অধ্যায়-11, শিক্ষার সার্কাস

পানিকর আধুনিক সাহিত্য-আন্দোলনকারী কবিদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য কবি ছিলেন।

মালয়ালম ভাষা-সাহিত্যের কবি—তবে ইংরেজি ভাষাতেও তিনি সাহিত্যচর্চা করতেন।

এখানে 'যদি' কথাটি সাপেক্ষবাচক এবং জিজ্ঞাসাচিহ্ন থাকার অর্থ, উদ্দিষ্টজন পাস করবে কিনা এ বিষয়ে। প্রশ্ন ও সংশয় দুটো ভাবই কবি ব্যক্ত করেছেন।

বাংলার কবি উৎপলকুমার বসু আইয়াপ্পা পানিকরের মালয়ালম কাব্য 'কাব্যসংগ্রহ'-এর ইংরেজি অনুবাদ 'ডেজ অ্যান্ড নাইটস্'-এর বাংলা অনুবাদ করেন 'দিন ও রাত্রি'। 'শিক্ষার সার্কাস' এই 'দিন ও রাত্রি' কাব্যের অনুবাদসূত্রেই বাংলায় এল।

একথাটি বলার পর আমি তৃতীয় শ্রেণিতে যেতে পারি না বলে কেন 'যদি আমি দ্বিতীয় শ্রেণি পাস করি' বললেন কেন কৰি ? উত্তর : বক্তা এখানে নিজের পাস করা সম্পর্কেও সংশয়াচ্ছন্ন, তাই 'যদি আমি' এই সাপেক্ষবাচক কথাটি বলেছেন।

ইংরেজিতে 'পাস' (Pass) কথাটি বাংলায় এত ব্যবহৃত যে, 'পাস' কথাটাই যেন বাংলা, তাই অনুবাদক এই কথাটিই বেশি ব্যবহার করেছেন। সুতরাং যেখানে 'উত্তীর্ণ' কথাটি আছে সেখানে পাস কথাটি ব্যবহৃত হলে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হওয়া ভাবটা স্পষ্ট হত না।

বকার সামনের দিকে এগিয়ে চলার মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে। অর্থাৎ তাঁর ক্রমোন্নয়নের পথে যাওয়ার প্রবনতা আছে।

অনেকরকম শিক্ষা আছে। যেমন-Formal Education, Informal Education আর Non Formal Education। এগুলো বস্তুত প্রথাগত (প্রাতিষ্ঠানিক) প্রধামুক্ত ও প্রথাবহির্ভূত শিক্ষা। এসবের উর্ধ্বে আছে প্রাকৃতিক শিক্ষা। তাবে কবি এখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথাই বলতে ছেয়েছেন ।

কবি কেন জ্ঞানের প্রসঙ্গ এনেছেন ? উত্তাপ জ্ঞান রূপাতিরিক্ত লাবণ্যের মতো, এতে শিক্ষার্থীর অসাধারণত্ব প্রকাশ পায় তবে এসবের জন্য শিক্ষার সলো বোধ-ধারণা-সচেতনতা দরকার। এসব না থাকলে শিক্ষা অসম্পূর্ণ বা যথার্থ নয় বলে কবি শিক্ষাক্ষেত্রে জ্ঞানহীনতা বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

'সে' এখানে 'জ্ঞান'। কবির ধারনায়, জ্ঞান আজ যেখানে পৌঁছেছে, (বা জ্ঞান মানুষকে আজ যেখানে নিয়ে গেছে তাতে যা দেখা গেছে, তা হল মানুষের নানা ধরনের অবনমন।

কবির একথায় একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা-বিদ্রুপ আছে, ইংরেজিতে যাকে বলে Satire । অর্থাৎ শিক্ষা সম্পর্কে কবি এখানে কটাক্ষপাত করেছেন, যেখানে শিক্ষার নেতিবাচক দিকটারই ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে।

১ পরীক্ষা- পাস বা পরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সার্কাসে মই বেয়ে ওপরে উঠে খেলা দেখানোর আদৃশ্য। ২. বৈচিত্রময় শিক্ষার মধ্যে সার্কাসের বৈচিত্র্যময় খেলার সাদৃশ্য।

বস্তুত, এখানে সব শ্রেণি বলতে প্রথাগত শিক্ষার সমূহশ্রেণির কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত এখানে 'পরের শ্রেণি' বলতে প্রথাগত শিক্ষার বাইরেও আরো নানা শিক্ষা আছে, যাতে শিক্ষার্থী প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও নিজেকে সেইসব শিক্ষায় সমৃদ্ধ করতে পারে। কারণ শিক্ষার কোনো শেষ নেই।

বোঝা অর্থাৎ প্রতারণা বা ঠকানো। সুতরাং জ্ঞানী মানুষের অসদাচরণের ফলেই জ্ঞান ধোঁকা হতে পারে।।

এখানে আক্ষরিক অর্থ গ্রাহ্য নয়। কথাগুলির ব্যঞ্জনাই আসল। সেটা এই যে, পড়াশুনা এবং জীবনে নানা ক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা, যেখানে মানুষের ক্রমোন্নয়নের কথাটাই চূড়ান্ত।

এটি বিস্ময়সূচক চিহ্ন। কারণ কবি শিক্ষার স্বরূপ দেখে প্রশ্নমুখর, সংশয়াচ্ছন্ন এবং বিস্মিত। বস্তুত শিক্ষার শ্রী-ৰূপ না থাকায় কবি মর্মাহতও। তাই তিনি এই চিহ্ন দিয়েছেন।

সভ্যতার সূচনা লগ্নে যেদিন মানুষের শিক্ষা আ-বাদানের সলো মুক্ত হয়ে একটা ইতিবাচক দিক আছে জেলেই তাকে মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছে। তারপর যুগে যুগে  নিয়ে সমাজের বিশিষ্টজনেরা, সংস্কারক বা দেশহিতৈষীরা নানা পন্থা অবলম্বন করেছেন। যার উদ্দেশ্য শুধু একটাই মানুষ যথার্থ মানুষ হবে, তার মন হবে প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক, সর্বোপরি আপন আপন দেশ বিশ্ব সুদীর্ঘ সময় অতিক্রমণের পর ইতিহাসের পাতায় যেদিন উঠে এল শিক্ষা ও সমাজসংস্কারকের ভূমিকার রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্যার সৈয়দ আহমেদ খান, জ্যোতিরা ফুলে, বেগম ফ্যাজুন্নেসা রাধুনী ভারতী ভি হেয়ার, ডিরোজিও, সেদিন দেখা গেল ভারতের মানুষ নবচেতনায় নিজেকে বিকশিত করতে চাইছেন। সেই সনে এও দেখা চেল আপামর দেশবাসীর নবজাগরণ। ক্রমে ক্রমে শিক্ষায় মাতৃভাষা, বিষয় সন্নিবেশ ইত্যাদি নিয়ে গঠিত হল কমিশন। ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের ঘটনা এসব।

অথচ এই শিক্ষাই যেদিন হাস্যোদ্রেককারী একটি বিষয় হয়ে উঠল শিক্ষিতের কুরুধর্মের মধ্য দিয়ে কিংবা শিক্ষার মধ্য থেকে আন উধাও হয়ে গেল, স্পষ্ট প্রতিভাত হল শিক্ষা একটি সার্কাস। কারণ সার্কাসের নির্দিষ্ট একই খেলার মতো মানুষ সেই শিক্ষা গ্রহণ করেছে | মনুষারের পরিচয় প্রকাশার্থে শিক্ষাকে যতো করেনি। সা জোকারের জোস-এর মতই শিক্ষা আজ বাকা-বিদ্রূপের বিষ্যা, শিক্ষা আজ একটি প্রহসনমায়। আইিযা 'শিক্ষার সার্কাস'-এ মূলত একথাই বলতে চেয়েছেন। তিনি বিস্মিত হয়েছেন এই দেশে, যে-শিক্ষার প্রতিনি আপ্রাণ প্রচেষ্টা, অথচ সেই শিক্ষায় যখন মানুষ অবনমিত হয়, মানব সভ্যতাও তার অর্থ বিস্তৃত হন। যার ইতি তন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শিক্ষার সন্ধ্যে সার্কাসের সাদৃশ্যে আর শিক্ষায় মানহীনতার প্রসঙ্গে।

 

সাধারণত গদ্য রচনার তুলনায় কবিতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হেঁয়ালি-নির্ভর সেইানো তার নামকরণ বিশয়ক আলোচনা একটু সতর্কতার সকোই করতে হয়। কারণ কবিতায় বাচ্যার্থ ও বাচ্চা দুই-ই থাকে। দ্বিতীয়ত, কবিতার অি ছত্র, শব্দ এমনকি বিরতি চিহ্নগুলোর ওপরও কবির যে অভিপ্রায়গত মায়াবী আলো সম্পাতি আলোচকের স্বভাবতই ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে মুখ্যত নামকরণের আলোচনায় কয়েকটি গতানুগতিক সূত্র অবলম্বিত হয় স্থান, কাল, পাত্র। এই হিসেবে শিক্ষার সার্কাস' কোনোটার সঙ্গেই সম্পৃক্ত নয়। বরং আপাতদৃষ্টিতে নামকরণটি বানানী বলেই প্রতীয়মান হয়।

কবিতাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন বক্তা উদ্দিষ্ট একজনকে জানাচ্ছেন, উদ্দিষ্টজন যে শ্রেণি পাস করবেন, তিনি তার পরের শ্রেণিতে যাবেন। এভাবে প্রথম-দ্বিতীয় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত উত্তীর্ণ হওয়ার কথা আছে এ কবিতায়। এছাড়া আছে, সব শ্রেণি শেষ হয়ে গেলেও বক্তা পরের শ্রেণিতে যাবেন। তবে লক্ষণীয়, এই পাস করার সলো তিনি প্রায় ক্ষেত্রে 'যদি' এই সাপেক্ষবাচক কথাটি ব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয়ত, কোথাও ফেল নেই, শুধুই ক্রমোন্নয়ন। থেকে প্রমাদিত হয়, শিক্ষায় একটা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্যমান, এমনকি জীবনের পরীক্ষায়ও (প্র. সব শ্রেণি শেষ হয়ে গেলেও পরের শ্রেণিতে যাওয়ার প্রচেষ্টা)। এইসব কথার পরেই কবি আইয়াপ্পা পানিকর সব শিক্ষাকে বলেছেন, সার্কাস আর তার মাধ্যমে ওপরে ওঠার কথা। কিন্তু সহসা যখন শিক্ষায় জ্ঞানহীনতার প্রসঙ্গ আনেন অথবা যে জ্ঞান (যা 'প্রকৃত' নয়) মানুষতে আজ যেখানে অবনমনের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে কবি মনে করেন এবং তাতে প্রত্যক্ষ করেন, শিক্ষা মানুষকে যথার্থ মানুষ করতে ব্যর্থ, তাই সে শিক্ষা আজ প্রতারক, সে শিক্ষা আজ প্রহসন। কারণ সার্কাস যেমন বৈচিত্র্যময় বিনোদনমূলক খেলা আর অন্যতম আকর্ষণ জোকারের jokes, সাম্প্রতিক শিক্ষাও তদ্রূপ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে কবিতার শিক্ষার সার্কাসা নামকরণ যথাযথ ও তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে হয়।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের দিকে আজ দৃষ্টিপাত করলেই দেখা যায়, নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা বিশৃঙ্খলা। রাজনীতির জটিল ঘূর্ণাবর্তে কোথাও শিক্ষক, কোথাও ছাত্র, কোথাও পুলিশ মার খাচ্ছেন, কোথাও মারা যাচ্ছেন। স্কুল কলেজ-যুনিভার্সিটি সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থী ফেল করলে পাস করাতে হবে—এরকম দাবি-দাওয়া, ঘেরাও ভাঙচুর। একই চিত্র ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার ক্ষেত্রেও পাস করাতে হবে। কোথাও পরীক্ষাক্ষেত্রে ভুয়ো পরীক্ষার্থী। কোথাও পড়ার ক্ষেত্রে মোটা টাকার চাহিদা। এছাড়া পরীক্ষা ক্ষেত্রে গণটোকাটুকি। সংবাদমাধ্যমে কেউ বলেন, পরীক্ষা নির্বিঘ্নে সম্পাদিত, কেউ বলেন, ব্যবস্থা নিচ্ছি।

এই ধরনের ঘটনা আজ বহুল পরিচিত। এছাড়া এই কবিতাটি প্রকাশের বা রচনার আগে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি অবস্থা ছিল, যখন বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল (সংবিধান স্বীকৃত কিনা, সে বিচার পরে) চতুর্দিকে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। সেসময় নানা ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীরা সশস্ত্র অবস্থায় পরীক্ষা দিয়েছিল (বলা বাহুল্য অস্ত্রপ্রদর্শনপূর্বক) | এসব কথা বিবেচনা করলে আইয়াপ্পা পানিকর-এর কবিতাটিকে খুবই প্রাসঙ্গিক মনে হয়। কারণ যে শিক্ষা মানুষের চিত্তের উৎকর্ষসাধন করে, সে শিক্ষা আজ ব্যর্থ, মানুষের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন করতে অসমর্থ। যদি তা না হত তাহলে আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই কোনো সংবাদ বেরতো না কোনো কাগজে। শিক্ষার আলোক থেকে বঞ্চিত মানুষ আজ শিক্ষার দিকে কটাক্ষপাত করে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের হাসি হাসছেন। কারণ শিক্ষায় হাজার পাস থাকতে পারে, যথার্থ মানুষ তৈরি হয় অঙ্গুলিমেয়।