অধ্যায়-৬, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর

ইটালির ফ্যাসিস্ট শাসক মুসোলিনির বৈদেশিক নীতির প্রধান লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যগুলি ছিল । - (1) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যুদ্ধবিগ্রহ ও জঙ্গিবাদী  নীতি গ্রহণ করে ফ্যাসিস্ট শাসনের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা, (2) যুদ্ধবিগ্রহ চালু রেখে বেকার যুবকদের বিভিন্ন সামরিক কাজে নিযুক্তির দ্বারা কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা, (3) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইটালির মর্যাদা বৃদ্ধি করা প্রভৃতি।

লন্ডনের গোপন চুক্তি (১৯১৫ খ্রি.) অনুসারে ইটালির রোডস দ্বীপ ও ডডিক্যানিজ দ্বীপপুঞ্জ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে (১৯১৯ খ্রি.)  ইটালিকে এই স্থানগুলি দেওয়া হয়নি।

→ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ইটালি ও গ্রিসের মধ্যে লুসানের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। → লুসানের সৃদ্ধির দ্বারা ইটালি গ্রিসের কাছ থেকে রোডস দ্বীপ এবং ডডিক্যানিজ দ্বীপপুঞ্জ লাভ করে।

গ্রিস ও আলবেনিয়ার মধ্যে সীমানা নির্ধারণের কাজে নিযুক্ত কয়েকজন  ইতালীয় প্রতিনিধি ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে নিহত হয়। এই ঘটনার জন্য ইটালির শাসক মুসোলিনি গ্রিসকে দায়ী করে গ্রিসের করফু দ্বীপটি দখল করে নেয়। অবশেষে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইটালিকে প্রচুর ক্ষতিপূরণ দিয়ে গ্রিস করফু দ্বীপটি ফিরে পায় ।

ইটালি অ্যাবিসিনিয়া আক্রমণ করলে জাতিসংঘ ) 1. ইটালিকে 'আক্রমণকারী' বলে ঘোষণা করে। 2. ইটালির সঙ্গে সর্বপ্রকার আমদানি রপ্তানি বন্ধ করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে নির্দেশ দেয় ।

অ্যাবিসিনিয়া-সোমালিল্যান্ড সীমান্তের ওয়াল ওয়াল গ্রামে ইতালীয় অ্যাবিসিনীয় সেনাদের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধে (৫ ডিসেম্বর, ১৯৩৪ খ্রি.) কিছু ইতালীয় সেনা নিহত হয়। এই ঘটনায় ইটালির শাসক মুসোলিনি অ্যাবিসিনিয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে এবং কিছুদিন পর অ্যাবিসিনিয়ায় আক্রমণ শুরু (৩ অক্টোবর, ১৯৩৫ খ্রি.) করে।

ইটালি কর্তৃক অ্যাবিসিনিয়া দখলের ঘটনার তাৎপর্যগুলি ছিল—1. এই ঘটনায় জাতিসংঘের দুর্বলতা প্রকাশ্যে এসে পড়ে। 2. জাতিসংঘের মর্যাদা নষ্ট হয়। 3. ইটালির আগ্রাসনের সাফল্যে জার্মানির হিটলারও আগ্রাসনে উৎসাহ পান। 4. ইটালি ও জার্মানির ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।

রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তিতে বলা হয় যে-1. জার্মানি ও রাশিয়া আগামী ১০ বছর পরস্পরকে আক্রমণ করবে না। 2. তারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের বিবাদ মিটিয়ে নেবে। 3. উক্ত দুই পক্ষ কোনো তৃতীয় শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হলে তারা কেউ তৃতীয় শক্তিকে সাহায্য করবে না। 4. এই চুক্তির গোপন শর্তে বলা হয় যে, পোল্যান্ড দখল করে তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে।

জেনেভা নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে (১৯৩৩ খ্রি.) জার্মানির দাবি ছিল—
1. ভার্সাই সন্ধির দ্বারা যতটা জার্মানির সামরিক শক্তি হ্রাস করা হয়েছে, অন্যান্য রাষ্ট্রের সামরিক শক্তিও ততটা হ্রাস করতে হবে। অথবা, 2.  জার্মানিকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে।

ইটালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিটো মুসোলিনি (১৯২২-৪৫ খ্রি.) বৈদেশিক ক্ষেত্রে যুদ্ধবাদী আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেন।

ফ্যাসিস্ট ইটালির আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি / সাম্রাজ্যবাদ-

মুসোলিনি বৈদেশিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন-
1. গ্রিসে আগ্রাসন: মুসোলিনি গ্রিসকে লুসানের সন্ধি (১৯২৩ খ্রি.)। স্বাক্ষরে বাধ্য করে তার কাছ থেকে রোডস দ্বীপ ও ডডিক্যানিজ দ্বীপপুঞ্জ লাভ করে। কিছুদিন পর মুসোলিনি গ্রিসের করফু দ্বীপটি দখল করে প্রচুর আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে তা গ্রিসকে ফিরিয়ে দেন।

2. ইউগোয়াডিয়ায় আগ্রাসন: মুসোলিনি ইউগোস্লাভিয়াকে নেটিউনো-র সন্ধি (১৯২৫ খ্রি.) স্বাক্ষরে বাধা করে তার কাছ থেকে ফিউম বন্দর এবং ইউগোয়াডিয়ায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক অধিকার লাভ করে।

3. অ্যাবিসিনিয়া দখল: মুসোলিনি উত্তর আফ্রিকার অ্যাবিসিনিয়া বা ইথিওপিয়া আক্রমণ (১৯৩৫ খ্রি.) করে তা দখল (১৯৩৬ খ্রি.) করে নেয়। জাতিসংঘ ইটালিকে 'আক্রমণকারী' বলে ঘোষণা করলে ইটালি জাতিসংঘের সদস্যপদ ত্যাগ করে।

4. আলবেনিয়া দখল: মুসোলিনি আলবেনিয়া আক্রমণ (১৯৩৯ খ্রি.) করে তা ইটালির সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেন।

বেনিটো মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট দল ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ইটালির রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে। ফ্যাসিস্ট সরকার বৈদেশিক ক্ষেত্রে উগ্র সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করে।

গ্রিসের সঙ্গে ইটালির ফ্যাসিস্ট সরকারের সম্পর্ক-

ইটালির ফ্যাসিস্ট সরকার গ্রিসে নির্লজ্জ আগ্রাসী নীতি চালায় ।

১। লুসানের সন্ধি: ইটালির শাসক মুসোলিনি গ্রিসকে লুসানের সন্ধি (১৯২৩ খ্রি.) স্বাক্ষরে বাধ্য করে গ্রিসের কাছ থেকে রোস দ্বীপ ও ডডিক্যানিজ দ্বীপপুঞ্জ অধিকার করে নেন।

২। করফু দ্বীপ দখল: গ্রিস-আলবেনিয়া সীমানায় কয়েকজন ইতালীয় নিহত হলে এর জন্য মুসোলিনি গ্রিসকে দায়ী করে গ্রিসের করফু দ্বীপটি দখল করে নেন।

৩। জাতিপুঞ্জের মধ্যস্থতা : জাতিসংঘ করফু দ্বীপের বিষয়ে ইটালি ও গ্রিসের মধ্যে মধ্যস্থতা করে। সেই অনুসারে ইটালি গ্রিসের কাছ থেকে প্রচুর আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায় করে গ্রিসকে দ্বীপটি ফিরিয়ে দেয়।

ইটালির একদিকে ভূমধ্যসাগর এবং অন্যদিকে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর অবস্থিত। এই অঞ্চলে ইটালির ভৌগোলিক সম্প্রসারণের জন্য সেদেশের ফ্যাসিস্ট শাসক মুসোলিনি সক্রিয় উদ্যোগ নেন ।

ফ্যাসিস্ট ইটালি ও ইউগোস্লাভিয়ার সম্পর্ক-

ফ্যাসিস্ট ইটালি ইউগোস্লাভিয়ার ক্ষেত্রে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেন।

1. দাবি ;-লন্ডনের চুক্তি (১৯১৫ খ্রি.) অনুসারে অ্যাড্রিয়াটিক অঞ্চলের বেশকিছু স্থান ইটালির পাওয়ার কথা থাকলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফিউম বন্দর সহ অধিকাংশই ইউগোস্লাভিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। মুসোলিনি ইটালির ক্ষমতা দখল করে ইউগোস্লাভিয়ার কাছে সেসব স্থান দাবি করেন।

2. নেভিউনো চুক্তি : মুসোলিনি ইউলোয়াডিয়াকে নেটিউনো চুক্তি (১৯২৯ খ্রি) রাধা করেন। এর দ্বারা ইউগোস্লাডিয়ার কা থেকেই [1] কিউম বন্দর এবং [ii] বিভিন্ন বাণিজ্যিক অধিকার লাভ করে।

3. আলবেনিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা : ইউগস্লাভিয়ার ফ্রান্সের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে পত্তি বৃদ্ধি করলে ইতালি আলবেনিয়ার সঙ্গে তিরানা চুক্তি (১৯২৬ খ্রি.) স্বাক্ষর করে। এই উদ্যোগ ইউগোস্লাভিয়াকে আতঙ্কিত করে ।

4. বালগেরিয়ায় মদত: ইউগোস্লাভিয়ার সঙ্গে বালগেরিয়ার সংযুক্তির সম্ভাবনা দেখা দিলে এই সংযুক্তির বিরুদ্ধে বালগেরিয়ায় মুসোলিনির সহায়তায় তাঁর বিদ্রোহ শুরু হয়। ফলে সংযুক্তি বাতিল হয়ে যায়।

5. আলেকজান্ডার নিহত : ইউগোস্লাভিয়ার, রাজা আলেকজান্ডার আততায়ীর হাতে মার্সাই বন্দরে নিহত (১৯৩৪ খ্রি.) হন। ইউগোস্লাভিয়া এই ঘটনার জন্য ইটালিকে দায়ী করে। এভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ইতালি ও ইউগোস্লাডিয়ার মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা অব্যাহত থাকে।

ইটালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট সরকার আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করে ইটালির শক্তি ও গৌরব বৃদ্ধির চেষ্টা করে।

ফ্যাসিস্ট ইটালির সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক ; -

মুসোলিনির নেতৃত্বে ইটালির সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক ছিল নিম্নরূপ—

1. সুসম্পর্কের নৈকট্য: ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হিটলারের জার্মানিতে নাৎসি একনায়কতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ইটালি ও ফ্রান্স উভয়ই আতঙ্কিত হয় এবং রোম চুক্তি বা লাভাল-মুসোলিনি চুক্তি (১৯৩৫ খ্রি.) স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির দ্বারা [i] টিউনিশিয়ায় ইটালি বেশকিছু সুবিধা লাভ করে এবং [ii] ফ্রান্স আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশের প্রায় ৪৫ হাজার বর্গমাইল এলাকা ইটালিকে দিয়ে দেয়।

2.আবিসিনিয়া আক্রমণ: ইটালি ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে আফ্রিকার অ্যাবিসিনিয়া বা ইথিওপিয়া দখল করলে ফ্রান্স এর প্রতিবাদ করে এবং ফ্রান্সের উদ্যোগে জাতিসংঘ ইটালিকে 'আক্রমণকারী' হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে ইটালি জাতিসংঘ ত্যাগ করে।

3.জার্মানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা : ইতিমধ্যে জার্মানির হিটলারের সঙ্গে মুসোলিনির মনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। ইটালি ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির অক্ষশক্তিতে যোগ দেয় এবং উভয়ে স্পেনের গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহী নেতা ফ্রাকোকে সমর্থন করেন। ফলে ইটালির সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে।

ইটালির উগ্র সাম্রাজ্যবাদী ফ্যাসিস্ট শাসক মুসোলিনি উত্তর আফ্রিকার জাবিসিনিয়া বা ইথিওপিয়া আক্রমণ (১৯৩৫ খ্রি.) ও দখল (১৯৩৬ খ্রি.) করেন।

অ্যাবিসিনিয়া আক্রমণের উদ্দেশ্য কারণ -

ইটালি কর্তৃক আবিসিনিয়া আক্রমণের বিভিন্ন উদ্দেশ্য বা কারণ ছিল। যেমন-  1. প্রতিশোধ গ্রহণ ; - ইষ্টামি ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে অ্যাবিসিনিয়া আক্রমণ করলেও অ্যাডোয়ার যুদ্ধে ইটালি পরাজিত হয়। পরবর্তীকালে মুসোলিনি অ্যাবিসিনিয়া দখলের মাধ্যমে এই পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্যোগ নেন।
2. জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ইটালির ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য বাসস্থান, খাদ্য, কর্মসংস্থান প্রভৃতির প্রয়োজনে মুসোলিনি ইটালির ভৌগোলিক সম্প্রসারণ ঘটানোর উদ্যোগ নেন।

3. শিল্পের বিকাশ ; ইটালিতে শিল্পের বিকাশ ঘটলে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ এবং উৎপাদিত শিল্পপণ্য বিক্রির জন্য মুসোলিনি অ্যাবিসিনিয়ার দিকে নজর দেন।

4. অবস্থান: অ্যাবিসিনিয়ার অবস্থান ছিল ইটালির সাম্রাজ্যভুক্ত সোমালিল্যান্ড ও ইরিত্রিয়ার মাঝখানে। মুসোলিনি যে অখন্ড পূর্ব আফ্রিকা রাজ্য গঠনের পরিকল্পনা করেন তার জন্য অ্যাবিসিনিয়া দখলের প্রয়োজন হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫ খ্রি.) ছিল বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে একদিকে ছিল অক্ষশক্তিভুক্ত জার্মানি, ইতালি, জাপান প্রভৃতি। রাষ্ট্র এবং অন্যদিকে ছিল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, আমেরিকা প্রভৃতি রাষ্ট্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভিন্ন কারণ ; -

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পশ্চাতে বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন-

১।ত্রুটিপূর্ণ ভার্সাই সন্ধি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রশক্তি পরাজিত জার্মানির ওপর তীব্র বৈষম্যমূলক ভার্সাই সন্ধি (১৯১৯ খ্রি.) চাপিয়ে দেয়। এই সন্ধির দ্বারা—[i] জার্মানির বিভিন্ন ভূখণ্ড, শিল্পাঞ্চল, খনি ও উপনিবেশগুলি কেড়ে নেওয়া হয়, [ii] জার্মানির সামরিক শক্তি হ্রাস করে। তাকে ক্ষুদ্র বেলজিয়ামের চেয়েও দুর্বল করা হয়, [ii] জার্মানির ওপর বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপুরণের বোঝা চাপানো হয়। ঐতিহাসিক ই এইচ কার একে ‘জবরদস্তিমূলক চুক্তি' বলে অভিহিত করেছেন। জার্মানি এই ‘একতরফা চুক্তি' ডেঙে ফেলার সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।

২। ঔপনিবেশিক লড়াই: বিংশ শতকের শুরুতে বিশ্বের অধিকাংশ উপনিবেশ ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, আমেরিকা প্রভৃতি দেশের দখলে চলে যায় । পরবর্তীকালে ইটালি, জাপান প্রভৃতি দেশ খুব বেশি উপনিবেশ দখল করার সুযোগ না পেয়ে ক্ষুদ্ধ হয়। তাছাড়া ভাসাই সন্ধির দ্বারা জার্মানির অধিকাংশ উপনিবেশ মিত্রপক্ষ কেড়ে নেয়। ফলে উপনিবেশের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়।

৩। একনায়কতন্ত্রের উত্থান: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েকটি দেশে একনায়কতান্ত্রিক শাসকের উদ্ভব ঘটে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইটালির ফ্যাসিস্ট শাসক মুসোলিনি, জার্মানির নাৎসি শাসক হিটলার, জাপানের শাসক তোজো প্রমুখ। তাদের উগ্র সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবাদী নীতি বিশ্বে অশান্তি সৃষ্টি করে।

৪। নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনের ব্যর্থতা: জেনেভার নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে (১৯৩৩ খ্রি.) বৃহৎ শক্তিগুলি জার্মানির অস্ত্রশক্তি হ্রাসে অত্যন্ত উদ্‌গ্রীব হলেও তারা নিজেদের অস্ত্রশক্তি হ্রাস করতে রাজি ছিল না। জার্মানি নিজের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ না পেয়ে সম্মেলন ত্যাগ করে নিজের ইচ্ছামতো সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে।

৫। জাসিংঘের ব্যর্থতা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও জাতিসংঘ তার লক্ষ্যপূরণে বারবার ব্যর্থ হয়। যেমন- [i] জাপান হিনের মাঞ্চুরিয়া দখল  (১৯৩১ খ্রি.) করলেও জাতিসংঘ জাপানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। [ii] ইটালি অ্যাবিসিনিয়া দখল (১৯৩৬ খ্রি.) করলে জাতিসংঘ তা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়, [iii] জার্মানি জাতিসংঘ ত্যাগ করার পর একে একে রাইন ভূখণ্ড, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া প্রভৃতি করে। কিন্তু এই রকম পরিস্থিতিতেও জাতিসংঘ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

৬। শক্তিজোট:  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্ব পরস্পর বিরোধী দুতি সম্পন্ন শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে থাকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, আমেরিকা প্রভৃতি দেশকে নিয়ে গড়ে ওঠা 'মিত্রশক্তি' এবং অন্যদিকে থাকে জার্মানি,ইটালি, জাপান প্রভৃতি দেশকে নিয়ে গড়ে ওঠা "অক্ষশক্তি”। উভয় শিবিরের মধ্যে সমরসজ্জার প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

৭। ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ : জার্মানি, ইতালি, জাপান প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র রমাগত ভার্সাই সন্ধির বিভিন্ন ধারাগুলি লঙ্ঘন করে বিভিন্ন দেশে আগ্রাসন চালায়। এই আগ্রাসন প্রতিরোধের চেষ্টা না করে ইঙ্গ ফরাসি শক্তি দীর্ঘদিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিকে তোষণ করতে থাকে। ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি মনে করত যে, তোষণনীতির মাধ্যমে জুদ্ধ এড়ানো যাবে। কিন্তু এই তোষণনীতির ফলে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির আগ্রাসন আরও বেড়ে যায়।

৮। প্রত্যক্ষ কারণ  : জার্মানির শাসক হিটলার ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ৩ সেপ্টেম্বর ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

মূল্যায়ন : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত যুদ্ধে মিত্রশক্তির কাছে জার্মান নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তি পরাজিত হয়। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর ইতালি, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে জার্মানি এবং ২ সেপ্টেম্বর জাপান আত্মসমর্পণ করে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে।