অধ্যায়-3, ডাকাতের মা

সৌখী আগেও দুবার জেলে গেলেও দলের লোকেরা যথা সময়ে ঠিকমতো মাসোহারা দিয়ে কিন্তু এবার আর ঠিকমতো তা দিচ্ছে না তাদের সেই টাকা না দেওয়ার কান্ডের কথাই বলা হয়েছে।

ডাকাত সৌখীর নামে চৌকিদার কাঁপে, দারোগাসাহেব পর্যন্ত তুই তোকারি করতে ভয় পেয়েছে তার ছেত অর্থাৎ সৌখীর একমাত্র পাঁচ বছর বয়সি ছেলের সম্পর্কে একথা বলা হয়েছে।

সৌখীর মা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খই-মুড়ি বিক্রি করে কোনোরকমে পেট চালানোর মতো খাবার জোগাড় করে ।

সৌখীদের পরিবার ডাকাতের, স্বাভাবিকভাবেই সে বাড়ির লোকজনদের কেউ বিশ্বাস করে না, তার পাড়ার লোকেদের এতে বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বলেই বক্তা এরকম বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

সৌখীর মা তার ছেলের বউ ও নাতিকে তার দুটো মোষওয়ালা বেয়াইয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল বলেই তাদের পেটে একটু দুধ পড়ছে।

সৌখীর মায়ের ধারণা হয়েছিল বছরখানেক পড়ে জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সৌখী তার বউকে রুপোর গয়নায় মুড়িয়ে দিয়ে পাড়ার লোকেদের দেখিয়ে দেবে সৌখীর মায়ের নাতি পথের ভিখারি নয়।

সৌখী জেলে যাবার পর যে লোকটি টাকা দিতে আসত তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে সৌখীর ম বলে—তালপাতার মতো চেহারা, থুতনির নীচে দুগাছা দাড়ি, একে কালি-ঝুলিই মাথা আর হাতে মশালর দাও ওকে কোনো কালে ডাকাত মনে হবে না—কেউ ভয়ও পাবে না।

একবার রাতদুপুরে ফিরে এসে টোকা দিয়েও সৌখী সত্বর তার মায়ের সাড়া না পেয়ে তার মাকেই কথা বলেছিল।

শীতের দিনে মাথা পর্যন্ত কম্বলের মধ্যে ঢুকিয়ে না নিলে কোনো কালে কোনো রাতে ঘুম না আসরে চাওয়ার অবস্থার কথা বলা হয়েছে।

সৌখী জেলে যাওয়ায় বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমালে একটা বকুনি দেওয়ার মতো কেউ নেই-এ প্রসঙ্গে কথাটি বলা হয়েছে।

ডাকাত স্বামী বেঁচে থাকাকালীন সৌখীর মায়ের পরিচয় ছিল ডাকাতের বউ হিসেবে কিন্তু তার মৃত্যুর পর ছেলে ডাকাত দলের সর্দার হওয়ায় সে-ই তখন হয়ে উঠল ডাকাতের মা।

ডাকাতের মায়ের হাজার ঝামেলা, রাতবিরাতে ছেলে, দলের লোক বা পুলিশ আসার সম্ভাবনা তাই ঘুম পাতলা হওয়া দরকার।

টকটক করে দু-টোকার শব্দ থেমে থেমে তিনবার হলে বুঝতে হবে দলের লোক টাকা দেবার জন্য এসেছে।

ছেলের কড়া হুকুমটি হল— দরজায় টোকা পড়ার শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন দরজা খোলা না হয়। দরজা খোলার জন্য দশবার নিশ্বাস ফেলতে যতটা সময় লাগে ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

দলের লোকের মনে পাপ ঢুকলে সে অন্যসব সঙ্গীদের নাম পুলিশের কাছে বলে দিতে উদ্যোগী হলে তখন তাকে ঠেকানো মুশকিল হয়।

সৌখীর বাবার কাছে তার মা শুনেছিল তাদের দলের কোনো এক সদস্য পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পর সে যাতে শত অত্যাচারেও পুলিশের কাছে দলের সম্বন্ধে কিছু বলতে না পারে তাই সে নিজেই নিজের জিভ কেটে ফেলেছিল।

ঘুমের অসুবিধা হওয়া সত্ত্বেও ছেলের কথা মনে করে একদিনের জন্যেও সৌখীর মা নাকমুখ ঢেকে পাঁচ বছরের মধ্যে শোয়নি।

সৌথীর মা এখন বৃদ্ধা, ফলে বুড়ো হওয়ায় তার শীত বেড়ে যাওয়ায় আগে একখানা কম্বলে হলেও এখন তাতে আর চলে না ।

কথাটি দ্বারা ক্ষমতাবান বলবান রূপ সৌখীর মায়ের এই চরম দুরবস্থায় সামান্য দুর্বল, হীন শক্তির অধিকারী টিকটিকিও যেন দরজায় টোকা ফেলে তাকে বালা বিদ্রুপ করছে বোঝানো হয়েছে।

ঘর গরম করার জন্য সৌথীর মা মেঝেতে যে আগুন করেছিল তার ধোঁয়া সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ার কারণেই সৌখীর ঘর আরও জমাট হয়ে উঠেছিল।

যে সামান্য ব্যাপার বুড়ির মধ্যে উত্তেজনা এনেছিল তা হল দরজার ওপর আরও দুটো টোকা পড়া।

সৌখীর ঘরের বাইরে ঘটেঘুটে অন্ধকার থাকায় বাইরে কিছু দেখা যায় না।

সাবধানে কথা না বললে হয়তো দলের কোনো সদস্যের নামধাম মুখ দিয়ে বেরিয়ে না আসে তার জন্যই সাবধানে কথা বলতে হবে।

সৌখীর মা, ডাকাত পরিবারের মা হিসেবে দরজা খোলার আগে মানসিক উত্তেজনায় খুব তাড়াতাড়ি দশবার নিশ্বাস ফেলে নিয়মরক্ষা করে নিল।

দরজা খুলে সামনে এক লম্বা-চওড়া লোক দেখে ডাকাতের মায়েরও গা ছমছম করে উঠল।

নির্দিষ্ট সময়ের আগে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার ফলে অপ্রত্যাশিতভাবে সৌখীর মা তার ছেলেকে কাছে পেয়ে যে পরম আনন্দ অনুভব করে এখানে মা ও ছেলের সেই মিলনের আনন্দের কথা বলা হয়েছে।

সৌখী হেড জমাদারকে টাকা খাইয়ে জেলখানা পরিদর্শনরত লাটসাহেবের কাছে সুপারিশ করিয়ে জেলারের থেকে বেশি রেমিশান পেয়েছিল।

অন্ধকারে কুপি খুঁজবার সুবিধার জন্য সৌখী দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলেছিল।

সৌখী ফিরে এসেছে, স্ত্রী ও সন্তানকে তা জানাতে ও সবার আনন্দের শরিক হতে স্ত্রীকে এ ঘরে আ জন্যে কিংবা তার ঘুম ভাঙাবার জন্যে সে দরকারের চেয়ে বেশি জোরে কথা বলছিল।

ছেলের স্বাস্থ্য খারাপ দেখে সৌথীর মা জানতে চেয়েছিল ছেলে তার অসুখ-বিসুখ করেছিল  কিনা মায়ের করা এই প্রশ্ন সৌখী কানে তুলতে চায় না।।

মাকে জিজ্ঞাসা করা সৌখীর 'এদের কাউকে দেখছি না? প্রশ্নের কথাই এখানে বলা হয়েছে।

ছেলে-বউ কেন বাড়িতে নেই একথা শুনে সৌখী হয়তো বা মাকে অগ্রাহ্য করে তার দলের লোকদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে ছুটে যাবে কিংবা মায়ের কাছে না থেকে তাদের কাছে চলে যাবে—এ প্রসঙ্গে কথাটি বলা হয়েছে।

অপ্রতিভের চেয়ে হতাশ হয়ে সৌখী মাকে বলেছিল – না না তাই কি বলছি নাকি?”।

সৌখী তার ছোট ছেলের ব্যাপারে ভেবেছিল রাত ন-টার মধ্যে দুরস্ত ছেলেটা নিশ্চয়ই ঘুমোবে না।

মানের বলা হাতমুখ ধুয়ে নেওয়ার অনুরোধের কথাটি সৌখীর কানে গেল।

সৌখী স্ইমুড়ি খেয়ে শুতে যাওয়ার সময় মায়ের গায়ে থাকা ছেঁড়া কম্বলখানা দেখে সেটি তাকে দিতে বলল।

নতুন কম্বল মুড়ি দিয়েও রাজ্যের দুশ্চিন্তায় সৌখীর মায়ের মাথা গরম হয়ে ওঠে বলে মায়ের ঘুম হয় না ।

কাল সকালে বৃদ্ধ মা জেল থেকে আসা ছেলেকে কী খেতে দেবে—এটাই  ছিল তার মস্ত ভাবনা ।

বুড়ি ভেবেছে ভোরে উঠেই ছেলেকে বলা যাবে না—আগে পয়সা জোগাড় করে আন পরে রেঁধে দেব।

মাতাদীন পেশকারের বাড়ির দুই-আড়াই হাত উঁচু পাঁচিলে নীচে মাটি আর ভাঙা ইটের গাদা পড়ে থাকায় সেই পাঁচিল ভাঙতে বুড়ির বিশেষ অসুবিধা হল না।

এত গভীর রাতে বুড়িকে লোটা হাতে বাইরে যেতে দেখলে কেউ সন্দেহ করবে না বলে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাড়ির লক্ষ্মীশ্রী ফিরিয়ে আনতে চুরি হয়ে যাওয়া দিনেই মাতাদীন পেশকারকে আর একটা নতুন লোটা কিনে আনতে হবে।

এই কথাটি মাতাদীন পেশকার তার স্ত্রীকে বলল।

মাতাদীন পেশকারের মতে আইনের ধারায় উল্লেখিত চুরির খবর পুলিশকে দিলে জেল পর্যন্ত হতে পারার খবরের কথা বলা হয়েছে।

একথা বলে বক্তা আইনচন্দ্র মাতাদীন পেশকার চুরির খবর থানায় দেওয়ার জন্য বের হয়ে গেলেন।

বাসনের দোকানে গিয়ে পেশকার খুরো দেওয়া, বড়ো মুখওয়ালা, স্বাস্থ্যবতী মেয়ের কাঁকনসুখ হাতে। ভেতর মাজা সম্ভব এমন একটি লোটা চেয়েছিলেন।

হাল ছেড়ে দিয়ে বাসনওয়ালা শেষকালে মাতাদীন পেশকারকে লোটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে পুরোনো হলে চলবে? নামেই পুরোনো। সস্তায় পাবেন। আড়াই টাকায়।

প্রশ্নকর্তা মাতাদীন পেশকারের এ কথার উত্তরে দোকানকার বলে—এই ঘটি সে কিছুক্ষণ আগে নগদ চোদ্দো আনায় সৌখীর মায়ের কাছ থেকে কিনেছে।

চুরির খবর পেয়ে চোর ধরা পড়ার পর থানার দারোগা সাহেব সঙ্গে সঙ্গেই সাইকেলে করে বাসনের। দোকানে হাজির হলেন।

লোটার নীচেয় নিজের হাতে আঁকা তারা চিহ্ন দেখে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি মাতাদীন পেশকার তার লোটা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হন।

দোকানদার সম্পর্কে পেশকারের অভিমত, সে দিনে দোকানদারি করলেও রাতে সিঁধকাঠি নিয়ে বের হয়।

পুলিশ যখন বাড়ি এল সৌখী তখন বিছানায় ঘুমুচ্ছিল।

- নতুন পাওয়া স্বাধীনতায় সৌখী ভেবেছিল সে আজ কিছুতেই বেলা বারোটার আগে বিছানা ছেড়ে উঠবে না।

সকালবেলায় বাসনওয়ালা ও মাতাদীন পেশকারের সঙ্গে দারোগা-পুলিশ দেখে বুড়ির বুক কেঁপে ওঠে।

 

এতদিন সৌখীদের বাড়িতে পুলিশ-দারোগা আসত ডাকাত স্বামী ও ছেলের খোঁজে কিন্তু আজ সৌখীর মা নিজেই চুরি করেছে তাই তারা এসেছে বলেই আজ ব্যাপারটা অন্যরকম।

উদ্ধৃত বাক্যে তখন বলতে বুড়ির স্বামী ও ছেলের ডাকাতি করার পর তাদের খোঁজে পুলিশ-দারোগার আসবার সময়কে বোঝানো হয়েছে।

সৌখীর মায়ের চুরি করার পর যেদিন সকালে পুলিশ এল তার প্রায় পাঁচ-সাত বছর আগে বন্দুকের খোঁজ করার জন্যে ভোররাতে সৌখীদের বাড়ি পুলিশ ঘেরাও করেছিল।

সৌখীর মায়ের ধারণা ছিল বাসনওয়ালারা পুরোনো বাসনগুলোতে রংচং দিয়ে নতুনের মতো না করে। নিয়ে বিক্রি করে না।

দারোগা সাহেব সৌমীর মাকে জিজ্ঞাসা করল, সে লোটাটি বাজারের বাসনের দোকানে চোদ্দো আনার বিক্রি করেছিল কিনা।

লজ্জায় সৌখীর মা অভিযোগ অস্বীকার করতে ভুলে গেল।

লোটা চুরির ব্যাপারে দারোগা সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে বুড়ি কোনো জবাব না দিয়ে একবার শুধু ছেলের দিকে তাকিয়ে মাথা হেঁট করে নিল।

জেলে থাকাকালীন সৌখী জেলখানার গুদামে ডিউটি দিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে যে নব্বই টাকা রোজগার করে এনেছে এখানে সেই টাকার কথাটাই বলা হয়েছে।

ঘরদোরের দিকে তাকিয়ে সৌখীর সংসারের দৈন্যদশার কথা আঁচ করে নেওয়া উচিত ছিল।

সকালবেলায় উঠে সৌখী মায়ের হাতে রোজগার করে আনা টাকা তুলে দেওয়ার সময় পায়নি।

জেলের মধ্যে ডাকাতরা তাদের কাজের সমতুল কাজের লোক অর্থাৎ লাইফার সঙ্গে আলাপ করে তার। সামান্য ছিঁচকে কদুচোরদের সঙ্গে আলাপ করে না।

আর থাকতে না পেরে সৌখী দারোগা সাহেবকে বলল তিনি কেন মেয়েমানুষ নিয়ে সে-ই কাল রাতে ঘটি চুরি করেছিল।

দারোগাবাবু তাঁর অনুচরদের দিকে তাকিয়ে বিজয়ী দৃষ্টি হেসে বোঝাতে চাইলেন এত বেলা পর্যা সৌখীকে ঘুমাতে দেখে তিনি আগেই বুঝেছিলেন চুরি সৌখীই করেছে।

সৌখীর মা মনে করে সে-ই ছেলের নামে কলঙ্ক এনেছে।

সৌগীর মা ছেলের নামে কলঙ্ক এনেছে, তার জনো ছেলে-বউয়ের সঙ্গে দেখা আবার জেলে যেতে হচ্ছে এই অপরাধবোধেই সৌখীর মা দারোগাবাবুর পায়ে মাথা কুটছিল।

যেহেতু দারোগাবাবুর আসল অপরাধীকে দরকার তাই বুড়ির সঙ্গে বাসনওয়ালাকে নিয়ে তিনি আর মাথা ঘামাতে চান না।

ডাকাতেরা মাঝে গল্পের শেষে মেঝেতে পড়ে ডুকরে কাঁদতে থাকা অবস্থায় দেখা গেল ।

ছেলেকে আলু চচ্চড়ি খাওয়ানোর আশায় সৌখীর মা যে আলুর তরকারি করছিল তারই পোড়া গন্তু সারা পোড়ায় ছড়িয়ে পড়ছিল।

পুলিশের সঙ্গে যাওয়ার আগে সৌখী তার কোমর থেকে বাটুয়া বের করে ঘাটিয়ার ওপর রেখে গেল।

আলোচ্য উদ্ধৃতিটি বাংলা সাহিত্যে অন্যতম বলিষ্ঠ লেখক সতীনাথ ভাদুড়ীর ডোকাতের মা' গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। ডাকাত দলের প্রত্যেক সদস্য ডাকাতির পর বাড়ি ফিরে নির্দিষ্ট সংকেতের মাধ্যমে ঘরের ভিতর থেকে নরজা খোলার পর ঢুকতে পারে। তাদের ধরবার জন্য পুলিশ এলে তারাও দরজায় কড়া নেড়ে শব্দ করে । ফলে যখন তখন একই রকম শব্দ হলে ধরা পড়ার ভয় থাকে তাই প্রত্যেকের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে টোকার ধরনও পালটে যায়। টোকা মারার ভিন্নতায় দেখা যায়—টকটক করে দু-টোকার শব্দ তিনবার হলে বাড়ির লোক বুঝাবে দলের লোক টাকা দিতে এসেছে। তিনবারের পর আরও একবার এই টোকা পড়লে বুঝতে হবে বাড়ির লোক সৌখী নিজে এল। কোনো দলের লোকের মারফত টোকা মারবার এই রীতি মাঝে মধ্যেই অন্যের কাছে প্রকাশ হয়—এমনকি পুলিশের কাছেও এই গুপ্ত ইশিত প্রকাশিত হয়ে পড়া বিচিত্র নয়। তাই যখন দেখা যায় এরকম অনাগত অনাবশ্যক উৎপাত উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে তখনই টোকার ধরন বদলে যায়। একই রীতির টোকার অপ্রত্যাশিত বিপদের আগম-সম্ভাবনার প্রসঙ্গে প্রশ্নোক্ত উদ্ধৃতি করা হয়েছে। আর এভাবেই ভিন্ন ধরনের টোকার ভিন্ন-বৈশিষ্ট্য নিয়েই তার সামগ্রিক গুরুত্ব |

ডাকাত দলের এই টোকা পালটানোর কারণ হল মানুষের মধ্যেকার চিরন্তন লোভ, লালসা ও বিশ্বাসঘাতকতা। সৌখী জেলে যাওয়ার পর তার দলের লোকেরা তার বাড়িতে যথাসময়ে এখন আর সংসার খরচ দিয়ে যায় না। ফলে বুড়ি ছেলের বউ ও নাতিকে নিয়ে মহা সমস্যায় পড়ে। প্রথম দু-বছর দিলেও শেষের তিন বছর আর দিচ্ছে না। এই অবস্থায় বুড়ি ভাবতে বসে। সে জানায় দুনিয়ায় এখন কাকে বিশ্বাস করা যাবে। পুলিশ না হয় ঠেকানো যায় কিন্তু নিজের দলের লোকের মধ্যে পাপ ঢুকলে তাকে আটকানো যায় না। দলের লোকেরা টোকার রকমফের জানে সেভাবেই সংকেত মারফত নিজেদের কর্তব্য-কর্ম করে যায়। সেই আপন জনের মনের পাপ দূরে রাখা কোনো ভাবেই সম্ভব হয় না। তাই নিজের বাড়িতে নিজের আগমন বিষয়ে জানানোর টোকাও মাঝে মধ্যেই বদলাতে হয়। সৌখীর নির্দেশিত সেই সংকেতসূচক ইঙ্গিতও মাঝেমধ্যে তাই বদলাতে হয়েছে। তাই টকটক করে দু-টোকার শব্দ তিনবার হওয়ার পর থেমে যদি আরও একবার হয় তবে সৌখীর মা বুঝে নেয় তার ছেলে এসেছে। তা ছাড়া সৌখীর আরও নির্দেশ ছিল—টোকা পড়ামাত্রই যেন হুট করে দরজা না খোলা হয়। বরং দশবার নিশ্বাস ফেলতে যতটা সময় লাগে ঠিক ততটা সময় যেন বুড়ি নেয়। তারপর দরজা খোলার ব্যবস্থা করা যাবে। তাই বাইরে অপ্রত্যাশিত পুলিশি উৎপাত ও দলের লোকের মনে ঢুকে পড়া পাপ থেকে তাৎক্ষণিক রক্ষা পাওয়ার জন্যেই বারবার টোকা মারবার ধরন বদলাতে হয়।

সতীনাথ ভাদুড়ীর লেখা 'ডাকাতের মা' গল্পের থেকে উদ্ধৃত এই উক্তিটিতে যা শোনার কথা বলা হয়েছে সেটি এক সময়ের ডাকাতের বউ ও বর্তমানের ডাকাতের মা শুনেছিল ।।

দুনিয়ায় কোন মানুষকে বিশ্বাস করা যাবে—এই বিষয় নিয়ে সৌখী ও তার বাপের সমকালীন দলের লোকদের তুলনা করতে গিয়ে সৌখীর মা যে কাহিনি শুনেছিল তা হল—সেকালে দলের একজন পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর নিজেই নিজের জিভ কেটে দেয়। তার ভয় ছিল পুলিশের অত্যাচারে সে হয়তো তাদের দলের লোকদের সম্বন্ধে জানিয়ে দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু আজ আর সে রকম হয় না।

• বর্তমান কালের প্রেক্ষিতে দেখা যায়—আগের মতন দল-প্রীতি এখন আর নেই। তারই উদাহরণ টেনে সৌখার মা জানায় সৌখী পাঁচ বছর জেলে গেছে; প্রথম দু-বছর দলের লোক টাকা দিলেও এই তিন বছর আর দিচ্ছে না। আগে এরকম হতে পারত না। ন্যায়-অন্যায়, অর্তব্য-অকর্তব্যের পাঠ দুনিয়া থেকে একেবারেই উঠে গেছে। সৌখীর বাবা যখন জেলে যেত। তখন কোনো দিন এরকম হয়নি। এমনকি সৌখীর আগে দুবার জেল হলেও দলের লোকেরা যথাসময়ে টাকা দিয়ে গেছে।কিন্তু এবার থেকেই বিপত্তি দেখা দিচ্ছে। আগে দলের লোকেরা মাস যেতে না যেতেই টাকা বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যেত।এমনও হয়েছে কখনো কখনো আগাম তিন-চার মাসের টাকাও একসঙ্গে দিয়ে গেছে। কিন্তু এখন অন্যরকম। পরিবারের আয়ক্ষম ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার পরিবারকে দেখার কেউ নেই। পয়সার অভাবে সংসার ভেসে গেল কিনা তার খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। সৌখীর বাড়িতে তার বুড়ি মা, বউ, ছেলে আছে অথচ তাদের দেখভাল করার জন্য দলের লোকের কোনো দায় নেই। কেউ একবার উকি মেরেও দেখে না। বুড়ি এবার তার পরিবারের চিন্তায় বিভোর হয়ে পড়ে। জানায় ডাকাতের বাড়ির লোক বলে কেউ তাদের কাজেও নেয় না। একারণে তার ছেলের বউ ও নাতিকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। আর নিজে একবেলা দুমুঠো ভাতের তাগিদে খই-মুড়ি বেচে। অথচ সৌখীর সঙ্গে থানার দারোগা পর্যন্ত তুই-তোকারি করে কথা বলে না, চৌকিদার পর্যন্ত কাঁপে। এভাবে সৌখীর মা অতীত দিনের মানুষের মূল্যবোধের বিচার করতে বসে। তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আগেকার মানুষদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দরদ ছিল, দলের প্রত্যেকে প্রতি তারা ছিল আন্তরিক। কিন্তু আজ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। সুযোগ বুঝে দলের ক্ষতি করতেও তারা পিছপা হয় না। পৃথিবীতে তাই কাউকে এখন আর বিশ্বাস করা যায় না।

সতীনাথ ভাদুড়ীর বিখ্যাত গল্প 'ডাকাতের মা' গল্প থেকে নেওয়া এই উদ্ধৃতিটিতে 'তারই' বলতে এখানে সৌখীর একমাত্র ছেলেকে বোঝানো হয়েছে।

তার সম্পর্কে একথা বলার কারণ হল ডাকাতির কেসে শাস্তিপ্রাপ্ত বাবা জেলে থাকায় তার দলের সদস্যা এখন আর সৌখীর পরিবারকে দেখে না। পাঁচ বছরের জেল খাটা আসামী সৌখীর পরিবারকে দু-বছর মাসে মাসে টাকা দিয়ে গেলেও এখন আর তারা টাকা দিতে আসে না। অথচ সৌখীর নামে চৌকিদার কাঁপে, থানার দারোগাসাহেব পর্যন্ত তার সঙ্গে অবহেলাভরে কথা বলে না—ডাকাত হিসেবে তার যথেষ্ট নাম ডাক । সেই মানুসটির একমাত্র ছেলেকে দেখার কেউ নেই। তাকে বাঁচার জন্য এখন তার মামার বাড়ির মুখাপেক্ষী হতে হয়। যার বাবা এত প্রভাবশালী তার চরম অনাহার ও অসহায় পরিনিতির সঙ্গে বর্তমানকালের ডাকাতদলের নৈতিক অধঃপতনকে স্পষ্ট করাই একথা বলার কারণ।

ছেলেটির সম্পর্কে ব্যবস্থা নিতে তাকে শেষ পর্যন্ত তার মামার বাড়ি অর্থাৎ বউয়ের বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। সৌমীর কণ্ঠ রোগাটে। শরীর শক্ত-সমর্থ নয়। সৌখীর বুড়ি মায়ের পক্ষে কাজ করা অসম্ভব। তাই সে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাই মুক্তি বেচে। তাতে যা আয় হয় তাতে নিজের পেটই চালানো শক্ত। বাধ্য হয়ে গয়লাবাড়ির মেয়ে ছেলের বউকে সপুত্র বাপের বাড়ি পাঠাতে হয়েছে। তার ভাবনা- বেয়াইয়ের দুটো মোষ আছে, সেখানে তবুও নাভিটার পেটে একটু একটু দুধ পড়বে। তার শরীরে এখন দুধের প্রয়োজন। তা ছাড়া বছরখানেক বাদে সৌখী জেল থেকে ছাড়া পেলে তাদের আর এই অসুবিধা হবে না। থেকে কুপোর গয়না মুড়িয়ে দেবে। আসল কথা সৌখীর মা তার নাতিকে যথেষ্ট ভালোবাসে। মূলত তার এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র নাভির মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে সুস্থ রাখার তাগিদে। তাই বউ নাতি নিয়ে ঘর করার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সৌমীর মাকে হাহা হয়ে তাদেরকে বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দিতে হয়। তবে তার একটাই সান্ত্বনা বেয়াই বাড়িতে তার নাতি অন্তত কিছুটা হলেও পুষ্টিকর খাবার পেয়ে ভালো থাকবে। শরীরটাকে সুস্থ রাখতে সমর্থ হবে। বুড়িও নিশ্চিন্ত থাকবে।

সতীনাথ ভাদুড়ীর লেখা অন্যতম গল্প 'ডাকাতের মা' থেকে সংকলিত এই উদ্ধৃতিটিতে সৌখীর মায়ের দুঃখের দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। সৌথীর মা এক সময় ছিল ডাকাতের বউ: স্বামী মারা যাওয়ার পর এখন সে ডাকাতের মা। ডাকাত পরিবারের স্ত্রী ও মা হিসেবে তাকে বহুকাল বাড়ি-ঘর পুলিশ-দলের লোকদের সামলাতে হয়েছে। তাদের সংকেত ধ্বনির সঙ্গো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকতে হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে তার ডাকাত বাড়ির লোক হিসেবে নিত্য-নৈমিত্তিক কাজের সঙ্গে জড়িত নয়। আগে তাকেই রাত-বিরেতে দরজায় টোকা পড়ার শব্দে, টোকার প্রকৃতি বুঝে ছেলের নির্দেশমতো দাবার নিশ্বাস ফেলে দরজা খুলতে হত। সৌখী জেলে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন একাজ তাকে করতে হচ্ছে না। একবার তো নাকমুখ ঢেকে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় মাকে ভয়ানকভাবে মেরেছিল। এমনকি বলেও রাখে— 'ফের যদি কোনোদিন নাকমুখ ঢেকে শুতে দেখি তাহলে খুন করে ফেলে দেব। ছেলের মার খেয়ে ও এই ভয়ানক কথা শোনার পর থেকে বুড়ি ছেলের কথামতো আর কোনোদিন ওভাবে ঘুমায়নি। ছেলে জেলে যাওয়ার পরে আর কেউ শাসন করবে না জেনেও সে আর এভাবে ঘুমাতে পারেনি। অন্তত এই পাঁচ বছরের মধ্যে তো নয়ই। একারণে ছেলের শাসনজনিত ঐকান্তিক অনুরাগ থেকেই বুড়ির মনে ছেলের প্রতি যে টান অনুভূত হয় সেটিই বুড়ির একথা বলবার কারণ।

• সৌখীর মা আজ মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধা। এসময় তার কাছে ছেলে, ছেলের বউ বা নাতি কেউ নেই। হোক না ডাকাত—তবু মানুষ তো বটে, তার ওপর মা। ছেলে ছেলে অথচ তার নির্দেশ পালনের মধ্য দিয়ে বুড়ি যেন ছেলের আগমন উপলব্ধি করে। তার উপর সে হয়তো ভাবে দলের লোকেরাও আসতে পারে। এসবই আপেক্ষিত। তবে যেটা সত্যি তা হল মাতৃহৃদয়ের বাৎসল্যজনিত নাড়ির টান। সন্তানের জন্য মানের চিন্তার শেষ নেই। কাছে না থাকা ছেলের জন্য বুড়ি তাই ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে তার সম্যক উপস্থিতি অনুভব করতে চায়। তার শাসন-আবদার পীড়ন-দমনের মধ্যেও সন্তানের আন্তরিকতা খুঁজে পায়। সেগুলো পায় না বলে আজ সে দুঃখবোধ করে, সেই দুঃখের মধ্যেই ছেলেকে সে খুঁজে পায়। এটা তার মানসিক যন্ত্রণা হলেও সে আনন্দাশ্রুতে হাত হয়। তাইতো বুড়িকে দুঃখ করে বলতে হয় "আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমুলেও একটা বকুনি দেবার লোক পর্যন্ত নেই বাড়িতে, গেল পাঁচ বছরের মধ্যে। এ কি কম দুঃখের কথা।”

বিখ্যাত সাহিত্যিক সতীনাথ ভাদুড়ীর লেখা 'ডাকাতের মা' গল্প থেকে নেওয়া প্রশ্নের উদ্ধৃতিটিতে সামান্য ব্যাপার বলতে বহুদিনের পরে সৌখীর মায়ের ঘরের দরজায় আবার দুটো টোকা পড়ার ব্যাপারটিকে বোঝানো হয়েছে।

• ব্যাপারটি 'সামান্য' বলে উল্লেখ করলেও আসলে তা সামান্য ছিল না বরং অনেক বেশি তাৎপর্যমণ্ডিত এ বৈশিষ্ট। সমন্বিত ছিল। সৌগীর পাঁচ বছর জেল হয়েছে—দীর্ঘদিন কেটেও গেছে কিন্তু বুড়ি ছেলের কথা ভেবে একটা দিনের জন্যে কম্বলে নাকমুখ ঢেকে ঘুমায়নি। বয়স বেড়ে যাওয়ায় শীত বেশি লাগলেও সব সময় মনের মধ্যে একটা অজানা ভয় কাজ করত। তা ছাড়া দুশ্চিন্তারও শেষ ছিল না। বউ-নাতির সম্পর্কেও সে ভারত। তার পরিবার ডাকাতের হলেও সে প্রধানত মা। তাই মাতৃদয়ের সদা শঙ্কিত মনে বুড়ি সব সময় অজ্ঞাত ভীতিতে দিন কাটাত।

দিন কাল অতিক্রান্ত কিন্তু সৌখীর সাজার মেয়াদ শেষ হয়নি। পাঁচ বছর পার হতে বেশ বাকি। এমনকি এক শীতের রাতে শীত আটকাতে অক্ষম পুরোনো কম্বলের কথা চিন্তা করতে গিয়ে তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। বন্যা টকটক করে শব্দ হয়। বুড়ি গ্রাহ্য করতে চায় না, ভাবে টিকটিকির ডাক। পাকে পড়লে ব্যাঙও হাতিকে লাথি মাঝে—এই চিন্তা করে সে চিন্তামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতেই আবার টকটক করে দুবার টোকা পড়ল। এই নিয়ে দু-ঢোকার টকটক শব্দ তিনবার হয়ে হোল তাই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কারণ এই শব্দ হওয়া পর্যন্ত ছিল দলের ডাকাতদলের কোনো সদস্যের আসবার সংকেতধ্বনি। এবার বুড়ি উঠে বসে। ভাবে এতদিন পরে হতো ছেলের ডাকাতদলের কোনো সদস্যর তাদেরকে মনে পড়ল ছিলো

দরজার ওপর এই তিনবার টকটক শব্দ হওয়া মোটেই টিকটিকির খুনসুড়ি না। বুড়ির মধ্যে উত্তেজনা সূচনা হল। নিভে যাওয়া আগুনের ধোঁয়ায় আরও জমাট হওয়া অন্ধকারে বসে বুড়ি খানিকটা স্বস্তিও বোধ করতে থাকে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা শঙ্কা দীর্ঘদিন কেউ তো এমন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ করেনি। অনেক দিনের অনভ্যাসে বুড়ির মধ্যে আগের মতন সেই সহজ স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য প্রকাশগুলিতে থাকার কথা নয়। তাই এই দীর্ঘ বিরতির পর আবার যখন টোকা পড়ল তখন তাকে তো উত্তেজিত করবেই। ডাকাত পরিবারের মা যাতে অভ্যন্ত ছিল, তাতে একবার ঘাটতি পড়ে আবারও সহসা সেই অভ্যন্ত শব্দের অনুভূতি পেয়েছিল বলেই আপাতভাবে সামান্য মনে হলেও তা অসামান্য বোধে বুড়ির মনে উত্তেজনা এনেছিল।

সতীনাথ ভাদুড়ীর লেখা ডাকাতের মা গল্প থেকে উদ্ধৃত এই বাক্যে যে টোকা পড়বার কথা বলা হয়েছে, তারাতাৎপর্য হল—এই টোকার শব্দ শুনে সৌদীর মা বুঝে নেবে যে তার ছেলে ফিরেছে। তার দলের অন্য কোনো সদস্য অন্য কেউ নয়৷৷

এই টোকা না পড়ার কারণ হল- সৌখী কোনো এক ডাকাতির কেসে ধরা পড়ায় তার পাঁচ বছরের জেল হয়। এখনও পাঁচ বছর কাটেনি, সুতরাং সৌখীর বাড়ি ফেরার কোনো সম্ভাবনাই থাকার কথা নয়। অথচ দরজা যে ধরনের টোকা পড়ল তা কিন্তু অন্য ইঙ্গিত দেয় সৌমীর ঘরে ফেরার ইঙ্গিত। ফলে অন্তত পাঁচ বছরের মধ্যে এই ধরনের টোকা পড়ার কোনে সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও যখন সেই রীতির টোকা পড়ল তা বুড়ির কাছে সম্পূর্ণ অবাস্তব ছিল বলেই বুড়ি ভেবেছে টোকা পড়বার কোনো কারণ ছিল না।

অপ্রত্যাশিত টোকা পড়বার পর বুড়ি আরও বেশি অবাক হল। সে বুঝল তাহলে দলের লোক আসেনি টাকা পাওয়ারে সম্ভাবনা নেই। টোকা দেবার নিয়মকানুন জানে না বলে হয়তো এরকম করেছে। আবার পুলিশের লোকও হতে পারে। যাইহোক বুড়ি সাবধানে কথা বলার মনস্থ করে। দরজা খোলার আগে ছেলের নির্দেশমতো তাড়াতাড়ি দশবার নিশ্বাস ফেলে নিয়মরক্ষা করে নেয়। দরজা খুলল—কিন্তু সামনেই এক লম্বা-চওড়া লোক। গা ছমছম করে উঠল। অসম্ভব সম্ভব করে সৌখীকে দেখে আনন্দে বুড়ি তাকে জড়িয়ে ধরে। তার আনন্দ রাখার জায়গা নেই। বিস্মিত নাকে সৌদী জানার লাটসাহের জেল দেখতে গিয়েছিল; সেই তার কাজ দেখে খুশি হয়ে ছেড়ে দেবার হুকুম দেয়। অবশ্য সে হেড জমাদার সাহেবকে আগে থেকে এ ব্যাপারে টাকা খাইয়ে রেখেছিল। সৌখী জোরে কথা বলে তার বউকে শোনাতে চাইছিল। তাতে শব্দ শুনে সে আসে। বুড়িও ছেলের চোখের দিকে লক্ষ রেখে ব্যাপার বুঝে নিয়ে বলে-বউ বাপের বাড়ি গেছে। সৌখী কারণ জানতে চাইলে তাকে মিথ্যে বলে ছেলেকে কাছে রাখতে চাইল।তারপর ছেলেকে খই-মুড়ি খাইয়ে ঘুমোতে পাঠিয়ে সে কালকে ছেলেকে কী খেতে দেবে-এই চিন্তা করতে থাকে। দুশ্চিন্ত বুড়ির মাথা গরম হয়। ছেলেকে টাকার কথা বলতে না পেরে বুড়ি মাতাদীন পেশকারের বাড়ি থেকে লোটা চুরি করে বাজারের বাসন গুলাকে বিক্রি করে। কিন্তু পেশকারের লোটা কিনতে যাওয়ায় বাসনওয়ালার কাছ থেকে সেই লোটা পাওয়া গেলে ব্যাপারটা ঘোরালো হয়ে পড়ে। শেষে চুরি ধরা পড়ে যায়। পুলিশের কাছে বাসনওয়ালা সব বলে দেয়। সৌখার মা চুরি করলেও সারোগাসাহেব সৌখীকেই চোর হিসেবে শনাক্ত করে ধরে নিয়ে যায়। বুড়ির সব আশা-ভরসা মুহূর্তে বুদবুদের মতন শুনো মিলিয়ে যায়। সৌখীর মনেও অনেক দ্বিধার জন্ম দেয়। কর্তব্যবোধের বিষয়টি সে-ও ভারতে থাকে। সৌদীকে থানায় নিয়ে যাওয়া হল, আর অন্যদিকে তার জন্য রান্না করতে থাকা আলুর তরকারি উনোনে পুড়ে পাড়াময় গন্ধ ছড়াতে থাকে।

সতীনাথ ভাদুড়ীর অন্যতম বিখ্যাত গল্প 'ডাকাতের মা' থেকে সংকলিত এই উদ্ধৃতিটিতে যে তখনই সব কথা খুলে বলতে চায়নি সে হল সৌখীর মা।

সৌখীর মা সদ্য জেল থেকে সাজা খেটে আসা ছেলে সৌখীর বাড়ি ফেরা মাত্র সেই রাত্রেই বুড়ি এতদিনে ঘটে যাওয়া বিষয় না বলতে মনস্থিত করে।

• সৌখীর মায়ের বলতে না চাওয়া সব কথাগুলি হল ছেলের জেলে যাওয়ার পর থেকে ঘটে যাওয়া তার সাংসারিক ও দলগত বিষয়গুলি। সাংসারিক কথা হল—অত্যন্ত দারিদ্র্যের কারণে ছেলের বউ ও নাতিকে তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বউয়ের বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া। আর দলগত দিকের বিষয় হল- দলের অন্যান্য সদস্যের কার্যকলাপ। সৌখীর জেলে যাওয়ার পর প্রথম দু-বছর ঠিকমতো টাকা দিয়ে যাওয়া এবং শেষের দিকে কোনো রকম খোঁজখবর না নেওয়া। একই সঙ্গে তাদের টাকা না পাঠানো এবং সে কারণেই সৌখীর বউ-ছেলেকে পাঠিয়ে দেওয়া বিষয়গুলিই হল উদ্ধৃতিটিকে। উল্লেখিত 'সব কথা'।

• সৌখীর মায়ের সব কথা খুলে বলতে না চাওয়ার কারণ প্রধানত মায়ের দ্বিধা-সংশয়ান্বিত মাতৃমনোসুলভ মানসিকতা। সন্তানের জন্য মায়ের মন সবসময় ভয়ে কাতর থাকে। ভাবে না জানি কোন দিক দিয়ে আবার কোন বিপদ ছেলের ওপর চেপে বসে। তা ছাড়া ছেলের মেজাজ কড়া হওয়ায় এই ভয় আরো বেশি করে তাকে ভীত করে রাখে। তাই বুড়ি প্রথমে কিছু বলতে চায় না। কারণ সে ভাবে পুরুষ মানুষের রাগ দলের লোকের টাকা না পাঠানোর জন্য যদি রেগে ছুটে গিয়ে। তাদের সঙ্গে কোনো বোঝাপড়ায় বসে তবে আবার কোনো বিপদ হতে পারে। এই সম্ভাবনা যেমন আছে তেমনি যদি ছেলে বা তার বউয়ের শরীরের অবস্থা কিংবা সংসার চালানোর অক্ষমতার ব্যাপারে বলে তাহলে সৌখী এখনই হয়তো সেখানে। চলে যাবে। এতদিন পরে বাড়ি ফেরা নিজের ছেলেকে সে একটা দিনও কাছে রাখতে পারবে না।

সৌখীর মা বুড়ি হলেও মা সে সন্তানের প্রতি মায়ের টান যেমন বোঝে তেমনি বাবা হিসেবে ছেলের প্রতি সৌখীর ভালোবাসার ব্যাপারটিও উপলব্ধি করে। মাতৃত্বের এই সার্বিক উপলব্ধি বুড়িকে এমনভাবে দ্বিধান্বিত করে যে সে এই মুহূর্তে ছেলেকে কোথাও যেতে দিতে চায় না। এ কারণেই বুড়ি সব কথা খুলে বলতে চায়নি।

ডাকাতের মা' গল্প থেকে উদ্ধৃত এই বাক্যে যার পা গরম না হওয়ার কথা বলা হয়েছে সে হল গল্পের প্রধান।

চরিত্র সৌখীর বৃদ্ধা মা। তার পা গরম না হওয়ার কারণ একাধিক হতে পারে। প্রথমত বলা যায় বয়সজনিত কারণে বুড়ির পা গরম হয় না। দ্বিতীয়ত অত্যধিক শীত পড়া ও তা নিবারণ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ শীতবস্ত্র না থাকা। তৃতীয়ত, জেল ফেরত ছেলের জন্য মাতৃহৃদয়ের স্বভাব আন্তরিকতা। এই সব কারণে সৌখীর মায়ের পা গরম হয় না।

• পা গরম না হলেও সৌখীর মায়ের মাথা গরম হতে শুরু করে। আর এই মাথা গরম হওয়ার কারণও কম নয়। বাহা কারণে মাথা গরম হয় না কিন্তু আস্তর-উত্তেজনায় দেহ গরম না হলেও মাথা গরম হয়ে ওঠে। সৌখী ঘরে ঢুকে মায়ের গায়ের ছেঁড়া কম্বল দেখে নিজের গায়ে থাকা নতুন কম্বলটি মাকে দেয়। বুড়ি আপত্তি করলেও তা গ্রাহ্য না করে সৌখীই মায়ের গায়ে নতুন কম্বলটি জড়িয়ে দেয়। কিন্তু বুড়ির শরীর গরম হয় না। তার মনে রাজ্যের দুশ্চিন্তা এসে হাজির হয়। তার মধ্যে প্রধান দুশ্চিন্তা সকালে ছেলেকে সে কী খেতে দেবে। রাতটা তো কোনোমতে বিক্রির জন্য রাখা খইমুড়ি দিয়ে হয়ে গেছে কিন্তু রাত পোহালে কী ব্যবস্থা হবে। তা ছাড়া এই রাতেই যদি ছেলে ভাত খেতে চাইত তাহলে সে কোনো ব্যবস্থা করত। তার পক্ষে সেটা তো ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না। সৌখীর পছন্দের খাবার আলু চচ্চড়ি—সেটাই বা কীভাবে জোগাড় হবে। এতদিন জেলের মধ্যে কোনোকিছুই হয়তো ভালো করে খেতে পায়নি। ছেলেকে খেতে দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র আলু হলেই চলবে না—চাল, সরষের তেল সবই আনতে হবে। এত পয়সাই বা সে পাবে কোথায়? আবার ভোরে উঠে ছেলেকে বলাও ঠিক হবে না। সে এটাও বলতে পারবে না – “আগে পয়সা যোগাড় করে আন, তবে রেখে দেব।"

এইসব নানা প্রশ্নের হাজারও সংশয় বুড়িকে দুশ্চিন্তায় ডুবিয়ে রাখে। সে ভাবনার কোনো কুলকিনারা পায় না। কী করা উচিত, কীভাবে কোথা থেকে টাকা আসবে এতসব প্রশ্নের কোনো মীমাংসা বুড়ির কাছে নেই। একদিকে তাঁর ইচ্ছা অন্যদিকে তার অপারকামতা, একদিকে মাতৃহৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা অন্যদিকে আকাঙ্ক্ষা পূরণের সার্বিক আপাত অক্ষমতা বুড়িকে ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত করে দেয়। দুশ্চিন্তায় সংশয়ে আশা-নিরাশার দোলায় বুড়ির মন দ্বিধান্বিত হয়ে মন মেজাজকে গরম করে তোলে বলেই সার্বিক দুশ্চিন্তায় বুড়ির মাথা গরম হয়ে ওঠে।

সতীনাথ ভাদুড়ার লেখা 'ডাকাতের মা' গয়া থেকে নেওয়া এই উদ্ধৃতিটিতে তিনি হলেন গ্রামেরই ধনী মানুষ আইনচঞ্চু মাতাদীন পেশকার। এর বাড়ি থেকে সৌখীর মা লোটা চুরি করে বাজারে বাসনওয়ালার কাছে তা বিক্রি করেছিল। • মাতাদীন পেশকারের বাড়ির বারান্দার দোরগোড়ায় গুছিয়ে রাখা থাকে জলভর্তি লোটা। আগের রাতে সেটাই করা হয়েছিল। সাধারণত ভোর রাতে লোটার ব্যবহার হবে ভেবেই এই ব্যবস্থা। সকালে উঠে লোটা যথাস্থানে না পেয়ে শোরগোল পড়ে গেল। গ্রামের বাড়িতে লোটা বাড়ির লক্ষ্মীশ্রী। খোকার মা তাই কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। বারবার পেশকার সাহেবকে তা মনেও করিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি আইনজ—বিষয়টা তাই থানায় জানানো দরকার। তার বহুদিনের পুরোনো কিন্তু অতি পছন্দের লোটা যে চুরি করেছে তাকে শাস্তি না দিতে পারলে তার শান্তি নেই। তাই প্রথমে সে থানায় গিয়ে চুরির রিপোর্ট লেখাল। আবার স্ত্রীর কথা মনে করে এবং লোটার নিত্য প্রয়োজনীয় আবশ্যিকতার কথা বিবেচনা করে নতুন লোটা কিনবার জন্যে ফিরতিমুখো পেশকার সাহেব বাসনের দোকানে গিয়েছিলেন।

এর পরবর্তী ঘটনা খুবই বেদনাবহ। বাসনওয়ালার দোকানেই পেশকার সাহেবের চুরি যাওয়া ঘাঁট পাওয়া গেল। তাকে চেপে ধরতেই বাসনওয়ালা বলে কিছুক্ষণ আগে সে সৌখীর মায়ের কাছ থেকে ঘটিটা নগদ চোদ্দো আনায় কিনেছে। পেশকার থানা থেকে দারোগাকে আনতে লোক পাঠালেন। দারোগা বাসনওয়ালাকে নিয়ে পেশকারসহ সৌখীর বাড়িতে এল। দারোগাকে দেখে প্রথমবার সৌখীর মায়ের বুক কেঁপে উঠল। এযাবৎ কোনোদিন পুলিশকে দেখে সে এত ভয় পায়নি। কিন্তু আজ অন্য ব্যাপার—এতকাল পুলিশ ডাকাতের খোঁজে বা ডাকাতির অস্ত্রের খোঁজে তাদের বাড়িতে এসেছে আর আজ সামান্য ঘটি চোরের খোঁজে তাকে ধরতে পুলিশ এসেছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় বুড়ি কিছু বলতে পারে না। অভিযোগ অস্বীকার করতেও সে ভুলে যায়।

সৌখী ঘুমোচ্ছিল ঘরে, বেশ খানিক পরে উঠে মায়ের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে তাকে একটু ভালো খেতে দেবে বলে মাতৃহৃদয়ের টান ও অভাবের যন্ত্রণা থেকে ছেলেকে নিশ্চিন্ত করতে তার মা চুরি করেছে। মায়ের প্রতিও তার যে কর্তব্য ছিল, তারও যে সংসারের খবর নেওয়া উচিত ছিল তা সে বুঝতে পারে। সে কোনোটাই করেনি, কিন্তু তাই বলে মাকে সে তো পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারে না। বলে ঘটিটা সে-ই চুরি করেছে। দারোগাসাহেবও সৌখীর কথা বিশ্বাস করে তাকেই গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে গেল। সৌখীর মা হতভম্ব, বিস্মিত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৌখী তার কোমরের থেকে বাটুয়া বের করে খাটিয়ার ওপর রেখে গেল। বুড়ি ডুকরে কাঁদতে লাগল। আর উনোনে আলুর তরকারি পুড়ে পাড়ায়। গন্ধ ছড়াতে লাগল।

সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ডাকাতের গল্প থেকে সংকলিত উদ্ধৃতিটিতে যে ব্যাপারটির কথা জানানো তা হল-সৌখীর মায়ের লোটা চুরি করার কথা। মাতাদীন পেশকারের বাড়ি থেকে লোটা চুরি করে বাসনওয়ালাকে বুড়ি চোদ্দো আনায় বিক্রি করে। ব্যাপারটি সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে এবং চোরের সন্ধানও পাওয়া যায়। দারোগা সাক্ষী চোরকে ধরতে আসে। বাসনওয়ালা সৌথীর মাকে ঘটির বিক্রেতা বললেও দারোগা তাকে চোর ভাবতে রাজি নয়। বরং ধারণা সৌখীই চুরি করে মাকে দিয়ে বিক্রি করিয়েছে। ফলে ব্যাপার ঘোরালো হয়ে ওঠে। সৌখী চুরি করে না, কিন্তু কী কারণে চুরি করতে বাধ্য হয়েছে সেটা তাকে বলে বোঝাতে হয় না। মায়ের করুণ মুখ যখন তার দিকে তাকিয়ে হল তখনই সে মায়ের চুরি করার ব্যাপারটি বুঝে মায়ের চুরি করা ব্যাপারটি সৌখীকেও ভাবতে বাধ্য করে। মায়ের কৃত কাজ নিজের উপলব্ধির দীনতা বুঝে আত্মান্বেষণে লিপ্ত হয়। সে ভাবতে বসে চোদ্দো আনা পয়সার জন্য মা শেষকালে একটা ঘটি চুরি করল। কেন

কিছু বলল না। অথচ মা জানে জেলের মধ্যে সামান্য চোরদের সঙ্গে ডাকাতরা কথা বলে না। আলাপ-আলোচনা বা কথাবার্তা যা হয় সবই ডাকাত নামের লাইফারদের সঙ্গে। এই সামান্য কদুচোরদের সাজা মাত্র তিন মাস এতো তার মা জানে। তবুও মা কেন শেষ পর্যন্ত এই কদুচোরের মতো কাজ করল। সৌথীর জিজ্ঞাসা উত্তর কেউ না দিলেও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে সে বুঝতে চেষ্টা করে। ঘরদোরের এই অবস্থা দেখে তার। হ্যাতো আগেই মায়ের অবস্থা বুঝে নেওয়া উচিত ছিল। সংসারের দৈন্যদশা উপলব্ধি করার মতো অবসর সে তো পেয়েছিল ,তবে অহেতুক মাকে দোষ দেওয়া কেন? সব কিছু বুঝে নিয়ে তারই তো উচিত ছিল মানের হাতে টাকা তুলে দেওয়া। তার

কোমরের বাটুয়ায় এখনও নব্বই টাকা রয়েছে। জেলের মধ্যে ঠিকাদারদের কাজ করে সে এই টাকা উপার্জন করেছে। সৌথী এক দোটানার মধ্যে পড়ে। একমনে সে মাকে দোষারোপ করে বলে—“মা তার কাছ থেকে চেয়ে নিল না কেন? মেয়ে মানুষের আর কত আক্কেল হবে।” এরই পাশাপাশি মায়ের জন্য কাতরতাও তার কম নয়। তাই দারোগার প্রশ্নের উত্তরে নির্বাক মায়ের সার্বিক অসহায়তা উপলব্ধি করেই দারোগাবাবুকে সম্বোধন করে বলে, "মেয়েমানুষকে নিয়ে টানাটানি করছেন কেন? আমি ঘটি চুরি করেছি কালরাত্রে "সৌখী দোষ নিজেই নিয়ে নেয়। জেল খাটার অভ্যেস তার আছে ; আর তিনমাস সাজা তার কাছে কোনো ব্যাপার নয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সৌষী যথার্থ কাজই করেছে।

সতীনাথ ভাদুড়ীর "ডাকাতের মা' গল্প থেকে প্রশ্নোত্ত উদ্ধৃতিটি সংকলিত। এই বাক্যটিই গল্পের শেষ বাক। ইঙ্গিতপূর্ণ এই বাক্যটির মাধ্যমেই সৌথীর মায়ের মাতৃসত্তা পাঠকের মনে সারিত হয়। আলুর তরকারি পোড়ার গরে সঙ্গে সঙ্গে সৌথীর মায়ের মাতৃহৃদয়ের হাহাকারও রসিক পাঠকমাত্রই উপলব্ধি করে।

সৌখীর মা ছেলের জন্য তার পছন্দের আলুর তরকারি উনোনে চাপায়। এর জন্য সে লোটা চুরি করে বিক্রি করে পয়সা জোগাড় করে। অথচ ঘটনা এত দ্রুত ঘটে যে রান্না শেষ হবার আগেই চোর ধরা পড়ে যায়। আর চুরির দায় গিয়ে বর্তায়। সেই ছেলের ওপরই। ছেলে দারোগার প্রত্যাশামতো দোষ স্বীকার করতেই দারোগা সৌদীকে গ্রেপ্তার করে। এতে সৌদী মা খুব ভেঙে পড়ে। যে ছেলের জন্য সে চুরি করেছে, রান্না করছে তার খাওয়া তো হলই না, বরং তাকেই বিনা দোয়ে শাস্তি পেতে হচ্ছে দেখে মা হিসেবে বুড়ির দুঃখের সীমা ছাড়ায়। বিমূঢ় বুড়ি রান্নার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আকর্ষণ বোধ করে। বরং মেঝেতে পড়ে ডুকরে কাঁদতে থাকে বলেই আলুর তরকারি উনোনে পুড়তে থাকে।

“ডাকাতের মা' গল্পটি সৌদীর মায়ের মাতৃসত্তার পরিচয়বাহী। ডাকাত মায়ের অন্তর অন্য আর সব মায়ের মতোই সন্তানের জন্য গভীর দুঃখ বোধ করে গল্পে সেই সত্যই গল্পকার ফুটিয়ে তুলেছেন। ছেলে ডাকাতি করে, অপরের সম্পন লুট করে, বাধ্য হয়ে খুনও যে করে না তা নয়, তা সত্ত্বেও ছেলের জন্য বুড়ির মন কাঁদে। দীর্ঘ পাঁচ বছরের মধ্যে সামান্য। বকুনি দেওয়ার কেউ নেই ভেবে বুড়ি তাই দুঃখ বোধ করে। আসলে বুড়ি চায় ছেলে তাকে শাসন করুক। আর প্রত্যেক মা-ই দায়িত্ববান ছেলের শাসন কামনা করে। এটি মাতৃসত্তারই পরিচায়ক।

চুলে পাক ধরা বয়স্ক ছেলেকে বহুদিন পরে কাছে পেয়ে তাকে অন্তত একটা রাতের জন্যও কাছে পেতে চায়। এমনকি ছেলের বউ বা ছেলের ছেলের কাছেও যেতে দিতে তার মন চায় না। ছেলে যাতে তার দলের অন্য ডাকাত সদস্যদের সঙ্গে ঝগড়া না করে তার জন্য তাদের এতকাল টাকা না দিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও ছেলেকে জানায় না। সবার কথা বললে দে যে এক মুহূর্তও মায়ের কাছে থাকবে না—সেটা বুড়ি বোঝে।

মাতৃসত্তার ঐকান্তিকতায় বুড়ি ছেলের কাছে হাত না পেতে ছেলের জন্য খাবার জোগাড় করতে চুরি করে। তারপর যখন ধরা পড়ে তখন সে ভাবে সে-ই ছেলের নামে কলঙ্ক এনেছে। আত্মগ্লানিতে বুড়ি মাথা তুলতে পারে না। ছেলের দিকে তাকিয়ে পুলিশের সামনে সে মাথা হেঁট করে রাখে। নির্বাক থাকে। দারোগার পায়ের কাছে মাথা কুটে তার সলো ছেলে ও বউয়ের দেখা না হওয়ার কথা বলে। সবশেষে ছেলে কোমর থেকে বাটুয়া বের করে খাটিয়ার ওপর রেখে দিলে বুলি মাতৃহৃদয় ছাপিয়ে কান্নার ঢেউ ওঠে। সন্তানের বিয়োগ ব্যথায় সে মেঝেতে পড়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। সন্তানের প্রতি সীমাহীন মাতৃত্বের অনুভূতি না থাকলে কখনোই এমনটি করা সম্ভব নয়—আর এখানেই বুড়ির মাতৃসত্তা অতুলনীয়।

শেকসপিয়র যতই বলুন না কেন- What's in n name', তবুও প্রত্যেক স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির নামকরণের ব্যাপারে অতিমাত্রায় সচেতন। সাহিত্যিক নামকরণের মাধ্যমেই সহজে পাঠককূলের কাছে পৌঁছে যেতে যান, আর পাঠক মাত্রেই নামকরণের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। সুতরাং শ্রষ্টা ও পাঠক দু-তরফ থেকেই নামকরণের দিকটি গুরুত্বের সলো বিচার করা হয়।

সাহিত্য প্রকরণে সাধারণত চার ধরনের নামকরণ রীতি প্রচলিত—১. প্রধান চরিত্রের নামানুসারে করা নামকরণ, যেমন—বলাই, খাজাক্তিবাবু, পোস্টমাস্টার, শুভা ইত্যাদি। ২. বিষয়বস্তু তথ্য ঘটনাকেন্দ্রিক নামকরণ। যেমন— সম্পত্তি সমর্পণ, গুপ্তধন, হালদার গোষ্ঠী ইত্যাদি। ৩. রূপকধর্মী নামকরণ রেকর্ড, ফসিল, অচলায়তন, ডাকঘর ইত্যাদি। ৪. ব্যঞ্জনাধর্মী বা ব্যঙ্গাত্মক নামকরণ; যেমন- পরোমুখম, তেলেনাপোতা আবিষ্কার, জীবিত ও মৃত ইত্যাদি। অবশ্য অনেকের কাছে রূপকধর্মী ও ব্যানাধর্মী নামকরণ প্রায় সমধর্মী। এবার ডাকাতের মা' গল্পের কাহিনির বিচার সাপেক্ষে তার নামকরণের দিকটি আলোচনা করা যাক।

“ডাকাতের মা' গল্পের আখ্যান অনুযায়ী সৌদীর মা-ই। এই কাহিনির ভিত্তিভূমি। তার জীবন কীভাবে কাটছে এটাই গল্পে দেখানো হয়েছে। সৌখীর মা ডাকাত পরিবারের বউ। আগে সে ছিল ডাকাতের বউ স্বামীর মৃত্যুর পর হল ডাকাতের মা। সেই মা হিসেবে তাকে পুলিশি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। রাত-বিরেতে ছেলের আগমন। তার দলের অন্য সদস্যদের আসার সংকেতের প্রকৃতি মনে রাখতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই অনুযায়ী কাজও যথাসময়ে করতে হয়েছে। শীতের রাতে তাকেই দরজা খুলতে হয়েছে ছেলের জন্য। এ ব্যাপারে দেরি হওয়ায় ছেলের হাতের মারও খেয়েছে।ছেলের জেল হলে, সৌথীর মা দলের অন্য সদস্যদের অসহযোগিতার ফলে বই-মুড়ি বেচে সংসার চালাতে সচেষ্ট হয়। সম্পূর্ণ অপারগ হওয়ায় ছেলের বউ ও নাতিকে বউয়ের বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। তারপর অপ্রত্যাশিতভাবে ছেলের আগমন হলে সে সন্তানকে একদিনের জন্য কাছে রাখার জন্য সমস্ত কথা মনের মধ্যেই চেপে রাখে। সন্তানের জন্য তার চিন্তার শেষ ছিল না বলেই পরদিন সকালে ছেলেকে কী খাওয়াবে কোথা থেকে তার জোগাড় হবে তা ভাবতে ভাবতে চুরি করতে বেরিয়ে পড়ে। ডাকাতের মা চোরে পরিণত হল অথচ জেলফেরত ছেলেকে টাকা জোগাড় করার কথা বলতে পারল না। ধরা পড়ে গেলে ছেলের সম্মানের কথা ভেবে প্রাথমিকভাবে নিজের দোষ স্বীকার না করলেও শেষে ছেলের সঙ্গে বউ ও ছেলের দেখা হয়নি বলে দারোগার পায়ে মাথা কুটতে থাকতে। ছেলের জন্য রান্নারত, তার অতি পছন্দের আলুর তরকারি জিনোনে পুড়তে থাকে। আর বুড়ি মেঝেতে পড়ে ডুকরে কাঁদতে থাকে। সমস্ত গল্পটির কেন্দ্রবিন্দু সৌখীর মা, তার কাহিনি, তার মানসিকতা, তার মাতৃসত্তার আনন্দ-বেদনাই গল্পের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। তাই প্রধান চরিত্রের নামানুসারে করা নামকরণ রীতি অনুযায়ী ডাকাতের মা" গল্পের নামকরণ সার্থক ও সুসামঞ্জসা ।।

ছোটোগল্পের সার্থকতা নির্ভর করে ছোটোগল্পের আন্তর বৈশিষ্ট্যের ওপর। সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমালোচকরা। যেসব কথা বলেছেন তার মধ্যে গল্পের প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো তাঁর 'বর্ষাযাপন' কবিতায় বলেছেন— ছোটোগল্প হবে— ১. “ছোটোপ্ৰাণ ছোটো ব্যথা ছোটো ছোটো দুঃখ কথা' যা নিতান্তই সহজ ও সরল। "সহস্র বিস্মৃতি রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি —তার কিছু সুখ-দুঃখের অশ্রুজল। ৩. ছোটোগল্পে নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা' তাতে কোনো তত্ত্ব-উপদেশ থাকবে না। এমনকি গল্প শেষ করেও পাঠকের মনে হবে—"শেষ হইয়াও হইল না শেষ। এছাড়া আরও কিছু বৈশিষ্ট্যে ছোটোগল্পে থাকা উচিত বলে মনে করা হয়। যেমন—১. হেটোগল্পের উপাদান—অপার-বিস্তৃত রহস্য জটিল আধুনিক জীবনভূমি। যার প্রতি মুহূর্তে অতলান্ত গভীরতা উপলব্ধি করা যায়।

শিল্পী-খ্যাতির ঘন-নিবিড় অনুভব তন্ময়তা এবং চলমান জীবনের বিষয়ে ধ্যানী-জনোচিত আত্মস্থতা। ৩. ব্যঞ্জনাধর্মিতা, যা জীবনের বিশেষ মুহূর্তের অবস্থান করেও স্থান-কাল-পাত্র ভেদে আবেগের অভিঘাতে শাশ্বত জীবনভূষিত উৎক্রমণ প্রাপ্ত হয়

আসল কথা—ছোটোগল্পকে জীবনের গভীরে প্রবেশ করে এক সুস্থির চেতনার দর্পণে আত্মআবিষ্কারে সক্ষম হতে হবে।

পাঠকমাত্রই তার মধ্যে জীবনের আপন প্রতিরূপ দর্শন করতে পারবে। এবার দেখা যাক ‘ডাকাতের না' গল্পে ব্যাপারগুলি কতটা পরিস্ফুট হয়েছে। 'ডাকাতের মা' গল্পটি সৌখীর মানের জীবনবেন। তারই দুঃখ যন্ত্রণা, পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনি। তারই ইচ্ছা-অনিচ্ছা সাধ্য সাধনের কথা। স্বামীর মৃত্যুর পর ডাকাতের বউ থেকে ডাকাতের মা হয়ে ওঠা এবং সস্তানের জন্য তার চুরি করা ও ধরা পড়ার পরে আত্মমানিতে মিশে যাওয়ার মধ্য দিয়ে গল্পে সর্বকালের সব মায়ের আর্তনাদই ফুটে উঠেছে।

আমরা স্পষ্টতই খুঁজে পাই সৌদীর মায়ের যে জীবন ও যন্ত্রণা তা আমাদের প্রতি প্রত্যেকের বিশেষত মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের প্রাত্যহিক কাহিনি। বুড়ির আশা-আকাঙ্ক্ষা তার ব্যক্তিগত হলেও তা সব মায়ের হৃদয়েই সংক্রমিত হয়। গল্পের বর্ণনার বাংলা, ঘটনার প্রাচুর্য কিংবা কোনো তত্ত্ব বা উপদেশ নেই। আবার শেষবেলায় যা ঘটেছে তা প্রত্যেক পাঠককেই জিজ্ঞাসা করায়—এর পর কী হল। সুতরাং গল্পটি শেষ হয়েও শেষ হয় না। পাঠকের কৌতূহল নিবৃত্ত হয় না। একইসঙ্গে রসিক পাঠক গল্পটির মধ্যে আত্মরূপ দর্শন করতে সক্ষম হয়। তাই সার্বিক দিক দিয়ে বিবেচনা করে বলা যায়। ছোটোগল্প হিসেবে 'ডাকাতের মা' একটি সার্থক ছোটোগল্প।

বাংলা সাহিত্যের বলিষ্ঠ লেখক সতীনাথ ভাদুড়ীর লেখা 'ডাকাতের মা' থেকে নেওয়া প্রশ্নের উদ্ধৃতিতে বিশেষণে বিশেষিত ডাকাত সৌখীর মায়ের বুক কেঁপে ওঠার কথা বলা হয়েছে। বুড়ির কেঁপে ওঠার কারণ হল পেশকারের বাড়ি থেকে লোটাটা করেছিল এবং বাজারের কাছে বিক্রি করে। এখন অভিযোগকারী সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে পুলিশসহ সদলবলে চোরকে ধরতে এসেছে। ইতিপূর্বে পুলিশের মোকাবিলা কিন্তু অন্য পরিস্থিতিতে, নিজেই অভিযুক্ত। ওপর ছেলে ঘরে, শোনে চুরি করেছে তবে হিসেবে তার সম্মান থাকবে না। তাই দুদিকের আসন্ন বিপদের সম্ভাবনার কথা ভেবেই বুড়ির বুক কেঁপে অন্যায় করলে অন্যায়কারীর বুক কাঁপে। বুড়ি জানে সে অন্যায় করেছে মাতাদীন পেশকারের বাড়িতে সে-ই লোটা বাসনওয়ালাকে সেই লোটা চোদ্দো আনায় বিক্রি করে ছেলেকে খাওয়ানোর জন্য সেই চুরির জিনিসপত্র কেনে। ছেলের রান্নাও শুরু করে। কিন্তু বিধি ছেলেকে আর খাওয়ানো না। বরং ছেলে জেল খেটে ফিরেছে, যে ঘটনার বিন্দুবিসর্গ কিছুই জানে না তাকেই কিনা দারোগা চোর সাব্যস্ত করে থানায় নিয়ে মা হিসেবে এই ঘটনা বুড়ির কাছেতবে বলতে বাধা নেই বুড়ির কর্ম সন্তানের জন্য অন্ধ অপত্য স্নেহের জন্য। তারও মানসিক যন্ত্রণা নয়।ছেলে জেলের গারদে বন্দি, সেখানে ঠিক মতো খেতে পায় কিনা জানে তার ওপর রাতের অন্ধকারে ছেলেকে তাররোগা মনে হয়েছিল। বুড়ির ভাবনায় “রোগা রোগা লাগছে যেন। সৌখীটার তো বাপের মতো জেলে গেলে শরীর ভালোতবে এবার এমন কেনো?” এই চুলে পাক ধরা ছেলের পছন্দের খাবার আলুচচ্চড়ি খেতে দিতে তার প্রবল আগ্রহ। অথচ সংস্থান নেই। আবার জেল থেকে আসামাত্র তাকে টাকার জোগাড় করার কথা বলতেও মায়ের মন মাতৃ হৃদয়ের যন্ত্রণা থেকেই ছেলে আসামাত্র তার অন্য সদস্যদের টাকা দিয়ে যাওয়া বা বউকে বাপের বাড়ি দেওয়ার ব্যাপারে কিছুই জানায় না। মাতৃসত্তার আর্তনাদ হেতুই ছেলের ন্যায্য কথায় সায় দিয়ে মার খেয়েও কোনো বলে বরং তার কথাই পালন করে। ছেলে বলেছিল বলেই এই দীর্ঘ পাঁচ বছর, শীতের মধ্যে কখনও কম্বলে মুখ ঘুমোয়নি। শেষ বেলায় নাছোড় দারোগা যখন সৌখীকেই চোর মনে করে ধরে নিয়ে যেতে উদ্যত হল তখন সে ভেঙে পড়ে। চিৎকার করে বলে—“না, না দারোগা সাহেব। সৌখী করেনি, আমি করেছি। ওকে ছেড়ে দিন দারোগা এখনও বউ-ছেলের সঙ্গে দেখা হয়নি ওর।" অথচ এই মা-ই সৌখীকে একদিনের জন্য কাছে রাখবে বলে নাতিকে পাঠিয়ে দেওয়ার মূল কারণটি বলেনি। আর এখানেই আমরা ডাকাতমায়ের মানসিক যন্ত্রণার দিকটি উপলব্ধি করি ।