অধ্যায়-21.A, লৌকিক সাহিত্য : ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ, কথা

ছড়া সাধারণত দুই, চার, হয় ও আটটি চরণ নিয়ে গঠিত হয়।

হুড়া মূলত শ্বাসাঘাত বা স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত হয় ।

ছড়ার লয় হয় দ্রুত।

ছড়া যে ছন্দে রচিত হয় তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল প্রতি চরণে চার পর্ব এবং প্রতি পর্বের প্রথম অক্ষরে থাকে জোরালো শ্বাসাঘাত ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রথম বাংলায় ছড়া নিয়ে বড়ো আকারের প্রবন্ধ লেখেন।

রবীন্দ্রনাথ রচিত ছড়া সংক্রান্ত প্রশ্নটির নাম 'ছেলে ভুলানো ছড়া'।

যোগীন্দ্রনাথ সরকারের উল্লেখযোগ্য হুড়া প্রশ্নটির নাম 'খুকুমণির ছড়া'।

‘খুকুমণির ছড়া' প্রশ্নটিতে দুই শতাধিক প্রচলিত ছড়া স্থান পেয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই ছড়ার নানা বৈশিষ্ট্যের প্রতি শিক্ষিত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করান।

সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরী ছড়া লিখে জনপ্রিয় হয়েছেন। 1

লোকসাহিত্যের কলেবর বৃদ্ধিতে ছড়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

উৎসের দিক থেকে ছড়াকে চারটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

উৎসগতভাবে চার প্রকার ছড়া হল- আচারমূলক, উপদেশমূলক, বিনোদনমূলক এবং শিশুতোষণমূলক।

রবীন্দ্রনাথ ছড়ার বিশিষ্টতা প্রসঙ্গে 'কামচারিতা ও কামরূপধারিতা' শব্দ দুটির প্রয়োগ করেন।

'কাম' শব্দের রবীন্দ্র অভিপ্রেত অর্থ হল ইচ্ছার লগতে বিচরণ করা।

কানচারিতা বা কামরূপধারিতা হল ইচ্ছানুযায়ী অন্যের রূপ ধারণ করে কামাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করা।

প্রশ্নোদৃত ছড়াটির রূপান্তর পূর্ববাংলার গ্রামান্তলে দেখা গেল নার্গিসের বিয়া দিমু উজানতালির দেশে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন মানুষের অবদমিত ইচ্ছা কীভাবে ছড়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়।

সামগ্রিকভাবে হড়াকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

সামগ্রিক দৃষ্টিভলিজনিত ছারা তিনটি ভাগ হল- আনুষ্ঠানিক ছড়া, শিক্ষামূলক বা উপদেশাত্মক ছড়া এবং শিশুদের জন্য ছড়া।

অনুষ্ঠানের হড়াকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

শিক্ষা বা উপদেশাত্মক ছড়া তিন প্রকারের হতে পারে।

তিন প্রকারের শিক্ষা বা উপদেশাত্মক ছড়া হল ডাকের বচন, খনার বচন এবং নানা সামাজিক ও

পারিবারিক বিষয়ে সমালোচনামূলক ছড়া।

শিশুদের জন্য রচিত ছড়াগুলিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়।

শিশুদের জন্য রচিত তিন প্রকার ছড়া হল— ঘুম পাড়ানো ছড়া, কান্না নিবারক ছড়া এবং খেলার ছড়া।

খেলার ছড়াকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

দু-প্রকার খেলার ছড়া হল ঘরে বসে খেলার হুড়া এবং বাইরে ছুটোছুটি করে খেলার ছড়া।

“তোষলা তোমার কাছে মাগি বর স্বামী পুত্র নিয়ে যেন সুখে করি ঘর।”

"পুণ্যি পুকুর পুষ্পমালা।

কে মোজেরে দুপুরবেলা ।"

"নদী নদী কোথায় যাও বাপ ভাইয়ের বার্তা দাও ।"

"গা পুণ্যি সেঁজুতি যোলো ঘরে ষোলো ব্ৰতী ।"

“স্বামীর সেবা, সাঁঝে বাতি ডাকে বলে লক্ষ্মীর স্থিতি।"

“খনা বলে ডেকে আন

রোদে ধান, ছায়ায় পান।"

“খোকা ঘুমোলো পাড়া জুড়োলো বর্গি এলো দেশে।

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে।"

“ইকড়ি মিকড়ি চাম চিক্‌ড়ি।”

সাধনা পত্রিকাতে রবীন্দ্রনাথের 'ছেলে ভুলানো ছড়া' প্রকাশিত হয়।

১৩০১ বঙ্গাব্দে 'মেয়েলি ছড়া' নামে 'ছেলে ভুলানো ছড়া' প্রকাশিত হয়।

যে বাক্যের সাহায্যে একটিমাত্র ভাব প্রকাশ করা হয় রূপকের সাহায্যে জিজ্ঞাসার আকারে। তাকে ধাঁধা বলে।

সাহিত্যিক ধাঁধার সৃষ্টি হয়েছে কোনো মৌলিক লোকমুখের শ্রুতিমূলক ধাধাকে ভিত্তি করে ।

মনীষী রোলান্ড লৌকিক ও সাহিত্যিক—এই দুই ভাগে ধাঁধাকে ভাগ করেছেন।

হার্ডার টেলর বিষয়বস্তুর সাদৃশ্য অনুসারে ধাঁধাকে ভাগ করেছেন।

ড. অনুতোষ ভট্টাচার্য ধাধাকে লৌকিক ও সাহিত্যিক দু ভাগে ভাগ করেও সেগুলিকে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকৃতি অনুযায়ী গ্রহ-নক্ষত্র, নরনারী প্রভৃতি বিষয়ে ভাগ করেছেন।

লৌকিক ধাঁধাকে বিষয়বস্তু অনুসারে আটটি ভাগ ভাগ করা যেতে পারে।

আশরাফ সিদ্দিকি উপমিত বস্তুর রূপবিচার করে ধাঁধাকে ভাগ করেছেন।

Durga Bhagwat মন্তব্য করেছেন— "The riddle incorporates a question primarily and an answer secondarily."

মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম মহকুমার অন্তর্গত বাঁশপাহাড়ি অঞ্চলে ধাঁধাকে বলা হয় 'ফোর'।

বাংলাদেশের বরিশালে ধাঁধারে ভাঙানি বলা হয়।

প্রকৃতির দান মাটির উর্বরতা বিষয়ক একটি ধাঁধা হল—

আশ্চর্য এ জিনিস ভাই, নিত্য গর্ভবর্তী।

পতি ছাড়া হাজার ছেলে নিত্য গর্ভবর্তী।

ধারার উৎপত্তি বিষয়ে ফ্রেজার সাহেবের অভিমতটি হল- “ধাধা সম্ভবত বছরের কোনো এক সময় আদিম মানুষের অপ্রত্যক্ষ শব্দ হিসেবে প্রচলিত হয়।

উৎপত্তি বিষয়ে এম এমডি বলেছেন- “শিশুর মতো সহজ-সরল আদিম সমাজে ধাঁধার জন্ম হয়েছে। এবং সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ধাধাগুলি জটিল ও পরিবর্তিত হয়েছে।"

গ্রিক সাহিত্যে ইডিপাসের উপাখ্যানে ধাঁধার উপস্থিতির কথা ড. শহীদুল্লাহ বলেছেন।

ধাঁধার  উদ্ভব সম্পর্কে তিতাশ চৌধুরী বলেছেন- "ৰাধ অনেক আচার-অনুষ্ঠান 'ও লোকগাথা থেকেই এর উদ্ভব।"

গ্রিক সাহিত্যে ইডিপাসের উপাখ্যানে ধাঁধার উপস্থিতির কথা ড. শহীদুল্লাহ বলেছেন।

যে ধাধানর ভাষার কারিকুরির মধ্যেই উত্তরটি লুকিয়ে থাকে এবং এক বা একাধিক সেই উত্তরটি খুঁজে নিতে হয় তাকে শাব্দিক ধাঁধা হলে।

ইড়িং বিড়িং তিড়িং ভাই /চোখ দুটো তার মাথা নাই।

ধাঁধার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হল কবিতার মতো নিল রক্ষা করা।

ধাঁধার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল তথ্যানুসন্ধিৎসা।

নানা ধরনের ধাঁধার উল্লেখ পাওয়া যায় বাঙালির বিভিন্ন পারিবারিক জীবন এবং আত্মীয় সম্পর্কিত প্রকারের বিষাকে অবলম্বন করে।

ওয়াকিল আহমেদ তাঁর বাংলা লোকসাহিত্য ধাঁধা। এদের ধাঁধার ১৬টি সূত্র শুনান্ত করেছেন।

"শিবায়ন' কাব্যের 'ফুলশয্যায় গৌরী' অংশের উল্লেখ আছে।

ঋষিপত্নীরা মহাদেবকে আটটি ধাঁধা জিজ্ঞাসা করেছিলেন।

আর্চার টেলর তাঁর English Riddles from Oral Tradition টিতে সাদৃশ্য অনুসারে ভাগ করেছেন।

রাজশাহী ও পাবনা জেলায় বাঁধাকে 'মান' নামে অভিহিত করা হয়।

ধাঁধাকে মুরশিদাবাদ জেলায় 'হেঁয়ালি' নামে অভিহিত করা হয়।।।

চির মধুর ও রসিকতার জামাই-শ্বশুরের সম্পর্ক নিয়ে রচিত একটি ধাঁধা হল

মানো নিয়ে বসে দুই দুই পুরুষ আসে।

মেয়ে বলছে বাবা আসছে মা বলছে বাবা আসছে !!

হেসে হেসে আসছো তুমি ঠাট্টা করতে মোকে আমার শ্বশুর বিয়ে করেছে তোমার স্বশুরের মাকে।

জাতির সুদীর্ঘ ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ততম সংহত ও সুন্দর ভাষাগত রূপের বহিঃপ্রকাশকে প্রবাদ বলে  ।

প্রবান মানুষের পরিবেশ ও জীবন পর্যবেক্ষণের এবং প্রকাশের এক সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থপূর্ণ অভিবান্ধি।

প্রবাদ শব্দটির উৎপত্তি প্রবদ+অ (যজ্ঞ) থেকে।

প্রবাদ শব্দটির অর্থ লোকবিশ্বাস।

লেখক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিলীয় শব্দকোষ গ্রন্থে প্রবাদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

লেখক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' সঙ্গে প্রবাদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন— কথোপকথন, সম্ভাষণ, পরস্পরাভিঘাত অন্যান্য স্পধী, লোকপ্রবাদ, লোকনিন্দা, পরম্পরাগত বাক্য, প্রসি "পরস্পর লোকবাদ, কিংবদন্তি, জনশ্রুতি ইত্যাদি অর্থে প্রবাদ শব্দটি প্রযুক্ত হয়।"

বর্তমানে প্রবাদের মাধ্যমে উক্তি, ব্যাখ্যান, বাগ্মিতা, ভাষণ গৌরব, চলতি কথা, জনশ্রুতি, কিংবদন্তি ইত্যাদি

প্রকাশিত হয়।

সংস্কৃত ভাষায় প্রবাদকে বলা হয়েছে "সুভাষিতম্'।

পালিভাষায় প্রবাদকে বলা হয় সুভাষিতা

ইংরেজিতে প্রবাদকে বলা হয় Proverb

ঋগবেদে প্রথম প্রবাদের ব্যবহার পাওয়া যায়।

চির মধুর ও রসিকতার জামাই-শ্বশুরের সম্পর্ক নিয়ে রচিত একটি ধাঁধা হল

মানো নিয়ে বসে দুই দুই পুরুষ আসে।

মেয়ে বলছে বাবা আসছে মা বলছে বাবা আসছে !!

হেসে হেসে আসছো তুমি ঠাট্টা করতে মোকে আমার শ্বশুর বিয়ে করেছে তোমার স্বশুরের মাকে।

প্রবাদকে বলা হয় মূলত মৌখিক বাকশিল্প ।

প্রবাদের ভাষায় নানাভাবে বুদ্ধিদীপ্ততার প্রকাশ দেখা যায়।

ভারতচন্দ্রের 'অন্নদামঙ্গল-এ' প্রবাদের প্রয়োগ আছে নানা জায়গায় ।

"বছর পীরিতি বালির বাঁধ/ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেকে চাঁদ।”

প্রবাদকে লোকসাহিত্যের মণিরত্নতুলা হিসেবে ধরা হয়।

একটি স্মরণযোগ্যতা সূচক প্রবাদের উদাহরণ হল- "জানি তোমার গিন্নীপনা/মুন থাকে তো তেল থাকে না ।

প্রবাদের অপর ছয়টি লক্ষণ হল সংক্ষিপ্ততা, সরলতা, আলংকারিকতা, সত্যতা, প্রাচীনতা এবং সাধারণভাবে প্রয়োগ যোগ্যতা।

প্রবাদ সাধারণত দুই প্রকারের সাহিত্যিক প্রবাদ ও লৌকিক প্রধান।

'শ্রীকৃষ্মকীর্তন' কাব্যের মধ্যে বাঙালির খাদ্যরসের পরিচয় প্রকাশক প্রবাদটি হল— "শুক্তার পাতা কাসুন্দির কোলে, তেলের ওপর দিয়া তোলে

কৃষি বিষয়ক একটি প্রবাদ হল— “খনা বলে চাষার পো / শরতের শেষে সরিষা রো

প্রাচীন মিশরীয় যুগ থেকে প্রবাদ মানুষকে লোকশিক্ষা দিয়ে আসছে।

মুখে মুখে প্রচলিত আছে যে গল্প তাকেই সাধারণভাবে বলা হয় কথা।

বাংলা লোককথাকে সাধারণ চারটি ভাগে ভাগ করা হয়।

বাংলা লোককথার চারটি ভাগ হল-উপকথা, রূপকথা, পশুকথা এবং ব্রতকথা।

চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্য নিয়েই উপকথার সৃষ্টি হয়েছে।

বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কহীন যে গল্প গড়ে উঠেছে অপ্রাকৃত ও প্রাকৃত প্রাণী এবং মানুষের ও ভালৌকিক এবং অতিলৌকিক চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াজাত ঘটনার বিবরণ থেকে তাকে বলা হয় রূপকথা।

মনের গভীরে যেসব অপূর্ণ ইচ্ছা সুপ্ত থাকে রূপকথার গল্পে সেইসব ইচ্ছাপূরণেরও বিবরণ থাকে।

রূপকথার গল্পে যাদের দেখতে পাওয়া যায় তাদের চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা চলে।

রূপকার গল্পে যাদের দেখতে পাওয়া যায় তাদের চারটি শ্রেণি হল- (১) মানুষ (২) অপ্রাকৃত প্রানি (৩) পশু (৪) নৈসর্গিক বস্তু।

রূপকথার গল্পে দেখতে পাওয়া মানুষগুলিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেখাতে পারি।

কেবল পশু নিয়ে যে, কাল্পনিক গল্প রচিত হয়, তাকে পশুকথা বলা হয়।।

পকথাকে তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

লিখিত সাহিত্যের পশুকথা গল্পের শেষে থাকে কোনো নীতিকথা।

লোকসাহিত্যের পশুকথা কেবল চিত্তবিনোদনের জন্যই রচিত হয়।

লোকসাহিত্যের পশুকথা গল্পে পশু, মানুষ অতিলৌকিক প্রাণী মেশামেশি করে থাকে।

বাংলা ভাষায় পশুকথার সেরা সংগ্রহ গ্রন্থটির নাম হল—'টুনটুনির বই'।

পুনটুনির বই' প্রশ্নটির সংকলককার হলেন- উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি।

বাংলা ভাষার পশুকথায় বাঘই প্রধান প্রাণী।

বাংলা ভাষার পশুকথার গল্পে ধূর্ত প্রাণীটি হল শিয়াল।

বাংলা ভাষার পশুকথার গল্পে নির্বোধ প্রাণী হচ্ছে— ষাঁড়, বলদ এবং গাধা।

বাংলা ভাষার পশুকথা গল্পে বুদ্ধিমান প্রাণীটি হল বাঁদর।

ব্রতকথার সঙ্গে বিশ্বাস এবং সংস্কারের যোগ খুবই গভীর।

বাংলা ব্রতকথার গল্প শুনলে পুণ্য হয়।

ব্রতকথা হচ্ছে দেব বা দেবীর মাহাত্ম্য বিষয়ক গল্প।

ব্রতকথা থেকে অন্তিমে এক বা একাধিক মিথ গড়ে ওঠে।

মানুষের কীর্তিকাহিনি যতক্ষণ সম্ভবের সীমার মধ্যে থাকে, ততক্ষণ এগুলিকে বলা যায় Heror।

বা বীরকাহিনি বা বীরগাথা।

folk ballads বা লোকগাথা নিয়ে যাঁরা গান করতেন তাঁদের বলা হত Bard বা চারণকবি বলা হত,

চারণকবিদের রচিত গেয় আখ্যানকাব্যকে ইংরেজিতে বলা হয় Bardic Poetry |

Bardic Poetry-কে 'বিলীন' বলা হয় রুশ দেশে।

উত্তp Bardic Poetry-কে 'নীলুংগেন' বলা হয় জার্মানিতে।

উপকথা' শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল উপাখ্যান, গল্প ইত্যাদি।

সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুষ ছিল হিংস্র প্রাণী আর দুরস্ত ‘প্রকৃতির' শিকার।

রূপকথার দুটি দিক রয়েছে।

রূপকথার দুটি দিক হল (১) মানবিক (২) অতিমানবিক।

উপকথার ইংরেজি প্রতিশব্দটি হল Fable বা 'Animal Tale' | মহাকাব্য, আখ্যানকারা ও গীতিকবিতার ধারা

প্রধানত দুটি ভাগে মহাকাবকে ভাগ করা যায়। (১) স্বতঃস্ফূর্ত মহাকাব্য বা প্রাচীন মহাকাবা বা

Authentic Epic or Epic of Growth) (2) সাহিত্যিক মহাকাব্য বা Literary Epic

মধুসুদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য'।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিহারীলাল চক্রবর্তীকে 'ভোরের পাখি'

সংগীতশতক, বলাসুন্দরী, নিসর্গদর্শন, বস্তুবিয়োগ, প্রেমপ্রবাহিনী, সারদামঙ্গল, সাধের আসন, বাউল

বিংশতি।।

সংগীতশতক, ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে রচিত।

কাদম্বরী দেবীকে স্মরণ করে এই কাব্যটি রচিত ,

নিসঃর্গসদর্শন (১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে)।

বিহারীলালের একজন বিশেষ অনুগামী কবি ছিলেন কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন।

অক্ষয়কুমার বড়ালের সর্বশ্রেষ্ঠ কারা এখা' ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে লিখিত হয়েছিল। পত্নীর মৃত্যুতে শোকাহত কবি 'এয়া' রচনা করেন।

দেবেন্দ্রনাথ সেনের লেখা কাব্যগুলি হল উর্মিলাকাব্য, অপূর্ব বীরাঙ্গনা, অপূর্ব ব্রজাঙ্গনা।।

দেবেন্দ্রনাথ সেন রচিত গীতিকবিতাগুলি হল নির্ঝরিণী, অশোকগুচ্ছ, গোলাপগুচ্ছ।

মুখেমুখে রচিত অন্ত্যমিলযুক্ত ছোটো আকারের পদ্যকে সাধারণত বলা হয় ছড়া। এগুলি মূলত দুই, চার হও আট চরণে নির্মিত। বাংলা লোকসাহিত্যের এক বিশিষ্ট সম্পদ হল ছড়া। এটি বাংলাদেশের লোকসাধারণের তথ্য নরনারীর সমস্ত বহু প্রকাশরীতির সর্বস্বীকৃত মাধ্যম। এই ছড়ার বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।।

(১) হুড়া মূলত মুখেমুখে রচিত একধরনের আমা কবিতা।

(২) হুড়ার অর্থগত সংগতি নেই, ছড়া অসংলগ্ন, ছড়া হেঁয়ালিতে ভরা।

(৩) ছড়ার চাল অত্যন্ত দ্রুত।

(৪) ছড়া যেন এক-একটি পর্বে সম্পূর্ণ আবার এক-একটি পর্বে খন্ডচিত্রও থাকে।।

(৫) হুড়ার মধ্যে কোনো গুলাষ্ঠীর ব্যাপার থাকে না।

(৬) হুড়ার ভাষাতে অনেকখানি দৃশ্যের সারবত্তা প্রতিফলিত হয়।

(৭) হুড়ার ভাব-ভাবনা পাঠক নির্ভর। অর্থাৎ হুড়ার মধ্যে এমন ভাব-ভাবনা থাকে, যিনি পড়ছেন তাঁর মতো ভান তিনি ছড়ার মধ্যে পেয়ে যান।

(৮) হুড়ার মধ্যে জীবনের সহজতা ও সরলতা ধরা দেয়।

(৯) ছড়ার বাচ্চাগুলি কাটাকাটা সংযোগ শূন্য ও ক্ষুদ্র অবসর সমন্বিত।

(১০) ছড়ার পংক্তিগুলি পারম্পর্যহীন নয়, মিলের একটা কখন অন্তত আছে।

(১১) ছড়ার ভাষা সমতার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে যায়।

(১২) বাংলা ভাষার মূল ধাঁচ হুড়ার মধ্যে কিছুটা হলেও অবিকৃত (১৩) ছড়ার মধ্যে একটা নিরুদ্দিষ্ট ভাবনা আছে।

(১৪) প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো একটি নিটোলভাব ছড়ার মধ্যে খোঁজা অর্থহীন।

(১৫) হুড়ার মধ্যে একটি সহজ-স্বাভাবিক কাব্যরস আছে। তাই হুড়া লাবণ্যময়।

(১৬) বাংলা ছড়ায় ছন্দ মুখ্য বিষয়।

বাংলা লোকসাহিত্যে ধাঁধা একটি অতি পরিচিত নাম। অতি প্রাচীনকাল থেকেই ধাধা চলে আসছে লোকসাহিত্যে। যদিও ধার করা সম্ভব হয়নি তবুও ধাঁধা মে লোকসাহিত্যের একটি প্রাচীনতম শাখা। সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ধাঁধার উৎপত্তি সম্বলের নৃতত্ববিদ ফেজার সাহেব বলেছেন- “ধাধা সম্ভবত বছরের কোনো এক সময় আদিম মানুষের অপ্রত্যক্ষ শব্দ হিসেবে প্রচলিত হয়। এছাড়া পণ্ডিত এম. ব্লুমেিণ্ডর মতে, “শিশুর মতো সহজ-সরল আদিম সমাজে ধাঁধার জন্ম হয়েছে এবং সভ্যতার অগ্রগতির মতো সঙ্গে ধাধাগুলি জটিল ও পরিবর্তিত হয়েছে।" পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন ধাঁধার নিদর্শন মিলেছে প্রাচীন ব্যাবিলনের বিদ্যালয় পাঠ্যপুস্তকগুলিতে। প্রাচীন হেলেনিক, সেমেটিকও বৈদিক সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে প্রাচীন ধাধাগুলি। প্রাচীন গ্রিসে ও ইউরোপের অন্যান্য সোলেমান ও হিরাউস, সোলেমান ও সেবার রানি, আলেকজান্ডার ও হিন্দু বিশ্বজনমণ্ডলী, হোমার ও থিওগনিসের মধ্যে অতি প্রাচীনকালে ধাঁধার যুদ্ধ হলে পরাজিত পক্ষকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। তাই দেখা যায় প্রাচীন সাহিত্য ও সমাজের সর্বক্ষেত্রেই ধাঁধার রাজত্ব ছিল।

ধাঁধার প্রাচীনতা সম্পর্কে এনডিউ ল্যাং মন্তব্য করেছেন— They were very ancient and had been handed down, with a gradual refining from ages of savagery to ages of civilization." এনডিউ ল্যাং-এর মতবাদের সঙ্গে ব্লুমফিল্ড-এর মতের মিল রয়েছে।

ড. শহীদুল্লাহ-র মতে, “ধাঁধা বা হেঁয়ালি প্রাচীন জগতের সৃষ্টি।" তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন যে গ্রিক সাহিত্যে ইডিপাসের উপাখ্যানে ও ঋগবেদে ধাধার কথা আছে। অন্যদিকে ড. আশরাফ সিদ্দিকী ধাঁধার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, “কোনো কোনো লোক বিজ্ঞানী ছড়াকে লোক সাহিত্যের আদিমতম সৃষ্টি বলতে চান। কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে হুড়া অপেক্ষা ধাধা বা হেঁয়ালিকেই প্রাচীন বলতে হয়। ধাঁধার সঙ্গে আদিম মানুষের বহু বিশ্বাসের 'সর্বপ্রাণবাদ' 'পূর্বপুরুষের পূজা' কোনো দৈবদুর্বিপাক থেকে মুক্তির প্রক্রিয়া ইত্যাদি দর্শন পাওয়া যায় । ধাঁধার উদ্ভব সম্পর্কে তিতাশ চৌধুরী বলেছেন, "ধাধা অনেক আচার-অনুষ্ঠান, বহু পুরাকাহিনি, রূপকথা ও লোকগাথা থেকেই এর উদ্ভব।"

লিখিত সাহিত্যের জন্মের বহু আগেই লোকসাহিত্য নিবৃত্ত করে এসেছে জনমনের শিল্পরস পিপাসা। যে সমস্ত আদিম উপজাতির মধ্যে অদ্যাবধিও সাহিত্য রচিত হয়নি, তাদের মধ্যেও লোকসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত বাঁধার নিদর্শন পাওয়া যায়। ধাধার প্রচলন দেখতে পাওয়া যায় ভারতীয় পুরাণে, রামায়ণে এবং মহাভারতে। ধাঁধার নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায় আরবা উপন্যাস, পারস্য সাহিত্য, কবি ফেরদৌসীর শাহনামা' গ্রন্থে, বৌদ্ধজাতক, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ, বেতাল পঞ্চবিংশতি এবং বাংলা ভাষার প্রাচীনতম গ্রন্থ চর্যাপদ প্রভৃতি গ্রন্থে।

সুতরাং লোকসাহিত্যের একটি প্রাচীনতম অংশ এবং রূপকথা ও পুরাকাহিনির মত বহুযুগ আগেই যে ধাধার উত্তর হয়েছিল তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পৃথিবীর বহুদেশেই প্রাচীন সাহিত্য থেকে শুরু করে বর্তমান শতাব্দী পর্যন্ত।

ধাঁধার প্রচলন দেখা যায়। তাই অধ্যাপক আর্চার টেলরের সঙ্গে ধাধা প্রসঙ্গে এবং ধাঁধার প্রাচীনত্বকে স্বীকার করে নিয়ো একমত হয়ে বলা যায় "Riddling is an universal art.

লোকসাহিত্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল ধাঁধা। লোকশ্রুতিবিদ, Durga Bhagwat ধাঁধা প্রসঙ্গো বলেছেন- "The riddle incorporates a question primarily and answer secondarily" ধাঁধার প্রকৃত পরিচয় ফুটে উঠেছে এই বক্তব্যের মধ্যে। মূলত যে বাক্যের সাহায্যে একটিমাত্র ভাব প্রকাশ করা হয় রূপকের সাহায্যে জিজ্ঞাসার আকারে, তাকে বলা হয় ধাঁধা।

বাংলা লোকসাহিত্যে ধাঁধা একটি অতি পরিচিত নাম। ধাধার বিষয়বস্তু নির্ভর করে প্রত্যেক মানবগোষ্ঠীর নিজস্ব জীবনযাপনের বৈশিষ্ট্যের ওপর এবং ধাধার বিষয়বস্তুও পরিবর্তিত হয় সমাজজীবনের ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে। ধাঁধার বিষয়বস্তু নির্বাচনে প্রধানত নির্ভর করে জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক জীবনাচরণগত বৈশিষ্ট্য। সেইজন্য বিভিন্ন জাতির ধাঁধা বিভিন্ন প্রকৃতির হয়। অনেক সময় ধাঁধার বিষয়বস্তু হয় আমাদের নিত্যব্যবহার্য ও নিতান্ত পরিচিত বন্ধু, আমাদের বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বহু জিনিস এবং প্রকৃতির নিত্যপরিচিত নানা উপকরণ। শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ বস্তুই ধাঁধার বিষয়বস্তু নয়, ধাঁধায় স্থান পায় নৈর্ব্যক্তিক ভাবমূলক বস্তুও।

ধাঁধার মধ্যে অনেক সময় আবার শিল্প ও রসবোধের চেয়ে বড়ো হয়ে ওঠে হাসির প্রবণতা। জীবনের যে-কোনো বিষয়কে অবলম্বন করেই ধাঁধার মধ্যে হাস্যরস সৃষ্টি করতে দেখা যায়। ঘর-গৃহস্থালি, উনুন, শিলনোড়া, ছাতা-লাঠি, লতা-পাতা, ফল-ফুল, কীটপতা, পশুপাখি, মানবজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাদি ধাঁধার বিষয়বস্তু হতে পারে।

পণ্ডিত রোলান্ড ধাধাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন — (১) লৌকিক ধাঁধা এবং (২) সাহিত্যিক ধাঁধা। ড. আশুতোষ ভট চার্য ধাধাকে লৌকিক ও সাহিত্যিক দু-ভাগে ভাগ করেও সেগুলিকে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকৃতি অনুযায়ী, গ্রহ-নক্ষত্র, নরনারী, দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত তৈজসপত্র, প্রকৃতি, পশুপাখি, মানুষের আচার-ব্যবহার, অঙ্কের হিসাবমূলক বিষয়ে ভাগ করেছেন। এছাড়া দেখা যায় যে, বিশেষ প্রকৃতির ধাঁধার প্রচলন নির্ভর করে জীবন আচরণের বিশেষত্বের ওপরও। তাই লৌকিক ও সাহিত্যিক এই দুই প্রধান ভাগে ভাগ করা যায় ধাঁধাকে। সুতরাং মানবজীবনের প্রায় সমস্ত দিককেই অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে ধাধা ।

বাংলার প্রকৃতি এবং কৃষিজীবনকে অবলম্বন করে ধাঁধাকারগণ কত সহজ কৌতুকের সাহায্যে আমাদের উপহার দিয়েছেন একটার পর একটা ধাঁধা যা দেশ-কালের গন্ডি পেরিয়ে একটা স্বতন্ত্র আসন করে নিয়েছে নিখিল মানব হৃদয়ে। এই সমস্ত ধাঁধা তাই চিরস্থায়ী হয়ে রয়ে গেল এককাল থেকে আর এক কালে বাংলার জল-মাটি- আকাশের সকো।

কৃষক চাষ করে মাটিতেই। সব কিছুই জন্ম নেয় এই মাটির বুকে। পল্লিকবি চমৎকারভাবে ব্যক্ত করেছেন প্রকৃতির দান

মাটির উর্বরতার ক্ষমতার কথা—

"আশ্চর্য এ জিনিস ভাই, নিত্য গর্ভবর্তী।

পতি ছাড়া হাজার ছেলে, নিত্য গর্ভবর্তী।”

—চাষের কাজে কৃষক, লাঙল ও বলদ এদের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে। পল্লি কবি তাই বেশ কৌতুকের সঙ্গেই বলেছেন। যখন কৃষক লাঙল ও বলদ নিয়ে জমিতে চাষ করে তখন তাদের একত্রে দেখতে লাগে—

"উর্বর ঝুটি মোড়ে মাটি

ছয় চোখ তার তিন পাছাটি।"

কৃষককে জমিতে ধানের চারা রোপণ করবার সময় দৃষ্টি রাখতে হয় ভূমির আলের দিকেও। তাই জমির আলের কথাও বলা হয়েছে ধাঁধার মধ্যে সতি পূজা করে।"

বাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে অত্যাশিভাবে জড়িত অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আর তাই যেমন রৌদ্রের প্রয়োজন মাটিতে চাষের জন্য, ঠিক তেমনি প্রয়োজন বৃষ্টিপাতের। যেমন বাংলাদেশের বুকে নেমে আসে খরা অত্যধিক কোষ এবং অনাবৃষ্টির জন্য, তেমনি আবার অতিরিক্ত বৃদ্ধির জন্য নেমে আসে বন্যা। বহু ধাঁধার সৃষ্টি হয়েছে, এই সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নিয়ে। প্রখ্যাত গবেষক এবং অধ্যাপিকা ড বসাকের মন্তব্যটি এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণীয় "বাংলার কৃষিজীবনের দলের প্রকৃতির এবং যড়ঋতুর একটা আত্মীয়রধনের সম্পর্ক রয়েছে। তাই রৌদ্রো আকাশ, বর্ষাকালের নিবিড় কালো মেঘ, ঘন বর্ষণ, শিলাবৃষ্টি প্রভৃতি এবং বিভিন্ন ঋতুর উদার অনুষ্ঠিত আত্মপ্রকাশকে অবলম্বন করেও রচিত হয়েছিল বিভিন্ন ধাঁধা।""

যে বাক্যের সাহায্যে একটিমাত্র ভাব প্রকাশ করা হয় রূপকের সাহায্যে জিজ্ঞাসার আকারে, তাকে ধাধা বলে। এই ধাঁধার বিশেষ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়
প্রথমত, কতকগুলি দুর্বোধ্য বা অর্থহীন শব্দ কিংবা শব্দগুচ্ছের ব্যবহার করা হয় বহু ধাঁধার মধ্যেই। যেমন— "হিড়িং বিড়িং তিড়িৎ ভাই। চোখ দুটো তার মাথা নাই।” (কাঁকড়া)
দ্বিতীয়ত, সচেতন শিল্পমনের সৃষ্টি হল ধাধা। তাই তির্যক ও পরোক্ষ বাধার প্রকাশভঙ্গি এবং ধাধার বিষয়বস্তু একটি নিগূঢ় চিন্তা।
তৃতীয়ত, তথ্যানুসন্ধিৎসা হল ধাঁধার অপর একটি বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ ধাঁধা হল একটি জিজ্ঞাসা, সব সময়ে মীমাংসা কামনা
চতুর্থত, এমন কতকগুলি শব্দ কিংবা বিশিষ্টার্থক শব্দগুচ্ছের ব্যবহার করা হয় ধাঁধার মধ্যে যে ধাঁধাটি না ভাঙানো পর্যন্ত করে এই জিজ্ঞাসা। ধাঁধাটির অর্থ বোঝা যায় না। তবে ধাঁধাটির অর্থ সহজেই ধরা পড়ে ধাঁধাটি ভাঙানোর পরেই। যেমন
"পরিমাণ যত বাড়াবে, পরিমাণ তত বাড়বে,
পরিমাণ যত কমাবে, পরিমাণ তত কমবে।” (আহার)
এই ধাঁধাটি শোনামাত্র চিন্তা করতে হয় যে যার সঙ্গে পরিমাণ বাড়া ও কমা নির্ভর করে সেটি কী এমন জিনিস, ধাঁধাটির
উত্তর যে "আহার' সেটি ধরা পড়ে ধাঁধাটি সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরই।
পঞ্চমত, সংক্ষিপ্ততা ধাঁধার একটি প্রধান গুণ। কিন্তু দেখা যায় ছড়ার হলে পদ্যে রচিত ধাধাগুলি খুব একটা সংক্ষিপ্ত হতে পারে না অথচ গদ্যে রচিত ধাঁধার প্রশ্নগুলি অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হয়। কারণ গদ্যে রচিত ধাঁধা হলে তা একটি সংক্ষিপ্ত বাক্যেই রচিত হতে পারে কিন্তু পদোর জন্য অন্তত দুটি পদের প্রয়োজন, পদ্যে পদ পূরণের আবশ্যক, সেই জন্য অনেক সময় ধাঁধার জিজ্ঞাসাটা প্রকাশ পায় একটিমাত্র পরেই, আর একটি পদ নিতান্তই অনাবশ্যক, শুধুই ব্যবহার করা হয় পদ পূরণের জন্য। যেমন
আগায় এস গোড়াইয়া মৌ
যে না বলতে পারবে সে পবনঠাকুরের বউ (" (অর্থ) এখানে প্রশ্নটি শেষ হয়েছে একটি পদেই, দ্বিতীয় পদটি যুক্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পদ পূরণের জন্যই।
আগায় এস গোড়াইয়া মৌ
যে না বলতে পারবে সে পবনঠাকুরের বউ (" (অর্থ) এখানে প্রশ্নটি শেষ হয়েছে একটি পদেই, দ্বিতীয় পদটি যুক্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পদ পূরণের জন্যই।
যাতে, আবার অনেক সময় একই শব্দের সলো একই শব্দের মিল দেওয়া হয়। ধাধার গঠনে। যেমন
পেট আছে তার পা নাই।" (বোতল) সপ্তমত, অনেক সময় দেখা যায় ধাঁধাটি সংক্ষিপ্ত হলেও কবিতার মতো মিল দেবার চেষ্টা রয়েছে ধাঁধাটির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রপর্বে। যেমন
"আট পা ষোলো হাঁটু
জাল বুনাইছে বুড়ো টাট্টু (মাঝা অষ্টমত, আকারে ছোটো হলেও ধাঁধার মধ্যে জাতির বৃদ্ধি এবং বিচারশক্তির যে পরিচয় পাওয়া যায় তা সমগ্র জাতির একাধারে যেমন মননশীলতার, ঠিক তেমনি আর একদিক দিয়ে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে তার জীবনচর্যার পরিচয়। নবমত, এক শ্রেণির দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করা হয় ধাঁধার ভেতরে কিন্তু ধাঁধার উত্তর তাদের ওপর নির্ভর করে না। যেমন
“মামাদের পুইইরে (পুকুরে) মরা উদ্দুর (ইঁদুর) ভাসে।
নাই (নাতি) ধইরা টিপটা দিলে ঘট ঘটাইয়া গেটটি করে আসে (হাসে)। – (টর্চলাইট) এখানে মরা ইদুরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে টর্চলাইটাকে। নিছক মিল দেবার জন্যই মামাদের পুকুর শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। সর্বোপরি, ধাঁধার অন্যতম বৈশিষ্ট্যগুলি হল— নির্মল হাস্যরস সৃষ্টি, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি, পরিণত শিল্পমন, বুদ্ধির। অনুশীলন, মানসিক ক্রীড়া সম্পাদন, রসবোধ, স্মৃতিচর্চা ও লৌকিক জ্ঞান।

বাঙালির গৃহজীবন ও সামাজিক জীবনের এক মহা সম্পদ হল বাংলা ধাঁধা। বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত বিষয়বস্তুর ভিতর যাদের আকৃতি ও প্রকৃতিগত কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য আছে সেই সমস্ত বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করেই। ধাঁধার সৃষ্টি হয়ে থাকে। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা গার্হস্থ্য জীবনের মধ্যে যে নানারকম সম্পর্ক বা আত্মীয়তা রয়েছে সেগুলিকেও ধাঁধার বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেছেন ধাঁধা রচয়িতারা।

বিচিত্র পঞ্চ্যামী বাঙালির গার্হস্থ্য জীবন এবং একইসঙ্গে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বিভিন্ন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে, যেমন—ছেলে, মেয়ে, মা, বাবা, জামাই, শ্বশুর-শাশুড়ি ইত্যাদি সম্পর্কের ভিতর দিয়ে বহু দিকে বিচিত্রভাবে বিস্তৃত হয়ে আছে তার সামাজিক জীবন। এই সমস্ত সম্পর্কের মাধ্যমেই যে বন্ধন, যে সহজ ভাবনা সেগুলিকে অবলম্বন করেই নানাদিকে নানাভাবে তার সাহিত্য প্রসারিত হয়েছে। এই দিকটি বাঙালির লোকসাহিত্যের ক্ষেত্রেও বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। নানা ধরনের ধাঁধার উল্লেখ পাওয়া যায় বাঙালির এই সমস্ত বিভিন্ন পারিবারিক জীবন এবং আত্মীয় সম্পর্কিত নানা প্রকারের বিষয়কে অবলম্বন করে। ধাধার মধ্যে দিয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে এই সব আত্মীয়র একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে পরিবারে। যেমন—

স্নেহ-মমতার প্রতিমূর্তি জননী প্রত্যেকটি পারিবারিক জীবনেই এক বিশেষ সম্মানের অধিকারিণী। তাঁকে সম্মান দিতে ভোলেননি লোককবিও— যেমন

"তিন অক্ষরে নামটি যার অন্যা করে সবাই

প্রথম অক্ষর ছেড়ে দিলে মোষের ঘরে রই ।" (জন) মাকে জননী নামের মধ্যে দিয়ে বলা হয়েছে ধাঁধাটিতে। অন্যদিকে 'বাবা'ই হলেন বাঙালি পরিবারের সর্বময় কর্তা। আর তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বাবার। বেশ রসিকতার সঙ্গেই লোককবি বাবার পরিচয় দিয়েছেন ধাঁধার মধ্য দিয়ে।। যেমন—

“ঘরের গাছের নাড়া পা

কী হয় তোমার পিসার শালা ।" -একথা কাউকে বলে দিতে হবে না যে পিসার শালাটি হলেন বাবা।

পল্লিকবি অত্যন্ত কৌতুকের সঙ্গে প্রশ্ন-উত্তরের মধ্যে দিয়ে স্বামী-স্ত্রীয় সম্পর্ক ও পরিচয় ব্যক্ত করেছেন। যেমন— শাখা হাতে মূলা পাতে ছেলে ধোয়াছ কারোরে ?

সুয়াই ছেলের মা হাত হইয়া ছেলের মা।

ছেলের বাপে যার শ্বশুর তার বাপে আমার শ্বশুর।" বাঙালির পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে অবলম্বন করেই এভাবে গড়ে উঠেছে বাংলা ধাঁধা। প্রখ্যাত গবেষক এ প্রসঙ্গে বলেছেন— এমনই বৈচিত্র্য আর রঙে ভরা বাংলার গার্হস্থ্য জীবন। এখানে দুঃখ আছে, সুখ আছে, আছে অপার বিস্ময় তাই গ্রামীণ সমাজজীবনের বড়ো বন্ধন হল এই পরিবার—যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে মধুর গার্হস্থ্য জীবন। আধুনিকতার উগ্র স্পর্শ হয়তো মাঝে মাঝে গ্রামবাংলার এই একান্নবর্তী পরিবারের নৈতিক আদর্শকে ভেঙে দিচ্ছে—তবু যা সত্য, যা মঙ্গলকামী, তা  থাকবে। আর এই টিকে থাকার মধ্যেই পরিবারভিত্তিক বাংলা ধাঁধা বেঁচে থাকবে চিরদিন, চিরকাল ।"

বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মময় জীবনের একটি অলা হল ধাঁধা। এই সমস্ত ধাঁধার জন্ম একদিনে হয়নি, এই ধাঁধার সৃষ্টি বহু যুগের ওপার থেকে বাংলার সোঁদা মাটির বুক থেকেই। এগুলি বাদ দিলে অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে। বাংলার লোকজীবন। বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে পালাপার্বণে, ব্রত আচরণকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত ধাঁধার প্রচলন হয়েছে তা যে শুধু সকল কৌতুকের সৃষ্টি করে আনন্দ দেয় তা নয়, এর ভেতর খুঁজে পাওয়া যায় লোকসংস্কৃতির একটি পরিচ্ছন্ন রূপকে যদি সংস্কৃতির অর্থ মানসিক বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা বা ঐতিহ্যকে বহন করা হয়, তাহলে যে সমস্ত গ্রামীণ ছোটো ছোটো ধাঁধাগুলি যা গড়ে উঠেছে পালাপার্বণ ও উৎসবকে কেন্দ্র করে, সেগুলি গ্রামবাংলার একান্তই নিজস্ব ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি, একথা বললে ভুল বলা হবে না। উৎসবের সুর সবসময়েই শোনা যায় বাংলার আকাশে-বাতাসে আর বাংলার মাটিতে এইসব উৎসবকে কেন্দ্র করেই জন্ম হয় নানান রকমের রত এবং আচার-অনুষ্ঠানের। গ্রামের সহজ-সরল সাধারণ মানুষ যুগ থেকে যুগান্তরে এই সমস্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রচনা করে গেছেন অসংখ্য ধারা।

উৎসবকেন্দ্রিক ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের ধাধাগুলি আকারে কখনও ছোটো হয় আবার কখনও বড়ো হয়েও থাকে। অনেক সময় দেখা যায় যে, বড়ো ধাঁধাগুলি বর্ণনাত্মক হয়, আর সংক্ষিপ্ত ধাঁধাগুলির মধ্যে বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তির অনুশীলন লক্ষ করা যায়। এই ধরনের ধাধাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শিবের গাজনমূলক, নবান্ন উৎসব-বিষয়ক, বিবাহ আচারমূলক এবং পৌষ-পার্বণ-বিষয়ক ধাঁধা।

এইসব উৎসব, আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে বিশেষ আড়ম্বরের সত্যে উদযাপন করা হয় বিবাহের অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে যে সমস্ত গান, হুড়া পরিবেশিত হয়, এদের সঙ্গে ধাধাও পরিবেশিত হয়ে থাকে। ঘরে ঘরে আনন্দের ঢেউ বরো যায় দুটি জীবনের মিলন উপলক্ষে। এই অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসে সক্রিয় অংশ নেয় নিকট আত্মীয়রা সেই সঙ্গে পাড়া-প্রতিবেশীরাও। বিবাহের পাত্র-পাত্রী নির্বাচন, গায়ে হলুদ দেওয়া, কন্যাবিদায়, বরযাত্রা, জামাইবরণ, বন্ধুবরণ প্রভৃতি বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে ধাধা বলতে শোনা যায়। আজও ছড়িয়ে আছে অজস্র ধাঁধা বিয়েবাড়ির আনন্দঘন পরিবেশের বিভিন্ন পর্যায়ে। মঙ্গলকাব্যের যুগে শিবায়ন' কাব্যের 'ফুলশয্যায় গৌরী' অংশে ঋষিপত্নীরা আটটি ধাঁধা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। মহাদেবকে। বাংলাদেশের পল্লি অঞ্চলে বিবাহের আচারমূলক ধাঁধা এখনও শুনতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ফসল বোনা, ফসল কাটা এবং বৃষ্টির আবাহন উপলক্ষেও ধাঁধার প্রচলন রয়েছে। নবান্ন উৎসবে ধান ভানা সম্পর্কে সুন্দর সুন্দর ধাঁধা বলতে শুনি। পৌষপার্বণেও অনেক ধাঁধা রচিত হয়ে থাকে। যেমন— চারকোণার পুকুর মরা তিনি ভাসে পার্শ্বে খোঁচা দিলে খিল খিলাইয়া হাসে।

গ্রামীণ এইসব ধাঁধা হয়তো বুদ্ধিজীবীদের কারো কারো মনে বিরক্তির উদ্রেক করে, তবুও বলতে দ্বিধা নেই, অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক গ্রামীণ ধাধাগুলি বাংলার নিজস্ব সম্পদ। এর ক্ষয় নেই, মৃত্যু নেই।

গঠনভঙ্গি এবং আঙ্গিকের দিক থেকে ধাধার সঙ্গে প্রবাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। বাহ্যিক গঠন এবং রচনার দিক থেকেও ধাঁধা ও প্রবাদের মধ্যে কোনো তফাত নেই। আবার ধাঁধা এবং প্রবাদের মধ্যে বহু ক্ষেত্রে একইরকম ব্যবহার থাকলেও উভয়ের মধ্যে অর্থগত পার্থক্যও লক্ষ করা যায়।

●সাদৃশ্য

(১) লোকসাহিত্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ধাধা ও প্রবাদ ।।

(২) ধাঁধা ও প্রবাদ উভয় ক্ষেত্রেই মস্তিকের চর্চা ও অনুশীলন হয়।

(৩) ধাঁধা ও প্রবাদ বিষয়-বৈচিত্র্যের দিক থেকে সমগোত্রীয় রচনা : এমন কোনো বিষয় বা ব্যাপার নেই যেখানে ধাঁধা ও প্রবাদ সৃষ্টি হয় না।

(৪) ধাঁধা ও প্রবাদ উভয়ই জাতির ঐতিহ্যাশ্রিত।

(৫) ধাঁধা ও প্রবাদ উভয়েই বারনার্থক।

(৬) ধাঁধা ও প্রবাদের ক্ষেত্রে শব্দ ও অর্থের সূত্র ধরে কতকগুলি বাহ্যিক লক্ষণ চিহ্নিত করা যায়।

(৭) ধাঁধা ও প্রবাদ উভয়ই জনশ্রুতিমূলক হয়েও সমকালীন।

(৮) ধাঁধা ও প্রধান দুটিই জীবনবাদী ও বস্তুধর্মী রচনা।

(১) ধাধা ও প্রবাদ উভয়ই সংক্ষিপ্ত রচনা।

(১০) অস্তামিল বিশিষ্ট ও বন্দোবদ্ধ দুই চরণ দৃষ্ট হয় প্রবাদে ও বাধায়। যেমন আট পা ষোলো হাঁটু জাল বুনাইছে বুড়া চাটু। (মাকড়সা)

প্রবাদ বাকি, বাক্য, ঝাঁটপাড়ি, এই তিন নিয়ে দোকানদার।

●বৈসাদৃশ্য

ধাঁধা এবং প্রবাদের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে একইরকম ব্যবহার থাকলেও উভয়ের মধ্যে অর্থগত বেশ কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন

(১) ধাঁধার ভেতর একটা বস্তুর সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু প্রবাদের মধ্যে ভাবের সন্ধান পাওয়া যায়।

(২) ধাঁধার মধ্যে স্ত্রীসমাজের অধিকার খুব সীমিত কিছু প্রবাদের মধ্যে নারীর জীবনচিত্র খুব স্পষ্ট

(৩) ধাঁধাতে সকলেই কৌতুক উপভোগ করে কিন্তু প্রবাদে সেটা হয় না। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয় এবং প্রত্যক্ষ জীবন অভিজ্ঞতার সুকঠিন ফলই ব্যক্ত হয় প্রবাদে।

(৪) ধাঁধার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রকাশভঙ্গি হতে পারে। কিন্তু প্রবাদের প্রকাশভঙ্গি প্রত্যক্ষ।

(৫) ধাঁধা ও প্রবাদ দুটিই নিষ্ঠাবান রচনা : কিন্তু প্রবাদ রচনাগত দিক দিয়ে বাঁধার চেয়েও নিষ্ঠাবান।

(৬) ধাঁধাতে সত্যকথন ও অতিকথন উভয়েই আছে। কিন্তু প্রবাদের ধর্ম সত্যকথন |

(৭) ধাঁধায় ব্যবহৃত উপমা-রূপক কাব্যগুণ সমৃদ্ধ : কিন্তু ধাধার এই কাব্যগুণ প্রবাদে প্রকাশিত হয় না।

(৮) ধাঁধা আকারে ছোটো এবং বক্তব্যতেও বৃহৎ নয়; কিন্তু প্রবাদ আকারে ছোটো এবং বক্তব্যে বৃহৎ ।

(৯) ধাঁধা বর্ণনার গুণে সাহিত্যধর্মী আর প্রবাদ তথ্যমাত্র।

(১০) ধাঁধায় অন্যথাবৃত্তি চলে : কিন্তু প্রবাদে অন্যথাবৃত্তি চলে না।

(১১) ধাঁধায় বেশিরভাগ সময় পদপূরণ বা চমক দেবার জন্য অবাস্তুর বাক্য থাকে, প্রবাদে কিন্তু ভাবশৈথিল্য, বাক্যবিলাস বা অর্থ বিচ্যুতি নেই বলা চলে।লতা আছে, আর অর্থের মহিমা আছে প্রবাদে।

(১৩) ধীবর বর্ণনা তাৎপর্যবাহী কিন্তু প্রধানের  যেমন-প্রান টেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। কাকলিতে পাড়া দিয়ে জোর করি । (১৪) উপনা, পর অলংকারের ভাষায় ধাঁধা : ক ন প্রকাশিত হয় বক্রোরি, অতিশয়োরি, উপমা বিরো অলংকারের ভাষায়।(১৫) বুদ্ধি ও কল্পনার মিশ্রণে বাঁধা রচিত হয়, জাতির বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায় এতে। আর অ, নিটোল, বং নৈতিকতার অলিখিত ছবি হয় প্রবাদে।

(১৬) পুরুষের প্রাধান্য নার ক্ষেত্রে কিন্তু সমাজের আধিক্য লক্ষ করা যায় প্রবাসে।

সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার তিন সুন্দর ভাষাগত রূপের অভিব্যক্তিই হল প্রবাদ। প্রধানকে ইংরেজিতে বলা হয় Proverb। এই সম্পর্ক আছে স্প্যানিশ ভাষায়। মাকে ইংরেজি করলে A Proverb in a short sentence based on a long experience । বাংলায় প্রদান হল এমন একটি ছোটো বাক্য যার ভিত্তিতে। প্রবাদ একদিক দিয়ে যেমন প্রাচীন অন তেমনি আধুনিক। প্রবাদ মানুষের পরিবেশ ও জীবন পর্যবেক্ষনের এর প্রকাশের এক দপ্তি অথচ অর্থপূর্ণ অভিব্যক্তি। একটি জাতির প্রতিভা, বুদ্ধিমত্তা একা আত্মা সেই জাতির প্রবাদের মতে আবিষ্কৃত হয়। প্রাচীন মিশরীয় যুগ থেকে প্রবাদ মানুষকে লোকশিক্ষা দিয়ে আসছে। এই প্রবাসের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের সৃষ্টি হয়।প্রথম প্রদান হল একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণা বাক্য।

দ্বিতীয়ত, প্রবাদের উদ্ভবে লোকের বাস্তব অভিজ্ঞ আছে। তৃতীয়ত, বাচ্যার্থ নয়, ব্যঞ্জনার্থেই প্রবাদের অর্থ। এই অর্থেই প্রবাদ রূপকধর্মী রচনা।

জগত, প্রবানে বুদ্ধির ও চিন্তার ছাপ থাকে প্রবল।

পরনত, প্রবাদের স্বাধীন সত্তা আছে কি স্বাধীন প্রয়োগ নেই।

ত, প্রবাদ বক্তব্যকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিকে জোরালো ও প্রকাশকে অর্থবহ করে তোলে। সপ্তমত, প্রবানের শিকড় ঐতিহ্য প্রতি ঐতিহ্য থেকে রস সপ্তার করে প্রধান অর্থপূর্ণ হয় ও ভাষার মধ্যে বহমান থেকে তাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

লোকনর্শন বা লোক অভিজ্ঞতার এক সুন্দর ও সাইত ভাষাগত রূপ হল প্রধান। একটি জরুরি জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নিহিত করে দেওয়া হয় একটি প্রধানের মধ্যে হুন্য এবং সংক্ষিপ্তভাবে। ব্যবহারিকতার মধ্যে দিয়ে উপার্জিত জ্ঞান আমাদের কাজে লাগে বলেই আমাদের জীবনে প্রবাদের মূল্য। অর্থাৎ প্রবাদের মূল গৌরবের উৎসই হচ্ছে বস্তু। আমরা বাদকে স্বীকৃতি দিই কার্যকর জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার বাহন হিসেবে। একটি বিশিষ্ট রূপ নিয়ে সে যদি না আসত, চেহারা ত নিছক শুকনো উপদেশের, 'সদা সত্য কথা বলিবে, 'না বলিয়া পরের দ্রব্য গ্রহণ করিবে না'-র মতো, তাহলে বছরের ■ বছর ধরে, ভাষার বিশাল পরিবর্তন সত্ত্বেও ন-টি প্রাণওয়ালা কিংবদন্তির বিড়ালের মতো থাকত না বেঁচে, আর এমনভাবে ছড়িয়েও পড়ত না লোকের মুখে মুখে। অর্থাৎ প্রবাদ একদিকে জ্ঞান হিসেবে, অপর দিকে কথার অঙ্গ হিসেবে ব্যাবহারিক জীবনে দুভাবে কাজে লাগে। সমালোচক কেনেথাক তাঁর দা ফিলজফি অব লিটারেরি ফর্ম (The Philosophy of Literary Form) বইটিতে বলেছেন- "প্রবাদের সঙ্গে কবিতার খুবই মিল, কারণ কবিতার মতোই প্রবাদ ও তার বক্তব্যকে আমাদের কাছে যে উপায়ে পৌঁছে দেয় তা হল 'স্ট্যাটেজি বা স্টাইল'। খুবই যুক্তিপূর্ণ বাকের এই উক্তি, কারণ প্রবাদের কোনো আকর্ষণই গড়ে উঠত না এই স্টাইল বা স্ট্যাটেজি না থাকলে।

প্রবাদের মূল পার্থক্য বাগধারার সঙ্গে। একটা প্রচ্ছন্ন উপদেশ থাকে প্রবাদে তা সে আলতোভাবে হলেও, নির্দেশ থাকে প্রয়োজনীয় কর্তব্য বা অকর্তব্যের কোনো প্রার্থিত প্রজ্ঞার ইশিত থাকে, কিন্তু তা থাকে না প্রবাদে। মার্কিন প্রবাদ বিশেষজ্ঞা আর্চার টেলর এ প্রসকো একটি প্রবাদের উল্লেখ করে বলেছেন- the wisdom of many and the wit of one' ইডিয়ম বা বাগধারা বেশিরভাগই মেটাফর ও রূপক জাতীয় অলংকরণ। কিন্তু ওজন এবং অলংকরণ দুই-ই আছে প্রবাদে।

ব্যাকরণগতভাবে প্রবাদের বাক্য গঠনের দিকটি বিচার করতে গেলে প্রবাদকে তিনটি ধারায় প্রকাশ করা যেতে পারে।

((১) অর্থপূর্ণ বাক্য বা খণ্ডবাক্য

(২) পূর্ণ বাকা

(৩) একাধিক বাক্য।

একটি সম্পূর্ণ বাক্য ব্যবহার করা হয়নি যে প্রবাদটির নির্মাণে, কিন্তু বাক্যের কয়েকটি শব্দকে নিয়ে একটি গুচ্ছ তৈরি কিরে সেটি প্রকাশিত হয়েছে, তাকেই বলা হয় খণ্ডবাক্য। এগুলি চলে বাগধারা হিসেবে, কিন্তু এগুলিকে প্রবাদের আকারে দেওয়া কষ্টকর নয়, ব্যানাকে সম্প্রসারিত করে। যেমন- লক্ষ্মীর ঘরে কাল পেঁচা। কালনেমির লঙ্কা ভাগ'। বা, 'ঘরের শত্রু বিভীষণ।

পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এগুলি খণ্ডবাক্য শুধু নামেই, কিন্তু এই খণ্ডে বিশেষ্য ভাগ বা Noun Phrase-কে অতিক্রম করা গেলে দেখা যাবে একটি পূর্ণ বাক্যের ব্যানা পাওয়া যাচ্ছে এগুলির প্রত্যেকটিতেই। যেমন—

লক্ষ্মীর ঘরে কাল পেঁচা (ও থাকতে পারে) কালনেমির ভাগ (সূর্যতা ছাড়া আর কিছু না) ঘরের শত্রু বিভীষণ (থেকে সতর্ক থেকো)

এই প্রবাদগুলি যদিও বাগধারা রূপী খণ্ডবাক্য কিন্তু অভীদার দিক থেকে পূর্ণবাক্য। সংখ্যায় বেশ কম বাক্যখণ্ডের প্রবাদ। আবার তুলনায় অনেক বেশি পূর্ণ বাক্যের প্রবাদ। যেমন—

নিয়মিত চোখ রাখা।

মাওনা মন ব্রাহ্মণেও যায়।

জহুরি জহুর চেনে।

-কর্তা প্রায়ই উহা এবং অনির্দিষ্ট থাকে এই সমস্ত প্রবাদে, ফলে সর্বজনীনতা পায় বাক্যের অর্থ। একাধিক বাক্যের প্রবাদই সংখ্যায় বেশি। কেনেথ বাক-কে অনুসরণ করে আমরা যাকে প্রবাদের বিশেষ স্টাইল বা স্ট্যাটেজি বলেছি, এই একাধিক বাক্যই তার মূল আশ্রয়। যেমন—

ফলের মধ্যে আম্রফল, সুন্দরী নারী আর গলা।

অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী, জুতারে ক্যা আলমারি।

তেল মাখবে থাবা থাবা, চিত হৈয়ে শোরে বাবা। মুঠি ভিক্ষা পায় না, উঠোন ঝেটিয়ে বসে।

এই উদাহরণগুলি থেকে বোঝা যায় যে, ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয় প্রবাদের অন্বয় বা ব্যাকরণগত গঠন। ওই স্ট্যাটেজি বা স্টাইলই হল প্রবাদের মূল অবলম্বন।

প্রবাদের ব্যাবহারিক দিক আলোচনায় সংগতভাবে এসে যায় তার উপদেশমূলক এবং বিজ্ঞানমূলক দৃষ্টি দিকের প্রসঙ্গা। উপদেশমূলক দিকের অন্তর্গত (১) অনুসরণীয় এবং আচরণীয় ইত্যাদি এবং (২) অনাচরণীয়, পরিহার প্রভৃতি। অন্যদিকে বিজ্ঞাপনমূলক দিকে আছে – (১) সংগত-অসংগত (২) সম্ভব-অসম্ভব (৩) বিশেষ কারণে বিশেষ কার্য ইত্যাদি। প্রত্যক্ষ বা স্পষ্ট বা তির্যক ও হতে হবে উপদেশমূলক প্রবাদের উপদেশটি। প্রবাদে স্পষ্ট উপদেশ তুলনায় অনেক কম কারণ তাতে তৈরি হয় না কোনো আকর্ষণ। কাউকে কিছু কর্তব্য বা অকতবের নির্দেশ করা হচ্ছে ক্রিয়াপদে মধ্যম পুরুষ বিভক্তি যোগ করে। অবশ্য বেশ কিছু প্রবাদ আছে ঘনা ও ডাকের বচনে। এছাড়াও অন্য কোথাও যে কয়েকটি পাওয়া যায় না, তা নয়। যেমন অতি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে। উচ্ছে যাবে কচি, পটলের যাবে বিচি ।।অগ্নি, ব্যাধি, ঋণ এ তিনের রেখো না চিন। কাঙাল দেখে কোরো না হান, কাঙাল হতে হবে একদিন।

কিন্তু বেশিরভাগ প্রবাদের অভিভাবকত্বের সুর এবং ব্যাকরণগত সংগঠন নেই। তার পরিবর্তে কোথাও আছে বক্তার নিজের উল্লেখ অথবা নিজের দৃষ্টান্ত টেনে এনে একটা অন্তরতা এবং ব্যক্তিগত পরামর্শ দেবার চেষ্টা শ্রোতাকে  - মারি তো গন্ডার, লুটি তো ভান্ডার।

আপনি থাকতে ঠাঁই নাই / বউর লাগে সরে আবার কখনো বা প্রথম পুরুষের আশ্রয় নিয়ে শ্রোতা ও বক্তা দু-পক্ষ থেকেই দূরবর্তী একটা দৃষ্টান্ত দেখিয়ে দেয় আপনি বড় ভালো, তাই পরকে বলে কালো।

সরকারে না মুখ পায়, ঘরে এসে মাথ ঠ্যাঙায়।

কখনও এমন একটা অনির্দিষ্টতার সঞ্চার করা হয় বার্তা ও ক্রিয়ার মধ্যে যে বক্তব্য বিশেষ শ্রেণি বা বিশেষ ব্যক্তিকে অতিক্রম করে সর্বজনীনতা পায়। এভাবেই ব্যবহার করা হয় প্রবাদগুলিকে।

কয়েকটি শব্দ একত্রে সন্নিবেশিত হয়ে যখন শব্দার্থকে অতিক্রম করে কোনো বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত অর্থ প্রকাশ করে, তখন সেই শব্দগুচ্ছকে 'প্রবাদ' বলা হয়। এই প্রবাদের মধ্যে এক ধরনের সর্বজনীনতা আছে এর বক্তব্য এবং সংগঠনের মধ্যে। তার ফলে কিছু কিছু প্রবাদকে খুব সহজেই অনুবাদ করা চলে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায়। রূপ বা রূপকে সম্পূর্ণ অনুবাদ না করা গেলেও তা প্রকাশ করা খুব একটা কঠিন হয় না ভিন্ন রূপ বা রূপকের মধ্যে দিয়ে।

প্রায় একই অর্থ হল 'অনভ্যাসের ফোঁটা কপালে চড়চড় করে' আর 'Every shoe fits not every foot নিজেকে প্রকাশ করেছে দুটি ভিন্ন রূপকরে। এক ভাষার প্রবাদ অন্য ভাষায় প্রতিধ্বনিত করা যায় সংগঠনের বা রূপাকৃতির দিক থেকে। যুয়েন রেন জাও-এর বই থেকে জানতে পারা যায় যে, ইংরেজি As you sow, so shall you reap চিনা ভাষায় 'চুং কুয়া নে কুয়া, চুং তৌ তে তৌ' এভাবেও রূপান্তরিত করা চলে তরমুজ বুনলে তরমুজ পাবে, শিম বুনলে। শিম পাবে। পণ্ডিত সমালোচকের প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি এক্ষেত্রে বিশেষ প্রযোজ্য—“অনাগরিক মানুষের জগৎ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতায় একটা স্তর পর্যন্ত যেমন বিশ্বব্যাপী ঐক্য আছে, মুকারোভস্কি কথিত ওই অপ্রাণীলথ নন্দন তত্ত্বের ভাষাশৈলীতে। তাকে পরিবেশন করার মধ্যেও খানিকটা সাদৃশ্য থেকে যায়।"

বিস্তৃতভাবে জীবন অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ততম সাহিত্যিক প্রকাশই হল প্রবাদ। বলা বাহুল্য প্রবাদগুলি হল। “চলমান জীবনে চলচ্চিত্র"। এ জাতীয় কয়েকটি প্রবাদ হল

(১) কারও পৌষমাস কারও সর্বনাশ। গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল ।

(৩) গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল।

(৪) ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে।

(৫) জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। প্রভৃতি।

প্রথম প্রবাদটির অর্থ হল— একজনের পক্ষে সুসময় অন্যের পক্ষে দুঃসময়। এখানে কৃষি জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে। পৌষমাস আসলে গোলায় ধান ভরে তোলার সময় হয়। রোদে পুড়ে জলে ভিজে কৃষক সারা বছরের কম এবং অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। তাই এর চেয়ে শুভ ও সুসময় কৃষি-সমাজের আর হয় না। তারই প্রতিফলন এই প্রবাদে। দ্বিতীয়টিতে, গ্রামপ্রধান বা মোড়লের কথা প্রকাশ পেয়েছে। মোড়লের মান্যতা গ্রামে অবশ্য স্বীকৃত। কিন্তু কেউ মোড়ল না হওয়া সত্ত্বেও মোড়লের মান্যতা পেতে চাইলে তাকে উপহাসের পাত্র হতে হয়। এখানেও গ্রামীণ সমাজের ছায়া। তৃতীয়টিতে, গাছে কাঁঠাল অথচ তেলের আয়োজনের অর্থ সিদ্ধিলাভের পূর্বেই ভোগের আয়োজন। গোঁফে তৈলমর্দন চাষিভাই করেন, গৃহ করেন আর্থিক সমৃদ্ধির প্রেক্ষাপটেই। অনেকেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্বেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবেই ধরে নিয়ে ভবিষ্যৎ সুখের স্বপ্ন দেখেন, এখানেও নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষের সমাজের থেকেই প্রবাদটির উৎপত্তি। চতুর্থ প্রবাদটির অর্থ হল অন্যের বিপদে পরিহাস করা। গ্রামাঞ্চলে খুঁটে পুড়িয়ে জ্বালানি তৈরি হয়। সেই খুঁটে তৈরি হয় গোবর থেকেই। খুঁটেকে পুড়তে দেখে গোবর হাসে কিন্তু গোবরের জানা নেই এক সময়ে তাকেও পুড়তে হবে। এর থেকে শিক্ষা মেলে অন্যের বিপদে সহানুভূতিসম্পন্ন হতে হয়, কারণ বিপদ একদিন হাস্যকারারও হতে পারে। বস্তুত, একান্তই গ্রাম্য সমাজলর এই অভিজ্ঞতা প্রবাদের আকারে নিজেকে প্রকাশ করেছে। পঞ্চম প্রবাদটিতে আছে অরণ্য অধ্যুষিত অঞ্চলের এক তিক অভিজ্ঞতা। উভয় সংকট অর্থে প্রবাদটি প্রচলিত হলেও এর উৎস কিন্তু বনাঞল। সুন্দরবন অঞ্চলের নালা এবং নদীগুলিতে কুমিরের প্রাবল্য রয়েছে। কুমিরের আক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যাও কম নেই। অন্যদিকে বনের মধ্যে রয়েছে বাঘ। তাই সুন্দরবন অঞ্চলের এই তিক্ত অভিজ্ঞতাই উপরোক্ত প্রবাদটির জন্ম দিয়েছে। এরকম আরও সামাজিক অভিজ্ঞতাজাত বহু প্রবাদের পরিচয় পাওয়া যায়। মূলত সামাজিক অভিজ্ঞতাই প্রবাদের উৎস।

লোকসাহিত্যের একটি বৃহৎ স্থান জুড়ে বিরাজ করছে লোককথা বা কথা। মুখে মুখে প্রচলিত নানা ধরনের তাল্পকেই সাধারণভাবে বলা হয় কথা। যেসব গল্প মৌখিক এবং যেগুলির প্রচলন নিরক্ষর কিংবা স্বল্পশিক্ষিত জনসাধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ সেগুলিকেই লোককথা বলে চিহ্নিত করা হয়। লোককথা প্রধানত গদ্যেই রচিত হয়ে থাকে, তবে মাঝে মাঝে পদ্যে রচিত ছড়াও লোককথার মধ্যে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।

লোককথা বা কথাকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। (১) উপকথা (২) পশুকথা (৩) ব্ৰতকথা (৪) ৰূপকথা।

(১) উপকথা বাস্তবের সঙ্গে সংগতি ক্ষীণ হলেও উপকথা বা কিংবদন্তির কিছু-না-কিছু যোগ স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যায়। দেখা গেছে উপকথা বা কিংবদন্তি সাধারণত বিয়োগান্ত হয়। চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যেই উপকথার সৃষ্টি। (২) পশুকথা কেবল পশু নিয়ে যে-কাল্পনিক গল্প, সাধারণত তাকেই বলা হয় পশুকণা। বাংলা ভাষায় শুধুই পশুকেন্দ্রিক গল্প অতিসামান্য আছে। বাংলা ভাষায় বেশি পাওয়া যায় পশু এবং মানুষের গল্প ।

(৩) ব্ৰতকথা : ব্রতকথা বাংলা লোক সংস্কৃতির এক অনন্য উপকরণ। এ জাতীয় গল্প অন্যত্র খুব বেশি পাওয়া যায়। না। এ গল্পের সঙ্গে বিশ্বাস এবং সংস্কারের যোগ খুবই গভীর। এ গল্প শুনলে পুণ্য হয়; গল্পটি শ্রবণও একটি। ধর্মীয় আচার বলে গণ্য হয়ে থাকে। ব্রতকথা হচ্ছে দেব বা দেবীর মাহাত্ম্য বিষয়ক গল্প। এ গল্পে থাকে মানুষ, দেবতা এবং নানা নৈসর্গিক বস্তু।

(৪) রূপকথা : রূপকথা হল এমন গল্প, যার সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্কই নেই। যে-গল্প গড়ে উঠেছে অপ্রাকৃত ও প্রাকৃত প্রাণী এবং মানুষের ও অলৌকিক এবং অতিলৌকিক চরিত্রে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াজাত ঘটনার বিবরণ থেকে তাকেই বলা হয় রূপকথা। রূপকের গল্প হবে অবশ্যই মিলনান্তক। দেখানো হবে সংপক্ষের জয় এবং অসৎ পক্ষের পরাজয়। রূপকথাও উপকথার মতো চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যেই রচিত। কিন্তু মনের গভীরে যেন অপূর্ণ ইচ্ছা সুপ্ত থাকে রূপকথার গল্পে সেইসব ইচ্ছাপূরণেরও বিবরণ থাকে।

লোকসাহিত্যের একটি বড়ো জায়গা জুড়ে আছে কথা বা লোককথা। myth তো গল্পের আকারেই গড়ে ওঠে। বিষয়ের দিক থেকে বিচার করে দেখা গেছে জন্ম, মৃত্যু, নিয়তি, দেব কল্পনা ও প্রাকৃতিক বস্তু নিয়ে প্রাচীন মানুষ কল্পনানির্ভর গল্প বানিয়েছিল। mythology বা পুরাণ কথা তো এইসব গল্পেরই সংগ্রহ। কিন্তু এগুলির মধ্যে একটি বড়ো অংশই মুখে মুখে চলে এসেছে হাজার হাজার বছর পার হয়ে একেবারে বর্তমানকাল পর্যন্ত। এ হল গল্পের একটি প্রধান উৎস। আর-একটি উৎস হল hero worship বা বীরপূজা। একজন অসাধারণ মানুষ বড়ো বীর, বড়ো নেতা বা বড়ো রাজা—তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা গল্প। তাকে প্রশংসা করে, অতিপ্রশংসা করে, অতিশয়োক্তি করে নানা ভাবে বড়ো করা হয়েছে। এইরকম নায়কের বিবরণ সম্ভবের সীমা অতিক্রম করে খুব সহজে অসম্ভবের পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

মানুষের কীর্তিকাহিনি যতক্ষণ সম্ভবের সীমার মধ্যে থাকে, ততক্ষণ এগুলিকে বলা যায় বীরকাহিনি বা বীরকথা। আগেকার দিনে রাজারাজড়াদের দরবারে এগুলি সুর করে গান গেয়ে শোনানো হত। এইভাবেই আখ্যানমূলক গানের জন্ম হয়েছিল যাকে সাধারণভাবে বলা হয় folk ballads বা লোকগাথা। এই জাতীয় লোকনাথাকে একত্র করেই হোমর, ব্যাস, বাল্মীকির মহাকাব্য গড়ে উঠেছিল। কাহিনি বা tale-এর এ হল দ্বিতীয় উৎস।

গল্পের আর-এক উৎস হল মানুষের ইচ্ছাপূরণের ইচ্ছা। এই ইচ্ছা থেকেই মানুষ কল্পনায় গল্প বানিয়ে নিয়েছে। রূপকথার জন্ম এই তৃতীয় উৎস থেকে। পশুকথার উৎস হচ্ছে fancy বা কল্পনা বিলাস। বিস্তৃত রসের গল্প, ভূতের গল্প ইত্যাদিরও এই কল্পনা বিলাস থেকেই উৎপত্তি। ব্রতকথার জন্মও নবোদ্ভূত মিথ থেকে পশু কথায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছায়া পড়ে কিন্তু রূপকথায় যেমন আছে রূপান্তরণের গল্প তেমনি ইচ্ছাপূরণেরও। যারা ভালো—রূপকথার উত্থালপাথাল গল্পে তাদেরই জয়জয়কার। কিংবদন্তি বা উপকথা বাস্তব জীবনেরই গল্প বটে কিন্তু কীর্তিমান মানুষের গল্প। কিন্তু সে-গল্প পুরোপুরি কাল্পনিক এবং অলৌকিক, আশ্চর্য ঘটনা নির্ভর।

‘উপকথা'—শব্দটির আভিধানিক অর্থ উপাখ্যান, গল্প ইত্যাদি। শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হল Fable বা ‘Animal Tale'। সভ্যতার প্রথম দিকে মানুষ ছিল অসহায় হিংস্র প্রাণী আর দুরস্ত প্রকৃতির শিকার তখন 'আধিভৌতিক' ক্ষমতাবিশিষ্ট গাঁওবুড়োর দল ভীত মানুষদের পরামর্শ দিত, কী করে বুদ্ধির জোরে এইসব আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। গাঁওবুড়োরা পরামর্শ দিত গল্পচ্ছলে। এই গল্পগুলিকেই বলা হয় উপকথা। উপকথা সাধারণত বিয়োগান্ত হয়। চিত্ত বিনোদনের উদ্দেশ্য নিয়েই উপকথার সৃষ্টি।

সাধারণ উপকথাকে ‘Animal Tale' বলা হলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সতর্কীকরণ এবং সাহসপ্রদান। তাই ‘উপকথা'-য় প্রদর্শিত হয়েছে কীভাবে স্বপ্নশক্তিসম্পন্ন বুদ্ধিমান খরগোশ বা শেয়াল তাদের বুদ্ধির জোরে বিশালকায় হাতি, সিংহ, বাঘকে পরাজিত করেছে। অথচ ‘উপকথা' এই নামটির পেছনে একটু প্রচ্ছন্ন অবস্থাতভাব রয়েছে।

বাংলা লোককথার অন্যতম অন্য হল ব্রতকথা। বাংলা এক অনন্য উপকরণ। জাতীয় গল্প অন্যত্র খুব পাওয়া যায় না। ঘরের সঙ্গে বিশ্বাস এবং সংস্কারের যোগ খুবই গভীর। গল্প করছে পুণা সামটি একটি ধর্মীয় আচার বলে হয়ে থাকে।

ব্রতকথা দেব বা মাহাত্ম্য বিষয়ক এ থাকে মানুষ (পুরুষ প্রথমে দেবদেবী পরে বিশ্বাসী, প্রথম থেকেই দেখ-বিশ্বাসী), তারপর (সাধারণ এবং অসাধারণ) আর দেবতা বুট তুই), সেই সঙ্গে ঘরে নানা নৈসর্গিক বস্তু (সাধারণ এবং অসাধারণ। ব্রতকথার প্রথমে নায়ক কিংবা নায়িকার বিপদ, দুঃখ, কান্না কৃচ্ছসাধনার বর্ণনা থাকে। তারপর স্বপ্নে কিংবা চোখের সামনে দেবদর্শনের বর্ণনা থাকে। অতপর নির্দেশ পালন, পূজা বর্ণনা। গল্পে পরিণামে নায়ক নায়িকার বিপমুক্তি এবং কৃপা লাভের বর্ণনা থাকে। ব্রতকথাও সময়ই মিলনান্ত। ব্রতকথা হয় শ্রবণের বর্ণনা দৈবকৃপা লাভের দিয়ে। প্রতকথাও সবসময়েই মিলনান্ত। তা শেষ শ্রবণের বর্ণনা এবং ব্রত পূজার ব্যাপারে। উপস্থিতি মিথ ওঠে।

মহাকাব্য আখ্যানকাব্য দুটিই প্রাচীন সাহিত্যরূপ। মহাকাব্যের পটভূমি থাকে চরিত্র এবং আনুষঙ্গিক নানা কাহিনি। তবে একটি চরিত্র। চরিত্র মহান এবং চরিত্রের সুখ-দুঃখের মধ্য দিে প্রকাশ করে বা মূলসত্তার পরিচয়। পরিধিও বিশাল। আখ্যানকাব্যের একটি রূপ দেব-মহিমামূলক মঙ্গালকাব্যধারা মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যে প্রচলিত ছিল আরও ধারা ছিল প্রেমকাহিনিমূলক কাব্য আর গাথা সাহিত্য। এদের আধুনিক অর্থে আখ্যানকাব্য যাবে কারণ মানবকেন্দ্রিকত গন্ধরস পরিবেশন কাব্যের মূল উদ্দেশ্য উনিশ শতকে পাশ্চাত্য সাহিত্যের আর গীতিকবিতার আখ্যানকাব্য একটি সাহিত্যরূপ দেখা দিয়েছিল। আধুনিক আখ্যানকাব্যের মূল অবলম্বন মানবজীবনের বিচিত্র প্রকাশের ছন্দময় আধুনিক বলে আখ্যানকাব্য প্রথম কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-৮৭)। তিনি ত্রিপদীর পুরোনো আধারেই চা লিখিত 'রাজস্থান থেকে সংগ্রহ করে লিখেছিলেন 'পদ্মিনী আর এরপর নাম করা যায়। বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৯১৯) বীরবাহু কাবা' (১৮৬৪), 'ছায়াময়ী' (১৮৮০) নবীনচন্দ্র (১৮৪৭-১৯০৯) 'পলাশীর (১৮৭৫) 'ক্লিয়োপেটা' (১৮৭৯) ও নিদর্শনই বলা ।

বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট সম্পদ তার গীতিকবিতা। 'লিরিক এই ইংরেজি শব্দটির বাংলা করা হয়েছে, রীতিকবিতা। পাশ্চাত্যের প্রাচীন সাহিত্যে, প্রাচীন গ্রम-এ। "লায়ার' নামের বীণাযত্নসহ যে অনুভূতিপ্রধান ছোটো ছোটো কবিতা গাওয়া হত, সেগুলির নাম ছিল লিরিক। এ অর্থে আমাদের বৈষ্ণব পদাবলি গীতিকবিতার উৎকৃষ্ট উপক্রমে সময়ের সলো সলো গীতি অনুষলা বর্ণিত হয়। করিমনের একান্ত অনুভবের ক্ষুদ্রাবয়র ছন্দ সমন্বিত ভাষারপগীতিকবিতা নামে অভিহিত হল। বঙ্কিমচন্দ্র ‘গীতিকবিতা'র সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, বিস্তার ভাবোচ্ছ্বাসের পরিস্ফুটনামাত্র যাহার উদ্দেশ্য, সেই কাবাই গীতিকাব্য।” রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “যাহাকে আমরা গীতিকাব্য বলিয়া থাকি, অর্থাৎ একটুখানির মধ্যে একটিমাত্রা ভাবের বিকাশ ..."। ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত 'গীতিকবিতা' সম্পর্কে বলেন, লিরিক কবিতার প্রধান ধর্ম মানুষের নিবিড় রসানুভূতিগুলিকে সে অতি ছোট আয়তনের ভিতরে প্রকাশ করে। ... ইহা বিশেষ করিয়া কবির ব্যক্তিপুরুষের প্রকাশ, তাই ইহা কবির নিজের কথা..... আধুনিক গীতিকবিতায় কবি হুদা হইতে হৃদয়ে কথা বলেন।

পাশ্চাত্যে এবং উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে দেখা গেল এই কবিতারূপের ব্যবহার। গীতিকবিতার মূল বিশেষত্ব ব্যক্তিমনের গভীর অনুভবের প্রকাশ। বহির্জগৎ কবিমনে প্রতিফলিত হয়ে নতুন জগৎ সৃষ্টি করবে এবং কবিতায় দেখা যাবে। গীতিকবিতায় গম্ভীর গভীর ও মধুর উভয় ভাবই রূপায়িত হতে পারে, যেমন—শোক, দেশপ্রেম, ব্যক্তিপ্রেম, বিরহ, ব্যক্তিপ্রশস্তি, অধ্যাত্মভাবনা—সবই হতে পারে গীতিকবিতার বিষয় আর গীতিকবিতার ভাষা হবে ভারস্পন্দন যুক্ত। গীতিকবিতার ছন্দ সামিল হতেও পারে নাও পারে। বাংলা গীতিকবিতার আবির্ভাবের মূলে আছে পাশ্চাত্য গীতিকবিতার (ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, স্কট, বায়রন, শেলি প্রমুখ) সলো বাঙালির নিবিড় পরিচয়।

মধুসূদন, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র—তিন মহাকাব্যকারই লিখেছিলেন কিছু কিছু গীতিকবিতা কিন্তু প্রথম সচেতন বাঙালি গীতিকবির নাম বিহারীলাল চক্রবর্তী। তাঁর রচনা পরবর্তী সময়ে বহু বাঙালি কবি বিশেষত তরুণ রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিল। বিহারীলাল সংস্কৃত ও ইংরেজি জানতেন। কিন্তু তাঁর কবিতায় বিদেশি প্রভাব তেমন নেই। স্বভাবত তিনি ছিলেন অনুভূতিপ্রবণ কবিচিত্তের অধিকারী। তাঁর কবিতা সংকলনের মধ্যে আছে 'সংগীতশতক (১৮৬২), 'বলাসুন্দরী' (১৮৭০) 'নিসর্গসন্দর্শন' (১৮৭০), 'বন্ধুবিযোগ' (১৮৭০), 'প্রেমপ্রবাহিনী' (১৮৭১), 'সারদামঙ্গাল' (১৮৭৯), 'সাধের আসন' (১২৯৫-১২৯৬ বঙ্গাব্দে— মাসিকপত্রে মুদ্রিত হয়), 'বাউল বিংশতি' (১৯২৪)।

'নিসর্গসন্দর্শন' (১৮৭০)-এ প্রকৃতিকে স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে কল্পনা করে তার সঙ্গে। সচেতন কবিসত্তার সম্পর্ক কল্পিত হয়েছে। 'বলাসুন্দরী' (১৮৭০)-তে অন্তঃপুরবাসিনী নারীকে মাতা, পত্নী, কন্যা ও ভগ্নীরূপে দেখেছেন এবং নারীর মুহরূপের সঙ্গে রোমান্টিক সৌন্দর্যের মিশ্রণ কাব্যটিকে করে তুলেছে অভিনব।

বিহারীলালের শ্রেষ্ঠ কীর্তি 'সারদামলাল' (১৮৭৯) যা রবীন্দ্রনাথকেও আলোড়িত করেছিল এবং এই গ্রন্থটি বাংলা কবিতার দিকবদলের একটি বিভাময় চিহ্ন।

কাব্যটির সূচনায় বাল্মীকির কবিত্ব লাভের রামায়ণ-কাহিনি বর্ণিত কিন্তু পরে সে কাহিনি অনুসৃত হয়নি।

সারদামঙ্গাল'-এ বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের সলো কবির ভাবজগতের অনুভূতির মিশ্রণ হয়ে উঠেছে রহস্যমিশ্রিত অপরূপ অনুভূতিবেদ্য কাব্য। সরস্বতীবিরহ, প্রীতিবিরহ এবং মৈত্রীবিরহ—এই তিন বিরহ-ই সারদামঙ্গাল-এর নেপথ্যচারিণী। বিহারীলাল অনুভুতিবিহ্বল কবিচিত্তের অধিকারী ছিলেন। তাই কবিতার বহিরা নির্মাণে স্থানে স্থানে শিথিলতা দেখা

যায়। তথাপি আবেগের সমুন্নত প্রকাশ, রহস্যময় সৌন্দর্যের ভাষারূপ—বিহারীলালকে গীতিকবিতার জনক করে তুলেছে। সমকালীন গীতিকবিদের মধ্যে বিহারীলালের অনুগামী হিসেবে বিশেষ উল্লেখ্য কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন ও অক্ষয়কুমার বড়াল।

রবীন্দ্র সমকালের এবং রবীন্দ্রসুহৃদ হলেও দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন পূর্ববর্তী যুগের গীতিকবি। তাঁর 'ঊর্মিলা কাব্য" (১৮৮২), অপূর্ব বীরাঙ্গনা' (১৯১২), 'অপূর্ব ব্রজাঙ্গনা' কাব্যে মধুসুদনের প্রভাব স্পষ্ট। তথাপি জীবনের স্বাভাবিক সহজ দিকগুলির মাধুর্য তার অনুভূতিলোককে আলোড়িত করেছিল। তাই তাঁর কবিতায়।

দেখা যায় পৃথিবী আর জীবন সম্বন্ধে আনন্দময় তদ্‌গত অনুভবের ভাষারূপ। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, ভালোবাসা, নারী আর সুন্দরের অনুভবের সঙ্গে দৈনন্দিন সংসার-জীবনও রূপায়িত হয়েছে। বাৎসল্য রসের কবিতাও লিখেছেন দেবেন্দ্রনাথ যা সে সময়ে খুব কম কবিই লিখেছেন। পুষ্প বিষয়ক কবিতা ও সনেট গীতিকবিতায় এই শিল্পসংহত দিকটিতে তিনি যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছেন। তাঁর কবিতায় ভাবের গাঢ় সংহত রূপ লক্ষিত হয়। ভাবাতিরেক বর্জন আর সরল সহজ জীবন ও অনুভবের রূপকার দেবেন্দ্রনাথ সেন তার এই গুণের জন্য আজও স্মরণীয়।

কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক হয়েও তাঁর কাব্যে নিজস্ব সুর ও ভঙ্গি বর্তমান। কিন্তু তাঁর মধ্যে।গীতিপ্রবণতার সঙ্গে মিশে ছিল মনন-প্রধান ক্লাসিকতা। তাঁর রচনা সংযত ও বিশ্লেষণ-প্রধান। মাত্র পাঁচটি কবিতাসংকলন আছে অক্ষয়কুমার বড়ালের। যথা—১. 'প্রদীপ' (১৮৮৪), ২. কনকাঞ্জলি (১৮৮৫), ৩. 'ভুল' (১৮৮৭), ৪. '' (১৯১০), ৫. 'এয়া' (১৯১২)। 'এমা' পত্নীবিয়োগ-জনিত স্মৃতি কবিতার সংকলন।

অক্ষয়কুমারের কবিতার মূল প্রেরণা গৃহজীবন, আবেগ-উত্তালতা নয়। অক্ষয়কুমারের কাব্যের অন্য বিশেষত্ব মানব মহিমার বন্দনা—'নমি তোমা নরদেব'। প্রেম ও প্রকৃতি অক্ষয়কুমারের কবিতার মূল অবলম্বন। অক্ষয়কুমারের নিবিড় প্রকৃতি চেতনা রূপ লাভ করেছে বহু কবিতায়, সর্বত্রই প্রকৃতিরূপের সঙ্গে আপন অনুভব যুক্ত করেছেন তিনি। অভিজ্ঞতাকে অনুভবের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পেরেছেন বলেই তিনি গীতিকবি হতে পেরেছেন এবং অনুভবের এই রূপায়ণের দিক দিয়ে তিনি বিহারীলাল চক্রবর্তীর অনুগামী।