অধ্যায়-21.B, কাব্য সাহিত্য ও কবিতা

মধুসূদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য"।

বাংলা সাহিত্যে প্রথম আধুনিক লিরিক কবিতা ("আত্মবিলাপ) মধুসুদন দত্ত লিখেছিলেন।

তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য' (১৮৬০) ও 'চতুর্দশপদী কবিতাবলি' (১৮৬৬)।

তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যের আগে 'পদ্মাবর্তী' নাটকে কলির সংলাপে কয়েকটি ছত্রে তিনি এই হবে প্রয়োগ করেন।

নয়টি। এই কাব্যের 'অশোকবন' নামাঙ্কিত চতুর্থ সগটি অতি প্রয়োজনীয়।

কবি 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এ একথা বলেছেন। বীর রসাত্মক মহাকাব্য লিখবেন বলে একথা বলেছেন।

মধুসুদনের তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যের চরিত্র।

জগদ্বন্ধু ভদ্র নামে এক কবি (?) ছুছুন্দরীবধকাব্য' (১ম সর্গ) রচনা করেছিলেন, যা প্রকাশিত হয় ১২৭৫। সালে বাংলা 'অমৃতবাজার পত্রিকা'র আশ্বিন সংখ্যায়।

মধুসূদন এ কাব্যে রাধার প্রকৃত যে ভাবমূর্তি তা সেইজন্য এটি বৈষব পদাবলি হতে পারেনি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি'। বৈষ্ণব পদাবলির আঙ্গিকে

লেখা একটি কাব্যগ্রন্থ।

 

রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের চারটি কাব্য হল—'কবি-কাহিনী', 'বনফুল', 'ভগ্নহৃদয়' ও শৈশব সংগীত।

‘গীতাঞ্জলি' (১৯১০) 'গীতিমাল্য' (১৯১৪) ও 'গীতালি' (১৯১৫) ঈশ্বরানুভূতির প্রকাশ ঘটেছে।

‘মানসী' (১৮৯০) কাব্যগ্রন্থ থেকে রবীন্দ্রকাব্যে নবপর্বের সুচনা ধরা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ‘Song Offerings' (গীতাঞ্জলি) নামক ইংরেজি অনুবাদ কাব্যের নোবেল প্রাইজ পান।

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে

'বলাকা' পর্বের তিনটি কাব্য হিসেবে নাম করা যায়—'বলাকা' (১৯১৬), 'মহুয়া' (১৯২৯) ও 'বনবাণী' (১৯৩১)।

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘জন্মদিনে’ অন্ত্যপর্বের কাব্য।

'পুনশ্চ' (১৯৩২), 'শেষ সপ্তক' (১৯৩৫), 'শ্যামলী' (১৯৩৬) ও 'আরোগ্য' (১৯৪১)। এই চারটি রবীন্দ্রনাথের শেষ পর্বের উল্লেখযোগ্য কাব্য।

রবীন্দ্রনাথের 'খাপ ছাড়া', এবং 'ছড়া ও ছবি' কাব্য দুটিতে লঘু হাস্যরসের পরিচয় পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ 'পুনশ্চ' কাব্যে প্রথম গদ্যছন্দ ও 'বলাকা' কাব্যে মুক্তক ছন্দ ব্যবহার করেন।

মৃত্যুর পর প্রকাশিত দুটি রবীন্দ্র-কাব্য হল— 'ছড়া' (১৯৪৩) ও 'শেষ লেখা' (১৯৪১)।

'মানসী', 'সোনার তরী', 'চিত্রা', ও 'চৈতালি'কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশেষ পর্বটিকে বলা হয় রবীন্দ্র কাব্যের ঐশ্বর্যপর্ব।

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের 'ওরা কাজ করে' কবিতাটি 'আরোগ্য' কাব্যের অন্তর্গত।

রবীন্দ্র-কাব্যে অধ্যাত্ম উপলব্ধির পর্ব হিসেবে 'গীতাঞ্জলি' পর্বের 'গীতাঞ্জলি', 'গীতালি', 'গীতিমাল্য'

প্রভৃতি) কাব্যগুলিকে বলা হয়।

'কথা' ও 'কাহিনী', কাব্যদুটিতে ভারতীয় পুরাণ ও ইতিহাস অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে।।

 

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ হে ছলনাময়ী।করি বিচিত্র ছলনাজালে।

মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে

সরল জীবনে।

('তোমার সৃষ্টির পথ) (কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কথিত ও রাণীচন্দ লিখিত। মৃত্যুর আট দিন পূর্বে জীবনদেবতার উদ্দেশে কবির শেষ অর্ঘ্য এটি।)

চারজন আধুনিক কবি হিসেবে মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জীবনানন্দ দাশ এর কথা বলা যায়।

(ক) মানুষের জৈবিক সম্পর্কের জটিল দিকটি দেখানো। (খ) মধ্যবিত্ত সমাজের আর্থিক অসচ্ছলতা সার্বিকভাবে জীবনের জটিলতাকে তুলে ধরা।

রবীন্দ্র-পূর্ব দুজন কবি হলেন—বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং অক্ষয়কুমার বড়াল (১৮৬০-১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ)।

রবীন্দ্র-সমসাময়িক দুজন কবি হলেন—নজরুল ইসলাম এবং সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।

যে সমস্ত কবি রবীন্দ্রনাথের ছত্রছায়ায় রবীন্দ্র কাব্যের ভাব, ভাষা, ছন্দ, লয় অনুসরণে কাব্য রচন করেছিলেন তাঁদের রবীন্দ্রানুসারী কবি বলা হয়। (যেমন—কালিদাস রায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক প্রমুখ কবি লেখো।

রবীন্দ্র-পরবর্তী চারজন কবি হলেন—জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) ও বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২)।

'বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে বলা হয়। তাঁর একটি বিখ্যাত কাবা হল

'সর্বহারা'।

'কুলিমজুর' ও 'বিদ্রোহী' যথাক্রমে 'সাম্যবাদী' ও 'অগ্নিবীণা' কাব্যের অন্তর্গত।

‘চক্রবাক' কাব্যের অন্তর্গত নজরুলের একটি প্রেমের কবিতা হল 'বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি' ।

আমার কৈফিয়ৎ' কবিতাটি 'বিজলী' পত্রিকায় ১৩৩২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।

নজরুলের চারটি কাব্য হল— 'অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী', 'সর্বহারা' ও 'ছায়ানট'।

নজরুলের কাব্য-কবিতার বিশেষত্ব হল, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি শাসন। শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা ও মানুষের জয়গান গাওয়া।

জীবনানন্দ দাশের জন্ম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ এবং মৃত্যু ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ।

জীবনানন্দ দাশের চারটি কাব্যগ্রন্থ হল— 'ঝরাপালক' (১৯২৭), 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' (১৯৩৬), বনলতা সেন (১৯৪২) এবং মহাপৃথিবী (১৯৪৪)।

জীবনানন্দ দাশের চারটি কবিতা হল—'রূপসী বাংলা' (কাব্য—'রূপসী বাংলা')। 'বনলতা সেন' (কাব্য— 'বনলতা সেন'), 'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি', ('রূপসী বাংলা'), 'আট বছর আগের একদিন' (কাবা 'মহাপৃথিবী')।

জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে ‘চিত্ররূপময়' বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বুদ্ধদেব বসু তাঁকে 'নির্জনতম কবি' বলেছেন।

‘রূপসী বাংলার কবি' বলা হয় জীবনানন্দ দাশকে।

বনলতা সেন' কবি জীবনানন্দ দাশের কাব্য-নায়িকা।

জীবনানন্দ দাশের দুটি উপন্যাস হল 'মালাবান' ও 'সুতীর্থ'।

জীবনানন্দ দাশের একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ হল— 'কবিতার কথা'।

জীবনানন্দ দাশের কবিতার বিশেষত্ব হল প্রেম-প্রকৃতি ও মৃত্যুর কথাকে সম্পূর্ণ নিজস্ব ভাব ও ভাষায় ব্যস্ত করা এবং ক্ষেত্রবিশেষে পরাবাস্তব জগৎকে তুলে ধরা।

জীবনানন্দ দাশের '১৯৪৬-৪৭' কবিতার চার লাইন উদ্ধৃত করা হল—

“দিনের আলোয় ওই চারিদিকে মানুষের অস্পষ্ট ব্যস্ততা পথে ঘাটে ট্রাক ট্রামলাইনে ফুটপাতে,

কোথাও পরের বাড়ি এখুনি নিলেম হবে—মনে হয়,

জলের মতন  দাম।"

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে, মৃত্যু ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটি হল 'তরী'।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের চারটি কাব্যের নাম হল—'অর্কেষ্টা' (১৯৩৪), ক্রন্দসী' (১৯৩৭), ‘সংবর্ত' (১৯৫৩) এবং 'দশমী' (১৯৫৬)।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের দুটি কবিতা হল— 'উটপাখি' এবং 'উত্তর ফাল্গুনী"।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের 'উটপাখি' কবিতাটি ১৯২৯-এর দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা।

বিশেষ উত্তা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্য কবিতার বিশেষত্ব হল – (ক) ব্যক্তিগত প্রেমানুভূতি, ইতিহাস ও সমাজচেতন পাশাপাশি সামাজিক ব্যাধি, যন্ত্রণা ইত্যাদিকে অস্থিরচিত্রতায় প্রকাশ করা।

'উটপাখী' কবিতার দুটি চরণ—"কোথায় লুকোবে ধু ধু করে মরুভূমি, ক্ষনো ক্ষয়ে ছায়া মরে গেছে পদতলে।"

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ এবং মৃত্যু ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ।

'পদাতিক' কাব্যের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে বলা হয় 'পদাতিক কবি'।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের চারটি কাব্য হল – 'অগ্নিকোণ' (১৯৪৮), 'চিরকুট' (১৯৫০), 'ফুল ফুটুক' (১৯৫৭)উত্তর এবং 'কাল মধুমাস' (১৯৬৬)।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের দুটি কবিতা হল — মিছিলের মুখ', 'স্বাগত'।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্য-কবিতার বিশেষত্ব হল, সমকালীন সমূহ ঘটনা, সাম্যবাদী চিন্তাভাবনা, মনুষ্যত্বের অবনমন ইত্যাদি বিষয়কে শিল্পরূপ দান করা।

'ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত' কবিতার দুটি চরণ— 'পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিনো হাসছে।'

যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, নজরুল ইসলাম প্রমুখ কবি রবীন্দ্র-প্রভাব উত্তরণের চেষ্টা করেছেন।

বিশ শতকের তিনের দশকে 'কল্লোল' (১৯২৩), 'কালিকলম' (১৯২৬), 'প্রগতি' (১৯২৭) এই

পত্রিকাগুলিকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্র ভাব-ভাষার বিরুদ্ধে সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়, একেই 'কল্লোল যুগ' বলে।

'কলোল যুগ'-এর লেখকদের রচনার বিষয় ও বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ 'লালসার অসংযম' ও 'দারিদ্রোর আস্ফালন' বলে উল্লেখ করেন।

'ভাঙার গান' (নজরুল ইসলাম), 'প্রলয়শিখা' (নজরুল ইসলাম), 'উত্তর ফাল্গুনী' (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত), 'দেবে 'মাল' (মোহিতলাল মজুমদার)।

ত্রিযামা' (যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত), 'সাম্যবাদী', (নজরুল ইসলাম), 'অগ্নিকোণ', (সুভাষ মুখোপাধ্যায়), ক্রন্দসী' (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত।)

বাংলা কবিতার জগতে মাইকেল মধুসুদন দত্ত সেই কবি, যিনি বাংলা কবিতার আঙ্গিক ও বিষয় সম্পর্কে এক বৈপ্লবিক কর্মসাধন করেছেন। এই কর্ম সম্পাদন করতে গিয়ে তিনি যা করেছেন, তা অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। অর্থাৎ দেশীয় পুরাণ বা ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা বা আকর্ষণের প্রাবল্য যেমন লক্ষণীয়, তেমনি ছিল ইউরোপীয় বা পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা ফলে তাঁর কাব্যসাহিত্যের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বৈচিত্র্য, ভাস্কর্যপ্রতিম হয়ে উঠেছে তাঁর কাব্য (যদিও দু-একটি ক্ষেত্রে কবি তাঁর সৃষ্ট-শিল্পকে সর্বাঙ্গসুন্দর করতে পারেননি)। সামগ্রিক বিচারে গণ্য হয়েছেন আপনার "ভাব-ভাষার গুণে স্বতন্ত্র। উম্মোচন করেছেন বাংলা সাহিত্যের এক নতুন দিগন্ত।

তাঁর প্রথম কাব্য 'তিলোত্তমাসম্ভব' প্রকাশিত হয় ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে। তার আগে অবশ্য প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কয়েকটি। নাটক ও প্রহসন। তাঁর উদ্ভাবিত অমিত্রাক্ষর ছন্দ (মিলটনের Paradise Lost এর Blank Verse-এর অনুরূপ) প্রবর্তিত হয়েছে তাঁর 'পদ্মাবতী' নাটকে। এখন সেই ছন্দই প্রকাশ পেল তাঁর এই প্রথম কাবো। আর এ কাব্যের কাহিনি। নির্মাণে পুরাণের (বা মহাভারতের) সুন্দ-উপসুন্দ ও তিলোত্তমাকে অবলম্বন করেছেন তিনি। তবে এ কাব্যে ছন্দ ছাড়া অন্য কোনো কিছুতেই মধুসূদনের প্রতিভার উপযুক্ত সৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায় না।

এরপরেই প্রকাশিত হয় মধুসুদনের যুগান্তকারী মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১)। এ কাব্যে দেশীয় ঐতিহ্য অনুসৃত হলেও গ্রিক বা পাশ্চাত্য প্রভাবও যথেষ্ট আর তাই কাব্যটি হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ আধুনিক একটি কৃত্রিম বা আলংকারিক বা সাহিত্যিক মহাকাব্য (Epic of Art)। এর কাহিনি অনুসৃত হয়েছে রামায়ণ থেকে। এখানে রাম ও রাবণকে তিনি প্রকাশ করেছেন ঐতিহ্যবিরোধীরূপে। বীর ও করুণরসের আশ্চর্য মিশ্রণ লক্ষিত হয় তাঁর এই মহাকাব্যে।

এই সমসময়েই (১৮৬১) তিনি প্রকাশ করেন একটি ভিন্নধর্মী কাব্য, যেখানে প্রকাশ পেয়েছে অপরূপ এক সাংগীতিক আবহ, ব্রিজাঙ্গনা কাব্য'। সমালোচক প্রবরের মতে, এ কাব্য সম্ভবত কবির সমসময়ে পঠিত 'গীতগোবিন্দ' ও বিদ্যাপতির রচনাবলি পাঠের ফলশ্রুতি। তবে Ode জাতীয় এই গীতিকাব্যটি অসম্পূর্ণ এবং এ কাব্যে রাধার বিরহ বৈচিত্র্য প্রকাশ পেলেও এখানে বৈপ্লব পদাবলীর মহাভাব স্বরূপিনী শ্রীরাধা' নেই এ রাধা 'মধুসূদন-পরিকল্পিত Poor Lady of Vraja' ।

১৮৬২-তে প্রকাশিত হয় কবির 'বীরাঙ্গনা কাব্য', যে কাব্যের ছায়া কায়া-নির্মাণে কবি রোমক কবি পাবলিয়াস ওভিডিয়াস ন্যাসোর Heroides (Heroic Epistles)-এর দ্বারা প্রভাবিত হন। ওভিডিয়াস তাঁর পত্রকাব্যে একুশজন নারীর কামনা-বাসনা-অভিযোগ ইত্যাদি যেভাবে চিত্রিত করেছেন, মধুসুদনও তদ্রূপ এগারোখানি পত্র (ইচ্ছা ছিল একুশটিই লিখবেন) নিয়ে রচনা করেন বীরাঙ্গানা। সোমের প্রতি তারা', 'দশরথের প্রতি কৈবেষী', 'নীলধ্বজের প্রতি জনা' প্রভৃতি পত্র এ কাব্যে উল্লেখ্য। এখানে প্রকাশ পেয়েছে মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য আর গীতিকবিতার গীতলতা। কাব্যটির গুরুত্ব বলতে এখানে উনিশ শতকীয় নারী জাগরণের ইঙ্গিত বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মধুসূদনের বিশেষত subjective আর একটি কাবা চতুর্দশপদী কবিতাবলী' প্রকাশিত হয় ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে। পেত্রার্ক শেকসপীয়র প্রমুখ বিখ্যাত কবির Sonnet-এর রীতিকে আত্মস্থ করে বাংলায় যে কবিতাগুলি তিনি লেখেন, তারা পাশাপাশি মিশ্ররীতিরও পরিচয় দেন তিনি। বেশিরভাগ কবিতাই রচিত হয় কবির ইউরোপ থাকাকালীন। এ কাব্যে মুখত বাংলা তথা দেশের কাব্য-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐত্যিকেই তুলে ধরেছেন তিনি।

তাঁর আর দুটি কবিতা 'আত্মবিলাপ' ও 'বঙ্গভূমির প্রতি' (দুটোই ১৮৬২ খ্রি. রচিত)-ও মন্ময়ধর্মী (subjective) রচনা, Lyric হিসেবে যা অনবদ্য। মূলত কবির ব্যক্তিজীবনের দুঃখ-হতাশা জীবন-মৃত্যু ইত্যাদি সম্পর্কিত মৃদুভাষণ এ কবিতা দুটিতে মূর্ত। আর আছে অপরূপ একটি এপিটাফ 'দাঁড়াও পথিকবর....।'

১৮৭৮-১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়সীমায় রচিত কাব্যগুলিকে রবীন্দ্রকাব্যের প্রথম পর্ব বা সূচনা পর্ব বলা হয়। এই সময় পরিধিতে যে কাব্যগুলি রচিত হয় তা হল— 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী' (১৮৮৪), 'কবিকাহিনী” (১৮৭৮), 'বনফুল' (১৮৮০), 'ভগ্নহৃদয়' (১৮৮১) ও 'শৈশব সংগীত' (১৮৮২)। এই পর্বে রচিত কাব্যগুলির বৈশিষ্ট্য নিম্নলিখিত ভাবে আলোচনা করা যায়— (১) এই পর্বের কাব্য-কবিতায় বিহারীলাল চক্রবর্তী, অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ কবির রচনার প্রভাব লক্ষ করা যায়। পরিণত বয়সে কবি স্বয়ং একথা স্বীকার করেছেন।

(২) এই যুগে রচিত কাব্য-কবিতায় কবি আপন হৃদয়ে আত্মমগ্ন থেকে রোমান্টিক বিষাদ, ভাব-ব্যাকুলতা, একাকিত্বেরবেদনা প্রভৃতিকে প্রকাশ করেছেন।

(৩) বনফুল'-এ, বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সম্পর্কের কথা বলেছেন। (৪) কবির ১৫-১৬ বছর বয়সে রচিত কবিকাহিনী -তে নিকটের প্রতি কবির শ্রদ্ধা নিবেদিত। এখানে কবির রুদ্ধ আকাঙ্ক্ষা সাবলীলভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

(৫) ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী' কাব্যটি বৈষব পদাবলির অনুকরণে রচিত। তবে 'মরণ', ‘প্রশ্ন' প্রভৃতি কবিতা বেশ ভাবাবেগপূর্ণ।

(৬) নাটকাকারে লিখিত হলেও 'ভগ্নহৃদয়' আসলে একটি গীতিকাব্য। নারীর রূপকে এ কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি। (৭) সন্ধ্যাসংগীত থেকেই রবীন্দ্রনাথের কাব্যস্রোত ক্ষীণভাবে শুরু হয়েছে। এর পূর্বে রচিত সকল কাব্যকে তিনি কাব্যগ্রন্থাবলি থেকে বাদ দিতে চেয়েছেন। এই পর্ব রবীন্দ্রনাথের কবি-মানসের অগ্রগতির স্তরগুলিকে স্পষ্ট করে। এই পর্বেই মহা-কবির পদস-স্থার শুনতে পাওয়া ।

রবীন্দ্র-কাব্যের ঐশ্বর্য পর্ব বলা হয় ১৮৮৬-১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়সীমাকে। এই পর্বের প্রধান কাব্যগুলি হল—'মানসী' (১৮৯০), 'সোনার তরী' (১৮৯৪), 'চিত্রা' (১৮৯৬) এবং 'চৈতালি' (১৮৯৬)। এই কাব্যগুলি সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল। ■ মানসী : 'মানসী' কাব্য থেকেই কবি নিজের সম্বন্ধে সজাগ হয়েছেন, দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের কল্পনাকে প্রকাশ করতে আরম্ভ করেছেন। কবি ঘোষণা করেছেন, এই কাব্যে কবি ও শিল্পীর যোগাযোগ লক্ষণীয়। কবি উচ্চারণ করেছেন,

এ চিত্র জীবন তাই আর কিছু কাজ নাই রচি শুধু অসীমের সীমা/ আশা দিয়ে ভাষা দিয়ে, তাহে ভালবাসা নিয়ে তুলি মানসীপ্রতিমা।” এ কাব্যের কবিতাগুলিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—প্রেমের কবিতা, দেশ সম্পর্কিত কবিতা, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা সম্পর্কিত কবিতা। • সোনার তরী : রবীন্দ্রনাথের মর্ত্যপ্রীতি, মানবর্তীতির বিশেষ পরিচয় বহন করে 'সোনার তরী' কাব্যটি। প্রতি', 'বসুন্ধরা', 'পরশ পাথর' প্রভৃতি কবিতায় কবির মর্ত্যপ্রীতির সুগভীর পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন—সমুদ্রের প্রতি কবিতা বলেছেন—আমি পৃথিবীর শিশু বসে আছি তব উপকূলে, শুনিতেছি ধ্বনি তব। 'বসুন্ধরা' কবিতায় বলেছেন—আমারে ফিরায়ে অগ্নি বসুস্থরে, কোলের সন্তানে ভর কোলের ভিতরে বিপুল অঞ্চল তলে।

'সোনার তরী' কাব্যে কবির জীবনদেবতা ভাবনা একটি বিশেষ প্রসঙ্গ। মৃত্যু ভাবনা এ কাব্যের আর একটি বিশেষ দিক। 'যেতে নাহি দিব', 'সোনার তরী' প্রভৃতি কবিতায় জীবনের প্রতি মমতা লক্ষণীয়। সীমার মাঝে বন্দি থেকেও অসীমের প্রতি মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা এ কাব্যের দুইপাখি', 'ঝুলন' প্রভৃতি কবিতায় বাণীরূপ লাভ করেছে। • চিত্রা : 'চিত্রা' কাব্যটি শুধু বাংলা সাহিত্য নয় বিশ্বসাহিত্যেও তুলনারহিত। এ কাব্যের 'চিত্রা', 'জীবনদেবতা, 'সিন্ধুপারে', 'উর্বশী', 'বিজয়িনী' প্রভৃতি কবিতায় কবির পরিপক্ষ মনের শান্ত সমাহিত ভাবাবেগের পরিচয় পাওয়া যায়। এ কাব্যে বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে "মানসসুন্দরী জীবনদেবতা-তত্ত্ব প্রেম ও সৌন্দর্য সম্বন্ধে অনুভূতি অনন্ত সৌন্দর্যের স্তবগান প্রভৃতি বিষয়।" (ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত) • চৈতালি। এ কাব্যের অধিকাংশ কবিতা সনেট জাতীয়। 'চৈতালি' কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় অতি সাধারণ নরনারী জীবনের প্রতি মমত্ব দেখিয়েছেন। মর্ত্যপ্রেম ও বৈরাগ্যহীন জীবনপ্রীতি এ কাব্যে ফুটে উঠেছে, কবি দেখিয়েছেন মানবসেবাতেই পুণ্য, তাতেই দেবতার পূজা— যারে বলে ভালবাসা তারে বলে পুজো।

রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর কবি। ভাবরসেই তাঁর আত্মা পরিতৃপ্তি লাভ করেছে। রবীন্দ্র-প্রতিভার উজ্জ্বল দীপ্তিতে বাংলা সাহিত্যের দশদিগন্ত আলোকিত হয়ে উঠেছিল। কাব্য-কবিতায় তাঁর সদর্প পদচারণা অন্য কবিদের কাব্য-সাধনার। পথকে কঠিন করে দিয়েছিল। তিনি মাত্র বারো বছর বয়স থেকে সাহিত্য রচনা শুরু করে দীর্ঘ আশি বছর পর্যন্ত কারণ কবিতার যে মণিহার আমাদের উপহার দিয়েছেন তা কয়েকটি পর্বে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে।

সূচনা পর্ব : ভৃত্য-শাসনতন্ত্রের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের মানুষ হওয়া, পিতার কষিসুলভ আচরণ ও জীবন দর্শন, জ্যোতি দাদার সহজ সান্নিধ্য বালক রবীন্দ্রনাথকে কবি হয়ে ওঠার পথে বিশেষ সাহায্য করেছিল। এই পর্যায়ে রচিত ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী' (১৮৮৪), 'শৈশব সংগীত' (১৮৮২), প্রভৃতি প্রধান। এই সময়ের কাব্যগুলিতে কৰি পলিপ্রকৃতির রূপচিত্র ও রোমান্টিক মনের পরিচয় রেখেছেন।

৯ উন্মেষ পর্ব : ১৯৮২-৮৬ সাল পর্যন্ত সময় সীমায় রচিত কাব্যগুলিতে মাটির পৃথিবীর কথা মুখ্য হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যা সংগীত' (১৮৮২) 'প্রভাত সংগীত' (১৮৮৩) 'ছবি ও গান' (১৮৮৪) প্রভৃতি এই পর্বের কাব্য। এ কাব্যে কবি তাঁর 'হৃদয়-অরণ্য' থেকে মুক্ত হয়ে উদাত্ত কণ্ঠে নতুন উপলব্ধির অবারিত আনন্দ প্রকাশ করেছেন : হ্রদয় আজি মোর কেমন গেল খুলি/জগৎ আমি সেথা করিছে কোলাকুলি।”

• ঐশ্বর্য পর্ব : ৩০-৩৫ বছর বয়সের মধ্যে লেখা 'মানসী' (১৮৯০), 'সোনার তরী', (১৮৯৪), চিত্রা (১৮৯৬) প্রভৃতি কাব্যেতে কবি প্রেম ও প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন। 'সোনার তরী-তে কবি তাঁর কাব্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে ধরতে চেয়েছেন। 'চিত্রা'-তে বাইরের সঙ্গে অন্তরের সীমার সঙ্গে সীমাতীতের মিলন ঘটাতে চেয়েছেন। আর চৈতালি'-তে পরিপূর্ণ জীবনের আনন্দ ও ঐশ্বর্যের সন্ধান করেছেন। ॥ অন্তবর্তী পর্ব এই পর্বের 'কথা' (১৯০০), 'কাহিনী' (১৯০১) 'নৈবেদ্য', 'স্মরণ' প্রভৃতি কাব্যে রবীন্দ্রনাথ নিসর্গ প্রেম, সৌন্দর্য ও জীবনদেবতা ভাবনায় বিশেষভাবে ভাবিত হয়েছেন। ● গীতাগুলি পর্ব : 'গীতাঞ্জলি' (১৯১০), 'গীতিমালা' (১৯১৪), 'গীতালি' (১৯১৫) এই তিনটি নিয়ে গীতাগুলি পর্ব। কবি এই পর্বে তাঁর ঈশ্বর চিন্তার স্বরূপ প্রকাশ করেছেন। এর আগেই 'খেয়া' কাব্যে কবিকে দেখা গিয়েছিল, তিনি বাস্তবের এই রুঢ়কঠিন জগৎ থেকে যাত্রা শুরু করেছেন রহস্যময় অন্তর্লোকে। এই পর্বে তাই কবি সম্পূর্ণভাবে তার অন্তদেবতাকে প্রিয়তম বন্ধুরূপে বিভিন্ন মানবরসের মধ্যে উপলব্ধি করেছেন। বলাকা পর্ব ; এই পর্বে রচিত রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুলি হল—'বলাকা' (১৯১৬) 'পূরবী' (১৯২৫) এবং 'মহুয়া' (১৯২৯)। এ কাব্যগুলিতে রবীন্দ্রনাথের প্রৌঢ় জীবনের দার্শনিক প্রত্যয়ের দিকটি ধরা পড়েছে। জীবনবোধের দীপ্তিতে এই পর্বের কাব্য-কবিতাগুলি সমৃদ্ধ। • অন্ত্যপর্ব অন্ত্যপর্বের কাব্যের মধ্যে প্রান্তিক' (১৯৩৮), 'রোগশয্যায় (১৯৪০) 'আরোগ্য' (১৯৪১), 'জন্মদিনে' (১৯৪১) প্রভৃতি প্রধান। এ পর্বে তাঁর প্রজ্ঞা ও বাস্তব সচেতনার মধ্যে এক ঐক্যবোধ গড়ে উঠেছে। মৃত্যু সম্পর্কে কবি তাঁর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি এখানে তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্র এবং রবীন্দ্রোত্তর যুগের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় কবি নজরুল ইসলাম। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে 'বিজলী' পত্রিকায় তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতাটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই একদিকে তিনি যেমন বাংলা কবিতার আসরে প্রিয় কবি হিসেবে পাঠক মহলে আদৃত হন তেমনি উত্তরণ প্রয়াসী অগ্নিস্রাবী রচনার জন্য কারারুদ্ধও হন। তিনি ছিলেন সমাজের কাছে একজন দায়বদ্ধ (committed) কবি। রবীন্দ্র স্নেহধন্যও ছত্রচ্ছায়ায় থেকেও এইখানেই তাঁর সঙ্গে তাঁর পার্থক্য। এমনকী সমকালীন জীবনানন্দ দাশ, যিনি অনুচ্চকণ্ঠের কবি, সেখানে নজরুল ছিলেন তাঁর বিপরীত।

তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অগ্নিবীণা' (১৯২২), 'বিষের বাঁশী (১৯২৪), 'সাম্যবাদী' (১৯২৫), সর্বহারা' (১৯২৬), ‘ফণীমনসা' (১৯২৭), চক্রবাক' (১৯২৯), 'সন্ধ্যা' (১৯২৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্র-প্রতিভার মধ্যগগনে আবির্ভূত হয়েও নজরুল আপন প্রতিভাবলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করেছিলেন। নজরুলের কাব্য বৈশিষ্ট্যের যে যে বিশেষ দিকগুলি আমাদের চোখে পড়ে তা সংক্ষেপে আলোচনা করা হল—

(১) নজরুলের কাব্যে সমকালীন যুগ্ম-সমাজের ছবি ধরা পড়েছে। শুধুমাত্র কাব্যের জন্য কাব্য রচনা করে তিনি ক্ষান্ত থাকেননি। যুগের চাহিদা তাঁর কাছে বড়ো ছিল, 'অমর কাবা' লিখে তিনি কবিত্বের আসনে চিরকাল টিকে থাকতে চাননি। 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার', 'মানুষ', 'বিদ্রোহী' প্রভৃতি তার উদাহরণ। নজরুলের কাব্য হল উত্তেজনার আগুন; সমাজ ও জীবনকে অনুভব করে তার স্বরূপকে তিনি কাব্যে তুলে ধরেছিলেন। এ কারণে পাঠকের কাছে তা বেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।

(৩) নজরুলই প্রথম যিনি কবিতার মধ্য দিয়ে সোচ্চার বিপ্লব ও বিদ্রোহের বাণী শোনালেন। মানুষের মুখে তিনি প্রতিবাদের ভাষা এনেছিলেন। 'কুলিমজুর' কবিতায় তার বিশদ পরিচয় লক্ষণীয়। (৪) নজরুল বাংলা কবিতাকে সাধারণ মানুষের সম্পত্তিতে পরিণত করেছিলেন। কাব্য-কবিতা শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিতজনের সামগ্রী হয়ে থাকল না।

(৫) কাব্যে ভাষা ব্যবহারে তিনি ছিলেন খুব সাহসী : আরবি, ফারসি, উর্দু প্রভৃতি ভাষার শব্দকে তিনি স্বচ্ছন্দে বাংলা কবিতায় ব্যবহার করেছেন। তাঁর কাব্যে হিন্দু পুরাণ ও ইসলামি বিশ্বাসজাত ইতিহাস ও ধর্মের ছবি রয়েছে। "অগ্নিবীণা' কাব্যে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

(৬) নজরুলের কাব্যে আছে সংগীতের সুর মূর্ছনা। 'চোখের চাতক', 'বনগীতি' প্রভৃতি গীতিসংকলনও তিনি রচনাকরেছেন। প্রেমের কবিতা রচনার ক্ষেত্রে সমান কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। (৭) কাব্যের রস রহস্যলোক তৈরি করার চেয়ে তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, আক্রমণাত্মক আর মানবতাপত্রী, সেজনা তিনি পৌঁছে গেছিলেন সরবয়সী পাঠকের কাছে। কারণ শান্তিকামী মানুষ সকলেই উপলব্ধি করেছেন নজরুল। শুধুমাত্র তাঁদেরই প্রতিনিধি, যিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বাস্তবিকই দাঁড়াতে পারেন।

এই সমস্ত কারণে নজরুল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। রবীন্দ্রনাথকে বা করে নিয়েও তিনি কাবা রচনায় আপন পথ নির্মাণ করে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত।

রবীন্দ্র সাহিত্যরসে নিমজ্জিত হয়েও রবীন্দ্রপ্রভাবকে বর্জন করে রবীন্দ্রনাথের জীবৎকালেই সাহিত্যসাধনার প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন এবং স্বতন্ত্রতার পরিচয় রেখেছেন বলে নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রেতর কবি' বিশ্লেষণে বিশেষিত হয়ে থাকেন।

● কাব্যের নাম: অগ্নিবীণা' (১৯২২), 'দোলন-চাঁপা' (১৯২৩), বিষের বানী (১৯২৪), 'ভাঙার গান' (১৯২৪), 'ছায়ানট(১৯২৫), 'সাম্যবাদী' (১৯২৫), 'পুবের হাওয়া' (১৯২৬), ঝিঙে ফুল' (১৯২৬), 'সর্বহারা' (১৯২৬), 'ফণিমনসা' (১৯২৭),'সিন্ধু-হিন্দোল' (১৯২৭), সবিতা' (১৯২৮), চক্রবাক (১৯২৯), 'সন্ধ্যা' (১৯২৯) প্রভৃতি।, কবিপ্রতিভা : বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কাজি নজরুল ইসলাম বিশ শতকের তৃতীয় দশকের বেশ খানিক সময় বাংলা সাহিত্য ও পাঠকসমাজে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। রবীন্দ্রযুগে এ ঘটনা খুব সহজ ছিল না। প্রথাগত শিক্ষাদীক্ষার সীমাবদ্ধ পরিধিকে অতিক্রম করে নিজস্ব অন্তর্নিহিত দুরন্ত প্রাণাবেগ ও বিষয়-বৈচিত্রো, কল্পনায় তিনি এক দশকের সময়সীমায় ধূমকেতুর মতোই অতর্কিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং বিদ্রোহের বহ্নি জ্বালিয়ে সহসা দুরারোগ্য ব্যাধির আক্রমণে নিষ্প্রভ হয়ে। গিয়েছিলেন।তাঁর রচিত কবিতাসমূহকে সাধারণভাবে দুটি ভাগে ভাগ করা চলে- (ক) বিষয়নিষ্ঠ ও বক্তব্য প্রধান এবং (খ) ব্যক্তিনিষ্ঠ ওকল্পনাপ্রধান। প্রথম শ্রেণির কবিতাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'বিদ্রোহী', 'ফরিয়াদ', 'সাম্যবাদী', 'অন্ধ স্বদেশ দেবতা", "কাণ্ডারী হুঁশিয়ার' প্রভৃতি। এগুলির মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা ও বিদ্রোহের বহ্নি অনুভব করা যায়। আবার দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত কবিতা হিসেবে আমাদের মনে পড়ে যেতে পারে বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি', 'গানের আড়াল' প্রভৃতি রচনাকে। এছাড়া নজরুল বেশ কিছু শিশু-বিষয়ক কবিতা রচনা করেছেন, যেমন—'খুকী ও কাঠবিড়ালী', 'প্রভাতী', 'লিচু-চোর', 'ঝুমকো লতায় জোনাকী প্রভৃতি। এসব রচনায়ও তাঁর কবিপ্রতিভার স্পর্শ অনুভব করা যায়।

বহুল আরবি, ফারসি ও ইসলামি শব্দের ব্যবহার, ছন্দের প্রয়োগ, সমসাময়িক কালের দুরন্ত প্রেক্ষাপটকে তিনি কবিতায় ব্যবহার করলেও দুঃখের কথা কবিতার পরিণতির দিকে তাঁর তত লক্ষ ছিল না। তাই তাঁর অনেক কবিতাই কবি-সমালোচক সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুর মতে 'ভাবালুতায় আবিল, অনর্গল অচেতন বাক্যবিন্যাসে রুদ্ধ স্রোত। তবে বুদ্ধদেব বসু যেহেতু পাশ্চাত্য কাব্য পাঠের অভিজ্ঞতা-দর্শন থেকে কবিতাকে মূল্যায়ন করেছিলেন সেজন্যে নজরুল সম্পর্কে তাঁর অভিযোগ ঠিক নয়। সময় তা প্রমাণ করেছে।

উনিশ শতকের শেষার্ধে জন্মগ্রহণ করে বাল্যজীবন বহু বিপর্যয় ও স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করে পুথিগত শিক্ষায় অধিক শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ থেকে বর্ণিত এক কবি উত্তরকালে রবীন্দ্র-প্রতিভা যখন মধ্যগগনে বিরাজমান সে সময় নিজের প্রতিভার স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছিলেন। তিনি কবি কাজি নজরুল ইসলাম ।

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে সাপ্তাহিক 'বিজলী' পত্রিকায় তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে তিনি রাতারাতি প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। দুরারোগ্য মস্তিষ্কজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত দীর্ঘকাল থাকলেও উত্তরকালে তিনি কোনো করতে পারেনি। ফলে তাঁর সাহিত্যজীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। আবির্ভাবকালেই প্রচণ্ড, বলিষ্ঠ, সোচ্চার উচ্চারণে বাংলা কবিতার শরীরে এক নতুন প্রবাহ স্যারণ করেছিলেন। কবিতার ভাষার মাধ্যমে, বক্তব্যের উপস্থাপনায় অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে, সামাজিক শোষণ পীড়নের প্রতিবাদে তিনি তাঁর কবি-প্রতিভাকে নিয়োগ করেছিলেন। তবে ভগি বড়ো অশান্ত, মানুষের মাহাত্ম্যের জয়গান তাঁর রণিত হয়েছে। সামাজিক অবিচার শোষণের বিরুদ্ধে বিধাতার স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধেও তিনি কেননা বিধাতাই সর্বজয়ী মানব-মহিমা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড়ো বাধা। 'অগ্নিবীণা', 'বিষের বাঁশী', ‘সাম্যবাদী', 'সর্বহারা', 'ফণিমনসা' 'প্রলয়শিয়া' প্রভৃতি উগ্র স্বাদেশিকতাবোধ, সাম্যবাদ বিদ্রোহী চেতনার জাগরণ তাঁকে 'বিদ্রোহী' অভিধায় ভূষিত করে। এটিই নজরুলের পরিচয় নয়।

তাঁর কবিতার একটি অংশ কল্পনাবিলাসী, প্রেমিক, সৌন্দর্যপিপাসু এমনকী ভক্তিগতপ্রাণ। 'দোলন চাপা', 'ছায়ানট", 'পুবের হাওয়া', হিন্দোল', 'সন্ধ্যা', 'চক্রবাক্স' প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায় দ্বারা প্রভাবিত  হয়েছিলেন।

জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থের 'ঝরা পালক' (১৯২৭) 'ধূসর পান্ডুলিপি' (১৯৩৬)।

• কবিতার বৈশিষ্ট্য জীবনানন্দের কাব্যের একদিকে রূপে ব্যবহৃত হয়েছে প্রেম প্রকৃতি, অন্যদিকে ইতিহাসচেতনা দেশপ্রাণতা জন্ম দিয়েছে একাধিক স্মরণীয় কবিতার। প্রাবন্ধিক জীবনানন্দের রচনাতেই তাঁর সৃষ্টির উৎসের কারণ আবিষ্কার করা চলে পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থির থাকবে ইতিহাসচেতনা মর্মে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান। ইমেসিজম, সিম্বল স্যুররিয়েলিজমের সঙ্গে জীবনের ব্যাখ্যাতীত জীবনের বিষণ্ণতা, ইতিহাসের মধ্যে খোঁজার প্রয়াস চারিদিকে আসন্ন হেমন্তের প্রেক্ষাপটে বেদনার রং তাঁর কবিতাকে রোমান্টিক অনুভূতির বিচিত্র রূপ-রস-গন্ধের হতে পারে ব্যক্তি-প্রেম। যেমন—

'সুচেতনা, তুম দূরতর

বিকেলের নক্ষত্রের কাছে

সেইখানে দারুচিনি-বনানীর

নির্জনতা ..... তবুও তোমার আমার হৃদয়।

এই স্বপ্নের হাতে ধরা দিতে পারার হতাশায় কবিতায় ব্যক্তি-মানুষ বস্তুজগতের সঙ্গে আত্মার দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। উটের গ্রীবার মতো এক নিস্তব্ধতা এসে ব্যক্তিমানসকে মুহূর্তের জন্যে অধিকার বালেই 'আট আগের একদিন' কবিতার মানুষটি বধু এবং সান্নিধ্যে থাকলেও আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। মৃত্যুচেতনা তাঁর কবিতাতে। এক মুখা। তাঁর কবিতায় নির্জনতার নিরবচ্ছিন্ন অবকাশ গড়ে ওঠার মূলে প্রকৃতির নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্য লক্ষ করা যায়। তাঁর কবিতাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন 'চিত্ররূপময়'। বর্ণবিন্যাসের অভিনবত্বে সনেটধর্মী কবিতায় চিত্রকর অভিনব আঙ্গিকের যৌথ সহাবস্থান ঘটেছে। রবীন্দ্রোত্তর কবি জীবনানন্দ শুধু কাব্যবস্তুতে কাব্যনির্মিতিতেও অনন্যসাধারণ। তাঁর কাব্যভাষায় বাকুরীতির ১৭৮ মুক্তধ্বনির ব্যবহার এড়িয়ে তিনি সাদামাটা বাংলা শব্দ ব্যবহার করে তাদের ব্যল্পনার সাহায্যেই অসাধারণ সব ভাষাচিত্র এঁকেছেন। যেমন—

"আমি চলে যাব, তবু জীবন অগাধ তোমারে রাখিবে ধরে সেইদিন পৃথিবীর পরে আমার সকল গান তবুও তোমাকে লক্ষ করে।

 

রবীন্দ্রনাথের মন ও মননপ্লাবী কাব্যমণ্ডলে বাঙালি পাঠক যখন মগ্ন তখন নতুনতর মাত্রায় আরেক নতুন দিগন্তের সন্ধানে গত শতকের তিনের দশকে যে কজন কবি বেরিয়ে পড়লেন পরিক্রমণে তাদের অন্যতম জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪ খ্রি.)। রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে, এক অনন্য কাব্যভাষা নির্মাণ করে, নিজেকে ঐতিহ্যাশ্রয়ী সবরকমের প্রভাবমুক্ত করে তুলেছেন। পরবর্তী বাংলা কবিতার জগতের ওপর তিনি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন।

স্বপ্নরনিতা (romanticism), অতীতচারিতা ( nostalgia), চেতনা-নিসর্গ, সমাজ, সময়, ইতিহাস (consciouness-nature, society, time, history), বিষণ্নতা ( melancholy), চিত্রকল্প (imagery), অস্পষ্টতা (obscurity) রবীন্দ্রোত্তর পর্বে জীবনানন্দের কবিতায় এইসব বিছুরণগুলির প্রাপ্তি রবীন্দ্রনিরপেক্ষ মেজাজ ও মেধায়। যেমন একটি কবিতায়—"জ্যোৎঙ্গা রাতে বেবিলনের রানির ঘাড়ের উপর ভিতর উজ্জ্বল চামড়ার ডালের মতো জ্বলজ্বল করছিল বিশাল আকাশ।কাল এমন আশ্চর্য রাত ছিল। বোঝাই যায় রবীন্দ্র কাব্যভাষার বহু দূরতম অবস্থানে রয়েছে এই ভাষা। এক নতুনতম বাংলা ভাষা অপরূপ চিত্রে জীবন ও প্রকৃতির গাঢ়তম ঘনিষ্ঠতায় প্রকাশ পেল জীবনানন্দের কলমে

মেঠো চাঁন রয়েছে তাকায়ে

আমার মুখের দিকে, ডাইনে আর বাঁয়ে

পোড়ো জমি যত পাড়া মাঠের ফাটল

শিশিরের জল।'

সমসাময়িক কবি বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিন্নু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো জীবনানন্দও সমসাময়িক পশ্চিমি কবিদের প্রস্তাবিলাস ও দুর্বোধ্যতাকে ব্যবহার করেছেন তাঁর কবিতায় কিন্তু ধানসিঁড়ি নদী, কামরাত্তা-লাল মেঘ, ঝিনুকের গায়ে আলপনা, বাঁশের ছ্যাঁদার গুণ, মধুকূপী ঘাস, হিজলের ক্লান্ত পাতা, মেঠো পথ দিয়ে গোরুর গাড়ির মন্থর চলে। যাওয়ার দিকেও তাঁর চোখ পড়েছে। তাঁর কবিতায় ভাবের যেমন বহু স্তর আছে ভাষারও বহু স্তর আছে—সেখানে বাইরের আপাত সারল্যের ভিতরেই রয়ে গেছে এক দুর্বোধ্য জটিলতা বৈচিত্র্য : যাকে শিল্পেরই এক শর্ত বলে ভাবা যেতে পারে।

সাহিত্যের অমরত্বের সূত্রগুলি তাঁর কবিতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, নিয়ত দৃশ্যের জন্ম হয় আবার সেই দৃশ্যকর কবিতার ভাবকল্পের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। স্বাজাত্যের বিনাশ, ব্যক্তিত্বের বিনাশ, 'মেসিন প্রতিম অধিনায়কের' তথাকথিত যন্ত্রসভ্যতার দাপট, আইন, প্রতিষ্ঠান, মতবাদ বা আজকের সভ্যতার মানুষকে মানবিকতায় উত্তীর্ণ না করে তার বিনাসের কারণ হয়ে উঠেছে—এক ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবির মতো জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় অনেক আগেই তাকে ভাষারূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন।

রবীন্দ্র-পরবর্তী কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে জীবনানন্দ দাশের নাম বিতর্কহীনভাবে উচ্চারিত হয়। এক সময় বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিখ্যাতির পাশে জীবনানন্দ দাশ কিছুটা ম্রিয়মান ছিলেন। এই সমস্ত কবিদের পাশে তাঁকে কিছুটা শান্ত, প্রকৃতিপ্রেমিক, কিছুটা অস্পষ্ট কুহেলি ঘেরা, রোমান্টিক বলে মনে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সাহিত্য সমালোচক এবং কাব্য-ভাবুকদের আলোচনা ও ব্যাখ্যায় কবির নান্দনিক মহিমা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর কাব্যের মধ্যে ঝরা পালক' (১৯২৭), ধূসর পাণ্ডুলিপি' (১৯৩৬), 'বনলতা সেন' (১৯৪২), 'মহাপৃথিবী' (১৯৪৪) ‘সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮), প্রভৃতি প্রধান। জীবনানন্দ দাশের এমন কয়েকশো কবিতা আছে, যা কাব্যাকারে প্রকাশিত হয়নি ।

• জীবনানন্দের কাব্যবৈশিষ্ট্য : জীবনানন্দের কবিতায় জীবনের প্রতি, মানুষের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি একইসঙ্গে প্রেম ও ঘৃণা এবং অবহেলা সমানভাবে কাজ করেছে। তাঁর কবিতা বাইরে থেকে কোমল বলে মনে হলেও ভিতরে ভিতরে কবি উত্তেজিত, ক্লান্তিতে ভরা।

দেখা যায় তাঁর কবিতার একদিকে আছে আত্মহননের তীব্র আগ্রহ আর অন্যদিকে আছে বাঁচার বাসনা। তাই কবি প্রেমিকা নায়িকা বনলতা সেনের একটু সান্নিধ্য পাবার জন্য 'হাজার বছর ধরে পথ হাঁটতে পারেন। কবি অজস্র রঙের, সব কটা ইন্দ্রিয় উপভোগের, ইন্দ্রিয় বিপর্যয়ের চিত্র একাধিক বার অঙ্কন করেছেন। যেমন ‘হয়তো বা হাঁস হবো—কিশোরীর ঘুঙুর রহিবে লাল পায়, সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।

তাঁর কবিতার হাজার বছরের গতি এবং স্তব্ধতা, অতীত ইতিহাসের রূপচিত্র এমনভাবে অঙ্কিত হয়েছে যা আমাদের কাছে সুদূর অতীতকে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করে। যেমন— '১৯৪৬-৪৭' কবিতাটির কথা প্রসঙ্গত বলা যায়।

জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতিপ্রেমিক কবি। প্রকৃতির মাঝে তিনি জীবনকে ও জীবনের আনন্দকে খুঁজেছেন। প্রসজাত তাঁর।

'রূপসী বাংলা' কাব্যের কবিতাগুলির কথা বলা যায়।

তাঁর কাব্য-কবিতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল মৃত্যুচেতনা। জীবন সম্পর্কে তাঁর গভীর উপলব্ধির কথা একাধিক কবিতায় ধরা পড়েছে। যেমন— 'রূপসী বাংলা, 'আট বছর আগের একদিন', 'পাখিরা' প্রভৃতি কবিতার মৃত্যুচেতনার দিকটি বিশেষভাবে সক্রিয়।

জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় জীবন ও প্রকৃতির ছোটো ছোটো যেসব চিত্র অঙ্কন করেছেন তা বেশ জীবন্ত। যেমন—'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি', 'বনলতা সেন' প্রভৃতি কবিতার কথা বলা যায়।

তাই জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্র-পরবর্তী কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি।

সম্ভবত আধুনিক কবিদের মধ্যে পাঠকসমাজে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত আজও স্বল্প পঠিত হয়। রবীন্দ্র-সান্নিধ্য লাভের কারণে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই সুধীন্দ্রনাথ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'তন্ত্রী' (১৯৩০ খ্রি.)-তে সমকালীন অপর আধুনিক কবিদের মতোই রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবান্বিত ছিলেন। এই কাব্যে প্রথম যৌবনের আবেগ-প্রবণতা ও রূপানুরাগের উৎসার ঘটেছে, ‘শ্রাবণকন্যা”, “বর্ষার দিনে' প্রভৃতি কবিতা তার প্রমাণ। তখনও পর্যন্ত তার স্বভাবজ যুক্তাক্ষর বহুল তৎসম শব্দের গাঢ় গাম্ভীর্য ও উদ্ধত মহিমা কবিতায় দেখা যায় না।

পরবর্তী 'অর্কেস্ট্রা' (১৯৩৫) কাব্য থেকেই তাঁর স্বকীয়তার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। এই কাব্যে তিনি রবীন্দ্রনাথের একাধিক পত্তিকে মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে জ্ঞানে-অজ্ঞানে ব্যবহার করেছেন। যেমন— যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে/সব সঙ্গীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া (রবীন্দ্রনাথ) আর 'সংখ্যার রাগ ছিন্ন মেঘের অন্তরে/অ্যারমণি প্রেমলোকে ক পুণা...' (সুধীন্দ্রনাথ)। 'ক্রন্দসী' (১৯৩৭) কাব্যের অনেক কবিতা “অর্কেষ্টা'র সমকালে রচিত হলেও পার্থক্যে প্রায় বিপরীত অর্কেষ্ট্ৰীয় আছে ক্ষণস্থায়ী প্রেমের চিরকালীন আর্তি, ক্রন্দসী'-তে আছে রুঢ়-নিষ্ঠুর, হিয়ে-উন্মত্ত পৃথিবীর প্রতি ২১ দৃষ্টিক্ষেপ। এখানে দেখা যায় কখনও নিষ্ফল স্বপ্ন, কখনও মর্মবিদারী হতাশা, আবার কখনও অসহ্য প্রতিবাদের ভঙ্গিমা। 'উত্তরফাল্গুনী' (১৯৪০) কাব্যটি মূলত যৌবনগত প্রেমের আর্তি। সংবর্ত' (১৯৫৩) কাব্যটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত। পৃথিবীতে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে স্বার্থপরতা, সুবিধাবাদ, ক্ষমতা, দম্ভের প্রকাশ দেখে সুধীন্দ্রনাথের প্রতিে কলম লিখেছে। 'অণুবিদারণে শত সহস্র মানুষ হত, ব্যক্ত অভিব্যক্তিবাদের ফাঁকি'। এই কাব্যের ভাষার ব্যবহারে ক বিস্ময়কর পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। দশমী' (১৯৫৬) কাব্যের দশটি কবিতায় কবি অনুভব করেছেন "বিরূপ বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী।

সুধীন্দ্রনাথের কাব্যের গঠনরীতি ধ্রুপদী। গদ্যছন্দে কবিতা রচনায় তিনি উৎসাহ বোধ করেননি। শুধু অপ্রচলিত শ তিনি ব্যবহার করেননি, প্রয়োজনসাপেক্ষে নতুন শব্দও গঠন করেছেন। শব্দসাধনায় ফরাসি করি মালার্মে-কে তিনি অধি মনে করেছেন। তাঁর কবিতায় শব্দগত জটিলতা আছে সন্দেহ নেই কিন্তু তাকে অতিক্রম করে তাঁর কবিতার কাব্যাস্বাম সম্ভব। পুরাণ-প্রসঙ্গা ব্যবহার তাঁর কবিতার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য।

বিন্তু ও বিদ্যার উত্তরাধিকার নিয়ে বাংলা কাব্যজগতে আবির্ভূত হয়েছিলেন ক্ষণজন্মা কবিপুরুষ সুধীন্দ্রনা দত্ত। 'প্রবাসী' পত্রিকায় সামান্য একটি 'কুকুট'-কে বিষয় করে জীবনের প্রথম প্রকাশিত কবিতায় তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রশসে ও স্নেহ অর্জন করেছিলেন। আধুনিক পৃথিবীর সমস্যা ও জীবনসত্য সন্ধান, দর্শন ও বিজ্ঞানের বহুমুখী বিস্তার, প্রাটন ভারতীয় দর্শনের যথাযথ গুরুত্ব, মনোবিজ্ঞানের আবিষ্কার — পাশ্চাত্য চিন্তা-পদ্ধতির সমস্ত রকম প্রবণতাকে সাঙ্গীকৃত করে বাংলা কাব্যচর্চার জগতে প্রবেশ করেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ।

এলিয়ট, মালার্মে, ভ্যালেরি প্রমুখ কবির কাব্য-নির্মাণকলার অনুভবী পাঠক এই কবি অধীত, অর্জিত অভিজ্ঞতাবে বাংলা কারো বিস্তৃত করলেন। জীবনের দ্বিতীয় কাব্য 'অর্কেস্ট্রা' কাব্যের বাইশটি কবিতায় সাতটি সংগীতের সাক্ষী। সংগীতধ্বনি নায়কের মনে যে স্মৃতি বা অনুষঙ্গের জন্ম দিয়েছে তার কথা বলেছেন। প্রবহমান অমিল পয়ার ছলে পর তারাগুলি এই কাবো বিন্যস্ত হয়েছে। এই কাব্যে রবীন্দ্রানুরাগী সুধীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের একাধিক পত্তিকে মৌলিকত বজায় রেখে জ্ঞানে-অজ্ঞানে ব্যবহার করেছেন। ধ্বনি- সাম্যমর বাক্যের ব্যবহার এই কাব্যে লক্ষ করা যায় যার মধ্য দিয়ে। শব্দ-সচেতন সুধীন্দ্রনাথকে আমরা চিনে নিতে পারি।

পরবর্তী কারা উত্তরফাল্গুনী'-তেও আছে সুধীন্দ্রীয় ভাষারীতির কারুকার্য, ধ্রুপদী রীতির উজ্জ্বল্য যেমন—'স্মৃি মিশর বীজ মন্ত্রস্তরে যথারীতি ম’জে'। আবার 'সংবর্ত" কাব্যে মত্ত ক্ষমতা প্রবল দম্ভের বিরুদ্ধে কবির প্রতিবাদী কা আমরা শুনতে পাই : 'রুশের রহস্যে লুপ্ত লেনিনের মমি, হাতুড়ি নিষ্পিষ্ট ট্রটস্কি, হিটলারের সুহৃদ স্টালিন, মৃত স্পেন, ম্রিয়মান চীন, কবন্ধ ফরাসীদেশ।

ধ্রুপদী গঠনরীতি, ব্যঞ্জনাধর্মী প্রতীকী কাব্যাদর্শ, শব্দের অর্থময়তা বিষয়ে সচেতনতা, জীবনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, দৈনন্দিন জীবনের বাগরীতি থেকে ভিন্নধর্মী বাগীতির ব্যবহার তাঁর রচিত কাব্যদেহকে কঠিন কঠোর ভাস্কর্যের রূপ করেছে। ভাব ও রূপকল্পের দিক থেকে সুধীন্দ্রনাথ বাংলা কাব্যজগতে এক স্বতন্ত্র আস্বাদনের প্রবর্তনা করলেন সন্দেহ নেই।

ছাত্রজীবন থেকে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সংযোগ জীবনকে অন্যভাবে অনুভব করার প্রেরণা জুগিয়েছিল। যে কবিকে তিনি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কাব্যচর্চাকে তিন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা চলে—কাব্য, অনুবাদ-কাব্য ও ইয়া তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের মধ্যে উল্লেখ্য—কাব্য : 'পদাতিক' (১৯৪০) 'অগ্নিকোণ' (১৯৪৮), 'চিরকুট' (১৯৫০), 'ফুল ফুটুক (১৯৫৭), “যত দূরেই যাই' (১৯৬২), 'কাল মধুমাস' (১৯৬৬), 'এই ভাই' (১৯৭১), 'ছেলে গেছে বনে' (১৯৭২), এবং পা চালিয়ে ভাই' (১৯৭৯), 'ভল সইতে' (১৯৮১), 'চইচই চইচই' (১৯৮৩), 'বাঘ ডেকেছিল' (১৯৮৫), “যা রে কাগজের নৌকা' (১৯৮৯), 'ধর্মের কল' (১৯৯১), 'নতুন কবিতার বই' (২০০৮)। অনুবাদ কাব্য 'নাজিম হিকমতের কবিতা" (১৯৫২), 'দিন আসবে' (১৩৭৬ বাদ), 'পাবলো নেরুদার কবিতাগুচ্ছ (১৩৮০ বঙ্গাব্দ), 'গুলবাস সুলেমেনভ-এর রোগা ঈগল' (১৩৮১ বন্ধ্যাব্দ), নাজিম হিকমতের আরো কবিতা' (১৩৮৬ বঙ্গাব্দ) 'পাবলো নেরুদার আরো কবিতা' (১৩৮৭ বঙ্গাব্দ), হাফিজের কবিতা' (১৯৮৪), 'চর্যাপদ' (১৯৮৬), 'অনরুশতক' (১৯৮৮)। ছড়া: 'মিউ-এর জন্য ছড়ানো ছিটানো' (১৯৮০)। একুশ বছর বয়সে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'পদাতিক' কাব্যটির সমালোচনায় বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন: "সুভাষ বোধ হয় প্রথম বাঙালি কবি যিনি প্রেমের কবিতা লিখে কাব্যজীবন আরম্ভ করলেন না, এমনকি প্রকৃতি বিষয়ক কোনো কবিতাও লিখলেন না।" এই স্বাতন্ত্র্যের প্রমাণ হিসেবে একটি কবিতার কিয়দংশ উদ্ধার করা যেতে পারে। 'পদক্ষেপ কেবলি চ গ্রামে গণ্ডে শহরে বাজারে দুর্জয় সংকর নেয় হাজারে হাজারে।"

পরবর্তীকালে কবির কাব্যে রাজনৈতিক চেতনার পরিবর্তে কবিভাবনা প্রাধান্য পেতে থাকে। ত্রুটিমাত্র কবিতায় প্রথিত ক্ষুদ্রকায় 'অগ্নিকোণ' কাব্যগ্রন্থে কবির রাজনৈতিক চেতনার চূড়ান্ত উত্তরণ, এখানে কবি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুক্তিযুদ্ধের সংবাদে উদবেলিত – 'লক্ষ লক্ষ হাতে / অন্ধকারকে দু'টুকরো ক'রে/ অগ্নিকোণের মানুষ / সূর্যকে ছিঁড়ে আনে। আবার 'ফুল ফুটুক' নামকরণের মধ্যেই আছে কবির দিক পরিবর্তনের আভাস। পরিণতির সুর স্পষ্ট আবেগের উঁচু পর্দায় কবিতার সুরে পাঠককে ডাকার রীতির পরিবর্তনে। এই সময়পর্বেই নাজিম হিকমতের কবিতা' অনুবাদকর্মে নিয়োজিত হয়ে সুভাষ উপলব্ধি করেন 'সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্শনে জীবন প্রতিফলিত। এই খাঁটি জীবনেরই প্রতিফলন 'যত দূরেই যাই', 'কাল মধুমাস' পর্বেও। সাম্যবাদের ছক-বাঁধা বিশেষণ পরিত্যাগ করে কবি সুভাষের নতুন চিত্রকল্প নির্মাণের প্রয়াস কথ্য গদ্যের চালে— আরে মুখুজ্যে মশাই যে। নমস্কার কী খবর? আর এই লেখা-টেখা সংসার-টৎসার নিয়েই ব্যস্ত' চরিত্র ও ঘটনার নাটকীয়তা, ছোটোগল্পের কথন-রীতি তাঁর কবিতার আঙ্গিককে ব্যাপ্তি ও গভীরতা দান করল। বোঝাই যায় কবিতার আঙ্গিক নির্মাণে তিনি বিশেষ মনোযোগী হয়েছেন। পুরাণ-প্রতিমা, চিত্রকল্প, ভাষা, ছন্দ, স্তবক বিন্যাসে অভিনবত্ব তাঁর কবিতায় বৈচিত্র্য এনে দিল। রূপকথা- লোককথা প্রসকাত, লৌকিক বিশ্বাসের প্রতিফলন তাঁর কবিতাকে পাঠকের কাছে এক অন্যতর জগতের সন্ধান দিল। যেমন তারপর যেতে যেতে যেতে এক নদীর সঙ্গে দেখা'

থু

থু

থু

এই একটি শব্দে

গলা চিরে

এবার আমি আগুন ওগরার',

বাংলা কবিতার ইতিহাসে তাঁকে 'পদাতিক'-এর কবি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস থাকে কিন্তু তিনি চির-পদাতিক। তাই তিনি বারবার নিজেকে নিত্যনতুন পথে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন।