অধ্যায়-2, তেলেনাপােতা আবিষ্কার

রাস্তা থেকে নেমে আপনাকে এবার সেই ভিজে জলার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।

আপনার সামনে দৃশ্যমান কাদাজলের যে নালা তা কিছুটা দূরে গিয়ে দু-পাশের বাঁশ-ঝড় আর বড়ো বড়ো ঝাঁকড়া গাছের মধ্যে অবলুপ্তি পাবে।

তেলেনাপোতা আবিষ্কারের জন্য আরও দুজন বন্ধু ও সঙ্গীর উপস্থিতি আবশ্যক বলে গল্পকার মনে করেন।

আপনারা যখন তিনজন মিলে উৎসুকভরে নালার দিকে চেয়ে মশার কামড় থেকে পা রক্ষা করতে ব্যস্ত সেই অবস্থায় সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে আপনারা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাবেন।

এখানে যে শব্দের জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠার কথা বলা হয়েছে তার উৎস সামনের বোবা জাল আর সেই শব্দের স্বরূপ হল অপরূপ শ্রুতিবিস্ময়কর ও নিংড়ে বের করে আনা এক অমানুষিক কান্না।

প্রথমে একটা ক্ষীণ আলোর দোলানি আবছা অন্ধকারের মধ্যে দৃশ্যমান হবে আর তারপর একটা গোরুর গাড়ি সেই জঙ্গলের মধ্য থেকে বেরিয়ে আপনাদের প্রতীক্ষা সার্থক করে তুলবে।

গাড়ি ও গোরুগুলি সম্পর্কে জানাতে গিয়ে লেখক বলেছেন—যেমন গাড়িটি তেমনি গোরুগুলি, মনে হবে পাতালের কোনো বামনের দেশ থেকে গোরুর গাড়ির এই ছোট্ট সংস্করণটি বেরিয়ে এসেছে।

উদ্ধৃতিটিতে যে সমস্যার কথা বলা হয়েছে তাহল—এই ছোট্ট গোরুর গাড়িতে ছই-এর মধ্যে তিনজনে প্রবেশ করে স্বল্পতম স্থানে কীভাবে সর্বাধিক বস্তু স্থাপন করা সম্ভব তার আলোচনা।

বিস্মিত হয়ে দেখা যাবে—ঘন অন্ধকার অরণ্য যেন সংকীর্ণ একটু সুড়ঙ্গের মতো পথ সামনে একটু একটু করে উন্মোচন করে দিচ্ছে।

প্রতি মুহূর্তে যে কথা মনে হবে তা হল—কালো অন্ধকারের অভেদ্য দেয়াল ভেদ করে গোরুর গাড়িটি অবিচলিতভাবে ধীর মন্থর গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।।

গোরুর গাড়িটি ছোটো, তাতে যাত্রীরা অত্যন্ত ঘেঁষাঘেষি করে বসে, তার ওপর রাস্তাও অমসৃণ একারণেই বন্ধুদের সঙ্গে অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষ বাধবে।

চারধারের জগৎ সম্পর্কে আপনার মনে হবে- আপনি পরিচিত পৃথিবী থেকে অনেক দূরে এমন স্থানে এসেছেন যেখানের সৎ অনুভূতিহীন কুয়াশাময়, এখানকার সময় স্রোতহীন স্ত, এমনকি গাঢ় অন্ধকারে আপনার চেতনার শেষ অন্তরীপটিও নিমজ্জিত।

ক্যানেস্তারা পিটিয়ে বাঘ-তাড়ানো সম্পর্কে গাড়োয়ান বলবে বাঘ মানে চিতাবাঘ, নিতান্ত ক্ষুধার্ত না হলে এর শব্দেই তাকে দূরে রাখা সম্ভব।

গল্পকার কৃষ্ণপক্ষের বিলম্বিত ক্ষয়প্রাপ্ত চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা নির্বাক মহাকালের সাক্ষ্যবহনকারী প্রাচীন অট্টালিকার থাম, খিলান বা মন্দিরের ভগ্নাবশেষকে। নির্দেশ করেছেন।

উদ্ধৃতিটিকে থাকা ‘যেমন' শব্দের যারা গল্পকার তেলেনাপোতা আবিষ্কারে যাওয়া অভিযাত্রীদের মনে হওয়া অফুরন্ত রাতের গহ্বরে নিবিড় অনাদি অনম্ভ পুষ্পতায় সব কিছুর নিমগ্ন অবস্থাকে স্পষ্ট করেছেন।

দু-তিনবার মোড় ঘোরার পর গাড়ি যেখানে থামবে সেখানে এসে স্বল্পপরিসর গাড়ি থেকে কোনোরকমে হাত-পা-গুলো কুড়িয়ে কাঠের পুতুলের মতো আড়ষ্টভাবে আপনারা এক এক করে নামবেন।

পানা-পচা গন্ধ ছড়ানো নাতিক্ষুদ্র পুকুরের পাশে বিশালায়তন একটি জীর্ণ অট্টালিকা ভাঙা ছাদ, ধসে পড়া দেয়াল ও চক্ষুহীন কোটরের মতো পাল্লাহীন জানালা নিয়ে দুর্গ-প্রাকারের মতো চাঁদের বিরুদ্ধে। দাঁড়িয়ে আছে।

 

গাড়োয়ান আপনাদের জন্য একটি ভাঙা লণ্ঠন ও সেই সঙ্গে এক কলসি জল ব্যবস্থা করে দেবে।

ধ্বংসাবশেষেরই একটি অপেক্ষাকৃত বাসযোগ্য ঘরে যেখানে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সেখানে ঢুকে বুঝতে পারবেন—বহুযুগ পরে মানব জাতির প্রতিনিধি হিসেবে আপনারাই এখানে প্রথম পা রাখছেন।

যে ঘরে আপনারা থাকছেন সেই অপরিচ্ছন্ন স্কুল, জাল, ধুলো ভরতি ঘরের মধ্যে সামান্য চলাফেরা ফলে ছাদ ও দেয়াল থেকে জান পলস্তারা বা প্লাস্টার আপনাদের ওপর বর্ষিত হবে।

তেলেনাপোতা আবিষ্কারের জন্য যে দুজন বন্ধু আবশ্যক তাদের একজনের বৈশিষ্ট্য হবে সদা পানাসক গুণে সমৃদ্ধ ও পানপাত্রে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে ব্যস্ত আর অন্যজন অত্যন্ত ঘুমকাতুরে কুম্ভকর্ণের ন্যায় ঘুমের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

বিচক্ষণতার গুণে গুণান্বিত হলে আপনি মশাদের বসবার বিশিষ্ট ভঙ্গি দেখে, তাদের স্বাতন্ত্র্য্য দেখেই মশাদের মধ্যে বড়ো কুলীন ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিসিলদেরকে চিনতে সক্ষম হবেন।

ছাদে দেখা যাবে বেশিরভাগ স্থানের আলিসা ভেঙে ধূলিসাৎ ফাটলে অরণ্যে পঞ্চমবাহিনী শিকড় ঢুকিয়ে অট্টালিকা ধ্বংসের কাজ অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছে।

কৃয়পক্ষের ক্ষীণ আলোর মোহময় আবেশে যা টের পাওয়ার কথা গল্পকার বলেছেন তাহল—এই মৃত্যু সুষুপ্তিমগ্ন মায়াপুরীর কোনো এক কক্ষে বন্দিনী রাজকুমারী সোনা ও রূপার কাঠি পাশে নিয়ে যুগান্তের গাঢ় ঘুমে অচেতন।

তেলেনাপোতা আবিষ্কারে যাওয়া অভিযাত্রীদের অবস্থানগৃহের ছাদ থেকে সামান্য দূরে সংকীর্ণ রাস্তার ওপারে ভগ্নস্তূপ মনে হওয়া বাড়ির একটি জানালায় ছায়ামূর্তি এসে দাড়াবে।

আসল উদ্দেশ্য বিস্মৃত না হয়ে আপনি এক সময় ষোড়শোপচারের আয়োজন করে মাছ ধরার জন্য পুকুরের ভাঙাঘাটের পাশে গিয়ে বসে বড়শি ফেলবেন।

মৎস্য শিকারি আপনাকে সন্ত্রস্ত করে একটি মোটা লম্বা সাপ ভাঙা ঘাটের ফাটল থেকে বেরিয়ে ধার গতিতে পুকুরটা সাঁতরে পার হয়ে ওপারে যাত্রা করবে।

দুটো ফড়িং নিজেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাতলা কাচের মতো পাখনা নেড়ে মাছ ধরার সুতোয় লাগানো ফাৎনার ওপর বসার চেষ্টা করবে।

মাছরাঙা পাখি ব্যর্থ মৎস্য শিকারিকে তার নিজের সার্থক মাছ শিকারের কৌশলে উল্লসিত হয়ে বিদ্রুপ করবে আর ঘুঘু তার উদাস করা ডাকে তাকে আনমনা করে তুলবে।

জলের শব্দে চমক ভাঙার পর আপনি দেখবেন— নিথর জলে ঢেউ উঠেছে, ছিপের ফাৎনা মৃদুমন্দভাবে দুলছে, আর ঘাড় বেঁকিয়ে একটি মেয়ের পিতলের ঘড়ায় জল ভরতে দেখা যাবে।

মেয়েটির দিকে তাকিয়ে অনুভূত হবে জীবনের সুদীর্ঘ নির্মম পথ সে পার হয়ে এসেছে, আর কেশোর অতিক্রম করলেও যৌবনের গতি তার দেহে স্থগিত থেকে গেছে।

পুকুরঘাটে অপরিচিত মেয়ের হঠাৎ ছিপে টান দিতে বলা এবং তার শান্ত মধুর ও গম্ভীরভাবে থেকেই আলাপ করা এই ব্যাপারটিই হল স্বাভাবিক।

পুকুরের মাছেরা, শক্তি-সামর্থ্যের ব্যর্থতার কারণে গভীর অবস্থার কারণে মৎস্য শিকারির সঙ্গে যার দ্বিতীয়বার প্রতিযোগিতায় নামতে চাইবে না।

কিছুক্ষণ আগে পুকুরঘাটে একটি মেয়ের জল নিতে আসা, তার কথা বলা এবং তার শান্ত ধীর পদে ঘটি থেকে চলে যাওয়া বিষয়টিই আপনার কাছে অবাস্তব ঘটনা মনে হবে।

ঘরে ফিরে আপনার অর্থাৎ মৎস্য-শিকারির মৎস্য-শিকার-নৈপুণ্যের বৃত্তান্ত সবার জেনে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

 

মৎস্য-শিকারের ব্যর্থতার বৃত্তান্তের সঙ্গে বৃত্তান্তদানকারী যামিনীর সঙ্গে পান-রসিক বন্ধুর জ্ঞাতিসম্পর্ক ও তাদের বাড়িতেই দুপুরবেলার খাবারের ব্যবস্থা হওয়ার কথা শোনার বিষয়ে বলা হয়েছে।

আপনার অভাবিত বিষয়টি হল-রাত্রির মায়াবরণ ভেদ করে বা স্থানটির নগ্নরূপ কুৎসিতভাবে ফুটে ওঠা।

যে বাড়িতে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে সেই বাড়িটাই হল যামিনীদের এবং সেখানেই আপনাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে জেনে আপনি অবাক হবেন।

খুব কাছে থেকে যামিনীকে দেখে যে বিষয়টি আপনার চোখে বেশি করে পড়বে তাহল আগে কখনও চোখে না পড়া তার মুখের করুণ গাম্ভীর্য।

যামিনীর মা ওপরতলার ঘর থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে বারবার যামিনীকে ডাকছিল বলেই সে ব্যস্ত হচ্ছিল ও বাইরে যাচ্ছিল।

মায়ের কাছ থেকে প্রত্যেকবার ফিরে আসবার পর তার চোখে-মুখে অসহায় অস্থিরতা ও আরও গভীরতর বলে মনে হবে।

মণিদা হল তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পের পান-রসিক বন্ধুটি আর উদ্ধৃত কথাটির বরা হল যামিনী।

অত্যন্ত কাতর স্বরে যামিনী তার মণিদাকে বলছিল যে, মা কিছুতেই শুনছে না, তাদের আসার খবর পাওয়ার পর থেকেই ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে ।

কথাটির বক্তা মণি অত্যন্ত বিরক্তভাবে কথাটি বলেছে।

যামিনীর মা তাকে নিরঞ্জনকে ডেকে দেবার কথা বলেছে।

যামিনীর মা অন্ধ হওয়ার পর তাকে নিরঞ্জনের ব্যাপারে কিছু বলে বোঝানোর চেষ্টা করলেও সে বোঝে না।

মুশকিলটি হল নিরঞ্জনের ব্যাপার নিয়ে অন্ধ যামিনীর মাঝে বোঝাতে গেলে রেগে-মেগে মাথা খুঁড়ে এমন কাণ্ড করে যে তার প্রাণ বাঁচানোই কষ্টকর হয়ে ওঠে।

যামিনী তার মণিদাকে যে অনুনয় জানাবে তার বিষয় হল সে যেন নিজে গিয়ে তার মাকে বুঝিয়ে একটু ঠান্ডা করে আসে।

উদ্ধৃতিটির বক্তার নাম মণি, এ প্রসঙ্গে তার বলা অন্য কথা হল বুড়ির হাত পা পড়ে গেছে, চোখ নেই তবুও কিছুতেই মরবে না বলে পণ করে বসে আছে।

বিরক্তির স্বরে বলা মণির কথা থেকে যামিনীর সম্পর্কে জানা যায় যামিনীর মায়ের দূর সম্পর্কের বোনপো নিরঞ্জনের সঙ্গে যামিনীর বিয়ের ঠিক হয়, আর বুড়িও সেই আশায় বুক বেধে এই অঙ্গারপুরীতে বসে দিন গুনছে।

প্রশ্নোক্ত প্রশ্নের সম্ভাব্য জবাবের থেকে জানা যাবে—নিরঞ্জন কোনোকালে বিদেশে যায়নি, সে নাছোড়বান্দা বুড়িকে ধাপ্পা দিয়ে পালিয়েছে—এমন ঘুঁটে কুড়ুনির মেয়েকে উদ্ধার করার তার কোনো দায় নেই, বরং সে বিয়ে-থা করে দিব্যি সংসার করছে।

আপনার পান-রসিক বন্ধু পুরো ব্যাপারটি বলতে যখন যামিনীর মায়ের ঘরের দিকে পা বাড়াবে তখন আপনি একথা বলবেন।

উক্তিটির বক্তা যামিনীর মা। এই কথার তার বলা কথাগুলি হল—'অভাগী এতদিনে পড়ল, আসবি প্রাণটা আমার কণ্ঠায় নিশ্চিত হয়ে মরতে পারছি না।"

মুখ তুলেও যামিনীর মাকে আপনার দেওয়া কথার ফলে মণির বিমূঢ়তা ও স্থাণুর মতো যামিনীর স্তম্ভিত বিস্ময় আপনি অনুভব করতে পারবেন ।

অন্ধ দিকে তাকিয়ে মনে হবে তার শূন্য কোটরের ভেতর কালো বেরিয়ে এসে আপনার সর্বাতা লেহন করছে কটি মুহূর্ত ধীরে সময়ের সাগরে শিশিরবিন্দুর ঝরে অনুভূতি হবে।

মরণোন্মুখ অন্ধ বৃদ্ধা বোঝে যামিনী সব জ্বালা-যন্ত্রণা-অসহায়তা সহা করেও যেভাবে তার মায়ের সেবা করছে তা সর্বগুণান্বিতা সহনশীল মেয়ের পক্ষেই সম্ভব। জীবনের বাস্তবতায় বৃদ্ধা যামিনীর বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করেই এই মন্তব্য করেছে।

শুধুমাত্র নিজের মেয়ে হিসেবে যামিনীকে বিচার না করে অন্ধ বৃদ্ধা অনুভব করেছে— শোকে তাপে বুড়ো হয়ে মাথার ঠিক না থাকা সত্ত্বেও দিনরাত খিটখিট করে মেয়েটিকে সে যা যন্ত্রণা দেয় তাতেও সে রা কাড়ে না—কোনো উত্তর দেয় না নীরবে সব সহ্য করে—মেনে নেয় মোট কথা সব কিছু বোঝে।

এরই মধ্যে বলতে লেখক লোকবসতি বিরল শ্মশানের নিস্তব্ধতা সমৃদ্ধ পরিত্যক্ত ভগ্নদশায় ধ্বংসপ্রাপ্ত যামিনীদের বাড়িকে বুঝিয়েছেন।

একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এতসব কিছু শোনবার পরেও একবার যামিনীর মুখের দিকে তাকাতে আপনি অক্ষম হবেন।

তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পে যামিনীর মানের শেষ কথা- "যামিনীকে তুই নিবি তো বাবা! তোর শেষ কথা না পেলে আমি মরেও শান্তি পাব না।"

প্রশ্নোক্ত উক্তির বক্তা যামিনীর এই কথার উত্তরে আপনার যে কথা তাহল- “থাক না। এবারে পারিনি বলে তেলেনাপোতার মাছ কি বারবার ফাঁকি দিতে পারবে।"

আপনাদের বিদায়বেলায় বিকেলে গোরুর গাড়িতে উঠে যামিনীকে শেষ কথা বলে যখন অপূর্ব আনন্দ নিয়ে ফিরে আসবেন তখন সে এরকম আচরণ করবে।

বিদায়ক্ষণে যামিনীর মুখ ফিরিয়ে না নেওয়ায় আপনার মনে হবে তার চোখের ভেতর একটি সকৃতজ্ঞ হাসি শরতের শুভ্র মেঘের মতো নিজের হৃদয়কে স্নিগ্ধ করে ভেসে যাচ্ছে।

আপনার বন্ধুরা চলন্ত গাড়িতে যে বিষয় আলোচনা করবেন বলে গল্পকার জানিয়েছেন তাহল— কবে একশো না দেড়শো বছর আগে, প্রথম ম্যালেরিয়ার মড়কের এক দুর্বার বন্যা তেলেনাপোতাকে চলমান জীবন্ত জগতের এই বিস্তৃতি বিলীন প্রান্তে এনে ফেলেছিল।

বাড়ি ফেরার পথে গোরুর গাড়ির সংকীর্ণতা আপনাকে আর পীড়িত করবে না।

মহানগরের আলোক উজ্জ্বল পরিবেশে কয়েকটি দিন কাটানোর পর বাধা-বিভূষিত জীবন আপনার মনের আকাশে কুয়াশা জমিয়েছে কিনা তা আপনি টের পাবেন না।

সব বাধা কাটিয়ে আবার তেলেনাপোতা ফিরে যাওয়ার মুহূর্তে মামা যা নিয়ে কাঁপুনিসহ শাহে লেপতোষক মুড়ি দিয়ে আপনাকে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে বিছানায় শয্যা নেবেন।।

উত্তর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত আপনি থার্মোমিটারের পাতায় জানবেন আপনার জ্বর একশো পাঁচ ডিগ্রি আর সেই সঙ্গে ডাক্তারের বলা ম্যালেরিয়াটি কোথা থেকে রাগালেন শুনলে আপনার আচ্ছন্ন হওয়ার দশা হবে ।

ম্যালেরিয়া-মুক্ত আপনি বহুদিন বাদে দুর্বল শরীর নিয়ে বাইরের আলো-হাওয়ায় কম্পিত পদে যখ বসবেন তখন দেখা যাবে অজ্ঞাতসারেই আপনার দেহ ও মনের অনেক ধোয়া-মোছা হয়ে গেছে।

ম্যালেরিয়া থেকে ওঠার পর তেলেনাপোতার স্মৃতি আপনার মন থেকে অস্ত যাওয়া তারার মতো ঝাপস একটা স্বপ্ন বলে মনে হবে আর তখন আপনার অভিব্যক্তি হবে— তেলেনাপোতা বলে সত্যিই কিছু নেই।

যামিনী সম্পর্কে আপনার শেষ সিদ্ধান্ত হবে ধ্বংসপুরীতে দেখা সেই রহস্যময় ছায়ার মতোই খামিন হ্যাতো আপনার কোনো দুর্বল মুহূর্তের অবাস্তব কুয়াশাময় কল্পনামাত্র।

তেলেনাপোতা আসলে অনুভূতিপ্রবণ কবিমনের শাশ্বত কাব্যিক অনুভূতি তাই একবার ক্ষণিকের জন আবিষ্কৃত হয়ে তেলেনাপোতা আবার রাত্রির অতলতলায় নিমগ্ন হয়ে যাবে।

তেলেনাপোতা আবিষ্কার কল্লোলযুগের সার্থক কবি ও গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের একটি সার্থক বলিষ্ঠ সৃষ্টি। এটি আদর্শ সার্থকনামা গল্প। শহুরে নাগরিক জীবনে অত্যন্ত অনামী এক নায়ক চরিত্রের মহৎ মানবিক আবেগকে কেন্দ্র বিবর্ধিত ও সুপরিণত। তবে গল্পকার তেলেনাপোতা আবিষ্কারের জন্য কিছু শর্তও রেখেছেন। শর্তগুলি নিম্নরূপ এলেনাপোতা আবিষ্কারের জন্য শনি বা মঙ্গলবারকে বেছে নিতে হবে। =বিষ্কারে যাওয়ার জন্য আপনার সঙ্গে আরও দুজন বন্ধু বা সঙ্গী থাকা উচিত। অবশ্য তাদেরকে যে মৎস্যলু এই হবে এমন কথা নেই।

(গ) আপনাকে অবশ্যই নিত্যনৈমিত্তিক কাজের ভিড়ে হাঁফিয়ে ওঠার পর যে অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হাবে তার থেকে মুক্তি নিয়ে কমপক্ষে দু-দিনের ছুটি নিয়ে আপনাকে এই আবিষ্কারে যেতে হবে। (ঘ) আপনার বন্ধুদের কেউ একজন অবশ্যই জানাবেন পৃথিবীর আশ্চর্য সরোবরের সরলতম মাছেদের বড়শি বিশ্ব হওয়ার জন্য আপন হৃদয় নিয়ে উৎসাহী থাকবার কথা।

(৫) মাছ ধরবার ব্যাপারে আপনার বিশাল কোনো অভিজ্ঞতা থাকবার দরকার নেই; সামান্য দু-চারটে পুঁটি টেনে। তোলবার সৌভাগ্য থাকলেও চলবে। (চ) তেলেনাপোতা আবিষ্কারের জন্য আপনাকে বিকেলবেলার পড়ন্ত রোদে জিনিসে মানুষে ঠাসাঠাসি একটা বাসে গিয়ে উঠতে হবে। তারপর ভাদ্রমাসের গরমে রাস্তার ঝাঁকুনি খেয়ে ঘামে ধুলোয় চটচটে দেহ নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক যাত্রার পর আচমকা রাস্তার মাঝখানে কোনো একটা নীচু জলার মতো জায়গায় ধারে নামতে হবে। এইসব শর্তসাপেক্ষে যে কেউ কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে তেলেনাপোতা আবিষ্কারে সমর্থ হবেন। তেলেনাপোতা গল্পের নায়ক চরিত্র এই সব শর্তসাপেক্ষে এক পান-রসিক বন্ধু ও এক ঘুম-কাতুরে বন্ধু নিয়ে তেলেনাপোতা আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছিল। যাত্রাপথ একই কিন্তু যাত্রা সেথাই শেষ হয়। তারা নীচু জলাস্থানে মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়েও দীর্ঘক্ষণ প্রতীক্ষার পর এক নালা বেয়ে গোরুর গাড়ির আগমন দেখতে পেল। তাতে ঠাসাঠাসি করে উঠে পড়ে ভয়সংকুল রাস্তা অতিক্রম করে তারা সব শেষে ধ্বংসোন্মুখ এক বাড়ি গিয়ে হাজির হল। সেখানকার অপেক্ষাকৃত বাসযোগ্য ঘরে অবস্থান করে নায়ক চরিত্র ওই রাতেই অনতিদূরের বাড়ির এক জানালায় রহস্যময় ছায়ামূর্তি দেখল। পরদিন মাছ ধরতে গিয়ে মাছরাঙার উপহাসে বিশ্ব হয়েও মাছ না ধরতে পারার লজ্জা নিয়ে বাড়ি এসে সবার সামনে আর এক প্রস্থ অপ্রস্তুত হল। শেষে গতরাতের রহস্যময়ী মূর্তির রহস্য অবিবাহিতা বাকদত্তা যামিনীর রূপ নিয়ে উন্মোচিত হয়। ধীরে ধীরে মনের তীব্র আবেগে নায়ক যামিনীর মায়ের কাছে যামিনীর বহু প্রতীক্ষিত অতিপ্রিয়জন হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। তেলেনাপোতা থাকাকালীন নায়কের কোনো সমস্যা হয় না কিন্তু শহরে ফিরে আসার পর ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে অবসন্ন হওয়ায় তার মন থেকে ধীরে ধীরে তেলেনাপোতার স্মৃতি হারিয়ে যেতে থাকে। সব শেষে নায়ক আবিষ্কৃত তেলেনাপেতা আবার চিরন্তন শাশ্বত রাত্রির অতলতলায় নিমগ্ন হয়।

তেলেনাপোতা আবিষ্কারের জন্য বেরিয়ে পড়া গল্পের নায়ক সহ তিন বন্ধুদের প্রতীক্ষা করার কথা বলা আছে। তারা যাত্রাপথে সহসা রাস্তার মাঝখানে এক নীচু জলার কাছে নেমে পড়ে। লা সাঁকোর ওপর দিয়ে তাদের বাসটিও অদৃশ্য, ঘন জঙ্গল হেতু চারিদিকে অন্ধকার, সেই সঙ্গে একটা ভিজে ভ্যাপসা আবহাওয়ায় মন অতিষ্ঠ। সামনে ঘন জঙ্গলের মধ্যে একটা নালা কাঁটা, সেটিও কিছু দূরে গিয়ে বাঁশ ঝাড় আর ঝোপের মধ্যে হারিয়ে গেছে। নালার সামনে উৎসুকভাবে অপেক্ষমান তিন বন্ধু মশার কামড়ে তিতিবিরক্ত আর মাঝে মধ্যে পায়ের সঙ্গে পা ঠুকে তাদের দূরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে। আর সপ্রশ্ন চোখে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে অজানা কোনো প্রতীক্ষায়। মশাদের ঐকতান তীক্ষ্ণতর হবে, ঘনায়মান অন্ধকারে পরস্পরের মুখও একসময় অদৃশ্য— এমত অবস্থায় যখন ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছে তখনই ঘন জঙ্গল থেকে অপরূপ শ্রুতি বিস্ময়কর এক আওয়াজ শোনা যাবে। মনে হবে বোবা জঞ্জাল থেকে কেউ একজন এই অমানুষিক কান্না নিঙড়ে বের করছে। গল্পকার এমত পরিস্থিতিতে সেই নালার পাশে প্রতীক্ষা করার কথা গল্পে বলেছেন।

প্রতীক্ষার অবসান ঘটার পর প্রথমেই আবছা অন্ধকারের মধ্যে একটি ক্ষীণ আলোর দোলানি দেখা যাবে। তারপর দেখা যাবে একটি গোরুর গাড়ি জঙ্গলের ভেতর থেকে নালা দিয়ে মন্থর দোদুল্যমান গতিতে বেরিয়ে আসছে। গোরুগুলি তার গাড়ির মতো। মনে হবে পাতালের কোনো বামনের দেশ থেকে গোরুর গাড়ির এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণটি বেরিয়ে এসেছে। কালবিলম্ব না করে এই গাড়িতেই ওঠা গেল—স্থান অকুলান, অথচ ভিন্ন উপায় নেই দেখেও কোনো রকমে হাত, পা মাথা গুঁজে চরম অস্বস্তির মধ্য দিয়ে এগোতে হল। গোরুর গাড়িটি কালো অন্ধকারের দেয়াল ভেদ করে পথ পার হয়ে লক্ষ্যে। পৌঁছাল। মাঝে মধ্যে গাড়োয়ানের বাঘতাড়ানো ক্যানেস্তারা পেটানোর আওয়াজ ছাড়া কোনো শব্দ নেই |

যাত্রাপথে কৃয়পক্ষের বিলম্বিত ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের আলোয় রাস্তার দু-পাশের বিশাল মৌন প্রহরীরা সরে যাবে। কোথাও প্রাচীন অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ থাম, খিলান, মন্দিরের ভগ্নাংশকে মহাকালের সাক্ষ্যরূপে দেখা যাবে। এভাবে যেতে যেতে কত না কল্পনার অবাস্তবতায় প্রকটিত হয়ে মনকে আচ্ছন্ন করে তেলেনাপোতায় পৌঁছাতে হবে। এখানে রাতের শেষ নেই, কখনও শেষ হয় বলেও মনে হবে না। অনুভূতিতে স্পষ্ট হবে এখানকার সবকিছুই নিবিড় অনাদি অনন্ত স্তত্থতায় নিমগ্ন। সবশেষে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানো গেল। দু-তিনবার মোড় ঘুড়ে গোরুর গাড়ি একটি স্থানে তার যাত্রা শেষ করল যাত্রীরাও আড়ষ্ট হাত-পাগুলিকে কুড়িয়ে কাঠের পুতুলের মতো নেমে গেল। পানা পুকুরের পচা কটু গন্ধের সাদর আহ্বানে, গাড়োয়ানেরই আনুকুলো ধ্বংসপ্রায় অট্টালিকার একটি অপেক্ষাকৃত বাসযোগ্য ঘরে তারা উঠল। একইসঙ্গে অনুভব করল বহুযুগ পরে । তারাই প্রথম মনুষ্যজাতির প্রতিনিধি হিসেবে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে তেলেনাপোতা এসে পৌঁছাল।

মহাকাল' হল অনবচ্ছিন্ন সময়। আবার শিবের রূদ্র রূপও মহাকাল হিসেবে চিহ্নিত। আসলে সময়ের আবর্তে জগতে যা কিছু ঘটে তার যেমন উদ্ভব আছে তেমনি স্থিতি ও প্রলয়ও আছে। সময়ের অভিঘাতে মানুষ জীবনের দুঃখ যন্ত্রণা, ব্যথা বেদনা ভুলে যায়। সময়ের সঙ্গে আগত সুখও একসময় সময়ের আবর্তেই শেষ হয়। মোদ্দা কথা সময়ই হল। ব্যক্তি মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দের নিয়ন্ত্রক। আজ যা মনে দুঃখ দেয় সেটাই হয়তো আগামীকালের নতুন উপলব্ধির সঞ্চারক হতে পারে। এক্ষেত্রেও সময়ই প্রকৃত অর্থে সার্বিক জ্ঞানের আধার। সময়ের আবর্তেই মানুষ নতুন উপলব্ধি লাভ করে, নতুন মূল্যবোধে জীবনকে উদ্দীপ্ত করে। আবার এই সময়ই তার পরিবর্তন ঘটিয়ে নিত্য নতুন অন্য এক উপলব্ধি আনে, ভিন্ন মূল্যবোধে উত্তীর্ণ করে। তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পেও মহাকালের সেই স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়। তাই স্পষ্ট হয় গ্রামের মধ্যে বিশাল অট্টালিকার প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ। দেখা যায়— ধ্বংসোন্মুখ প্রাসাদের অস্তিম থাম, দেউড়ির খিলা কিংবা মন্দিরের ভগ্নাংশ। আবার এই অবস্থায় এসে গল্পের নায়ক যে মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে পরবর্তীতে সময়ের অভিঘাতে তার সেই মূল্যবোধ মুছে যায়। এক্ষেত্রে গল্পকার বলেন—“বহুদিন বাদে অত্যন্ত দুর্বল শরীর নিয়ে যখন বাইরের আলো-হাওয়ায় কম্পিত পদে এসে বসবেন, তখন দেখবেন নিজের অজ্ঞাতসারে দেহ ও মনের অনেক ধোয়ামোছা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে।" আসলে মহাকাল রূপ সময় নতুন মূল্যবোধে, কর্তব্য তাকে উদ্দীপ্ত করে তেলেনাপোতার সৃষ্টি পর্যন্ত ঝাপসা। করে দিয়ে রাত্রির অতলতলায় নিক্ষেপ করেছে। মহাকালের এমনই সপ্রভাব বাস্তব স্বরূপ।

মহাকালের সাক্ষ্যরূপকে স্পষ্ট করতে গল্পকার যেখানকার কথা বলেছেন সেখানটি মহানকারী থেকে মাত্র মাইল ত্রিশের দূরে অবস্থিত। যাত্রাপথের আবছা অন্ধকারে সেখানে কৃয়পক্ষের বিলম্বিত ক্ষয়িত স্নান চাঁদ উঠেছে। তারই স্তিমিত আলোয়। আবছা অস্পষ্ট বিশাল সব মৌন প্রহরীরা গাড়ির দু-পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে সরে যাবে। মহাকালের কাছে সাক্ষ্য দেবার ব্যথ আশায় যারা নিশ্চুপ নিস্তদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে তারা হল প্রাচীন অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ, কোথাও একটা থাম, কোথাঃ একটা দেউড়ির খিলান, কোথাও কোনো মন্দিরের ভগ্নাংশ। স্থানটি যেন জীবন্ত পৃথিবীর অতীত কোনো কুয়াশাচ্ছন্ন স্মৃতিলোক মাত্র। এখানের রাত যেন ফুরোয় না। সবকিছু যেন নিবিড় অনাদি অনন্ত স্তদ্ধতায় নিমগ্ন। সমস্তই যেন জাদুঘরের নান প্রাণীদেহের আরকের মধ্যে অবস্থিত। মনে হবে আশেপাশের বেশ বিশালায়তন একটি জীর্ণ অট্টালিকা তার ভাঙা ছাদ, ধ্বসে পড়া দেওয়াল ও চোখহীন কোটরের মতো পাল্লাহীন জানালা দিয়ে চাঁদের বিরুদ্ধে দুর্গ-প্রাকারের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পে 'রাত্রির দেশ বলতে গল্পের নায়কের উপলি করা সেখানকার রাত্রির স্বরূপকে স্পষ্ট করেছেন। এই দেশ সম্পূর্ণভাবে তার রাতের অন্ধকারে, অস্পষ্ট চাঁদের আলোর মায়াবী পরিবেশে স্বপ্নের বিহ্বলতায় দেখা। এ যেন কবি কল্পনার মায়াবী সৌন্দর্যময় দেশ। এখানের সবকিছুই রহস্যময়। এখানকার ঘরগুলো পরিষ্কার হয় না, চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। ঘরটি আবার ঝুল-জাল-ধুলো সমেত স্বমহিমায় অবস্থান করে। লোকের উপস্থিতিতে মায়াবী ঘরের মধ্যে আবদ্ধ অধিষ্ঠাত্রী আত্মা যেন অভিশাপ দেয়। তারই অভিশাপের ফলে চলাফেরার সময় ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। দু-চারটি চামচিকা আপনাদের উপস্থিতির প্রতিবাদ জানাবে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নায়ক অতি সাবধানে টর্চ হাতে করে ভগ্নপ্রায় সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠবে। প্রতি মুহূর্তে ভূপতিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা জেনেও কোনো এক দুর্বার অমোঘ আকর্ষণে তাকে যেতেই হবে। ছাদের অধিকাংশ আলিয়া ভেজে ধূলিসাৎ। ফাটলে ফাটলে অরণ্যের পঞ্চম বাহিনি শিকড় চালিয়ে অট্টালিকা ধ্বংসের কাজ অনেকটা এগিয়ে এনেছে দেখা যাবে। কৃষ্ণপক্ষের ক্ষীণ চাঁদের আলোয় সমস্তই যেন অপরূপ মোহময়। বেশ কিছুক্ষণ তাকালে স্থানটির মৃত্যু সুযুপ্তি মমতা স্পষ্ট হবে। বোঝা যাবে এখানকার কোনো গোপন কক্ষে সোনা ও রুপোর কাঠি সমেত স্বপ্নের রাজকুমারী বন্দিনী হয়ে আছেন। কিছু দূরে সংকীর্ণ রাস্তার ওপারে ভগ্নস্তূপ মনে হওয়া এক জানালায় আলোর ক্ষীণ রেখা দেখা যাবে। মুহূর্তকাল পরে আলোর রেখা আড়াল করে এক রহস্যময় ছায়া মূর্তি সেখানে দাঁড়াবে। কিছুক্ষণ পরে সেটাও থাকবে না। মনে হবে সবই চোখের ভুল। রাত্রির এই দেশটি যেন ধ্বংসপুরীর অতল নিদ্রা থেকে ক্ষণিকের জন্য ভেসে উঠে আবার মিলিয়ে যাওয়া স্বপ্নের একটা বুদবুদ মাত্র।

গল্পকার বর্ণিত তেলেনাপোতা আপাত ঘুমিয়ে পড়া রাত্রির দেশ মনে হলেও এখানেও সকাল হয়। পাখির ডাকে চারিদি ভরে ওঠে। বেলা বাড়ে, বাঁশের ডগায় মাছরাঙা পাখি বসে। তেলেনাপোতার গুঁড়িপানা ঢাকা সবুজ জলেও ঢেউ ওঠে। যামিনী নামের মেয়েটি কলসি ভরে জল নেয়। জল নেওয়ার আগে পানা সরাতে সে নিথর শাস্ত্র জলে ঢেউ সৃষ্টি করে। সমস্ত করে পুকুরের ভাঙা ঘাটের ফাটল থেকে লম্বা মোটা সাপ বেরিয়ে সাঁতরে পুকুর পার হয়। ফড়িং তার পাতলা কাচের মতো পাখনা মেলে উড়ে বেড়ায়। আবার এসবের মধ্যেও উদাস ঘুঘুর ডাকে মানুষের মনও আনমনা হয়ে যায়। সবশেষে বলা হয় তেলেনাপোতা রাত্রির দেশ হলেও এখানে অন্য সব দেশের মতোই দিনমানের প্রকৃতি যথেষ্ট সচল ও স্বাভাবিক থাকে।।

'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পের নায়ক 'রাত্রির দেশে' সকালবেলায় তার মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে শ্যাওলা ঢাকা ভাঙা ঘাটে বসে। তারপর যথোচিত নৈবেদ্য সমেত সে গুঁড়িপানায় সবুজ জলের মধ্যে বড়শি নামিয়ে দেয়। এদিকে বেলা বাড়ে—কিন্তু মাছের খোঁজ নেই। অথচ কিছু দূরে এক মাছরাঙা পাখি অনায়াসে ওই পুকুরের মধ্য থেকে মাছ শিকার করে। হয়তো মাছ ধরতে অক্ষম এই নায়ককে দুর্বোধ্য ভাষায় বিদ্রুপ করতেও ছাড়ে না। এর মাঝে ভাঙা ঘাটের ফাটল থেকে সাপ বেরিয়ে সাঁতরে পুকুর পাড়ি দেয়।

এমন পরিবেশে নায়ক চরিত্রটি আরও অভিনিবেশ সহকারে পুকুরে নামিয়ে দেওয়া কাংনার দিয়ে নজর রাখে। দুটো ফড়িং পাল্লা দিয়ে কাচের মতো পাখনা নেড়ে সেই ফানার ওপর বসবার চেষ্টা করবে। থেকে থেকে উদাস ঘুঘু পাখি ডাকবে আর সেই ডাকে সেও উদাস আনমনা হয়ে পড়বে। প্রাকৃতিক এই পরিবেশের মধ্যে একলা নায়ক কেবলমাত্র মাছ ধরার কাজেই তার সমস্ত মন-প্রাণ ঢেলে দিয়ে বসে থাকবে। অথচ কোনো একটা মুহূর্তে আনমনা হয়ে পড়ার ফাঁকে কখন যে ফাতনা ডুবে গেছে সে খেয়ালই করবে না। অকস্মাৎ জলের শব্দে চমক ভাঙবে। নিথর জলে ঢেউ দেখা দেবে, তার দোলানিতে ফাৎনাও দুলবে। অদূরে একটি মেয়ের কলসে জলভরার দৃশ্য দেখা যাবে সেও মেয়েটিকে দেখবে আবার মেয়েটিও কোনো আড়ষ্টভাবে আক্রান্ত না হয়ে সোজাসুজি নায়কের দিকে ও তার ফাৎনা লক্ষ করবে। তারপর হঠাৎ তার কথায় চমকে উঠতে হবে। বিহ্বলতা কাটিয়ে শোনা যাবে তার কণ্ঠ—সে বড়শিতে টান দিতে বলবে। এভাবেই পুকুরঘাটের এতক্ষণের নির্জনতা এক শান্ত মধুর ও গম্ভীর কণ্ঠের ধ্বনিতে ভেঙে গিয়েছিল।

রাত্রির দেশে সকাল হলেও লোকসমাগম কম; দু-একজন ছাড়া আর কেউ নেই বললেই চলে। তাদের মধ্যে যামিনীই একমাত্র পুকুরে আসার মানুষ। নায়কের বন্ধুরা আসবে না। চারিদিক তাই গভীর নির্জন। পাখির ডাক শোনা গেলেও তাতে কখনও মাছ ধরার অসুবিধা হয় না। মাছের আনাগোনায় কিংবা সাপের সাঁতার কাটায় জ্বলে যে নাড়াচাড়া হয় তাতে জলের ঢেউ ওঠে না। লোকের কন্ঠস্বরে চমক ভাঙবে না—অর্থাৎ যামিনীর চলে যাওয়ার পর পুকুর ঘাটে আর কেউ আসবে না। আসাও সম্ভবপর নয় বলেই গল্পকার নির্দ্বিধায় সিদ্ধান্ত করেছেন— পুকুর ঘাটের নির্জনতা আর ভঙ্গ হবে না তারপর।

উদ্ধৃত বাক্যে যার কথা বলা হয়েছে সে হল যামিনী-বিধবা মায়ের একমাত্র কন্যা। মেয়েটিকে নিরঞ্জন বিয়ে করবে বলে কথা দিয়ে অন্যত্র চলে যায়, আর আসে না। অথচ সে এখনও তার প্রতীক্ষায় অজগরপুরীর ভেতর বসে কোনো মতে প্রাণটা ধরে রেখেছে। তার নিজের কথায়—এই প্রেতপুরী পাহারা দিয়ে দিন গুনছি।

সেই কঙ্কালসার কাঁথাজড়িত তক্তাপোষে শুয়ে থাকা যামিনীর মা বাড়িতে কেউ এলে ভাবে নিরঞ্জন এসেছে। মেয়েকে এবার সে পাত্রস্থ করতে পারবে। কিন্তু সে আসে না। তাই মাকে বুঝিয়ে বলবার জন্য যামিনী তার মণিদাকে অনুরোধ করে। কিন্তু সে তো পরের কথা—যামিনী সমস্ত ব্যাপারটা বুঝে মনে চেপে রেখে দিনরাত মায়ের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করে। যায়। মনে মনে সেও নিরঞ্জনের প্রতীক্ষায় থাকে। হৃদয়ে তার অপ্রকাশিত বোবা যন্ত্রণা। তাই তো নায়ক বারবার উপলব্ধি। করে যামিনীর চোখের অস্থিরতা, সেই সঙ্গে মুখের করুণ গাম্ভীর্য। পরিত্যক্ত বিস্তৃত জনহীন লোকালয়ের সমস্ত মৌন বেদনা যেন তার মুখে ছায়া ফেলেছে। যামিনীর দৃষ্টি যেন এক ক্লান্তির অলসতায় নিমগ্ন। নায়ক উপলব্ধি করে সেও একদিন যেন এই ধ্বংসস্তূপেই ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে।

গল্পের নায়ক যামিনীর সম্পর্কে ইতিপূর্বে উপলব্ধি করেছিল— যামিনীর চোখে কৌতূহল আছে কিন্তু গতিবিধিতে সলজ্জ আড়ষ্টতা নেই। তার বয়স বোঝা যাবে না কিন্তু দেখে মনে হয় জীবনের সুদীর্ঘ নির্মম পথ সে পার হয়ে এসেছে। আরও উপলব্ধি করে তার ক্ষীণ দীর্ঘ অপুষ্ট শরীরে কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনের উত্তীর্ণ হওয়া যেন স্থগিত হয়ে আছে। সেই মুখেও দীপ্ত হাসির আভাস চকিতে দু-একবার অনুভূত হবে।

যামিনীকে নিয়ে নায়কের অনুভূতি এখানেই শেষ নয়—পরিত্যক্ত বিস্তৃত জনহীন পরিবেশে সে তার বিপন্নতা উপলব্ধি করে। তারপর বন্ধু মণির সঙ্গে যামিনীর মাকে নিরঞ্জন হয়ে যখন সে কথা দেয় তখন তার দিকে না তাকিয়েও সে স্থাণুবৎ মেষের মুখে স্তম্ভিত বিস্ময় উপলব্ধি করে। যামিনীর মাকে পরম স্বস্তি নিয়ে নায়ক যামিনীর ওপর দৃষ্টি ফেলে উপলব্ধি করে—তার বাইরের কঠিন মুখোশের আড়ালে তার মধ্যেও কোথায় যেন কি ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। ভাগা ও জীবনের বিরুদ্ধে গভীর হতাশার উপাদানে তৈরি এক সুদৃঢ় শপদের ভিত্তি আলগা হয়ে যেতে আর বুঝি দেরি নেই। শেষ বেলায় নায়কের বলা—'বারবার তেলেনাপোতার মাছ কি ফাঁকি দিতে পারবে' কথাটি যামিনীর ওপর কেমন প্রবাব ফেলল তাও সে উপলব্ধি করে। এবার আর কারুণ্যমাখা মুখ নয়—মনে হবে যামিনীর চোখের ভেতর থেকে মধুর একটি সকৃতজ্ঞ হাসি শরতের শুভ্র মেঘের মতো তার হৃদয়ের দিগন্ত স্নিগ্ধ করে ভেসে যাচ্ছে। আর এই সব উপলব্ধি নিয়েই নায়ক শহরে ফিরে এসেও দীর্ঘদিন স্মরণে রাখবে।

'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পের এই উদ্ধৃতিতে গল্পকার আপনার যে বিষয়টি অনুভূত হওয়ার কথা বলেছেন তা হল—নায়কের বন্ধু মণির বিমূঢ়তা ও তার পাশে একটি স্থাণুর মতো মেয়ে যামিনীর মুখের স্তম্ভিত বিশ্বায়ের উপস্থিতি। আসলে নায়ক যখন যামিনীর মায়ের কাছে মণিকে বাধা দিয়ে কোনো কথা বলতে না দিয়ে অকপটে জানায়—না, সে আর পালাবে না, তখনই তারা এমন বিমূঢ়, স্তম্ভিত ও বিস্মিত হয়ে পড়েছিল।

নায়কের এইরকম অনুভবের প্রধানতম কারণ হল আকস্মিকতা। আর এই আকস্মিকতা উভয়দিক দিয়েই সংঘটিত হয়েছিল। যামিনী বা মণি কেউই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না—নায়ক তো নয়ই। বরং ঘটনাক্রমে একটা অনভিপ্রেত অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে মাত্র।

নিরঞ্জন যে আসেনি, আর কোনোদিন যে আসবেও না—সেটা বুঝিয়ে বলতেই যামিনীর একান্ত অনুরোধে মণি ওপর তলায় তার মায়ের ঘরে যায়। নিতান্ত কৌতূহলবশত নায়কও বন্ধুর সঙ্গী হয়। অবশ্য ভিতরে ভিতরে যামিনীর প্রতি তার যে একটু দুর্বলতা তৈরি হয়নি তা বলা যাবে না। বরং কল্পনাপ্রবণ নায়ক পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক অনুষঙ্গে আরও বেশি অনুভূতিপ্রবণ হয়ে যামিনীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। তারপর দামিনীর মাকে দেখে, তার অস্তিম দশার কথা বিবেচনা করে। সে আর নিজেকে সংযত রাখতে পারে না। কল্পনার ফানুস উড়িয়ে সে নিজেকে এই পরিবেশেরই একজন হয়ে ওঠে। তার ওপর কাথা জড়িত শীর্ণ কঙ্কালসার মূর্তির পাশে কৈশোর অতিক্রম স্থগিত-যৌবনা যামিনীকে পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল দেখে নায়ক আর নিজের কাঠিন্য ধরে রাখতে পারেনি। আসলে কোনো তা পারে বলে মনে হয় না। তাই যামিনীর মা যখন নিবন্ধন ভেবে উপস্থিত নায়ককে বলে 'অভাগী মাসিকে এতদিনে মনে প Peter যে নিশ্চিন্ত হয়ে মরতে পারছিলাম না। এবার তো আর অমন করে পালাবি খনজেকে সামলাতে পারল না। তার মনের মধ্যে কেউ যেন দুখিনী মায়ের দুঃখ মোচনের জন্য তাকেই দায়িত্ব দিল। তাই ভাবনার অবকাশ না রেখেই মণিকে কথা বলতে না দিয়ে সেই দে

নায়কের এই বলা বিষয়টি যে অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক তা সে বোকে। সে জানে ব্যাপারটি আলোপ্রবণ মানুষের আলো উত্থিত অবিবেচিত বচনমাত্র কিন্তু তা সত্যি। আর এই সত্যি কথা শোনার জন্য যখন কেউ প্রস্তুত থাকে না তখন শ্রোতামাত্রই বিমূঢ়, স্তম্ভিত ও বিস্মিত হয়। মণি ও মানিনীর সেটাই হয়েছিল। আর নায়ক যেহেতু জানে এমন পরিস্থিতিতে ওইরকম আচরণই স্বাভাবিক সেহেতু ব্যাপারটিকে সেও অনুভব করতে পারে।

'তেলেনাপোতা আবিষ্কার ঘর থেকে উদ্ভূত এই উত্তর বন্ধা হল যামিনীর মা। অন্যভাবে বলা যায় অনুদা মেয়ের জন্য দুশ্চিন্তায় নিঃশেষিত মৃত্যুপথযাত্রী এক যামিনীকে নিয়ে এ প্রসঙ্গে তিনি আরও যে সব কথা বলেছেন তা এইরকম তিনি তার আসার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন বলেই তো এমনি করে এই প্রেতপুরী পাহারা দিয়ে দিন গুনছেন। একথা বলার পর হাফাতে হাঁফাতে তিনি আরও বলতে থাকেন যামিনীকে নিয়ে সে সুখী হবে, আর একথা তিনি কেবলমাত্র নিজের মেয়ে বলেই বলছেন না এমন মেয়ে সত্যিই হয় না। শোকে তাপে বুড়ো হয়ে তার মাথার ঠিক নেই। দিনরাত মিটমিট করে মেয়েটিকে কত যন্ত্রণাই না দেওয়া হয়—এসবই তিনি জানেন তবুও মেয়েটি কিছুই বলে না। সব কিছু সহ্য করে চলে। এই শ্মশানের দেশে যেখানে দশটি বাড়ি খুঁজলে একটা পুরুষের দেখা মেলে না, যেখানে কেবল মৃত্যুপথযাত্রীরাই শুধু ভাঙা ইট একিতে এখানে সেখানে ঠুকছে সেখানে তার মধ্যে যামিনী একাই মেরো-পুরুষ হন্যে কী না করছে। তিনি আরও বলেন- যামিনীকে সে যেন গ্রহণ করে, তার শেষ কথা না পেলে তিনি মরেও শান্তি পাবেন না।

" যামিনীর মাঝেনা বলা কথার সময় নায়ক যাহিনী সম্পর্কে নানান দিব্যা উপলব্ধি করেন। অবশ্য তার এই উপলধির বিষয়। তার পূর্বের ভাবনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পৃক্ত। একারণে বৃদ্ধের কথা বলা ও ইকোনোর সময় চকিতে সে যামিনীর ওপর দৃষ্টি ফেলে আর উপলখি করে তার বাইরের কঠিন মুখোশের অন্তরালে তার মধ্যেও কোথায় যেন কি ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে ভাগ্য ও জীবনের বিরুদ্ধে। তার মনে হয় যামিনী তার চারপাশে মনের চতুর্দিকে রাতকাল ধরে গভীর হতাশার উপাদানে যে সুদর শপথের ভিত্তি তৈরি করে এখানেই অনূঢ়া থেকে মায়ের সেবা করার দায়বদ্ধ ইচ্ছাতেই প্রবল করে রেখেছিল। তা ধীরে ধীরে আলগা হতে থাকে। আর সে আলগা শিথিল বাধন ফুটতে যে বেশি দেরি নেই সেটাও নাকে বুঝে নেয় ।

সমস্ত ব্যাপারটি অনুধাবন করলেও একটিবার মুখ তুলে যামিনীর দিকে তাকাবার সাহস হবে না কারণ তাহলে নিজের চোখের জলও ধরে রাখা আর সম্ভব হবে না। অগত্যা অন্য কোনো কথা না বলে নায়ক কেবল তার কাঙ্ক্ষিত শুধু মুখ থেকে বের করতে পারবে- “আমি তোমায় কথা দিচ্ছি মাসিমা। আমার কথার নতচড় হবে না।”

তেলেনাপোতা থেকে ফিরে আসবার পর গল্পের নায়ক শহরের অনাকীর্ণ আলোকোজ্বল পরিবেশে এসেও আবার সেখানে ফিরবার আশা করেও ম্যালেরিয়া রোগের কারণে যেতে পারে না। অবশ্য ইসা যে তার ছিল না তা নয় কিছু প্রতিকূল পরিস্থিতি তাকে সেখানে যেতে দেয়নি। তখনও নায়কের মনে তেলেনাপোতার স্মৃতি উজ্জ্বল তারার মতো আলে ছড়িয়ে মনকে আলোড়িত উদবেলিত করছে। ছোটোখাটো বাধা বিড়ম্বিত কটি দিনও কেটে যায়। এই অবস্থায় মনের আকাশে একটু করে কুয়াশা জমে যাওয়ার পথে কোনো নিস্পৃহতা সৃষ্টি করছে কিনা বোঝা যাবে না। শেষে সব বাধা কাটিয়ে নায়ক যখন যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় সেদিন সে মাথার যন্ত্রণায় ও কাঁপন দেওয়া শীতে লেপ-তোশক মুড়ি দিয়ে শয্যা গ্রহণ করে। জ্বর একশো পাঁচ ডিগ্রি। সে জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন। কঠিন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সে গৃহবন্দি। ডাক্তারের কাছ থেকে

শোনা যাবে কোথা থেকে ম্যালেরিয়াটি আনা হয়েছে। তারপর এক সময় রোগ সারে, নায়ক সুস্থ হয় কিন্তু শরীর অসম্ভব দুর্বল—চলাফেরা কষ্টকর আর সেই মানুষে জিনিসে ঠাসাঠাসি বাসে ভাদ্রের গরমে ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক যাত্রা করে রাস্তার মাঝখানে নামা অসম্ভব। তারপর মশার কামড় খেয়ে ডোবার কাছে অপেক্ষা করে থাকা এবং ছোট গোরুর গাড়িতে তেলেনাপোতায় পৌঁছানো সম্পূর্ণ অলীক বিষয়। ফলে তাকে বাধ্য হয়েই দুর্বল শরীরে একদিন স্বাভাবিক হওয়ার জন্যে আলো-হাওয়ায় এসে বসতে হয় কিন্তু ততদিন তার অজ্ঞাতসারেই দেহ ও মনের অনেক কিছু ধুনো মুছে যায়। এমতাবস্থায় নায়ক অবশ্যই আর তেলেনাপোতায় দিয়ে যেতে চাইবে না বলেই গল্পকার মন্তব্য করেছেন-"অন্ত যাওয়া তারার মতো তেলেনাপোতার স্মৃতি আপনার কাছে ঝাপস একটা স্বপ্ন বলে মনে হবে।"

অবশ্য এর অন্য একটি কারণও আমরা খুঁজে পেতে পারি--আর তা হল সম্পূর্ণ মানসিক। আসলে পরিবেশ ও পরিস্থিতি আবেগপ্রবণ মানুষদের দিয়ে যেমন অনেক কিছু করিয়ে নেয় তেমনি তার চাপেই তারা ইচ্ছে থাকলেও বহু কিছু করতে পারে না। গল্পের নায়কেরও সেই অবস্থা তেলেনাপোতার নিস্তরতা অতি স্বাভাবিক সরল জীবন শহুরে কল্পনাপ্রবণ নায়ককে সম্পূর্ণ অভিভূত করে রেখেছিল। আসলে সে তখন ভাবাবেগের মানুষ, আবেগচালিত তাৎক্ষণিক অবস্থার প্রতিনিধি মাত্র। তারপর সময়ান্তরে পরিস্থিতির চাপে সে বাস্তব ও কল্পনার ব্যবধান বুঝে নেয় এবং উপলব্ধি করে তেলেনাপোতা বলে সত্যিই কিছু নেই—সবই ধ্বংসপুরীর ছায়ার মতোই ব্যক্তি মানুষের দুর্বল মুহূর্তের অবাস্তব কুয়াশাময় কল্পনা মাত্র।

'What's in a name? – শেকসপিয়র যতই বলুন না কেন নামে কী আসে যায়, তবুও সাহিত্য প্রব নামকরণের দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যিক এই নামকরণের মধ্য দিয়েই বিষয়বস্তুর আভাস দিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে যান। অনেক সময় তাঁর মনোগত অভিপ্রায়ও নামকরণের মধ্যেই নিহিত থাকে।

সাহিত্য প্রকরণের নামকরণের যেসব রীতি প্রচলিত আছে সেগুলিকে মোটামুটি চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়

কাহিনির প্রধান চরিত্রের নামানুসারে করা নামকরণ, যেমন—বলাই, খাজাক্তিবাবু। ঘটনাকেন্দ্রিক বা বিষয়বস্তু অনুযায়ী করা নামকরণ, যেমন—সম্পত্তি সমর্পণ, হালদারগোষ্ঠী।

৩. রূপকধর্মী নামকরণ—অচলায়তন, ডাকঘর, রেকর্ড, ফসিল। ৪. ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণ— পায়োমুখম, তেলেনাপোতা আবিষ্কার, জীবিত ও মৃত ইত্যাদি। এবার দেখা যাক তেলেনাপোত আবিষ্কার' গল্পটি কোন প্রকরণ রীতি অনুযায়ী সার্থকতা পায়।

তবে নামকরণের সার্থকতা দেখানোর আগে আমাদের বুঝে নিতে হবে— গল্পে লেখক প্রতিটি মানবমনের ঠিক কোন দি উন্মোচন করতে চেয়েছেন। সহজ কথায় তাঁর মূল প্রতিপাদ্য কী? এক্ষেত্রে কোনোরকম দ্বিধা না রেখে সচেতন রসিক পাঠকার উপলব্ধি করতে পারেন গল্পকার এখানে প্রতিটি মানবমনের 'মানস ভ্রমণ, মানসমুক্তি ও বাস্তবতার আঘাতে তার রক্তাক্ত হয়ে ওঠার দিকটিই নির্দেশ করেছেন। আর তা করতে গিয়ে গল্পকার গল্পের নায়কের মাধ্যমে নিজেকে নতুন ভাবনার অবকাশ দিয়েছেন। এরজন্য নায়ক শহর থেকে ত্রিশমাইল দূরে এক গন্ডগ্রামে পৌঁছায়। স্থানটি যেন অন্যগ্রহের সেখানের প্রধান বৈশিষ্ট সারলা। এখানকার পরিবেশ, মানুষ যেন তাকে স্বপ্নময়লোকে নিয়ে যায়। স্থানটি নায়কের কাছে অদৃষ্টপূর্ব অথচ বাস্তব। ফলে এখানকার সবকিছুই তার কাছে অসাধারণ—নতুন এক আবিষ্কার। আর এই আবিষ্কার কোনো অজ্ঞাত, অখ্যাত গ তেলেনাপোতা নয়—এ আসলে রোমান্টিক নায়কের আত্ম-আবিষ্কার। তেলেনাপোতাকে বাংলার কোনো ভৌগোলিক সীমা মধ্যে পাওয়া যাবে না—যেখানে এর অবস্থান তা হল মানষেরই অবচেতন মনের মণিকোঠায়।

আবিষ্কার শব্দের দুটি অর্থ ইংরেজি অভিধানে পাওয়া যায়- Discovery ও Invention। প্রথমটির অর্থ যা প্রত্যক্ষ আছে কিন্তু আজও সন্ধান মেলেনি তার খোঁজা। আর দ্বিতীয়টির অর্থ যা অপ্রত্যক্ষ তাকেই খুঁজে নেওয়া। তেলেনাপোতা অপ্রত্যক্ষ তাই তাকে খোঁজ করার মধ্যে আছে invention এর বৈশিষ্ট্য। অর্থতা সেই স্থানের আবিষ্কার কেবলমাত্র রসিক মানবপ্রেমিকের পক্ষেই সম্ভব। গল্পকার সেই আবিষ্কারের পটভূমি তৈরি করে যা ছিল না। তাকে মনের মধ্যে প্রত্যক্ষগোচর করে তুলেছেন। তাই গল্পটির নামকরণ আমাদের কাছে সার্বিক দিক দিয়েই বাঞ্জনাময় অর্থের নিগূঢ় তাৎপর্যে সার্থক ও যথার্থ শিল্পরসে মণ্ডিত।

যে-কোনো ছোটোগল্পের সার্থকতা নির্ভর করে কতকগুলি আন্তরবৈশিষ্ট্যের ওপর। গল্পের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সমালোচকরা যেসব কথা বলেছেন তার নির্যাস নিয়ে ড. ভূদের চৌধুরী লিখেছেন- ছোটোগল্পের উপাদান তিনটি ১. অপার বিস্তৃত রহস্য জটিল আধুনিক জীবনভূমি। যার প্রতিমুহূর্তে প্রতিবিন্দুতে অতলান্ত গভীরতা উপলব্ধি করা যায়।

শিল্পী-ব্যক্তির ঘন-নিবিড় অনুভব তন্ময়তা এবং চলমান জীবন সম্বন্ধে ধ্যানী-জনোচিত আত্মস্থতা। রচনার ব্যথানাধর্মিতা। একটি জীবনের বিশেষ মুহূর্তের অবস্থান, অভিঘাতে বা আবেগে তা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে শাশ্বত জীবন ভূমিতে উৎকমন (transcend) করতে পারে।।

আসল কথা হল ছোটোগল্পের অন্যতম গুণ হল জীবনের গভীরে প্রবেশ করে এক সুস্থির চেতনার দর্পণে মানুষের আত্ম আবিষ্কার বা জীবনের এক অখন্ড ছায়ারূপকে প্রত্যক্ষ করা। এবার তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পে উপরোক্ত গুণগুলি। কতখানি রক্ষিত হয়েছে বলা যাক।

আলোচ্য গল্পে প্রেমেন্দ্র মিত্র কোনো কাহিনিকে প্রধান করে তোলেননি : যা করেছেন তাহল বিশেষ ভাবের প্রতিষ্ঠা। গল্পের প্রাণবিন্দু হল সেই বিশেষ চিরন্তন শাশ্বত ভাব বা উপলব্ধি। গল্পের যতটুকু কাহিনি বা পরিবেশ রচিত হয়েছে তার সবটাই সেই ভাবকে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদে। গল্পের চরিত্রগুলিও সেই একই কারণে হাজির হয়েছে। গ্রামবাংলার দরিদ্র অসহায় পরিবারের কন্যা-দায়, দুখিনী বৃদ্ধার আশা-আকাঙ্ক্ষার অসহায় ছবির থেকেও এখানে বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে মনুষ্যত্ববোধে জাগ্রত এক রোমান্টিক পরিমণ্ডল। ফলে গল্পের আনুষঙ্গিক সবকিছুই পাঠককে এক ভারসর্বস্ব জগতে নিয়ে যায়। নায়ক যেভাবে ভাবিত হয়েছে তারাও যেন সেইভাবে ভারতে শুরু করে।

পরিবেশ রচনা করে গল্পকার যখন বলেন-“কোথাও একটা থাম, কোথাও একটা দেউড়ির খিলান কোথাও কোনো মন্দিরের ভগ্নাংশ, মহাকালের কাছে সাক্ষ্যদেবার ব্যর্থ আশায় দাঁড়িয়ে আছে।" তখন আমরা সহজেই বুঝে নিতে পারি এই বর্ণনায় স্বপ্ন-রঙিন ভাবনা যতই থাকুক না কেন তা লেখকেরই অভিজ্ঞতা-লক্ষ খন্ড খন্ড জীবনের প্রতিতির সমগ্রতা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই গল্পকার পরিবেশ রচনায় যে বিবরণ বা পর্যবেক্ষণ শক্তির পরিচয় দিয়েছেন তা তাঁর সার্থক গল্প-বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দেয়। আপাত দৃষ্টিতে পটভূমি বা চরিত্রের মধ্যে আমরা কোনো ছোটো গল্পীয় ক্লাইমেন্স তেমন পাই না কিন্তু মানবমনের কোনো এক আকস্মিক ভাবপ্রকাশের কেন্দ্রবিন্দুতে এই গল্প চূড়ান্ত সার্থকতা পায়। সুতরাং অনাবশ্যক অতিবিস্তারের অসংযমহীন ক্লাইমেক্স গল্পের ঘাত-প্রতিঘাতে ও রুদ্ধশ্বাস টানে উজ্জ্বলতম হয়ে ওঠে। এদিক দিয়েও ছোটোগল্পের সার্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' গল্পটি তাই আমাদের কাছে সত্যিই সার্থকনামা ছোটোগল্প হয়ে ওঠে।

তেলেনাপোতা আবিষ্কারের জন্য শনি ও মঙ্গলবারের মধ্যে মঙ্গল, হঠাৎ পাওয়া দু-দিন ছুটি, কারো ফুসলানি, আশ্চর্য সরোবরে সরলতম মাছ, মাছ ধরবার অনভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয়ের সংযোগ দরকার।

তেলেনাপোতা আবিষ্কারের জন্য আপনাকে বিকেলবেলার পড়ন্ত রোনে জিনিসে মানুষে ঠাসাঠাসি একটা বাস ধরতে হবে।

বাস যাত্রার অভিজ্ঞতায় থাকবে—রাস্তার প্রচণ্ড ঝাঁকুনি, মানুষের গুঁতোগুতি, ভাদ্রের গরমে ধুলো ও ঘামের চটচটে শরীর, ঘণ্টা দুয়েক যাওয়া ও আচমকা রাস্তার মাঝখানে অবতরণ ইত্যাদি।

রাস্তার মাঝখানে নামবার পর দেখা যাবে সামনের নীচু জলার মতো জায়গার ওপর দিয়ে সাঁকো চলে গেছে, তার ওপর দিয়ে ঘর্ঘর শব্দ করে বাস চলে গিয়ে ওপারে বাক নিয়ে অদৃশ্য হবে আর সূর্য না ডোবা সত্ত্বেও ঘন জঙ্গল হেতু স্থানটির অন্ধকার দৃশ্য হাজির হবে।