অধ্যায়-13, বিশ্বের ভাষা ও ভাষা পরিবার

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষাগুলির জন্ম হয়েছে।

আনুমানিক ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশ ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর আদি বাসস্থান।

দশটি প্রাচীন শাখার জন্ম হয় ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী থেকে।

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর প্রাচীন শাখাগুলির মধ্যে ইন্দো-ইরানীয় শাখাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল ইন্দো-ইরানীয় শাখাটি।

আঞ্চলিক পার্থক্যবৃদ্ধির কারণে ইন্দো-ইউরোপীয় শাখাটি প্রাচীন শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

আঞ্চলিক পার্থক্যবৃদ্ধির কারণে ইন্দো-ইউরোপীয় শাখাটি প্রাচীন শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

আফ্রিকার উত্তরাংশ এবং এশিয়ার পশ্চিমের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সেমীয়-হামীয় ভাষাবংশের ভাষাগুলি

প্রচলিত।

ফিরো-উত্তীয় ভাষাবংশের ভাষাগুলি হল ফিনল্যান্ড-এর ভাষা ফিনীয় (Fennish) এবং হাজোরির ভাষা হাফেজারীয়। • এদের একত্রে "উরাল' নামে অভিহিত করা হয়।

জীবিত ভাষার মতো এ ভাষার বিকাশ নেই—এটিই এর সীমাবদ্ধতা।

এই সীমাবদ্ধতা এড়ানোর জন্যে ড. জামেনহয় একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্রীয় সমিতি' গঠন করেন, বাজ পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তনসাধন করতে পারবেন।

জাতিতে জাতিতে ভাষাগত ব্যবধান দূর করার জন্যে ভাষাতাত্ত্বিকেরা বিভিন্ন সময়ে যে-ভাষা গড়ে তুলেছেন। তাকে বিশ্বভাষা বলে। এই ভাষা আন্তর্জাতিক ভাববিনিময়ের জন্যে সর্বাধিক সহজ ভাষা। এ ভাষার গঠন অতিসহজ, ধ্বনিও সরল। এর ব্যাকরণও সহজ ও জটিলতামুক্ত। যেমন পুরুষ ও রূপভেদ হয় না। যেমন— My dormas noktE — আমি রাত্রে ঘুমোই। Li dormas noktE — সে রাত্রে ঘুমায়।

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের অন্তর্গত ভাষাগুলির দুটি ধারা। একটি প্রাচীন, অন্যটি আধুনিক সমৃদ্ধ ভাষা। প্রাচীন ভাষার মধ্যে পড়ে সংস্কৃত, গ্রিক, লাতিন, গথিক আর আধুনিক সমৃদ্ধ ভাষা হল ফারসি, বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, জর্মন ইত্যাদি।

পৃথিবীর ভাষাকে বারোটি ভাষা বংশে বর্গীকৃত করা হয়েছে।

পৃথিবীর প্রথম ভাষাবংশগুলির নাম হল । ইন্দো-ইউরোপীয় দেশীয়-হামীয়: বান্টু ফিগ্রো-উত্তীয় তুর্ক-মোঙ্গল-মঞ্জু ; ককেশীয়; দ্রাবিড় : অস্ট্রিক ; ভোটচিনীয় ; উত্তর-পূর্ব সীমান্তীয় : এস্কিমো এবং আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের ভাষা।

প্রথম দার্শনিক দেকার্ত ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বভাষা তৈরির পরিকল্পনা

কয়েকটি বিশ্বভাষার নাম হল – এসপেরান্তো, ইদো, ইডিয়ম, নি, এন্টিডো,

এসপেরান্তো সর্বাধিক জনপ্রিয় ও সার্থক বিশ্বভাষা।

• পোল্যান্ড-এর অধিবাসী ড. জ্যামেনহফ প্রথম ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে এসপেরান্তো বিষয়ে তার  পরিকল্পনা  প্রকাশ করেন।

ভাষাবিদরা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাকে আনুমানিক বারোটি ভাষা বংশে অঙ্গীভূত করেছেন। সেগুলির নাম হল

(ক) ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-European) (Semito Hamitic)

(গ) সেমীয়-হামীয় (গ) বান্টু (Bantu)

(ঘ) ফিন্নো-উগ্রীয় (Finno-Ugrian)

(৬) তুর্ক-মোঙ্গল-মাঞ্জু (Turko Mongal-Manchu )

(চ) ককেশীয় (Caucasian)

(ছ) দ্রাবিড় (Dravidian)

(জ) অস্ট্রিক (Austric)

(ঝ) ভোট-চিনীয় (Tibeto- Chinese) (ঞ) উত্তর-পূর্ব সীমান্তীয় (Hyperborian)

(ট) এস্কিমো (Esquimo)

(ঠ) আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের ভাষা।

পৃথিবীর মোট ভাষার সংখ্যা আনুমানিক চার হাজার। এই চার হাজার ভাষাকে তাদের মূলগত সাদৃশ্যের তে বারোটি প্রধান ভাষাবংশে বিভক্ত করেছেন ভাষাবিদরা। এগুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

ইন্দো-ইউরোপীয় : পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাবংশের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এই ভাষাবংশ। মূলত মধ্য ইউরোপ দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশ এই ভাষাবংশের আদি বাসস্থান। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী মূল আর্যজাতি সময়ে ভারতবর্ষ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তা থেকে দশটি প্রাচীন শাখার জন্ম হয়।

ইন্দো-ইউরোপীয় বংশের সমৃদ্ধ প্রাচীন ভাষা হল সংস্কৃত, গ্রিক, লাতিন, গথিক। আর আধুনিক সমৃদ্ধ ভাষা হল ফারসি, বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, জর্মন ইত্যাদি।

• সেমীয়-হামীয় : সেমীয়-হামীয় ভাষাবংশের দুটি প্রধান উপশাখা সেমীয় এবং হামীয়। সেমীয় উপশাখার দুটি উল্লেখযোগ্য ভাষা হল হিব্রু এবং আরবি।। হামীয় শাখার একমাত্র ভাষা মিশরীয়। বর্তমানে এটি লুপ্ত। আফ্রিকার উত্তরাংশ এবং এশিয়া-মহাদেশের পশ্চিমের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এই ভাষাবংশের বিভিন্ন ভাষারূপ প্রচলিত।

● বান্টু : বান্টু বংশের ভাষাগুলি প্রধানত মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় প্রচলিত। এই বংশের প্রধান ভাষা হল সহিলি,কঙ্গো, কাফির প্রভৃতি।

• ফিল্লো উগ্ৰীয় : এই বংশের ভাষাগুলির মধ্যে ফিনল্যান্ড-এর ভাষা ‘ফিল্মীয় এবং হাঙ্গেরির ভাষা হাঙ্গেরীয়।

• তুর্ক-মোঙ্গল-মাঞ্জু : এই ভাষাবংশের তিনটি শাখা। সেগুলির নাম তুর্ক-তাতার, মোজাল ও মাঞ্জু। এই ভাষাগোষ্ঠী একসলো 'আলতাই' ভাষাগোষ্ঠী নামেও পরিচিত। প্রধান ভাষা ওসমানি। মোঙ্গল এবং মাজু ভাষার বিশেষ ব্যাপকতা নেই।

• ককেশীয় : কৃষ্ণসাগর এবং কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী ভূভাগে প্রচলিত এই ভাষাগোষ্ঠী। এর দুটি শাখা, উত্তর ককেশীয় এবং দক্ষিণ ককেশীয়। দক্ষিণ ককেশীয় শাখার জর্জীয় ভাষা একমাত্র উন্নত ও উল্লেখযোগ্য ভাষা।

· দ্রাবিড় : প্রধানত দক্ষিণ ভারতেই প্রচলিত। তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড় প্রধান ভাষা। অপ্রধান ভাষাগুলি  হল—টুলু, ব্রাহুই, গোল্ড, ওঁরাও, মালতো, কুরুখ ইত্যাদি।

• অস্ট্রিক : দুটি শাখা। একটি অস্ট্রো-এশিয়াটিক অন্যটি অস্ট্রোনেশীয়। অস্ট্রো-এশিয়াটিক শাখার প্রধান ভাষা হল—জাবর, সাঁওতালি, খাসি, মুন্ডারি, নিকোবরি।

• ডোটচিনীয় : এই বংশের তিনটি শাখা—চিনীয়, থাই এবং ভোটবর্মি। চিনীয় শাখার প্রধান ভাষা চিনা। থাই শাখার প্রধান ভাষা শ্যামি আর ভোটবর্মি শাখার অন্তর্ভুক্ত ভাষাগুলি হল— তিব্বতি, বর্মি, বোডো এবং নাগা।

• উত্তর-পূর্ব সীমান্তীয় : প্রধান ভাষা চুকটি, যা এশিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে প্রচলিত ।

● এস্কিমো: প্রধান ভাষা এস্কিমো। উত্তর মেরুর সীমান্ত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড থেকে অ্যালেউশিয়ান পর্যন্ত এই ভাষা প্রচলিত।

●  আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের ভাষা : আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের ভাষাবংশের সংখ্যা আটটি।

আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের ভাষাবংশের সংখ্যা আটটি ।

• সেগুলি হল—

১. আলগোষ্কিয়ান
২. আত্মাবাস্তান
৩. ইরোকোইয়া
8. মুস্কোজিয়ান
৫. সিওউয়ান
৬. পিমান
৭. কোশোনিয়ান
৮. নাহয়াটলান্ট

এগুলির মধ্যে নাইয়াটলান্ট বংশের ভাষা আজটেক একদা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে কিঞ্চিৎ সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ওপরের ভাষাবংশ ছাড়া এমন কিছু ভাষা আছে, যেগুলিকে অন্য কোনো ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত করা যায় না। ফলে সেই ভাষাকে কোনো বংশে শ্রেণিবন্ধ করা যায়নি। এইরকম ভাষাকে অ-শ্রেণিবন্ধ ভাষা (Unclassified Lan guage) বলে। সেই ভাষাগুলি হল প্রাচীন ইটালির এটুস্কান ভাষা।

এসপেরান্তো ভাষার শব্দভাণ্ডার অনেক কম। এই ভাষায় ২৪টি ব্যঞ্জন এবং ৫টি স্বরধ্বনি ছিল। ৯২১টি =মূল বা root-এর সঙ্গে বিভিন্ন প্রত্যয় অথবা চিহ্ন যোগ করে নানা ধরনের শব্দ তৈরি হয়। এরকম শব্দের সংখ্যা ০০-এরও বেশি।

প্রসঙ্গত, এসপেরান্তো ভাষায় বিভিন্ন শব্দ তৈরি করার কিছু নিয়মও রয়েছে। যেমন 'O' যোগে বিশেষ্যপদ, 'a' যোগে শযণ, 'e' যোগে ক্রিয়াবিশেষণ, 'j' যোগে বহুবচন পদ সৃষ্টি করা হয়। আবার ক্রিয়ার কাল বোঝাতে বর্তমান কালে অতীতকালে 'I', ভবিষ্যৎকালে 'O' এবং অনুজ্ঞা বোঝাতে 'U' যোগ করা হয়।

এই ভাষার সীমাবদ্ধতা হল, এর কোনো বিকাশ নেই।

■ বিশ্বভাষা ব্যবহারের সুবিধা নানা রকম।

(ক) জাতিতে জাতিতে ব্যবধান দূর করে।

(খ) বানান খুবই সরল এবং উচ্চারণ অনুসারী। (গ) শব্দভাণ্ডার অনেক কম।

(ঘ) ব্যাকরণের ক্ষেত্রেও জটিলতা তেমন নেই।