অধ্যায়-২, বিপ্লবী আদর্শ, নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ

নেপোলিয়ন প্রথম জীবনে একজন সাধারণ সৈনিক থেকে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। তিনি অদক্ষ ডাইরেক্টরির শাসনকালে (১৭৯৫-৯৯ খ্রি.) বিভিন্ন মুখক্ষেতে চমকপ্রদ সাফল্যের পরিচয় দিয়ে দেশবাসীর মন জয় করেন এবং ডাইরেক্টরির শাসনের অবসান (৯ নভেম্বর, ১৭৯৯ খ্রি.) ঘটিয়ে কনসুলেট নামে নতুন শাসনব্যবস্থা চালু করেন। তিনি প্রথম কনসাল হিসেবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন।

ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি) পরবর্তীকালে রাজতন্ত্রের সমর্থক উন্মত্ত জনতা ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর ফরাসি জাতীয় সভা  আক্রমণ করলে ফরাসি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নেপোলিয়ন অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করেন এবং জাতীয় সভা রক্ষা করেন। এটি উদেমিয়ার ঘটনা বা 'অক্টোবরের ঘটনা' নামে পরিচিত।

নেপোলিয়ন ইটালির লম্বার্ডি দখল করে সেখানে যে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন তা সিজালপাইন প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত। এটি ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে 'ইতালীয় 'রাজ্য  নামে পরিচিত হয়।

ফরাসি সেনাপতি পেশেগ্রু  হল্যান্ড দখল করে সেখানে ফ্রান্সের অধীনে এক তাঁবেদার   প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বাটাভিয়া প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত।

ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ডাইরেক্টরির শাসনের অবসান ঘটিয়ে (৯ নভেম্বর, ১৭৯৯ খ্রি.) ফ্রান্সে এক নতুন শাসনব্যবস্থা চালু করেন। এই ব্যবস্থায় নেপোলিয়ন-সহ মোট ৩ জন কনসালের হাতে ফ্রান্সের শাসনভার তুলে দেওয়া হয়। এটি "কনসুলেটের শাসন' নামে পরিচিত।

কনসুলেটের শাসনকালে ফ্রান্সের প্রথম কনসাল  ছিলেন নেপোলিয়ন যিনি ছিলেন দেশের চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। অন্য দুই কনসাল ছিলেন আবে সিয়েস ও রজার ডুকোন। তাঁরা ছিলেন প্রথম কনসালের সহকারী ও আজ্ঞাবাহী মাত্র।

প্রথম কনসাল হিসেবে নেপোলিয়ন অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তাঁর হাতে সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী, মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত প্রমুখের নিয়োগ, আইন প্রণয়ন, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিস্থাপন প্রভৃতি দায়িত্ব ছিল।

কনসুলেট ও ডাইরেক্টরির শাসনের মধ্যে দুটি সাদৃশ্য হল –1. উত্তর ব্যবস্থায় একাধিক শাসনের অস্তিত্ব ছিল। 2. উভয় ব্যবস্থায় শাসকরা ফ্রান্সের সাম্রাজ্যবাদী নীতি বজায় রেখেছিল।

নেপোলিয়ন সমগ্র ফ্রান্সকে ৮৩টি ডিপার্টমেন্ট বা প্রদেশে এবং প্রদেশগুলিকে ৫৪৭টি ক্যান্টন বা জেলায় বিভক্ত করেন। প্রদেশ ও জেলার শাসনকর্তা ছিলেন যথাক্রমে 'প্রিফেক্ট' ও 'সাব-প্রিফেক্ট'।

নেপোলিয়ন কর্তৃক নিযুক্ত কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা ছিলেন বিদেশ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত তালির, অর্থ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত গোদিন, পুলিশ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফুচে প্রমুখ।

নেপোলিয়ন নিজ ভ্রাতা জোসেফকে স্পেনের সিংহাসনে, লুই বোনাপার্টকে হল্যান্ডের সিংহাসনে এবং জেরোম বোনাপার্টকে ওয়েস্টফেলিয়ার সিংহাসনে বসান।

ম্যারেঙ্গোর যুদ্ধ (১৮০০ খ্রি.) ও হোহেনলিন্ডেনের যুদ্ধে (১৮০০ খ্রি.) ফ্রান্সের কাছে পরাজিত হয়ে অস্ট্রিয়া ফ্রান্সের সঙ্গে লুনভিলের সন্ধি (১৮০১ খ্রি.) স্বাক্ষরে বাধ্য হয়।

নেপোলিয়ন ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ডাইরেক্টরির শাসনের অবসান ঘটিয়ে "কনসাল' হিসেবে ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল এবং ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে "সম্রাট" উপাদি গ্রহণ করেন। তাঁর ব্যক্তিগত গুণাবলি এবং ফ্রান্সের সমকালীন পরিস্থিতি তাঁর সাফল্যে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল।

নেপোলিয়নের সাফল্যের কারণ;

ফ্রান্সের ক্ষমতা দখলে নেপোলিয়নের সাফল্যের পিছনে বিভিন্ন কারণ ছিল—

১/  নেপোলিয়নের গুনাবলি:  নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত গুণাবলি, চমকপ্রদ ব্যক্তিত্ব ও বাকপটুতা, তুলো বন্দর উদ্ধার, ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও ইটালির যুদ্ধে ধারাবাহিক জয়লাড প্রভৃতির ফলে দেশে তাঁর জনপ্রিয়তা দারুণ বৃদ্ধি পায়। ঐতিহাসিক কার্লটন হেইজ বলেছেন যে, “এইসময় ফ্রান্সের সর্বাধিক আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন নেপোলিয়ন।"

২/  বিপ্লব সম্পর্কে হতাশা;  সন্ত্রাসের শাসনকালে মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হলে মানুষ বিপ্লব সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মানুষ আশা করেন যে, নেপোলিয়নের মতো শক্তিশালী সেনাপতি দেশে আইন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করতে এবং মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দিতে পারবেন।

৩/  ডাইরেক্টরির অপশাসন: অপদার্থ ও দুর্নীতিগ্রস্ত ডাইরেক্টরদের আমলে (১৭৯৫-৯৯ খ্রি.) দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও খাদ্যাভাব দেশকে তাঁর সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন বলেছেন যে, "বিপ্লবের দুরন্ত গতি শেষ হয়ে যাওয়ায় সাংগঠনিক ও সামরিক প্রতিভাধর সৈনিকের ক্ষমতালাভের পথ প্রশস্ত হয়।

৪/  সুবিধাবাদ:  অত্যন্ত সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদী নেপোলিয়ন একসময় জ্যাকোবিন দলের সদস্য হিসেবে এই দলের সমর্থনে প্রচারপত্র রচনা করেন। পরবর্তীকালে তিনি সুযোগ বুঝে রোবসপিয়ারের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে বিরোধীদের সঙ্গে যোগ দেন।

৫/  বিপ্লবী আদর্শ;  আদর্শের প্রতি নেপোলিয়নের শ্রদ্ধা, বিভিন্ন বিপ্লবী সংস্কার প্রবর্তন, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, বিরোধী দলগুলির প্রতি উদার মনোভাব প্রভৃতি জনগণকে খুবই আকৃষ্ট করে। তিনি 'বিপ্লবের প্রতীক' এ পরিণত হন ।

আধুনিক ইউরোপ তথা বিশ্বের ইতিহাসে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক যিনি এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নিজ প্রতিভার গ্রুনে  ফ্রান্সের চূড়ান্ত শাসনক্ষমতা দখল করেন। ঐতিহাসিক ফিলিপ গুয়েদালা বলেছেন যে, “নেপোলিয়নের উত্থানের ফলে ফ্রান্সের ইতিহাস হয় ইউরোপের ইতিহাস এবং নেপোলিয়নের ইতিহাস হয় ফ্রান্সের ইতিহাস"।

নেপোলিয়নের উত্থান ও ক্ষমতালাভ;

১/   উত্থান: ফরাসি বিপ্লবের ঘটনা নেপোলিয়নের উত্থানের ড়িত গড়ে দেয়। এই বিপ্লবই তাঁকে জীবন পথের সন্ধান দেয়। তিনি বিপ্লবপন্থী জ্যাকোবিন দলের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজেকে ইতিহাসের পাদপ্রদীপের সামনে তুলে ধরেন। বিপ্লবের পর নেপোলিয়ন মাত্র ১৭ বছর বয়সে ফরাসি গোলন্দাজ বাহিনীর লেফটেন্যান্ট পদে নিযুক্ত হন।

২/  অভ্যন্তরীণ সাফল্য: লেফটেন্যান্ট পদে বসে নেপোলিয়ন ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পান। এই সময়—

[i] ইংরেজ বাহিনীর অবরোধ থেকে ফ্রান্সের তুলো বন্দর যুক্ত (১৭৯৩ খ্রি) করে সামরিক সাফল্য দেখিয়ে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের পদে উন্নীত হন। [ii] তিনি উন্মত্ত জনতার আক্রমণ থেকে ফরাসি জাতীয় সভাকে রক্ষা করেন (১৭৯৫ খ্রি.) এটি 'ভঁদেমিয়ার ঘটনা' নামে পরিচিত। এই সাফল্যের পুরস্কারস্বরূপ তিনি মেজর জেনারেল পদ লাভ করেন।

৩/ সামরিক সাফল্য : ডাইরেক্টরির শাসনকালে (১৭৯৫-৯৯ খ্রি.) নেপোলিয়ন [i] ইটালির সার্ডিনিয়া, পার্মা, মডেনা ও নেপলসকে পরাজিত করেন।[ii] অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করে মিলান-সং ইটালির বিভিন্ন স্থান ফ্রান্সের দখলে আনেন এবং পরে অস্ট্রিয়াকে ক্যাম্পো ফর্মিও -এর সন্ধি (১৭৯৭ খ্রি.) স্বাক্ষরে বাধ্য করেন। [iii] পোপের রাজ্য আক্রমণ করে পোপকে টলেন্টিনা-র সন্ধি (১৭৯৭ খ্রি.) স্বাক্ষরে বাধ্য করেন। [iv] ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পিরামিডের যুদ্ধে (১৭৯৮ খ্রি.) জয়লাভ করলেও নীলনদের যুদ্ধে (১৭৯৮ খ্রি.) পরাজিত হন।

৪/ ক্ষমতা দখল ; ডাইরেক্টরির শাসনকালে ফ্রান্সে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ফলে এই শাসনব্যবস্থার প্রতি ফরাসি জনগণ অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপোলিয়ন সেনাবাহিনীর স ডাইরেক্টরির শাসকদের পদচ্যুত করে (৯ নভেম্বর, ১৭৯৯ খ্রি.) ফ্রান্সে কনসুলেট' নামে এক নতুন শাসনব্যবস্থা চালু করেন। তিনি নিজে  প্রধান কনসালের দায়িত্ব নেন এবং আরও ২ জন সহযোগী কনসাল নিয়োগ করে শাসন চালাতে থাকেন।

৫/ চুরান্ত  ক্ষমতা:  নেপোলিয়ন প্রথমে ১০ বছরের জন্য এবং পরে সংবিধান করে ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে আজীবন কনসাল পদ লাড করেন। ফলে ফরাসি শাসনব্যবস্থায় তাঁর শক্তি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় তিনি ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে 'সম্রাট' উপাধি গ্রহণ করেন এবং মাত্র ৩০ বছর বয়সে ফ্রান্সে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন।

মূল্যায়ন;

ফরাসি বিপ্লবের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার আদর্শকে জনগণের সামনে তুলে ধরে নেপোলিয়ন ক্ষমতা হস্তগত করলেও পরবর্তীকালে তিনি জনগণের স্বাধীনতার অধিকারটি ধূলিসাৎ করেন। অবশ্য জনগণকে সাম্য ও মৈত্রীর অধিকার দিয়ে তিনি দেশবাসীর ক্ষতি কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা করেন। তিনি দেশে চূড়ান্ত স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও সামরিক সাফল্যে দেশবাসী মুখ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ থেকে বিরত ছিল।

নেপোলিয়নের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় কীর্তি হল 'কোড নেপোলিয়ন প্রবর্তন।

কোড নেপোলিয়;

1. আইনসমূহ রচনা;  নেপোলিয়নের উদ্যোগে গঠিত কমিশন ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের জন্য নতুন আইনসমূহ রচনা করেন। এটি 'কোড নেপোলিয়ন (Code Napoleon) বা 'নেপোলিয়নের আইনসংহিতা' নামে পরিচিত।

2.  আইনসমূহের শ্রেণিবিভাগ;  কোড নেপোলিয়নে মোট ২২৮৭টি (মতান্তরে ২২৮১টি) ছিল এ আইনগুলি মূলত তিনভাগে বিভক্ত ছিল, যথা— [i] দেওয়ানি আইন, [ii] ফৌজদারি আইন এবং [iii] বাণিজ্যিক

3.  বৈশিষ্ট্য;  কোড নেপোলিয়নের দ্বারা- [i] আইনের চোখে দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়. [ii] সামন্ততান্ত্রিক অসাম্যের বিলোপ ঘটানো হয়. [iii] যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়. [iv] ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়, [v] সম্পত্তির অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, Ivi] ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করা হয় এবং [vii] অপরাধের শাস্তি হিসেবে জরিমানা, কারাদণ্ড, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতির ব্যবস্থা করা হয়।

4. ত্রুটি;  কোড নেপোলিয়নের বিভিন্ন ত্রুটি ছিল। যেমন- [i] এতে সমাজে নারীর মর্যাদা হ্রাস করা হয়. [II] স্ত্রীর ওপর স্বামীর কর্তৃত্বপ্রতিষ্ঠিত হয়, [ii] পারিবারিক সম্পত্তির অধিকার থেকে নারীকে বঞ্চিত করা হয় এবং [iv] শ্রমিকশ্রেণি তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত  হয়।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সবচেয়ে গৌরবময় কীর্তি হল 'কোড নেপোলিয়ন প্রবর্তন।

কোড নেপোলিয়ন ধারা ;

১/ পরিচিতি; ফ্রান্সে প্রছলিত বিভিন্ন পরস্পরবিরোধি  দেশের সর্বত্র সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নেপোলিয়ন ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে চারজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞকে নিয়ে 'কোড নেপোলিয়ন'। 'আইনসংহিতা' প্রণয়ন করেন। এতে মোট ২২৮৭টি (মতান্তরে ২২৮১টি) 'আইন' বা 'ধারা' ছিল। এই আইনসংহিতাটি তিন ভাগে বিভক্ত ছিল, যথা— [i] দেওয়ানি আইন [ii] ফৌজদারি আইন এবং [iii] বাণিজ্যিক আইন।

২/ আইনের বিভিন্ন ধারা;  কোড নেপোলিয়নে মোট ২২৮৭টি (মতান্তরে ২২৮১টি) 'আইন' বা 'ধারা' ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল [i] আইনের দৃষ্টিতে সকল ব্যক্তির সমানাধিকার, [ii] যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি লাভের অধিকার, [iii] পৈত্রিক সম্পত্তিতে সকল সন্তানের সমানাধিকার, [iv] সামন্ততন্ত্রের বিলোপ সাধন এবং নতুন ভূমিবন্দোবস্ত আইন প্রণয়ন. [v] স্ত্রীর ওপর একমাত্র অধিকার স্বামীর [vi] সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়ভার একমাত্র পিতার [vii] বিচারব্যবস্থার সংগঠন সাধন এবং জুরি প্রথার প্রচলন, viii] ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি দান, [ix] ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি গ্রহণ, [x] অপরাধের শাস্তি হিসেবে জরিমানা, কারাদণ্ড, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতির ব্যবস্থা, [si] সাধারণ অপরাধী এবং রাজনৈতিক অপরাধীদের স্বতন্ত্রীকরণ, [ii] কৃষক ও মধ্যবিত্তরা বিপ্লবের সময় যে জমি পেয়েছিল তার বৈধতা দান।

সম্রাট নেপোলিয়নের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় কীর্তি হল ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে 'কোড নেপোলিয়ন' নামে আইনসংহিতা রচনা।

কোড নেপোলিয়নের গুরুত্ব;

কোড নেপোলিয়নের বিভিন্ন গুরুত্ব ছিল। যেমন—

1.  সাম্যের স্বীকৃতি: নেপোলিয়ন তাঁর আইনসংহিতায় ফরাসি বিপ্লব প্রসূত সাম্যনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি—[i] সামন্ততান্ত্রিক বৈষম্যের অবসান, [ii] আইনের চোখে সকলের সমান মর্যাদা [iii] সরকারি চাকরিতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রভৃতির মাধ্যমে সাম্য প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হন।

2 .স্বাধীনতার স্বীকৃতি: নেপোলিয়ন তাঁর আইনসংহিতার মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লব-প্রসূত গুরুত্বপূর্ণ ভাবধারা স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তি ক্রয়বিক্রয় ও ভোগদখলের স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, প্রভৃতি ছিল এতে উল্লিখিত উল্লেখযোগ্য স্বাধীনতা।

3. আধুনিকতা;  কোড নেপোলিয়নের আইনসমূহ সমকালীন যুগের বিচারে অত্যন্ত আধুনিক ছিল। ফ্রান্সে প্রচলিত হওয়ার পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আইনব্যবস্থায় স্থান পায়। এই কৃতিত্বের জন্য নেপোলিয়নকে অনেকে 'দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান' বলে অভিহিত করেন।

4.  বিপ্লব রক্ষিত: ফরাসি বিপ্লবের মূল লক্ষ্যগুলিকে নেপোলিয়ন তাঁর আইনব্যবস্থায় স্থান দেন। ফিলারের মতে, এই আইনগুলি বিপ্লবের স্থায়ী বিজয়কে সুনিশ্চিত করে। নেপোলিয়ন নিজেও তাঁর যুদ্ধ জয়ের চেয়ে এই আইনগুলিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন।

ফরাসি বিপ্লবের কালে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবী সংবিধান দ্বারা ফরাসি গির্জার জাতীয়করণ করা হলে পোপ তথা ক্যাথলিক প্রজাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধ বাঁধে।

  1. কনকর্ডটি চুক্তি সম্পাদন: পরবর্তীকালে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট রাষ্ট্রের সঙ্গে পোপ ও ক্যাথলিক প্রজাদের বিরোধ মিটিয়ে নিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান জগতের ধর্মগুরু পোপ সপ্তম পায়াস-এর সঙ্গে 'কনকর্ডাট' বা ‘ধর্ম-মীমাংসা' চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

2.  চুক্তির বিষয়বস্তু: কনকর্ডাট চুক্তির দ্বারা স্থির হয় যে [i] পোপ ফরাসি গির্জা ও গির্জার সম্পত্তির জাতীয়করণ মেনে নেবেন। [ii] সম্রাট রোমান ক্যাথলিক ধর্মমত ও গির্জাকে স্বীকৃতি দেবে। [iii] সরকার যাজকদের নিয়োগ করবে এবং পোপ তাঁদের স্বীকৃতি দেবে। [iv] রাষ্ট্র যাজকদের বেতন দেবে।

মূল্যায়ন;

ধর্ম-মীমাংসা চুক্তির মাধ্যমে ফরাসি রাষ্ট্র এবং পোপ উভয়েরই সুবিধা হয়। একদিকে যেমন ফ্রান্সে ধর্মীয় ঐক্য ফিরে আসে, অন্যদিকে তেমনি নেপোলিয়ন ক্যাথলিকদের সমর্থন লাভ করেন। যাজকদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠিত হয় ফলে রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি পায়।