'আনন্দমঠ' কি ধরনের উপন্যাস? 1
' আনন্দমঠ' তত্ত্ব ও দেশাত্মবোধক উপন্যাস।
'অমরনাথ' ও 'লব্যলতা' চরিত্রদুটি বক্তিমের কোন উপন্যাসের অন্তর্গত ? 1
'রজনী' উপন্যাসের।
'রজনী' উপন্যাস রচনায় বঙ্কিমচন্দ্র কোন বিদেশি রচনাকে অনুসরণ করেছেন ? 1
লিটন ৰচিত The Last Deys of Pompeii-a নিদিয়া নাম্নী অন্য ফুলওয়ালির কাহিনিকে।
'বিষ' উপন্যাসে প্রধান কয়েকটি চরিত্রের নাম লেখো। 1
কুন্দনন্দিনী, নগেন্দ্রনাথ ও সূর্যমুখী।
কিছুকান্তের উইল' উপন্যাসের মুখ্য চরিত্রগুলির নাম কী ?
গোবিন্দলাল, ভ্রমর ও রোহিনী।
দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের প্রধান আকর্ষণ কি ? 1
মানসিংহের পুত্র জনাৎসিংহ, পাঠানকন্যা আজো আর গড় মান্দারা দুর্গের অধিপতি বীরেন্দ্র সিংহের কন্যা তিলোত্তমার পারস্পরিক আকর্ষণ।
নবকুমার, পদ্মাবতী (মতিবিবি) কোন উপন্যাসের চরিত্র ? 1
'কপালকুণ্ডলা।'
'বিষবৃক্ষ' উপন্যাসের বিনা ? 1
নগেন্দ্রনাথ পত্নী-সূর্যমুখীর প্রেম-ভালোবাসা পেয়েও বালবিধবা ও আশ্রিতা কুন্দনন্দিনীর প্রতি আস তাকে পত্নীত্বে বরণ। সূর্যমুখী গৃহত্যাগী। কুন্দনন্দিনী বিষপানে আত্মত্যাগী। পুনশ্চ সূর্যমুখী ও নগেন্দ্রের মিলন ।
কমকান্তের উইল' উপন্যাসের বিষয় কী ?1
স্ত্রী-ভ্রমর থাকা সত্ত্বেও গোবিন্দলাল বালবিধবা-রোহিনীর প্রতি আসক। পরে গোবিন্দলালের হাতে (পিস্তলের গুলিতে) রোহিনীর মৃত্যু। ভ্রমরের মৃত্যুশয্যায় গোবিন্দলাল উপস্থিত এবং ঈশ্বরের চিন্তায় মনোনিবেশ।
ঠাকুর কতগুলি উপন্যাস লিখেছেন? 1
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট ১২-খানি উপন্যাস লিখেছিলেন। (সেগুলি হল—'বৌঠাকুরাণীর হাট' (১৮৮৩), 'রাজর্ষি' (১৮৮৭), 'চোখের বালি' (১৯০৩), 'নৌকাডুবি' (১৯০৬), 'যোগাযোগ' (১৯২৩), 'গোরা' (১৯১০), 'ঘরে বাইরে' (১৯১৬), 'চার অধ্যায়' (১৯৩৪), 'চতুরঙ্গ' (১৯১৬), 'শেষের কবিতা' (১৯২১), 'দুইবোন' (১৯৩৩), 'মাল' (১৯৩৪), এ ছাড়া তাঁর 'করুণা' নামে আর একটি উপন্যাস আছে, যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। এটি 'ভারতী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।)
রবীন্দ্রনাথের দুটি ঐতিহাসিক রোমান্সধর্মী উপন্যাসের নাম দেখো।। 1
'বউঠাকুরানীর হাট' (১৮৮৩) এবং 'রাজর্ষি' (১৮৮৭)।
রাজর্ষি' উপন্যাসে কোন রাজার কথা আছে? 1
রবীন্দ্রনাথের 'রাজর্ষি' উপন্যাসে ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দমাণিক্যের কথা আছে।
স্বাধীন্দ্রনাথের দুটি সামাজিক উপন্যাসের নাম । 1
রবীন্দ্রনাথের দুটি সামাজিক উপন্যাস হল 'চোখের বালি' (১৯০৩) এবং 'নৌকাডুবি' (১৯০৬)।
'চোখের বালি" উপন্যাসের হারটি ছবিতে নাম লেখা। 1
"চোখের বালি' উপন্যাসের চারটি চরিত্র হল- মাহেন্দ্র, বিনোদিনী, আশালতা ও বিহারী।।
'গো'রা (১৯১০) জাতীয় উপন্যাস? এর চারটি চরিত্র
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গোরা' সামাজিক উপন্যাস, একে মহাকাব্যিক উপন্যাসও বলা চারটি চরিত্র হল—গোৱা, বিনয়, পরেশবাবু, আনন্দময়ী, সুচরিতা।
রবীন্দ্রনাথের দুটি রাজনৈতিক উপন্যাসের নাম লেখো। 1
রবীন্দ্রনাথের দুটি রাজনৈতিক উপন্যাস হল- "ঘরে বাইরে ও চারা অন্যায়"।
যোগাযোগ' উপন্যাসের পূর্ব নাম কি ছিল? ১
রবীন্দ্রনাথের 'যোগাযোগ' উপন্যাসের পূর্বনাম ছিল তিনপুরুষ'।
রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক দুটি উপন্যাসের নাম লেখে।? ১
দুটি রোমান্টিক উপন্যাস হল—'শেষের কবিতা' এবং 'মাল্য'।
রবীন্দ্রনাথের চারটি উপন্যাসের নাম করে তাদের দুটি করে চরিত্র উল্লেখ করো।? 1
'নৌকাডুবি'—রমেশ, কমলা, 'যোগাযোগ'—কুমুদিনী, মধুসুদন 'শেষের কবিতা - অমিত লাবণ্য 'মালঞ্চ'- নিরজা ,সরলা।
রবীন্দ্রনাথের দুটি মনস্তত্ত্ব প্রধান উপন্যাসের নাম লেখো।।1
রবীন্দ্রনাথের দুটি মনস্তত্ত্ব প্রধান উপন্যাস হল—'চোখের বালি' ও 'যোগাযোগ'।
রবীন্দ্র-উপন্যাসগুলিকে প্রকৃতি অনুযায়ী কয় ভাগে ভাগ করা যায়? 1
রবীন্দ্র-উপন্যাসগুলিকে তাদের প্রকৃতি অনুযায়ী মোটামুটিভাবে ৪ ভাগে (ঐতিহাসিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক
'ও রোমান্টিক) ভাগ করা যায়।
রবীন্দ্রনাথের একটি কাব্যধর্মী উপন্যাসের নাম বলো। 1
রবীন্দ্রনাথের একটি কাব্যধর্মী উপন্যাস হল—'শেষের কবিতা' (১৯২৯)।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প-সংকলন এগুলির নাম লেখো। 1
রবীন্দ্রনাথের গল্প-সংকলন গ্রন্থগুলি হল—'গল্পগুচ্ছ', 'গল্পস্বপ্ন', 'লিপিকা' ও 'তিনসঙ্গী'।
রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম পর্বের (১৮৯১-১৯০১) চারটি গল্পের নাম লেখো। 1
রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম পর্বের ৪টি গল্প হল–কক্কাল, অতিথি, একরাত্রি ও কাবুলিওয়ালা।
রবীন্দ্রনাথের তিনসঙ্গীর গল্পগুলি কি কি? 1
রবীন্দ্রনাথের "তিনসঙ্গী'র গল্পগুলি হল—'রবিবার', ‘শেষকথা' ও 'ল্যাবরেটরি'।
পারিবারিক জীবনের ছবি আছে রবীন্দ্রনাথের এমন তিনটি ছোটোগল্পের নাম লেখো। 1
'দেনাপাওনা', 'নষ্টনীড়', 'ত্যাগ'—এইসব গল্পে পারিবারিক জীবনের ছবি পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাথের চারটি অতিপ্রাকৃতরসের গল্পের নাম লেখো। ? 1
রবীন্দ্রনাথের দুটি অতিপ্রাকৃতরসের গল্প হল— 'কঙ্কাল', 'ক্ষুধিত পাষাণ', 'জয় পরাজয়', 'মণিহারা'।
রবীন্দ্রনাথের দুটি রাজনৈতিক চেতনাযুক্ত গল্পের নাম লেখো। 1
রবীন্দ্রনাথের দুটি রাজনৈতিক চেতনাযুক্ত গল্প হল—'মেঘ ও রৌদ্র' এবং 'রাজটীকা'।
রবীন্দ্রনাথের একটি সমাজসমস্যামূলক গল্প ও একটি রূপকথামূলক গল্পের নাম লেখো। 1
রবীন্দ্রনাথের একটি সমাজসমস্যামূলক গল্প হল— 'দেনাপাওনা' এবং রুপকথামূলক গল্প হল— হল
আষাঢ়ে গল্প'।
'ছোটো প্ৰাণ ছোটোব্যথা ছোটো ছোটো দুঃখ কথা নিতান্ত সহজ সরল..... ছোটোগল্প সম্পর্কে একথা রবীন্দ্রনাথ কোথায় বলেছেন ? 1
'সোনার তরী' কাব্যের 'বর্ষাযাপন' কবিতায়।
রবীন্দ্র-সমসাময়িক চারজন ছোটোগল্পকারের নাম লেখো। 1
রবীন্দ্র-সমসাময়িক চারজন ছোটোগল্পকার হলেন - শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরী, পরশুরাম (রাজশেখর বসু)।
রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে-র রচনারীতি কেমন ? 1
'ঘরে বাইরে' উপন্যাসটি আত্মকথন ভঙ্গিতে লেখা। যেমন—নিখিলেশ, সন্দীপ, বিমলা অধ্যায়ে নিজের কথা বলেছে এবং অধ্যায়গুলির শিরোনামও সেইভাবে চিহ্নিত।
'অমল' ও 'চারুলতা'র কথা কোন রচনায় আছে ? 1
'নষ্টনীড়' রচনায়।
'নষ্টনীড়' কী ধরনের রচনা ? 1
'নষ্টনীড়' ছোটোগল্পের অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ এটি ছোটোগল্প। আকার-আয়তনে এটি দীর্ঘ হওয়ায় বড়ো গে হতে কোনো বাধা নেই। তবে অণু-উপন্যাসও বলা যায়।
'ছুটি' গল্পটিতে কোন চরিত্র প্রাধান্য পেয়েছে ? 1
ফটিক নামে একটি শিশু চরিত্র প্রাধান্য পেয়েছে ।
'কাবুলিওয়ালা' গল্পে কী প্রাধান্য পেয়েছে ? 1
একটি পিতৃত্ব।
রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু গল্পে বাংলাদেশের কোন কোন স্থান ছায়াপাত করেছে ? 1
বাংলাদেশের শিলাইদহ, পাতিসর আর সাজাদপুর।
রবীন্দ্রনাথের কোন উপন্যাসে লালন ফকিরের গান ব্যবহৃত ? 1
'গোরা' উপন্যাসে [গানটি হল : খাঁচার ভিতর অচিন পাখি...] ।
'রাজর্ষি উপন্যাসে কোথাকার ঘটনা উল্লেখিত ? 1
ত্রিপুরার রাজপরিবারের ঘটনা।
শরৎচন্তা কোন ছদ্মনামে কোন রচনাটি লেখেন ? 1
পরা নারীর মূল্য' প্রবন্ধটি অনিলা দেশী ছদ্মনামে লেখেন।
শরৎচন্দ্রের চারটি উপন্যাসের নাম লেখো। 1
'পল্লীসমাজ' (১৯১৬), 'চরিত্রহীন' (১৯১৭), 'দেনাপাওনা' (১৯৯৩) ও 'পণের সানী' (১৯২৬)।
শরৎচন্দ্রের দুটি সামাজিক উপন্যাসের নাম লেখো।? 1
'পল্লীসমাজ' ও 'দেনাপাওনা'।
শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী' কী ধরনের উপন্যাস ? 1
শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী' রাজনৈতিক উপন্যাস।
'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের চারটি নারী চরিত্রের নাম লেখো।? 1
রাজলক্ষ্মী, অভয়া, কমললতা ও আমদাদিদি।
শরৎচন্দ্রের চারটি উপন্যাস ও প্রতিটি উপন্যাসের একটি করে নারী চরিত্রের নাম লেখো। 1
'গৃহদাহ'—অচলা, 'দেনাপাওনা'— ষোড়শী, 'পল্লীসমাজ'– রমা, 'শ্রীকান্ত' কমললতা, কমল।
'পথের দাবী' উপন্যাসের দুটি চরিত্রের নাম লেখো। 1
শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী' উপন্যাসের দুটি চরিত্র হল — অপূর্ব ও নিমাই কাকাবাবু।
শরৎচন্দ্র তাঁর কোন প্রথম ছোটোগল্পটির অন্য কোন পুরস্কার পান? 1
শরৎচন্দ্র তাঁর প্রথম 'মন্দির' (১৯০২) ছোটোগল্পটির জন্য 'কুত্তলীন পুরস্কার' পান।
শরৎচন্দ্রের দুটি বিখ্যাত ছোটোগল্পের নাম লেখো। 1
শরৎচন্দ্রের দুটি বিখ্যাত ছোটোগল্প হল—'মহেশ' ও 'অভাগীর স্বর্গ।
শরৎচন্দ্রের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসটি কী? 1
শরৎচন্দ্রের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসটি হল— 'শ্রীকান্ত' (প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্ব)।
শরৎচন্দ্রের দুটি মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাসের নাম লেখো। 1
শরৎচন্দ্রের দুটি মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাস হল ——'চরিত্রহীন' ও 'গৃহদাহ'।
শরৎচন্দ্রের চারটি পারিপারিক উপন্যাসের নাম বলো। 1
শরৎচন্দ্রের চারটি পারিবারিক উপন্যাস হিসেবে 'পরিণীতা' 'বিন্দুর ছেলে' 'পল্লীসমাজ' ও 'বৈকুণ্ঠের উইল' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শরৎচন্দ্রের দুটি মতবাদপ্রধান উপন্যাসের নাম লেখো। 1
শরৎচন্দ্রের দুটি মতবাদপ্রধান উপন্যাস হল—'পথের দাবী' ও 'শেষপ্রশ্ন"।
প্রকাশকালসহ শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসটির নাম লেখো। 1
১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসটি হল 'বড়দিদি'।
সমাজ সমালোচনামূলক শরৎচন্দ্রের দুটি উপন্যাসের নাম লেখো। 1
'শেষপ্রশ্ন' ও 'চরিত্রহীন'।
শরৎচন্দ্রের রচনা-বৈশিষ্ট্য কেমন ? 1
শরৎচন্দ্র মূলত গ্রামীণ সমাজজীবনের রূপকার এবং সেইসঙ্গে সমকালীন বৃহত্তর সমাজ-দেশ-কানা চরিত্র ইত্যাদি আরও নানা সমস্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষক-সাহিত্যকার ।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি উপন্যাসের নাম লেখো। 1
'দিবারাত্রির কাব্য' (১৯৩৫), 'পুতুল নাচের ইতিকথা' (১৯৩৬), 'পদ্মানদীর মাঝি' (১৯৩৬), সুর (১৯৪৮)।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকৃত নামসহ 'কল্লোলের কুলবর্ধন' উপাধিটি কার দেওয়া লেখো। 1
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত প্রদত্ত 'কল্লোলের কুলবর্ধন' উপাধিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকৃত নাম গুর বন্দ্যোপাধ্যায়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি উপন্যাস ও প্রতিটির দুটি করে চরিত্রের নাম লেখো। 1
‘দিবা-রাত্রির কাব্য'—সুপ্রিয়া, হেরম্ব; 'পুতুল নাচের ইতিকথা'—শশী, কুসুম 'পদ্মানদীর মাঝি'—কুবের, কপিলা ; 'শহরতলী'—যশোদা, সত্যপ্রিয়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৪টি ছোটোগল্প ও প্রতিটির দুটি করে চরিত্রের নাম লেখো। ?1
‘প্রাগৈতিহাসিক'—ভিখু ও পাঁচী; 'সরীসৃপ'—চারু ও বনমালী ; 'শিল্পী'—ভুবন ও মদন; যাকে ঘুষ দিতে হয়'—সুশীলা ও মাখন।
তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি গল্পের নাম লেখো। ? 1
'হারানের নাতজামাই' (১৯৪৮) ও 'ছোট বকুলপুরের যাত্রী'
'বৌ' গল্প সংকলনের দুটি গল্পের নাম লেখো। 1
পৃষ্ঠরোগীর বৌ', 'কেরাণীর বৌ', 'তেজী বৌ' প্রভৃতি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি জৈব-প্রবৃত্তি নির্ভর গল্পের নাম করো। 1
সরীসৃপ' ও 'প্রাগৈতিহাসিক'।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি রাজনৈতিক ছোটোগল্পের নাম লেখো। 1
ছোট বকুলপুরের যাত্রী' ও 'হারানের নাতজামাই' মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি বিখ্যাত রাজনৈতিক
(১৯৪৯)।
প্রকাশকালসহ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাসটি কী? 1
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাসটি হল 'পথের পাঁচালী'।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি উপন্যাসের নাম লেখো। 1
'পথের পাঁচালী' (১৯২৯), 'অপরাজিত' (১৯৩২), 'আরণ্যক' (১৯৩৮), আদর্শ হিন্দু হোটেল' (১৯৪০)।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি গল্প-সংকলনের নাম বলো। 1
'মেঘমল্লার' (১৯৩১), 'মৌরীফুল' (১৯৩২), 'যাত্রাবদল' (১৯৩৪) ও 'কিন্নরদল' (১৯৩৮)।
'অপরাজিত' কোন উপন্যাসের পরবর্তী অংশ? 1
'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের পরবর্তী অংশ 'অপরাজিত'।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি উপন্যাসের নাম উল্লেখ করে প্রতিটির দুটি করে চরিত্রের নাম লেখো। 1
'পথের পাঁচালী'—অপু, দুর্গা; 'অপরাজিত'—অপু, অপর্ণা ; 'আরণ্যক'—সত্যচরণ, ভানুমতী, ‘বিপিনের সংসার' (১৯৪১)-মানী, বিপিন।
বিভূতিভূষণের তিনটি গল্পের নাম উল্লেখ করে প্রতিটির দুটি করে চরিত্রের নাম লেখো। 1
‘মৌরীফুল'—সুশীলা, কিশোরীলাল ; 'দ্রবময়ীর কাশীবাস'-দ্রবময়ী, নীরজাসুন্দরী ; 'পুঁইমাচা'—–ক্ষেন্তি, অন্নপূর্ণা।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা-বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো। 1
তাঁর রচনা-বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃতির আধারে আধৃত মানুষের জীবনালেখ্য রচনা।
বাংলা সাহিত্যে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় কে কে? 1
তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান চারটি উপন্যাসের নাম লেখো। 1
‘কালিন্দী' (১৯৪০), 'গণদেবতা' (১৯৪২), 'পঞ্চগ্রাম' (১৯৪৩) এবং 'হাঁসুলী বাঁকের উপকথা' (১৯৪৭)।
তারাশঙ্করের যে-কোনো চারটি ছোটোগল্পের নাম লেখো। 1
নারী ও নাগিনী', 'তারিণী মাঝি', 'ডাইনি', 'দেবতার ব্যাধি' ও 'জলসাঘর'।
তারাশঙ্করের প্রথম ছোটোগল্পটি কী? 1
'রসকলি' তারাশঙ্করের প্রথম ছোটোগল্প |
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি উপন্যাসের দুটি করে চরিত্রের নাম লেখো। 1
‘ধাত্রীদেবতা' (১৯৩৯)—শিবনাথ, রাখাল সিংহ ; 'গণদেবতা' (১৯৪২)–শ্রীহরি পাল, দেবুপণ্ডিত ; ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা' (১৯৪৭) —বনোয়ারী, সুচাদ ; 'আরোগ্য নিকেতন' (১৩৫৯) জীবন দত্ত, শশাঙ্ক 'কবি' (১৯৪২)–ঠাকুরঝি, নিতাই।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি ছোটোগল্পের নাম লিখে প্রতিটির দু'টি করে চরিত্রের নাম লেখো। 1
‘অগ্রদানী’—পূর্ণ চক্রবর্তী, জমিদার শ্যামাদাস বাবু : 'নারী ও নাগিনী'—খোঁড়া শেখ, জবেদা, 'জলসাঘর'— বিশ্বন্তর, মহিম গাঙ্গুলী : 'তারিণী মাঝি-তারিণী, সুখী।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কোন উপন্যাসের জন্য 'জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন? 1
'গণদেবতা' উপন্যাসের জন্য তারাশঙ্কর 'জ্ঞানপীঠ' পুরস্কার পান।
জমিদারতন্ত্রের সঙ্গে শিল্পতন্ত্রের বিরোধ নিয়ে লেখা তারাশঙ্করের দুটি ছোটোগল্পের করো। 1
‘রায়বাড়ি' এবং 'জলসাঘর'।
প্রকাশকালসহ তারাশঙ্করের প্রথম উপন্যাসটি ? 1
১৯২৯-৩০ খ্রিস্টাব্দে ‘কল্লোল' পত্রিকায় প্রকাশিত তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ঠিক ।
মানবেতর প্রাণীদের নিয়ে লেখা তারাশঙ্করের লেখা দুটি ছোটোগল্প-এর নাম লেখো। 1
'কালাপাহাড়' এবং 'নারী নাগিনী'।
তারাশঙ্করের রচনা-বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো। 1
তারাশঙ্কর মূলত রাঢ়ের পটভূমিকায় আঞ্চলিক ভাষায় রাঢ়জীবনের অসামান্য কথাকার।
রাজশেখর বসুর ছদ্মনাম কী? 1
রাজশেখর বসুর ছদ্মনাম পরশুরাম।
রাজশেখর বসুর চারটি গল্পসংকলনের নাম লেখো। 1
'গড্ডলিকা' (১৯২৪), 'কজলী' (১৯২৭), 'হনুমানের স্বপ্ন' (১৯৩৭), 'কৃষ্ণকলি' (১৯৫৩)।
'সহসা ইঁহার অসামান্যতা দেখিয়া চমক লাগিল ..... বইখানা চরিত্রচিত্রশালা। —কার কোন বই সম্পর্কে কে কথাটি বলেছেন।
পরশুরামের 'গড্ডলিকা' গল্পগ্রন্থ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই মন্তব্যটি করেছিলেন।
পরশুরামের রচনা-বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো। 1
পরশুরামের রচনায় দার্শনিকতা ও নানা হাস্যরসের (প্রধানত বৈদগ্ধ্যপূর্ণ ও বিদ্রুপাত্মক) মিশ্রণ লক্ষ যায়।
পরশুরামের লেখা প্রথম ছোটোগল্পটি কী? 1
'সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড'।
পরশুরামের চারটি গল্পের নাম উল্লেখ করে ২টি করে চরিত্র উল্লেখ করো। 1
‘বিরিক্তিবাবা’—সত্য, নিবারণ, বুচকী ‘স্বয়ংবরা’—চাটুজ্যেমশায়, বিনোদবাবু ; নকুড়মামা 'জাবালি'—জাবালি, ইন্দ্র ।
পরশুরামের রচনার মূল রস কী? 1
পরশুরামের রচনার মূল রস হল — হাস্যরস।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের দুটি উপন্যাসের নাম লেখো। 1
প্রেমেন্দ্র মিত্রের দুটি বিখ্যাত উপন্যাস হল—'পাক' (১৯২৬), 'মিছিল'।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথম উপন্যাসটি কী ও তার প্রকাশকাল কত ? 1
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথম উপন্যাসটি হল 'পাক'।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের চারটি গল্পের নাম লেখো। 1
‘মোট বারো', 'পুন্নাম', 'হয়তো' ও 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার'।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের চারটি গল্পের নাম লেখো ও প্রতিটির দু'টি করে চরিত্রের নাম লেখো। 1
‘কুয়াশায়’—সরমা, মোক্ষদা পোনাঘাট পেরিয়ে'—বলাই, ছুট্কি ; 'স্টোভ'—বাসন্তী,
'মহানগর'—রতন, চপলা ।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচনা-বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো। 1
প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচনায় কঠোর বাস্তবের অসহায়, বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের জীবনচিত্র সহানুভূতি ও সাহসিকতার সঙ্গো চিত্রিত।
বনফুল কোন লেখকের ছদ্মনাম ? 1
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম 'বনফুল'।
বনফুলের পেশা কী ছিল?
বনফুলের পেশা ছিল ডাক্তারি।
বনফুলের পাঁচটি গল্পের নাম বলো। 1
বনফুলের পাঁচটি গল্প হল —‘বাজেখরচ’, “মিনির চিঠি', 'খোকনের প্রথম ছবি', ‘সেকালের এক খোকনের গল্প' ও 'শ্রীপতি সামস্ত।
বনফুলের চারটি উপন্যাসের নাম লেখো। 1
'মৃগয়া' (১৯৪০), স্থাবর' (১৯৫১), 'জাম' (১৯৪১) ও 'ডানা' (১৯৪৮)।
বনফুলের চারটি গল্পের নাম উল্লেখ করে তাদের দুটি করে চরিত্রের নাম লেখো। 1
‘অপূর্ব রহস্য’—অপূর্ব, দেবু ; 'শতাব্দীর ব্যবধান'—ডাক্তার নিত্যানন্দ, গোপীবাবু ‘থাপপোড়’—গণেশদা, রাসমণি ; 'শ্রীপতি সামস্ত'—শ্রীপতি সমাপ্ত, বাঙালি সাহেব ; 'দুইটি ছবি! তুমি, মিস্টার মাঞ্জিয়া।
বনফুলের দুটি গল্প সংকলনের নাম লেখো। 1
বনফুলের দুটি গল্প সংকলনের নাম হল—'বাহুল্য', 'বৈতরণীর তীরে'।
'বুড়িটা' গল্পটি কার লেখা? 1
‘বুড়িটা' গল্পটি বনফুলের লেখা।
বনফুলের দুটি রচনা-বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো। 1
বনফুলের রচনা প্রধানত স্বল্প পরিসরে, সহজ-সরল ভাষায় ও নাতিদীর্ঘবাক্যে লেখা।।
বাংলা উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান আলোচনা করো। 5
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ইংরেজি ভাষায় লেখা Rajmohan's Wife মূলত এ রোমান্স নয়, বাস্তব জীবনের গল্প। তাঁর যথার্থ প্রথম বাংলা উপন্যাস 'দুর্গেশনন্দিনী'র রচনা অবশ্য তার আগেই ঘু হয়েছিল, কিন্তু প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে। তার শেষ উপন্যাস 'সীতারাম' প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে বাইশ বছরের মধ্যে তাঁর মোট উপন্যাসের সংখ্যা চৌদ্দো। সেই উপন্যাসগুলির শ্রেণি ও সময়কাল নিম্নরূপ :
(ক) ইতিহাস ও রোমান্স । দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫), কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬), মৃণালিনী (১৮৬৯), যুগলা শহ (১৮৭৪), চন্দ্রশেখর (১৮৭৫), রাজসিংহ (১৮৮২), সীতারাম (১৮৮৭)।
(খ) তত্ত্ব ও দেশাত্মবোধ : আনন্দমঠ (১৮৮৪), দেবীচৌধুরানি (১৮৮৪) (গ) সমাজ ও গার্হস্থ্যজীবন = বিষবৃক্ষ (১৮৭৩), ইন্দিরা (১৮৭৩), রজনী (১৮৭৭), কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮) রাধারানী (১৮৮৬)।
এর মধ্যে প্রথমোক্ত শ্রেণির উপন্যাসগুলির মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র মূলত ইতিহাস ও কল্পনার মিশ্রণে সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক রোমান্সের পরিচয় দিয়েছেন। তবে সর্বত্রই যে তিনি পুরোপুরি সার্থক, তা বলা যায় না। যেমন 'দুর্গেশনন্দিনী'তে পাঠান। মোগল স্বন্দ্ব একটি স্বল্প পরিচিত ঘটনা, কিন্তু তার সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছে প্রচুর কল্পনা। কোথাও ইতিহাসের পটভূমিকা আবির্ভূত সাধারণ নরনারী (প্র. চন্দ্রশেখর)। একইভাবে 'রাজসিংহ' উপন্যাসে নির্মলকুমারী বা ঔরঙ্গজেবের প্রতিক্রিয় ইতিহাসবিরোধী হয়েছে এবং প্রাধান্য পেয়েছে জেবউন্নিসা-মবারকের কাল্পনিক কাহিনি।
দ্বিতীয়োক্ত শ্রেণির উপন্যাসে যে তত্ত্ব ও দেশাত্মবোধের কথা বর্ণিত বঙ্কিমচন্দ্র তার আভাস অনেক আগেই সূচিত করেছিলেন তাঁর বঙ্গদর্শন' ও অন্যান্য পত্রিকায়। 'আনন্দমঠ'-এর কেন্দ্রে তিনি রেখেছেন সন্ন্যাসী-বিদ্রোহ আর সুপরিচিত 'বন্দেমাতরম' সংগীত। ভবানন্দ ও শান্তি চরিত্রই এখানে সুচিত্রিত। এ ছাড়া এ উপন্যাসের কাহিনি এখনে কোনো বলি নেই। তবে দেশাত্মবোধ এমনই প্রবল যা পরবর্তী আন্দোলনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। দেবীচৌধুরানী তে সম কাহিনি এবং প্রফুল্ল চরিত্রের বাস্তবতাও পাঠকরে নানাভাবে প্রশ্নমুখর করে তোলে।
তবে বঙ্কিমের শেষোক্ত শ্রেণির উপন্যাসগুলিতে বরং অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে তাঁর বাস্তব জীবন জগতের প্রতি পর্যবেক্ষণ, মানুষের গভীর মনস্তত্ত্ব আর বর্ণনভঙ্গিমা। ইন্দিরা', 'রাধারানী' মূলত বড়ো গল্প (Novelete) এবং একটির কাহিনিতে আছে ভিন্ন গরৱস, অভিনব রচনাভঙ্গি, দ্বিতীয়টি অতি সাধারণ। তৌলন বিচারে বিষ 'কৃষ্ণকান্তের উইল' ও 'রজনী'তে বঙ্কিমচন্দ্র যা দেখিয়েছেন, সে সম্পর্কে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন “ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের বাঙালি উচ্চমধ্যবিত্ত জীবনের কয়েকটি পারিবারিক সমস্যা এই উপন্যাস তিনখানিয়ে রোমান্সের স্বর্গলোক হইতে মর্ত্যের কঠিন মৃত্তিকায় টানিয়া নামাইয়াছে।” (দ্র. "আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত)। তবে কোথাও কোথাও শিল্প অপেক্ষা নীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য তাঁর উপন্যাস প্রচারধর্মী ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত মনে হয়েছে।
পরিশেষে একথা বলতে হয় যে, তাঁর উপন্যাস প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বহু বিদেশি লেখকের নাম উল্লেখিত হয় যেমন—স্কট-ডিকেন্স কিংবা জোলা-বালজাক-ফ্লবেয়র প্রমুখ কারণ বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সৃষ্টিকর্মে কোথাও তাঁদের অনুসর করেছেন অথবা তাঁদের মধ্যে কারোর লেখার প্রতি তাঁর আসক্তি ছিল না; থাকলে হয়তো উপন্যাসের ক্ষেত্রে আরো বৈশি বা অভিনবত্ব দেখাতে পারতেন। তবে সামগ্রিক বিচারে তিনি যা-ই লিখেছেন, তাতে সময়ের প্রেক্ষিতে তাঁকে শ্রেষ্ঠ বারে গণ্য করা অসমীচীন হবে না।
কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান আলোচনা করো। 5
রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার প্রধান বাহন কবিতা হলেও তিনি কথাসাহিত্যেও বিশেষ উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন। অর্থাৎ উপন্যাস ও ছোটোগল্প উভয় ক্ষেত্রেই তিনি বিচরণ করেছেন সমানভাবে। এই শিল্পসৃষ্টিকর্মে কাজে লাগিয়েছেন ইতিহাস, দেশাত্মবোধ, ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতা, মানসিক জটিলতত্ত্ব ইত্যাদি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপার। " উপন্যাস রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস খুবই কম, তবু তার শ্রেণিবিভাগটি লক্ষণীয় :
(১) ইতিহাস ও রোমান্সধর্মী : 'করুণা' (১৮৭৭-৭৮), 'বউ ঠাকুরানির হাট' (১৮৮৩) এবং 'রাজর্ষি' (১৮৮৭)। এগুলো রবীন্দ্রনাথের কম বয়সে রচিত। তাই তার মধ্যে বেশকিছু ভুলত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী রমেশচন্দ্র দত্ত বা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো ইতিহাসকে আশ্রয় করতে গিয়ে 'করুণা'য় তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখতে পারেননি বরং তাঁর "বউ ঠাকুরানির হাট' ও 'রাজর্ষি'তে ইতিহাস অবলম্বিত হয়েছে। অবশ্য এ দুটিতে ইতিহাসের পাশাপাশি মানবচরিত্রই মুখ্যত চিত্রিত হয়েছে।
(২) দ্বন্দ্বমূলক : 'চোখের বালি' (১৯০৩), 'নৌকাডুবি' (১৯১০-১২) ও 'যোগাযোগ” (১৯২৩)। বলা বাহুল্য প্রথমটি রচনার আগে বাঙালি পাঠক বঙ্কিমের দুটি উপন্যাস 'বিষবৃক্ষ' ও 'কৃষ্ণকান্তের উইল' পড়েছেন। সে হিসেবে রবীন্দ্রনাথ এ রচনায় কোনো অভিনবত্ব দেখাননি, তবে তিনি নীতি অপেক্ষা শিল্পে বিশ্বাসী ছিলেন বলে, মহেন্দ্র তার স্ত্রী আশাকে উপেক্ষা করে যে বিনোদিনী (বিধবা)-র প্রতি আসক্ত ছিল, তাকে তিনি বঙ্কিমের কুন্দনন্দিনী-রোহিনির মতো মেরে ফেলেননি। নৌকাডুবি'র কাহিনি প্রথমটির মতো মজবুত নয়। দাম্পত্য অশান্তির কাহিনি 'যোগাযোগ' মোটামুটি একটি রচনা, কারণ মানসিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত এখানে একতরফা।
(৩) বৃহত্তর সমস্যামক : 'গোরা' (১৯১০), 'ঘরে বাইরে' (১৯১৯), 'চার অধ্যায়' (১৯৩৪)। এই উপন্যাসগুলিতে রবীন্দ্রনাথ ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে যে পরিচিত জগৎ বা মানুষের প্রেম-কামনা-ভালোবাসা, তার পাশাপাশি তার বাইরের জাংকেও চিত্রিত করেছেন সুনিপুণভাবে। এক্ষেত্রে সমকাল এবং সমকালীন বৃহত্তর সমস্যা চিত্রিত হয়েছে সারলীল বাকভঙ্গিমায়। এর মধ্যে 'গোরা' হচ্ছে মহাকাব্যধর্মী উপন্যাস। ঘরে বাইরে তে রাজনীতি বা স্বদেশি আন্দোলন এসেছে অনুষঙ্গ হিসেবে।
(৪) মিস্টিক ও রোমান্টিক : 'চতুরঙ্গ' (১৯১৬) ও 'শেষের কবিতা' (১৯২৯)। প্রথমটি মূলত চারজনের কাহিনি। শচীশ, দামিনী, শ্রীবিলাস ও জ্যাঠামশাই। এখানে শচীশ-দামিনী-শ্রীবিলাসকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে সম্পর্ক বা মনস্তত্ত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা অনেক প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক-সমালোচক মনোবিজ্ঞানসম্মত বলে মনে করেননি। শেষোক্তটি অমিত লাবণ্য ও কেটিকে নিয়ে একটি লিরিক উপন্যাস। বিষয় ও আঙ্গিকে এ এক অভিনব রচনা। সর্বোপরি উপভোগ্য।
• ছোটোগল্প রবীন্দ্রনাথ মূলত উপন্যাসের চেয়ে ছোটোগল্পেই বেশি সফল, স্বাচ্ছন্দ। তিনিই একমাত্র বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক ছোটোগল্পকার। নানা পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে তাঁকে প্রায় পত্রিকাতেই গল্প লিখতে হয়েছে বেশি। বেশিরভাগ গল্পের পটভূমিতে আছে তাঁর বাস্তব জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, বাকিটা তিনি পূর্ণ করেছেন কল্পনায়।
তাঁর গল্পের নানা শ্রেণি। কোনো গল্প পুরুষ প্রধান, কোনোটা প্রকৃতিনির্ভর, কোনোটা অলৌকিক, আবার কোনোটায় নারী, শিশু, পিতা ইত্যাদির ভূমিকা। তাঁর গল্পগুচ্ছ (১-৪) ছাড়া গল্পস্বল্প, সে, ইত্যাদি মিলিয়ে শতাধিক গল্প। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগুলি হল—'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন', 'দেনাপাওনা', 'পোস্টমাস্টার', 'কঙ্কাল', 'ছুটি', 'স্ত্রীর পত্র', 'কাবুলিওয়ালা', ‘ল্যাবরেটরি', ‘ক্ষুধিত পাষাণ”, “অতিথি” প্রভৃতি।”
তাঁর গল্প সম্পর্কে অধ্যাপক সুবোধ সেনগুপ্ত বলেছেন, “তিনি কবি। তাই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনার মধ্যে তিনি মানবহৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি জাগাইয়াছেন, তাহাদের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য উদ্ঘাটিত করিয়াছেন।" (রবীন্দ্রনাথ)
পরিশেষে একথা বলা যায় যে, কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ কালোত্তীর্ণ এই কারণে যে, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে একটি সর্বচন এ সর্বকালীন আবেদন বিদ্যমান, যা দ্বিতীয় কারোর মধ্যে পরিদৃষ্ট নয়।
ছোটোগল্পকার রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আলোচনা করো। 5
সংহত পরিধিতে বাহুল্যবর্জিতভাবে মানবজীবন সম্বন্ধে কোনো একটি কেন্দ্রীয় বিষয়ের উ আলোকসম্পাতকারী রচনাকেই বলা হয় ছোটোগল্প। নাটকীয়তা, গীতিমূর্ছনা, আকস্মিকতা ও ব্যঞ্জনামিতা ছোটে প্রধান বৈশিষ্ট্য। কাব্য বা উপন্যাসের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ নিজের অন্তরের সুরটিকে যতটা ধরেছিলেন ছোটোগল্পের মধ্যে কিছু নিজের অন্তর প্রকৃতিকে আরো বেশি করে মেলে ধরেছিলেন। যদিও সাময়িক পত্রের চাহিদা মেটাতেই কবি রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প রচনা করতে হয়েছিল। পদ্মার তীরে নৌকাযোগে ভ্রমণ, জমিদারি তদারকিসূত্রে গ্রাম-জীবনের সঙ্গে নিবিড় দেখ এবং অন্যদিকে রাজধানী শহর ও অন্যত্র মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, মজুর শ্রেণি প্রভৃতি ধরনের মানুষ ও তাদের জীবনকে কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং সেগুলিই ছোটোগল্পের মধ্যে তুলে ধরেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ছোটোগল্পে মানুষ ও প্রকৃতিকে পাশাপাশি বর্ণনা করেছেন। ছুটি, অতিথি, একরাত্রি, পোস্টমাস্টার গল্পগুলিতে প্রকৃতি মানবপ্রাণের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এই ধরনের গল্পে রহস্যলোকের প্রভাব দেখা যায়। তাঁর ছেলে গল্পগুলিতে প্রেম, সৌন্দর্য ও কল্পনার বিচিত্র সমন্বয় ঘটেছে। যেমন—'একরাত্রি', 'মধ্যবর্তীনি' প্রভৃতি। দৈনন্দিন জীবনরে কেন্দ্র করে লেখা গল্পগুলি বেশ উৎকৃষ্ট মানের। যেমন—'পোস্টমাস্টার', 'ছুটি' ইত্যাদি। তাঁর বেশ কিছু গল্পে গীতিজ্ঞাতে ও রহস্যলোকের বিচিত্র সমন্বয়ে গঠিত জড় প্রকৃতির একটি চরম মূর্তি অঙ্কিত হয়েছে। যেমন— মেঘ ও রৌদ্র', 'অতিধি, 'আপদ', 'একরাত্রি' ইত্যাদি।
সাধারণ ভৌতিক সংস্কারের ওপর লেখা গল্পগুলিতে মানবজীবনের রহস্য সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। যেমন— ক্ষুধিত 'পাষাণ', 'কঙ্কাল' ইত্যাদি। এই সমস্ত গল্পগুলিতে প্রাকৃত ও অপ্রাকৃতের ভেন লুপ্ত হয়ে গেছে। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত গল্পের হয়ে 'রবিবার', 'শেষকথা', 'ল্যাবরেটরি' প্রভৃতি প্রধান। এখানে আধুনিক জীবনের বিভিন্ন জটিল দিক তুলে ধরেছেন। পারিবারিক জীবনে স্নেহপ্রেমের বিবিধ নিকগুলি পরম সহানুভূতিতে চিত্রায়িত করেছেন। যেমন— 'রাসমণির ছেলে', 'কাবুলিওয়ালা', 'ফুট, 'দিদি', 'ঠাকুরদা' প্রভৃতি।
এইভাবে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ছোটোগল্পকে নানান বিষয় বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ করে তুলেছেন। এবং ছোটোগল্পকার হিসেবে তিনি টলস্টয়, মোপাসাঁ, চেক-এর পাশে স্থান লাভ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে ছোটোগল্পের ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম সর্ব ছোটোগল্প রচয়িতা। শুধু তাই নয়, বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসেও রবীন্দ্রনাথ সার্থক ছোটোগল্পকার হিসেবে স্বীকৃত।
বাংলা উপন্যাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। 5
বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবির্ভাব আকস্মিক নয়, আকাঙ্ক্ষিত। একটি বঙ্কিমচন্দ্রের অপ্রচলিত সাধুগদ্য, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের অতিদূর কল্পলোকে বিহার সাধারণ বাঙালি পাঠককে উপদান বিমুখ করে তুলেছিল। ঠিক শরৎচন্দ্র কথাশিল্পীর জাদুদণ্ড দিয়ে বাংলা সাহিত্যে অবতীর্ণ হলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা কোর কথাশিল্পীর অনুরাগের সহজ আলপনায় নয়, তাঁর জনপ্রিয়তা আরও কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে আছে। সমাজ অননুমোদিত প্রেমের বিশ্লেষণ এবং সমাজসংস্কার ও আচার-আচরণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে তি গেছে।
শরৎচন্দ্রের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হল- 'বড়দিদি' (১৯১৩), 'পণ্ডিত মশাই' (১৯১৪), অর (১৯১৬), পল্লীসমাজ' (১৯১৬), চার পর্বে বিভক্ত 'শ্রীকান্ত' (১৯১৭, ১৯১৮, ১৯২৭, ১৯৩৩), 'দেবদাস' (১৯১ 'চরিত্রহীন' (১৯১৭), 'গৃহদাহ' (১৯২০), 'দেনাপাওনা' (১৯২৩), 'শেষপ্রশ্ন (১৯০১), 'বামুনের মেয়ে (১৯২০) 'পথের দাবী' (১৯২৬) প্রভৃতি।
শরৎচন্দ্র সমাজ-অননুমোদিত প্রেমের বিশ্লেষণে সিদ্ধহস্ত। 'গৃহদাহ', 'চরিত্রহীন', 'পল্লীসমাজ' প্রভৃতি উপন্যাসের কথা J আসলো স্মরণ করতে হয়। জমিদারি শাসনব্যবস্থায় জমিদারতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে বেশির ভাগ নামক চরিত্রগুলি গড়ে উঠেছে। যেমন—
'পল্লীসমাজ'-এর রমেশ, 'দেনাপাওনা'-র জীবানন্দ প্রভৃতি।
শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাসে আবেগ-উচ্ছ্বাসের অতিরেক দেখা যায়। এ কারণেই তাঁর গল্প-উপন্যাস বাঙালি হৃদয়ে সাড়া জাগিয়েছিল। প্রেম-ভিত্তিক উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দেবদাস', 'পরিণীতা', 'গৃহদাহ', 'দত্তা' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। দেশপ্রেম তথা সহিংস বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে রোনান্দের মিশ্রণ ঘটেছে 'পথের দাবী', 'অরক্ষণীয়া', 'গৃহদাহ' প্রভৃতি উপন্যাসে। চার পর্বে বিভক্ত 'শ্রীকান্ত' তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস। শেষপ্রশ্ন-কে তিনি তর্কপ্রধান উপন্যাস হিসেবে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। এই উপন্যাসে তিনি নরনারীর সহাবস্থানে সংস্কারমুক্ত এক জীবনের ইঙ্গিত নিয়েছেন।
শরৎ-উপন্যাসে বোহেমিয়ান সমাজ ইতিহাসের কিছু চরিত্র লক্ষ করা যায়। যেমন— শ্রীকান্ত' উপন্যাসে শ্রীকান্ত। ধর্মীয় মূল্যবোধকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কিছু কিছু আচার-আচরণ, সংস্কার, অনাচার ও ব্যভিচারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সমাজের বিধিনিষেধ সমাজপতিদের বিধিবিধান এবং আচার-বিচারের নেপথ্যে সত্য উদ্ভাবন শরৎ-উপন্যাসের আরও একটি বিশেষ গতিপ্রকৃতি বলা যায়। শরৎচন্দ্র বিধবা চরিত্রগুলি অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে অঙ্কন করেছেন। যেমন— 'বনবির বড়পিনি, 'পল্লীসমাজ'-এর রমা, শ্রীকান্ত-এর কমললতা, 'গৃহদাহ'র মুগাল, ‘শেষ প্রশ্ন'র কমল প্রমুখ। অবশেষে বেলা যায়, সরল আকর্ষর্ণীয় রচনারীতি এবং আবেগের আন্তরিক প্রকাশ শরৎ-উপন্যাসের জনপ্রিয়তার কেন্দ্রীয় কারণ।
কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের কয়েকটি বিখ্যাত ছোটোগল্প সম্পর্কে আলোচনা করো। 5
শরৎচন্দ্র কথাশিল্পের জানুনও দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠক সমাজকে বশ করেছেন। তিনি উপন্যাস। রচনায় যতটা কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, ছোটোগল্পে সেভাবে প্রভাব রাখতে পারেননি। তাঁর গল্পগুলি ছোটোগল্পের চরিত্রকে বজায় রাখতে পারেনি। উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত হয়ে গেছে। যেমন—রামের সুমতি' (১৯১২), 'বিন্দুর ছেলে' (১৯১৪), 'মেজদিদি', 'মামলার ফল' (১৯২০) প্রভৃতি গল্পে উপন্যাসের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তবে 'মহেশ', 'অভাগীর স্বর্গ' গল্প দুটি বাংলা সাহিত্যে প্রথম সারির ছোটোগল্প। এখন কয়েকটি ছোটোগল্প সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।। মহেশ ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রচিত 'মহেশ' গল্পে শরৎচন্দ্র একটি মানবেতর প্রাণীকে কাহিনির কেন্দ্রে রেখে জমিদারি শোষণে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের অত্যাচারে কিছু অসহায় মানুষের জীবনের করুণ পরিণতিকে তুলে ধরেছেন। গফুর ও তার মেয়ে আমিনা সেই অত্যাচারিত শ্রেণির প্রতিনিধি। এ গল্পে শরৎচন্দ্র বিশেষভাবে দেখিয়েছেন এক অসহায় মুক প্রাণীর প্রতি আর এক অসহায় মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসা কত তীব্র হতে পারে। মহেশ" একটি বিশ্বমানের ছোটোগল্প।
অভাগীর স্বর্গ। জমিদারি শোষণ-শাসনের আর একটি জ্বলন্ত প্রতিবাদ হল 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পটি। স্বামী পরিতাকা এক সন্তানের জননী অভাগী জমিদার গৃহিণীর শেষকৃত্যের সমারোহ দেখে পুত্রের হাতের আগুন পাবার উদগ্র আকাঙ্ক্ষায় অকালে মারা যায়। তাকে শুনতে হয়েছে, তোদের জেতে কে করে আবার পোড়ায় রে—না, মুখে একটু মুড়ো জ্বেলে নিয়ে নদীর চড়ায় মাটি দি গো। শেষ পর্যন্ত তাই সে করেছে, নুড়োর এক চিলতে ধোঁয়ার দিকে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেছে মায়ের জন্য স্বর্গ থেকে রথ আসছে কি না। এ গল্পের কাহিনি ও সমাজ-ভাবনা আমাদের ভঙ্গিত করে।
'মন্দির', 'বড়দিদি', 'নিষ্কৃতি', 'রামের সুমতি' প্রভৃতি গল্প মনে করিয়ে দেয় শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যের নায়ক চরিত্রের সাধারণ লক্ষণ উদাসীনতা এবং সাংসারিক বিবেচনাহীনতা। মেজদিদি' গল্পে বড়ো বউ ছোটো বউয়ের ছেলে মানুষ করেছে, যদিও সেখানে ভ্রাতৃবিরোধ ছিল। আবার 'নিষ্কৃতি'র নয়নতারা ও 'হরিলক্ষ্মী' গল্পের দুই বৌয়ের মধ্যে কুটিলতাও দুর্লক্ষ নয়।
'অনুপমার প্রেম', 'কাশীনাথ', 'স্বামী' প্রভৃতি দাম্পত্য প্রেমের গল্প। 'একাদশী বৈরাগী', তাঁর মানব মহিমাবোধের এক অসাধারণ গল্প। ছোটোগল্প প্রচলিত আদর্শকে সামনে রেখে তাঁর গল্পের মূল্যায়ন করতে গেলে হয়তো হিসেব সবক্ষেত্রে মিলবে না, কিন্তু তাঁর গল্পগুলি যে সুখপাঠ্য ও একান্তভাবেই সমাজকেন্দ্রিক এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই।
প্রধান প্রধান উপন্যাসের নাম করে কথাসাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশিষ্টতা সংক্ষেপে আলোচন করো। 5
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতৃদত্ত নাম প্রবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্র-পরবর্তী সাহিত্যধারায় মারি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলি জীবনের গদ্যময় বাস্তবতাকে প্রকাশ করেছে। 'বিচিত্রা' পত্রিকায় প্রকাশিত 'অতসী হ (১৯৩৫ খ্রি.) গল্পের মাধ্যমেই তিনি সাহিত্যের আঙিনায় প্রবেশ করেন। 'দিবারাত্রির কাব্য' তাঁর প্রথম উপন্যাস। এ তাঁর প্রধান প্রধান উপন্যাসগুলি হল—'পুতুলনাচের ইতিকথা' (১৯৩৬), 'পদ্মানদীর মাঝি' (১৯৩৬), 'অহিংসা' ( চতুষ্কোণ' (১৯৪৮), 'সোনার চেয়ে দামী' (১৯৫১) ইত্যাদি।
তাঁর “দিবারাত্রি কাব্য' উপন্যাসে মানুষের অবচেতন মনের দিকটি দেখানো হয়েছে। 'পুতুলনাচের ইতিকথা' উপন্যাস পরিস্থিতির চাপে গ্রামকেন্দ্রিক মানুষের জীবনের জটিলতার দিকগুলি দেখানো হয়েছে। 'পদ্মানদীর মাঝি’-তে পদ্মাবেই জেলে-মাঝিদের জীবন সংগ্রামের চিত্র সুচারুভাবে অঙ্কিত। 'শহরতলী'-তে পুঁজিপতি ও মেহনতি মানুষের দ্বন্দ্ব ফুট উঠেছে। চতুষ্কোণ' উপন্যাসটিকে যৌন জীবনের ছবি মনে হলেও সুস্থ উপভোগ্য জীবনের প্রতি ঝোঁক লক্ষ করা গেছে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখায় চরিত্রগুলিকে মেকি ভদ্রতার মুখোশ পরিয়ে আড়াল করেননি; জীবন যা তাবেই তিনি অঙ্কন করেছেন। বৃত্তিজীবী মানুষের জীবন ও সমাজকে নিপুণ দক্ষতায় তিনি অঙ্কন করেছেন, এর মধ্যে কল্পনার রং নেই, আছে বার সমাজ, বাস্তব জীবন। যেমন—'পদ্মানদীর মাঝি' (১৯৩৬)। পূর্ব-বাংলার আঞ্চলিক জনজীবনের ছবি এ উপন্যাসে আয়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের কাম পিপাসার জান্তব মূর্তিকে তাঁর বিভিন্ন লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষ কামর আবর্তে পড়ে কীভাবে জীবনকে জটিল করে তোলে 'প্রাগৈতিহাসিক' গল্পে দেখিয়েছেন। ফ্রয়েডীয় মনোবিকলনের কমবেশি তাঁর প্রায় সমস্ত উপন্যাসের মধ্যে দেখা যায়। ‘স্বাধীনতার স্বাদ', 'সর্বজনীন' প্রভৃতি উপন্যাসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও মহাযুদ্ধ পরবর্তী সমাজের অর্থনীতি, সমাজনীতি ও মানুষের সামাজিক আলোচনার চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। এই সময়কার উপন্যাসে বিপর্যস্ত জীবনবোধের বাস্তব চিত্র সুমুদ্রিত আছে। পরবর্তী দশকগুলিতে বাংলা সাহিত্যে প্রায় সব শাখাতে যে প্রাণময় প্রবলতা পরিলক্ষিত হয় দিয়েছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ সাহিত্যিক।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কয়েকটি বিখ্যাত উপন্যাসের নাম করো। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর বিশিষ্টতার দিকগুলি উল্লেখ করো। 5
প্রকৃতির মুগ্ধ দর্শক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) মানবজীবনকে প্রকৃতির প্রেক্ষাপটেই কিন্তু করেছেন। প্রাত্যহিক জীবনের সাধারণ ঘটনা, কথাবার্তা, হাঁটাচলা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এসবই তাঁর গল্প-উপন্যাসে বিষয়। তাঁর প্রধান উপন্যাসগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- 'পথের পাঁচালী' (১৯২৯), 'অপরাজিত' (১৯৩২), আরণ্যক (১৯৩৮), “আদর্শ হিন্দু হোটেল' (১৯৪০), ইছামতী' (১৯৫০), 'অশনি সংকেত' (১৯৫০) প্রভৃতি। তাঁর উপন্যাসে বিশিষ্টতার দিকগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করা হল—
পরিচিত বিষয়, দৃশ্য, বিবর্ণ দেশ-কাল—এসবের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রসবভু, কঠোর বাস্তবের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বু লোকের স্বপ্ন মাধুরীকে আবিষ্কার করেছেন। যেমন—'পথের পাঁচালী'। প্রকৃতির সঙ্গে মানবহৃদয়ের একটি গোপন সংযোগ আছে তা তিনি তাঁর লেখায় বারে বারে বলেছেন। যেমন 'আরণ্যক'। এই উপন্যাসে তাঁর ভাব-তন্ময়তা লক্ষ করা যায়।
আধুনিক বাংলা সাহিত্য সমসাময়িক যুগের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জীবনের জটিলতা প্রভৃতি বিষয় তাঁর লেখার মধ্যে সেভাবে পাওয়া যায় না, তিনি একান্তভাবেই প্রকৃতির কবি।
বিভূতিভূষণের রচনার চরিত্রগুলি সহজ সরল ও নাম্বর জীবনরীতিতে অভ্যস্ত। তাঁর রচনার মধ্যে চরিত্রের অন্তদ্বন্দ্ব, তাত্ত্বিক সংঘাত এসবের বাহুল্য নেই। আছে চেনা পৃথিবীর মধ্যে, পরিচিত মানুষের মধ্যে, প্রতিদিনের জীবনযাপনের মধ্যে এক বিচিত্র সৌন্দর্যময় ইঙ্গিত ও রহস্যময় বাগুনা। প্রচলিত বাঁধা গতের মধ্যে তাঁর কথাসাহিত্যকে বিচার করা যাবে না। বিভুতিভূষণের রচনায় শিশু চরিত্রগুলি আবহমানকালের শিশু রসের প্রতিনিধিত্ব করেছে। যেমন— 'পথের পাঁচাশিক এভাবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশিষ্টতার দিকগুলি আমরা চিহ্নিত করতে পারি।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান প্রধান উপন্যাস ও ছোটোগল্পগুলির নাম করো। 5
তাঁর রচনার বিশিষ্টতার দিকগুলি নির্দেশ করো। উত্ত্যক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১) রাঢ় বলের প্রকৃতি-মানুষ-সংস্কৃতির রূপকার। রাঢ়ের মধ্যবিত ও নিম্নবিত্ত, সাধারণ মানুষের জীবনের রূপকে তিনি অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। সময়ের সঙ্গে সংলা কৃষিজীবী, সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবন কীভাবে পরিবর্তিত হয়ে চলে তা তিনি বিভিন্ন লেখায় দেখিয়েছেন। তারাশঙ্করের লেখায় কাহার, বেদে প্রভৃতি আদি জনজীবনের ছবি লক্ষ করা যায়। এই সমস্ত সম্প্রদায়ের সংস্কার, বিশ্বাস, খাদ্যাভ্যাস, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান প্রভৃতি লেখক জীবন্তভাবে তুলে ধরেছেন। বিশিষ্ট অথলের জীবন আর মানুষের চরিত্র-চিত্রণে তাঁর অসাধারণ দক্ষতার জন্যেই তাঁকে আঞ্চলিক ঔপন্যাসিকও বলা হয়। তাঁর লেখা উপন্যাসের মধ্যে 'ধাত্রীদেবতা' (১৯৩৯), 'কালিন্দী' (১৯৪০), 'গণদেবতা' (১৯৪২), 'পান' (১৯৪৩), 'হাসুলী বাঁকের উপকথা' (১৯৪৭), 'নাগিনীকন্যার কাহিনী (১৯৫২), 'জনপদ', 'পদচিহ্ন', 'রাধা', 'চাঁপাডাল্যার বউ (১৯৫৫) প্রভৃতি প্রধান । তারাশঙ্কর ছোটোগল্প রচনা করেছেন কয়েকশো। উপন্যাস ও ছোটোগল্পের ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি একই। তাঁর ছোটোগল্পের মধ্যে রসকলি', 'রাইকমল', 'জলসাঘর', 'নারী ও নাগিনী', 'তারিণী মাঝি', 'রায়বাড়ী', 'অগ্ৰদানী', 'ডাইনী', 'ছলনাময়ী', 'পৌষলক্ষ্মী' প্রভৃতি প্রধান। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাস- ছোটোগল্পের মধ্যে নবীন ও প্রবীণের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন। নবীনের কাছে প্রবীণের পরাজয় দেখালেও প্রবীণের ক্ষেত্রে তিনি সর্বদাই সহানুভূতিশীল। যেমন— 'জলসাঘর', 'পৌষলক্ষ্মী' প্রভৃতি রচনার কথা বলা যায়। মানবজীবনের বিশালতা ও গভীরতাকে তিনি ধ্যান-তন্ময়তার সঙ্গে পরিস্ফুট করেছেন। যেমন – রামদেবতা"।
আধুনিক সমাজ ও জীবনকে তিনি নিপুণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে তিনি সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা, উৎসব অনুষ্ঠান, খাদ্যাভ্যাস প্রভৃতি দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। যেমন—'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা"। ছোটো-বড়ো, ইতর-ভদ্র, ভূস্বামী-অভিজাত প্রভৃতি শ্রেণির মানুষের জীবনকে, তাদের জীবনের চাওয়া পাওয়াকে যেভাবে জীবন্তরূপে বর্ণনা করেছেন, তা আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে খুব বেশি চোখে পড়ে না। মানবজীবনে শাশ্বত প্রেম বলে কিছুই নেই—এমন কথা তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। যেমন—বলা যায় 'বেদেনী' গল্পটির কথা, প্রেম ও স্কুল জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার জন্ম তিনি জীবন-তৃয়াকে জয়ী দেখতে চেয়েছেন। প্রসজাত বলা যায় তাঁর 'তারিণী মাঝি' গল্পটির কথা। মানবেতর প্রাণীর প্রতি মানুষের জৈবিক আসত্তির কথা বলেছেন 'নারী ও নাগিনী' গল্পে। নিয়তির হাত থেকে মানুষের মুক্তি নেই——তা দেখিয়েছেন অগ্রদানী' গল্পে।
তারাশঙ্কর ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্র ও নবীন বণিকতন্ত্রের রূপটি কাহিনি ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট করেছেন 'ধাত্রীদেবতা, 'কালিন্দী' প্রভৃতি রচনায়। এখানে সমকালীন রাজনীতির কথাও বলেছেন।
বাংলা গল্পসাহিত্যে পরশুরাম এর ভূমিকা আলোচনা করো। 5
বাংলা গল্প লিখে যিনি হাস্য ও বালো বাঙালি পাঠককে আমোদিত ও সচকিত করে তুলেছিলেন হলেন পরশুরাম ছদ্মনাম গ্রহণকারী রাজশেখর বসু। বাংলা সাহিত্যে তাঁর পরিচয় বুদ্ধিদীপ্ত ব্যলা-তীক্ষ্ণ গল্পের লেখ হিসেবে। তাঁর পরিকল্পনার মৌলিকতার দৃষ্টান্ত ‘শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড' গল্পে যৌথ ব্যবসায় ধর্মকেন্দ্রিক জুয়াচুরি প্রবৃত্তিকে আঘাত করা হয়েছে। বাঙালির ব্যাবসা প্রণালীর ত্রুটিকে আঘাত করতে গিয়ে তিনি এ গল্পে সৃষ্টি করেছে কয়েকটি আশ্চর্য চরিত্র।
বাংলা সাহিত্যে শ্রীলতা-অশ্লীলতা সম্পর্কিত সময়কালের তুমুল বিতণ্ডার অর্থহীনতা বোঝানোর জন্য লেখা 'ভূশওঁর মাঠে গল্পে তিনি ব্যবহার করেছেন ভৌতিক জগতের চরিত্র ও আবহ। পুরাণ কথার মধ্য থেকে তাঁর কল্পনা উদ্ঘাটিত করেছে অসংগতি। ফলে সৃষ্টি হয়েছে আবিলতাহীন কৌতুক। 'জাবালি', 'পাঞ্চালী', 'তৃতীয় দ্যুতসভা' গল্পগুলি তার প্রমাণ। পুরাণের এত বিচিত্র এবং সার্থক ব্যবহার রাজশেখর বসুর মতো খুব কম বাংলা গল্প লেখকই করতে পেরেছেন। বিশ শতকের পরবর্তী সমাজ ও সমাজের মানুষের যাবতীয় অসংগতি ও ত্রুটিবিচ্যুতিকে তুলে ধরেছেন কচি সংসদ, "স্বয়ম্বরা' প্রভৃতি গল্পে। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা নিয়ে পরশুরাম সমাজ ও সমাজ-অন্তর্গত মানুষের ভিতরটা পোস্টমর্টেম করলেন। সেখানে ছোটো মানুষ, ছোটো জীবন—অনেক বড়ো মাপের ব্যঞ্জনায় বৈজ্ঞানিক নিরাসক্তিতে পাঠকের সামনে আসে। মজলিশি গল্পের আদর্শ, বৈচিত্র্য, কল্পনার প্রসার পরশুরামের গল্পে পাওয়া যায়। সমাজ সমালোচনা, সমাজ বিচার,
চিন্তাভাবনার অসংগতি প্রভৃতি দিক হাস্যরসের মোড়কে পরিবেশন করেছেন।
বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময় ও সমাজের মানুষ এবং তাদের আচার-আচরণে নীতি ও নীতি ভ্রষ্টতার পরিচয় উদ্ভাসিত "লম্বকর্ণ প্রভৃতি গল্পে। পরশুরামের হাস্যরসের বিশেষত কৌতুককর পরিস্থিতির সৃষ্টি। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক আচরণে নিহিত হাস্যরস কেমন করে পরিস্থিতির প্রভাবে ঘনীভূত হয়ে ওঠে তা তাঁর রচনায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর গল্প-সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল 'গড্ডালিকা' (১৯২৪), 'কজ্জলী' (১৯২৭), হনুমানের স্বপ্ন' (১৯৩৭), 'গল্প-কল্প' (১৯৫০) প্রভৃতি বিখ্যাত। তাঁর লেখাতে ও ত্রৈলোক্যনাথের মতো বাস্তব-উপেক্ষাকারী কল্পনা স্থান পেয়েছে। তাবে পরশুরামের রচনা বেশ মার্জিত ও সংহত।
বাংলা কথাসাহিত্যে প্রেমেন্দ্র মিত্রের অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। 5
প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯১৪-১৯৮৮) কবিতা, উপন্যাস, গল্প—সবই সমান দক্ষতায় লিখেছেন। তবে ছোটোগল্পকার ও কবি হিসেবে তিনি বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। দরিদ্র বস্তিবাসী মানুষের নিরুপায় নিষ্ঠুর জীবনযাপন নিয়ে লেখা ‘পাক' (১৯২৬), 'মিছিল' (১৯৩৩) প্রভৃতি উপন্যাস সাহিত্যিক মহলে তাঁর পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে ‘আগামী কাল' (১৯৩৪), 'প্রতিশোধ' (১৯৪১) 'প্রতিধ্বনি ফেরে' (১৯৬১), প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
তাঁর গল্প-সংকলনের মধ্যে 'পঞ্চশর', 'বেনামী বন্দর', 'পুতুল ও প্রতিমা', 'মৃত্তিকা', 'মহানগর' প্রভৃতি প্রধান। শুধু ‘কেরানী', 'স্টোভ', 'হয়ত’, ‘পুন্নাম' প্রভৃতি মনস্তত্ত্বভিত্তিক গল্পগুলি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখ এ গল্পগুলিতে লেখক সহানুভূতির সঙ্গে তুলে ধরেছেন। গল্পগুলির কাহিনি বেশ নিটোল এবং একমুখী ; চরিত্রগুলি প্রাণবন্ত। পতিতাদের জীবন নিয়ে তীক্ষ্ণ সহানুভূতির গল্প লিখেছেন। যেমন—'মহানগর', “সংসার সীমান্তে। বিজ্ঞানকে ভিত্তি করেও তিনি সার্থক ছোটোগল্প রচনা করেছেন। প্রসঙ্গত বলা যায়—ঘনদার গল্প এর কথা।
প্রেমেন্দ্র মিত্র শিল্প সৃষ্টিতে প্রধানত কঠোর বাস্তবকেই অবলম্বন করেছেন। চরিত্র অঙ্কনে কোনোকিছু রাখ-ঢাক করার চেষ্টা করেননি। তিনি তাঁর রচনার মধ্যে জীবনের আশাবাদের দিকটি প্রকাশ করেছেন। অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ভাঙা নৌকায় ছেঁড়া পাল তুলে মানবসমুদ্র পার হতে চেয়েছেন।
তোমার মতে 'কল্লোল গোষ্ঠী'র শ্রেষ্ঠ গল্পকার কে? গল্পকার হিসেবে তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। 5
কল্লোল গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ গল্পকার হিসাবে বিশেষভাবে প্রেমেন্দ্র মিত্রের নাম করা যায়। প্রেমেন্দ্র মিত্র কবিতা, উপন্যাস সবই সমান দক্ষতায় রচনা করেছেন। তবে ছোটোগল্পকার হিসেবে তাঁকে আলাদাভাবে আমাদের মনে রাখতেই হবে। মনস্তত্ত্ব ভিত্তিক গল্পগুলি তিনি নিপুণ দক্ষতায় সৃষ্টি করেছেন। যুগযন্ত্রণা এইসব গল্পে উঠে এসেছে। এ ধরনের গল্পের মধ্যে— 'হয়তো', 'শুধু কেরানি' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখ নিয়ে লেখা গল্পগুলি আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের অসহায় অবস্থাকে চিত্রায়িত করেছে। এ ধরনের গল্পের মধ্যে 'পুন্নাম', 'শৃঙ্খল' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
প্রেমেন্দ্র মিত্র পতিতাদের জীবন নিয়ে গভীর সহানুভূতির গল্প লিখেছেন। যেমন—'মহানগর', 'সংসার সীমান্তে প্রভৃতি। মানুষ কোনোভাবে ঘটনার পাকে পড়ে ভ্রষ্টাচার, কদর্যতার মধ্যে জড়িয়ে পড়লেও তার জীবন মিথ্যা নয়, প্রেম- ভালোবাসা মিথ্যা নয়—এটা তিনি দেখিয়েছেন। প্রসঙ্গত বলা যায়, 'মহানগর' গল্পে পতিতা বৃত্তি গ্রহণকারী দিদি চপলার প্রতি ভাই রতনের ভালোবাসার কথা। বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প রচনার ক্ষেত্রেও প্রেমেন্দ্র মিত্র সমান কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। যেমন—'ঘনাদার গল্প। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পের ভাষা সহজ-সরল, কাহিনি স্বল্প পরিসরে পরিবেশিত এবং চরিত্রগুলি প্রাণবন্ত। তাঁর গল্পগুলির মধ্যে বিষণ্ণতা থাকলেও, জীবন বেদনায় ভরা হলেও চরিত্রগুলির প্রতি আছে এক অসাধারণ সমানুমর্মিতা। গল্পের মধ্যে যে ভাব-ব্যঞ্জনা তিনি সৃষ্টি করেছেন তা আমাদের ভাবায় এবং হৃদয়কে আলোড়িত করে।
বনফুলের উপন্যাস ও ছোটোগল্পগুলি সম্পর্কে আলোচনা করো। 5
বনফুলের আসল নাম বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৯-১৯৭৯)। বনফুল সমান সাহসিকতায় উপন্যাস ও ছোটোগল্প রচনা করেছেন। তবে উপন্যাসের তুলনায় ছোটোগল্পগুলি বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে পক্ষীবিদ্যা নিয়ে লেখা 'ডানা' (১৯৪৮-১৯৫০), মানবসভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস নিয়ে লেখা উপন্যাস স্থাবর' (১৯৫১); বিশ শতকের চলমান জীবনের মহাকাব্য 'জাম' (১৯৪৩ ও ১৯৪৫); রাজনীতি বিষয়কে কেন্দ্র করে লেখা ‘সপ্তর্ষি' (১৯৪৫), 'অগ্নি' (১৯৪৬) ইত্যাদি প্রধান। বনফুলের উপন্যাসগুলির কাহিনি বয়নে, চরিত্র নির্মাণে এবং মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে।
ছোটোগল্প রচনার ক্ষেত্রে তিনি এক নতুন পথের যাত্রী। ছোটো ছোটো একপৃষ্ঠার গল্পের শিল্পসফল লেখক হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে স্মরণীয়। সমাজের অসহায়, ক্লিষ্ট মানুষের জীবনকে, সমাজের স্বার্থপরতাকে তির্যকভাবে 'বুড়িটা' গল্পে তুলে ধরেছেন। মিথ্যা পাশ্চাত্য অনুকরণ ও আদর্শবান বাঙালি চরিত্রকে তুলে ধরেছেন তাঁর ‘শ্রীপতি সামন্ত’ গল্পটিতে।
তাঁর অনেক গল্পে আছে বিজ্ঞানীর নির্বিকারত্ব, যেমন—'কসাই'। জীবনে হিসাবনিকাশ করে মিতব্যয়িতার মধ্য দিয়ে চলাই জীবন নয়, বাজে খরচও জীবনে অর্থহীন নয়, তা দেখিয়েছেন বাজে খরচ' গল্পে। জীবন, জীবনের স্বপ্ন, স্বপ্ন পুরণের ব্যাকুলতা, ব্যাকুলতা সত্ত্বেও অপ্রাপ্তি, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্য দিয়েই মৃত্যুর দ্বারে পৌঁছে যাওয়ার এক ছোট্ট আকৃতির অসাধারণ প্রতীকধর্মী গল্প 'সার্থকতা'। ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা স্বদেশ-প্রীতির এক অনন্য সৃষ্টি 'সেকালের এক খোকনের গল্প"। বাৎসল্য রসের এক করুণ কাহিনি বাড়তি মাশুল'। দাম্পত্য জীবনে প্রেম-ভালোবাসায় দুঃখের গল্প 'খেদি'।
ছোটোগল্প রচনায় বনফুল বিষয় ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের সন্ধানী। তাঁর অতি ছোটোগল্পের বিষয়েও বৈচিত্র্য আছে। ছোটোগল্পের পাশাপাশি তিনি বড়ো গল্পও রচনা করেছেন। যেমন— 'টাইফয়েড', 'অর্জুন মণ্ডল' প্রভৃতি। তাঁর গরে মানুষের জীবনের অন্তরঙ্গা ও বহিরা উভয় দিকই রূপায়িত। তাঁর গল্পের ভাষা সহজ, সরল ও ব্যঞ্জনাময়। সব মিলিয়ে বলা যায়, আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে বনফুল অনন্য।