অধ্যায়-10, বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়াে

কাঁকড়াগুলোকে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দিতে হয়েছিল তার কারণ পেলাই ও দম্পতির নবজাত শিশুটির ছিল। জ্বর, আর ওরা ভেবেছিল জ্বরটা হয়েছে ওই পচা বদদ্ধটার দরুন।

মঙ্গলবার থেকে সারা জগৎ বিষণ্ণ হয়ে আছে।

প্রকৃতি-বিশ্বে সেই বিষয়তা চারিয়ে গিয়েছে। সমুদ্র আর আকাশ হয়ে উঠেছে ছাই-ধূসরবস্তু। বেলাভূমির বালি মার্চের রাত্তিরে যা ঝাকঝক করে গুঁড়ো গুঁড়ো আলোর মতো, সেগুলিও হয়ে উঠেছে কাদা আর পচা খোলক মাছগুলোর এক ভাপে সিদ্ধ হওয়া দগদগে স্তূপ।

তার বিশাল দুই ডানায় কেবলই বাধা থুরথুরে বুড়োটি উঠতে পারছিল না

দুপুরবেলাতে আলো ছিল খুবই দুর্বল। পাচ্ছিল বলে থুরথুরে বুড়োটি উঠতে পারছিল না।

পেলাইও দুপুরের অস্পষ্ট আলোয় দেখেছিল উঠোনের পেছন কোণটায় কী একটা ছটফট করেছে। খুব কাছে গিয়ে দেখে যে এক খুবই ঘুরথুরে বুড়ো কাদার মধ্যে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে।

দুঃস্বপ্ন দেখে পেলাইও প্রথমে আঁৎকে উঠেছিল।

পেলাইও ছুটে গিয়েছিল তার বউ এলিসেন্দার কাছে।

এলিসেন্দা তখন অসুস্থ বাচ্চাটির কপালে জলপটি দিচ্ছিল।

তারপর পেলাইও তাকে ডেকে নিয়ে গেল উঠোনের পেছন কোণায়।

উঠোনের পেছন কোণায় পড়ে থাকা শরীরটার দিকে তাকিয়ে তারা কেমন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

বুড়োর পরনে ছিল ন্যাকড়াকুড়ুনির পোশাক।

বুড়োর টাক পড়া চকচকে মাথায় ছিল কয়েকটা মাত্র বিবর্ণ চুল। ফোকলা মুখটায় খুবই কম দাঁত। তার অতিকায় শিকারি পাখির ডানা-নোংরা, আদ্ধেকটাই পালক খসা, চিরকালের মতো কাদায় জট পাকিয়ে গেছে।

চেনা-চেনা ঠেকলে তখনই তারা সাহস করে তার সঙ্গে কথা কইবার চেষ্টা করে।

তাদের সে চেষ্টায় ঘুরঘুরে বুড়ো খালাসিদের মতো গলা ফাটিয়ে রিনরিনে গলায় কী এক দুর্বোধ্য বুলিতে জবাব দিয়েছিল।

তারা তখন ভেবেছিল যে বুড়ো নিশ্চয়ই তুফানে উলটে যাওয়া কোনো ভিনদেশি জাহাজের নিঃসকা ভরাডুবি নাবিক।

তাকে দেখাবার জন্যে ওরা এক পড়োশিনিকে ডেকে এনেছিল।

পড়োশিনি তাদের বুঝিয়েছিল যে, ওরা একটা মস্ত ভুল করেছে।

-একথা পড়োশিনি পেলাইও দম্পতিকে বলেছিল।

পড়োশিনি বুড়ো সম্পর্কে পেলাইও দম্পতিকে বলেছিল যে, সেই ফরিশতা নিশ্চয়ই তাদের বাচ্চাকে যেতে আসছিল কিন্তু বেচারা এমনই বুড়োহাবড়া যে সেই মুষলবৃষ্টি তাকে একেবারে কাবু করে ফেলেছে।

পরের দিন সবাই জেনে গিয়েছিল যে পেলাই ওদের বাড়িতে রক্ত-মাংসের এক ফরিশতাকে কয়েদ করে রাখা হয়েছে।

না, জ্ঞানে ঝুনো পড়োশিনির বিচার-বুদ্ধিকে পেলাইও কোনো পাত্তা দেয়নি।

পেলাইও ছুটে গিয়েছিল তার বউ এলিসেন্দার কাছে।

এলিসেন্দা তখন অসুস্থ বাচ্চাটির কপালে জলপটি দিচ্ছিল।

তারপর পেলাইও তাকে ডেকে নিয়ে গেল উঠোনের পেছন কোণায়।

উঠোনের পেছন কোণায় পড়ে থাকা শরীরটার দিকে তাকিয়ে তারা কেমন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

বুড়োর পরনে ছিল ন্যাকড়াকুড়ুনির পোশাক।

বুড়োর টাক পড়া চকচকে মাথায় ছিল কয়েকটা মাত্র বিবর্ণ চুল। ফোকলা মুখটায় খুবই কম দাঁত। তার অতিকায় শিকারি পাখির ডানা-নোংরা, আদ্ধেকটাই পালক খসা, চিরকালের মতো কাদায় জট পাকিয়ে গেছে।

চেনা-চেনা ঠেকলে তখনই তারা সাহস করে তার সঙ্গে কথা কইবার চেষ্টা করে।

তাদের সে চেষ্টায় ঘুরঘুরে বুড়ো খালাসিদের মতো গলা ফাটিয়ে রিনরিনে গলায় কী এক দুর্বোধ্য বুলিতে জবাব দিয়েছিল।

তারা তখন ভেবেছিল যে বুড়ো নিশ্চয়ই তুফানে উলটে যাওয়া কোনো ভিনদেশি জাহাজের নিঃসকা ভরাডুবি নাবিক।

তাকে দেখাবার জন্যে ওরা এক পড়োশিনিকে ডেকে এনেছিল।

পড়োশিনি তাদের বুঝিয়েছিল যে, ওরা একটা মস্ত ভুল করেছে।

একথা পড়োশিনি পেলাইও দম্পতিকে বলেছিল।

পড়োশিনি বুড়ো সম্পর্কে পেলাইও দম্পতিকে বলেছিল যে, সেই ফরিশতা নিশ্চয়ই তাদের বাচ্চাকে যেতে আসছিল কিন্তু বেচারা এমনই বুড়োহাবড়া যে সেই মুষলবৃষ্টি তাকে একেবারে কাবু করে ফেলেছে।

পরের দিন সবাই জেনে গিয়েছিল যে পেলাই ওদের বাড়িতে রক্ত-মাংসের এক ফরিশতাকে কয়েদ করে রাখা হয়েছে।

না, জ্ঞানে ঝুনো পড়োশিনির বিচার-বুদ্ধিকে পেলাইও কোনো পাত্তা দেয়নি।

উঠোনের চারপাশে বেড়া দিয়ে সকলের কাছ থেকে দর্শনীবাবদ পাঁচ সেস্তাবো করে চাওয়ার ফন্দি খেলেছিল।

ফরিশতার একমাত্র খাদ্য বেগুনভর্তা।

ফরিশতার একমাত্র অতিপ্রাকৃত শক্তি মনে হল প্রথম দিনগুলো তার ধৈর্যের কারণে।।

তার জানায় যেসব আগাছা জন্মেছিল তার খোঁজে যখন মুরগিরা তাকে ঠোকরাত, আর পশুরা ছিঁড়ে নিত তার পালক, কিংবা তাকে দয়াবানরাও ঢিল ছুড়ত, তখনও সে শান্তই থাকত।

'সে' বলতে গল্পের বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়োকে বোঝানো হয়েছে।  অতিপ্রাকৃত জীব বলতে লেখক ফরিশতা বা দেবদূতকে বুঝিয়েছেন।

এখানে দেবদূতকে অর্থাৎ বিশাল ডানাওয়ালা এক ঘুরঘুরে বুড়োকে সার্কাসের জন্তুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে তাকে নিয়ে কৌতূহলী জনতার আচরণের কারণে।

তারা সাবধান ছিল, যাতে তাদের বাচ্চা কখনও মুরগির খাঁচাটার খুব কাছে না যায়।।

না, পরবর্তী সময়ে তারা সেই সাবধানতা রাখতে পারেনি। ক্রমে ক্রমে তাদের ভয় যায় কমে এবং তারা গন্ধটায়ও অভ্যস্ত হয়ে উঠল।

বাচ্চার দ্বিতীয় দাঁতটি বেরোবার আগে সে মুরগির খাচার ভিতর খেলতে চলে যেত। • খাঁচার তারগুলো ততদিনে অবহেলায় অযত্নে ছিঁড়ে ছিঁড়ে গিয়েছে।

মাকড়সায় বদলে যাওয়া মেয়েটি আসতেই দেবদূতের নামস্তাক একেবারেই ধসে পড়ল।

পাদে গোনসাগা দেবদূতের অস্তিত্ব সম্পর্কে কৌতূহলী দর্শকদের মনে প্রথম থেকেই নানারকম সন্দেহ আর প্রশ্ন জুগিয়ে যাচ্ছিল। এরপর মাকড়সা-মেয়েটির আবির্ভাব ও তিনদিন তিনরাত্তির একটানা কমকর্ম করে যখন বৃষ্টি চলে—সম্মিলিত এই প্রতিক্রিয়ায় পেলাই ওদের উঠোন ফাঁকা হয়ে গেল।

অন্য কোনো মর্ত্যবাসীর সঙ্গে কোনো মাখামাখি করেনি দেবদূত বরং তাদের থেকে দূরে দূরেই থাকত।

কোনো কুকুর যেমন বাচ্চাদের যাবতীয় যাচ্ছেতাই অপমান ও নিগ্রহ পরম ধৈর্যসহ সহ্য করে, তেমনই ধৈর্যের সঙ্গে দেবদূত পেলাই ওদের বাচ্চাটিকে সহ্য করত।

এই দুজন হল পেলাই ও-এলিমেন্দার বাচ্চা এবং তাদের আশ্রিত দেবতা

যে ডাক্তার বাচ্চাটির রোগ দেখতে এসেছিল, সে অবশ্য দেবদূতের হৃৎপিণ্ডের ধুকধুক শোনবার লোভ সামলাতে পারল না। সে তার বুকে এত শিশু এবং শোরগোল শুনতে পেল যে, ডাক্তারের মনে হল দেবদূতের আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

দেবদূতের ডানার যুক্তি ও প্রকৃতি ডাক্তারকে সবচেয়ে বেশি তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের মনে হয় ডানাদুটি এমনই স্বাভাবিক যে পুরোপুরি কোনো মানুষেরই আবশ্যিক অঙ্গ বলে মনে হয়।

আর তার অবাক লাগল এই ভেবে যে অন্যসব মানুষেরই বা কোনো ডানা নেই কেন?

রোদে-বৃষ্টিতে মুরগির খাঁচা সম্পূর্ণ ধ্বংসের কিছুকাল পরে বাচ্চা স্কুলে যেতে শুরু করে।

বাচ্চা স্কুলে যাওয়া শুরু করার পর দেবদূতের অবস্থার পরিবর্তন সূচিত হয়। এখন সে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় পথহারা দিগভোলা কোনো মুমূর্খের মতো। ওরা তাকে কাঁটা মেরে বার করে দেয় শোবার ঘর থেকে।

তার বলতে ‘বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো' গল্পে দেবদূতের কথা বোঝানো হয়েছে।

সে পালকগুলোকে তার জরার আর একটা দুর্ভাগা লক্ষণ বলেই মনে হয়েছিল।

ডিসেম্বরেরর গোড়ায় তার ডানায় মস্ত কতকগুলো আড়ধরা পালক গজিয়ে ওঠার যে বদল, সেই বদলের বিষয়ে কেউ যাতে কিছু না দেখতে পায়, সে বিষয়ে সে খুব সজাগ ছিল। আকাশভরা ঝিকিমিকি তারার তলায় সে যে গুনগুন করে সিন্ধুরোলের গান করে কেউ যাতে না শুনতে পায় সে বিষয়ে সাবধান ছিল।

দেবদূত যখন ওড়ার চেষ্টা করছিল এলিসেন্দা তখন রান্নাঘরে বসে পেঁয়াজকলির গুচ্ছ কাটছিল।

দেবদূতের উড়ালকে কোনো মতিচ্ছন্ন জরাগ্রস্ত শকুনের ঝুঁকিতে ভরা ডানা ঝাপটানির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এর বিশাল জানাওয়ালা এক ঘুরপুরে বুড়ো' গড়ে পাত্রে গোনলাগা হলেন। যাজনপল্লির পুরুতঠাকুর।

* তিনি বন্দির খবর শুনে তার সম্পর্কে সত্যাসত্য পরীক্ষা করার জন্যে এসেছিলেন। ■ বন্দির ভবিষ্যৎ নিয়ে জড়ো হওয়া দর্শকদের মনে নানা ভাবনা ঘুরতে থাকে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সরল লোকটা ভেবেছে যে বন্দিকে সারা জগতের পুরপিতা নাম দেওয়া উচিত। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত কঠিন হৃদয়ের লোকদের মনে হল। তাকে এক পাঁচতারা সেনাপতির পদে উন্নীত করে দেওয়া হোক যাতে যুদ্ধ-বিগ্রহ সব সে জিতিয়ে দিতে পারে। আবার কিছু কিছু দূরদর্শীর মনে হল, তাকে দিয়ে যদি পৃথিবীতে কোনো ডানাওয়ালা জাতির জন্ম দেওয়ানো সম্ভব হয়, তবে সে জাতি হবে জ্ঞানে-গুণে সকলের সেরা। আর তারাই তখন বিশ্বমান্ড পরিচালনার দায়িত্ব নেবে।

"তিনি" বলতে এখানে যাজনপল্লির পুরুত পারে গোনসাগাকে বোঝানো হয়েছে। ৯ পাস্রে গোনসাগা তারের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে মুহূর্তে জেরা করবার জন্যে প্রশ্নোত্তর সব ভেবে নিলেন। আর গুদের বললেন দরজাটা খুলে দিতে, যাতে ভেতরে গিয়ে কাছ থেকে তিনি হতশ্রী করুণ লোকটাকে দেখে নিতে পারেন। ● পারে গোনসামা মুরগির পাঁচার মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং তাকে লাতিন ভাষায় 'সুপ্রভাত' জানালেন। কিন্তু জগতের।

ধৃষ্টতা আর উচ্চতা তার অচেনা বলে সে শুধু প্রভুপ্রাচীন চোখ তুলে গুনগুন করে কী একটা বললে তার ভাষায়। * এই আচরণে সে তল্লাটের রাজনপল্লির পুরুত পাষে গোনসাগার মনে প্রথম সন্দেহ জেগে উঠল। তিনি দেখলেন বন্দি ঈশ্বরের ভাষা বোঝে না। জানেও না কী করে ঈশ্বরের উজির-নাজিরদের সম্ভাষণ করতে হয়। তখন তিনি মনে করেন বদি এক জোচ্চোর ফেরোজ। তারপর তিনি আরও কাছে গিয়ে খুব নজর করে দেখে বলেন তাকে বড্ড বেশি মানুষ মানুষ দেখায়। তার গা থেকে বেরুচ্ছে খোলামেলার এক অসহ্য গন্ধ। তার ডানাগুলোর পেছন দিকে গজিয়েছে নানারকম পরমা। দেবদূতের সম্মানের সঙ্গে তুলনা করা যায় এমন কিছুই তার নেই। তারপর মুরগির খাঁচা থেকে বেরিয়ে সকলকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে জানালেন যে রোমান ক্যাথোলিকনের হুল্লোড়ে-উৎসবে এসে কৌশলে আচমকা ল্যাং মেরে দেবার একটা বিষম বদভ্যাস আছে এইরকম শয়তানের। যাতে অসাবধানিদের সে বেকায়দায় ফেলে বিপথে নিয়ে যেতে পারে।

ফরিশতাকে দেখার জন্যে দূর-দূরান্ত থেকে নানা কৌতূহলীরা আসে। তাদের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ সার্কাসল যেমন ছিল, তেমনই ছিল বেচারি মেয়ে, পোর্তুগিজ, ঘুমে হাঁটা লোক, আর ছিল কত-কত জন।

* আমামান সার্কাসদলের ছিল উড়ন্ত দলবাজিকর, যে সরু দড়ির ওপর দিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিমায় ইটিতে হাঁটতে খেলা দেখাত । লেগতের সবচেয়ে দুর্ভাগা আর অশক্তরা আসে তাদের স্বাস্থ্যের সন্ধানে। এল এক বেচারি মেয়ে জন্ম থেকেই যে গুনে যাচ্ছিল তার বুকের ধুকধুক। গুনতে গুনতে এখন যে সব সংখ্যাই শেষ করে ফেলেছে। আসে এক পোর্তুগিজ, কিছুতেই যে কখনো ঘুমোতে পারে না। কারণ তারাদের কোলাহল কেবলই তার ঘুম চটিয়ে দেয়। আর আসে এক ঘুমে হাঁটা লোক। যে দিনে জেগে থাকা অবস্থানয় যা যা করেছে, রাত্তিরে ঘুমের ঘোরে উঠে সব গুবলেট করে দেয়। এতসব অব্যবস্থার মধ্যে পেলাইও আর এলিসো অবশ্য তাদের ক্লান্তিতেই সুখী। কারণ এই ফরিশতার কারণে তাদের ঘরে হস্তা শেষ হবার আগে এসেছে বেশ টাকাকড়ি।

এখানে ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীতে আসা এক মাকড়সা-মানবীর কথা বলা হয়েছে। । যখন সে একেবারেই ছেলেমানুষ, এক নাচের আসরে যাবে বলে কাউকে কিছু না জানিয়ে সে তার বাবা-মার বাড়ি। কে বেরিয়ে এসেছিল।

কৌতূহল ভরে সে বাবা-মার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে অনুমতি না নিয়ে সারারাত ধরে নাচে। নাচ শেষে যখন সে এটা বনের মধ্যে নিয়ে ফিরছিল তখন হঠাৎ এক কর ব াকাশকে দু-ভাগে ফেড়ে ফেলে। আর সেই ফাটলের। ৫ দিয়ে নেমে আসে জ্বলন্ত গন্ধকের এক বিদ্যুৎশিখা—যা তাকে বদলে দিয়েছিল সেই আলের মাকড়সাতে।

সেই মেয়েটি ছিল এক ভয়ংকর 'তারানতুলা' যার মাথাটা ছিল এক বিষাদময়ী কুমারী মেয়ের। ) সবচেয়ে হৃদয় বিদারক তার সেই তালক আকৃতি নয়, বরং তার অকৃত্রিম-দুঃখী করুণ গলা, যে গলায় সে তার সব বুটিনাটি বর্ণনা করত, তাই ছিল তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে হৃদয় । * দয়াবান মানুষরা তার মুখে মাংসের বড়া ছুড়ে দিয়ে এসেছে। একমাত্র তাই তাকে অ্যাদ্দিন ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে।

রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর বিশাল ডানাওয়ালা এক ঘুরপুরে বুড়ো' গল্পটি জাদুবাস্তবতার গল্প। এ গল্পের বহুতকে এমন অবস্থানে লেখক রেখেছেন যার মধ্য দিয়ে মানুষের লোভ আর বিবেকহীনতার কথাকে প্রকাশ করতে চান। কবিতাকে নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে পারে মোনসগা পর্যন্ত সকলেই নানা জল্পনা-কল্পনা করেছেন। শেষ পর্যন্ত ফরিশতার গ্রহ কমতে শুরু করল মাকড়শা মানবীর উপস্থিতির পর। বিশাল ডানাওয়ালা থুপুরে বড়ো যে আসলে মানুষ, তার এই নবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কারণে লেখক মাকড়সা মানবীকে গল্পে উপস্থিত করেছেন।

দেবদূতের নামে নানা অলৌকিক অনটনের দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যেমন, এক অন্ধ আঙুর, সে তার এই ফিরে পায়নি ঠিকই, তবে তার তিনটে নতুন নাত গজিয়ে ছিল। কিংবা এক পশু বেচারি যে হেঁটে হেঁটে পাহাড় অতিক্রম পরে পারেনি কিন্তু একটা লটারি প্রায় জিতেই যাচ্ছিল। অথবা এর কুষ্ঠরোগীর মাগুলো থেকে গজিয়েছিল মুক্মিনী ফুল। কোনো সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো এ-সব অলৌকিক কাজ আসলে প্রায় বিদশে সব মশকরা বা কৌতুকের মতো। এসবের ফলে দেবদূতের মান-সম্ভ্রম খ্যাতি ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছিল।

দেবদূতকে দেখার সঙ্গে এই মাকড়সা মানবীকে দেখার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। দেবতকে দেখার জন্যে বেশি পয়তা কাবাবদ দিতে হলেও মাকড়সা মেয়েকে দেখবার জন্যে পয়লা নিতে হত কম। শুধু তাই নয়, তার এই অসম্ভব দশার জন্যে এদিকে যা-খুশি প্রশ্ন করবারও সুযোগ দেওয়া হয়। এমনকী তাকে আগাপাশতলা খুঁটিয়েও দেখতে দেওয়া হয়, যাতে তার এ বিভীষিকার সত্য-মিথ্যা সঙ্গনের কারো মনে কোনো সন্দেহের লেশমাত্র না থাকে। এতটাই করুণ ছিল মেয়েটির বাস্তবতা।

: করিশতা পেলাই ও-সম্পতির জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। দেবদূতকে ব্যবহার করে দর্শনীয়াবন সময়ে যে টাকা তারা কামিয়েছে তা দিয়ে তারা বানিয়ে নিল এক চকমেলানো দোতলা বাড়ি। সে বাড়ির ছিল অহিন্দ তার বাগান। ছিল উঁচু তারের জাল, যাতে শীতের সময় কাঁকড়ারা আর ভিতরে ঢুকতে না পারে। আর জানালায় ছিল।

লোহার গরাদ যাতে কোনো পথহারা দেবদূতও ঢুকে পড়তে না পারে আচমকা। এ ছাড়া শহরের কাছেই পেলাই একটি ঘরগোশ পালন করবার মিষ্টি গোল বানিয়ে নিল। চিরকালের মতে করল ঝাড়ুদারের কাজ। এলিসেন্দর বাত্ত্বিক যাপনেও লাগল আভিজাত্যের পরশ। সে কিনে নিন কতকগুলো উঁচু খুকুগুয়াল ঢাকাই জুতো আর রামধনু-রঙা রেশমি কাপড়ের অনেও প্রশ্ন পোশাক। যে পোশাকগুলো পরত তখনকার দিনে সবচেয়ে অভিজাত ও কাঙ্ক্ষিত মহিলারা রোববারে রোববারে। খাঁচাটার দিকে তারা মনোযোগ দেয়নি তবে মাঝে মাঝে আসিড নিয়ে ঘুয়েছে গু-গোবরের স্তূপের দুর্গন্ধ থেকে বাড়ির আবহকে মুক্ত রাখতে।

উদ্ধৃত স্বরভাষ্যের বক্তা হল এলিসেন্দা।

• এলিসেন্দা-দম্পতির বাচ্চা স্কুলে যাওয়া শুরু করলে দেবদূতের প্রতি তাদের অমনোযোগ ও উদাসীনতা বাড়ে।

এলিসেন্দারা তাকে কাঁটা মেরে বার করে দেয় শোবার ঘর থেকে। পরক্ষণেই তাকে আবার দেখে রান্না ঘরে। একই সঙ্গে

তাকে এত বিভিন্ন জায়গাতে দেখা যায় বলে মনে হয়, তারা অবাক হয়ে যায়। ভাবে এর আবার এগুলো সংস্করণ হয়ে নাকি। সে কি নিজেকেই তৈরি করছে বাড়ির সকল কোণায় ঘামাচিতে? তখনই বিপর্যন্ত ও তিতিবিরক্ত এলিসের কর গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে-মেচিয়ে বলতে লাগল – “দেবদূতে দেবদূতে থৈ-থৈ করা কোনো নরকে বাস করা কী যে জঘন্য কা * দেবদূতের অবস্থা ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়ে। এখন সে খেতেই পারে না। তার প্রভুপ্রাচীন চোখও এত ঘোলাটে হয়ে গেছে যে সবসময় সে জিনিসপত্তরে ধাক্কা খায়। তার শেষ পালকগুলোর নিহত সূক্ষ্ম কালের মতো পারগুলোই এখন আছে মাত্র। পেলাইও একটা কম্বল হুড়ে দেয় তার ওপর। তাকে করুণা করে একটা আটচালার নীচে শুতে দেয়। এই সময় রোজ রাত্তিরে তার জ্বর আসত। আর বুড়ো কোনো নরওয়েবাসীর জিভ জড়ানো ভাষায় সেই বিকারের ঘোরে প্রলাপ বকত। তাে এলিসেদা দম্পতি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল এবং তারা ধরেই নিয়েছিল যে দেবদূত বুঝি মরতে বসেছে।

একথা এলিসেলার মনে হয়েছিল। একদিন সকালে এলিসেন্দা যখন পেঁয়াজকলির গৃহ কইছে, তখন তার মনে হয়েছিল হঠাৎ যেন দূর বারদরিয়ার এক ঝলক হাওয়া এসে ঢোকে অর রান্না ঘরে। তখন সে জাগিয়ে দেখে পায় দেবদূত সেই প্রথম তার ডানা ছড়িয়ে ওড়বার চেষ্টা করছে।

, দেবদূতের ওড়বার চেষ্টার প্রকৃতি পাঠকের মনে একই সঙ্গে ভয় ও করুণার সৃষ্টি করে। দেবদূত অসোহাে অনভ্যস্তভাবে গুড়বার চেষ্টা করছিল। তার নখগুলো সবজিবাগানের মধ্যে গভীর সব খাঁজ কেটে নিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন তার জবুথবু উলটোপালটা ডানা ঝাপটানিতে আটচালাটা ধসিয়ে দেবে। বারবার সে বিচ্ছিরিভাবে হতকে যাচ্ছিল। কিছু আঁটো করে চেপে ধরতে পারছিল না হাওয়া।

[7:28 am, 03/10/2022] Anju: কটু নড়বড়েভাবে হলেও দেবদূত যখন একটু ওপরে উঠতে পারল, তখন তাই দেখে এলিসেনা ছি

নিশ্বাস ফেলেছিল।

* সে নিজের জন্যে আর দেবদূতের জন্যে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল। কারণ দেবদূতের এই খারাপ অবস্থা তাকে এম দেখতে হবে না যেমন, তেমনই দেবদূত তাদের আশ্রয় ও ছেড়ে চলে যাচ্ছে—এই কারণে। * দেবদূত এখন শেষ বাড়িগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সে উড়ালে সে কোনোরকমে নিজেকে ধরে রেখেছে উড়াল যেন কোনো মতিচ্ছন্ন জরাগ্রস্ত শকুনের ঝুঁকিতে ভরা ডানা ঝাপটানি। বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো পেঁয়াজকলি কাটা সারা হলেও এলিসেলা তাকে দেখতে থাকে তাকিয়ে যতক্ষণ তাকে বিন্দুবৎ হলেও দেখা যায়। দেবদূত তখন এসিসেন্দার জীবনের কোনো জ্বালাতন বা উৎপাত নয়, বরং মহাসমুদ্রের নিকচক্রবালে নিছকই মানিক একটা ফুটকিই যেন। অর্থাৎ ব্যক্তিজীবনের সলো দেবদূতের উড়ালের আর কোনো সংযোগ থাকল না, এই বিশ্বয়ে এলিসেলা তাকিয়েই থাকে।

গারিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো' গল্প সম্পর্কে 'জাদুবাস্তবতা'-র মুভিধার সত্যাসত্য নির্ণয়ের আগে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া দরকার 'জাদুবাস্তবতা' (Magic Realism) কী? ম্যাজিক রিয়ালিজম-এর বীজ নিহিত ছিল সম্ভবত কিউবা-র উপন্যাসকার অ্যালিজো কারপেন্টার-এর একটি প্রশ্নে "What is the story of Latin America if not a chronicle of the marvellous in the real ?"

জানুবাস্তবতা হল তাই, যেখানে আখ্যানের ভেতরে বাস্তব আর কাল্পনার থাকে অদ্ভুত মিশেল। বিশ্বাসা এবং বস্তুনিষ্ঠ বোর নির্ভর ন্যারেটিভের মধ্যে থাকে অবিশ্বাস্য ও অধিবাস্তব ঘটনার আশ্চর্য উপস্থিতি। রূপকথা, স্বপ্ন, পুরাণ, মিথ তবে লোকগাথার ঐন্দ্রজালিক উপস্থাপনা।

এই জাতীয় গল্পে বা আখ্যানে যেন হঠাৎ কোনো এক মুহূর্তে ঘটনার বর্ণনা যুক্তির সীমানা ছাড়িয়ে কল্পনার অভিমুখী হয়। ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও শাসনের স্বেচ্ছাচারিতাকে তুলে ধরার জন্যে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতে এই জাদুবাস্তবতা কথাসাহিত্যে এনেছিল এক নতুন আঙ্গিক। যার মধ্য দিয়ে সমাজ ও রাজনীতির উৎকেন্দ্রিকতাকে তুলে ধরা সম্ভব আসলে লোকালয়ের নানা আন্দোলনকে অতিক্রম করে রূপকথা, অতিকথা, লোকগাথাকে অবলম্বন করে জাদুবাস্তবতা প্রমাজিক দায়বন্ধতা ও মূল্যবোধকে নতুনভাবে ধরতে চায়।

আলোচা গল্পে তাই আমরা দেখতে পাই 'বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো'-কে পাত্রে গোনসাগা ছাড়া কাকুর মানুষ বলে মনে হয় না। পড়োশিনির মনে হয় এ যে এক ফরিশতা, দেবদূত। এমনকী গল্পের যে আবহ তৈরি হয় এবং বুড়োকে দেখবার জন্যে যে মানুষরা আসে তারা যেন স্বাভাবিক যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলেছে। পেলাইও দম্পতির বিশ্বাসও তাদের মোর জ্বর এই 'পচা বদ গন্ধটার দরুন। অপরদিকে মাকড়সা মানবীর উপস্থিতি ও তার মাকড়সাতে পরিণত হয়ে যাবার ঘটনার সঙ্গে থুরথুরে বুড়োর বিন্দুতে মিলিয়ে যাবার ঘটনা—সবই জাদুবাস্তবতার বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট করে তোলে।

গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর 'বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো' গল্পের অংশ এটি। • গল্পের শেষে বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো উড়তে উড়তে ক্রমশ যখন শুনো মিলিয়ে যেতে থাকে, সেই হতো এই মন্তব্য।

এই উক্তিটি গল্পের কথকের। উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক দুটি সাহায্যকারী শব্দ 'সমুদ্র' এবং 'কাল্পনিক ইউরি টি। পুরো বক্তব্যটাই থুরথুরে বুড়োকে কেন্দ্র করে। গল্পের মধ্যে আমরা জেনেছি এই বৃদ্ধকে কেউ-ই মানবিক গুরুত্বে মর্যাদা দেয়নি । না পেলাইও দম্পতি, না পড়োশিনি, কিংবা পাত্রে গোনসাগা থেকে সাধারণ সকলে। অথচ তাকে নিয়ে চিত্র জল্পনা-কল্পনা ও প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সমীকরণের অভাব ছিল না। কেউ তাকে চিহ্নিত করতে চেয়েছে ফরিশতা বা প্রকৃত হিসেবে, কেউবা তাকে নিজেদের অবস্থার উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখেছে তা যুদ্ধজয়ের স্বপ্ন হোক কৌতূহল নিরসনের ইচ্ছে হোক।

আবার সমুদ্রের বিস্তার মানুষের মনকে প্রসারিত করে তোলে, পারিপার্শ্বিক সমস্ত খণ্ডতা থেকে তা মনকে উদার ব্যাপ্তি এনে দেয়। যে ব্যাপ্তি ও সহনশীলতার গুণ ছিল গল্পের ডানাওয়ালা বৃদ্ধের মধ্যে। কিন্তু তার সেই মহত্ত্বের কোনো স্থান নেই আজকের এই বস্তু আকাঙ্ক্ষার বদরোগে আক্রান্ত বিশ্বে। তাই তাকে সমস্ত মানবিক আবেগ-অনুভূতি বিচ্ছিন্ন হয়ে মায়া কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত উড়ে চলে যেতে হয়। আর 'কাল্পনিক ফুটকি'-টি শেষ পর্যন্ত 'সত্য দ্বি-বাচনিক' এই ব্যঞ্জনায় উত্তীর্ণ হয়ে যায়। একদিকে পৃথিবী শুভ চেতনা ক্রমশ বিলীয়মান, যা তলানিতে ঠেকছে ক্রমশ।

অন্যদিকে পেলাইও এবং এলিসেন্দার যাপনচিত্রের রূপান্তরের কেন্দ্রে সেই বুড়োর অবদান। একদিকে অবস্থার পরিবর্তন, অন্যদিকে যার জন্যে সেই অস্তিত্বগত অবস্থান্তর, তার ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া-এলিসেন্দা যেন নিতে পারছিল আচমকা এবং ‘ফুটকিহ' দেখা এলিসেন্দার চোখ দিয়ে যা গল্পে অনুস্ত, তবে স্পষ্ট হয়েছে কথকের বিবৃতিতে। বস্তুত কথাকার আখ্যান বিন্যাসের পরিকল্পনায় 'জাদুবাস্তবতা'-র আবহকে রাখতেও চেয়েছিলেন তাঁর সাহিত্যের স্বীকৃত একটি দিক। সে বিচারেও এই 'ফুটকি'-কে আমরা আজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি : মানুষের করুণ অসহায়তাও ফুটকির চিত্রকল্পে ক্রমশ উদ্‌ভাসিত হয়ে উঠেছে গল্পের অন্তিমে।

ভাষাশিল্পে নামকরণ গুরুত্বপূর্ণ। নামকরণের নানা রীতি-চরিত্রকেন্দ্রিক, বিষয়নির্ভর, ব্যঞ্জনাধর্মী, রূপক সাংকেতিক ইত্যাদি। এ ছাড়া আছে সময়নির্ভর নামকরণও—জীবনানন্দ দাশের ১৯৪৬-৪৭। গঠনকেন্দ্রিক নামকরণ নিয়ে লেখকরা কম-বেশি পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন, যেমন উদয়কুমার চক্রবর্তীর উপন্যাস—'ওগগর ভত্তা অথবা পিতৃতীর্থের জল'। বস্তুত নামকরণের মধ্যেই শিল্প-সংরূপটি সম্বন্ধ্যে একটি আভাস পাওয়া যায়। নামকরণ শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠে সাহিত্য সংরূপটির অন্দরমহলে প্রবেশের চাবিকাঠি।

বিশাল ডানাওয়ালা এক পুরপুরে বুড়ো' চরিত্রকেন্দ্রিক। আখ্যানবস্তুর কেন্দ্রে আছে এই বিশাল ডানাযুক্ত কাহিনির বাকিটা আবর্তিত হয়েছে এই চরিত্রকে কেন্দ্রে রেখে। গল্পের শুরুতে পেলাইও উঠোনের পেছন কোণটায় দেখে এক থুরথুরে বুড়ো কাদার মধ্যে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। তার প্রচন্ড চেষ্টা সত্ত্বেও সে উঠতে পারছে না। কারণ তার বিশাল দুটি ডানা।

পরের দিন এ খবর রাষ্ট্র হয়ে যায় যে পেলাই বাড়িতে রক্তমাংসের জ্যান্ত একটি দেবদূতকে হয়েছে। ভোর হতে না হতেই দুনিয়ার লোক তাদের উঠোনে জড়ো হয়ে তাকে খাবার ছুড়ছে, করছে, যেন সে সার্কাসের জন্তু। যাজনপল্লির পুরুত পাত্রে গোনসাগা ফরিশতাকে পরীক্ষা করে জানলেন সে আদৌ দেবদূত নয়। সকলের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিলেন তিনি ফরিশতার অতিপ্রাকৃত অস্তিত্ব সম্পর্কে। পেলাইও আর এলিসেন্দা এরপর ফরিশতাকে ব্যবহার করে জমিয়ে ফেলে সু-প্রতুল অর্থ-ঐশ্বর্য। পরিবর্তন আসে তাদের জীবনযাপন ও পেশাতে। এরপর এসেছে তারানতুলা তথা মাকড়সা-মেয়ের কথা যে মেয়েটির কারণে ফরিশতার প্রতি মানুষের কৌতূহল ক্রমশ কমে যায়। তাদের বাড়িটাও খালি হয়ে যায় শেষে।

গল্পের ঊন-শেষাংশে এলিসেন্দার বাচ্চা আর দেবদূত দুজনেই জলবসন্তে হয়। ওরা ঝাঁটা মেরে বের করে দেবার উপক্রম করে। কিন্তু তখন সারা ঘরে যেন দেবদূতের বিচিত্র সংস্করণ। পর্যন্ত দেবদূত অসমর্থ হয়ে পড়ে। গল্পের শেষে এলিসেন্দা দেখে অতিকষ্টে দেবদূত সমর্থ হয়েছে এবং শেষবাড়িগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। এলিসেন্দা সারাক্ষণই তাকিয়ে থাকে তার উড়ালের দিকে।

এইভাবে আখ্যানের আদ্যন্ত জুড়ে থাকে বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো। তাকে শুরু করে পড়োশিনি, সাধারণ মানুষ, মাকড়সা মেয়ে, পাত্রে গোনসাগা—সকলেরই আগ্রহ এবং গতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে ডানাওয়ালা বুড়োর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। গল্পের একতম প্রতীতির উদ্‌ভাসনও হয়েছে ওই বিশাল ডানাওয়ালা থুরথুরে বুড়োকে নিয়ে। সুতরাং সামগ্রিক বিশ্লেষণে গল্পের নামকরণ অত্যন্ত শিল্পসচেতন ও সার্থক হয়েছে বললে অত্যুক্তি হয় না।।