অধ্যায়-18, বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়

আর্য ও অনার্যের সংঘাত- মিলনের মধ্য দিয়ে।

অস্ট্রিক বা মোঙ্গল ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর মানুষের ভাষা এ যেমন—ভাঙ্গা, ঢিপি, চিল এগুলি অস্ট্রিক। খোকাখুকি, ছেলেপিলে এগুলি মোকাল ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর।

আর্য ও অনার্যের মিলনে তৃতীয় ও সংকরজাতি (বা মিশ্র জাতি)।

চারটি জাতির। মতান্তরে দুটি—লম্বা-নীচু মাথাওয়ালা ও মোঙ্গলিয়ান গোল ।

খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে।

লগ-উঁচু, লম্বা-নীচু ও গোল মাথাওয়ালা (দু-রকম) এই চার জাতির উপাদান পাওয়া যায়।

অস্ট্রিক দ্রাবিড়-মোকাল প্রভৃতি গোষ্ঠীর প্রভাবের কথা বলেছেন।

লম্বা নীচু মাথাওয়ালা আধুনিক দক্ষিণ ভারতীয় (তামিল)-দের।

পালরাজাদের বিতাড়িত  করে।

রাঢ়ের সেনবংশীয় রাজাদের আমলে।

আলপাইন ও মোঙ্গলিয়ান।

 

বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় উল্লেখের আগে মনে রাখা দরকার, এই জাতি কতটা প্রাচীন। বাঙালি জাতি বা বাংলার উল্লেখ পাওয়া যায়—

(১) বেদের ঐতরেয় আরণ্যক অংশে (শ্লোক : ২-১-১)
(২) প্রাচীন মহাভারতে (সেখানে বারাজ কৌরবপক্ষীয় অন্যতম নৃপতি (),
(৩) পাতগুলির মহাভাষ্য-এ,
(৪) খ্রিস্টপূর্ব রোমক কবি ওভিদ ও গ্রিক পণ্ডিত টলেমির রচনায়,
(৫) কালিদাসের রঘুবংশম কাব্যে।

নানা তথ্য সূত্র থেকে জানা যায়, আর্যরা দু-হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন এবং ক্রমে বহু বাধাবিঘ্নের মধ্য দিয়ে গঙ্গা-বিধৌত অঞ্চল দিয়ে এদেশের পূর্বপ্রান্তে এগিয়ে আসেন বাংলায় করেন ?
তারা প্রবেশ করেন বহুকাল পর তাদের আসার আগে এদেশে প্রাধান্য পেয়েছিল অস্ট্রিক গোষ্ঠীর বা দক্ষিণী জাতির মানুষ + কিন্তু আর্যরা পরে এই প্রধান জাতির তুলনায় নানা দিক থেকে উন্নত হওয়ায় তাঁরা বাংলায় সুপ্রতিষ্ঠিত হন। অনুমিত হয়, আর্যরা খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে বাংলায় আসেন এবং খুব কম সময়ের মধ্যে দ্রুততার সঙ্গে পুরোনো জাতিদের বিদ্যা বুদ্ধিতে হারিয়ে বাংলায় প্রভুত্ব বিস্তার করেন। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে তাদের শাসন সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলায়। পক্ষান্তরে ভারতের প্রাচীন জাতিরা কালক্রমে আর্যদের ভাষা-ধর্ম-রীতি-নীতির দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং বহিরাগত আর্যজাতির সঙ্গে তাঁদের যেমন সংঘর্ষ বাধে, তেমনি মিলনও হয়, ফলে সৃষ্টি হয় নতুন এক্স বাঙালি জাতি। অর্থাৎ বাঙালি জাতি একটি সংকর জাতি হিসেবে গণ্য হয়।

কিন্তু অধুনা বাঙালি জাতির যে অবারিক-সংস্থান বা সৌষ্ঠব, তাতে মনে হয় আর্যীকরণের আগে বাংলার আদিম অধিবাসীরা ছিল অস্ট্রিক বা অস্ট্রো-এশিয়াটিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এরা অনার্য ভাষাভাষী শবর, কোল, পুলিল, হাড়ি, ডোম, SS প্রভৃতি নিম্নবর্গীয় জাতি। চার-পাঁচ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে তারা ইন্দোচিন থেকে অসম হয়ে বাংলায় আসে। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে তাদের ভাষা তার প্রমাণ, যেমন—ভালা, টিপি, ঢিল, রিক্সা, খুঁটি, মজা, ডোম প্রভৃতি।

কোনো কোনো নৃতাত্ত্বিক ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, বাঙালি জাতির অস্তিতের পিছনে মোজাল ও দ্রাবিড় জাতির মিশ্রণ।
আছে। এরা ইরাক, এশিয়া মাইনর প্রভৃতি দেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে। বাংলায় এদের ভাষা।
নিদর্শন খোকাখুকি, ছেলেপিলে, গণ্ডগোল প্রভৃতি। কারোর মতে, বাঙালি জাতির দেহ-সংস্থানে নেগ্রিটো জাতির প্রভাব : যদিও অধুনা বাঙালির জীবনাচরণে বা ভাষায়
তার কোনো নিদর্শন নেই। এরপর আরেকটি বহিরাগত জাতি ভোটচিন বা তিব্বতি- চিনা গোষ্ঠীর মানুষের পরিচয় পাওয়া যায়, কিন্তু তাদের প্রভাব
সমগ্র বাংলায় লক্ষিত হয় না।
তবে এ বিষয়ে ভাষাচার্য ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, Risely প্রমুখ দু-একজন নৃতাত্ত্বিকের মত উল্লেখ করে বলেন। বাঙালি জাতির দেহ সংস্থানে প্রকৃত মূল চারটি জাতির উপাদান পাওয়া যায়। কিন্তু Risely ও অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক নীচু মাথাওয়ালা ও মোজালিয়ান গোল মাথাওয়ালা জাতির দেহ-সংস্থান বাঙালি জাতির দেহ
সংস্থানে সংশ্লেষিত হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিককালে এই বিষয়ে অনেকেই ভিন্নমত পোষণ করেন।

নৃতত্ত্ববিদ্যার আবিষ্কারে জানা যায় বাঙালি জাতির যে দেহগঠন, তাতে মূল চারটি জাতির উপাদান এসে মিশেছে। সেগুলি হচ্ছে (১) লা-উঁচুমাথা ওয়ালা বৈদিক আর্যভাষী জাতি, (২) লম্বা-নীচু মাথাওয়ালা দক্ষিণ ভারতীয় দ্রাবিড়-ভাষী আর কোল-জাতীয় ; (৩) গোল মাথাওয়ালা ( আলপাইন) সিন্ধু-গুটি-কর্নাটক-অন্ধ্রবাসী জাতি আর (৪) গোল মাথাওয়ালা (মোঙ্গলিয়ান) মোঙ্গলজাতীয় মানুষ। রিজলি প্রমুখ নৃতত্ববিদ মনে করেন, মুখ্যত দ্বিতীয় ও চতুর্থ সংখ্যক জাতির উপাদান মিশেছে বাঙালি জাতির অবয়বিক সংস্থানে।

কিন্তু এ বিষয়ে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আরো কয়েকটি কথা বলেছেন, যা তরজমা করলে দাঁড়ায় : বাঙালি জাতির দেহ-সংস্থানে প্রথমোক্ত শ্রেণির অস্তিত্ব সামান্য (বিশেষত উচ্চশ্রেণির বাঙালির মধ্যেও)। দ্বিতীয় শ্রেণির অস্তিত্ব পাওয়া যায়,

(১) North Indian 'Aryan' Longheads - উঁচু মাথাওয়ালা এরা আর্যভাষী, এদের মিল পাওয়া যায় পঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তর ভারত প্রভৃতি রানি শ্রেণির শারীরিক সংস্থানে। (২) South Indian or Dravido Munda Longheads লম্বা-নীচু মাথাওয়ালা। এরা হচ্ছে আধুনিক দক্ষিণ ভারতের (তামিল) রাবিড় ভাষী, কোল-জাতি। (e) Alpine Shortheads গোল মাথাওয়ালা, এরা সিন্ধুপ্রদেশ, গুজরাট, মধ্যভারত, কর্ণাটক, অন্ধ্র প্রভৃতি স্থানে বসবাসকারী মানুষ এবং এদের মাথার আকৃতির মতো সাদৃশ্য পাওয়া যায় অধুনা বাঙালি জারি, (s) Mongolian Shortheads : আরেকটি গোল মাথাওয়ালা। এরা মোভালজাতীয়, নাক চ্যাপটা, গালের হাড় উঁচু, এদের সত্যে সাদৃশ্য আছে উত্তর আর পূর্ববাজার বাঙালি জনসাধারে
[7:31 pm, 04/10/2022] Anju: বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়

বাংলাদেশে নিম্নশ্রেণির লোকদের মধ্যে। চতুর্থ শ্রেণির অস্তিত্ব বাঙালি পরিদৃষ্ট, তবে তারা আগে ভোট চিনাগোষ্ঠীর ভাষা-ভাষী মানুষ। তবে তৃতীয় শ্রেণির আগে দ্রাবিড়-কোল-ভোট-চিনা নাকি অন্য কোনো ভাষা বলত, সেটা জানা বেশ মুশকিল। কেউ বলেন, তারা আবার এও হতে পারে দ্রাবিড় কোলভাষী। মোটামুটিভাবে শ্রেণি বাদ দিলে বাকি তিনটি (২/৩/৪) আর্য-ভাষী একথা চট্টোপাধ্যায় মনে করেন।

এছাড়া তিনটি সূত্র (প্রাচীন সাহিত্য, ভাষাতত্ব ইতিহাস) অবলম্বনেও বিষয়টি করা যায়।। আমাদের প্রাচীনতম প্রশ্ন থেকে যায়, আর্য-অনার্য সংমিশ্রণে বাঙালি জাতির তবে অনার্য গ্রাহ্ আর্য ছিল দুটি অনার্য জাতি-বাড়ি আর কোল। সত্যে আর্যদের সংঘাত বেধেছিল আর্যদের আধিপত্য মানতে রাজি না। কিন্তু কালক্রমে অনার্যরা আর্থীভূত হয়ে যায়।

পরবর্তীকালে বাঙালির ভাষায় যায় অনার্যদেরই বেশ কিছু ভাষা (ডাঙা, চিল, টিপি কিংবা ছেলেপিলে, উল্লেখ্য নবগঠিত বাঙালি জাতি রুমে রাজ্য সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শন, স্মৃতি, শিল্পকলায় তার উৎকর্ষের পরিচয় দিয়ে ইতিহাসে রাখে। বাংলায় পালবংশের (আনুমানিক ৭৪০ খ্রিস্টাব্দ) তার প্রমাণ। এভাবেই গড়ে ওঠে ব্রাহ্মণ-বৌদ্ধ পন্ডিতের এ বিষয়ে উল্লেখ্য। তিনি তৎকালের এক 'নবীন বাংলার চিন্তা প্রচারক। এরকম উল্লেখ্য, পরবর্তীকালের বংশীয় রাজা হেমন্তসেন, বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন প্রমুখ রাজার আমলে (একাদশ শতক) অভ্যুত্থান বিরাট এক হিন্দুধর্মের। তারপর তুর্কি আক্রমণ। তারও পরে বাঙালি জাতির পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটে শ্রীচেতন্যের আবির্ভাবে। পরবর্তীকালে ওঠে আরও নানা সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি। এভাবেই নবগঠিত বাঙালি জাতি শক্তিশালী ওঠে। ড. সুকুমার সেন যাকে বাঙালির পক্ষে শুভ মনে করেন।