অধ্যায়-15, ভারতে প্রচলিত ভাষা পরিবার

ভারতীয় আর্যভাষাগুলিকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

পশ্চিমা পাঞ্জাবি বা লহন্দা এবং সিন্ধি ।

মারাঠি ভাষার প্রধান উপভাষার নাম 'কোঙ্কনী'।

গোয়ায় 'কোঙ্কনী' ভাষা প্রচলিত।

ওড়িশার ভাষাগুলির মধ্যে ‘ভত্রি' উপভাষা বিশেষ উল্লেখ্য।

ভাষাতাত্ত্বিক গ্রিয়ার্সন ‘বিহারি’—নামকরণ করেছেন।

'পূর্বা' ভারতীয় আর্যের অন্তবর্তী শাখার একটি শাখা।

বাংলা ভারতীয় সংবিধানে অষ্টম সংখ্যক অনুসূচি স্বীকৃত ভাষা  ।

উর্দু হিন্দুস্থানীয় ভাষার সাহিত্যিক রূপ।

বুন্দেলি উত্তরপ্রদেশের দক্ষিণ জেলাগুলির প্রত্যন্ত অঞ্চলে কথিত।

তেলুগু দ্রাবিড় গোষ্ঠীর মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষা।

দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর একমাত্র তামিল ভাষাতেই প্রাচীন নিদর্শন বর্তমান।।

ভারতে প্রচলিত আর্যভাষাকে তিনটি যুগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন—

ক. প্রাচীন ভারতীয় আর্য মান-৫ & C

খ. মধ্য ভারতীয় আর্য

গ. নব্য ভারতীয় আর্য

এই তিনটি যুগের ভাষাকে নিয়ে ভারতের আর্যভাষা পরিবারগুলি গড়ে উঠেছে। সেগুলির পরিচয় এভাবে দেখানো হল

ভারতীয় আর্যভাষাগুলির প্রথম বর্ণীকরণ করেন A. FR. Hoernle, পরে তা ব্যাখ্যা করেন G.A. Grierson তাঁর 'Linguistic Survey of India' (LSI) গ্রন্থে।

• ভারতীয় আর্য : বহিরা শাখা

উত্তর-পশ্চিমা বর্গের প্রধান দুটি ভাষা—

১। পশ্চিমা পাঞ্জাবি বা লহন্দা পশ্চিম পাঞ্জাব এবং সিন্ধুপ্রদেশ এই অঞ্চলে এই ভাষাগোষ্ঠীর অধ্যুষিত অঞ্চল।
২। সিন্ধি পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু প্রদেশের ভাষা।

■ দক্ষিণী বর্গ : দক্ষিণী বর্গের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মারাঠি এবং তার প্রধান উপভাষা কোঙ্কণী, সাম্প্রতিক জনসমীক্ষায় কোঙ্কণী স্বতন্ত্র ভাষারূপে চিহ্নিত। দক্ষিণ মহারাষ্ট্র, মহীশূর, কেরালা, গোয়া এবং তামিলনাড়ুর অঞ্চলবিশেষে এই ভাষা প্রচলিত।
■ পূর্বী বর্গ : ওড়িশা প্রদেশের ভাষা ওড়িয়া। এই ভাষাগুলির মধ্যে ভিত্রি' উপভাষা বিশেষ উল্লেখ্য। মাতৃভাষার সংখ্যা ২৪টি
■ বিহারি : বিহারের সমগ্র ভাষাগুলিকে একত্রে বলা হয় বিহারি। বিহারির প্রধান শাখা তিনটি— ভোজপুরী, মাহী, মৈথিলী। বিহারির অন্তর্ভুক্ত মাতৃভাষার সংখ্যা ৩৪টি। ‘বিহারি” এই নামকরণ করেছেন প্রিয়ার্সন।
■ বাংলাঃ বাংলার মাতৃভাষার সংখ্যা ১৫টি। বাংলা ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম অনুসূচি অনুমোদিত ভাষা।
■ অসমিয়া : ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম অনুসূচি স্বীকৃত ভাষা। মাতৃভাষার বৈচিত্র্য অসমিয়ায় লক্ষ করা যায় না।

ভারতীয় আর্য :অন্তবর্তী শাখা

ভারতীয় আর্যের অন্তবর্তী ভাষাগুলির সাধারণ নাম 'পূর্বী হিন্দি'। এর প্রতিনিধিস্থানীয় প্রধান উপশাখা অবধী: অন্য দুটি উপশাখা বখেলী, ছত্তিশগড়ী।

■ অবধী : অবধী ভাষাভাষীর অধিকাংশই উত্তরপ্রদেশের অধিবাসী। অবধী সমেত মোট মাতৃভাষীর সংখ্যা ১৬।
■ ছত্তিশগড়ী: ছত্তিশগড়ী সমেত অন্যান্য মাতৃভাষার সংখ্যা ১৬।
■ বখেলী : বখেলী অবধীর মাতৃভাষা রূপে চিহ্নিত।

  ভারতীয় আর্য : অন্তরা শাখা

প্রিয়ার্সন উল্লিখিত অন্তরা শাখার দুটি বিভাগ—মধ্যদেশীয় এবং উত্তরদেশীয়। মধ্যদেশীয় ভাষাগুলির অন্তর্গত পশ্চিমাহিন্দি, রাজস্থানী, গুজরাটি, পাঞ্জাবি ইত্যাদি। উত্তরদেশীয় বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হল পাহাড়ি ভাষাগুচ্ছ।

■ পশ্চিমা হিন্দি : পাঞ্জাবের সিরহিন্দ থেকে উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল, আর উত্তরে হিমালয়ের তরাই অধ্যুষিত ভোট-চিনা গোষ্ঠীর ভাষাঞ্চল থেকে দক্ষিণে রাজস্থানসহ মধ্যপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল হিন্দি ভাষাভুক্ত বলা যায়। এই সর্বজনীন হিন্দির মোট মাতৃভাষার সংখ্যা ৯৭।
■ উর্দু : হিন্দুস্থানীয় একটি সাহিত্যিক রূপ উর্দু। ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে ভাষা দুটি ও তাদের ব্যাকরণগত কাঠামো এক হলেও উভয়ের পশ্চাৎপট পৃথক হিন্দির প্রধান ভিত্তি হিন্দু সংস্কৃতি আর উর্দু ভাষার পশ্চাৎপটে রয়েছে। ইরান বা আরবের সংস্কৃতি।
■ খড়ীবোলী: ভাষার বিচারে খড়ীবোলী হল আঞ্চলিক কথোপকথনের ভাষা। গ্রামীণ খড়ীবোলীতে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার অন্যান্য হিন্দি বিভাষার চেয়ে বেশি। রামপুর, মুরদাবাদ, বজনৌর, মীরাট, মুজফ্ফর নগর সাহারানপুর, দেরাদুনের সমতল অঞ্চল, পাতিয়ালার পূর্বাঞ্চল, আম্বালা অঞ্চলের কথ্য ভাষা হল খড়ীবোলী। বাঙ্গর বাঙ্গারুর অপর নাম হরিয়ানি। দিল্লি, কর্ণাল রোটক, হিসার জেলা এবং তৎসংলগ্ন পাতিয়ালা নাভা ও ঝিন্দ অঞ্চলে এই ভাষা প্রচলিত। এর মোট মাতৃভাষা চারটি।
■ ব্রজভাষা : ব্রজভাষার বিশুদ্ধ রূপ এখনো মথুরা, আগ্রা, আলীগড় এবং ধৌলপুর অঞ্চলে শোনা যায়।
■ বুন্দেলী : বুন্দেলী উত্তরপ্রদেশের দক্ষিণ জেলাগুলির প্রত্যন্ত অঞ্চলে কথিত হয়। এ ছাড়া মধ্যপ্রদেশের বিস্তৃত অঞ্চলে এর প্রসার। এর মাতৃভাষা ১২টি।
■ পাঞ্জাবি : পাঞ্জাবের পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত অন্তরঙ্গ শাখাভুক্ত পূর্বী পাঞ্জাবি বা পাঞ্জাবি। মোট মাতৃভাষার সংখ্যা
■ গুজরাটি : গুজরাটি ভাষা ভারতীয় সংবিধানে অষ্টমসূচি অনুমোদিত। এই ভাষার মাতৃভাষার সংখ্যা ২৭।
■ ডিলী ও খান্দেশী : ভিলী ও খান্দেশী তিনটি প্রধান ভাষাগুলের সীমানায় অবস্থিত। এই তিনটি ভাষা হল। গুজরাটি, মারাঠি এবং রাজস্থানি।
■ রাজস্থানি : আগে রাজস্থানি ভাষাগুচ্ছকে হিন্দির অন্তর্ভুক্ত করা হত। প্রিয়ার্সন প্রথম এর স্বতন্ত্র স্বীকৃতি দেন। রাজস্থানি মাতৃভাষা ৭৩টি। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হল—জয়পুরী, মালবী, মাড়োয়ারি ইত্যাদি।

ভারতে আর্য ভাষাগোষ্ঠী ছাড়াও আর্যের ভাষাগোষ্ঠীর প্রভাব সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে আর্যেতর জাতি বলতে বোঝায়

১. অস্ট্রিক বা নিষাদ ।

২. দ্রাবিড় এবং

৩. মঙ্গোল

এই জাতির বাসস্থানসহ ভাষাগুলির পরিচয় সংক্ষেপে দেওয়া হল এভাবে।
(১) অস্ট্রিক: আধুনিক জনসমীক্ষা (১৯৬১) থেকে জানা গেছে ভারতে অস্ট্রিক মাতৃভাষা সংখ্যায় ৬৫টি। এর মধ্যে মুন্ডা শাখার অন্তর্গত ৫৮টি, মোন্নখমের শাখার অন্তর্গত ৭টি।

মোন-খমের শাখা
(ক) খাসিয়া-এদের মূল অধিষ্ঠান খাসি-জৈন্তিয়া পার্বত্যাঞ্চল।
(গ) নিকোবরী-নিকোবরী আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের ভাষা।

■ মুণ্ডা বা কোল শাখা : মুক্তা গোষ্ঠীর মাতৃভাষা প্রায় এক লক্ষেরও বেশি। এর মধ্যে প্রধান হল
■ সাঁওতালি : এই ভাষার মূল কেন্দ্র বিহারের ছোটোনাগপুর ও সাঁওতাল পরগনা। আগে এই ভাষা লেখা হত বাংলা বা রোমক লিপিতে। বর্তমানে রঘুনাথ মুর্মু সাঁওতালদের লিপি 'অলচিকি' উদ্ভাবন করেছেন।
■ মুন্ডারী : মুভারীর কেন্দ্রস্থল হল বিহারের রাঁচী অঞ্চল।

(২) দ্রাবিড়: ভাষাগুলি হল : অস্ট্রিক গোষ্ঠীর পরই ভারতে সম্ভবত দ্রাবিড় জাতির উপস্থিতি ঘটে। দ্রাবিড় গোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য

• তামিল: প্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর একমাত্র তামিল ভাষাতেই প্রাচীন নিদর্শন বর্তমান। তামিলনাড়ুতে ও শ্রীলঙ্কার উত্তরালে তামিল ভাষা প্রচলিত।

• মালয়ালম : কেৱল অঞ্চলে প্রচলিত। লাক্ষাদ্বীপেও মালয়ালম প্রচলিত। খ্রিস্টীয় নবম শতকে তামিল থেকে এর উদ্ভব। এতে সংস্কৃতির প্রভাব বেশি।

• কয়ত্ব বা কানাড়ী: কর্ণাটক তথা মহীশুর অঞ্চলে কন্নড় ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এটিও তামিল থেকেই। উদ্ভূত।
• তেলুগু বা আন্দ্র :এর প্রচলন প্রধানত অস্ত্রে। দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষাসমূহের মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষা তেলুগু

● ব্রাহুই :পাকিস্তানের অন্তর্গত ইরানি ভাষাবেষ্টিত বেলুচিস্তানের এক সীমাবদ্ধ অঞ্চলে দ্রাবিড় ভাষার একটি শাখা ব্রাহুই বর্তমান।

(৩) মঙ্গোল বা ভোটচিনা গোষ্ঠী : ভোটচিনা ভাষাগোষ্ঠীর তিনটি প্রধান শাখা। ভোটবর্মী শাখার ভোট-হিমালয়ী মণ্ডলের দুটি ভাগ—(ক) তিব্বতি (খ) হিমালয়ী।

*  ভোটবর্মী : এই শাখার আসাম-বর্মী মণ্ডলের শাখাগুলি হল । (ক) বোডো (খ) নাগা (গ) কুকিচিন (ঘ) বর্মী।

* হাই-চিনা : এই শাখার 'খামতি' ভাষা এখনও পূর্ব আসামে বর্তমান।

* যেনেসি:  যেনেসি শাখার সঙ্গে ভারতের যোগ নেই।

পৃথিবীর প্রায় ৪০০০ ভাষাকে তাদের মূলগত সাদৃশ্যের ভিত্তিতে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের পদ্ধতির সাহায্যে বারোটি ভাষাবংশে বর্গীকৃত করা হয়েছে। এগুলির মধ্যে অন্যতম ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ থেকে আরও দশটি প্রাচীন শাখার জন্ম হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখাটি হল

ইন্দো-ইরানীয়। ইন্দো-ইরানীয় শাখাটি আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। একটি শাখা ইরান বা পারস্যে প্রবেশ করে। অন্যটি ভারতীয় আর্য নামে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে।

অর্থাৎ ইন্দো-ইরানীয় শাখা দুটির মধ্যে যে-শাখাটি ভারতবর্ষে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছর আগে প্রবেশ করে,

তাকে ভারতীয় আর্যভাষা নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। • এই ভাষাবংশের তিনটি স্তর। সেই স্তরগুলির নামসহ কালসীমা এইরকম—

(ক) প্রাচীন ভারতীয় আর্য (Old Indo-Aryan): সময়সীমা হল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ ।

(গ) ভারতীয় আর্য (Middle Indo-Aryan) : সময়সীমা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দ।

(গ) নব্য ভারতীয় আর্য (Modern Indo-Aryan): সময়সীমা আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে পর্যন্ত।