অধ্যায়-20, মধ্যযুগের বাংলা সমাজ ও সাহিত্যের প্রধান ধারা

১৯০১ খ্রিস্টাব্দে বসন্তরঞ্জন রায় বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের গোয়াল ঘরের মাচান থেকে এই কাব্যের পুঁথি আবিষ্কার করেন।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটি বড়ু চণ্ডীদাসের রচনা।

শ্রীকৃষ্মকীর্তন কাব্য শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের আগেকার রচনা।

বড়ু চণ্ডীদাস ও পদাবলির চণ্ডীদাস এক ব্যক্তি নন; পদাবলির চণ্ডীদাস চৈতন্যদেবের আগে আবির্ভূত হন।

পদাবলির চণ্ডীদাস ও বড়ু চণ্ডীদাস একই ব্যক্তি কি না সেই বিষয় নিয়ে যে সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, তাকে চণ্ডীদাস সমস্যা বলে।

শ্রীকৃরকীর্তনেলা আসল নাম 'শ্রীকৃষ্মসন্দর্শ।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের মধ্যে আছে প্রধান তিনটি চরিত্র—কৃষ্ণ, রাধা ও বড়ায়ি।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ১৩টি খণ্ডে বিভক্ত।

দানখও, নৌকাখণ্ড, ভারখণ্ড ইত্যাদি।

শ্রীকৃষ্মকীর্তনের শেষ খণ্ডের নাম 'রাধাবিরহ"।

নাট্যগীতি পাঁচালি জাতীয় রচনা।

জন্মখণ্ড, তাম্বুলখণ্ড, দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, ভারখণ্ড, ছত্রখণ্ড, বৃন্দাবনখণ্ড, কালীয়দমন খণ্ড, যমুনাখণ্ড, হারাণ্ড, বাণখণ্ড, বংশীযও ও রাধাবিরহ (জতাদা-নৌভামর-কাযহাবা-বরাবি)।

বড়ায়ি রাধার মায়ের পিসি।

রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে মধ্যযুগে বাঙালি কবি-সাধকরা যে পদ বা গীতিকাব্য রচনা করেছিলেন, তাকে বৈষ্ণব পদাবলি বলে।

বৈয়ব পদাবলির আদি কবি হলেন জয়দেব।

বৈষ্ণব পদাবলিকে তিনভাগে ভাগ করা যায় চৈতন্য-পূর্ববর্তী, চৈতন্য-সমসাময়িক ও চৈতন্য-পরবর্তী যুগের বৈষ্ণব পদাবলি।

চৈতন্য-পূর্ববর্তী বৈষ্ণব কবি হলেন বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস।

চৈতন্য পরবর্তী বৈষ্ণব কবি হলেন জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বলরামদাস, কবিবল্লভ প্রমুখ।

বৈয়ব পদাবলিকে বাল্যলীলা, পূর্বরাগ, অভিসার, মিলন, বিরহ, মাথুর, প্রেমবৈচিত্ত্য, ভাৰসম্মিলন পর্যায়ে ভাগ করা যায়।

বিদ্যাপতি ছিলেন মিথিলার অধিবাসী।

বিদ্যাপতি পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

মাথুর বা বিরহ পদে বিদ্যাপতির শ্রেষ্ঠত্ব।

চণ্ডীদাস পশ্চদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে বীরভূম জেলার নানুর-এ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ।

পূর্বরাগ পদে চণ্ডীদাসের শ্রেষ্ঠত্ব।

জ্ঞানদাস ষোড়শ শতাব্দীতে বর্ধমানের কাঁদড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

রূপানুরাগ পর্যায়ের পদে জ্ঞানদাসের শ্রেষ্ঠত্ব।

জ্ঞানদাস বৈষবপদ রচনার চণ্ডীদাসের ভাবাদর্শ অনুসরণ করতেন বলে তাঁকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য বল হয়।

গোবিন্দদাস ষোড়শ শতাব্দীর চারের দশকের মধ্যভাগে বর্ধমান জেলার শ্রীখন্ড-এ জন্মগ্রহণ করেন ।

কবি গোবিন্দদাস বিদ্যাপতির ভাবাদর্শে বৈয়ব পদ রচনা করেছিলেন বলে তাঁকে বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য বলা হয়।

অভিসার পর্যায়ের পদে গোবিন্দদাসের শ্রেষ্ঠত্ব।

বলরামদাস ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রীহট্ট-এ জন্মগ্রহণ করেন।

গৌরচন্দ্রিকা হল রাধাকৃষ্ণলীলার ভাবানুরূপ গৌরাঙ্গ লীলাবিষয়ক পদ যা কীর্তনের আগে গাওয়া হয়।।

গৌরপদাবলি হল গৌরাঙ্গালীলা বিষয়ক পদাবলি।

 

১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে দোলপূর্ণিমার দিন নবদ্বীপে চৈতন্যদের জন্মগ্রহণ করেন ।

চৈতন্যদেবের তিরোধান হয় ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে পুরীধামে।

চৈতন্যদেব বাংলায় গৌড়ীয় বৈষবধর্ম প্রচার করেছিলেন।

জাতিধর্মনির্বিশেষে সকল মানুষকে প্রেম বিতরণই চৈতন্যদের প্রচারিত গৌড়ীয় বৈষুব ধর্মের মূল নীতি।।

চৈতন্যদেবের প্রভাবে বাংলার বুকে সামাজিক, সাহিত্যিক ও আধ্যাদিক পরিবর্তন ঘটেছিল।

চৈতন্যদেবের শেষজীবন অতিবাহিত হয় পুরীধামে।

দুটি। প্রথম স্ত্রী লক্ষ্মীপ্রিয়া, দ্বিতীয় স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া (সর্পদংশনে লক্ষ্মীপ্রিয়ার অকাল প্রয়াণ ঘটে)।

অদ্বৈত আচার্য ও শ্রীনিবাস আচার্য।

ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনের যন্ত্রণা ও মুসলমান রাজশক্তির অত্যাচার ও অবিচারের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করা।

পিতা—জগন্নাথ মিশ্র এবং মাতা শচীদেবী।

চৈতন্যজীবনী-গ্রন্থগুলি হল-বৃন্দাবনদাসের 'প্রাচৈতন্য ভাগবত', কুমুদাস কবিরাজের

“শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, জয়ানন্দের 'চৈতন্যমঙ্গাল', লোচনদাসের 'চৈতন্যমঙ্গাল' ও গোবিন্দদাসের কড়চা।

চৈতন্যজীবনী গ্রন্থগুলির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান দেওয়া হয় কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত 'শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত" ত্যকে।

বুন্দাবনদাস চৈতন্যদেবের ভক্ত নারায়ণীর শিষ্য। তিনি ষোড়শ শতকের তৃতীয় দশকে নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখা চৈতন্যজীবনী গ্রন্থটি হল 'চৈতন্যভাগবত'।

বর্ধমান জেলার ঝামটপুর গ্রামে পাদশ শতাব্দীর শেষভাগে কবির জন্ম।

রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, রঘুনাথ দাস, রঘুনাথ ভট্ট, গোপাল ভট্ট ও জীব বৃন্দাবনের ষড় গোস্বামী। এঁদের সঙ্গে পরে যোগ দিয়েছিলেন কুয়দাস।

শ্রীচৈতন্যদেবের নির্দেশে বৃন্দাবনে রাধাকুয়লীলা

চৈতন্যজীবনী গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল দেবতার বদলে একজন মানুষের জীবন মহিমার বিষয় রচিত হওয়া।

জীবনী গ্রন্থ—দুই প্রকার।

বৃন্দাবনদাসের মায়ের নাম হল নারায়ণী দেবী।

চৈতন্যদেবের জীবনকে কেন্দ্র করে লেখা একটি নাটক, রচয়িতা – কবি কর্ণপুর।

বৃন্দাবনের শ্রীজীব গোস্বামী গোবিন্দদাসকে 'কবিরাজ' উপাধিতে ভূষিত করেন।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ 'শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত' গ্রন্থটি রচনা করেন।

মধ্যযুগে দেবদেবীর মাহাত্ম্য কীর্তনমূলক যে এক ধরনের আখ্যান কাব্য রচিত হয়েছিল তাকে মঙ্গলকাব্য বলে।

মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও কর্মমকাল—এই তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।

মনসামঙ্গল কাব্যে সর্পদেবী মনসার মাহাত্ম্যকীর্তন করা হয়েছে।

মনসামঙ্গল কাব্যের নায়ক হলেন চন্দ্রধর বা চাঁদসদাগর।

অভিজাত বণিক চাঁদসদাগর তাঁর পুজো করলে মর্ত্যলোকে মনসাপুজা প্রচলিত হবে—এই কারণে তাঁর পুজো করতে বলেছিলেন।

মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান নারী চরিত্র হলেন বেহুলা।

লখিন্দর চাঁদসদাগরের ছোটো ছেলে, বেহুলার স্বামী।

লোহার বাসরঘরে কালনাগিনীকে পাঠিয়ে মনসা লখিন্দরকে হত্যা করলেন।

লখিন্দরের মৃত্যুর পর বেহুলা তাঁর মৃতদেহ কলার ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে নদীতে অজানা পথে যাত্রা।

দেবসভায় নৃত্য প্রদর্শন করে বেহুলা লখিন্দরের জীবন ফিরিয়ে আনলেন।।

মনসামঙ্গলের আদি কবি কানা হরিদত্ত।

মনসামঙ্গল কাব্যের কয়েকজন প্রধান কবি হলেন নারায়ণ দের, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, বিজয়গুপ্ত, দ্বিজ, বংশীদাস প্রমুখ।

মনসামঙ্গল কাব্য পূর্ববঙ্গের অধুনা বাংলাদেশে অধিক প্রচলিত।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে লৌকিক মঙ্গলচণ্ডী দেবীর মাহাত্ম্য কীর্তন করা হয়েছে।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কাহিনি দু-ভাগে বিভক্ত।

আখেটিক খণ্ড (কালকেতু কাহিনি) ও বণিক খণ্ড (ধনপতি সদাগরের কাহিনি)। এই কাব্যে একটি প্রধান।

নারী চরিত্র হল ফুল্লরা।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের প্রধান পুরুষ চরিত্র ব্যাধ কালকেতু।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের প্রধান কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের প্রধান তিনজন কবি হলেন মানিক দত্ত, মুকুন্দ চক্রবর্তী ও দ্বিজমাধব।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে খল চরিত্র হল ভাঁড়দত্ত ও মুরারি শীল।

মুকুন্দ ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে তাঁর চণ্ডীমঙ্গল কাব্য রচনা করেন।

মুকুন্দ চক্রবর্তীর আত্মবিবরণী পাঠে জানা যায় যে, তিনি বর্ধমান জেলার দামুন্যাগ্রামের অধিবাসী ছিলেন গ্রাম ত্যাগ করে মেদিনীপুরের আড়রা গ্রামের জমিদার বাঁকুড়া রায়ের আশ্রয়ে চণ্ডীমঙ্গাল কারা কম করেন।

ধর্মমঙ্গল কাব্যে ধর্মঠাকুরের মাহায্য কীর্তন করা হয়েছে।

ধর্মমঙ্গল কাব্যের প্রধান নায়ক চরিত্র লাউসেন।

ধর্মমঙ্গল কাব্যের প্রধান কবিরা হলেন ময়ূরভট্ট, ঘনরাম চক্রবর্তী, রূপরাম চক্রবর্তী, সীতারাম হ মানিকরাম গালগুলি প্রমুখ।

ধর্মমঙ্গল কাব্যে মহাকাব্যসুলভ কাহিনি, ঘটনা ও চরিত্রসমূহ আছে বলে তাকে রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য

বলা হয়।

বর্ধমানের ঘনরাম চক্রবর্তী 'ধর্মমঙ্গাল' কাব্যের একজন খ্যাতনামা কবি।

মধ্যযুগে সংস্কৃত থেকে বাংলায় যে সকল গ্রন্থ অনুবাদিত হয়েছিল, সেগুলিকেই সাধারণভাবে অনু সাহিত্য বলে।

মধ্যযুগের অনুবাদ সাহিত্যের মধ্যে আছে মালাধর বসুর 'শ্রীকৃয়বিক্রয়া, কৃত্তিবাস ওঝার রামনত কাশীরাম দাসের 'মহাভারত'।

মালাধর বসু ১৪৭৩-৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সংস্কৃত শ্রীমভাগবত প্রশ্নের দশম ও একাদশ স্কন্নো ও বঙ্গানুবাদ করেছিলেন, তার নাম 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়"।

এর মধ্যে কৃষ্ণের জন্ম থেকে দেহত্যাগ পর্যন্ত ঘটনা বর্ণিত।

কৃত্তিবাস পশ্চাদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে ফুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

কৃত্তিবাস মহাকবি বাল্মীকি রচিত সংস্কৃত রামায়ণের বঙ্গানুবাদ (ভাবানুবাদ) করেন।

কৃত্তিবাসের রামায়ণ বাল্মীকি রামায়ণের অবিকল অনুবাদ নয়। তিনি সংস্কৃত রামায়ণের কাহিনির ঘটনা ও চরিত্রকে বাঙালির জীবনাদর্শ অনুযায়ী গড়ে নিয়েছেন। এটি অবিকল অনুবাদ নয়।

কৃত্তিবাস তাঁর রামায়ণে বাঙালির বৈশিষ্ট্য ও জীবনাদর্শ এবং ভক্তিবাদ প্রকাশ করেছেন বলে তাঁর রামায়ণ অত্যধিক জনপ্রিয়।

কৃত্তিবাসের রাম, সীতা, লক্ষ্মণ যথাক্রমে বাঙালি পরিবারের আদর্শ দাদা, বউদি ও ভাইয়ের প্রতিনিধি।

কাশীরাম দাসের 'মহাভারত' বেদব্যাস রচিত সংস্কৃত মহাভারতের অনুবাদ।

আরাকান রাজসভার দুজন বিখ্যাত কবি হলেন দৌলত কাজি ও সৈয়দ আলাওল।

আরাকান রাজসভার কবি দৌলত কাজি। ১৬২১ থেকে ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি 'লোরচন্দ্রানী' কাব্য রচনা করেন।

আরাকান রাজসভার কবি সৈয়দ আলাওল। তিনি ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে 'পদ্মাবতী' কাব্য রচনা করেন।

পদ্মাবতী কাব্যে রাজা রত্নসেনের সঙ্গে পদ্মাবতীর বিবাহ, দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খলজির চিতোর আক্রমণ ও আগুনে পদ্মাবতীর আত্মবিসর্জনের কাহিনি বর্ণিত।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে শক্তিদেবী কালিকার মাহাত্ম্য কীর্তনসূচক যে পদগুলি রচিত হয়েছিল, তাকে শাক্তপদাবলি বলে।

শাক্তপদাবলিকে আগমনি-বিজয়া গান ও কালীসংগীত—এই দু-ভাগে ভাগ করা হয়।।

আগমনি ও বিজয়া গানে দেবী দুর্গার পিতৃগৃহে আগমন ও তিনদিন পরে স্বামীগৃহে যাত্রার বিবরণ বর্ণিত হয়েছে।

রামপ্রসাদ সেন প্রথম শাক্তপদাবলি রচনা করেন।

রামপ্রসাদ সেন ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরের নিকটবর্তী কুমারহট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

রামপ্রসাদের মৃত্যুসাল ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ।

শারুপদাবলির আগমনি-বিজয়া গানে বাঙালি সমাজের অল্পবয়সি মেয়েদের বিবাহের পর শ্বশুরবাড়িতে দুঃখ-দারিদ্র্যময় জীবনের কথা বলা হয়েছে।

কালীকীর্তনের মধ্য দিয়ে সামাজিক অন্যায়, অবিচার, আর্থিক দুঃখকষ্ট ও রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের দেওয়া হয়েছে।

শাক্তপদাবলির প্রধান কবি হলেন রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, দাশরথি প্রমুখ।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্যে একজন শক্তিময়ী দেবীর প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল বলেই শক্তিদেবী কালিকাকে নিয়ে গীত রচনা করা হয়েছিল।

শাক্তপদাবলির শ্রেষ্ঠ কবি রামপ্রসাদ সেন।

দুর্গাকে উমা ও গৌরী নামে ডাকা হয়েছে।

দুর্গার স্বামীর নাম শিব, মহেশ্বর বা ভোলানাথ।

ভারতচন্দ্র রায়ের জন্ম ১৭১২ খ্রিস্টাব্দ ও মৃত্যু হয় ।

ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে তিনটি খণ্ড আছে— 'অন্নদামঙ্কাল', 'কালিকামঙ্গল' বা 'বিদ্যাসুন্দর' ও

'মানসিকে' বা 'অন্নপূর্ণাম'।

ভারতচন্দ্রের অন্য রচনাগুলি হল— 'সত্যনারায়ণের পাঁচালী', 'রসমঞ্জুরী' ইত্যাদি।

ভারতচন্দ্রের কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য—আলংকারিক বর্ণনা, বাক্-বৈদগ্ধ্য, চরিত্রচিত্রণে দক্ষতা ও অনুপম ভাষা ।

ভারত কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সভাকবি ছিলেন।

১৭৫২ খ্রিস্টাব্দ।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রধানত তিনটি যুগ — আদিযুগ, মধ্যযুগ

দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী।

মধ্যযুগের সময়সীমা হল ১০০০-১৭০০ খ্রি. পর্যন্ত।

উত্তরযুগ (Barren Period) বা অন্ধকারময় যুগ (Dark Age).

বাংলায় তুর্কি আক্রমণ হয় রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বকালে। ১২০০ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি সেনানায়ক ইমতিয়ার উদ্দিন-মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি-র সেনাবাহিনী নদিয়া জয় করেন। লক্ষ্মণ সেন পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান আর বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি শাসন। এর ফলে বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীর জীবনে বিরাট পরিবর্তন ঘটে যায়।

তুর্কি আক্রমণের ফলে বিনষ্ট হয় ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিশিষ্ট কেন্দ্রসমূহ বীরত্ব ও বিদ্যার দেশের প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা হন বিপন্ন।

বাংলার সমাজে পূর্বে প্রধান ছিল দুটি পৃথক স্তর—নবীন অর্থাৎ নবাগত ব্যক্তিবর্গ এবং প্রবীন অর্থাৎ বাংলার পূর্বতন বাসিন্দাগণ। প্রথম স্তরের মানুষগুলি ছিলেন সংস্কৃত শাস্ত্রনির্দেশ-নিষ্ঠ, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুগামী প্রবীণ ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য জাতিরা ছিলেন প্রাকৃত ভাষাভাষী; তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট ধর্মমতে আস্থা ছিল না। এঁদের মধ্যে প্রচলিত ছিল জৈন, বৌদ বা যোগে ধর্মাবলম্বী। নবাগত মানুষগুলি ছিলেন চিন্তনপরায়ণ ও শাস্ত্রনিষ্ঠ। যজ্ঞ ও পূজোর নিয়মিত অনুষ্ঠান করতেন তাঁরা, তর আলোচনায় ছিল তাঁদের আগ্রহ এবং তাঁদের জীবনাচরণ ছিল সংযত।

বাংলার পূর্বতন বাসিন্দাদের বিশ্বাস ছিল দৈবে। তাঁদের ধর্ম ছিল রতকেন্দ্রিক, কর্ম আর সংগীত-সাহিত্যে স আকর্ষণ ছিল এই ভাববাদী অধ্যাত্মবাদী মানুষদের।

দুই শাখার আরাধ্য দেবদেবী প্রায়ই এক ছিলেন। কিন্তু তাদের প্রকৃতি ছিল ভিন্ন। প্রথম স্তরের দেবতা হিসেবে ি ছিলেন যোগীশ্রেষ্ঠ, সতী ও উমার প্রতি আসক। দ্বিতীয় স্তরের দেবতা হিসেবে তিনি ছিলেন গাঁজা ধুতুরাপ্রিয় তাদের বৃদ্ধ কৃষক, নিম্নশ্রেণির পরর্তীর প্রতি আসর।

এই দুই ভারের সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস, আচার-ব্যবহার ও ভাবধারার প্রভেদ মুছে দিয়ে সংহত একটি জাতিরূপে বাঙালি উদ্ভবের জন্যে প্রয়োজন ছিল কোনো প্রবল আঘাত তথা অনুঘটকের। বাংলায় তুর্কি আক্রমণ দিয়েছিল সেই প্রচণ্ড চা যার ফলে গড়ে উঠল বাঙালি জাতি, এদেশের সমাজ হয়ে উঠল বাঙালি সমাজ। দুই স্তরের দেবদেবীর মধ্যে চলল অঙ্গ মিশ্রণ। স্থানীয় দেবদেবী মনসা, চণ্ডী, উচ্চ সम গৃহীত হলেন। এঁদের পূজাকে কেন্দ্র করে শুরু হল উৎস লোকায়ত দেবদেবীর মহিমাভিত্তিক কাহিনি স্থান পেল ওইসব সাহিত্যে।

ধর্মান্তরিত হল হিন্দু শাসনে নিপীড়িত নিম্নশ্রেণি আর বৌদ্ধগণ। ইসলাম ধর্মে এই ধর্মান্তরিতদের প্রভাবে শুরু হল পির পুজা, পিরের সমাধি পূজা, সিন্নি দেওয়া।

আবার দুই ধর্মের সম্মিলনের ফলে কিছু নতুন দেবদেবীরও উদ্ভব হল। সতাপির, বনবিবি, কুম্ভীরদেবতা কালু গাজি, গুলাবিধি প্রমুখের কথা আমরা এখানে মনে করতে পারি। অর্থাৎ ভালোমন্দে মেশা বাঙালি সমাজের বর্তমান সুপ তুর্কি আক্রমণের ফলে অনেকটাই গড়ে উঠেছিল—এ কথা আমরা নিঃসংশনো বলতে পারি।

বড়ু চণ্ডীদাসের প্রাকৃল্পকীর্তন'-এর পুথি বসন্তরঞ্জন রায় বিষণ্ণত বিষ্ণুপুরের নিকটস্থ কাঁকিল্যা গ্রামে এক ব্রাহ্মণের বাড়ি থেকে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কার করেন। “শ্রীকৃষ্মকীর্তন কাব্যটি প্রায় চেতনা যুগের ফসল। বসন্তরঞ্জন রায় বিষয়ল্লভের সুযোগ্য সম্পাদনায় কারাটি ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশ পায়। 'শ্রীকৃয়কীর্তন' সম্ভবত চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকে রচিত হয়। কারো দেখা যায় যে কৃষ্ণ রাধার প্রেমে যেতে প্রাথমিকভাবে যতটা আগ্রহী, রাধা সে তুলনায় অনেকটাই বিস্তৃয় অর্থৎ দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত কোটি থেকে চরিত্র দুটি যাত্রা শুরু করেছে এবং কাব্য যত এগিয়েছে রাধার কৃষ্ণবিরূপতাও সঙ্গে সঙ্গে কমতে শুরু করেছে। বস্তুত, কিশোরী রাধাকে একজন প্রেমগরীয়সী পরিপূর্ণ নারীতে রূপান্তরিত করাই কবির মূল উদ্দেশ্য কাব্যে তিনটি চরিত্র প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছে। কৃষ্ণ অমার্জিত গ্রাম্য যুবক। বড়াই চরিত্রটি রাধাকৃষ্ণের মিলনে নেহাতই দূতীরূপে অবতীর্ণ হয়েছে। ফলত তার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যায় না।

এ কাব্যে কবিত্বশক্তির যে স্ফুরণ ঘটেছে তা পাঠককে স্তম্ভিত করে দেয়, নাট্যধর্মী সংলাপ রচনাতেও তিনি কুষ্টিয় দেখিয়েছেন। কাব্যে আদিরসের বাহুলা লক্ষ করে অনেক সমালোচক অসন্তুষ্ট হয়েছেন। চর্যার ভাষা—আর মধ্যযুগের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য— দুয়ের মধ্যবর্তী সময়ের ভাষা ও সাহিত্যের একমাত্র নিদর্শ বলেই প্রশ্নটি বিশেষ মূল্যবান।

শ্রীকৃষ্মকীর্তনের কাব্যবৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। উত্ত্যক” শ্রীকৃষ্ণকীর্তন চর্যাপদ ও মধ্যযুগের মধ্যবর্তী সময়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মূল্যবান নিদর্শন। রচনাকাল সম্ভবত চতুর্দশ-পরদশ শতক।

বড়ু চণ্ডীদাসের 'শ্রীকৃষ্মকীর্তন' রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা-বিষয়ক আখ্যান কাব্য। ড. সুকুমার সেন একে বলেছেন গীত-পাঁচালি। নাট অর্থে নাটককে বোঝায়। নাটকে একটি নিটোল আখ্যান থাকে এবং নাটকের প্রাণ হল যন্ত্র (কনফ্লিক্‌ট)। এবং অবশ্যই বিভিন্ন চরিত্র পারস্পরিক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে কাহিনিকে ত্বরান্বিত করে।

গীত অর্থে গানকে বোঝায়। অখন্ড শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কারো ৪১৮টি পদের প্রত্যেকটির শুরুতে একটি নির্দিষ্ট রাগের উল্লেখ রয়েছে। এই পদগুলি মধ্যযুগে গায়োনরা পালা করে পরিবেশন করতেন। যেহেতু মধ্যযুগ শ্রুতি-নির্ভর সেই কারণে বহু শ্রোতার কর্ণগোচরের জন্যে এরকম গান করে পরিবেশিত হত। তাই এটি গীতিকাব্য।

পাঁচালি অর্থে আখ্যান বা গল্পকে বোঝায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মধ্যযুগে পায়ে মুন্ডুর বেঁধে গায়েনরা এই কাহিনি। পরিবেশন করতেন। কাব্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি অখন্ড আখ্যান প্রবাহ লক্ষিত হয়। সেইকারণে একে পাঁচালি আখ্যা দেওয়া যুক্তিসংগত। তাই স্বভাবচরিত্রে বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্মকীর্তন নাট গাঁত-পাঁচালি। রসবিচারে সাধারণভাবে এই কাব্যকে আদিরসের কাব্য বলে প্রায় প্রত্যেকে মনে করেছেন। কিন্তু মজার বিষয় হল কাবাটি নিপাট হাস্যরসের। কারণ তীব্র অসংগতি থেকে জন্ম নেয় হাস্যরসের। পৃথিবীকে পাপমুক্ত করার জন্যে স্বর্গের নারায়ণ কৃয়রূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী জন্ম নিচ্ছেন রাধা হিসেবে। কৃর তাঁর পূর্বজন্মের সমস্ত কথা মনে রাখতে পারছেন, কিন্তু রাধা বেমালুম পূর্বজন্মের সমস্ত কথা ভুলে গিয়েছেন। যেকারণে কৃষ্ণের রাধার প্রেমপ্রার্থনা তাঁর কাছে কোনো অসংগতির জন্ম দেয় না। কিন্তু রাধা ভুলে গেছেন বলেই বলতে পারেন 'বড়ার বহু অনি আগে বড়ার ঝি মোর রূপ যৌবনে তোস্তাতে কি।।' কিংবা নিলজ কাহুই তোর বাপে নাহি লাজ। এ যদি হাসারসের কাব্য না হ্যা, তবে কাকে বলব হাস্যরস ?

এ কাবো শ্রীলতা-অশ্লীলতা নিয়ে মধ্যযুগের সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের যুক্তি শারীরিকতার উন্মোচন হয়েছে বস্তুর কাব্যে। কিন্তু মনে রাখতে হবে শ্রীলতা-অশ্লীলতা সমাজনীতির প্রশ্ন। সাহিত্য-রীতির নয়। আর যেখানে অশ্লীলতার সংজ্ঞা দেশ-কাল-ব্যক্তি নিরপেক্ষ নয় সেখানে ঝি আমরা বলতে পারি বড়ুর কাব্য অশ্লীল। তাই সাহিত্য যেহেতু কালে কালে পাঠকের তথা যুগের একটি চর্চিত মানসিকতার ওপর মূল্য পায়। তাই যদি মনে রাখি মধ্যযুগে কারো অতি সত্যত ভাবে শারীরিকভার ব্যাপার এসেছে। যে কারণে সমালোচকদের এই অভিযোগ আজকে সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন। তাছাড়া অশ্রীল তাই, যা আমাদের আদিম প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে দেয়। সমস্ত শ্রীকৃমুকীৰ্ত্তন কাহিনির পরিসরে এ কাবা আমাদের আদিমতা জাগায় না, বরং রাধাকুল্পের প্রণয়-লীলার প্রতি শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দেয়।

অধ্যাপক শিশিরকুমার দাশ তাঁর 'দ্য ম্যাড লাভার' (প্যাপিরাস, পৃষ্ঠা-৭৬) গ্রন্থে রাধা আ ম্যাড লাভার' প্রবন্ধে কৃষকে বর্তমান ব্যবসায়ী সিনেমার আধুনিক ইভটিচার হিসেবে দেখেছেন। আর রাধাকে দেখেছেন বাংলার চিরন্তন দুঃখ-যাপিত নারী হিসেবে।

বহিরঙ্গে নাটকের অস্তিত্ব কিন্তু অন্তরতো গীতিকাব্য। মোট তেরোটি অংশে কাব্যটি রচিত : (১) খণ্ড (2) তাম্বুলখন্ড (৩) দানখণ্ড (৪) নৌকা ও (৫) ভারখন্ড (৬) ছত্রখণ্ড (৭) বৃন্দাবনখণ্ড (৮) কালীয়দমনখণ্ড (৯) যমুনা (১০) হারখণ্ড (১১) বাঘখণ্ড (১২) বংশীগণ্ড (১৩) রাধাবিরহ। শেষ অংশে খণ্ড'-টি যুক্ত নেই। কৃষ্ণ, রাধা ও বড়ায়ি— এই কাব্যের তিন প্রধান চরিত্র। কিশোরী রাধা প্রথমদিকে কৃষ্ণবিমুখ থাকলেও পরিণতিতে যুবতী রাধা কুয়- আকুল হয়ে শুনেছে—'কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি কালিনী নইকুলে। কেনো বাঁশি বাএ বড়ায়ি এগোঠ গোকুলে। আকুল শরীর মোর বেয়াকুল মন। বাঁশির শবদে মোর আউলাইল রাখন। এগারো বছর বয়সে রাধার পিছনে কৃষ্ণ অনুসারী হয়েছিলেন। কুয় নিজেই রাধাকে অপ্রাপ্ত বয়সে ব্যবহার করেছেন। রাধা বলেছেন নিখখত না দিও মোর পয়োধরে। অর্থাৎ শরীরেরও নিজস্ব একটি মন তৈরি হয় সে আকুতি রাধার এবাক্যে উদ্‌ভাসিত। রতি যখন জাগেনি আরতি তখন কোথায় ? তাই পরিণত রাধা ক্রমশ কৃষ্ণের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। কাব্যের উনশেষ অংশে রাধা কৃষকে ফিরিয়ে আনতে বিড়ায়িকে পাঠিয়েছেন। কুয়ের সাফ বক্তব্য লেখুত রস না দিও কাটা ঘারে। শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণরাধা থেকে দূরে সরে গেছেন।

বড়ার চরিত্রটি সমস্ত মধ্যযুগে এক বিকল্প চরিত্র। যিনি দুপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ঘটিয়েছেন। আবার প্রয়োজনে দুপক্ষকেই নাচিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনের বর্ণনা তাঁকে এই কাজটিতে বিশেষভাবে প্রাণিত করেছে। মধ্যযুগের সমাজ অন্বেষণ করলে এরকম চরিত্র বাস্তবে দেখাই যেত। ব্যক্তিজীবনের ব্যর্থতা এভাবে কাবাজীবনে একটি সার্থকতার সন্ধান করেছেন। বস্তু অত্যন্ত নিপুনতার সঙ্গে রক্তমাংসে জীবন্ত করে বড়ায়িকে নির্মাণ করেছেন তাঁর কাব্যে। কাব্যটি প্রাগচৈতন্য যুগের, ফলে স্থূলতার প্রাধান্য আছে। সমকালীন সমাজ সত্যের উদ্ভাসনে কাব্যটি মধ্যযুগের গুরুত্বপূর্ণ কাব্য।

কবি বিদ্যাপতি বৈষব পদাবলি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং স্বয়ং চৈতন্যদেব মুগ্ধ হয়ে পদাবলির রস আস্বাদন করতেন। চতুর্দশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের (১৪৮৬ খ্রি.) প্রাককালে মিথিলার বিসফী গ্রামে এক শৈব-রায়ণ পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। সংস্কৃত ভাষাসাহিত্য এবং স্মৃতি-সংহিতায় তিনি সবিশে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন এবং মিথিলা-নৃপতি শিবসিংহের আনুকূল্যে তিনি রাজকবির মর্যাদা লাভ করেন। বিদ্যাপতি আদতে মিথিলাবাসী হলেও বলাদেশের কাবারসিকরা তাঁকে প্রাণের কবি হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন এবং বলাদেশ ও মিথিলার ভৌগোলিক ব্যবধানকে অস্বীকার করে স্বয়ং চৈতন্যদেরও বিদ্যাপতির রসাস্বাদনে তৎখ হয়েছিলেন বলে জানা যায়। বিদ্যাপতি এক নতুন ধরনের কাব্যভাষাও নির্মাণ করেন— প্রাচীন মৈথিলি ভাষার সঙ্গে বাংলার তৎকালীন দেশভাষ অবহঠের সংমিশ্রণে সেই নতুন ভাষার জন্ম হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তা 'ব্রজবুলি ভাষা' নামে খ্যাত। বিদ্যাপতি রাধাকৃষ্ণ মিলন বর্ণনায় দেহ বর্ণনার আতিশয্য দেখিয়েছেন। বিদ্যাপতি রাধার বয়ঃসন্ধি, অভিসার ও মা পর্যায়ের পদ রচনায় বিশেষ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। নারী-মনস্তত্ত্বের সুক্ষ পারম্পর্যকে তিনি অবলীলায় তুলে ধরেছেন তাঁর কাব্যে যেমন লৌকিক ভাব আছে, তেমনি উচ্চমার্গের হৃদয় আকৃতির প্রকাশেও তিনি চমৎকারিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন ।

চণ্ডীদাস বাঙালির প্রাণের কবি। তিনি সম্ভবত বীরভূমের নানুরে জন্মগ্রহণ করেন। চৈতন্যদেব পদাবলির রস গ্রহণ করে খুব আনন্দ লাভ করতেন।চণ্ডীদাস রাধার প্রেম বর্ণনায় তাঁর সাধিকামূর্তি অর্জন করেছেন— সই কেবা শুনাইল শ্যামনা। কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো আকুল করিল মোর প্রান ।

সহজ কথায়, নিরলংকৃত ভাষায়, সাবলীল ছন্দে চণ্ডীদাস রাধিকার কৃষব্যাকুলতাকে রূপায়িত করেছেন। রূপ নয় রূপাতীয় প্রেম, দেহ নয় দেহাতীত বাঞ্ছনাই ছিল চণ্ডীদাসের অভীঃ। পরবর্তীকালে জ্ঞানদাস চণ্ডীদাসের ভাবতন্ময়তা ও আলিয় বিন্যাসকে বিশ্বস্তভাবে অনুসরণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির পারস্পরিক বৈসাদৃশাকে এইভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন—'বিদ্যাপতি সুখের কবি চণ্ডীদাস দুঃখের কবি। বিদ্যাপতি বিরহে কাতর হইয়া পড়েন, চণ্ডীদাসের মিলনেও সুখ নাই।”

ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে, বর্ধমান জেলার কাটোয়ার নিকটবর্তী কাঁদড়া গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবার জ্ঞানদাসের জন্ম হয়। তাঁর ব্যক্তিজীবন বিষয়ে বেশি কিছু জানা যায় না, তবে নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর সান্নিধ্য ও সাহচর্য ভাগে পদ রচনা করতে উৎসাহিত করেছিল বলে গবেষকরা মনে করেন।

চৈতন্য-পরবর্তী কবি আনদাস – তাঁর পদে পাওয়া যায় ভক্তিভাবের সঙ্গে মানবিক অনুভবের প্রাণময় রূপায়ণ। জ্ঞানদাসের পদের প্রকাশরীতি চণ্ডীদাসের মতোই সরল প্রাঙল । এ জন্যে অনেকে বলেন জ্ঞানদাস চণ্ডীদাসে ভাবশিষ্য। ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু ঐক্য উভয় কবির পদে পাওয়া গেলেও জ্ঞানদাস আপন প্রতিভায় ভাষা চণ্ডীদাসের রাধা বলে

সই জাতি জীবন কালা তোমরা আমারে

যে বল সে বল

কালিয়া গলার মালা।
আদাসের পদে বাধার অনুচর আরও গাঢ়

কানু সে জীবন

হিয়ার লী

দুটি সারির তারা পরান অধিক জ্ঞানদাস অনুরাগ বিষয়ের পদের নিপুণ শিল্পী, বিশেষত রূপানুরাগের পদে তাঁর কৃতিত্ব অনন্য। তিনি লেখেন—

নিমিশে নিমিয়ে হারা

বুখলাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর। প্রতি ালা লাগি কাদে প্রতি অন্য মোর।

মনে করতে পারি তাঁর প্রসিদ্ধ গন যেখানে রাধার মনে গভীর প্রেম বার হয়েছে, সমাজ আর পরিবার তাঁর কাছে হতো।

কে সে কহ মোরে

ছাড়ে বা ছালুক গৃহপতি

শরণ লই চো

কি করিব ঘরের বসতি ||

উত্তরে গোবিন্দদাস বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যের বিশিষ্ট তপ্ত কবি। তিনি ছিলেন কবি বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য। কাব্যাদর্শে বিদ্যাপতিপন্থী গোবিন্দদাস শ্রীমন্তে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা বিখ্যাত চেতনা তত্ত্ব চিত্রগ্রীব সেন। অয় বয়সেই তিনি শ্রীনিবাস আচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শ্রীজীব গোজামীর সলো তাঁর বিশেষ সখ্য ছিল এবং তাঁর প্রতিভায় মুখ্য হয়ে তিনিই গোবিন্দদাসকে 'কবিরাজ' অভিধা প্রদান করেন।

গোবিন্দদাস চৈতন্য পরবর্তীকালের বৈয়ব পাবনি রচনীতা। চেতনা পূর্ববর্তী এবং চেতনা পরবর্তী স্তরের বৈপ্লব পদাবলির মধ্যে আছে প্রভেন। চৈতন্যপূর্ব বৈষ্ণব পদকর্তাদের কাছে রাধাকৃষ্ণ কোনো আধ্যাত্মিক অনুভবের দ্যোতক পুরাণ প্রতিমা নয় তারা নিতান্তই প্রেমিক যুবক-যুবতি। চণ্ডীদাসের পদে তারা নিতান্ত মান্য প্রেমিক-প্রেমিকা। গোবিন্দদাস বিদ্যাপতির মতো মণ্ডনকলা-মধুর অপেন না অভান্ত ছিলেন। তাই বহুকাল আগে থেকেই

বিদ্যাপতির সঙ্গে গোবিন্দদাসের তুলনা করা হয়ে এসেছে।

গোবিন্দদাস ও বিদ্যাপতির পদের ভাষায় সাদৃশ্য আছে। কারণ বিদ্যাপতির পদের ভাষা মৈথিলি অবহ গোবিন্দদাসের পদের ভাষা— এই দুই ভাষার আধারে ঠিক কৃত্রিম সাহিত্যালয়া রজবুলি। তিনি গ্রহণ করেছেন ব্রয়োদশ চতুর্দশ শতকের মৈথিলির রূপ— বিদ্যাপতির পদ এই সময়েই রচিত। তাই উভয়েনা পদে আছে ভাষাগত সাদৃশ্য।

লাশ শতাব্দীতে চৈতনের আবির্ভাবে বস্তুত বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি ও ঘটে। চেতনা-প্রবর্তিত আন্দোলন মূলত ধর্মভিত্তিক হলেও বা সমাজবি new humanism-এ প্রবর্তন করে ছিলেন চৈতনাদের। চৈতন্যজীবন ও কাণ্ড দেশ থেকে দৃশ্য-অদৃশ্য ভেদরেখা তুলে দেবার পক্ষে এক প্রবল গতিবেগসম্পন্ন গড়ে তোলে।

এই আন্দোলনের ফলে সমকালীন সমাজের সামনে এক সাম্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জনগণ সামিল হয়। ত আবির্ভাব-লগ্ন থেকে জনরুটি ভ্রাম্যতামুক্ত হয়ে সুরুচিকর জীবন আদর্শের লক্ষ্যে এগিয়েছে এবং সংস্কৃতি জীবনে কোনো ভাবের প্রাধান্য ঘটিয়েছে। ধর্ম ও সমাজজীবনে সহিঞ্চুতা ও সহনশীলতার বাতাবরণ তৈরি করেছে তাঁর।

পরোপকারের মধ্যেই সমাজজীবনের সার্থক বিকাশ ঘটে—এই বোধ তাঁর জীবন থেকে সমাজ গ্রহণ করতে শুধু করে। তাঁর পরমত সহিষ্ণুতা, ধর্মীদরিদ্র, আচারবিচারের বেড়াজালে আবদ্ধ সমস্ত মানুষকেই একটি বন্ধ জনসমষ্টিতে পরিণত করেছিলেন। বর্ণবিদ্বেষ, পারস্পরিক ঘৃণা, মানবিকতা-বর্জিত আচরণ, ধর্মীয় আচারসর্বস্বতা ইত্যাদি আমাদের সংস্কৃতি, সমাজ ও ভাবজীবনের গতিকে স্তষ্ক করে দিয়েছিল, চৈতন্যের আবির্ভাব সেই জড় জাতিকে আবার চলার ছন্দে গতিশীল করেছিল। তাই তিনি শুধু ধর্মপ্রচারক নন, একজন সমাজ সংস্কারকও ছিলেন।

চৈতন্যদেব নিজে সাহিত্যিক ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু পাদশ শতাব্দীতে তাঁর আবির্ভাব বাংলা সাহিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।

চৈতন্যদেবের জীবন প্রকৃতপক্ষে বৈষ্ণবধর্ম ও জীবনযাপনের এক দার্শনিক ভিত গড়ে দিয়েছে। তাঁর আবির্ভাবে প্রত্যক্ষভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে বৈয়ব পদাবলি ও জীবনী সাহিত্য। সেই বোধের আলোকে চৈতন্যদেবের ভক্তি ও প্রেমের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সাহিত্যের অঙ্গনে এসেছেন গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস, বলরামদাস, যদুনন্দন, নরহরি চক্রবর্তী প্রমুখ প্রখ্যাত পদকর্তা।

চৈতন্য প্রভাবিত হয়ে চৈতন্যোত্তর সাহিত্যে এসেছে 'গৌরচন্দ্রিকা' বা 'গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ'। চৈতন্যের জীবনী অবলম্বনে রচিত হয় জীবনী সাহিত্য যেমন, বৃন্দাবন দাসের 'শ্রীচৈতন্য ভাগবত', জয়ানন্দ ও লোচনদাসের 'চৈতন্যমঙ্গল', কৃয়দাস কবিরাজের 'শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত' প্রভৃতি অমূল্য গ্রন্থ। চৈতন্যোত্তর যুগের বাংলা সাহিত্যেও তাঁর প্রভাব লক্ষণীয়। কাশীরাম দাসের অনুবাদ সাহিত্য 'মহাভারত'-এও বৈষ্ণু রুচি ও কোমলতার ছাপ পড়েছে, মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীর চরিত্রেও এসেছে নমনীয়তা ও সহিঞ্চুতা; শাক্ত ও বালৈ সাহিত্যেও চৈতন্য প্রভাব লক্ষ করা যায়।

বৃন্দাবনদাস বিরচিত আলোচ্য প্রশ্নটি বাংলা ভাষার প্রথম চৈতন্যজীবনী কাব্যের গৌরব দাবি করতে পারে। আনুমানিক ১৫১০-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নবদ্বীপে তাঁর জন্ম হয়। কবি নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর শিষ্য ছিলেন এবং তাঁর নির্দেশেই শ্রীচৈতন্যভাগবত লিখতে প্রবুদ্ধ হন। প্রথমে গ্রন্থটির নাম ছিল 'চৈতন্যমঙ্গল, পরে বৃন্দাবনদাস গ্রন্থনামের পরিবর্তন করে রাখেন শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত'।

অধিকাংশ বিদগ্ধ পণ্ডিতের মতে, ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দের পরে কাব্যরচনা সম্পূর্ণতা পেয়েছিল একান্নটি অধ্যায়ে, কারাটিকে কবি আদি-মধ্য-অন্ত্য খণ্ডে বিভক্ত করেছিলেন। শ্রীচৈতন্যের বাল্য ও কৈশোরের লীলাবর্ণনায় বৃন্দাবনদাস সরলতা এবং বাস্তবতাকে সযত্নে রক্ষা করেছেন এবং দুরুহ তত্ত্বকথাকে প্রাধান্য না দিয়েও তিনি শ্রীচৈতন্যের ভাবমূর্তি ও মানবমূর্তির মধ্যে সমতা বিধানে সমর্থ হয়েছেন বলে সাধারণ পাঠক সমাজে গ্রন্থটি অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে অত্যখণ্ডটি কিছু সংক্ষেপিত এবং স্থানে স্থানে অলৌকিক ঘটনার অনুপ্রবেশ লক্ষ করা যায়। গৌরাঙ্গ-বিষয়ক পদ রচনাতেও তাঁর দক্ষতা ছিল।

বৃন্দাবন লাস প্রধানত ভক্ত, গৌণত কবি। সে কারণে তাঁর কারো আদর্শ জীবনী সাহিত্যের লক্ষণ স্পষ্ট হয়নি। তিনি চৈতন্যকে অলৌকিক মানুষরুপেই চিত্রিত করেছেন এবং অন্যান্য চরিত্রও সাধারণ মানুষ হিসেবেই হয়ে উঠেছে বাস্তব। চৈতন্যের সন্ন্যাস গ্রহণের বিবরণ তিনি সংক্ষেপে দিয়েছেন তবু, বর্ণনাটি হৃদয় স্পর্শ করে।

বৃন্দাবনদাসের ‘শ্রীচৈতন্যভাগবত' ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হোসেন শাহের রাজত্বকালের প্রথম বিশ। বছরের—পঞ্চদশ- ষোড়শ শতকের সংযোগস্থলের সমাজপরিবেশ যেভাবে বৃন্দাবনদাসের কাব্যে চিত্রিত হয়েছে তা আর কোনো পুরোনো বাংলা কাব্যে পাওয়া যায় না। নবদ্বীপে পড়িলে যে বিদ্যারস পায়' অংশে নবদ্বীপের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথা জানতে পারি।

শ্রীচৈতন্যের জীবন নিয়ে আধারিত কাব্যগুলির মধ্যে শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত' সর্বশ্রেষ্ঠ। কৃষ্ণদাস কবিরাজ এখানে বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শন যেমন সম্মিলিত করেছেন তেমনই মহাপ্রভুর জীবন ইতিহাসকেও নিপুণ দক্ষতায় বিশ্লেষণ করেছেন।

আলোচ্য গ্রন্থটি আদি-মধ্য-অন্ত্য খণ্ডে বিন্যস্ত ও সর্বমোট ৬২ অধ্যায়ে সন্নিবেশিত। অন্ত্যর্থ ওটিতে কবির একাগ্রতা প্রবল হয়ে উঠেছে কেননা শ্রীচৈতন্যভাগবতে অস্থাখন্ডটি সে অর্থে বর্ণিত হয়নি। বৈষুবদর্শন, সখীতত্ত্ব, কৃষ্ণতত্ত্ব প্রভৃতি গুরুতর আলোচনা গ্রন্থটির কলেবর বৃদ্ধি করেছে। সমগ্র গ্রন্থে, তিনি কখনও সাম্প্রদায়িক বিশ্লেষবুদ্ধির দ্বারা প্রভাবিত হননি এবং বৈষ্ণবসুলভ বিনয় ও সংযমকে পূর্বাপর রক্ষা করেছেন। গতানুগতিক পরার-ত্রিপদী ছন্দেও কুয়দাস কবিরাজ বৈষুব রসসাধনা, রাধাকৃষ্ণের যুগল রসতত্ত্ব, চৈতনাবতারের অন্তপর্ব— সমুদয় বক্তব্যকে যথেষ্ট প্রাঞ্জল করতে পেরেছিলেন বলে ঐতিহাসিক মূলো উজ্জ্বল। আদিলীলার প্রথম আশে কৃষ্ণদাস চৈতন্যকে রাধা ও কৃষ্ণের সম্মিলিত রূপের অবতার বলে গ্রহণ করেছেন ও এই অংশের শেষে সংক্ষেপে চৈতন্যের বালা, কৈশোর ও যৌবনের বিবরণ আছে। মধ্যলীলায় চৈতন্যের সন্ন্যাসগ্রহণ, দাক্ষিণাত্য, বৃন্দাবন ও কাশীভ্রমণ, রায় রামানন্দের সকো ভালোচনা বর্ণিত হয়েছে এবং অন্ত্যলীলার আছে চৈতন্যের তিরোধান পর্যন্ত শেষজীবনের বর্ণনা তাঁর কাব্যে একান্ত জীবন্তভাবে বর্ণিত হয়েছে।।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হল বৈষ্ণব পদাবলি। রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলা বৈচিত্র্য অবলম্বনে বাঙালি তত্ত্ব সাধক কবিরা বৈয়ব পদাবলি রচনা করেছিলেন। কবি জয়দেবই সর্বপ্রথম 'পদ' শব্দটি ব্যবহার করেন তাঁর

‘গীতগোবিন্দ' কাব্যে। মধ্যযুগীয় সাহিত্যসম্ভারের মধ্যে বৈষ্ণব পদাবলি একটি সম্মাননীয় আসন অধিকার করে আছে। যদিও গীতিকবিতা

অর্থে পদাবলি শব্দটির ব্যবহার সুপ্রচলিত, তথাপি বৈষ্ণব পদাবলি শুধুমাত্র লিরিক নয়। তার গোপনে নিগূঢ় আধ্যাত্মিক উপলব্ধির দ্যোতনাও নিহিত আছে এবং কবিত্বশক্তির মাহায্যে বৈষব পদাবলির সেই তাত্ত্বিক আদর্শকে ভেদ করে মানবীয় আনন্দবেদনাও মূর্ত হয়ে উঠেছে।

শ্রীচৈতন্যের আবেগ-আর্তি বৈয়ব পদাবলিকে একই সঙ্গে ধর্মীয় সাধনা ও সাহিত্যের মর্যাদা দান করে। শ্রীচৈতন্যের সমকালে এবং পরে বহু কবি তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অসংখ্য ভাববিহুল পদ সৃজন করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চৈতন্য পূর্ববর্তী বৈষ্ণব পদাবলি গৌড়ীয় বৈষ্ণবদর্শনের স্পর্শরহিত। বরং চৈতন্যোত্তর পদাবলিতেই সচেতনভাবে দার্শনিক তত্ত্বের অনুপ্রবেশ ঘটে।

অসংখ্য কবি মনসার পালা অনুসরণ করে মনসামঙ্গল রচনা করেছেন। তন্মধ্যে কানা হরিদত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপলাই ও নারায়ণদেবের নাম স্মরণীয়। তাদের মধ্যে কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ মনসামঙ্গল কাব্যধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। মনসার এক নাম কেতকা। কিরা পাতে জন্ম হৈল কেতুকাসুন্দরী'। তাই কবি নিজেকে কেতকাদাস ক্ষেমানন্ বলেছেন।

তিনি বর্তমান হুগলি জেলার অন্তর্গত বাদড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাতৃআদেশে মাঠে খড় কাটতে গিয়ে করি মনসার দেখা পান এবং মনসার আদেশে মনসামঙ্গল রচনা করেন। কাব্য রচনাকাল সম্ভবত সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগ। তাঁর কাব্য উভয় বঙ্গেই জনপ্রিয় ছিল। কারণ তবে কাহিনির বাধা ছকের বাইরে যাওয়ার উপায় কবির ছিল না। তবুও সমকালীন সামাজিক রীতিনীতি ও ভৌগোলিক পরিবেশের বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁর রচনা বাস্তবসম্মত। সীতা চরিত্রের আদর্শে সর্বাধিক, সহজ সাবলীল ভাষায় রচিত তাঁর কাব্য সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে লৌকিক দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য কীর্তিত হয়েছে। দুটি আখ্যান নিয়ে চণ্ডীমঙ্গল কাহিনি : (১) আখেটিক খণ্ড' বা 'ফুল্লরা-কালকেতু' উপাখ্যান (২) বণিক বলে বা 'ধনপতি সদাগর উপাখ্যান'।

• প্রাচীনতম কাহিনি বা আখেটিক খণ্ড

ইন্দ্রপুত্র নীলাম্বর চণ্ডীর প্ররোচনায় সামান্য অপরাধে মর্তো ধর্মকেতুর পুত্র কালকেতু হয়ে এবং তার স্ত্রী ছায়া ফুল্লরা নাম নিয়ে ব্যাধ-কন্যা রূপে জন্ম নেয়। এগারো বছর বয়সে ফুলরার সঙ্গে কালকেতুর বিয়ে হয়।

ওদিকে কালকেতুর বিক্রমে বনের পশুরা অতিষ্ঠ হয়ে চণ্ডীদেবীর কাছে আকুল প্রার্থনা জানালে দেবী তাদের নিশ্চিন্ত করলেন এবং পরদিন শিকারে বেরিয়ে চণ্ডীমায়ার প্রভাবে কালকেতু শুধু এক স্বর্ণগোধিকা ছাড়া কোনো শিকারই হস্তগত করতে পারল না। অবশেষে রুদ্ধ, বিরত্ব কালকেতু সেই স্বর্ণগোধিকাটিকে ধনুকের গুণে বেঁধে বাড়ি নিয়ে এল। কালকেতুর পরামর্শে ফুল্লরা সাহায্যের আশায় প্রতিবেশীর কাছে গেল আর নিরুপায় কালকেতু বাসি মাংসের পসরা সাজিয়ে বাজারের উদ্দেশে রওনা দিল।

বলাবাহুল্য, স্বর্ণগোধিকাটি স্বয়ং দেবী চণ্ডী, বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তিনি সুন্দরী যুবতীর রূপ পরিগ্রহ করলেন। ফুলরা ফিরে এসে তাঁকে প্রত্যক্ষ কার যথারীতি বিস্মিত হয়ে পরিচয় জানতে চাইলে সুন্দরী বলল যে কালকেতু তাকে 'নিজগুণে বেঁধে ঘরে নিয়ে এসেছে এবং এখন থেকে তাই সে কালকেতুর ঘরেই থাকরে। শুনে ফুলগার বুক কেঁপে উঠল কেননা শত অভাব-অনটনের মধ্যে স্বামীপ্রেমই ছিল তার শেষ ভরসা। সতীনের আবির্ভাবে সেই সুখের দিনেরও বোধ হয় অবসান ঘটল এই ভেবে ফুলরা বিশেষ কাতর হল এবং সুন্দরী মহিলাকে তাড়াতে নিয় জীবনের সুখদুঃখ অর্থাৎ বারোমাস্যা' বর্ণনা করলেন।। কালকেতু অবাক হয়ে সবকিছু ভালো করে বুঝতে ঘরে উপস্থিত হল এবং সুন্দরীকে মিষ্টি বচনে ঘর থেকে বিতাড়িত করতে না পেরে শেষে কালকেতু ধনুকে শর অণ্ডল। কিন্তু সেই শের নিক্ষিপ্ত হল না। স্বামী-তীর ডা আশঙ্কা-বিস্ময় যখন উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে তখন দেবী প্রকাশিতা হয়ে সবিস্তারে সকল ঘটনা জানিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ ক্ষুদ্ররা কালকেতুকে সাত ঘড়া ধন উপহার দিলেন এবং আদেশ দিলেন বন কেটে গুজরাট নগরী পত্তন করতে। নববসতিতে ভাঁড়ুদত্ত নামে এক শঠের অত্যাচারে প্রজারা ক্ষিপ্ত হয়ে কালকেতুকে নালিশ জানালে তাঁকে কালকেতু নগর ছাড়া করে এবং ভাঁড়ারের প্ররোচনার কলিকারাজ কালকেতুকে যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দি করে। শেষে চন্ডীর স্বপ্নাদেশে কালকেতু মুক্ত হয় ও মর্তো দেবী চণ্ডীর পূজা প্রচলিত হয়।

উজানীনগরের নিঃসন্তান বণিক ধনপতি স্ত্রী লহনার সম্মতিতে শ্যালিক মুপ্পনাকে বিয়ে করেন। এরপর রাজাদেশে 'সুবর্ণ পিএব আনতে গৌড়ে যান। তাঁর অনুপস্থিতিতে দুর্বলা দাসীর শঠতায় লহনা-ঘুমনার মধ্যে বিবাদ শুরু হয় এবং নুহনাকে অবর্ণনীয় কষ্টে জীবন কাটাতে হয়। দৈবক্রমে বনের মধ্যে পাঁচ দেবকন্যাকে চণ্ডীপূজায় নিয়োজিত দেখে চণ্ডীপূজা করে ঘুমনা স্বামীকে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন এবং লহনা স্বামী কর্তৃক তিরস্কৃত হন। সপ্তডিঙা সাজিয়ে ধনপতি সিংহল যাত্রা করলে মুদ্রনা স্বামীর কল্যাণে চণ্ডীপূজা করলে শৈসাধক ধনপতি তা জানতে পেরে চণ্ডার ঘট পদাঘাতে ভেঙে দেন। চণ্ডী প্রতিশোধ নিতে সামুদ্রিক বড় সৃষ্টি করলে কোনো রকমে একটা ভিত্তা নিয়ে ধনপতি আত্মরক্ষা করালেন ও কালীদহে কমলে কামিনী' দেখেন। সিংহলের রাজাকে কমলে কামিনী' দেখার কথা বললে তিনি তা দেখানোর কথা বলেন এবং ধনপতি তা দেখাতে না পেরে কারাগারে বন্দি হন।

অপরদিকে খুল্লনার পুত্র সিংহলরাজকে চন্ডীর কৃপায় কমলে কামিনী' দৃশ্য দেখাতে সমর্থ হলেন। রাজকন্যাকে নিয়ে ও অর্ধেক সম্পত্তির মালিক হয়ে ধনপতি সপুত্র-পুত্রবধূ ঘরে ফিরে মহা ঘটা করে চণ্ডীপূজা করেন। এরপর মর্ত্যলোকে মহা সমারোহে দেবী চণ্ডীর পূজা প্রচারিত হল।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্য রচনা করেন মানিক দত্ত, মাধব আচার্য, প্রমুখ। এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন মুকুন্দ চক্রবর্তী। এর উপাধি ছিল 'কবিকঙ্কণ'। মঙ্গলকাব্যের রচনারীতি ছিল সুনির্দিষ্ট ; আটদিনে খোলো পালায় দুটি কাহিনি শেষ হত।

দিনগত বিন্যাস-নিয়মের ব্যতিক্রম করা যেত না বলে পুনরাবৃত্তিতে ক্লান্তিকর হত কাহিনি।

মুকুন্দের বিশেষত্ব এখানেই যে এই কঠিন নিয়ম-নিগড়ের বন্ধনেই তিনি রচনাকে করে তুলেছেন সাহিত্য। সরল ভাষায় বাস্তবের সপ্রাণ রূপায়ণই মুকুন্দের বিশেষত্ব। বাস্তব জীবনের প্রচুর অভিজ্ঞতা থাকায় তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতাবলে তিনি প্রতিটি অনুপুরা সহ সর্বশ্রেণির মানবজীবনকে করে তুলেছেন বাস্তব। মেয়েদের সমকালীন সামাজিক অবস্থানের বাস্তবরূপটি সংক্ষিপ্ত ভাষায় চিত্রিত করেছেন মুকুন্দ (তাঁর চণ্ডীমলালের কোনো স্থানেই 'মুকুলরাম' ভণিতা নেই। তাই পণ্ডিতগণ তাঁকে মুকুন্দ বলার পক্ষপাতী) যা তাঁর রচনা-দক্ষতার পরিচয় দেয়। পরিহাস হলে পরিমার্জিত ও সাবলীল ভাষায় চরিত্র সৃষ্টিতেও তিনি যথেষ্ট দক্ষতা দেখিয়েছেন। অনুপুঙ্খ বর্ণনা মুকুন্দের বিশেষত্ব। তাঁর কৃতিত্বে যে বর্ণনা হয়েছে সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। গুজরাট নগর পত্তন বর্ণনায় অন্ত্যজ শ্রেণি আর মুসলিম সমাজের বিবরণ তার প্রমাণ। সব মিলিয়ে মুকুন্দের চণ্ডীমকাল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ক্ষেত্রে একটি সামাজিক দর্পণ।

ধর্মমঙ্গল কাব্যে রাঢ় বাংলায় পূজিত ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য কীর্তন করা হয়েছে। ধর্মমঙ্গল কাব্যের দুটি কাহিনি, প্রথমটি অপুত্রক রাজা হরিশচন্দ্রকে নিয়ে, দ্বিতীয়টি লাউসেনের আখ্যান। তবে ধর্মমঙ্গলের কাহিনি বলতে লাউসেনের কাহিনিই বোঝায়।

• লাউসেনের কাহিনি:

গৌড়েশ্বরের সামন্ত কর্ণসেন ইছাই ঘোষ নামে এক সামন্তের আক্রমণে ছটি পুত্রকে হারিয়ে কাতর হয়ে পড়েন। তখন গৌড়েশ্বর বৃদ্ধ কর্ণসেনকে গৃহী করার জন্যে তাঁর আপন শ্যালিকা রঞ্জাবতীর সঙ্গে বিয়ে দেন। কিন্তু কর্ণসেন বুদ্ধ বলে এই বিয়েতে অমত পোষণ করেন গৌড়েশ্বরের শ্যালক মহামদ। এই বিয়ের পর মহামদ ভগ্নীপতিকে আটকুড়া' বলে উপহাস করতে আরম্ভ করেন। এই উপহাসের জবাব দিতে রঞ্জাবতী পুত্রলাভের বাসনায় ধর্ম ঠাকুরের আরাধনা করলে ধর্মের কৃপায় পুত্র লাভ করেন। পুত্রের নাম রাখা হয় লাউসেন। রঞ্জাবতীর পুত্রলাভ মহামন বা মাহুদ্যাকে আরও নিষ্ঠুর করে তোলে এবং বহু উপায়ে লাউসেনের ক্ষতিসাধন করতে তিনি তৎপর হয়ে ওঠেন। আর লাউসেন ধর্মের কৃপায় সেসব মারাত্মক বিপদের হাত থেকে উদ্ধার পান। লাউসেন রুমে বড়ো হতে থাকলেন ও শাস্ত্রবিদ্যা লাভ করলেন। গৌড়েশ্বর যেসব দুরূহ কাজ করতে পারতেন না, সে সমস্ত কঠিন কাজের সমাধান করতে লাগলেন লাউসেন। চারদিকে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ল। মাহুদ্যা লাউসেনের অনিষ্ট করতে গিয়ে তাঁর অনুপস্থিতিতে পুরী আক্রমণ করেন। লাউসেনের পত্নীরা বীরত্বের সঙ্গে। মহামদকে বিতাড়িত করেন। পরাজিত মামা এবার ভাগনের কর্মদক্ষতার পরিচয় প্রমাণ করতে বিরাট বাজি ধরেন এবং বলেন প্রমাণ করুক পূবের বদলে পশ্চিমে সূর্যোদয়, কিন্তু লাউসেন ধর্মের কৃপায় সেটাও প্রমাণ করে দেখান। দুষ্কর্মের মহামদ মাহুদ্যা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হন। পরে লাউসেনের প্রার্থনা ধর্মঠাকুর তাঁকে ক্ষমা করেন ও কাব্যশেষে স্বর্গভ্রষ্ট নায়ক লাউসেন স্বর্গে যান। তাঁর পুত্র চিত্রসেন লাভ করে ময়নার শাসক পদ।

ধর্মমঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন কেনারাম চক্রবর্তী, শ্রীশ্যাম পণ্ডিত, রূপরাম চক্রবর্তী প্রমুখ। এঁদের মধ্যে ধর্মমঙ্গল কাব্যের সর্বাধিক জনপ্রিয় কবি হলেন ঘনরাম চক্রবর্তী।

বর্ধমানের কইয়ড় পরগনার কুকুড়া-কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা ঘনরাম চক্রবর্তীর পিতার নাম গৌরীকান্ত এবং মাতা সীতাদেবী। কবি সম্ভবত বর্ধমান রাজ কীর্তিচন্দ্রের দ্বারা উপকৃত হয়েছিলেন। কারণ তিনি আপন কাব্যে বহুবার তাঁর সপ্রশংস উল্লেখ করেছেন। সম্ভবত ১৭১১ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে তাঁর কাব্য রচিত হয়। তিনি তাঁর কাব্যে আত্মপরিচয় খুব সামান্যই দিয়েছেন। ঘটনাবিন্যাস, চরিত্রনির্মাণ এবং চিত্রাঙ্কনে তিনি বিশেষ নিপুণতার পরিচয় দিয়েছেন। ধর্ম মালের দুটি কাহিনিকে ঘনরাম তাঁর পরিবেশনের গুণে মহাকাব্যের মর্যাদা দান করেছেন। লাউসেন চরিত্রে বলিষ্ঠ পৌরুষ ও বীরত্বের সমন্বয় এবং কলিঙ্গা, কানাড়া প্রমুখ নারী চরিত্রকে স্নেহময়ী ও বীরত্বের আদর্শে চিত্রিত করেছেন। হাস্য, করণ ও বীররসের চিত্রণেও বিশেষ দক্ষ ছিলেন তিনি। ঘনরাম নানা শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। তাঁর কাব্যে পাণ্ডিত্য ও কবিত্ব মিশে গেছে। তাঁর রচনার বিশেষ গুণ মার্জিত রুচি।

মুকুন্দ চক্রবর্তী মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যধারার অন্যতম কবি মুকুন্দ তাঁর কাব্যে 'অভয়ামঙ্গাল' নামটি বেশি বার ব্যবহার করলেও ভণিতায় চণ্ডিকামঙ্গল', 'অম্বিকামঙ্গল', 'গৌরীমঙ্গল' 'শ্রীকবিকঙ্কণ রস গান' এর ব্যবহার আছে।

• তাঁর রচিত 'চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যটির প্রকৃত নাম 'অভয়ামঙ্গল'।

■ সমগ্র মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুকুন্দ চক্রবর্তী একজন উল্লেখযোগ্য কবি। তাঁর অপূর্ব পর্যবেক্ষণ শক্তি দিয়ে নিজের পরিপার্শ্ব জগৎকে দেখেছিলেন, মানবচরিত্রকেও সুক্ষভাবে লক্ষ করেছিলেন। তাই তাঁর কাব্যের বাস্তবতার চিত্র ও ফুল্লরা, মুরারি শীল, ভাড়দত্ত, দুর্বলা দাসী প্রমুখ জীবন্ত চরিত্রগুলি বাংলা উপন্যাস রচনার প্রাক্ প্রস্তুতি হিসেবে অনেক সমালোচকই ভাবেন। কৌতুকরস রচনাতেও মুকুন্দ দক্ষ ছিলেন। কালকেতুর উপাখ্যানে দারিদ্র্যের বাণীরূপ সৃষ্টিতে ও ধনপতি উপাখ্যানে খুলনার দুঃখ বর্ণনায় তাঁর উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর নিহিত আছে। কাবা রচনায় কবি ভাষা, ছন্দ ও অলংকার ব্যবহারে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। কবির আত্মপরিচয় অংশ অপূর্ব রচনা-নৈপুণ্যে মধ্যযুগের রাষ্ট্রীয়, ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক তথ্যের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

তুর্কি আগমনের ফলে বাংলাদেশে অনুবাদকর্মের সূচনা হয়। রামায়ণ অনুবাদকদের মধ্যে স্মরণীয় কবি কৃত্তিবাস ওঝা। রামায়ণের আত্মপরিচয় অংশে কৃত্তিবাস নিজের যে পরিচয় প্রদান করেছেন সেখান থেকে জানা যায়, অরাজকতার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে তাঁর পূর্বপুরুষ বলাদেশ বা অধুনা বাংলাদেশ থেকে ফুলিয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পিতা বনমালী আর মাতার নাম মালিনী দেবী। কোনো এক মাঘ মাসের শ্রীপদমী তিথিতে রবিবারে কৃত্তিবাসের জন্ম হয়েছিল বলে জানা যায়। পণ্ডিতরা অনুমান করেছেন যে, তাঁর জন্মসাল ১৩৯৮ খ্রি. এবং কাব্যরচনার সময়সীমা আনুমানিক ১৪২৫ খ্রি.।

• অ-সামান্য কবিপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন কৃত্তিবাস। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে ছিলেন সুপণ্ডিত। বিভিন্ন লোককথা এবং পুরাণবিষয়ও তাঁর আয়ত্তে ছিল। কাব্যপ্রকরণের সময় তিনি সেই সমস্ত উপাদানের গ্রহণ-বর্জনের দ্বারা স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করেন। তবে যুগে যুগে লিপিকার ও কথক ঠাকুরদের প্রভাবে মূল কাব্যের ভাষা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। পল্লিবাংলার সহজ সরল রূপটি তাঁর হাতে নির্ভুলভাবে বিকশিত হয়েছিল বলে রাম-সীতাসহ অপরাপর চরিত্রগুলি রাজসভার নাতি থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালি পুরুষ ও নারী চরিত্রে পর্যবসিত হয়। কৃত্তিবাসের শ্রীরাম পাঁচালিতে সবচেয় বড়ো জায়গা নিয়েছে 'ভক্তিবাদ'। মৃত্যু পথযাত্রী তরণী সেন-এর কাটামুণ্ড রামনাম উচ্চারণ করেছে। রাবণও বলেছে— মরিব রামের হাতে যদি ভাগ্য থাকে।" আর রামচন্দ্রও বলেছেন, “কেমনে এমন ভরে করিব সংহার। বিশ্বে কেহ রামনাম না ভাইবে আর।। আসলে মধ্যযুগের বাতাবরণে বাঙালির যে স্বাভাবিক ভবিপ্রাণতা, তাই এ কাব্যের প্রেরণাভিত্তি।

কৃত্তিবাস বাল্মীকির রামায়ণের অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর কাব্যের নাম 'শ্রীরাম পাঁচালী' বা 'রামায়ণ পাঁচালী'।

• কৃত্তিবাসের শ্রীরাম পাঁচালী" বাল্মীকির রামায়ণের ভাবানুবাদ। তাই সৃষ্টির এত বছর পরেও কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাংলার অট্টালিকা থেকে পর্ণকুটির পর্যন্ত সর্বত্র সমাদৃত। বাল্মীকির মহাকাব্যের চারদিকের দেশ-কালের পরিবর্তন ঘটেছে কৃত্তিবাসের কারো, অযোধ্যাকেন্দ্রিক রামকাহিনি পরিবর্তিত হয়ে পূর্বভারতকেন্দ্রিক রামকাহিনিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলার পারিবারিক সম্পর্ক বিন্যাসের ছায়ায় দশরথ হচ্ছেন গৃহস্থ পরিবারের স্বীনির্ভর বৃদ্ধ কর্তা; বীর রাম হয়েছেন। পত্নীগতপ্রাণ দুর্বল বাঙালি স্বামী, সীতা অশ্রুমুখী সহনশীলা বাঙালি বধু: কৌশল্যা বাঙালি মা। এইভাবে বাঙালির পারিবারিক জীবনাদর্শ চিত্রিত হয়েছে কৃত্তিবাসী রামায়ণে। বাঙালির রীতিনীতি, আচারবিচার, প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা, চাওয়া পাওয়া, ইত্যাদিতে কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাঙালির জীবনরসে সমৃদ্ধ মহাকাব্যে পর্যবসিত হয়েছে। বাল্মীকি রামায়ণে বীররসের স্থান নিয়েছে বাঙালির নিজস্ব করুণরস। ভক্তিবাদের প্রভাবে রাম হরেছেন ভক্তবৎসল, রাবণ রামকে দেখছেন অনাথের নাথ তুমি পতিতপাবন রূপে। বাঙালির স্বভাব স্বচ্ছন্দ হাস্যরসও এ কাব্যে পরিচর্যা পেয়েছে। হনুমান রাবণ সেনাদের কাঁধের ওপর প্রস্রাব করে দিচ্ছে, কিংবা বলছে, কতগুলি শালী পার লকার ভিতর'—হাস্যরসের উচ্ছ্বল দৃষ্টান্ত। তাই রবীন্দ্রনাথের মতে কৃত্তিবাসের হাতে বাঙালি পেয়েছে স্বতন্ত্র মহাকাব্য। এই জন্যেই বাংলায় কৃত্তিবাসী রামায়ণের এত জনপ্রিয়তা।

মালাধর বসু 'শ্রীমদভাগবত গ্রন্থ অবলম্বনে কৃষ্ণের কাহিনি রচনা করেছেন। তাঁর কাব্যের নাম 'শ্রীকৃল্পবিজয়া।

অনুমান করা হয় পৰুদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মালাধর বসু বর্ধমান জেলার অন্তর্গত কুলীন প্রা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ভগীরণ ও মাতা ইন্দুমতী। তৎকালীন গৌড়েশ্বর তাঁকে 'গুণরাজ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এবং ১৩৯৫-১৪০২ সালের মধ্যে মালাধর বসু সংস্কৃত শ্রীমভাবেতের অনুসরণে শ্রীকৃবিজয় কাবা প্রণয়ন করেন।

মালাধর বসু নানা শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। তবে কার্যক্ষেত্রে তিনি শুধু ভাগবতের দশম ও একাদশ স্কপের অনুবাদ করেছিলেন অর্থাৎ, তাঁর কারো জন্ম থেকে দ্বারকালীলা ও যদুবংশ ধ্বংসের কাহিনি স্থান পেয়েছে। সকল পরার ত্রিপদী ছন্দে তিনি ঘটনারভুকে বিকৃত করেছেন এবং বৃন্দাবনলীলার বর্ণনায় যথ্যের কবিরশল্পির পরিচয় রেখেছেন। সেখানে বুয়শোকাতুরা গোপীদের বিনাপ্যাথা বৈষব পদাবলির কারণোর মতোই সরসতা প্রাপ্ত হয়েছে।

কৃত্তিবাসের মতো মালাধর বসুও অনুরানের কর্মে নিজ স্বাধীনতা বজায় রেখেছেন এবং সংযোজন-পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো বৈচিত্র্য সার করেছেন। বাঙালিত্বের ছোঁয়ার 'শ্রীকৃষ্মবিজয়' গৌরবান্বিত। স্বয়ং নাদেরও মালাধর বসুর প্রশংসা করেছিলেন এবং বৈশর ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে এই কথাকে প্রবেশক গ্রন্থের মর্যাদা দিতেই হয়।

মহামুনি ব্যাসদের সংস্কৃত ভাষায় "মহাভারত রচনা করেন। মহাভারতে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস বরা

আছে। বাংলার ঘরে ঘরে মহাভারতের কাহিনিকে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে কাশীরাম দাসের অবদান অনস্বীকার্য। মধুসুদন দত্ত কাশীরাম দাসকে শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন। আর আপামর পাঠক এই কবিকে (কাশীরাম দাসকে) তাদের আপন অন্তে কাশীরাম দাস কৃত্তিবাসের উত্তরকালের কবি। বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমা গ্রামে এক কায়স

পরিবারে তাঁর জন্ম। মহাভারতের কিছু আশে কবির প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায়। কাশীরাম দাস কৃত্তিবাসের পথ অনুসরণ করে মূল মহাভারতের আক্ষরিক অনুবাদ করেননি ভাবানুবাদ করেছিলেন। কিছু অংশে মূল অংশের সারানুবাদ করেন। যদিও কাশীরাম দাসের মহাভারত নির্মাণকে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য রয়েছে। কারও কারও মতে তিনি আদিপর্ব, সভাপর্ব, বিরাটপর্ব এবং বনপর্ব-রচনা করেছিলেন।। তিনি বাঙালির সামাজিক ও পারিবারিক আদর্শকে সমাজবিজ্ঞানীর মতো বিশ্লেষণ করে তাঁর কাব্যে পরিবেশন করেছেন। এ কারণে কবি মধুসূধন দত্ত বলেছেন, 'হে কাশী করীশ দলে তুমি পুণ্যবান।

বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সীমান্ত হল রাই রাজ্যের বৌদ্ধ ধর্মাবল কাব্যচর্চায় উৎসাহী ছিলেন এবং আরাকান রাজসভার সাহিত্যের প্রধান বিশেষত্ব হল এর ধর্মীয় সংকীর্ণতারহিত চরিত্র এবং ধর্মবিদ্বেষহীনতা, যদিও বাংলার অন্যত্র তখন চলেছে ধর্মনির্ভর সাহিত্য রচনা। হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতার সামঞ্জস্য সাধনের চিহ্ন লক্ষিত হয়। এ সাহিত্যে যেমন, দৌলত কাজি ও আলাওল উভয়েই বিনা বিধায় হিন্দু পুরাণ থেকে উপমা আহার করেছেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য মানুষকে দুরে সরিয়ে রেখেছিল বলে সেখানে। প্রাধান্য পেত দেবমহিমা। বাংলা সাহিত্যের এই শূন্যতা পুরণ করেন আরাকান রাজসভার কবিসমান, শিবায়ন ও অন্নদামলালের পূর্বাভাস দেখা যায় এঁদের রচনায়। এর আগে বাংলা অনুবাদ সাহিত্য ছিল একমুখী — পুরাণ-শাস্ত্রাদির অনুবাদেই আবদ্ধ। কিন্তু আরাকানের কবিবৃদ্ধ আরবি, ফারসি, হিন্দি নানা ভাষা থেকে বহু আখ্যান অনুবাদ না বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের পরিধি বিস্তৃত করেছিলেন বলে মধ্যযুগীয় গতানুগতিকতা থেকে মুক্ত এ সাহিত্য হয়েছিল সমৃদ্ধ। বাংলায় ঐতিহাসিক সাহিত্যের সূচনা করেন এই কবিরা, ক্ষীণ হলেও এ ইতিহাস-চেতনা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের পক্ষে মুল্যবান।

ব্যক্তিমানুষকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এই কবিরা; এ মনোবৃত্তিকে বলা যায় প্রায় আধুনিক। মুসলমানগণ এদেশের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে উঠলেও সাহিত্যে তাঁরা এবং তাদের সাহিত্য ছিল উপেক্ষিত। কোনে দেশের জনসমাজের একটি বড়ো অংশ যদি সাহিত্যে উপেক্ষিত হয় তাহলে সে দেশের সাহিত্য কখনই জাতীয় সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে না। আরাকান রাজদরবারের কবিগণ মুসলিম সংস্কৃতি ও ব্যক্তিজীবনকে সাহিত্যে স্থান দিয়ে এ জুটি থেকে বাংলা সাহিত্যকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এইসব কারণে আরাকান রাজসভার সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয়।

দৌলত কাজি আরাকান রাজসভার বিশিষ্ট কবি। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক প্রেমের কাব্য হিসেবে দৌলত কাজির 'লোরচন্দ্রাণী' বা 'সতী ময়না'র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আরাকান রাজ্যের সমরসচিব আশরফ খানের পৃষ্ঠপোষকতায় দৌলত কাজি মিঞা সাধনের হিন্দি ভাষায় লেখা 'মৈনা কা সৎ কাব্যের অনুকরণে 'লোরচন্দ্রাণী' বা 'সতী ময়না' নামে রোমান্টিক কাব্য রচনা করেন ১৬২১-৩৮ খ্রিস্টাব্দে।

দৌলত কাজি ছিলেন সুফি মতাবলম্বী; তিনি কাব্যের মধ্যে মানব মহিমা কীর্তন করেছেন। চরিত্র সৃষ্টিতে দৌলত কাজি যথেষ্ট সফল। সতীত্বের আদর্শ ময়না, প্রতি নায়িকা চরিত্র চন্দ্রাণী, নায়ক লোর ভিন নপুংসক বামনের চরিত্রও জীবন্ত হয়ে উঠেছে তাঁর কাব্যে।

তাঁর রচনা রীতিতে ক্লাসিক ও রোমান্টিক রীতির সুষম মিশ্রণ লক্ষিত হয়। দুঃখের বিষয় দৌলত কাজি কার্যটি সম্পূর্ণ করার পূর্বেই মারা যান। আরাকানের অর্থমন্ত্রী (দৌলত উজির) সুলেমানের নির্দেশে আনুমানিক ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে কারাটী সম্পূর্ণ করেন কবি আলাওল। তবে দৌলত কাজি 'সতীময়না'র যেটুকু অংশ লিখেছেন তার কাহিনি খুব সংযত, সংহত ও পরিচয় এবং তার ভাষা ও ছন্দ বেশ মার্জিত। তাঁর ভাষা অলংকার ও কৃত্রিমতা বর্জিত। মিঞা সাধনের কাবাকে অবলম্বন করলেও দৌলতে এমন বহু অংশ আছে যা মিঞা সাধনের কাব্যে নেই।

কতেয়াবাদের শাসক মজলিস কুতুবের মন্ত্রীর পুত্র সৈয়দ আলাওল আরাকান রাজসভার বিশিষ্ট কবি। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন অ-সামান্য কবিত্বশক্তির অধিকারী ও সংগীত বিশারদ তাঁর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আরাকানের প্রধানমন্ত্রী মাগনঠাকুর, অর্থমন্ত্রী সুলেমান এবং শ্রীহট্টের সৈয়দ মুসা। আলাওলের সব কাবাই আরবি, ফারসি ও হিন্দি কাব্যের অনুবাদ বা ভাবানুবাদ। লোরচন্দ্রাণী' বা সতীময়না সমেত।

তাঁর কাব্যের সংখ্যা - (১) 'পদ্মাবতী (আনুমানিক ১৬৪৬), (২) লোরচন্দ্রাণীর উত্তরাংশ (১৬৫৯), (৩) সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল (১৬৫৮-৭৫), (৪) হল পয়কর' (১৬৬০৬৯), (৫) 'তোহফা' (১৬৬০৬৯), (৬) সেকেন্দরনামা' (১৬৭২)। মধ্যযুগের কোনো কবিই এতগুলি কাব্য অনুবাদ করেননি, আলাওলের অনুবাদ স্বচ্ছন্দ এবং কোনো কোনো স্থালে কবির মৌলিক রচনাশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।

মাগনঠাকুরের আদেশে অবধি বা পূর্বী হিন্দিতে লেখা মালিক মহম্মদ জায়সীর 'পদুমাবৎ' নামের আধ্যাত্মিক রূপক কাব্যের অনুবাদ করেন আলাওল 'পদ্মাবতী' নামে। স্বয়ং সুফি মতাবলম্বী ছিলেন কবি। মন প্রেমভাবে সংসার সৃজিল করতার' তবে 'সয়ফুলমুলুক বদিউজমাল' আরব্য উপন্যাসের একটি কাহিনি অবলম্বনে।

রচিত। ফারসি ভাষায় লেখা এই মুসলিম নীতিশাস্ত্রের অনুবাদ মুসলিম সমাজে জনপ্রিয় ছিল। 'সন্তু" বা (হস্ত) পয়কর নিজামির ফারসি কাব্য হপ্তপয়করের স্বাধীন অনুবাদ।

"সেকেন্দরনামা" আলাওলের শেষ রচনা, এই কাব্যটি নিজামির ফারসি কাব্য 'সেকন্দ্ররনামা'-র অনুবাদ।

আলাওল কেবল অদ্বিতীয় স্রষ্টা নন, নতুন দিনের বার্তাবহ। তাঁর বিশেষত্ব— (১) মানবীয় প্রেমের সঙ্গে আধ্যাত্মিক প্রেমসাধনার মিলন তাঁর কাব্যকে করেছে বিশিষ্ট।

(২) বাঙালি সাহিত্য ভাষা ব্রজবুলির সঙ্গে ফারসি আরবি কথাবন্তু, ইতিহাস চেতনা এবং ধর্মনীতিকে সাহিত্যের বিষয় করে তিনি সাহিত্যের পরিধিকে বিস্তৃত করেছেন। তিনি বাংলা সাহিত্যকে করেছেন অ-সাম্প্রদায়িক। (৩) বাংলা সাহিত্যে তিনি গঠনসৌকর্য, প্রাপ্তলতা ও প্রসাদগুণ এনে দিয়েছেন। পাণ্ডিত্য ও সংকীর্ণতামুক্ত আধ্যাত্মিকতার প্রকাশে আলাওল বাংলা সাহিত্যকে করেছেন নাগরিক এবং জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকল বাঙালির সাহিত্য।

অষ্টাদশ শতকের বাংলায় দীর্ঘকাল চলেছিল অরাজকতা। ঔরকাজেবের মৃত্যুর পরবর্তীতে শাসক শক্তির। ক্ষমতাহীনতার ফলে প্রাদেশিক শাসকশক্তি হয়ে উঠেছিলেন শক্তিশালী। এই সময়ে জাতিভেদ, কৌলীন্যপ্রথা, বহুবিবাহ ইত্যাদি কু-প্রথার আধিক্য বাংলার সমাজজীবনকে নিয়ে চলেছিল অবক্ষয়ের পথে। বর্গি আক্রমণ বাংলার, অর্থনীতিকে ধ্বংস করে ফেলেছিল। সিরাজের আমলে কলকাতায় ইংরেজ শক্তি প্রবল হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে বাংলার শাসনভার যায় বিদেশি ইংরেজের হাতে। ফলে সমৃদ্ধ বাংলার অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

সাহিত্যচর্চা ক্রমে হয়ে উঠেছিল ধনীর উপভোগের বস্তু, ফলে রুচিহীনতা হয়েছিল প্রবল। আন্তরিকতার পরিবর্তে ভাষাক্রীড়া, অনুভবের গাঢ় প্রকাশের বদলে বর্ণনার চাকচিক্যের দিকে কবিদের নজর ছিল বেশি। উদাহরণস্বরূপ আমরা ভারতচন্দ্রের 'অন্নদামঙ্গাল' কাব্যের কথা মনে করতে পারি যার একাংশ বিদ্যাসুন্দর। এ অংশে শৃঙ্গার-বিলাসের আধিক্য

যেমন আছে তেমনই আছে দেবী কালিকার মহিমা বর্ণনা। অষ্টাদশ শতকের বাংলা সাহিত্যে দেবতার পরিবর্তে মানুষই অধিক গুরুত্ব লাভ করেছিল। 'অন্নদামঙ্গাল'-এর নিতান্ত সাধারণ দরিদ্র মানুষ।

সার্বিক অবক্ষয়ের মধ্য থেকেও জাগরণের বার্তাই অষ্টাদশ শতকে রচিত বাংলা সাহিত্যের যথার্থ বিশেষত্ব।

আঠারো শতকের বাংলায় বর্গির আক্রমণ, কেন্দ্রীয় শাসকশক্তির দুর্বলতা – এইসব নানা কারণে প্রকট।

হয়েছিল অন্নাভাব। সমকালের এই প্রেক্ষিত ভারতচন্দ্রের অন্নদাত্রী দেবী অন্নদার কল্পনার উৎস: হরিহোডের কাহিনি, ঈশ্বরী পাটনী দেবীর কাছে বর প্রার্থনা 'আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে' সমকালের প্রভাবেই রচিত হয়েছে। বিদ্যাসুন্দর কাহিনিতে আদিরসের প্রাধান্য সমকালের অভিজাত জীবনবিলাস পঙ্কিল জীবনযাত্রার পরিচায়ক। দেবী অন্নদার পূজক প্রতিষ্ঠাকামী মানসিংহ ভবানন্দ ক্ষুৎপীড়িত দেবতা শিব, ঋষি ব্যাস, হরিহোড় ও ঈশ্বরী পাটনী

সমকালীন আত্মশক্তিতে অবিশ্বাসী বাঙালির প্রতিরূপ। ভারতচন্দ্রের কাব্যের মণ্ডনকলা, বুদ্ধিনির্ভর প্রকাশভঙ্গি, মাঝে মাঝে আত্মভাব প্রধান গীতিকবিতার যোজনা, অষ্টাদশ শতকের দৈব বিশ্বাসহীন আত্মগত ভাবপ্রধান যুগমানসের ফসল। ভারতচন্দ্র ধর্মীয় প্রভাবের বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারলেও মানুষের করা সহৃদয়তার সঙ্গে অঙ্কন করেছেন।

অন্নদামঙ্গল কাব্য তিনটি খন্ডে বিভক্ত- (ক) অন্নদামঙ্গল' যা পৌরাণিক আখ্যান সম্বন্ধীয়, (খ) অন্নপূর্ণামাল' বা 'মানসিংহ'। এই পদে ইতিহাসের কিছু স্বাদ পাওয়া যায়, (গ) কালিকামঙ্গল' বা 'বিদ্যাসুন্দর'।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলার যুগসংকট সৃষ্টি হয়েছিল—তখনকার সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে যা মূল সুর তা হল দুঃখ ও হতাশা। এই যুগসংকটের প্রেক্ষিতে ভক্তকবি রামপ্রসাদ। সেন শাক্তপদাবলি রচনা করেন। রামপ্রসাদের শারুপদাবলি শুধু মাতৃসংগীত নয়, প্রসাদী গান বাঙালির পরম আশ্রয়।

তাঁর বহু গান বঙ্গসংস্কৃতির বিশেষ সম্পদ। কতগুলি তো প্রবাদবাক্যের মতো :

মন রে কৃষিকাজ জান না।

এমন মানবজমিন রইল পতিত

আবাদ করলে ফল সোনা।

বলার মানুষ তো নেই-ই, তাই মনকে সম্বোধন করেই যত আক্ষেপ, আকুতি। দারিদ্র্য ৰূপতঙ্গলে দেখা দিয়েছে। সেখানেও মন উপমেয়' :

মন- গরিবের কী দোষ আছে।

তুমি বাজিকরের মেয়ে শ্যামা যেমনি নাচাও তেমনি নাচে ৷৷

সংসার-জ্বালায় যে কবি জর্জরিত তা বোঝা যায় এই গানে :

আমি কি দুখেরে ডরাই।

ভাবে দাও মা দুঃখ আর কত চাই।।

আগে পাছে দুখ চলে মা যদি কোনখানেতে যাই

তখন দুখের বোঝা মাথায় নিয়ে দুখ দিয়ে মা বাজার মিলাই।

বাণীর সঙ্কো সুর যেন এইসব গানে অর্ধনারীশ্বর। আমরা শাক্তপদাবলি বলতেই বুঝি প্রসাদী সুর।

অষ্টাদশ শতকের সাধক কবি রামপ্রসাদ ছিলেন শাক্ত পদতরঙ্গিনীর গোমুখী আর তারই সরণি অনুসরণ করে জনগণমন হরণে সিদ্ধকাম শিল্পী বর্ধমানের কবি সাধক কমলাকান্ত। শ্যামামায়ের প্রতি আন্তরিক ভক্তি ও ঐকান্তিক আত্মনিবেদনের অকৃত্রিম উচ্ছ্বাসে তাঁর সংগীতাগুলি পরিপূর্ণ বলে তাঁর মাতৃগীতি শুধু মনোগ্রাহীই নয়, হিংস্র দস্যুদলেরও হৃদয় হরণে সক্ষম।

কমলাকান্ত ন্যূনাধিক তিনশত পদ রচনা করেছিলেন। এদের মধ্যে ঊমা সংগীত এবং শ্যামা সংগীত—উভয় জাতীয় পদই রয়েছে। তবে উমা সংগীত তথা আগমনী-বিজয়ার গানে কমলাকান্ত যে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা অতুলনীয় বিবেচিত হয়ে থাকে। উমার বাল্যলীলা, কন্যা উমার জন্যে না মেনকার অন্তর-বেদনা, কন্যাকে পিতৃগৃহে না আনার জন্যে স্বামী হিমালয়ের প্রতি অনুযোগ, অভিযোগ, উমার প্রতি আদর যত্ন এবং তার ফিরে যাবার ব্যাপারে মেনকার ঘোরতর আপত্তি প্রভৃতি বর্ণনায় কমলাকান্ত এমন গার্হস্থ্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন, যাকে বাঙালি জীবনের শাশ্বত রূপেই গ্রহণ করা চলে। তাঁর রচিত “ওরে নবমী নিশি, না হইওরে অবসান”, “কি হলো নবমী নিশি হইল অবসান গো” ফিরে চাও গো উমা তোমার বিধুমুখ হেরি” প্রভৃতি পক্তিগুলি যেন শতনরীর মণিরত্ন-স্বরূপ।

আবার শ্যামা সংগীত রচনাতেও কমলাকান্তের কৃতিত্ব অনুপেক্ষনীয়। আরাধ্যা দেবীর স্বরূপ এবং কবির নিজস্ব ধ্যান ধারণা-প্রকাশে তাঁর কয়েকটি পদ সত্যই অপুর্বতা লাভ করেছে। সদানন্দময়ী কালী', 'তাই শ্যামারূপ ভালবাসি', 'শুকনো তবু মঞ্জুরে না', 'মজিল মন ভুমরা' প্রভৃতি গানের ভাষা এবং বিন্যাস পদ্ধতি অতিশয় মার্জিত ও দৃঢ়বন্ধ। কল্পনা, ভক্তিভাব। প্রভৃতির সঙ্গে উৎকৃষ্ট রচনারীতির মিশ্রণে কমলাকান্তের পদগুলি রসোত্তীর্ণ হয়ে কালজয়ী হবার সুযোগ পেয়েছে।