাত্র ছিল।

৪। করভার : তৃতীয় সম্প্রদায়ের মানুষ নানা করভারে জর্জরিত ছিল। দেশের মোট রাজস্বের ৯৬ শতাংশই তাদের কাছ থেকে আদায় করা হত। রাষ্ট্র, গির্জা ও সামন্তপ্রভুরা তাদের কাছ থেকে ভূমিকর, উৎপাদন কর, আয়কর, লবণ কর, ধর্মকর প্রভৃতি আদায় করত। ঐতিহাসিক লারুজ বলেছেন যে, “অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের কৃষকরা ছিল সর্বাপেক্ষা শোষিত।"

দীর্ঘ ১৭৫ বছর পর ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে ভার্সাই নগরীতে স্টেট্স  জেনারেল বা জাতীয় সভার অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা একই কক্ষে বসা এবং মাথাপিছু ভোটের দাবিতে বিদ্রোহ শুরু করলে বুর্জোয়া বিপ্লব শুরু হয় ।

বুর্জোয়া বিপ্লবের বিভিন্ন গুরুত্ব ছিল। যেমন—

1. তৃতীয় সম্প্রদায়ের জয় : বুর্জোয়া শ্রেণির বিদ্রোহের চাপে আতঙ্কিত রাজা ২৭ জুন তিন সম্প্রদায়ের একত্রে অধিবেশন এবং মাথাপিছু ভোটের দাবি মেনে নেন। ফলে বুর্জোয়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ জয় হয় |

2. ফরাসি বিপ্লবের সূত্রপাত: বুর্জোয়া বিপ্লব জয়যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনা থেকে ফরাসি বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটে। বুর্জোয়াদের বিপ্লবে কিছুদিনের মধ্যেই তৃতীয় শ্রেণির দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকরা যোগ দেয়।

3.  প্রতিক্রিয়াশীলতা: বুর্জোয়া বিপ্লবের সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিও সক্রিয় থাকে। কেননা, বুর্জোয়াদের সাফল্য রাজা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। অভিজাতরাও বুর্জোয়াদের সঙ্গে কোনো বোঝাপড়ায় রাজি ছিল না। ফলে অনমনীয় রাজা নতুন করে সৈন্য সমাবেশ করলে জটিলতা বৃদ্ধি পায় |

4. গণবিদ্রোহ: বুর্জোয়া বিপ্লবে তৃতীয় সম্প্রদায়ের দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকরা যোগ দিলে ফরাসি বিপ্লব প্রকৃত গণবিদ্রোহে পরিণত হয় । গ্রামেগঞ্জে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিসের উত্তেজিত বিদ্রোহীরা ১৪ জুলাই কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটায়

ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে শোষিত ও নির্যাতিত দরিদ্র কৃষকরা সামন্তপ্রভুদের ‘করভি' বা বেগারশ্রম-সহ বিভিন্ন সামন্তকর, রাজাকে 'টাইলে' বা ভূমিকর, গির্জাকে ‘টাইদ' বা ধর্মকর প্রভৃতি দিতে বাধ্য হত। এজন্য কৃষকরা তাদের নিকটস্থ প্রভু গ্রামীণ সামন্তপ্রভু ও অভিজাতদের ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিল।

গুজবের প্রভাব মহাতঙ্ক;

১/ গ্রামাঞ্চলে বিদ্রোহ: টেনিস কোর্টের শপথের (২০ জুন, ১৭৮৯ খ্রি.) পর থেকে ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ খাদ্যের দাবিতে প্যারিসে এসে সর্বহারা মানুষের সঙ্গে যোগ দিলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। প্যারিসের উত্তেজিত জনতা ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে দুর্গের পতন ঘটায়।

২/  মহাতঙ্ক: প্যারিসের উত্তাল পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, কৃষকদের শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে রাজকীয় সেনাবাহিনী ও অভিজাতদের ভাড়াটে গুন্ডা গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে। এই গুজব ‘মহাতঙ্ক' ('Great Fear') নামে পরিচিত।

৩/  বিদ্রোহের ব্যাপকতা : মহাতঙ্কের ঘটনার পর ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে ভয়ংকর কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহী কৃষকরা জমিদার ও তাদের কর্মচারীদের গ্রাম থেকে বিতাড়িত করে, তাদের খামারবাড়ি ও গির্জা ধ্বংস করে, ঋণপত্রগুলি পুড়িয়ে দেয় এবং পশুচারণভূমি দখল করে নেয়। বিদ্রোহের আতঙ্কে প্রায় ২০ হাজার যাজক ও অভিজাত ব্যক্তিরা ফ্রান্স ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে যায়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে 'পুরাতনতন্ত্র' প্রায় ভেঙে পড়ে।

সন্ত্রাসের শাসন চালু হওয়ার কারণ;

১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে সন্ত্রাসের শাসন চালু হওয়ার বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন—

  1. অভ্যন্তরীণ কারণ: অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ফ্রান্স নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। যথা—[i] রাজতন্ত্রের সমর্থনে এবং বিপ্লবের বিরুদ্ধে দেশে প্রতিবিপ্লব অর্থাৎ বিপ্লব-বিরোধী আন্দোলন ক্রমে জোরদার হতে থাকে। [ii] কিছু লোক সরকারি আইন অগ্রাহ্য করে এবং সরকারকে করপ্রদান বন্ধ করে দেয়। [iii] ফরাসি যুবকরা সেনাদলে যোগ দিতে অস্বীকার করে। এরূপ সংকটের পরিস্থিতিতে ফ্রান্সে বিপ্লবী সরকারের পতনের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

2. বৈদেশিক কারণ : বিপ্লবের সময়ে ফ্রান্স বৈদেশিক ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়। যথা- [i] ইউরোপের বিভিন্ন রাজতান্ত্রিক শক্তি ফ্রান্সে বিপ্লবের প্রসারে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। [ii] ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, স্পেন, পোর্তুগাল প্রভৃতি দেশ ফ্রান্সের বিপ্লবী সরকারকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম শক্তিজোট গঠন করে। [iii] শত্রুপক্ষ ফ্রান্সের সীমানা অতিক্রম করে দ্রুত প্যারিসের দিকে ছুটে আসে। [iv] এই সময় বিপ্লবী  ফ্রান্সের সেনাপতি ডুমুরিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে অস্ট্রিয়ার পক্ষে যোগ দেয়।

 

সন্ত্রাসের শাসনের কৃতিত্ব বা সাফল্য

ফ্রান্সে সন্ত্রাসের শাসনের বিভিন্ন কৃতিত্ব বা সাফল্য ছিল। যথা-

1. সন্ত্রাসের শাসনের ফলে ফ্রান্সের প্রতিবিপ্লবী কার্যকলাপ দমিত হয় এবং অরাজকতা ও গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে। বিদেশি শক্তিগুলির আক্রমণের হাত থেকেও বিপ্লবী ফ্রান্স রক্ষা পায়।

2. গির্জাগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

3. প্রচলিত খ্রিস্টান বর্ষপঞ্জি বাতিল করে 'প্রজাতান্ত্রিক বর্ষপঞ্জি' চালু করা হয়।

4. নতুন মাপ, ওজন ও মুদ্রা ব্যবস্থায় দশমিক প্রথা চালু করা হয়।

5. বিভিন্ন দ্রব্যের সর্বোচ্চ মূল্য ও মজুরির সর্বনিম্ন হার বেধে দেওয়া হয়।

6. অভিজাতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা কৃষকদের মধ্যে বিলি করা হয়।

7. দাসপ্রথার অবসান ঘটানো হয়।

8. খাবারের জন্য রেশন কার্ড চালু করা হয়।

9. ধর্মনিরপেক্ষ ও অবৈতনিক সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়।

10. ১০ লক্ষ সেনার এক বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়।

11.  একটি প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করা হয়। অবশ্য এটি কার্যকর করা হয়নি।

সন্ত্রাসের শাসনের গ্রহণযোগ্যতা  বিচার;

কোনো কোনো ঐতিহাসিক সন্ত্রাসের শাসনের বিপক্ষে যুক্তি দিলেও কেউ কেউ আবার এই শাসনের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।

১/  সন্ত্রাসের বিপক্ষে যুক্তি ;  ঐতিহাসিক তেইন সন্ত্রাসের শাসনের সমালোচনা করেছেন। তার মতানুযায়ী এর বিপক্ষে যুক্তিগুলি হল [i] বিপ্লবীর বলিদান : বহু প্রকৃত বিপ্লবী সন্ত্রাসের বলি হন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন যে, “সন্ত্রাসের দ্বারা বিপ্লব তার নিজের সন্তানদের গিলে ফেলে । [ii] অতিসক্রিয়তা : দেশের সংকটকালে সন্ত্রাসের কিছুটা প্রয়োজন থাকলেও সন্ত্রাস পরিচালনায় অকারণ অতিসক্রিয়তা দেখায়। [iii] সাধারণ মানুষের মৃত্যু: সর্বহারা বহু মানুষ সন্ত্রাসের বলি হন। বহু নিরপরাধ ও নিরীহ মানুষ বিনা বিচারে প্রাণ হারান। [iv] উচ্ছৃঙ্খলতা : সন্ত্রাসের শাসনের সুযোগে একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা সরকারি আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। [v] গণতন্ত্র ধ্বংস সন্ত্রাস ফ্রান্সের গণতন্ত্র ধ্বংস করে। এই শাসন ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসন ধ্বংস করে।

২/  সন্ত্রাসের পক্ষে যুক্তি: ওলার, মাতিয়ে, লেভের প্রমুখ ঐতিহাসিক সন্ত্রাসের শাসনের সপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। যথা— [i] আপৎকালীন পদক্ষেপ: ফ্রান্স অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয়ক্ষেত্রে সংকটের সম্মুখীন হলে সন্ত্রাস ছাড়া পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না। [ii] বিপ্লব রক্ষা : সন্ত্রাসের শাসনের ফলে ফ্রান্সে অরাজকতা দূর হয় এবং শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসে। বৈদেশিক আক্রমণের সম্ভাবনা থেকেও ফ্রান্স রক্ষা পায়। এককথায়, সন্ত্রাসের দ্বারা বিপ্লব রক্ষা পায়। [iii] জনকল্যাণ: সন্ত্রাসের শাসনকালে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সর্বনিম্ন মজুরি, ভূমিহীনদের জমি বিলি প্রভৃতি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক আইন পাস করা হয়। [iv] অতিরঞ্জিত বক্তব্য: ডিকেন্স-সহ বিভিন্ন লেখক সন্ত্রাসের ভয়াবহতাকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করেছেন।

মূল্যায়ণ;

ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সংকট দূর করার জন্য সন্ত্রাসের শাসনকে সমর্থন করা যায়। কিন্তু সন্ত্রাস অহেতুক বাড়াবাড়ি করায় জনগণ বিপ্লবের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। ফলে জ্যাকোবিন দল জনসমর্থন হারায় এবং ফ্রান্সে নেপোলিয়নের স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রস্তুত হয়।

সম্রাসের রাজত্ব ;

উগ্র বামপন্থী জ্যাকোবিন দল ফ্রান্সে ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২ জুন প্রদর্শনের মাধ্যমে এক কঠোর শাসনের রাজত্ব শুরু করেন। এই শাসনব্যবস্থাই ইতিহাসে 'সন্ত্রাসের শাসন' নামে পরিচিত।

১/ সময়কাল: ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২ জুন থেকে ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই পর্যন্ত ফ্রান্সে সন্ত্রাসের শাসনকাল চলেছিল।

২/  পটভূমি : নিম্নলিখিত কারণগুলির জন্য ফ্রান্সে এই শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। এগুলি হল— [i] ফরাসি বিপ্লবের শেষে ফ্রান্সের 'জাতীয় মহাসভা' রাজা ষোড়শ লুই-কে প্রাণদণ্ড (১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ জানুয়ারি) দিলে ফ্রান্সে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে এক চরম অরাজকতার সৃষ্টি হয়। ফলে ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পোর্তুগাল প্রভৃতি দেশ একযোগে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিরোধিতা শুরু করে। [ii] ফ্রান্সের ৮৩টি প্রদেশের মধ্যে ৬০টি প্রদেশে বিদ্রোহ শুরু হয়ে যায়। [iii] দেশের অভ্যন্তরে খাদ্যাভাব, অর্থাভাব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং বিশ্বাসঘাতকতায় জর্জরিত প্রজাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে শুরু করলে তারা সরকারের বিরোধিতা করে, অহিন অগ্রাহ্য করে এবং কর প্রদান বন্ধ করে দেয়। [iv] ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলি ফ্রান্সকে আক্রমণ করতে সচেষ্ট হয় এবং ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে এক বিশাল শক্তিজোট গঠন করে।

৩/  সন্ত্রাসের শাসনের উদ্দেশ্য:  সন্ত্রাসের রাজত্বে প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হল—[i] ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ফ্রান্সের জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করা। [ii] কালাবাজারি ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। [iii] অভিজাতদের জমি বাজেয়াপ্ত করে তা দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা। [iv] ফ্রান্সের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রের গৌরব পুনঃরুদ্ধার করা।

৪/ ফলাফল : ফ্রান্সে দীর্ঘ ১৩ মাস ধরে চলাকালীন এই শাসনের ফলাফলগুলি ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- [i] এই শাসনের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অরাজকতা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। [ii] ফ্রান্সের সমাজ থেকে পুরাতনতন্ত্র ও সামাজিক বৈষম্য দূরীভূত হয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বহু পদক্ষেপ গৃহীত হয়। [iii] খাদ্যদ্রব্যের সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, ফলে কালোবাজারি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। [iv] খাবারের জন্য র‍্যাশন কার্ড চালু করা হয়। [v] পিতার সম্পত্তিতে সকল সন্তানের সমান অধিকার স্বীকৃত হয়। [vi] শিশু, বৃদ্ধা ও অসহায় বিধবাদের সরকারি সহায়তা প্রদান করা হয়। [vii] প্রচলিত খ্রিস্টান বর্ষপঞ্জি বাতিল করে 'প্রজাতান্ত্রিক বর্ষপঞ্জি' চালু করা হয়। [viii] ধর্মনিরপেক্ষ ও অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু হয়।

৫/   শাসনের ভয়াবহতা: সন্ত্রাসের শাসনের ভয়াবহতা ফ্রান্স সহ পৃথিবীর মানুষকে ভীত করে তোলে। এই কারণে অনেকে এক 'লাল সন্ত্রাস' বলেও অভিহিত করেন। এই শাসনের ভয়াবহতা নিম্নরূপ— [i] প্রায় ৫০ হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়। [ii] বহু মানুষ চিরদিনের মতো নিখোঁজ হয়ে যায়, যাদের অনেককেই জলে ডুবিয়ে বা অন্যভাবে হত্যা করা হয়। [iii] প্রায় ৩ লক্ষ মানুষকে সন্দেহের আইন-এ গ্রেফতার করা

৬/  শাসনের অবসান : সন্ত্রাসের ভয়াবহতায় ভীত হয়ে ফ্রান্সের জ্যাকোবিন, জিরন্ডিস্ট এবং মধ্যপন্থী দল একত্রে ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই রোবসপিয়ার ও তাঁর অনুগামীদের বন্দি করে। পরের দিন অর্থাৎ ২৮ জুলাই ‘জাতীয় সভার' নির্দেশে রোবসপিয়ার ও তাঁর ২৪ জন অনুগামীকে গিলোটিনে হত্যা করা হলে সন্ত্রাসের শাসনের অবসান ঘটে।

ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই বুর্জোয়াদের প্রবল চাপের কাছে নতি স্বীকার করে তিন সম্প্রদায়ের একরে অধিবেশন ও মাথাপিছু ভোটের দাবি মেনে নেন। এই ঘটনা ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে।

বাস্তিল দুর্গের পতন;

  1. রাজার পদক্ষেপ;  প্রবল চাপে পড়ে ষোড়শ লুই বুর্জোয়াদের দাবি মেনে নিলেও তিনি মন থেকে এই ঘটনা মানতে পারেননি তিনি প্যারিস ও ভার্সাই-এ প্রায় ৩০ হাজার সেনা মোতায়েন করেন। এরপর ষোড়শ লুই জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী নেকারকে পদচ্যুত (২২ জুন) করলে প্যারিসের উন্মত্ত জনতা হিংসার পথে পা বাড়ায়। রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি হয়, জনতা অস্ত্রের দোকান ও গির্জাগুলিতে লুণ্ঠন চালায়।

2.  প্যারিসের পরিস্থিতি;  এসময় খাদ্যের দাবিতে হাজার হাজার মানুষ গ্রাম থেকে এসে প্যারিসের উত্তেজিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলিত হলে পরিস্থিতি ভয়াংকর হয়ে ওঠে। সশস্ত্র জনতা সরকারি দপ্তরগুলিতে আক্রমণ চালিয়ে বহু নথিপত্র পুড়িয়ে দেয়, অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে। এরপর ৭-৮ হাজার মানুষ ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গের রক্ষীদের হত্যা করে দুর্গটি দখল করে এবং বন্দিদের মুক্ত করে দেয়।

3.   গুরুত্ব : বাস্তিল দুর্গ ছিল স্বৈরশাসনের প্রতীক। বিনা বিচারে বহু নিরপরাধ মানুষকে এখানে বন্দি করে রাখা হত। বাস্তিলের পতনে রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের ওপর তীব্র আঘাত নেমে আসে। প্যারিসের শাসনক্ষমতা বুর্জোয়াদের হাতে চলে যায়। ‘প্যারি কমিউন' গঠন করে তারা প্যারিসের শাসন চালাতে থাকেন । ঐতিহাসিক গুডউইনের মতে, “বাস্তিলের পতনের ঘটনা সমগ্র বিশ্বে স্বাধীনতার উন্মেষকাল হিসেবে চিহ্নিত।

ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই বুজোয়াদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করলেও তিনি পুরাতনতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী নেকারকে পানত এবং প্যারিস ও ভাসাইয়ে সেনা মোতায়েন করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্যারিসের জনতা ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই বাস্তিল দূর্গ আক্রমণ ও দখল করে নেয়।

বাস্তিল দুর্গের গঠনের গুরুত্ব;

বাস্তিল দুর্গের পতনের গুরুত্বগুলি হল—

1. রাজার নতিস্বীকার: বাধিলের পতনের পর আতঙ্কিত রাজা প্যারিসে এসে বিপ্লবের তেরঙা (লাল-নীল-সাদা) পতাকাকে ফ্রান্সের প্রতীক বলে মেনে নেন। বিপ্লবী বেইলি-কে প্যারিস পৌরসভার মেয়র পদে বসানো হয়। জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে সংগঠিত করে বিপ্লবী লাফায়েৎ-কে এর প্রধান সেনাপতি করা হয়।

2. স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে আঘাত কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গ ছিল স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র ও মধ্যযুগীয় স্বৈরতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের প্রতীক। এখানে বিনা বিচারে প্রজাদের বন্দি করে রাখা হত। তাই বাস্তিলের পতনে রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত আসে। এর ফলে রাজতন্ত্রের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

3.  জনগণের শক্তিবৃদ্ধি : বাস্তিলের পতন ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করে। প্রবল প্রতাপশালী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে যে জয় লাভ করা সম্ভব তা বাস্তিলের পতনের ঘটনা প্রমাণ করে দেয়।

4. অভিজাতদের দেশত্যাগ: বাস্তিলের ঘটনার পর আতঙ্কিত বহু অভিজাত প্রাণভয়ে বিদেশে চলে যায়। অভিজাতরা উপলব্ধি করে। যে, বিদেশি শক্তির সাহায্য ছাড়া তাদের বিশেষ অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই-এর ওপর ক্ষুদ্ধ হয়ে জিরন্ডিস্ট দলের নেতৃত্বে প্রায় ৮ হাজার সশস্ত্র মানুষের বিশাল মিছিল টুইলারিজ রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে (২০ জুন, ১৭৯২ খ্রি.)। এসময় প্রাশিয়ার সেনাধ্যক্ষ ডিউক অব ব্রান্সউইক এক ঘোষণার মাধ্যমে ফরাসি জাতিকে সতর্ক করেন— ফরাসি রাজপরিবারের কোনো ক্ষতি কেউ করলে তিনি তাদের চরম শাস্তি দেবেন।

ষোড়শ  লুই-এর মৃত্যুদণ্ড ;

১/ রাজতন্ত্রের অবসানের দাবি;  ব্রান্সউইক ঘোষণার ফলে ফ্রান্সের বিপ্লবীরা সন্দেহ করে যে, রাজপরিবার বিদেশিদের সঙ্গে ষড়যা করে দেশে বিপ্লবীদের ধ্বংস করতে চাইছে। ফলে উন্মত্ত জনতা ১০ আগস্ট (১৭৯২ খ্রি.) দ্বিতীয়বার রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে প্রায় ৮০০ রক্ষীকে হত্যা করে। আতঙ্কিত রাজপরিবার নিকটবর্তী আইনসভা কক্ষে আশ্রয় নিলে জনতা আইনসভা অভিযান করে রাজতন্ত্রের অবসানের দাবি জানায়।

২/  রাজার বিচার: উপাত্ত জনতার চাপে অধিনসড়া রাজাকে বরখান্ত করে তাঁর বিচারের উদ্দেশ্যে টেম্পল দুর্গে বন্দি করে। রাজার বিচারকে কেন্দ্র করে জিরন্ডিস্ট ও জ্যাকোবিন দলের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। জিরন্ডিস্ট দল রাজার মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে গণভোটের ভিত্তিতে রাজার অন্য-কোনো শাস্তিদানের পক্ষপাতী ছিল। কিন্তু উগ্র বামপন্থী জ্যাকোবিন দল রাজার মৃত্যুদণ্ডের জোরালো দাবি জানায়।

৩/  মৃত্যুদণ্ড;  শেষপর্যন্ত জাতীয় সড়া সামান্য ভোটের ব্যবধানে রাজার মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ জানুয়ারি গিলোটিনে রাজা ষোড়শ লুই-এর মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়। রাজার মৃত্যুদণ্ড ইউরোপকে স্তম্ভিত করে। ঐতিহাসিক হ্যাজেন বলেছেন, “সিংহাসনের তুলনায় রাজা ফাঁসির মঞ্চে বেশি মহান ছিলেন ।"