অধ্যায়-16, প্রাচীন লিপি ও বাংলা লিপির উদ্ভব ও বিকাশ

যে লিপি-পদ্ধতিতে দড়িতে গিঁট বেঁধে ঘটনা মনে রাখা হত, সেই পদ্ধতি 'কুইপু' নামে পরিচিত। এম্মিলিপিতে অনুসৃত।

দক্ষিণ আমেরিকার পেরু অঞ্চলের ইকামদের মধ্যে এম্মিলিপি প্রচলিত ছিল।

লিপির ক্রমবিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ে 'ভাবলিপি'-র উদ্ভব। চিত্রলিপির শেষ পর্বে কোনো জিনিসের পুরো ছবি না এঁকে কয়েকটি রেখাচিত্রের দ্বারা জিনিসটিকে বোঝানো হত। ভাবলিপির পর্বে এই রেখাচিত্র দ্বারা ক্রমশ জিনিসটিকে বোঝানো হত।

ক্যালিফোর্নিয়াতে ভাবলিপির ব্যবহার দেখা যায়।

রোমীয় লিপি বর্ণলিপির উদাহরণ।

বর্তমান মেসোপটেমিয়ায় যে সুমের জাতির বাস ছিল, তারা অন্তত ৬০০০ বছর আগে কাটা মাটির টালির ওপরে কীলক বা বাটালি বসিয়ে লিখত বলে একে কীলকাকার বা বাণমুখ লিপি বলা হয়। বর্তমানে এই লিপি লুপ্ত।

মিশরীয় লিপির তিনটি ধারার নাম হল- হায়ারোগ্লিফ, হিরোটিক এবং ডেমোটিক।

ফিনিসীয় লিপি মিশরীয় লিপি থেকে উদ্ভূত। তবে, ফিনিসীয়রা এই লিপির কিছু সংশোধন করে মোট ২২টি বর্ণে আনেন। খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীর মোয়াবাইট লিপিতে এই লিপির নিদর্শন রয়েছে।

ব্রাহ্মী এবং খরোষ্ঠী প্রাচীন ভারতের আদি লিপিমালা।।

খরোষ্ঠী লিপি ডানদিক থেকে ক্রমশ বামদিকে লেখা শুরু হয়। এই লিপি ব্যবহৃত হত সেমেটিক ভাষা লেখার জন্যে।

ব্রাহ্মী লিপির আঞ্চলিক রূপগুলির নাম হল – উত্তর ভারতীয়, দক্ষিণ ভারতীয় এবং বহির্ভারতীয়।

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে সিদ্ধমাতৃকা লিপির যে জটিল রূপ গড়ে ওঠে, তাকে 'কুটিল লিপি' নামে অভিহিত করা হয়

প্রাচীনকাল থেকে মাধুনিককাল পর্যন্ত লিপির যে ক্রমবিকাশ ঘটেছে তাতে স্পষ্ট কয়েকটি স্তর লক্ষ করা মায়। সেগুলি হল ।

● চিত্রলিপি: আনুমানিক ২০,০০০ থেকে ১০,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে আপন মনের ভাবকে স্থায়িত্ব দান করার উদ্দেশ্যে মানুষ তার চিত্তকে কাজে লাগায়। দেয়ালে, পর্বতগাত্রে, গাছের গুড়িতে দাগ কেটে মানুষ তার শিকারের ঘটনা চিত্রলিপির অনুকূল পদ্ধতি এম্মিলিপি। এই পদ্ধতিতে দড়িতে গিঁট বেধে ঘটনা মনে রাখা হত। এই পদ্ধতির নাম কুইপু। এই পদ্ধতির প্ররিকার পেরু অঞ্চলের ইকামদের মধ্যে।

●ভাবলিপি (Ideogram): লিপির ক্রমবিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ে এল ভাবলিপি। চিত্রলিপির শেষ পর্বে কোনো জিনিসের পুরো ছবি না এঁকে কয়েকটি রেখাচিত্র দ্বারা জিনিসটিকে বোঝানো হত। ভাবলিপির পর্বে এই রেখাচিত্র খারা ময়ে তার ভাবতে বোঝানো হত। ডেভিড ডিগ্রিজার উদাহরণ থেকে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। যেমন: চিত্রলিপির মুখে গোল বৃত্ত দিয়ে সূর্যকে বোঝানো হত। কিন্তু ভাবলিপির যুগে ক্রমশ এই গোল বৃত্ত নিয়ে সূর্যকে না বুঝিয়ে তার উত্তাপকে বোঝানো হত। ক্যালিফোর্নিয়াতে এই ভাবলিপির ব্যবহার দেখা যায়।

● চিত্রগতীকলিপি (Hieroglyph): চিত্রপ্রতীকলিপির করে চিত্রগুলি আর বস্তু বা ভাবের প্রতীক না হয়ে সেই উপস্থাপ্য বস্তু বা ভাবের নামবাচক শব্দ বা প্রতীক হয়ে উঠল। যেমন একটি বাজপাখির ছবি fisw' প্রতীক ছিল অর্থ 'thaw'ল শুধুমাত্র বাজপাখিকেই বোঝানো হত। মিশরের চিত্রপ্রতীকলিপি এই শ্রেণির লিপির নিদর্শন।

● ধ্বনিলিপি (Phonogram): চিত্রপ্রতীকলিপিগুলি যখন ধ্বনির প্রতীক হয়ে উঠল তখন সেই লিপি হয়ে উঠল নিলিপি। ধ্বনিলিপির প্রথম পরে লিপিতে ব্যবহৃত প্রতীকগুলি গোটা শব্দকেই বোঝাত। এই স্তরের নাম শব্দলিপি (Logogram) | দশ সরলীকরণের ফলে রেখাচিত্রগুলি ভেটো হয়ে এল এবং এক একটি রেখাচিত্র গোটা শব্দের প্রতীক মা হয়ে শুধু শব্দের আদি অক্ষরের প্রতীক হয়ে উঠল। এই প্রক্রিয়ার ফলে যে লিপিপদ্ধতির জন্ম হল তাকে বলা হল অক্ষরলিপি বা লিপি (Syllabic Script)। মনিলিপির শেষ ধাপে প্রত্যেকটি রেখাচিত্র এক একটি ধ্বনির প্রতীক হয়ে উঠল। এই শেষ ধাপে নাম হল কালিপি (Alphabetic Script)। এই ফ্যানের লিপির নিদর্শন রোমীয় লিপি। এইভাবে ধাপে ধাপে জকি লিপির জন্ম হয়।

প্রাচীন ও বর্তমান কালে পৃথিবীতে যত রকমের লিপি প্রচলিত ছিল ও আছে তাদের কয়েকটি মূল শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে

* সুমেরীয় বাখমুখ লিপি:

বর্তমান মেসোপটেমিয়ায় যে সুমের জাতির বাস ছিল তারা অন্তত ৬০০০ বছর আগে যে চিত্রলিপি উদ্ভাবন করেন। সেটি সম্ভবত পৃথিবীর প্রাচীনতম লিপি। এরা কাটা মাটির টালির ওপরে কীলক বা বাটালি বসিয়ে লিখত বলে এক কীলকাকার বা বাণমুখ লিপি (Cuneiform) বলে অভিহিত করা হত। তবে এই লিপি প্রথমে চিত্রলিপি হলেও পরে প্রাচীন লিপি ও বাংলা লিপির উদ্ভব ও বিকাশ ভাবলিপি বা ধ্বনিলিপিতে পরিণত হয়। সুমেরীয়, আমেরীয়, ব্যাবিলনীয়রা এই লিপি ব্যবহার করত। এই লিপি বর্তমানে

• চিনীয় লিপি

মূলত চিত্রলিপি থেকেই চিনীয় লিপির জন্ম। এই লিপি ভাবলিপিতে উত্তীর্ণ হলেও এখনো বর্ণলিপির স্তরে পৌঁছায়নি। তবে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দেও এই লিপি ছিল বলে অনুমান করা হয়, তবে এর সঠিক সূচনাকাল জানা যায় না। এই লিপি চিনা ভাষা ছাড়াও পরিবর্তিত আকারে জাপানি ভাষাতেও ব্যবহৃত হয়।

● মিশরীয় লিপি

খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের কাছাকাছি সময় মিশরীয় লিপির উদ্ভব ঘটে বলে মনে করা হয়। মিশরীয় লিপিতে চিত্রতার ও ধ্বনির সমন্বয় লক্ষ করা যায়। মিশরীয় লিপির তিনটি ধারা ছিল- (১) হায়ারোशিফ, (২) হিরোটিক (৩) ডেমোটিক। প্রস্তরে মোদিত পুরোহিতদের মধ্যে প্রচলিত এই চিত্রপ্রতীকলিপি ছিল হায়ারোমিক। এই জটিল লিপিপদ্ধতির সরলীকৃত টানা লেখার নাম হয় হিরোটিক এবং তা থেকে আরো সংক্ষেপিত লিপিপদ্ধতির নাম ডেমোটিক।

• ফিনিসীয় লিপি

ফিনিসীয় লিপি মিশরীয় লিপি থেকেই উদ্ভূত। তবে ফিনিসীয়গণ এই লিপির কিছু সংশোধন করে মোট ২২টি অক্ষরে আনে। খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীর মোয়াবাইট লিপিতে এই লিপির নিদর্শন রয়েছে। ফিনিসীয় ধারা থেকেই আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে গ্রিকরা তাদের বর্ণলিপি গ্রহণ করে গ্রিক বর্ণমালা গড়ে তোলে। এ থেকেই ক্রমবিবর্তনের ফলে লাতিন ভাষায় ব্যবহৃত রোমীয় লিপির বিকাশ হয়।

● আরামীয় লিপি

মিশরীয় লিপির আর একটি ধারা আরামীয় লিপি। এই লিপি ডানদিক থেকে বামদিকে লিখিত হয়। হিব্রু, পারসোর পহ্লবী, আরবি বিশেষত ভারতের দুটি মূল লিপিমালা ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠীর জন্ম হয় আরামীয় যারা থেকে।

ভারতীয় লিপি :

প্রাচীন ভারতের আদি লিপিমালা দুটি—ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী। এদের থেকে পরবর্তীকালের সমস্ত ভারতীয় লিপির জন্ম।

বাংলা লিপির উদ্ভব ও বিকাশ

ভারতে প্রাপ্ত প্রাচীনতম লিপির সন্ধান পাওয়া যায় অশোকের বিভিন্ন অনুশাসনে। অশোকের অনুশাসনে দু-প্রকার লিপি পাওয়া যায়—একটি ব্রাম্মী, অপরটি খরোষ্ঠী। আরামীয় লিপি থেকে ভারতের আদিলিপি ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠীর জন্ম বলে লিপি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। খরোষ্ঠী লেখা হত ডান থেকে বাম দিকে এবং এই লিপি ব্যবহৃত হত সেমেটিক ভাষা লেখার জন্য। ব্রাহ্মী লেখা হত বাম থেকে ডান দিকে, তবে ডান থেকে বাম দিকে লেখার নিদর্শনও রয়েছে। ব্রাহ্মী ব্যবহৃত হত অ-সেমেটিক ভাষা লেখার জন্য। এ থেকে আধুনিক নাগরী, বাংলা প্রভৃতি ভারতীয় লিপির জন্ম হয়।

ব্রাহ্মী লিপির প্রসারের ফলে এর নানা আঞ্চলিক রূপ গড়ে উঠেছিল। খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতাব্দীতে ব্রাহ্মী লিপির। তিনটি আঞ্চলিক রূপ হল : (১) উত্তর ভারতীয় (২) দক্ষিণ ভারতীয় ও (৩) বহির্ভারতীয়। ব্রাহ্মী লিপির উত্তর ভারতীয় রূপটি পরিপূর্ণতা লাভ করে খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীতে অর্থাৎ গুপ্তযুগে। সেইসময়

প্রত্তর ভারতীয় লিপিকে গুপ্তলিপিও বলা হয়। গুপ্তলিপির দুটি ধারা পূর্ব ও পশ্চিমা। এই পূর্বী ধারার আবার দুটি উপধারা— [বী ও পশ্চিমা। গুপ্তলিপির পূর্বী ধারার পশ্চিমা উপধারা থেকে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে সিরমাতৃকা লিপির জন্ম হয়। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে সি মাতৃকা লিপির যে জটিল রূপ গড়ে ওঠে তাকে বলা হয় 'কুটিল লিপি'। ড. সুকুমার সেন নে করেন, এই 'কুটিল লিপি' থেকেই বাংলা লিপির উদ্ভব। বাংলা লিপির উৎস সম্বন্ধে দুটি মত প্রচলিত। সেইসময় নারী লিপির দুটি প্রকারভেদ ছিল—পূর্ব ভারতীয় ও পশ্চিম ভারতীয়। ব্যুলারের মতে, খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে এই পূর্ব ভারতীয় রূপটি থেকেই প্রত্ন-বাংলা লিপি গড়ে ওঠে। অন্যদিকে এস. এন. চক্রবর্তীর মতে, উত্তর ভারতীয় লিপির পুরী শাখাটি থেকে স্বতন্ত্র ধারায় খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতেই প্রত্ন-বাংলা লিপির উদ্ভব হয়। যাইহোক, বাংলা লিপির উৎস সম্বন্ধে একথা মনে করা যেতে পারা যায় যে, “সিদ্ধমাতৃকা' লিপির জটিল রূপ কুটিল লিপি থেকেই দুটি পৃথক ধারায় নাগরী ও বাংলা লিপির বিকাশ হয়েছিল।

প্রত্ন-বাংলা লিপির নিদর্শন পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে নারায়ণ পালের তাম্রশাসনে এবং মহীপালের বাণগড় লানলিপিতে। লক্ষ্মণ সেনের তর্পণ দীঘি লিপিতে একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর বাংলা লিপির বিবর্তনের চিহ্ন রয়েছে। তবে চর্যার লিপিকে প্রাচীন বাংলা লিপির নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হলে শ্রীকৃষ্মকীর্তনের লিপিকে মধ্যযুগের বাংলা লিপির নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করা যায়। লিপি বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন শ্রীকৃষ্মকীর্তনের পাণ্ডুলিপিতে বাংলা লিপির প্রায় পূর্ণ বিকশিত রূপটি ধরা রয়েছে।