অধ্যায়-14, বাংলা ভাষার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ

অপর শাখাটি ভারতবর্ষে প্রবেশ করে ।

বিবর্তনের ধারা অনুসারে ভারতীয় আর্যভাষাকে প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করা যায় ।

ঋগবেদ সংহিতা প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নিদর্শন।

ভারতীয় আর্যভাষার তিনটি যুগের নাম হল যথাক্রমে— • প্রাচীন-ভারতীয় আর্য (ওল্ড-ইন্দো-এরিয়ান) মধ্য ভারতীয় আর্য (মিল ইন্দো-এরিয়ান) নব্য ভারতীয় আর্য (নিউ/ মডার্ন ইন্দো-এরিয়ান)।

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার  সময়সীমা

প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার সময় পরিসর আনুমানিক ৯০০ বছর।

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টাব্দ ৯০০ মধ্যভারতীয় আর্যভাষার সময়কাল।

অশোকের শিলালিপিতে প্রধানত মধ্য-ভারতীয় আর্যভাষার নিদর্শন পাওয়া যায়।

সংস্কৃত নাটকে ব্যবহৃত প্রাকৃত ভাষায় এবং বৌদ্ধ গ্রন্থে ব্যবহৃত পালি মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার নিদর্শন।

মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার সময়কাল আনুমানিক ১৫০০ বছর।

আনুমানিক খ্রিস্টাব্দ ৯০০ থেকে নব্যভারতীয় আর্যভাষার সূচককাল ধরা হয়।

নব্যভারতীয় আর্যভাষা হল—বাংলা, হিন্দি, মারাঠি।

প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার দুটি রূপ ছিল। রূপদুটি হল—(ক) সাহিত্যিক এবং (খ) কথা।।

প্রাচীন ভারতীয় আর্যের কথ্যরূপের চারটি আঞ্চলিক উপভাষা ছিল।

প্রাচ্য, উদীচ্য, মধ্যদেশীয় এবং দাক্ষিণাত্য—এই চারটি হল প্রাচীন ভারতীয় আর্যের কথ্যরূপের আঞ্চলিক উপভাষা।

এই কথ্য উপভাষাগুলি মধ্য-ভারতীয় আর্যভাষার প্রথম স্তরে চারটি কথা প্রাকৃতের জন্ম দেয়।

প্রাচ্য প্রাকৃত, প্রাচ্য-মধ্যা প্রাকৃত, উত্তর-পশ্চিমা প্রাকৃত, পশ্চিমা বা দক্ষিণ-পশ্চিমা প্রাকৃত হল মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার প্রথম স্তরে উৎপন্ন হওয়া চারটি কথা প্রাকৃত।

বাংলা ভাষার অব্যবহিত পূর্ববর্তী স্তরটির নাম মাগধী অপভ্রংশ অবহট্ঠ।

বাংলা ভাষার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ । পৃথিবীর প্রায় চারহাজার ভাষাকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের পদ্ধতির সাহায্যে কয়েকটি ভাষাবংশে বর্গীকৃত করা হয়েছে। এগুলি হল- ১। ইন্দো-ইউরোপীয়, ২। সেমীয়-হামীয়, ৩। বান্টু, ৪। ফিন্নো-উত্তীয়, ৫। তুর্ক-মোঙ্গল-মাদু, ৬। ককেশীয়, ৭। দ্রাবিড়, ৮। অস্ট্রিক, ৯। ভোট-চিনীয়, ১০। উত্তর-পূর্ব সীমান্তীয়, ১১। এস্কিমো, ১২। আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের ভাষা।

এই ভাষাবংশগুলির মধ্যে শুধু ভৌগোলিক বিস্তারেই নয় সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইন্দো-ইউরোপীয়। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সমৃদ্ধ ভাষাগুলির জন্ম হয়েছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী থেকে। আনুমানিক ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই ভাষাবংশের জনগোষ্ঠী দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বত থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। আঞ্চলিক পার্থক্য বৃদ্ধির ফলে এই ভাষাবংশ থেকে দশটি প্রাচীন শাখার জন্ম হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখাটি হল ইন্দো-ইরানীয়।         আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইন্দো-ইরানীয় শাখাটি দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি ইরানীয় নামে ইরান বা পারস্যে প্রবেশ করে। অপর উপশাখাটি ভারতীয় আর্য নামে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে আজ পর্যন্ত এই আর্যভাষা নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকাশলাভ করেছে। এই বিবর্তনের ধারা অনুসারে ভারতীয়। আর্যভাষাকে প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করা যায়—

১। প্রাচীন ভারতীয় আর্য (Old Indo-Aryan) : এর সময়সীমা ১৫০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ঋগবেদ সংহিতা।

২। মধ্য ভারতীয় আর্য (Middle Indo-Aryan) : এর সময়সীমা আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই ভাষার নিদর্শন রয়েছে অশোকের শিলালিপিতে। এ ছাড়া সংস্কৃত নাটকে ব্যবহৃত প্রাকৃত, বৌদ্ধগ্রন্থে ব্যবহৃত পালি এ যুগের নিদর্শন।

৩। নব্য ভারতীয় আর্য (New Indo-Aryan / Modern Indo-Aryan) : আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত এ ভাষার স্তরের বিন্যাস। বিভিন্ন নব্য ভারতীয় আর্যভাষার নাম হল—বাংলা, হিন্দি, মারাঠি ইত্যাদি।-এইভাবে নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা স্বরের নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা এসেছে।

নব্য-ভারতীয় আর্য (Modern Indo-Aryan) এর সূচনাকাল আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত। বিভিন্ন নব্য-ভারতীয় আর্যভাষার নাম বাংলা হিন্দি, মারাঠি ইত্যাদি। প্রাচীন ভারতীয় আর্যের দুটি রূপ ছিল—সাহিত্যিক ও কথা। কথা রূপের চারটি আঞ্চলিক উপভাষা হল প্রাচ্য, উদীচা, মধ্যদেশীয় ও দাক্ষিণাত্য। এই কথ্য উপভাষাগুলি মধ্য-ভারতীয় আর্যভাষার প্রথম স্তরে চারটি কথ্য প্রাকৃতের জন্ম দেয়।। প্রাচ্য থেকে প্রাচ্য প্রাকৃত ও প্রাচ্যমধ্যা প্রাকৃত; উদীচ্য থেকে উত্তর-পশ্চিমা প্রাকৃত এবং মধ্যদেশীয় ও দাক্ষিণাত্য থেকে পশ্চিমা বা দক্ষিণ-পশ্চিমা প্রাকৃত। মধ্য-ভারতীয় আর্যভাষার দ্বিতীয় স্তরে এই চারটি কথা প্রাকৃত থেকে পাঁচটি সাহিত্যিক প্রাকৃতের জন্ম হয়। যথা: প্রাচ্যা থেকে মাগধী প্রাকৃত: প্রাচামধ্যা থেকে অর্ধমাগধী প্রাকৃত, উত্তর-পশ্চিমা থেকে পৈশাচী প্রাকৃত: পশ্চিমা বা দক্ষিণ-পশ্চিমা থেকে শৌরসেনী ও মাহারাষ্ট্রী প্রাকৃত। মধ্য ভারতীয় আর্যের তৃতীয় স্তরে এই পাঁচটি সাহিত্যিক প্রাকৃত থেকে পাঁচটি অপভ্রংশ-অবহট্‌ঠ স্তরের উদ্ভব হয়। মাগধী প্রাকৃত থেকে মাগধী অপভ্রংশ অবহট্ঠ অর্ধমাগধী থেকে অর্ধমাগধী অপভ্রংশ অবহট্‌ঠ, পৈশাচী প্রাকৃত থেকে পৈশাচী অপভ্রংশ অবহট্ঠ, শৌরসেনী প্রাকৃত থেকে শৌরসেনী অপভ্রংশ-অবহট্‌ঠ, মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত থেকে মাহারাষ্ট্রী অপভ্রংশ অবহট্ঠ ।

অপভ্রংশ অবহট্টঠের পর আনুমানিক ১০০ খ্রিস্টাব্দে এক-একটি অপভ্রংশ অবহটঠ থেকে একাধিক নব্য ভারতীয় আর্যভাষার জন্ম হল। যেমন, মাহারাষ্ট্রী অপভ্রংশ অবহট্ঠ থেকে মারাঠি, মাগধী অপভ্রংশ অবহট্ঠ থেকে বাংলা ভাষার জন্ম হয়। আনুমানিক ৯০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মাগধী অপভ্রংশ অবহট্ঠ থেকে যে বাংলা ভাষার জন্ম হয় সেই ভাষা। আজ পর্যন্ত নানাভাবে বিবর্তিত হয়ে চলেছে ।

প্রায় হাজার বছরের বিবর্তনের ধারাকে ভাষাতাত্ত্বিকরা তিনটি যুগে ভাগ করেছেন। যথা

• প্রাচীন বাংলা : প্রাচীন বাংলার সময়সীমা আনুমানিক ৯৫০ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই সময়ে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বৌদ্ধ সহজিয়া সাধক রচিত চর্যাপদ। এ ছাড়া সর্বানন্দ রচিত 'অমরকোষ'-এর টীকায় বেশ কিছু বাংলা প্রতিশব্দে, ধর্মদাস রচিত 'বিদগ্ধ মুখমণ্ডল' গ্রন্থের কয়েকটি বাংলা কবিতায় এবং 'সেক শুভোদয়া'-র গানে ও ছড়ায় প্রাচীন বাংলার নিদর্শন রয়েছে। তবে সঠিকভাবে প্রাচীন বাংলার সময়সীমা ৯০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। কারণ ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়সীমায় রচিত বাংলা ভাষার কোনো সাহিত্যিক নিদর্শন পাওয়া যায় না।

 মধ্য বাংলা : মধ্য বাংলার সময়সীমা আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই দীর্ঘ চারশত বছরের মধ্যে বাংলা ভাষার মধ্যে নানা পরিবর্তন লক্ষ করে ভাষাতাত্ত্বিকেরা মধ্য বাংলাকে দুটি উপস্তরে ভাগ করেছেন—

১। আদি-মধ্য বাংলা—আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এর সময়সীমা। এই পর্বের একমাত্র সাহিত্যিক নিদর্শন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন'।

২। অন্ত-মধ্য বাংলা- আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এর সময়সীমা। এই পর্বের সাহিত্যিক নিদর্শন হল, মঙ্গলকাব্যের বিভিন্ন ধারা, অনুবাদ সাহিত্যের ধারা, বৈষব পদাবলি, জীবনীকাব্য ইত্যাদি।

• আধুনিক বাংলা- ১৭৬০ খ্রিস্টাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সময়সীমায় বাংলা ভাষার নিদর্শনগুলি হল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকগোষ্ঠীর রচনা, রামমোহন, বিদ্যাসাগর থেকে বর্তমান কালের সমগ্র সাহিত্যিকদের রচনা। অনেকে মনে করেন, সংস্কৃত থেকে বাংলা ভাষার জন্ম। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। কারণ সংস্কৃত হল বৈদিকের পরবর্তী একটি প্রায় কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা। ফলে এর কোনো বিবর্তন হয়নি। বস্তুত বৈদিক ভাষার যে কথ্যরূপ ছিল তাই বিবর্তিত হয়ে মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার মধ্য দিয়ে নব্য ভারতীয় আর্যভাষাগুলির জন্ম দিয়েছে। একইভাবে বৈদিক ভাষার কথ্যরূপ প্রাচ্য থেকে বিবর্তিত হয়ে মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার শেষ স্তর মাগধী অপভ্রংশ, অবহট্ঠ থেকে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে। সুতরাং, জন্মসূত্র বিচারে বাংলা ভাষার জননী মাগধী অপভ্রংশ অবহট্‌ঠ সংস্কৃত নয়।

সংস্কৃত বাংলা ভাষার জননী নয়। কারণ, সাধারণের ধারণা হল সংস্কৃত থেকেই বাংলা তথা ভারতের অন্যান্য আধুনিক ভাষাগুলির জন্ম। কিন্তু এই ধারণার মূলে উচ্ছ্বসিত স্বদেশপ্রেম যতই থাক, যথাযথ বিচারে এ ধারণা যে সর্বৈর ভ্রান্ত সতর্ক ভাষাবিজ্ঞানীমাত্রেই তা স্বীকার করবেন। সূক্ষ্ম বিচারে সংস্কৃত হল বৈদিকের পরবর্তী একটি প্রায়-কৃত্রিম ভাষা যা পরে মৃত ভাষা হয়ে গিয়েছিল। ফলে জীবন্ত ভাষার মতো তার কোনো বিবর্তন হয়নি এবং তা থেকে কোনো ভাষার জন্ম হয়নি। বস্তুত বৈদিক ভাষাই ছিল জীবন্ত ভাষা। এরই যে কথা ভিত্তি ছিল তারই বিবর্তনের ধারায় মধ্যবর্তী স্তর হয়ে বাংলা প্রভৃতি নব্য ভারতীয় আর্যভাষাগুলির জন্ম হয়েছে। সুতরাং, অব্যবহিত জন্মসূত্র বিচারে বৈদিক ভাষাকেও নব্য ভারতীয় আর্যভাষাগুলির জন্ম-উৎস বলা যায় না। নব্য-ভারতীয় আর্যভাষাগুলির অব্যবহিত জন্ম উৎস হল বৈদিক ভাষার কথ্যরূপ থেকে জাত মধ্য-ভারতীয় আর্যভাষার শেষ স্তর বিভিন্ন অপভ্রংশ অবহট্ঠ ভাষা। বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে মাগধী অপভ্রংশ অবহট্ঠ থেকে।

প্রাচীন বাংলার সাহিত্যিক নিদর্শন হল—চর্যাগীতি, অমরকোষ-এর টীকার অন্তর্গত বেশ কিছু বাংলা প্রতিশব্দ।

বিদগ্ধমুখমণ্ডল গ্রন্থের কয়েকটি বাংলা কবিতা। এবং 'সেক শুভোদয়া'-র গান ও ছড়ায় প্রাচীন বাংলার সাহিত্যিক নিদর্শন রয়েছে।

মধ্য বাংলার সাহিত্যিক নিদর্শনগুলি হল বৈয়ব সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের অনুবাদ এবং চৈতন্যজীবনী কাব্যসমূহ।

আধুনিক বাংলার সাহিত্যিক নিদর্শনের সূচনাকাল ধরা হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের লেখা এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের রচনা থেকে। পরবর্তীকাল তথা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সদ্যতনকাল। পর্যন্ত যুগের সাহিত্য আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন।