অধ্যায়-12, গুরু

এই রবীন্দ্রসংগীতটি রবীন্দ্রসংগীতের পূজা পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

গুরু আসার খবর শুনে পঞ্চক তৈরি না হয়ে সব পুঁথিপত্র ফেলে দিয়েছে।

পঞ্চকের যুক্তিতে গুরু না থাকলেই পুথির প্রয়োজন আর গুরু এলে অপ্রয়োজনীয় পুথির জঞ্জাল সরিয়ে সময়কে কাজে লাগানো আবশ্যক।

মাঙ্গল্য গুরুকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সিংহদ্বার সাজাতে ব্যবহৃত হবে।

গুরুর প্রবেশদ্বার সম্পর্কে না জানা জয়োত্তম বোঝা বয়ে মরে আর পঞ্চক হালকা হয়ে বসে থাকে— এটাই পার্থক্য।

প্রশ্নোদ্ধৃত মহাপকের কথার উত্তরে পঙ্গুক জানায় এবার তাকেও গান ধরতে হবে একধার থেকে

গান সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে পঞ্চক জানায়- অচলায়তনে এবার মন্ত্র ঘুচে গান আরম্ভ পাথর থেকে সুর বেরোবে।

গুরু এলে মন্ত্র ভুলে যাওয়ার জন্য তিনি পঞ্চককে আয়তন থেকে বের করে দেবেন, এই ভরসাতেই পঞ্চক অপেক্ষা করে আছে।

অমিতায়ুর্ধারিণী মন্ত্র সম্পর্কে পশুকে তার দাদাকে বলে সে স্বয়ং গুরুর কাছ থেকে মন্ত্রটা শিখবে বলে তা আগাগোড়া ভুলতেই গান ধরেছে।

মন্ত্রতন্ত্রে তিতিবিরক্ত যুক্তিবাদী পশুক এই আয়তনের সরলমতি বালক সুভদ্রের কান্না সহ্য করতে পারে না।

উত্তরদিকের জানালা খুলে সে মাতৃহত্যাজনিত পাপ করেছে বলে মনে করে।

অচলায়তনে পাপের জন্য প্রায়শ্চিত্তের উপায় আছে বিশ-পঁচিশ হাজার রকমের। সেই বিষয়ে পত বলেছে এখানে না এলে তার বেশির ভাগটাই কেবল বই-এ লেখা থাকত কিন্তু এখানে এসে সেগুলির বারো আনাই সে ব্যবহার করেছে কিন্তু মনে রাখতে পারে না।

অচলায়তনের দৈনন্দিন একঘেঁয়ে জীবনে, মজার জিনিস প্রায়শ্চিত্ত না থাকলে সেখানে মানুষ টিকতে  পারত না ।

শনিবার মহাময়ূরী দেবীর পূজার দিনে তার রাগ দেখার জন্য পশুক সেদিন কাঁসার থালায় ইঁদুরের গর্তের মাটি রেখে তার ওপর পাঁচটা শেয়ালকাঁটার পাতা ও তিনটে মাষকলাই সাজিয়ে আঠারো বার ফুঁ দিয়েছিল।

মহাময়ূরী দেবীর আজ্ঞাবহ হয়ে পঞ্চকের অনাচারের শাস্তিস্বরূপ তাকে যে সাপটির কামড়ানোর কথা ছিল। সেটি কামড়ানোর জন্য প্যককে খুঁজে পায়নি।

মহাময়ূরী দেবীর আজ্ঞাবহ হয়ে সাপটি পাককে কামড়াতে সক্ষম হলে অচলায়তনে পালিত কঠোর কুসংস্কার সম্পর্কেও যাবতীয় শাস্ত্রবিধি সম্পর্কে পদকের কোনো সন্দেহ থাকত না।

অচলায়তনের আচরণীয় শাস্ত্রমতে পূর্ব-ফাল্গুনী নক্ষত্রের মাহাত্ম্য হল এই দিন কাকিনী সরোবরের নৈত কোণে প্রাপ্ত টোড়া সাপের খোলস কালো ঘোড়ার লেজের সাতগাছি চুল দিয়ে বেঁধে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে ধোঁয়া দিলে তারা সেই ধোঁয়ার ঘ্রাণ নেয় এবং যারা তা করে তাদের পুণ্য হয়।

উপাধ্যায়মশায়কে আসতে দেখে পঞ্চক তার কাছ থেকে পরমার্থতত্ত্ব শোনার আগ্রহে সুভদ্রকে দৌড়ে পালাতে বলল।

উপাধ্যায়ের মতে উত্তরদিকের জানালায় কনুই ঠেকানোর প্রায়শ্চিত্ত হল সেদিকের যজ্ঞপাত্রগুলি ফেলে। সাত মাসের বাছুরকে দিয়ে ওই জানালা চাটিয়ে শোধন করে নেওয়া।

উত্তরদিকের জানালা শোধন প্রসঙ্গে উল্লেখিত শাস্ত্রদুটির নাম – (ক) কুলদত্তের ক্রিয়াসংগ্রহ ও (খ) ভরদ্বাজ মিশ্রের প্রয়োগপ্রাপ্তি।

সুভদ্রের উত্তরদিকের জানালা খোলার কথা শুনে উপাধ্যায়মশায় বসে পড়ে ভাবতে লাগলেন তার দুই চোখ মুহূর্তে পাথর হয়ে গেল না কেন?

অচলায়তনে গুরুর আগমন প্রসঙ্গে আচার্যদেবের প্রথম অভিব্যক্তি হল—'এক এক সময়ে মনে ভয় হয়। যে, হয়তো অপরাধের মাত্রা পূর্ণ হয়েছে বলেই তিনি আসছেন।

আচার্যদেবের কথা অনুসারে অচলায়তনে সব প্রশ্নের শাস্ত্র থেকেই পাওয়া যায়—তার এটাই হল নিশ্চল শাস্তি।

উদ্ধৃতিটির বক্তা আচার্যদেবের কথা অনুসারে উপাচার্য সূতসোম সমস্ত দিকের বিচলতাসহ অচলায়তনের

পাথরের পারছে না ।

বক্তা পণ্যকের মতে নিজেই জানেন পঞ্চককে নিয়মের ঢাকার নীচ থেকে টেনে নিয়েছেন ।

বক্তা উপাধ্যায়ের ভাবনার বিষয় হল উত্তরদিকের জানালা খোলায় বাইরের মন্ত্রপূত বুদ্ধ বাতাসকে কতটা দূর পর্যন্ত আক্রমণ করেছে।

উত্তরদিকের জানালা খোলার প্রায়শ্চিত্ত প্রসঙ্গে মহাপত্ত্বক জানিয়েছে অপরাধীকে ছয়মাস মহাতামস সাধনা করতে হবে।

মহাতামস এতে অপরাধীকে প্রথমে হিামর্দন কুণ্ডে স্নান করানো হয় তারপর তাকে টানা ছয়মাস সূর্যের আলহিন একটা আন্ধকার ঘরে কাটতে হয়।

 

প্রশ্নোদ্ধৃত উক্তিটির প্রসঙ্গে বক্তা আচার্যদের উদ্দিষ্ট সুভদ্রকে আরও বলেছেন— বিনা তোমাকে হাজার হাজার মুখ ভয় তাদেরই।

সনাতন ধর্ম বলতে বক্তা অচলায়তনে পালিত সমস্ত শাস্ত্রবিহিত অমানবিক প্রথাকে বুঝিয়েছেন।

জয়োত্তমের কথা অনুসারে আচার্যদেবকে যিনি অচলায়তনের আচার্যের পদে অধিষ্ঠিত করেছেন একমাত্র তিনিই তাকে সেই আসন থেকে নামিয়ে দেবেন, সেজন্যে অপেক্ষা করে আছেন।

পকের কথা অনুযায়ী অচলায়তনে কোনো শাস্ত্র নির্দেশিত আচরণ থাকবে না, এমনকি আয়তনের পাথরও থাকবে না, সেগুলি সব পাগল হয়ে যাবে, সেগুলি ছুটে গান ধরবে।

অচলায়তনের শাস্ত্রনির্দেশমতো সুভদ্র যদি মহাতামব্রত সাধন করে তবে সে ধরাতলে দেবত্ব লাভ করতে সক্ষম হবে।

আচার্যের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুভদ্র মানুষ, তার ওপর সে একজন শিশু। মানুষ দেবতারই সৃষ্টি। একদিকে মানুষ দেবতার প্রতিরূপ হিসেবে যেমন সে দেবতার প্রিয়, অন্যদিকে শিশুমাত্রই দেবত্বের অধিকারী—এ কারণেই শিশু ও মানুষ হিসেবে সুভদ্র দেবতাদের প্রিয় ।

আচার্যদেব মনে করেন যখনই স্বাভাবিকতার পরিবর্তে অস্বাভাবিকতা আসে—প্রচলিত বিষয়ে মনুষ্যত্বের। অপমান হয় তখনই গুরু আসেন আয়তনে তেমনিভাবেই আচার্যের অনুগামীরাই যখন তার শাস্তিদানে। তৎপর হল তখনই তিনি গুরুর আবির্ভাবের ব্যাপারটি বুঝলেন।

উদ্দিষ্টের প্রতি কোনো দ্বিধা না রেখে বক্তা জানিয়েছেন—সবারই উচিত আচার্যদেবকে জোর করে ধরে। নিয়ে ঘরে বন্ধ করে রাখা।

সরলমতি দেবতাসম সুভদ্রের সুমিষ্ট কথা শুনে, তার নম্র, বিনীত মার্জিত আচরণ দেখে আয়তনের আচার্য অধীনপুণ্যের হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।।

সামান্য শিশু সুভদ্রের কথার আচার্যের ধারণা—হাজার হাজার বছরের নিষ্ঠুর মুষ্টির ক্ষতটুকু শিশুর মনকে আচ্ছন্ন করে রাখার প্রসঙ্গে একথা বলেছেন।

আচার্য সুভদ্রকে নিষ্ঠুর মহতামস ব্রড করানোয় সচেষ্ট হলেও সে তা করতে চায়, আর এর জন্য সে তাঁকে বলে এই ব্রত তাকে একলা করতে হবে। লোক থাকলে পাপ হবে; বালক সুভদ্রের মুখে অচলায়তনের আচার নিষ্ঠার প্রতি আনুগত্য দেখাই বক্তার এই মন্তব্যের কারণ ।।

মহাতামস ব্রত না করার ব্যাপারে আচার্য জানান তিনি যতক্ষণ আচার্য আছেন ততক্ষণ তাঁর আদেশ ব্যতীত কোনো ব্রত আরম্ভ বা শেষ হতে পারে না, একথা জানিয়েই বলা নিষেধাজ্ঞা দিলেন।

স্থবিরপত্তনের রাজা মন্থরগুপ্ত গোপনে খবর পান যে চণ্ডক নামে এক ঘৃনক স্থবিরক সম্প্রদায়ের মঙ্গ পেতে গোপনে তপস্যা করছে এই খবর পেয়ে রাজা চণ্ডকের শিরশ্ছেদ করেন।

শাস্ত্রের বিধানটি হল- আসন্ন বিপদে রাজা হিসেবে তিনি তিথি নক্ষত্র না দেখেই রাজ-অধিকার বলে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

মহাপক বলেন—স্পর্ধা দেখিয়ে যে আচার লঙ্ঘন করে তার শাস্তিই হল অনাচারী ম্লেচ্ছদের মধ্যে নির্বাসন—এই যুক্তিতেই তিনি আচার্যকে ঘৃনকদের মধ্যে নির্বাসন দিতে চেয়েছেন।

ঘৃনক সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় ঘৃনক পঞ্চককে তাদের গুরুর আসার খবর দিতে বলেছে।

অচলায়তনের পরম আচারনিষ্ঠ, সংকীর্ণ শাস্ত্রাচারী মহাপ্যক তার ভাই পড়ুক সম্পর্কে জেনেছে প্রাচীর ডিঙিয়ে খুনকদের কাছে গেছে একারণেই তিনি ভাই পঞ্চয় সম্পর্কে একথা বলেছেন।

উদ্ধৃত উক্তিটিতে নগ্ন পেতে আগ্রহী, অত্যন্ত জেদি বেপরোয়া ঘূনক সম্প্রদায়ের অনেক চণ্ডকের কথা বলা হয়েছে।

উদ্ধৃতিটির বক্তা পঞ্চকের কথা অনুসারে খুনকদের বড়ো দোষটি হল—তাদের সবরকম কাজ করা।

ঘৃনকদের মতো যারা ঝাঁকুড় ও খেসারি ডালের চাষ করে তাদেরকে অচলায়তনের আচারনিষ্ঠরা ঘরে ঢুকতে দেয় না।

পার জানায় কোনো এক যুগে উপবাসের দিনে পণ্যকের কোনো পূর্বপুরুষের গোঁফের ওপর ডালের গুঁড়ো পড়ায় তার পুণ্যফল কমে যাওয়ায় সে জগতের সব খেসারি খেতের ওপর অভিশাপ দেয়। এই অভিশাপ দানই ছিল তার তেজ।।

বক্তা পঞ্চকের কথা থেকে জানা যায় মূনকরা সবকিছুর মধ্যেই একটা মানে খোঁজে আর এই মানে খোঁজাটাই হল যুক্তিবাদের উন্মেষ-বরা উদ্দিষ্টের সেই যুক্তি খোঁজার আস্পর্ধার কথাই বলেছে।

য়ূনকদের হাজারো প্রশ্নের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়ুক থাকতে না পেরে তাদের বুকের ওপর নাচতে চেয়েছে আর তাতে তার জাতমান নাও থাকতে পারে।

বক্তা পঞ্চক মূনকদের প্রাত্যহিক সহজ স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে প্রথা করে, আয়তনের মতো কোনো নিষেধের বেড়া নেই—সবকিছুই মহানন্দে গ্রহণ ও পালন করে। ঘৃনকদের স্পর্শে কথাবার্তার এদের মাধ্যমে পথকে সেই স্বরূপ উপলব্ধি করে আয়তনের আচারসর্বস্বতাকে অগ্রাহ্য করছে।

বক্তা, দ্বিতীয় ঘূনক জানে তাদের দাদাঠাকুরকে আবদ্ধ করে রাখার কারো সাধ্য নেই, কোনো বন্ধ ঘরে তো নয়ই—তিনি খোলা উদার আকাশের মতো—এটা জেনেই বক্তা তাঁর সম্পর্কে এমন নিস্পৃহ ভাব দেখিয়েছে।

খুনকের কথামতো অচলায়তনে দাদাঠাকুরকে নিয়ে গেলে তার প্রভাব হবে মারাত্মক, সেখানে কোনো কিছুই আর বন্ধ থাকবে না -সেখানকার পাথরগুলো নাচবে আর পুথিতে বাঁশি বাজবে।

পদক গুরুর কাছে ঘৃনক পাড়ার খোলা হাওয়ার মধ্যে থেকে অভয় নতুবা খুব করে পরিচাপা পড়ে আগাগোড়া সমান চ্যাপটা হতে চায়।

দাদাঠাকুরের কথা থেকে জানা যায়, তাদের রাজার আদেশ হল স্থবিরপত্তনের পাপ যখন পাঁচিলের আকার নিয়ে আকাশের জ্যোতি ঢেকে দেবে তখন সেই প্রাচীর ধুলোয় লুটিয়ে দিতে হবে।

বক্তা পঞ্চক মন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে গ্রেহ, নীচু জাতি বলে পরিচিত দর্ভক পাড়ায় আসে অথচ তারাই পড়ে তাদের বাপ-পিতামহকে উদ্ধারের অনুরোধ করে বলেই বক্তা বিস্ময় প্রকাশ করে।

বক্তা পশুকে দর্শকদের তাদের গান শুনিয়ে দিতে বলেছে।

বক্তা আচার্য অদীনপুণ্যের অভাগ্যের বিষয়টি হল এত কাছে থেকেও সে এতদিন এই সহজ, সরল মানুষ গুলোকে আপন করে নিতে দ্বিধা করেছে, আচার্য হয়েও সবাইকে সমানভাবে দেখতে পারেনি, তাদের কাছে আসেনি।

আচার্য উপলব্ধি করেছেন, সুভদ্র এমনই কোমলমতি ছেলে যে সে কান্না চেপে রাখতে পারে সে যে কাঁদছে সেটাও মানতে চায় না একারণেই আচার্যদেব ভীষণ দুঃখ পাচ্ছেন।

কাল সমস্ত রাত ভরে পণ্যকের কেবলই মনে হচ্ছিল চারদিকে বিশ্বব্রম্মান্ড যেন ভেঙেচুরে পড়ছে।

লোকের মুখে শোনা কথাটি হল— অচলায়তনে গুরু যেমন এসেছেন তেমনি লড়াই করার জন্য নাকি দাদাঠাকুরের দলও এসেছেন।

দাদাঠাকুরের প্রবেশে আচার্য প্রণাম জানিয়ে গুরুজির জয়ধ্বনি দিল; পশুক বলল, এতো গুরুজি নয়ঃ এতো দাদাঠাকুর আর দর্ভকদল তাঁকে গোঁসাই ঠাকুর বলল।

দাদাঠাকুর অর্থাৎ দর্শকদের গোঁসাই ঠাকুরের শুধু ভাত ও মাষকলাইয়েই হয়ে যাবে।

প্রশ্নোধৃত উক্তির মাধ্যমে আমি ধারণা করতে পারি বক্তা একমাত্র মানবধর্মেই বিশ্বাসী। তিনি অন্য কোনো সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা, জাতিভেদ, সম্প্রদায়গত মানুষ-বিচ্ছিন্ন ধারণা এমনকি স্পর্শদোষ মানেন না।

প্রশ্নোদ্ধৃত দাদাঠাকুরের এ কথার উত্তরে আচার্যদের বলেন— কী যে করেছি তা বোঝবার শক্তি তার নেই—তবে তিনিই সব নষ্ট করেছেন বলে মনে করেন।

মুক্তিদাতাকে বাঁধতে না পারার অপারগতা সম্পর্কে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উপলব্ধি হল—তাঁকে বাঁধছি ভেবে যত পাক দিয়েছি সব পাক কেবল নিজের চারদিকেই জড়িয়েছে, যে হাত দিয়ে সেই বাঁধন, খোলা যেত সেই হাতটা শুদ্ধ বাঁধা হয়ে গেছে।

আচার্যদের পুথির কথার মধ্যে তাঁরই মুক্তিদাতাকে বাঁধবার চেষ্টা করে গেছেন। তাঁকে হারাতে হয়।

বক্তা দাদাঠাকুর বলেন, যিনি সব স্থানে নিজেই ধরা দিয়ে বসে আছেন তাকে একটা জায়গায় ধরতে গোলে হারাতে হয়।

অভ্যাসের চক্র সম্পর্কে দাদাঠাকুর বলেন, অভ্যাসের চক্র কোথাও নিয়ে যায় না, কেবল নিজের মধ্যেই ঘুরিয়ে মারে তার থেকে সবার বের হওয়া দরকার।

দাদাঠাকুরের মতে যে ব্যক্তি জানতে চায় না যে দাদাঠাকুরই তাকে চালাচ্ছে তার কাছে তিনি দাদাঠাকুর অতি আপন—আর যে ব্যক্তি কেবল আদেশ নিয়ে চলতে চায় তার কাছে তিনি গুরু, বহুদূরের।

দাদাঠাকুরের কাছে পঙ্ক জানতে চেয়েছে তিনি তার কাছে যেমন দাদাঠাকুর তেমনি গুরু—সে যেমন নিজেকে চালাচ্ছে, তেমনি তাকে দাদাঠাকুরও চালাচ্ছে; এই দুটি বিষয়কে মিশিয়েই সে জানতে চাষ।

দাদাঠাকুর অচলায়তনের বন্ধু কারাগার ভেঙে ফেলে দিতে চেয়েছেন, দিয়েছেনও, আর সেখানে এবার তিনি মন্দির গড়ে তুলতে চান।

অচলায়তনে ফিরে যেতে না চাওয়ায় দাদাঠাকুর পাককে বলেছে সেখানে তোমাকে ওরা চাইছে না বলেই ওখানে তোমাকে বড়ো দরকার, তাছাড়া ওরা ঠেলে দিচ্ছে বলে তুমিও এদের ঠেলে দিতে পারো না।

বক্তা উপাধ্যায় আসবার পথে দেখে এসেছেন অচলায়তনের দ্বার বলে কিছুই আর নেই তাই দ্বার না। থাকায় দ্বারে শাঁখ বাজানোর দরকার আছে বলে তিনি মনে করেন না বলেই একথা বলেছেন।

বক্তা অচলায়তনে সংঘটিত হার ভাঙা, প্রাচীরগুলোকে সমান করে মাটিতে শুইয়ে দেওয়া, আয়তনের আলো আসা ইত্যাদি আয়তনবিরুদ্ধ আচরণরূপ বিপত্তির কথা বলেছেন।

প্রশ্নোদৃত কথার সঙ্গে বক্তা মহাপ্যক আরও বলেছে যে বাইরের প্রাচীর ভাঙতে পারলেও ভিতরে লোহার দরজা আছে আর তা ভাঙতে এলে চন্দ্রসূর্য নিবে যাবে-তোমরা বরং দাঁড়িয়ে অচলায়তনের রক্ষক দেবতার আশ্চর্য শক্তি দেখে যাও।

আজ চারদিক থেকে আলো আসছে, পাখির গান ভেসে আসছে, আজকে কোনো নিয়ম নেই, কোনো নিত্যপালনীয় শাস্ত্রকর্ম নেই—ঘড়াসন বা পংক্তিধৌতি কিছুই নেই—সমস্ত আকাশ যেন ঘরে এসেছে দিনটি যেন ছুটির—এসব কারণেই আজ অচলায়তনের বালকদের আনন্দ।

প্রশ্নোক্ত উক্তির বক্তা মহাপ্যকের এই কথার উত্তরে শ্রোতা জানালেন যে তিনি কোথাও তাঁর গুরুর প্রবেশের পথ রাখেনি বলে তাঁকে একাজ করতে হল।

মন্ত্রহীন কর্মকাণ্ডহীন ম্লেচ্ছদের সম্পর্কে অচলায়তনের আচার্য হিসেবে তিনি দাদাঠাকুর ওরফে গুরুকেই তাঁর সেই দলবলকে সঙ্গে করে বেরিয়ে যেতে আদেশ দিলেন।

মহাপশুকের প্রতি দাদাঠাকুরের শেষ কথা ছিল—'আমি যাকে আচার্য নিযুক্ত করব সেই আচার্য, আমি আদেশ করব সেই আদেশ দিয়েছে  ।

বক্তা উপাধ্যায় দাদাঠাকুরের অনুবর্তী ঘৃনকদের কৃত অচলায়তনের পাঁচিল ও দরজা ভেঙে আকাশের সঙ্গে সেগুলির মিশিয়ে দেওয়ার কাজকে বাহবা দিয়েছে।

বক্তা প্রথম শূনক মহাপঞ্চকের বলা—যুনকদের পাঁচিল ভাঙা, লোহার দরজা খোলা কাজকে মেনে কলুষিত করতে পারবে না, এ কথাগুলো শুনে প্রথম যূনক তাঁকে পাগল বলেছে।

তারা যে তার ইন্দ্রিয়ের রুদ্ধ দ্বারকে খুলে প্রায়োপবেশনে বসা মহাপক্ষককে তাদের আলো-হাওয়ায় মহাপত্তকের পাগলামি সহ্য করে ঠাট্টাচ্ছলে প্রথম ঘৃনক জানিয়েছে তলোয়ারের ডগা দিয়ে এর মাথার খুলিটা ফাঁক করে দিয়ে তার বুদ্ধিতে হাওয়া লাগাতে চেয়েছে।

উদ্ধৃত কথাটির মাধ্যমে দাদাঠাকুর বলতে চেয়েছেন মনের দরজা বন্ধ করে রাখলে কোনো মতেই সত্যের স্পর্শ পাওয়া যায় না।

দাদাঠাকুর বালকদেরকে বৎস সম্বোধন করে তাদেরকে মহাজীবন লাভের আশীর্বাদ দিলেন।

দাদাঠাকুরের কথা অনুযায়ী খোলা জায়গার সুবিধা হল সেখানে কোনো পাপ হয় না, সব পাপ পালিয়ে যায়।

একজটা দেবী সম্পর্কে দাদাঠাকুর জানান উত্তরদিকের দেয়াল ভাঙামাত্র তার সঙ্গে দাদাঠাকুরের এমন ডাব হল যে সে আর কোনো দিন জটা দুলিয়ে কাউকে ভয় দেখাবে না বলে আকাশের আলোয় আষাঢ়ের নতুন মেঘের সঙ্গে তার জটাকে জড়িয়ে নিয়েছে।

‘গুরু' নাটকের শেষ দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই গুরুকে ঘিরে নিয়ে ঘৃনক ও দর্শকদলসহ আয়তনের সমস্ত বালক উদার উন্মুক্ত আকাশতলে মহাজ্যোতির্ময়ের আগমন গীতি করতে শুরু করেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অচলায়তন' নাটকেরই সহজে অভিনয়যোগ্য নাট্যরূপ 'গুরু' নাট্যাংশ থেকে প্রশ্নোত্ব উদ্ধৃতিটি গৃহীত। উক্তিটির বস্তা হল পরক। সে এই উক্তিটি অচলায়তনের একমাত্র সনাতন আচরণের ও প্রথার দ্বারা সম্পূর্ণ বর্ণীভূত সংযমী ও জেদী মহাপককে বলেছে। মহাপত্তক সম্পর্কে পদকের দাদা। • অচলায়তনের নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করা, সেখানকার মূর্তিমান বিদ্রোহ পলক গুরুর আসবার অপেক্ষায় এবং তিনি এই আয়তন থেকে তাকে দূর করে দেবেন--এই ভরসায় অপেক্ষা করে আছে। • অচলায়তনের মন্ত্র-তন্ত্র, আচার-আচমন ও সূত্রবৃত্তিতে সম্পূর্ণ বিশ্বাসহীন পাক সেখানকার কোনো নিয়মনীতি মানে না । গুরুর আগমনবার্তা তার কাছে কোনো বাড়তি উৎসাহের সৃষ্টি করে না। অন্যানা সবাই যখন গুরুর আগমনকে সাদরে গ্রহন করার মান্য নানান উপাচারে, মন্ত্রে আয়তনকে ও নিজেদেরকে প্রস্তুত করছে তখন পঞ্চক সব কিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। অমিতায়ধারনী মন্ত্র মুখস্থ আছে কি না মহাপক জানতে চাইলে পাক তাকে অবলীলাক্রমে জানিয়ে দেয়া সেই মন্ত্রটা ন্যাং গুরুর কাছ থেকে শিখর বলেই তো আগাগোড়া তোলবার চেষ্টায় আছি। সেই জন্যেই গান ধরেছি শুধু তাই নয়—সঞ্জীবের সঙ্গে তার কথোপকথন থেকে জানা যায় গুরু আসছেন শুনে পরক পুথিপত্র সব ফেলে দিয়েছে। এ ব্যাপারে সে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়-গুরু যখন থাকেন না তখনই তো পুথিপত্রের দরকার। আর গুরু অলে পৃথির জন্মাল সরিয়ে সব খোলসা করা আবশ্যক। পাক সেই পুথি বন্ধ করার কাজে ভয়ানক বাস্ত এদিকে জয়োত্তম গুরুর জন্য সিংহদ্বার সাজাতে মালালা নিয়ে চলেছে। পণাক জানায় খুব যে দরজা দিয়ে ঢুকবে তা সে কী করে জানল। ব্যাপারটা খোলসা করে দিয়ে প্যক বলে গুরুর আগমন ও আয়তনে প্রবেশের ব্যাপারে—"তোমরাও জানো না আমিও জানিনে তফাতটা এই যে, তোমরা বোঝা বয়ে মর, আমি হালকা হয়ে বসে আছি।" সুতরাং আমরা উপলব্ধি করি পদকের এখনকার কৃত কাজকর্ম কোনোটাই আয়তনের সংস্কারসম্মত নয়—বরং আয়তনের নিয়ম ভাঙার খেলায় সে মত্ত। সে গান ধরে, পুঁথিপত্র ফেলে আয়তনের জন্মাল সরিয়ে মুক্ত উদার প্রাণের বারতা আনবার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছে।

প্রশ্নোদৃত উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "অচলায়তন' তত্ত্বনাটকের অভিনয়যোগ্য সহজ রূপ 'গুরু' নাটক থেকে সংকলিত হয়েছে। এই কথাটি অচলায়তনের সকল রসের রালী মূর্তিমান বিদ্রোহ, শাশ্বত প্রাণের প্রতিভূ পঞ্চক সুভদ্রকে বলেছে। সুভদ্র অচলায়তনের এক শিক্ষার্থী। সে উত্তরদিকের জানালা খুলে বাইরেটা দেখে ফেলে। অচলায়তনের মধ্যে থাকা সব ছাত্র-শিক্ষকদের কাছে এ এক ভয়ানক পাপ মাতৃহত্যাজনিত পাপের সমান। ঘটনাটি জানাজানি হতেই সুভদ্রের মনে ভয় ঢোকে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। এই পাপ থেকে মুক্তির জন্যে তাকে কোন ধরনের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, সেই প্রসকা বোঝাতে গিয়েই পক্ষক সুভদ্রকে কথাটি বলেছিল।

'গুরু' নাটকটির মূল কথা হল সংস্কারাচ্ছন্ন, আচারসর্বস্ব, মূঢ় নিশ্চল, গতিহীন জরাগ্রস্ত সমাজসংস্কারের বিরুদ্ধে সার্বিক প্রতিবাদ। আর এই প্রতিবাদের উদ্‌গাতা গুরু হলেও পণ্যরই প্রথম সঞ্চারক। বালকদের মধ্যে তথা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সে-ই এই প্রতিবাদকে স্যারণ করতে সচেষ্ট হয়েছে। অচলায়তনে প্রতিনিয়ত নানা রকমের বিধিনিষেধের প্রবল উপস্থিতি। শাস্ত্রপুথি দ্বারা এখানকার জীবন নিয়ন্ত্রিত। তাই সংস্কার ভাঙার প্রবণতা যেমন লক্ষ করা যায় তেমনি শাস্ত্রেই সেই সংস্কার ভাঙার ফলে কৃত পাপের থেকে উত্তরণ প্রাপ্তির প্রায়শ্চিত্তেরও বিধান আছে। এমনই একটি কাজ সুভদ্র করে ফেলে। উত্তরদিকের জানালা খোলাজনিত কারণে সে মাতৃহত্যার পাপে পাপিষ্ঠ এর থেকে মুক্তির জন্য মহাতামস ব্রতের বিধান
আছে। এমনি ভাবে মৃত্যুভয়রোদের জন্য অমিতায়ুধারিনী মা, মহাময়ূরী, ভট্টারিকা, মহাসাহতপ্রমর্দিনী, হরাইনের বজ্রবিদারণ আরও কত। আর এর কোনোটার ব্যত্যয় হলে প্রায়শ্চিত্ত দানের জন্য আছে হাজারও শাস্ত্রগ্রন্থ। যেমন- কুলদত্তের ক্রিয়াসংগ্রহ, ভরদ্বাজমিশ্রের প্রয়োগ প্রাপ্তি, ভগবান জ্বলনান্তকৃত আধিকাৰ্ষিক বর্ষায়ণ, সহ ক্রিয়াকল্পতরু, আর্যঅষ্টোত্তরশত, দিচন্দ্রিকা ইত্যাদি। আর এসবই পাপের প্রায়শ্চিত্তের পদ্ধতি দেখায়।

এসব ছাড়া আটান্নরকম আচমন বিধি আছে। এরকমই প্রায়শ্চিত্ত আছে বিশ-পঁচিশ হাজার রকমের। আসলে বক্তা প বলতে চেয়েছেন অচলায়তনের বিরুদ্ধ কাজ করার পর তার থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ও কম নেই। আর এই প্রায়শ্চিত্ত তার কাছে এখানের নিত্যকার গতানুগতিকতা থেকে বাঁচবার রসদ। প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান আছে বলেই রোজকার একঘেয়ে জীবন থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মেলে মানুষ টিকতে পারে। কথাটির মধ্যে আপাত তির্যক ভঙ্গিও লক্ষণীয়। বালাত্মকভাবে পঞ্চক বোঝাতে চাইছে পাপের সংখ্যা থেকে প্রায়শ্চিত্তের আধিক্যের কারণেই অচলায়তনের জীবনযাত্রা সত্যিই জীবনবিমুখ অমানবিক ও অসার। সবই সংস্কার মাত্র, এর থেকে মুক্তি পাওয়াই জীবনের লক্ষ্য।

সংস্কারার আচারমূঢ় সমাজ ও তার সংস্কারের প্রতিবাদস্বরূপ লেখা, অভিনযযোগ্য নাটক 'গুরু' থেকে উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে। উক্তিটির বরা হল উদারমনা, সংস্কারমুক্ত মনের অধিকারী, অচলায়তনের মূর্তিমান বিদ্রোহ পঞ্চক। মহামযুরী দেবীকে রাগানোর জন্য সে দেবীর পূজার দিন শনিবারে কাঁসার থালায় ইঁদুরের গর্তের মাটি রেখে তার ওপর পাঁচটা শেয়ালকাঁটার পাতা আর তিনটে মাসকলাই সাজিয়ে নিজে আঠারোবার ফুঁ দিয়েছিল। এই কাজের জন্য তিনদিনের মধ্যে কোনো একটা সাপ এসে তাকে কাটবার কথা। অন্তত অচলায়তনের শাস্ত্রে সেটাই বলা আছে। কিন্তু দেখা গেল তিনদিন তো দূর-অন্ত, আরও বহুদিন। কেটে গেলেও সাপটি তাকে খুঁজে পায়নি। পঞ্চকের নিজের কথা থেকে জানা যায়—“তিনদিনের দিন যে সাপটা এসে আমাকে নিশ্চয় কামড়াবে কথা ছিল, সে আজ পর্যন্ত আমাকে খুঁজে বের করতে পারেনি । শুধু তাই নয় তার স্পষ্ট কথা—“তাঁর রাগটা কীরকম সেইটে দেখবার জন্যেই তো একাজ করেছি। সুতরাং প্যকের কথানুসারে মহাময়ূরীর উদ্দেশ্যে সে যে কাজ করেছিল, তার শাস্তিস্বরূপ যা হওয়ার কথা ছিল তা যদি ঘটত অর্থাৎ তিনদিনের দিন যদি সাপ এসে তাকে কামড়াতো তবে। করা তথা পঞ্চকের মনে অচলায়তনের শাস্ত্রবিধি সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকত না।

উদ্ধৃতিটিতে যা হওয়ার কথা বলা হয়েছে তা হল অচলায়তনের শাস্ত্রীয় নিয়মের তথা সংস্কারের বিপরীত কোনো কাজ করলে বা যথাবিধ নিয়ম লঙ্ঘন করলে যে শাস্তির বিধান তা পাওয়া। এখানে যেমন মহাময়ূরী দেবীর বিরক্তি সৃষ্টি করলে সাপের কামড়ে মৃত্যুর কথা বলা আছে তেমনি বলা আছে উত্তর দিকের জানালা খুললে সঙ্গে সঙ্গে যে জানালা খুলবে তার দুচোখ মুহূর্তে পাথর হয়ে যাওয়ার কথা। এছাড়াও আছে পূর্বফাল্গুনী নক্ষত্রে কাকিনী সরোবরের নৈর্ঝত কোণ থেকে টোড়া সাপের খোলস খুঁজে তাতে কালো রঙের ঘোড়ার লেজের সাতগাছি চুল দিয়ে বেঁধে পুড়িয়ে ধোঁয়া দিলে। পিতৃপুরুষেরা সেই ধোঁয়ার ঘ্রাণ গ্রহণ করেন। আর তাতে ভয়ানক পুণা হয়।

, শাস্ত্রীয় আচরণ ও তার প্রতিফলস্বরূপ যা বলা আছে সে বিষয়ে পঞ্চকের কথা থেকে বুঝতে পারি পঞ্চক এই আয়তনের সংস্কার মানে না। সে বোঝে এর কোনো সত্যতা নেই। সবই অচল, অসার, ভিত্তিহীন। এর পিছনে কোনো যুক্তি নেই। সুতরাং আমরা বলতে পারি পঞ্চক হল— প্রতিবাদ-প্রবণ, মূর্ত বিদ্রোহী এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবুজ অবুঝের দলের প্রতিনিধি ও সীমার গন্ডিতে আবদ্ধ শাশ্বত মানবাত্মার প্রতীক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গুরু' নাটকটি তাঁর বিশিষ্ট সমাজভাবনারই বহিঃপ্রকাশ। নাটকটি অবশ্য তাঁর 'অচলায়তন' নাটকের সহজে অভিনয়যোগ্য রূপ। এ ব্যাপারে কবি নিজেই বলেছেন "সহজে অভিনযোগ্য করিবার অভিপ্রায়ে অচলায়তন নাটকটি 'গুরু' নামে এবং কিঞ্চিৎ পাতি এবং লঘুতর আকারে প্রকাশ করা হইল ।” তবে নাটকটি আকারে ছোটো হলেও মূল ভাবনা থেকে তা সরে আসেনি। বরং সংহত আকারে তা আরও বেশি গুরুতর হয়েছে। আর এই গুরুতর বিষয়টি যাদের উপস্থিতিতে বেশিমাত্রায় গতি পেয়েছে তাঁরা হলেন আচার্য ও উপাচার্য। তাদের কথোপকথনের মাধ্যমে প্রবলবেগে গুরুর আবির্ভাব ঘটেছে।

উপাচার্যের কাছে আচার্যই প্রথম বলেছেন যে বহুকাল পরে গুরু আসছেন। তবে তাঁর এই আগমন প্রসন্নতার জন্যে না অপরাধের মাত্রা পূর্ণ হওয়ার দরুন তা জানা যাচ্ছে না। উপাচার্য অবশ্য বললেন- তিনি প্রসন্ন হয়েছেন বলেই আসছেন, কারণ এখানে সব নিয়ম কঠোরভাবে পালিত হয়, কোনো ত্রুটি ঘটে না। তাছাড়া বজ্রশুতি এই আয়তনে এইবার নিয়ে সাতাত্তরবার পূর্ণ হয়েছে— যা অন্য কোথাও হয়নি; সুতরাং গুরুর অপ্রসন্নতার কোনো কারণ নেই।

তবুও আচার্যের মনে অশান্তি যায় না। তিনি উপাচার্যের কাছে জানতে চান এতে তিনি শাস্তি পেয়েছেন কিনা। উপাচার্য জানান—এক মুহূর্তের জন্যেও তার মনে কোনো অশান্তি নেই। কারণ তাঁর দিনরাত্রি সম্পূর্ণ নিয়মে বাঁধা, তাই এর চেয়ে কোনো শাস্তি আর হতে পারে না। তবে আচার্যের কথায় জানা যায়—এই যে শাস্তি তা সম্পূর্ণ নিশ্চল শান্তি। অচেনার মধ্যে গিয়ে অস্ত মেলে না বরং অভ্যন্ত জানার মধ্যেই যেখানে সব প্রশ্নের উত্তর মেলে সেখানে অশান্তি থাকতে পারে। না। আচার্যের এই কথার মধ্যে উপাচার্য তাঁর বিচলিত ভাবের ইঙ্গিত দিলে আচার্যদের বলেন-" আমার কেমন মনে হচ্ছে কেবল একলা আমিই না, চারিদিকে সমস্তই বিচলিত হয়ে উঠেছে। আমার মনে হচ্ছে আমাদের এখানকার দেয়ালের প্রত্যেক পাথরটা পর্যন্ত বিচলিত। তুমি এটা অনুভব করতে পারছ না সূতসোমঃ”-এর উত্তরে উপাচার্য বলেন না, তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত অবস্থা দেখছেন না। তিনি দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেন— "আমাদের তো বিচলিত হবার কথাও না। আমাদের সমস্ত শিক্ষা কোনকালে সমাধা হয়ে গেছে। আমাদের সমস্ত লাভ সমাপ্ত, সমস্ত সপ্তম পর্যাপ্ত। ... পাথরের মধ্যে কি ঘাস বেরোয়।"পকে আসতে দেখে উপাচার্য চলে যেতে উদ্যত হল আর আচার্য তার সঙ্গে নিভৃতে কথা বলার জন্য থেকে গেলেন।

• আচার্যের কথা থেকে আমরা উপলব্ধি করি অচলায়তনের প্রথা, রীতি, নিয়ম সম্পর্কে তিনি খুশি নন। তিনি চরম অশান্তিতে ভুগছেন। আয়তনে যা শেখানো হচ্ছে তাতে মন বন্ধ, সংকীর্ণ হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন শাস্ত্রের নিয়মাধীনে এখানকার সাধনা চার দেয়ালের গণ্ডিতে আবদ্ধ, অন্তঃসারশূন্য। তিনি নিজে এই বন্ধন ছিঁড়তে পারছেন না, তাই আশা করছেন বাইরের আঘাত এসে সব কিছু ওলটপালট করে দিক। তা সে যদি গুরু হন তো ক্ষতি নেই। আচার্যের মধ্যে তাই দোলাচলতা দেখা যাচ্ছে। তিনি এখানকার কঠোর শাস্ত্রনিয়মের পেষণে যন্ত্রণাদগ্ধ হচ্ছেন কিন্তু সর্বসমক্ষে আনতে পারছেন। না। তিনি ভয়ানক মানসিক যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছেন।

রবীন্দ্রনাথ চির প্রতিবাদী। সংস্কারাম্প, আচারমূঢ় নিশ্চল, গতিহীন জরাগ্রস্ত সমাজসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়ে ওঠে। কখনও কাব্যে, কখনও গানে, কখনও নাটকে, কখনও প্রবন্ধে—সবকিছুতেই তাঁর এই প্রতিবাদ স্পষ্ট হয়। রবীন্দ্রভাবনায় এমন জরাগ্রস্ত সমাজের কোনো কাজ নেই—যে মৃত তাকে বিনাশ করাই শ্রেয়। তিনি সুস্থ গতিশীল সমাজের পক্ষে সায় দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সবাইকে আহ্বান জানালেও তার সূচনা করেছেন সুভদ্রের মতন চিরকৌতূহলী অবোধ ডাগর চোখ মেলে তাকানো বালকের মাধ্যমে। একারণেই তো 'সবুজের অভিযান' কবিতায় শোনা যায়—

"ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা ওরে সবুজ ওরে অবুবা আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা' কিংবা যখন বলে——খাচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায় তখন আমরা বুঝে নিতে পারি কবি মানা'র পীড়নে নিষ্পেষিতদের হাত দিয়েই আলোকের ঝর্নাধারাকে ভিতরে প্রবেশ করিয়েছেন। এ কারণেই সুভদ্র উত্তরদিকের জানালা খুলে অচলায়তনের শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের ভাবিয়ে তুলেছে। সুভদ্রের নিয়নভাঙার মধ্য দিয়ে আয়তনের আকাশচুম্বী প্রাচীর শেষ পর্যন্ত ধুলোয় মিশে গেছে। তবে তার আগে এখানকার শাস্ত্রজ্ঞ নিয়মনিষ্ঠ পণ্ডিতদের অবস্থাও সেই উত্তরদিকের অধিষ্ঠাত্রী একটা দেবীর মতো। সুভদ্রের জানালা খোলার কথা প্রচার হতেই উপাধ্যায় এসে হাজির হন। সুভদ্রের কৃত কাজের ভয়ানকতা যে এত প্রবল হবে তা জানার আগে তিনি এক-একবার উত্তর দিকের দেয়ালে আঁক কাটা, কনুই ঠেকানোর কথা উল্লেখ করেছেন। সুভদ্র যে জানালাই খুলে ফেলবে তা তিনি ভাবতেই পারেননি, তাছাড়াও বলেছেন—যদি সে আঁক কেটে থাকে তবে তা চতুষ্কোণ না গোলাকার ইত্যাদি। কিন্তু সুভদ্রের স্পষ্ট কথা—“আঁক কাটিনি আমি জানালা খুলে বাইরে চেয়েছিলুম।” উপাধ্যায়ের মাথায় বজ্রপাত, এর প্রতিবিধান বা প্রায়শ্চিত্ত কী তা তারই জানা নেই। তবে তিনি যে মাথায় হাত দিয়ে সর্বনাশ বলে বসে পড়ে নিজের সংস্কারান্ধতার প্রকাশ ঘটাবেন তাতে সন্দেহ নেই। তিনি বলেন— "জানিনে কী সর্বনাশ হবে। ...বালকের দুই চক্ষু মুহূর্তেই পাথর হয়ে গেল না কেন তাই ভাবছি।"

উপাধ্যায় চললেন মহাপকের কাছে। একমাত্র তিনিই এর প্রতিবিধানের বিধান দিতে পারবেন। আচার্যদেবের কাছে এর বিধান নেই। শেষপর্যন্ত মহাপক জানান—একমাত্র ভগবান জ্বলনানগুকৃত আধিকর্মিক বর্ষায়ণে এর প্রতিবিধানস্বরূপ ছয়মাস মহাতামসত্ৰত সাধন করার কথা বলা আছে। অচলায়তন জুড়ে বিরাট আলোড়ন। দুটি পক্ষ একদিকে আচার্য ও পক অন্যদিকে মহাপঞ্চক, উপাধ্যায় প্রমুখ। সুভদ্রের কৃত জানালা খোলার মতো কাজ শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের ভাবিয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে আমরা তাদের সংকীর্ণতা, অন্ধকারাচ্ছন্নতা, সংস্কারান্ধতাকেই প্রবল হতে দেখি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিবাদধর্মী তত্ত্বমূলক নাটক 'গুরু' থেকে নেওয়া প্রশ্নোক্ত উক্তিটির বক্তা হলেন। অচলায়তনের সবচেয়ে সংস্কারনিষ্ঠ সংযমী, তেজি ও শাস্ত্র আচারের প্রতি গভীর বিশ্বাসী মহাপক। তিনি এই কথাটি আয়তনেরই আর একজন আচারনিষ্ঠ এবং মহাপত্তকের সর্বকর্মের অনুরাগী ও অনুবর্তী উপাধ্যায় মহাশয়কে বলেছেন।

" বক্তা এখানে যে অবস্থার কথা বলতে চেয়েছেন তা হল সুভদ্রকে দিয়ে মহাতামস ব্রত না করানোর জন্য আচার্যের সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত নিস্পৃহতা। অচলায়তনের শিক্ষার্থী সুভদ্র কৌতূহলবশে উত্তরদিকের জানালা খুলে বাইরে তাকায় ফলে জানালা দিয়ে সেদিককার বাতাস ঢুকে আয়তনের ভিতরকার বাতাস দূষিত করে দেয়। এর জন্য সুভদ্রকে মহাতামসব্রতের বিধান দেওয়া হয় কিন্তু আচার্যদেব শিশু সুভদ্রকে দিয়ে সেই কঠিন ব্রত করাতে চান না। ওই ব্রত পালনের জন্য সুভদ্রকে ছয়মাস আলোকরশ্মিহীন অন্ধকার ঘরে রেখে দিতে হবে। কেননা আয়তনে পালিত শাস্ত্রমতে- “আলোকের দ্বারা যে অপরাধ অন্ধকারের দ্বারাই তার ক্ষালন ।" আচার্যদের বিচলিত হয়ে জানান সুভদ্রকে কোনো প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না, তিনি আশীর্বাদ করে দেবেন মাত্র। ব্যাপারটি নিয়ে মহাপত্যকের সঙ্গে আচার্যদেবের মতপার্থক্য হয়। ইতিমধ্যে পাক সুভদ্রকে নিয়ে এলে আচার্যদেব তাকে অভয় দিয়ে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন—“বৎস, তুমি কোনো পাপ করোনি। যারা বিনা অপরাধে তোমাকে হাজার হাজার বৎসর ধরে মুখ বিকৃত করে ভয় দেখাচ্ছে, পাপ তাদেরই।"

আচার্যদেবের এই দৃঢ় অবস্থান অচলায়তনের নিয়মবিরুদ্ধ। কিন্তু তিনি কোনোভাবে সুভদ্রের ওপর আয়তনের এই অমানবিক নিশ্চল, গতিহীন, সংস্কারান্ধ, জরাগ্রস্ত মূঢ় আচরণের প্রয়োগ করতে দেবেন না। বক্তা মহাপঞ্চক আচার্যের এই কঠোর দৃঢ় অবস্থার কথা বলেছেন।

• শেষ পর্যন্ত মহাপকের দৃঢ় তেজি আচারনিষ্ঠ সংযমের জন্য আচার্যদেবকে দর্শকপল্লিতে নির্বাসন নিতে হল। এ ব্যাপারে স্থবিরপত্তনের রাজা তাঁর ক্ষমতাবলে সংকটকালীন সময়ে রাজ-অধিকার প্রয়োগ করলেন, বলা যায় মহা পণ্যকের প্রভাবে রাজা আচার্যদেবকে আয়তনের আচার্য পদ থেকে বরখাস্ত করলেন এবং মহাপ্যককে সেই পদে। প্রতিষ্ঠিত করলেন। আর আচার্যদের অধীনপুণ্যকে আয়তনের প্রান্তে যে দর্ভকপাড়া আছে সেখানেই নির্বাসিত করা হল। মহাপণ্যকের কথায়—“যিনি স্পর্ধাপূর্বক আচার লঙ্ঘন করেন, অনাচারীদের মধ্যে নির্বাসনই তার উচিত দণ্ড।

এ ব্যাপারে পঞ্চকরেও সেই শাস্তি দিতে দাদা হিসেবে তার কোনো দ্বিধা থাকবে না। আচার্যদেবকে সেখানেই নির্বাসিত করা  হল।

‘অচলায়তন' নাটকের সংক্ষিপ্ত অভিনয়যোগ্য রূপায়ন 'গুরু' নাটক থেকে উদ্ধৃত এই সংলাপটি আয়তনের আচার্যদের অদীনপুণ্য অন্য এক শাস্ত্রাপণ্ডিত জয়োত্তমঞ্চে বলেছেন। প্রসঙ্গটির সূত্রপাত সুভদ্রকে দিয়ে মহাপঞ্চকের নির্দেশমতো মহাতামস ব্রত সাধন করতে না দেওয়ার মধ্য দিয়ে। আচার্যদের চেয়েছিলেন সুভদ্রের মতো বালক শিশুকে যেন আলোকরশ্মিহীন ঘন অন্ধকার কুঠুরিতে থাকতে না হয়। তারই সূত্র ধরে পণ্যক অচলায়তনে গান ধরে এবং দাদাকেও বলে—“সর্বনাশের বাজনা বাজলেই নাচ শুরু হয় দাদা ।"—মহাপত্তক তাকে গালমন্দ করে চুপ করতে বলে। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলে - ... আত্মবিস্মৃত হয়ো না। ঘোর বিপদ আসন্ন সে-কথা স্মরণ রেখো।"

এরপর বিশ্বস্তর আচার্যদেবের পায়ে ধরে অনুরোধ করে সুভদ্রকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলে। তাকে প্রায়শ্চিত্ত করা থেকে বিরত রাখতে নিষেধ করে। সঞ্জীব তাঁকে বোঝায়-সুভদ্রর ভাগ্য ভালো বলেই তো সে মহাতামস ব্রত পালনের মাধ্যমে ধরাতলে দেবত্বলাভে সক্ষম হবে। এমন সৌভাগ্য তো খুব কমজনেরই হয়। ফলে আচার্যদেবকে জানাতেই হয় গায়ের জোরে কাউকে দেবতা গড়ার কাজে সে থাকবে না। শিশুরা দেবতাদের প্রিয় সুতরাং মানুষরূপী শিশু-দেবতার আর দেবত্বলাভের প্রয়োজন হয় না। এরপর জয়োত্তম বলেন- “দেখুন আপনি আমাদের আচার্য, আমাদের প্রথমা, কিন্তু যে অন্যায় কাজ করছেন তাতে আমরা বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হব।" জয়োত্তমের বলা এই কথার প্রসঙ্গে তাই আচার্যদের প্রশ্নোক্ত সংলাপটি বলেন।

• প্রশ্নোক্ত উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণে প্রথমেই যা বলতে হয় তাহল- প্রত্যেক কাজেরই কারণ আছে। সুতরাং গুরুর আবির্ভাবের কারণও বর্তমান। আর সেই কারণ শুধুমাত্র সুভদ্রের উত্তরদিকের জানালা খোলা নয় আরও কিছু অনাচার এখানে হচ্ছে। আর সেই অনাচারগুলি মহাপঞ্চক, বিশ্বন্তর, সঞ্জীব কিংবা উপাধ্যায়ের আচরণ থেকে এসেছে। আচার্যদেব আয়তনের সর্বোচ্চপদে আসীন তিনি ত্রিমার্গ সাধনার শ্রেষ্ঠ জ্ঞানমার্গের প্রধান। ফলে তিনি এখানকার সমস্ত প্রায়শ্চিত্ত, আচার-আচরণ, সংস্কার, বিধান, নীতি-নিয়ম কিছুরই অন্তঃসারশূন্যতার ব্যাপারটি বোঝেন। তিনি উপলব্ধি করেন এই সব আচরণের কোনো মানে নেই—সবই সরল-কোমলমতি চিত্তকে ভয় বিহ্বল করে রাখার জন্যেই তৈরি। তার চেয়ে বরং এঁরা যেসব কাজ করছে; বিশেষ করে আচার্যদেবকে তাঁরা যা বলছে সেটাই অনেক বেশি অনাচার। আচার্যদেবের আদেশের অবাধ্য হওয়াও শাস্ত্র-নিয়ম বিরুদ্ধ অথচ তারা সেটাই করছে। বড়ো অনাচার তো এটাই তাঁরই অধস্তনরা তাঁর কৃতকর্মের কৈফিয়ত চাইছে, তাকে বোঝাচ্ছে, তার কর্মের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আচার্যের এই ভাবনাই উপাচার্যের কথায় পাওয়া যায়—যখন মহাপত্যকে উপাচার্যকে আচার্যপদের প্রলোভন দেখায়। এইসময় তার কণ্ঠে শোনা যায়—“সেই প্রলোভনে আমি আচার্যদেবের বিরুদ্ধে দাঁড়াব। একথা বলবার জন্য তুমি যে মুখ খুলেছ সে কি এখানকার উত্তরদিকের জানালা খোলার চেয়ে কম পাপ?"।

মহাতামস ব্ৰতা কথার অর্থ ঘন অন্ধকারে থেকে সাধনা করা। অচলায়তনের মূঢ় অন্ধকারাচ্ছন্নতার আর এক যুক্তিহীন সংস্কারের নির্দয় নির্মম প্রায়শ্চিত্ত হল এই মহাতামস ব্রত। ভগবান জ্বলনানন্তকৃত আধিকর্মিক বর্ষায়ণে এই মহাতামস ব্রতের কথা আছে। যদিও নাটকের প্রেক্ষাপটে আমরা বুঝতে পারি অচলায়তনের অন্যান্য সব প্রায়শ্চিত্ত বা আচার-আচরণের মতো এটিও অসার ও অন্তঃসারশূন্য নিরর্থক।

এই মহাতামস ব্রত পালন করার জন্য ব্রতপালনকারীকে হিন্দুমর্দনকুণ্ডে স্নান করিয়ে তাকে ঘন অন্ধকার ঘরে রেখে দিতে হয়। ঘরটি এমন হবে যেখানে আলোকের একটি রশ্মিও প্রবেশ করতে পারবে না। অর্থাৎ পালনকারী কোনো আলো দেখতে পারবে না। এভাবেই আলোকরশ্মি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রেখে অন্ধকার ঘরে থেকে মহাতামস হত পালন করতে হন ।

• 'গুরু' নাটকে উল্লেখিত মহাতামস ব্রত সম্পর্কে জানা যায় যে ভগবান জ্বলনানন্তকৃত আধিকর্মিক বর্ষায়ণে মহাতামসব্রত পালনের কথা আছে। অচলায়তনের সংস্কারমতে উত্তরদিকের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন একজটা দেবী। তার অশুভ দৃষ্টি থেকে আয়তনের ভিতরকার সবাইকে রক্ষা করার জন্য সেদিককার জানালা খোলা হয় না। সেদিক দিয়ে বাতাস প্রবেশ করাও ঠিক নয়, কারণ বাতাস ঢুকেও সব যজ্ঞপাত্র ও উপাচারকে অশুদ্ধ করে দিতে পারে। ফলে সবাইকে জানালা খুলতে মানা করা হয়। কিন্তু কৌতূহলী সুভদ্র অতিআগ্রহে উত্তরদিকের জানালা খুলে বাইরে তাকায়। ব্যাপারটি জানাজানি হতেই আয়তনে শোরগোল পড়ে যায়। উপাধ্যায়মশায় প্রায়শ্চিত্তের নানান কথা বললেও সে সম্পর্কে উত্তরদিকের জানালা খোলার প্রায়শ্চিত্ত কী তা জানা যায় না। শেষে মহাপাক এসে জানিয়ে দেন “আমরা এখন সকলেই অশুচি, বাহিরের হাওয়া আমাদের আয়তনে প্রবেশ করেছে।" প্রায়শ্চিত্তের বিষয়ে তিনি আরও বলেন ক্রিয়াকল্পতরুতে এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না—একমাত্র ভগবান জ্বলনানগুকৃত আধিকর্মিক বর্ষায়ণে লিখেছে। অপরাধীকে ছয় মাস মহাতামস সাধন করতে হবে। সুতরাং সুভদ্রের উত্তর দিকের জানালা খোলার প্রসশা ধরেই তার প্রায়শ্চিত্ত ও অচলায়তনের পরিশুদ্ধতা বজায় রাখার অনুক্রমে মহাতামস ব্রত সাধনের কথা এসেছে।

• মহাতামস ব্রডের প্রভাব সম্পর্কে জানা যায়- এই তামসব্রত যে পালন করে তার ভাগ্য বড়ো ভালো। পরম সৌভাগ্যসম্পন্ন ব্যক্তিই এ ব্রত পালনের সাহস দেখাতে পারে। শুধু তাই নয় এই ব্রত পালনকারী এই পৃথিবীতেই দেব আসন লাভ করে, সে দেবতার অতি প্রিয় হয়ে ওঠে। তাই তো সঞ্জীব বলেন- “ভেবে দেখুন, সুভদ্রের কতো বড়ো ভাগ্য। মহাতামস কজন লোকে পারে। ও যে ধরাতলে দেবত্ব লাভ করবে।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিনয়যোগ্য আকারে লেখা 'অচলায়তন' নাটকের সংক্ষিপ্ত রূপ 'গুরু' নাটকে খুনকদের কথা আছে। তাদের অবস্থান আয়তনের বাইরে, পাহাড় মাঠ সংবলিত মনোরম পরিবেশে। মূল নাটকে যদিও নক সম্প্রদায়ের কথা নেই, সেখানে আছে শোনপাংশুদলের কথা। এই শোনপাংশুরাই 'গুরু' নাটকে ঘৃনক-এ পর্যবসিত হয়েছে। এরা পাহাড়ের কোলে অবস্থান করে। আর সারাদিন কাজকর্ম, হাসি, আনন্দ, নাচ-গানে ব্যস্ত থাকে। ধর্মানুষ্ঠান, পূজার্চনা, শাস্ত্রপাঠ এসবের প্রতি যুনকদের কোনো আকর্ষণ নেই। এরা আসলে প্রাণরসে ভরপুর কাজের মানুষ।

অচলায়তনের পঞ্চক মূনকদের পাড়ায় যায়। পঞ্চক গানে মাতোয়ারা আর সে গানের তালে যূনকরা নাচতে লাগে। এ ব্যাপারে প্যক জানতে চাইলে প্রথম যুনক বলে তারা নাচবার সুযোগ পেলেই নাচে, পা দুটোকে স্থির রাখতে পারে। না। তারা পঙ্গুককে কাঁধে তুলে নাচতে চাইলে সে তাদের খুঁতে মানা করে। এর উত্তরে তারা বলে- “ওকে অচলায়তনের ভূতে পেয়েছে।”

পঞ্চক যুনকদের জানায় তাদের গুরু আসছে। একথা শুনে তারা গুরুকে দেখবার ইচ্ছে প্রকাশ করে। তারা বলে গুরুকে।

তারা মানে না, তারা হল দাদা-ঠাকুরের দলের লোক। তবে তাদের মধ্যে চণ্ডক নামের এক যূনক গুরুর কাছে মন্ত্র নিতে কোথায় যেন লুকিয়ে চলে গেছে। তৃতীয় যুনকের কথা থেকে জানা যায়—— “য়ূনক বলে কেউ তাকে মন্ত্র দিতে চায় না। সেও ছাড়বার ছেলে নয়, সে লেগেই রয়েছে। ... মন্ত্র আদায় করবার জন্য তার এত জেদ।"

পণ্যকের কথা থেকে জানা যায় খুনকদের বড়ো দোষ তারা সবাই সবরকমের কাজ করে। চাষবাসের ব্যাপারে প্রথম যূনকের কথা—“চাষ করি বৈকি, খুব করি। পৃথিবীতে জন্মেছি সেটা খুব কষে বুঝিয়ে দিয়ে তবে ছাড়ি।” তারা মহানন্দে চাষ করে, সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত মাঠে মাঠেই তাদের বেলা কাটে।

যূনকরা খেসাড়ি ডালের ও কাকুড়ের চাষ করে—এ দুটোর ব্যাপারেই অচলায়তনের শাস্ত্রে মহানিষেধ। কারণ পঞ্চক আমাদের পিতামহ বিষী কাকড়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ।" আর "কোন যুগে একটা খেসারি ডালের গুঁড়ো উপবাসের দিন কোন এক মস্ত বুড়োর ঠিক গোঁফের ওপর উড়ে পড়েছিল তাতে তাঁর উপবাসের পুণ্যফল থেকে ষষ্টিসহ ভাগের একভাগ কম পড়ে গিয়েছিল... " কিন্তু নকদের ক্ষেত্রে এমন ঘটলে তারা তাকে আরও একটু এগিয়ে নিত। এছাড়া করা তামা- লোহা-পিতলের কাজও করে। কিন্তু পণ্যকরা কেবলই তামা-পিতলের কাজ করে।

এরপর আসে মগ্ন ও পুথির কথা। পঞ্চক একে একে বজ্রবিদারণ কেয়ূরী, মরীচী, মহাশীতবর্তী, উন্নীয় বিজয় মন্ত্রের কথা বললে যূনকরা অপারগ হয়। শূনকরা জানায়—ক্ষৌর করতে গিয়ে নাপিত রক্ত ঝরালে তারা রেগে গিয়ে নাপিতের দুইগালে চড় কষিয়ে দেয়। তারা নৌকায় উঠতে পারে, নদী পার হতেও তাদের বাধা নেই। আসলে পণ্যকদের যাতে বাধা খুনকদের সে কাজ অবাধ। অচলায়তন যেখানে নিষেধের বেড়ায় আবদ্ধ সেখানে পাহাড়ের কোলে খুনকরা উদ্যমী গানে-নাচে-কাজে উচ্ছ্বাসময়। পরকের পা দুটোও যুনকদের গানে নেচে ওঠে। সে বলে ওঠে—“আমাকে সুখ এরা টানবে দেখছি। কোনদিন আমিও লোহা | পিটাবো রে লোহা পিটোকে—কিন্তু খেসারির ডাল—না না, পালা ভাই, পালা তোরা। দেখছিস না পড়ব বলে পুঁথি সংগ্রহ করে এনেছি। কিন্তু তার পুথি পড়া হয় না খুনকদের দাদাঠাকুর এসে হাজির হয়। তাদের কথাবার্তায় ব্যাঘাত ঘটে।

'অচলায়তন' নাটকের সহজে অভিনয়যোগ্য রূপ হল 'গুরু'। রবীন্দ্রনাথ 'অচলায়তন' নাটকটিকে কিলিং রূপান্তরিত এবং লঘুতর আকারে 'গুরু' নামে প্রকাশ করেছিলেন। সেই সূত্র ধরেই মূল নাটকের শোনপাংশুর দল খুনক নামে আখ্যাত হয়েছে। এরা শাস্ত্রপাঠ, পূজার্চনা ও ধর্মানুষ্ঠানে সম্পূর্ণ অনাগ্রহী। বরং সারাদিন কাজকর্ম, হাসি, আনন্দ, নাচ-গানে এঁরা ব্যস্ত থাকে। এঁরা সদাব্যস্ত কর্মী মানুষ। আর এইসব কিছুর মূলে আছে তাদের দাদাঠাকুর। পঞ্চক তাদের গুরুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তাদের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে শোনা যায়—“গুরু। আমাদের আবার গুরু কোথায়। আমরা তো হলুম দাদাঠাকুরের দিল। এ পর্যন্ত আমরা তো কোনো গুরুকে মানিনি।" দাদাঠাকুরকে আসতে দেখে দ্বিতীয় ঘূনকের কণ্ঠেও একই কথা শুনি। সে পাককে বলে—“এখন রাখো তোমার পুঁথি রাখো— দাদাঠাকুর আসছে।" ঘুনকেদের কাছে দাদাঠাকুরই সব; সে-ই তাদের চালক, সকল কাজের সঙ্গী। এরা লোকদেখানো প্রণাম করে না, সঙ্গে মিশে যায়। ভক্তি নৈবেদ্যের ফাঁকটুকুও তারা রাখেনি। দাদাঠাকুরকে তারা কাছের মানুষ ও প্রাণের মানুষ করে নিয়েছে। এই কারণেই শেষ পর্যন্ত দাদাঠাকুরের নির্দেশে তারা অচলায়তনের আকাশচুম্বী প্রাচীরকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তাই দাদাঠাকুরই হয়ে উঠেছে ঘৃনকদের সর্বেসর্বা, সকল উচ্ছ্বাস-আনন্দ-উল্লাস।

→ দাদাঠাকুরের সঙ্গে পশুকের প্রথম সাক্ষাতে যে কথা হয় তা এরকম। ঘৃনকদের মুখে দাদাঠাকুরের কথা শুনে সেও তাঁকে দাদাঠাকুর বলে ডাকে। সে তাঁর সঙ্গে নিরিবিলিতে একটু কথা বলতে চায়। পণ্যক তাদেরকে বলে তোদের বাবাঠাকুরকে নিয়ে তোরা তো দিনরাত মাতামাতি করছিস, একবার আমাকে ছেড়ে দে, আমি একটু নিরালায় বসে কথা কই । ভয় নেই, ওকে আমাদের আয়তনে নিয়ে গিয়ে কপাট দিয়ে রাখব না।" উত্তরে প্রথম ঘূনক বলে “উনি গেলে তোমাদের অচলায়তনের পাথরগুলো সুদ্ধ নাচতে আরম্ভ করবে, পুথিগুলোর মধ্যে বাঁশি বাজবে।”

পাক প্রথমেই দাদাঠাকুরকে জানায় সে শুনেছে তাদের গুরু আসছেন। দাদাঠাকুর বিস্মিত কণ্ঠে বলেন—তাহলে ভীষণ বিপদ, ভারি উৎপাত করবে তাহলে। পঞ্চক বলে—একটু উৎপাত হলেই সে বাঁচে। চুপচাপ থেকে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে। দাদাঠাকুর অভয় দিয়ে বলেন – “আচ্ছা বেশ, তোমার গুরু এলে তাকে দেখে নেওয়া যাবে। এখন তুমি আছো কেমন বলো তো?”

উত্তরে পঞ্চক বলে—ভয়ানক টানাটানির মধ্যে সে আছে। তবে তার প্রার্থনা এই—“গুরু এসে যেদিকে হোক একদিকে | আমাকে ঠিক করে রাখুন–হয় এখানকার খোলা হাওয়ার মধ্যে অভয় দিয়ে ছাড়া দিন, নয় তো খুব কষে পুথি চাপা দিয়ে রাখুন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত আগাগোড়া একেবারে সমান চ্যাপটা হয়ে যাই।” ইতিমধ্যে চণ্ডককে মেরে ফেলার খবর করে দিয়েছিল, মহাপরক বিশ্বাস করেনি। এখনও করছে না। উপাধ্যায় জানালেন—শুধু মার নয় প্রাচীরগুলোও এমন সমান করে শোয়ানো যে সে ব্যাপারে কোনো চিন্তা না করলেই চলবে। কারণ আলো দেখা যাচ্ছে। দৈবজের স্পষ্ট গণনাকে সম্পূর্ণ মিথ্যে করে দিয়ে শত্রুসৈন্যের রক্তবর্ণ টুপি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই অবস্থায় আচার্যদের থাকলে কোনো চিন্তা ছিল না- তিনি দক্ষতার সঙ্গো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতেন। তবুও মহাপনারা বলছেন-রা বাইরের পাঁচিল ভাঙলেও ভিতরের লোহার দরজা বন্ধ আছে। আর তা খোলা অসম্ভব। সে ভাঙতে গেলে চন্দ্র সূর্য নিতে যাবে। তার এখনও বিশ্বাস অচলায়তনের রক্ষক দেবতার আশ্চর্য শক্তি আছে।

কিন্তু মহারক্ষা মন্ত্রের পাঠের পরেও রক্ষকদেবতা অচলায়তনকে রক্ষা করতে পারেনি। শত্রুসৈন্য সব ভেঙে দিল--পাঁচিল, পরজা, দেয়াল সবই ধুলোনা লুণ্ঠিত। নীল আকাশের সঙ্গে সব সমান হয়ে গেছে। ছেলেরা মজা করে নৃত্য করছে। চারদিকের আলো সবকিছু ফাঁক করে দিয়েছে। পঙক্তিধৌতি আজ অপ্রয়োজনীয়। কারণ আয়তনের সবকিছু ভেঙে নামার হয়ে যাওয়ায়-সমস্ত আকাশ যেন ঘরের মধ্যে দৌড়ে এসেছে। এখন আয়তনের সঙ্গে খোলা মাঠের কোনো পার্থক্য নেই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্বমূলক নাটক 'গুরু' থেকে উদ্ধৃত কথাটি অচলায়তনের গুরু এই আয়তনের সর্বাপেক্ষা নিষ্ঠাবান, তেজি, সংযমী ও জেদী পুরুষ মহাপককে বলেছেন।

অচলায়তনের সমস্ত বাধার প্রাচীর ভেঙে দিয়ে গুরু এলেন। তবে আয়তনের শত্রুবেশেই তার আগমন। তিনি আয়তনের সমস্ত আচারসর্বস্থ নিষ্প্রাণ, নীরস নিয়ম লঙ্ঘন করে তাঁর আগমনস্বরূপ তুলে ধরে বললেন-“আমাকে মানবে না জানি কিন্তু আমিই তোমাদের গুরু।" কারণ এটাই তার গুরুর বেশ লড়াইয়োর বেশ আর তাঁরা লড়াই করলে তা হবে গুরুত্ব অভ্যর্থনা। মহাপক তাঁকে প্রাচীর ভাঙার কারণ বলতে বললে তিনি জানান- গুরুর প্রবেশের পথ না রাখার জন্যই তাঁকে এই কাজ করতে হল। মহাপক হার মানতে চায় না তাই দাদাঠাকুরকে বলতে হয়—এখন হার না মানলেও পদে পদে, দিনে দিনে তাকে হার মানতেই হবে। মহাপণক আঘাত করার কথা বললে তিনি বলেন—তিনি গুরু বলেই তাঁকে আঘাত করতে পারলেও আহত করতে পারবে না।

উপাধ্যায় মশায়ের মাছ থেকে জানা যায় দাদাঠাকুর গুরু হিসেবে তাদের প্রণাম গ্রহণ করলে তাঁরা প্রণাম করতে রাজি। কিন্তু মহাপক স্পষ্টভাবে উদ্ধৃত কণ্ঠে বললেন-"মা, আমি তোমাকে প্রণাম করব না ।"-মহাপ্যকের এই কথার প্রসা ধরেই দাদাঠাকুর রূপে থাকা গুরুদের প্রশ্নোদৃত কথাটি বলেন।

● 'প্রণাম' ও প্রণতা দুটি আলাদা অর্থ আপক শব্দ। প্রণাম অর্থ প্রণতি, অর্থাৎ ভূমিতে বা পায়ের ওপর আনত অভিবাদন। প্রণামের মধ্যে প্রথম্যের প্রতি প্রণামকারীর শ্রদ্ধা-ভক্তি মিশে থাকে। অর্থাৎ মানুষ অন্যকে প্রণাম করে নিজের হয়ে আন্তরিক সম্রদ্ধ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে।

কিন্তু 'প্রণত" ব্যাপারটি তা নয়। প্রণাম করার জন্য প্রণামকারীর যে ঝুঁকে পড়া ন্যুব্জ অবস্থা সেটাই প্রণত। এক্ষেত্রে 'প্রায়' শব্দটি বিশেষ প্রণামের বিশেষ হয়ে ওঠেনি। 'প্রণত করবা কথার মধ্যে একটা কলপ্রয়োগের দিক আছে। অর্থাৎ উখত, গর্বিত কোনো অবোধকে বক্তা আনত করতে চাইছেন। বক্তা উদ্দিষ্টকে তাঁর দর্প থেকে, তাঁর অভিমান থেকে মুক্ত করে তাকে নিচু হতে বাধ্য করবেন, আসলে তিনি এমন অবস্থা সৃষ্টি করবেন যাতে উন্নত মহাপক অবনত, নমিত বা প্রণত হয়।

শব্দ দুটি বিশেষ্য, বিশেষণ হলেও ভাবের দিক দিয়ে আলাদা অর্থ দান করে। একটিতে আছে হৃদয়ে বিনম্র মনোরম মাধুর্য আর অন্যটিতে আছে দর্পের উদ্ধৃত বহিঃপ্রকাশ। একটি মনের থেকে আপনি প্রকাশ পায়, অন্যটি করতে বধ হয়। প্রণামে আছে স্বতঃস্ফূর্ততা আর প্রণত-এ আছে বলপ্রয়োগজনিত অনিবার্যতা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান রূপক-সাংকেতিক নাটকের অভিনযযোগ্য সংক্ষিপ্ত রূপ হল 'গুরু' নাটকটি। এই নাটকে বালকমলের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শিক্ষাদানকে কেন্দ্র করেই সমাজের অম্ল-কুসংস্কার, ভিত্তিহীন অনাচার ও অবৈজ্ঞানিক শাস্ত্রীয় আচার, রীতি ও তার ভয়ংকরতা এই নাটকে স্থান পেয়েছে। বালকদের মধ্যে সুভদ্র উত্তরদিকের জানালা খুলে যে উদার আকাশ-পাহাড় দেখতে চেয়েছিল গুরুর প্রবল আগমনে তা পূর্ণতা পেয়েছে। অচলায়তনের দরজা আকাশের সঙ্গে দিব্যি সমান হয়ে গেছে।

তাদের উচ্ছবাসের শেষ নেই। আজ তাদের খুব মজা তাই তারা মহানন্দে নৃত্য করছে। এখানে চারিদিক থেকে আলো এসে সমস্ত কিছু ফাঁক করে দিয়েছে। এতদিন তারা এত আলো দেখেনি, পাখির ডাক শোনেনি। অবস্থাটা খাঁচার বন্ধ ময়নার মতো একেবারেই নয়। আজ তাদের ছুটতে ইচ্ছে করছে, তারা দামাল হয়ে উঠেছে। আজ আর কোনো নিয়ম-আচার রক্ষার বালাই নেই। আজ ছেলেদের যড়াসন কন্ধ, কোনো পক্টিধৌতি পর্যন্ত নেই। বালকরা মনে করছে সমস্ত আকাশটাই যেন আজ ঘরের মধ্যে দৌড়ে এসেছে। বালকদের সঙ্গে জয়োত্তম, বিশ্বম্বর, সঞ্জীবও সমানভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তাদের মতন হয়ে গেছে। বালকদল বন্ধ কারাগার থেকে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। তারা খোলা আকাশের নীচে গুরুর সঙ্গে খেলা করার উদ্যোগ নিয়েছে। বালকদের কাছে এখনকার অচলায়তনকে আর আগের সঙ্গে মেলানো যায় না। আগের অচলায়তনে মাঠ ছিল। না, এখন সেখানে বিরাট মাঠ। মাঠটি ঘরের চেয়ে, আন্তিনার চেয়েও অনেক বড়ো। বালকরা সেখানে গুরুর সঙ্গে খেলায়। মত্ত। এ যেন বালকদের কাছে থাকবো না কো বন্ধ ঘরে ) বালকদলের কাছে দাদাঠাকুর এসে জানালেন—“আমি তোমাদের গুরু।” সকলে প্রণাম জানালে গুরু তাদের মহাজীবন লাভের আশীর্বাদ করলেন। তারপর তাদের সঙ্গে খেলতে শুরু করলেন। তাঁর কাছে বালকদের সন্ধ্যে না খেললে যে গুর হওয়ার সুখ নেই। এ কথা প্রসঙ্গে মাঠের কথা এলে গুরু জানালেন খোলা জায়গায় গেলে পাপ হয় না, খোলা জায়গায় সব পাপ পালিয়ে যায়। সবাই দাদাঠাকুরের সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেও মহাপঞ্চক যায় না। সুভদ্র এসে দাদাঠাকুরকে বলল তার পাপের তো প্রায়শ্চিত্ত হল না। দাদাঠাকুর বললেন আর কিছু বাকি নেই, তিনি সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। আর একজটা দেবীর সঙ্গে তার এমন মিল হয়ে গেল যে, সে আর কোনোদিন জটা দুলিয়ো কাউকে ভয় দেখাবে না। এখন তাকে দেখলে মনে হবে সে আকাশের আলো। তার সব জটা আমাদের নবীন মেঘের মধ্যে জড়িয়ে গেছে।

অচলায়তন এতদিন ছিল এক নিশ্চল শিক্ষালয় মাত্র। কেবল শাস্ত্রীয় নিয়মকানুনের পালন পদ্ধতি। প্রাণের বিকাশ বা উচ্ছ্বাস ছিল না। সর্বত্র বিধিনিষেধের নিগড়। কিন্তু গুরুর আগমনে, অচলায়তনের ধ্বংসের মাধ্যমে সেখানে এল আলোর আগমন। মরা প্রাণে জীবনের বান এল। শাস্ত্রীয় বিধি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। আর এটাই হল শিক্ষা। সংকীর্ণ, ভীরু মন উদার আলোয় স্নান করল। বন্ধ মনের আকাশেও ফুটল উচ্ছ্বাসের হাজারও অম্লান তারকারাজি।

শেকসপিয়র যতই বলুন না কেন What's in a name?" প্রকৃতপক্ষে আমরা দেখি নামকরণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। জাগতিক ক্ষেত্রে আমরা দেখি সন্তান জন্মাবার পূর্ব থেকেই পিতামাতা নবজাতক বা জাতিকার নামকরণ বিষয়ে বিশেষ যত্নবান হয়ে ওঠেন। সুতরাং নামকরণ কেবলমাত্র একটি নামে ডাকাই নয়, তা পরিচয়জ্ঞাপকতার চেয়ে অনেক বেশি। রবীন্দ্র মানসিকতার বিশিষ্ট লক্ষণই হল—কোনো কিছু হালকা নয়—ভারী, গভীরতার দিকে তার গতি। রবীন্দ্রনাথ যে কোনো রচনার নামকরণ বিষয়ে খুবই মনোযোগী ছিলেন। তার ওপর বিষয়বস্তু অনুসরণ করে রচনার নামকরণ কবি খুব বেশি পছন্দ করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে-কোনো রচনার বিষয়বস্তু, রচনারীতি, চরিত্রচিত্রণ, ভাষাপ্রসঙ্গ, রসবিচার এই সমস্ত মিলেই সাহিত্য একটি অখণ্ড সৃষ্টি। সেই অখণ্ড সামগ্রিকতাকে বিখণ্ডিত করলে সামগ্রিকতায় বিঘ্নতা ঘটে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেন- “রসশাস্ত্রে মূর্তিটি মাটির চেয়ে বেশি, গল্পটিও বিষয়ের চেয়ে বড়ো। এই জন্য বিষয়টাকে শিরোধার্য করে নিয়ে গল্পের নাম দিতে আমার মন চায় না।"—তাই তিনি এমন নামকরণ করতে চেয়েছিলেন যার মধ্য দিয়ে। সৃষ্টির অভ্যন্তরীণ ভাবসত্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 'অচলায়তন' নাটকের সংক্ষিপ্ত ও কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত লঘুতর সহজে। অভিনয়যোগ্য রূপ 'গুরু' নাটকটিও তার ব্যতিক্রম নয়।

“গুরু” নাটকের ভাবসত্য হল সংস্কারের বেড়াজালে নিমজ্জিত মানুষকে শাশ্বত সত্যের পথে আনার জন্য একজন। মহারুদ্রের দরকার। তা চিরকালই হয়ে এসেছে। আমরা জানি গুরুকে বাদ দিয়ে গুরুবাদের প্রাবালা বেশি হলে পণ্ডিতদের।

হাতে সাধারণ ভক্তসমাজ নিপীড়িত নিষ্পেষিত হয়। অচলায়তন নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা-ই হয়েছিল। আমরা দেখি সংস্কারের প্রাচীরে ঘেরা প্রাণহীন, আচার-আচরণের শ্বাসরোধকারী অচলায়তনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে মানবাত্মার বিকাশ বাধা পাচ্ছে। মননহীন মন্ত্রের চাপেও যে শাশ্বত সত্যকে অবরুদ্ধ করা যায় না 'গুরু' নাটকে সেটাই প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে। আলো-বাতাস-প্রাণহীন নিশ্চল গতিবিহীন জীবনে কোনো সত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। অচলায়তন নামের আড়ালে নাট্যকার সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। আয়তনে বসবাসকারী সবাই নৈষ্ঠিকভাবে শাস্ত্রচর্চায় নিমজ্জিত, অন্ধ সংস্কার, তন্ত্রমন্ত্র আচারবিচার, প্রাচীন রীতিনীতি—এসবই এদের জীবনের সব। এখানে আলো, হাসি, গান, উচ্ছ্বাস, উল্লাস, কথা, গল্প নেই; আছে কেবল মন্ত্রপাঠের গুঞ্জনধ্বনি। প্রাণহীন মন্ত্রকে সফল করে অচলায়তনের গমন প্রক্রিয়া। আর তাতেই প্রাণের জোয়ার এনেছেন—য়ূনকদের দাদাঠাকুর। ইনিই দর্শকপল্লির গোঁসাইঠাকুর এবং অচলায়তনের গুরু।

'গুরু' নাটকের গুরু ওরফে দাদাঠাকুরই সমস্ত কর্মকান্ডের প্রাণস্বরূপ। তার হাতেই অচলায়তনের সৃষ্টি, আবার নতুনভাবে নতুন ধারায় তাতে প্রাণের জোয়ার আনতে তাকে ভেঙে ধুলোয় মিশিয়ে সমান করে দেন। তিনি অচলায়তনের জ্ঞানমার্গের সঙ্গে প্রতিটি মানুষের কর্মমার্গ ও ভক্তিমার্গকে একাত্ম করে দিতে চান। তিনি মানুষকে ত্রিমার্গ সাধনার পথে উন্নীত করতে চান। তার প্রধান লক্ষ্য মানুষকে সর্বসংস্কারের ঊর্ধে তুলে তাকে আলোকের ঝরনাধারায় স্নান করানো। উচ্ছ্বাসের জোয়ারে জীবনকে মিলিয়ে দেওয়াই তাঁর কাজ। তিনি সবার মনের অন্ধকার দূর করতে চান এবং 'গুরু' তা করতে পেরেছেন। তাই 'গুরু' কেবলমাত্র ব্যক্তিবিশেষের চরিত্রকেন্দ্রিক নামের মাধ্যমেই সার্থক নয়—তাঁর মূল লক্ষ্য ও জীবনের শাশ্বত সত্যের ব্যানা নিয়েও নাটকটি সার্থকনামা হয়ে ওঠে।

মহাপণক 'গুরু' নাটকের অন্যতম চরিত্র। অবশ্য শুধু এই নাটকের নয়—সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্যের এক বিস্ময়কর ও উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। এই চরিত্রটির মধ্য দিয়ে নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ তাঁর রূপক-সাংকেতিক নাটকের এক বিশেষ ভাবসত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথ চিরকালই অর্থহীন সংস্কার ও যুক্তিহীন আচারসর্বস্বতা ঘৃণা করে এসেছেন। মহাপণ্যক হলেন। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সংস্কারের প্রতীক। একই সঙ্গে তিনি এই চরিত্রে পরিবর্তন এনে তাঁকে মানবধর্মবোধে জাগিয়ে দিয়েছেন।

মহাপত্তক মহাজ্ঞানী, বিদ্বান ও অর্থংত্ব লাভকারী এবং ইন্দ্রিয় নিরোধকারী মহাযোগী। জড়ত্বপ্রাপ্ত অচলায়তনের স্থবিরদের মধ্যে তিনি সর্বাধিক স্থবির। মহাপঞক সজীব, সরস জীবনের বিরুদ্ধে নীরস, শুষ্ক মহাকুঠার। তিনি আচারবিলাসিতার প্রতীক। তাঁর মধ্যে মহাতেজ, নিষ্ঠা, ঐতিহ্যের প্রতি একাগ্রতা, রুদ্র তপস্বীর সার্বিক গুণ বর্তমান। তিনি জ্ঞানমার্গের প্রতীক ও শাস্ত্রপাঠ ও শাস্ত্রবিধি পালনে বিশেষ যত্নবান। প্রাণবিকাশের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে সমস্ত অচলায়তনে অচলতার সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মন-প্রাণ-হৃদয়-চিত্ত এতটাই কঠিন যে পারিপার্শ্বিক জগতের রূপরসগন্ধবর্ণ কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করে না। শাস্ত্রীয় আচার-নীতি-নিয়ম-বিধি; এসবের বাইরে তিনি জানেন না, বোঝেনও না। তাঁর বিশ্বাস শাস্ত্ৰ নির্দেশিত বিশেষ বিশেষ মন্ত্রপাঠ করলেই বিশেষ ফল পাওয়া যায়। তাই তিনি জ্ঞানবাদী মহাপ শুকমাত্র। শাস্ত্রীবিধি-বিধানে অন্য সবার জ্ঞান যেখানে পৌঁছাতে পারে না, মহাপ্যক সেখানে অনায়াসে পৌঁছে যান। মহাতামস ব্রত সাধন সম্পর্কে উপাধ্যায়মশায় তাই বলেন— “যদি কারো জানা থাকে তো সে ওঁর।”

মহাপঞ্চক নিজের প্রতি গভীর বিশ্বাস রাখতেন। মন্ত্র-তন্ত্র, আচার-অনুষ্ঠান, জপতপ, দৈবজ্ঞের গণনা, শাস্ত্রীয় বিধিবিধান জনিত পুথিপাঠ কোনোটাতেই কোনো ফাঁকির প্রশ্ন তাঁর কাছে ছিল না। শৃঙ্খলাপরায়ণ মহাপকের সনাতন ধর্মের প্রতি অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা। তাঁর কাছে শাস্ত্র নির্দেশিত ধর্মই বড়ো। তাই তো আচার্যদের সম্পর্কে তাঁর কণ্ঠে শোনা যায়—“উনি আজ সুভদ্রকে বাঁচাতে গিয়ে সনাতন ধর্মকে বিনাশ করবেন। এ কীরকম বুদ্ধিবিকার ওঁর ঘটল। এ অবস্থায় এঁকে আচার্য বলে গণ্য করাই চলে না।”

মহাপঞ্চক নিষ্ঠায় সংযমী ও জেদী। তাই যোদ্ধার বেশে দাদাঠাকুর তথা গুরুকে দেখে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন "তুমি গুরু? তবে শত্ৰুবেশে কেন?” এই প্রশ্নের সঙ্গে মহাপঞ্চক জানিয়েও দেন—“আমি তোমাকে প্রণাম করব না।” তবে যাই হোক মহাপঞ্চকের দু-একটি আচরণ আমাদের ঠিক নাও মনে হতে পারে। উপাচার্যকে আচার্য হওয়ার লোভ দেখানো তাঁর মতন ইন্দ্রিয় নিরোধকারী মহাযোগীর কাছে অপ্রত্যাশিত। মহাপাক চরিত্রের প্রধানতম দিকগুলি হল তিনি মহাজ্ঞানী, নিজের প্রতি তাঁর অবিচলিত বিশ্বাস, তাঁর চরিত্রে ধর্মই। বড়ো, তিনি দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী, দৈবজ্ঞে ও ঈপারে কঠোর ভক্তি ঐতিহ্যানুসরণে কঠোর দূতা মানসিকতা এবং অসীম ধৈর্যশীলতা। সব শেষে বলব মহাপঞ্জক চরিত্রটিই রবীন্দ্রনাথের 'গুরু' নাটকের ভাবসত্যকে ভুলে। ধরেছেন। তিনি নাটকটির মূল ধারক ও বাহক। ড. সুকুমার সেনের মতে মহাপঞ্চক চরিত্রটি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট নির্দিষ্ট জ্ঞান সাধনার প্রতীক হিসেবে সুসংহত, সর্বাপেক্ষা সুমিত এবং সর্বাধিক শিল্পোজ্জ্বল।

নাটকের ঘটনা বা ক্রিয়ার উত্থান-পতন চরিত্রের মাধ্যমেই বিবর্তিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিণতি পায়। নাটকের action এই চরিত্রের ওপরই নির্ভরশীল। আর এই চরিত্র দুরকম— প্রধান ও অপ্রধান চরিত্র | প্রধান চরিত্রের সুখ দুঃখ, আনন্দ-বেদনাই কাহিনির মূল হলেও সেই মূলকেই পরিণতির দিকে নিয়ে যায় অপ্রধান চরিত্রগুলি। পঞ্চক তেমনি। একটি অপ্রধান চরিত্র কিন্তু তারই কার্যকলাপ 'গুরু' নাটককে সার্থক গতি দিয়েছে।

'গুরু' নাটকের অচলায়তন নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পঞ্চক এক মূর্তিমান বিদ্রোহ। মন্ত্রতন্ত্র, আচার-আচরণে, আচমন সূত্রবৃত্তিতে তার বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। যাদের আস্থা আছে তাদের সঙ্গে তার তর্ক বাধে। বালক সুভদ্র উত্তরদিকের জানালা খুলে শঙ্কিত হলে পণক তাকে সাহস দেয়। তার যাতে শাস্তি না হয় তার জন্য সচেষ্ট হয়। মহাময়ূরী দেবীকে সে ভয় পায় না। মহাময়ূরী দেবীর পুজোর দিন “কাঁসার থালায় ইঁদুরের গর্তের মাটি রেখে তার ওপর পাঁচটা শেয়ালকাঁটার পাতা আর তিনটে মাষকলাই সাজিয়ে আঠারোবার ফুঁ দিয়ে সে পরীক্ষা করতে চেয়েছিল সত্যি সত্যিই তাকে সাপে কামড়ায় কি না। অচলায়তনের ধারণা যে মিথ্যে তা সে প্রমাণ করে দিয়েছিল।

পাক অচলায়তনের রীতি-নিয়মের ধার ধারে না। উপাচার্য তার সম্বন্ধে বলেন- “ এমন ছেলে আমাদের আয়তনে কী করে সম্ভব হল। শিশুকাল থেকেই ওর ভিতর এমন একটা প্রবল অনিয়ম আছে, তাকে কিছুতেই দমন করা গেল না।” পাক প্রাণের প্রতিভূ। অন্যেরা যেখানে মন্ত্র ও আচরণের দাসত্ব করে পঞ্চক দেখাতে আপন ইচ্ছাশক্তির জয় ঘোষণা করেছে। তাকে দেশেই আচার্যকে পর্যন্ত তাই বলতে শোনা যায়—“তোমাকে যখন দেখি আমি মুক্তিকে যেন চোখে দেখতে পাই। এত চাপেও যখন দেখলুম তোমার মধ্যে প্রাণ কিছুতেই মরতে চায় না তখনই আমি বুঝতে পারলুম মানুষের মন মন্ত্রের চেয়ে সত্য, হাজার বছরের অতি প্রাচীন আচারের চেয়ে সত্য।"

পঞ্চক আশ্চর্য প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ। সে গান মুখস্থ করে কিন্তু মন্ত্র তার মুখস্থ হয় না। সে সুদূরের পিয়াসী—বন্ধ মিথ্যা সংস্কারের মায়াজালে পঞ্চকের যুক্তিবাদী মন আটকে থাকে না। সীমার মাঝে অসীমের সাধনাই তার উদ্দেশ্য। সে জেনেছে—মন্ত্রতন্ত্র, ধর্মীয় শাস্ত্রের অমানবিক আচার-অনুষ্ঠান নিরর্থক, সে শাশ্বত সত্যের সন্ধানী। তার মন-প্রাণ-চিত্ত মুক্ত প্রাণের স্পন্দনে শুদ্ধিপবিত্র। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য পঞ্চক সম্পর্কে বলেন—“রবীন্দ্রনাথ পশুকের মূর্খতাকে ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করিয়া তাকে রসিক রূপে আঁকিয়াছেন। ... সে কৃত্রিম বিদ্যার ভার বহন করিতে চাহে নাই।"

পঞ্চক চরিত্র অনুধাবন করে আমরা বুঝতে পারি যে, শিক্ষা মানুষকে পূর্ণ বিকশিত হতে দেয় না, পূর্ণ বিকশিত হতে বাধা দেয়, সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ করতে চায় তাকে সে মানতে চায়নি। আসলে পঞ্চক হল বিশ্বগ্রাসী। পককে রবীন্দ্রনাথ রসিক রূপে এঁকেছেন। সে সকল রসের রঙ্গী। পাথর ঘেরা অচলায়তনে পথকে উন্মুক্ততার প্রতীক, প্রাণের স্পন্দন ও প্রতিমূর্তি। পঞ্চক বিদ্রোহী, তার বিদ্রোহ মানবিকতা-বিরোধী প্রথা, সংস্কার, স্থবিরতা ও সব রকমের অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে। প্রমথনাথ বিশী তাই যথার্থই বলেন—“পক সীমার গণ্ডিতে আবদ্ধ মানবাত্মার প্রতীক। তাহার চিত্র। অসীমের জন্য উৎকণ্ঠিত।

দাদাঠাকুরই অচলায়তনের গুরু। তাঁর নামেই নাটকের নামকরণ হলেও নাটকে তিনি দাদাঠাকুর হিসেবে উপস্থিত। জড়ত্বপ্রাপ্ত অচলায়তনের পাথরের বুক সজীবতা আনার জন্যই দাদাঠাকুরের আবির্ভাব। তাঁকে তিনরূপে আমরা দেখি—তিনি অচলায়তনের গুরু, যূনকদের কাছে দাদাঠাকুর আর দর্ভক পল্লিতে গোঁসাই ঠাকুর।

দাদাঠাকুর জীবনবিমুখ শাস্ত্রাচারের বিরোধী। পুস্তক পুথিপাঠে তাঁর প্রবল অন্যস্থা। তিনি জ্ঞান-প্রেম-কর্ম ও আনন্দের সুষ্ঠু সমন্বয় করতে চান। একদা তিনি বিদ্যাচর্চার জন্য হয়। যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন আদর্শ ও লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। যুনকদের নিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানকেই তিনি ধ্বংস করে নীলাকাশের সঙ্গে মিলিয়ে দেন। তাই তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় “যে-চক্র কেবল অভ্যাসের চক্র, যা কোনো জায়গাতেই নিয়ে যায় না, কেবল নিজের মধ্যেই ঘুরিয়ে মারে, তার থেকেই বের করে সোজা রাস্তায় বিশ্বের সকল যাত্রীর সঙ্গে দাঁড় করিয়ে দেবার জন্যেই আমি এসেছি।" স্থূল আচার-আচনা প্রথার দাসত্ব ঘোচাতেই তাঁর আগমন। পদকের উদ্দেশ্যে তাই তিনি অনায়াসে অবলীলায় বলেন- “নিজের নাসাগ্রভাগের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে থাকবার দিন এখন চিরকালের মতো ঘুচিয়ে দিয়েছি।" তিনি চিত্তের সংকীর্ণতা ও মানসিক জড়তাকে আঘাত করে বিশ্ববিস্তৃত অচলায়তনবাসীদের সার্বিকভাবে সচেতন করে তোলেন। অচলায়তনের দমবন্ধ হওয়া ঔষ পরিবেশে যুদ্ধের ঝোড়ো হাওয়া বইয়ো দেন। মোহগ্রস্ত মহাপত্যকের দল সম্বিৎ ফিরে পায়-অচলায়তনে প্রাণের প্রতিষ্ঠা হয়।

দাদাঠাকুর প্রতিবাদপ্রবণ : গুরু বিদ্রোহী। তাঁর বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য হল প্রয়োজনে তিনি যুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে পিছপা হন না। সংঘাত-সংঘর্ষের পথ বেছে নেন। সংকীর্ণতার প্রাচীরকে ধূলোয় মিশিয়ে দেন। তবে তিনি শুধু ধ্বংস করেন না, দ্বিগুণ উৎসাহে তাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেন। এ কাজে খুনকদের মতো অস্পৃশ্য, দেখদেরকেও সঙ্গী করে। নেন। জ্ঞানমার্গের সঙ্গে কর্ম ও ভক্তিমার্গের যোগসাধন করে বিশ্বজুড়ে ত্রিমার্গ সাধনার মুক্তধারা বইয়ে দিতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। প্রতিবাদী গুরু কেবল ভাঙেন না গড়েও তোলেন। জরাজীর্ণ পুরাতনের বিনাশ সাধন করেই তিনি ক্ষান্ত হন না, নতুনকেও আহ্বান জানান। স্থবিরতা তাকে কখনও গ্রাস করে না। করবেও না—তাই তার কণ্ঠে শোনা যায় না যদি কুলোয় তাহলে দেয়াল আবার আর একদিন ভাঙতেই হবে।” তাই দাদাঠাকুর তথ্য গুরু “সদা গতিশীল, জীবনরসের রসিক ।"

নাট্যকার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ দাদাঠাকুর তথা গুরুর স্বরূপ উদ্ঘাটন করে মন্তব্য করেছেন - ... গুরু কি ভাঙিবার কথাতেই শেষ করিয়াছেন। গড়িবার কথা বলেন নাই। পঞ্চক যখন তাড়াতাড়ি বন্ধন ছাড়াইয়া উধাও হইয়া যাইতে চাহিয়াছিল তখন কি তিনি বলেন নাই, না, তা যাইতে পারিবে না যেখানে ভাঙা হইল এইখানেই আবার প্রশস্ত করিয়া গড়িতে হইবে সুতরাং আমরা বলতে পারি গুরুর আঘাত নষ্ট বা ধ্বংস করবার জন্য নয়, বড়ো করবার জন্যেই। তাঁর উদ্দেশ্য ত্যাগ করা নয়, সার্থক করা। আর এখানেই গুরুর বিশেষত্ব, তাঁর সার্বিক ক্রিয়াকর্ম প্রতিবাদ নতুন সৃষ্টির মহিমায় মহিমান্বিত। তিনি আলোর স্রোতে পালতোলা হাজার প্রজাপতি।

'গুরু' তথা 'অচলায়তন' নাটকের অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল- আচার্যদের। তাঁর প্রকৃত নাম অধীনপুণ্য। অচলায়তন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনিই প্রথম আচার্য হিসেবে গুরুর দ্বারা নিযুক্ত হয়েছিলেন। অচলায়তন ছিল— জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তিমার্গের পীঠস্থান। এখানে ত্রিমার্গ সাধনার যে কথা বলা ছিল তারই জ্ঞানমার্গের প্রধান হলেন আচার্যদের অদীনপুণ্য। দীর্ঘদিন কাজ করার পর তাঁর মনে এক দোলাচল মানসিকতা আসে। তিনি উপলব্ধি করতে থাকেন এখানকার অন্তঃসারশূন্য। পাবনার বিষয়। আবার মনের দ্বন্দ্ব হেতু আয়তনের মিথ্যে সাধনার দিকটিকে সর্বসমক্ষে আনতেও পারছিলেন না। গুরু আসবার খবর পেয়ে তাই তাঁর মন অধীর হয়ে ওঠে। উপাচার্য সুতসোমকে তাই বলেন-“আজ গুরু আসবেন শুনে হঠাৎ মনটা থমকে দাঁড়াল। আজ নিজেকে জিজ্ঞাসা করলুম, ওরে পণ্ডিত, তোর সব শাস্ত্ৰই তো পড়া হল। সব ব্রতই তো পালন করলি, এখন বল মূর্খ কী পেয়েছিস? কিছু না, কিছু না মৃতসোম।” আর অদ্ভুতভাবে লক্ষ করা যায় তাঁর সমগ্র সাধনা ব্যর্থ। প্রাজেনেও তিনি তা পরিবর্তন করতে পারেননি।

আচার্যের উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত জ্ঞানের সাধনা কিন্তু অচলায়তনের ঘূর্ণাবর্তে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তিনি প্রথম গুরুর। ভাছ থেকে দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষা আরম্ভ করেন, কিন্তু গুরু যাওয়ার পর তিনি পুথি বাড়াতে থাকেন ফলে দিন যত যায় শিক্ষা ততই সহীন, প্রাণহীন হতে থাকে। পুথির প্রাধান্যই আজ সাধনাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। তিনি এখন মনেপ্রাণে গুরুকেই কামনা করছেন। আচার্যের তাই আহ্বান—“এবার নিয়ে এসো সেই বাণী, গুরু নিয়ে এসো হৃদয়ের বাণী। প্রাণকে প্রাণ দিয়ে জাগিয়ে দিয়ে যাও আচার্য এখন প্রাণের প্রতীক গুরুকে আহবান করে প্রাণহীন জীবনে প্রাণ-রসের সম্পার ঘটাতে চেয়েছেন।আচার্য ব্যক্তিগতভাবে সংস্কারমুক্ত পুরুষ। আবার আয়তনের প্রধান হিসেবে তিনি সেখানকার সংস্কার ও দায়িত্বের দ্বারা নীড়িত। তাই সেই আয়তন থেকে তিনি যখন নির্বাসিত হলেন তখন যেন তিনি শাশ্বত মুক্তির স্বাদ পেয়েছেন। তাকে পরম শান্তিতে বলতে শোনা যায়- "সার্থক হল আমার নির্বাসন ।" অবশ্য এই জীবনমুক্তির স্বাদ তিনি পদকের মধ্য দিয়ে আয়তনে থেকেই যেন পেতে শুরু করেছিলেন। পঞ্চক সম্ভকপল্লিতে বা ঘুনকদের সঙ্গে মিশছে জেনেও তাই তিনি তাঁকে বাধা দিতে পারেননি, বরং সঙ্গেই প্রশ্রয় দিয়েছেন। আচার্যের পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল না পড়ুক তা করে দেখিয়েছে। আর আচার্য ওপদকের মধ্য দিয়ে তাঁর মন-প্রাণ-আত্মার ক্ষুধা মিটিয়ে গেছেন। এখানেই তিনি পলককে বলেছেন— তোমাকে যখন দেখি, আমি মুক্তিকে যেন দেখতে পাই। এত চাপেও যখন দেখলুম তোমার প্রাণ কিছুতেই মরতে চাষ না. তখনই আমি বুঝতে পারলুম মানুষের মন মন্ত্রের চেয়ে সত্য, হাজার বছরের অতি প্রাচীন আচার্যের চেয়ে সত্য ।" দম্ভকদের সমবেত গানে জীবন মুক্তির শাশ্বত স্বাদ পেয়ে সুভদ্রের মুখে পাপের কথা শুনে তাঁর উপলব্ধি হয়- "হাজার বছরের নিষ্ঠুর বাহু অতটুকু শিশুর মনকেও পাথরের মুঠোয় চেপে ধরেছে। একেবারে পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়ে দিয়েছে রে। কখন সময় পেল সে সে কি গর্ভের মধ্যেও কাজ করে?" আচার্যের কাছে তাই শাস্ত্রের নির্দেশের চেয়ে প্রাণের মূলাই বেশি। সুভদ্রের প্রাণের মূল্য দিতে তিনি তাই প্রথম নিয়ম ভাঙেন। গুরুর পথে আচার্য মুক্তি পেলেন। একই সলো মনের দোলাচলতা নিয়ে শেষ পর্যন্ত আচার্য রবীন্দ্র মানসিকতার ধারক ও বাহক চরিত্র হয়ে উঠেছেন।

উপাচার্য মৃতসোম 'গুরু' নাটকের অপ্রধান চরিত্র হলেও নাট্যকার সম্মানের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে চরিত্রটি সৃষ্টি করেছেন। নাটকের স্বল্পতার মধ্যেও তাঁর উপস্থিতি দর্শক ও পাঠকদের শ্রদ্ধাটুকু টেনে নেয়া। আয়তনের প্রচলিত। নিয়মনীতির প্রতি তাঁর অবিচলিত শ্রদ্ধা। আচার্যের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা। সর্বোপরি তাঁর নির্লোভ দৃঢ় মানসিকতা সকলকে সমানভাবে আকর্ষণ করে।

আচার্য অদীনপুণ্যের সন্ধ্যে উপাচার্য এই আয়তনে আসেন। দীর্ঘকাল থাকার সুবাদে এখানকার যাবতীয় ক্রিয়াকর্মের সঙ্গে তিনি নিজেকে গভীরভাবে জড়িয়ে নেন। আচার্যের প্রতি তিনি গভীর অনুরাগী ছিলেন ফলে আয়তনের কোনো আচার-আচরণ, মন্ত্র-তন্ত্র এবং নিয়মনিষ্ঠা সম্পর্কে তাঁর কোনো সংশয় কোনো কালে ছিল না। কোনো অবস্থায় তাঁর বিশ্বাসের দৃঢ় ভিত টলেনি। এমনকি আচার্যের মনে সংশয়ের মেঘ জমলেও উপাচার্যের মনে কোনো দ্বিধা আসেনি শান্তির সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটেনি। এ ব্যাপারে আচার্যকে তিনি নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন আমার তো এক মুহূর্তের জন্য অশান্তি নেই, কিছু মাত্র না। আমার অহোরাত্র একেবারে নিয়মে বাঁধা। সে হাজার বছরের বাধন ক্রমেই সে পাথরের মতো, বজ্রের মতো, শক্ত হয়ে জমে গেছে এক মুহূর্তের জন্যেও কিছুই ভাবতে হয় না। এর চেয়ে আর কী শাস্তি হতে পারে।"

অচলায়তনের জগৎ বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই ব্যবস্থাকে উপাচার্য যথার্থ বলে মনে করেন। তিনি বিশ্বাস করেন—বাইরের আলো-হাওয়া, আয়তনিকের চিত্ত-চালা ঘটায়, মানসিক একাগ্রতায় বিঘ্নতা আগে আয়তনের শাশ্বত নিয়মে অন্তরায় সৃষ্টি করে। সমস্ত নিয়মের অন্ধ অনুরাগী হওয়ায় সুভদ্রকে তিনি যেমন মহাপত্যকের হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করেন না, তেমনি পণ্যকের সৃষ্টিছাড়া কর্ম সম্পর্কেও তিনি নালিশ জানান। বলেন- "পাথরের মধ্যে কি মাস বেরোয়। এমন ছেলে আমাদের আয়তনে কী করে সম্ভব হল। শিশুকাল থেকেই ওর ভিতর এমন একটা প্রবল অনিয়ন আছে, তাকে কিছুতেই দমন করা গেল না। ওই বালককে আমার ভয় হয়। ওই আমাদের দুর্লক্ষণ

উপাচার্য আচার্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ও অনুরাগী হলেও আচার্যের সবকিছুকে মন থেকে মেনে নিতে পারেননি।। আবার জোরালো বিরোধিতাও তিনি করেননি। সুভদ্রকে নিয়ে আচার্যের সিদ্ধান্তকে তিনি যেমন মানেননি তেমনি মহাপঞ্চক আচার্যকে পদচ্যুত করতে উদ্যত হলে বিচলিত কণ্ঠে বলেন "যিনি একবার আচার্য হয়েছেন তাঁকে কি আমাদের ইচ্ছামত পদচ্যুত করতে পারি।" আবার তাকে আচার্য পদের অধিকার দিতে চাইলে উপাচার্য বলেন- “মহাপনাক। সেই প্রলোভনে
আমি আচার্যদেবের বিরুদ্ধে দাঁড়াব। একথা বলবার জন্য তুমি যে মুখ খুলেছে সে কি উত্তরদিকের জানালা খোলার চেয়েও কম পাপ।" এই কথার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন উপাচার্যের নির্লোভ মানসিকতার পরিচয় পাই, তেমনি আচার্যদেবের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ পেয়েছে। উপাচার্য চরিত্রটির নির্লোভ মানসিকতা সবাইকে মুগ্ধ করে। আয়তনের নিষ্ঠায় নিষ্ঠাবান উপাচার্যের মনের গভীরে সর্বদা মুক্ত প্রাণের সরস আনন্দ ছিল। দর্ভক পল্লিতে আচার্যকে তাই বলতে শোনা যায়—“তুমি চলে আসা মাত্র আয়তন যে কী কঠিন হয়ে উঠল কী শুকিয়ে গেল যে আমি বলতে পারিনে।” এমনকি আচার্যের আলিকান চেয়ে বলেছেন—“তোমার আলিশান যদি অশুচি হয় তবে সেই অশুচিতার পুণাদীক্ষাই আমাকে দাও।" উপাচার্য তার স্বপ্ন উপস্থিতিতে তাই দর্শক পাঠক চিত্তে স্থায়ী।