অধ্যায়-19, প্রাচীন বাংলা : সমাজ ও সাহিত্য

চর্যাপদগুলি লেখা হয়েছিল দশম-দ্বাদশ শতাব্দীতে।

চর্যাপদের দুজন কবি লুইপাদ ও কাহ্নপাদ।

মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে 'চর্যাপদ'-এর পুঁথি আবিষ্কার করেন।

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে চর্যাপদ আবিষ্কৃত হয়েছিল।

চর্যাপদের নাম দেওয়া হয়েছিল 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা'।

চর্যাপদের পুথিতে মোট ৫০টি পদ (মতান্তরে ৫১টি) ছিল বলে অনুমান করা হয়। কিন্তু পাওয়া গেছে। সাড়ে ছেচল্লিশটি।

চর্যাপদ পাদাকুলক ছন্দে লেখা।

চর্যাপদের মধ্যে প্রধানত নিম্নশ্রেণির মানুষ, যেমন— ডোম, শবর, কৃষিজীবী প্রভৃতি মানুষের জীবনযাত্রার

পরিচয় পাওয়া যায়।

চর্যাপদের ভাষাকে 'সন্ধ্যাভাষা' বলা হয়।

চর্যাপদগুলির দুটি অর্থ আছে। একটি বহিরলা—গূঢ় সাধনতত্ত্বের কথা, অন্যটি অন্তরঙ্গ—সহজ জীবনচর্চার চিত্র।

দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর।

তিব্বতি ভাষার চর্যাপদের টীকা রচনা করেন অধ্যাপক মুনিদত্ত।

চর্যাপদের আদি সিদ্ধাচার্য হলেন লুইপান।

চর্যায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পদ লিখেছেন কাহ্নপাদ (১৩টি)।

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ।

চর্যার ভাষা 'খানিক বোঝা যায় আবার খানিক বোঝা যায় না', এই অস্পষ্টতার কারণে চর্যার ভাষাকে 'সন্ধ্যাভাষা' বলে।

চর্যাপদ হল বাংলা ভাষা সাহিত্যের আদিগ্রন্থ। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে চর্যাপদের পুথি আবিষ্কার করেন। এই পুথিতে লুইপাদ, কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, সরহপান প্রমুখ কবির নাম পাওয়া যায়। সেই পুথিকে সম্পাদনা করে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা' নামে প্রকাশ করেন।

চর্যাপদের রচনাকাল দশম দ্বাদশ শতাব্দী। বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যরা নিজেদের ধর্মের তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সাধনপদ্ধতির কথা প্রচার করার জন্য অনেক গান লিখেছিলেন। প্রাপ্ত পুথির অনেকগুলি পাতা পাওয়া যায়নি। তবে শেষ চর্যাটির ক্রমিক সংখ্যা ছিল ৫০। কিছু পাতা হারিয়ে যাওয়ায় পুথিতে মাত্র সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ পাওয়া গিয়েছে। ইহবিমুখ সহজিয়া সাধকগণ কবিত্ব সৃষ্টির বাসনা নিয়ে চর্যাপদ লেখেননি সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশায় ভরা এই জগৎকে তাঁরা ততটা গুরুত্ব দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু মজার কথা হল, সেই তত্ত্বকে পরিস্ফুট করতে গিয়ে তাঁরা বারে বারে পার্থিব পরিবেশের সাহায্যই নিয়েছেন। নির্মাণের দক্ষতায় কঠিন ধর্মকথা সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে।

• চর্যাপদের উদাহরণ : কাথা তবর পদবি ভাল।

উজ্বল চীএ পইঠো কাল ।।

• চর্যাগীতির ঐতিহাসিক গুরুত্ব

বাংলা ভাষা-সাহিত্যের ইতিহাসের ধারায় চর্যাগানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। চর্যাগীতি বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন। ভাষার নির্মীয়মান যুগের আদি নিদর্শন হওয়ায় বাংলা ভাষার প্রাচীনরূপ কী রকম ছিল তা জানবার ক্ষেত্রে চর্যাগান বিশেষ কোন্ রাজবংশ রাজত্ব করছিল ?

গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রকৃত প্রভাবে, চর্যাগান আবিষ্কারের ফলে বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশের বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে জানতে পারার একটি সুযোগ তৈরি হয়াছে। এমনকী অনেক বাংলা শব্দের বিবর্তনের সুত্রটিকে জানার ক্ষেত্রে চর্যাগান। বিশেষ সহযোগীর ভূমিকা পালন করে। তাই ভাষার ইতিহাস রচনা করার ক্ষেত্রেও চর্যাগান সহযোগী। আবার চর্যার প্রাপ্ত পুথি বাংলা ও নেপালি লিপিতে লেখা। সেয়ানো বাংলা লিপির রূপান্তরের ইতিহাস জানার চর্যাগীতি গুৰুত্ববহ।

অন্যদিকে চর্যার গানগুলি বাংলা সাহিত্যেরও প্রাচীনতম নিদর্শন। সুতরাং বাংলা সাহিত্যের আদিরূপ কেমন ছিল তা জানতেও চর্যাগীতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা কবিতার ছন্দের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে গেলেও চর্যাগান পরিপুরকতার দায়িত্বে উজ্জ্বল। ছন বিশেষজ্ঞরা বাংলা ছন্দের গঠনে চর্যার প্রভাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। এমনকী বাংলা কবিতায় যে অন্ত্যমিলের অস্তিত্ব তার মুলে ও চর্যাগীতি বলে তাঁরা মনে করেন। চর্যায় অনুসৃত রাগ-রাগিনী বাংলা সংগীত রচনার নেপথ্যে ক্রিয়াশীল ছিল। সে বিচারে, বাংলা তথা বাঙালির সংগীত সাধনার পূর্বাপর ধারায় চর্যাগানের রাগ-রাগিনী বিশেষ জায়গা নিয়েছে। চর্যাগানে ব্যবহৃত প্রবাদ এবং চিত্রকল্প উত্তর সময়ের বাংলা ভাষার আসন করে নিয়েছে। সর্বোপরি, প্রাচীন বাংলার সমাজ-ইতিহাস চর্চায় এবং লোকায়ত জীবনের পরিচয় পাওয়ার ক্ষেত্রেও চর্যাগান জরুরি।। হাজার বছরের আগেকার ধর্মীয় ইতিহাসের চালচিত্র সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে চর্যাগীতি নিঃশেষিত স্থান জুড়ে আছে।

চর্যাপদে বৌদ্ধধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব ও সাধনপদ্ধতি প্রকাশিত হলেও এর মধ্যে নিয়ে তৎকালীন সমাজের পরিচয়ও পাওয়া যায়। এক্ষেত্রেও চর্যার ঐতিহাসিক মূল্য অস্বীকার করা যায় না। যেমন,, এই পদটি নগর বাহিবি রে ভোগী তোহরি কুড়িয়া (১০) থেকে বোঝা যায় গ্রামের প্রত্যন্তে বাস ছিল অভাজনের। বাংলাদেশ তখনও ছিল নদীবহুল তাই চর্যায় বার বার এসেছে নৌকা (৮), নৌকা বাওয়া (৫, ৩৮) প্রভৃতির উল্লেখ সোনে ভারতী কৰুণা নারী (৮) রূপা থোই নাহিক ঠাবী ।।

মদ্য বিক্রয় (৩), তুলা ধুনা (২৬), নট বৃত্তি (১৭) বাঙালির এইসব পেশার উল্লেখ আছে অনেক চর্যার আছে সেই সময়ের বিনোদন – ধর্মাচরণ 'আগম গোষ্ঠী টम (80) প্রভৃতির উল্লেখ নাতনের কথাও আছে (বিটেড ও খাটা বি বলয়া') (৩৮) আছে বাসনপত্রের কথা—হাড়ী (৩৩), পিঠা, দোহন পাত্র (৩৩) প্রভৃতির কথা। তাই চর্যাগীতিসমূহ সামাজিক ইতিহাসের দিক দিয়েও মুল্যবান।

চর্যাপদের কবিরা সাহিত্যিক ছিলেন না, ছিলেন সহজিয়া সাধক। তথাপি তাঁরা তাঁদের পদের মধ্যে নীরস ধর্মীয় তত্ত্বকথাকে অতিক্রম করে মানব ও প্রকৃতির যে রূপ অঙ্কন করেছেন, তাতে ফুটে উঠেছে অপূর্ব সাহিত্যগুণ। জীবন থেকে উপমা নিয়ে তাঁরা সমস্ত বিষয়কে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আর সেখানেই চর্যাগীতি হয়ে উঠেছে, সাহিত্য গুণান্বিত। কয়েকটি উদাহরণ দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, যেমন ২৮ সংখ্যক চর্যায়— উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই সবরী বালী। মৌরলা পীচ্ছ পরহিণ শবরী গীবত গুণ্ডরীমালী ॥আমাদের সময়ের কবি সমকাল দিয়ে অনুবাদ করে নেন এভাবেউঁচু উঁচু সব পাহাড় চূড়ায় সে এক শবরীবালা। ময়ূর পাখনা পরে আছে তার গলায় রয়েছে গুপ্তমালা।।

মত শহর পাগল শর বা কোরো না আমাকে আর।। মণী আপন ঘরনী ও যে তোমার।এই সুন্দরীকে পাওয়ার জন্যে শহরের আকুলতা এবং মিলন ব্যাকুলতা। দরিদ্র সংসারের বচিত্র অঙ্কনে ও দক্ষ চর্যার কবি এইসব ক্ষেত্রে সহজেই পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে নিতে সমর্থ হয়েছেন, যেমন টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী। হাঁড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।(আবার শব্দবিন্যাসে ও রূপনির্মাণেও নিপুণ ছিলেন চর্যাকারগণ। বাজ এ অলোসহি হেৰুত্ব বীণা / মুনি তান্তিধনি বিলসইরুনা'। এখানে ন-এর বিন্যাসে যেন বীণাধ্বনি অনুভব করা যায়।

ভবনই গহন গভীর বেগে বাহী।/ দুআন্তে চিখিল মাঝে ন থাহী।'—এইসব পঙ্ক্তিতে বাস্তব হয়ে উঠেছে দূরন্ত স্রোতস্বিনীর চিত্র। তাই আমরা বলতে পারি সাধক হলেও চর্যাকারা ছিলেন কবি, তাই তাঁদের রচনা সাহিত্যগুণেও ন্যূন নয়।

চর্যাপদের কয়েকজন প্রধান কবি হলেন

• লুইপা

চর্যাগীতিতে মোট কুড়ি নান রচয়িতার মধ্যে প্রথম হলেন লুইপাদ, ২৯ সংখ্যক চর্যাটি তাঁর রচনা, এঁকে আদি চর্যাকার বলা হয়। তিব্বতি গ্রন্থ তেঙ্গুর-এর মতে লুইপাদ বাঙালি এবং মগধবাসী। রাঢ় বাংলায় ধর্মপূজাকালে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সলো উল্লিখিত হয়। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জেও তাঁর পূজা প্রচলিত, সম্ভবত দশম শতকে তিনি বর্তমান ছিলেন।

• কাহ্নপাদ বা কাহ্নপাদ

চর্যাগীতিতে কাহ্নপাদের মোট তেরোটি পদ আছে। তাঁকে চর্যার গীতিকারদের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ বলা হয়। কল্পাচার্য (কৃষ্ণপাদ) ও কৃষ্ণবান্ন নামে দুই কবির লেখা পাওয়া গেছে 'দোহাকোষ-এ। এই কবি এবং চর্যার কাহ্নপাদ সম্ভবত একই ব্যক্তি। আনুমানিক ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর আবির্ভাব বিদ্যানগরে, মতান্তরে সোমপুরে।

• ভুসুকপাদ বা ভুসুকুপাদ পণ্ডিতদের মতে ভুসুকু একটি ছদ্মনাম। মগধের রাউত' (সেনাপতি) সৌরাষ্ট্রের রাজপুত্র শান্তি পরিণত বয়সে নালন্দার ভিক্ষু হন। তাঁর শান্ত স্বভাবের জন্যে নাম হয় ভুসুকু, পূর্বের নাম 'রাউত ভুসুক'। ভুসুকু রচিত তেরোটি চর্যার মধ্যে উল্লেখ্য ৪র্থ সংখ্যক চর্যা। এখানে পদ্মানদী আর 'বঙ্গালী'-র উল্লেখ আছে। সম্ভবত তাঁর গুরু ছিলেন জালম্বরিপাদ। কাহ্নপাদ রচিত চর্যাগীতিগুলিতে হরিণ শিকার, ইঁদুরের উপদ্রব, নগর-উপাত্তে ডোম্বীর বাস, কাপালিক নানা প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে।।