অধ্যায়-5, গালিলিও

গালিলিওর পারিবারিক নাম ছিল গালিলাই ।

গালিলিওর পিতা পুরাণ-সাহিত্যে, সংগীতে এবং গণিতে কৃতবিদ্য ছিলেন।

গালিলিওর পিতা Lute ভালো বাজাতে পারতেন।

১৩ বছর বয়সে গালিলিও vallam-brosa-র বেনেডিকটিন সম্প্রদায়ের মঠে গিয়েছিলেন অধ্যয়ন করতে।

গালিলিও দুই বছর ধরে বেনেডিকটিন সম্প্রদায়ের মঠে সাহিত্য, ন্যায় ও ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন।

গালিলিওর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ এবং বেশি পড়াশোনা ক্ষতিকর—এই অজুহাতে গালিলিওকে মঠ ছাড়তে হল।

গালিলিও খুব ভালোবাসতেন সংগীত ও চিত্রকলাকে।

গালিলিও ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে সতেরো বছর বয়সে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি পড়তে গেলেন।

সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক ছাত্রকে দর্শন পড়তে হত।

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতামত সকলকে নির্বিচারে মানতে হত।

অল্প বয়স থেকেই গালিলিওর ঝোঁক ছিল সবকিছুকে হাতে-কলমে করে দেখতে।

গালিলিও পরিবারের বিশেষ বন্ধুটি গণিতশাস্ত্রে মহাপণ্ডিত ছিলেন।

পারিবারিক নানা কারণে গালিলিওদের গৃহস্থালী ফ্লোরেন্সে উঠে এল।

ইটালির উত্তর অংশে অবস্থিত একটি বিখ্যাত শহর হল ফ্লোরেন্স।

গালিলিও তাঁদের পারিবারিক বন্ধুর কাছে গণিত ও পদার্থবিদ্যা পড়তে শুরু করলেন।

১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে গালিলিও শিক্ষকতার জীবন শুরু করেন।

পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে গালিলিও গণিত বিষয়ে শিক্ষকতা করেন।

পিসা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গালিলিওকে ৬০ Scudi (ইটালিয়ান মুদ্রা) বাৎসরিক মাইনে দিতেন।

(গালিলিওর পিতা ১৫৯১ খ্রিস্টাব্দে মারা যান।

গালিলিওর ছোটো ভাইয়ের নাম মাইকেল এঞ্জেলো।

মাইকেল এঞ্জেলো বাড়িতে স্ত্রী ও সন্তানদের রেখে বিদেশে চলে গেলেন।

মাইকেল এঞ্জেলো পোল্যান্ডের রাজদরবারে কলাবিদ হলেন।

১৫৯২ খ্রিস্টাব্দে গালিলিও তাসকানি ছেড়ে পাড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন ।

গালিলিও ফ্লোরেন্সে আসতেন প্রতি গরমের ছুটিতে।

ফ্লোরেন্সের Duke-এর পুত্র Cosmo তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিল।

গালিলিও কোপারনিকাসের বিশ্ববিন্যাসে গভীর বিশ্বাসী ছিলেন।

সেই সময়ে সর্বত্র টলেমীর যুগ চলছে।

পাড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গালিলিও কোপারনিকাসের মতবাদের পক্ষে বক্তৃতা দিতেন।

পাড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি একটানা ১৮ বছর ছিলেন।

ভেনিসের সরকার গালিলিওর ওপর খুব খুশি হয়েছিলেন।

ভেনিসের সরকার ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দে আরও ৬ বছর গালিলিওর শিক্ষকতার চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে দিলেন।

নতুন ব্যাপারটি হল হল্যান্ডবাসী এক ভদ্রলোকের দ্বারা দূরবিন আবিষ্কার।

ভেনিসের নৌবহরকে শত্রুপক্ষের আক্রমণের হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে হত।

ভেনিসের সরকার গালিলিওর ওপর ভার দিলেন দূরবিন জোগান দেবার ।

এবার গালিলিও পেলেন বিশ্বসমীক্ষার এক প্রধান যন্ত্র।

গালিলিও বৃহস্পতি গ্রহের ৪টি উপগ্রহকে ঘুরতে দেখলেন।

সেটিকে ধার্মিক ব্যক্তিরা যন্ত্রের কারসাজি বলে প্রচার করলেন।

১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে তাসকানির বৃদ্ধ ডিউক মারা গেলেন।

তাসকানির বৃদ্ধ ডিউক মারা গেলে সেই গদিতে গালিলিওর প্রিয় ছাত্র Cosmo বসলেন।

১৬১০ খ্রিস্টাব্দের শরৎকালে তাসকানির নতুন ডিউক তাঁর পুরোনো গুরুকে আশ্রয় দিলেন।

তাসকানির নতুন Duke গালিলিওকে ১০০০ Scudy মাইনে দিতেন প্রতি বছর।

তাসকানির নতুন ডিউক গালিলিওকে রাজপণ্ডিত ও দার্শনিক হিসেবে স্বর্ণপদকে বিভূষিত

গালিলিও Latin ভাষা ছেড়ে ইটালিয়ান ভাষায় তাঁর মতামতকে লিপিবদ্ধ করলেন।

কোপারনিকাসের মতবাদ গালিলিওর কাছে অভ্রান্ত বলে মনে হল।

সনাতনীরা গালিলিওর বিরুদ্ধতা করতে লাগলেন।

ধর্মযাজকেরা প্রচার করতে লাগলেন—গালিলিওর অধ্যাপনা ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী এবং তা বাইবেলের। অনেক কথার সরাসরি বিরুদ্ধে।

Inquisition হল একটি পবিত্র আদালত।

Inquisition রায় দিয়েছিলেন সূর্য যে জগতের কেন্দ্রস্বরূপ—সেটি বাইবেলের সঙ্গে না মেলায় যা অযৌক্তিক ও যথার্থ ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী।

Inquisition সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলেন যে, পৃথিবীর আহ্লিক ও বার্ষিক গতিরধারণা বিরোধী।

১৬১৬ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে কোপারনিকাসের বই নিষিদ্ধ ঘোষিত হল।

পোপ কার্ডিনাল বেলারিমিনের ওপর ভার দিয়েছিলেন গালিলিওকে বোঝানোর।

পোপ বেলারিমিনকে বলতে বলেছিলেন গালিলিও যেন তার ভ্রান্ত বিশ্বাস ত্যাগ করেন, তা না হলে কারারুদ্ধ করা হবে।

১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে গালিলিওর ডাক পড়ল রোমে।

বেলারিমিন ছিলেন গালিলিওর হিতাকাঙ্ক্ষী ও সুহূদ।

 

বেলারিমিন গালিলিওকে নিজের প্রাসাদে ডেকে এনে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন।

এপ্রিল গ্যালিলিও কারারুদ্ধ হলেন।

বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা গালিলিওর নিষিদ্ধ হল।

৩০ এপ্রিল গালিলিওকে স্বীকার করানো হল।

গালিলিওকে স্বীকার করানো হল—যা কিছু তিনি লিখেছেন তা সবই তাঁর বৃথা গর্বের অজ্ঞতা অসতর্কতার নিদর্শন।

গালিলিওকে দিয়ে বলানো হল যে, তিনি কোপারনিকাসের মতে বিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

বিচারকদের সামনে অনুতাপবারক সাদা পোশাক পরে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে হল।

বিচারকের রায় অনুযায়ী তিন বৎসর ধরে প্রতি সপ্তাহে গালিলিওকে অনুতাপসূচক প্রার্থনা করতে হবে।

Inquisition দু-দিন বাদে গালিলিওকে ফ্লোরেন্সের দূতাবাসে প্রেরণ করলেন।

প্রথমে গালিলিওকে সিয়েনাতে নজরবন্দি করে রাখা হল।

গালিলিওকে Archbishopরা নজরবন্দি করে রাখত।

দুঃখ-কষ্টে গালিলিওর জীবনের শেষ ৯ বছর কাটল।

গালিলিওর খ্যাতি ও সহানুভূতি ছিল খ্রিস্টীয় মহলে।

১৬৪২ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি গালিলিও শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

গালিলিও ৭৭ বছর বয়সে মারা যান।

গালিলিও বিচারকদের সামনে হাঁটু গাড়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নাকি বলেছিলেন—এ সত্ত্বেও পৃথিবী চলমান।" এমন কথা প্রচলিত আছে।

গালিলিও প্রথমে সনাতনী ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্য প্রচার করতে চেষ্টা করেছিলেন।

প্রখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস রচিত 'গালিলিও' প্রবন্ধে আমরা দেখি মাত্র ১৩ বছর বয়সে গ্যালিলিও গিয়েছিলেন Vallam brosa-র বেনেডিকটিন সম্প্রদায়ের মঠে সাহিত্য, ন্যায় ও ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে। কিন্তু ছেলের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ এবং বেশি পড়াশোনা ক্ষতিকর বাবার আরোপিত এই অজুহাতে তাকে মঠ ছাড়তে হল। অভাবী সংসারকে একটু সফল করার আশায় ছেলেকে ডাক্তারি পড়তে পাঠালেন পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় ছাত্রকে গ্রিক দার্শনিকের মতবাদকে নির্বিচারে মেনে নিতে হত এবং প্রত্যেককে দর্শনশাস্ত্র পড়তে হত। কিন্তু গালিলির ছোটোবেলা থেকে ঝোঁক সবকিছুকে হাতে-কলমে যাচাই করে দেখতে। ফলে বিরোধ বাধত অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে এমনকি, কখনো কখনো শিক্ষক মহাশয়দের সঙ্গেও মতবিরোধ ঘটত তাঁর। ফলে ডাক্তারি পড়াতে তিনি মানসিক প্রশান্তি পেতেন না। তাঁদের পরিবারের বিশেষ বন্ধুস্থানীয় এক ব্যক্তি ছিলেন সেসময় গণিত শাস্ত্রে মহাপণ্ডিত। তাঁর কাছে সকলে গণিতশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে যেত। তাসকানির শাসকের পুত্র সেসম্যা সেই পণ্ডিতের কাছে গণিতশাস্ত্র অধ্যয়ন করছে। গালিলিও একদিন আড়াল থেকে শুনলেন তাঁর গণিতশাস্ত্রের ব্যাখ্যা। অভিভূত হয়ে গেলেন তিনি। ডাক্তারি পড়াতে তাঁর আর মন বসে না। শেষে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে শুরু করলেন সেই মহাপণ্ডিতের কাছে গণিত ও পদার্থবিদ্যা অধ্যয়ন। ফলে ডাক্তারি পড়া তাঁর আর হল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিও আর পেলেন না।

পিতার মৃত্যুর পর গালিলিও পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র আকারে দেখা দিলে গালিলিও তাসকানি ছেড়ে চলে এলেন পাড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই মূলত শুরু হল তাঁর প্রকৃত বিজ্ঞানীর জীবন। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপনার পাশাপাশি দেশরক্ষার ব্যাপারে পরামর্শদাতাও হয়ে উঠলেন। অন্যদিকে ফলিত জ্যোতিয়ে রাশিচক্র কেটে ভবিষ্যৎ গণনার কাজও চলতে থাকল। তখন সর্বত্র টলেমীর যুগ চললেও কোপারনিকাসের মতবাদে বিশ্বাসী গালিলিও তাঁর নতুন মতবাদ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ুয়ায় বক্তৃতা দিচ্ছেন কোপারনিকাসের মতবাদের পক্ষে। বহু মানুষ শুনতে আসছেন। তাঁর সেই মনোজ্ঞ বক্তৃতা। এ সময় হল্যান্ডের এক ভদ্রলোক কাচের লেন্স নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ একটি নলের দুপাশে চোখ রেখে দূরের জিনিসকে কাছে এবং বড়ো আকারে দেখতে পেলেন। এখবর গালিলিওর কাছে পৌঁছালে তিনি সঙ্গে সঙ্গে কাগজে প্ল্যান এঁকে আলোর রেখাপথের বিষয় বিচার করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করলেন এবং আবিষ্কৃত হল শক্তিশালী দূরবিন যন্ত্র। ভেনিসের কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর কদর আরও বেড়ে গেল। শত্রুর হাত থেকে ভেনিসের নৌবহরকে আত্মরক্ষার জন্য জাহাজে দুরবিন বসানোর ব্যাপারে দূরবিন তৈরি এবং জোগান দেওয়ার ভার পড়ল গালিলিওর ওপর। এতে আবিষ্কারে নতুনত্ব এবং অর্থাগম দুই-ই ভালো হতে থাকায় বাড়ি হয়ে উঠল 'ফ্যাক্টরী কারুশালা'।

জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানী গালিলিও আবিষ্কার করেছিলেন শক্তিশালী দূরবিন যন্ত্র, যার সাহায্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি অনেক নতুন নতুন দৃশ্য দেখলেন। তাঁর আগে যেগুলি ছিল মানুষের কল্পনার অতীত। তিনি দেখলেন চাঁদের পাহাড়, ছায়াপথের মধ্যে লক্ষ লক্ষ তারার সমাবেশ। এছাড়া নতুন নতুন উপগ্রহের সন্ধানও তিনি পেলেন। আমাদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে একটি মাত্র চন্দ্রমা—তাও তাঁর যন্ত্রের মাধ্যমে চোখে ধরা পড়ল। তিনি দেখতে পেলেন বৃহস্পতি গ্রহের চারটি উপগ্রহ ঘুরছে। সে সময় ধার্মিক পণ্ডিতেরা এ সমস্ত বিশ্বাস করতে চাইতেন না। তাঁরা মনে করতেন—গালিলিও।

এ সমস্ত দেখিয়ে এবং প্রচার করে কোপারনিকাসের বিশ্ব বিন্যাসের পক্ষে যুক্তি সংগ্রহ করছেন। গালিলিওর এই প্রচেষ্টাকে তাঁরা অন্যায় বলে প্রচার করতে লাগলেন। তাঁরা বললেন, যা চোখে দেখা যায় না, তা যদি যন্ত্রের মাধ্যমে দেখা যায় তাহলে সেটি প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রেরই কারসাজি। ফলে তাঁরা যন্ত্রের মাধ্যমে দেখতেও রাজি হলেন না এবং তাদের বিশ্বাস থেকে তারা একবিন্দু নড়লেনও না। এ বিষয়ে গ্যালিলিওর আমোদ লাগল।

তাসকানির নতুন ডিউকের দ্বারা বাৎসরিক এক হাজার scudy বেতনে রাজপণ্ডিত ও দার্শনিক হিসেবে স্বর্ণপদকে বিভূষিত হওয়ার পর গালিলিও নিশ্চিন্ত মনে নতুন উদ্যমে বিজ্ঞান সেবায় নিজেকে সঁপে দিলেন। নিজের আবিষ্কৃত দূরবিন নিয়ে তিনি চাঁদের পর্বতমালা, বৃহস্পতির ৪টি উপগ্রহ, সূর্যবিম্বে কলঙ্কবিন্দু, শুক্র গ্রহের চলের মতো উজ্জ্বল্যের হ্রাস-বৃদ্ধি, শনির বলয় ইত্যাদি আরও বহু তথ্য আবিষ্কার করতে থাকলেন। এইভাবে নিজের চোখে গ্রহমণ্ডলের অনেক বৈশিষ্ট্য দেখতে পেলেন যার সত্য-মিথ্যা যে-কোনো ব্যক্তি ইচ্ছা করলেই নিজের চোখে তা বিচার করতে পারবেন। কোপারনিকাসের মতবাদ গালিলিওর কাছে সঠিক বলে মনে হল। এই সমস্ত তথ্যগুলিকে তিনি গ্রন্থাকারে লিখে প্রকাশ করে। মানুষকে তাঁর পক্ষে আনতে সচেষ্ট হলেন। কিন্তু সনাতন পন্থীরা যথারীতি তাঁর বিরুদ্ধতা করতে থাকলেন। একদিকে ফ্লোরেন্সের তোমিনিকান সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা, আর অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র এবং অধ্যাপকরা যাঁরা গালিলিওর এই নতুন মত মেনে নিতে পারছিলেন না বা গালিলিওর যশের প্রতিভায় ঈর্ষাদিত ছিলেন—তাঁরা তাঁর বিরোধিতা করতে থাকলেন। বিশেষ করে ধার্মিক ব্যক্তিরা প্রচার করতে লাগলেন, যা খালি চোখে দেখা যায় না, যন্ত্রের মাধ্যমে তা দেখা গেলে সেটা যন্ত্রেরই কারসাজি। ফলে তাঁরা দূরবিনের মাধ্যমে দেখতেও রাজী হলেন না এবং এই সম্পর্কে তাদের মতও পরিবর্তন করলেন না। তাঁরা বলতে শুরু করলেন, গালিলিওর অধ্যাপনা ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী এবং তা বাইবেলের অনেক কথার সরাসরি বিরুদ্ধে। গালিলিও বাইবেলের ওপর মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করতে চাইছেন। ফলে গালিলিওর বিরুদ্ধে গোপনে ষড়যন্ত্র শুরু হল । Inquisi tion তথা পবিত্র আদালতের রায় ঘোষিত হল গালিলিওর বিরুদ্ধে বাইবেল বিরোধী বলে গালিলিওর মতামত অযৌক্তিক এবং ধর্মবিশ্বাসের পরিপার্থী; এমনকী, পৃথিবীর আহ্নিক বা বার্ষিক গতির ধারণাও ধর্মবিশ্বাসের বিরোধী। অতঃপর ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে মার্চ মাসে কোপারনিকাসের এই সম্পর্কিত পুস্তক নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পুণ্যাত্মা পোপের কাছে খবরটি পৌঁছে দিলেন।

গালিলিওর অধ্যাপনা ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী এবং বাইবেলের অনেক কথার সরাসরি বিরুদ্ধে বলে তৎকালীন ধর্মযাজকরা পুণ্যাত্মা পোপের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। ফলে পোপ সঙ্গে সঙ্গে কার্ডিনাল বেলারিমিনকে ডেকে গালিলিওকে সতর্ক করে দেওয়ার ব্যাপারে আদেশ দিয়ে বললেন, গালিলিও যেন তাঁর ভ্রান্তবিশ্বাস পরিত্যাগ করেন। তা না হলে। তাঁর এই মতামত বন্ধ করার জন্য বিধিসম্মতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমনকী কারারুদ্ধ ও করা হতে পারে। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে যথারীতি গালিলিওর ডাক পড়ল রোমে। গালিলিওর হিতাকাঙ্ক্ষী তথা সুহৃদ বেলারিমিন তাঁর নিজের প্রাসাদে গালিলিওকে ডেকে এনে বুঝিয়ে বললেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপারনিকাসের তত্ত্ব নিয়ে তিনি যেদ ধর্মযাজকদের সঙ্গে কোনোরকম বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে না পড়েন এবং সর্বোপরি বাইবেল থেকে লাইন উদ্ধৃত করে নিজের মনের মতো তার ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা না করেন। গালিলিও বেলারিমিনের কথায় রাজি হলেন। তবে তিনি হয়তো ঘটনার গুরুত্ব আন্দাজ করতে পারেননি তেমনভাবে । তাই ভেবেছিলেন গণিতের কল্পনা হিসেবে কোপারনিকাসের কথা হয়তো কিছু কিছু আলোচনা করা যাবে অথবা যুক্তি-তর্ক সং টলেমী ও কোপারনিকাসের বিশ্ববিন্যাসের গুণাগুণ অল্প-বিস্তর আলোচনা চলতে পারে। তাই তারপরও তিনি আহ্নিক ও বার্ষিক গতির কথা, ভাসমান বস্তুর স্থিতিরহস্য ইত্যাদি বিষয় এবং কথোপকথনের আকারে টলেমী ও কোপারনিকাসের মতবাদের আলোচনা করে বই লিখে তা ছাপাবার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে তাঁর হিতাকাঙ্ক্ষী বেলারিমিন এবং পুণ্যাত্মা পোপ মারা গিয়েছেন। সেই পদে অধিষ্ঠিত নতুন ব্যক্তি সম্পর্কে গালিলিওর ধারণা ছিল যে, তিনি বিজ্ঞানকে যেহেতু শ্রদ্ধা করেন, সেহেতু বই ছাপাবার অনুমতি তিনি হয়তো দেবেন। কিন্তু নানা ঘটনায় নতুন পোপ তাঁর ওপর ক্ষুদ্ধ হয়েছেন, তাই হিতে হল বিপরীত। বই ছাপাবার অনুমতি তো পেলেনই না বরং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হল ।।

বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচিত 'গালিলিও' প্রবন্ধের প্রধান চরিত্র হল গালিলিও। তাঁর বিভিন্ন দিক আমাদের মুগ্ধ করে। ছোটোবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধার অধিকারী। অতি অল্প সময়ের মধে তিনি যে-কোনো বিষয়কে রপ্ত করে ফেলতেন। আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী না হয়ে তিনি সব কিছুকে হাতে-কলমে যাচাই কর দেখার পক্ষপাতী ছিলেন। সংগীত ও চিত্রকলাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। নিজের ইচ্ছানুযায়ী চলতে পারলে হয়তো তিনি চিত্রকর হতে পারতেন।।

নতুন কিছু উদ্ভাবনের নেশা গালিলিওর ছোটোবেলা থেকেই ছিল। তাই দেখা যায় মাত্র ২৪ বছর বয়সেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার পাশাপাশি নানারকম যন্ত্র আবিষ্কারে মেতে আছেন।

গালিলিও ছিলেন মহানুভব ব্যক্তি। পিতার মৃত্যুর পর সমস্ত সংসারের দায়ভার তাঁর ওপর পড়লে অর্থনৈতিক সমস্যা

সমাধান করতে তিনি একনিকে শিক্ষকতা, ছাত্র পড়ানো । আবার অন্যদিকে ব্যাবসা, দেশরক্ষার বিষয়ে পরামর্শদাতা প্রভৃতি নানাভাবে অর্থরোজগারের চেষ্টা করেছেন। ছোটো ভাই মাইকেল এঞ্জেলো তাঁর স্ত্রী ও সাতটি ছেলেমেয়েকে রেখে বিনে চলে যাওয়ায় তাদেরকেও তিনি লালনপালন করেন। গালিলিওর প্রধান পরিচয় তিনি বিজ্ঞানী। হল্যান্ডের জনৈক ভদ্রলোকের আবিষ্কৃত দূরবিনের খবর তাঁর কাছে পৌঁছাতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে কাগজে প্ল্যান এঁকে সমস্যার সমাধান করে আবিষ্কার করে ফেললেন শক্তিশালী দূরবিন যন্ত্র। তা দিয়ে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে নানা তথ্য অর্থাৎ চাঁদের পাহাড়, ছায়াপথের মধ্যে লক্ষ লক্ষ তারার সমাবেশ, বৃহস্পতির উপগ্রহসমূহ ইত্যাদি আবিষ্কার করতে থাকলেন। কোপারনিকাসের মতবাদ তাঁর কাছে অভ্রান্ত মনে হল। এই মতবাদে পক্ষে তিনি নানা স্থানে বক্তৃতাও দিতে থাকলেন। এই সমস্ত আবিষ্কার ও বক্তৃতার জন্য তাঁকে অশেষ বাধা-বিপত্তি, লাঞ্ছন। এমনকী, কারাবরণও সহ্য করতে হয়েছে। তবুও তিনি সত্যের কাছে মাথা নত করতে চাননি। এতে তাঁর একটা হার ন মানার মানসিকতাকে আমরা দেখতে পাই। ক্ষমতার কাছে পরাজয় স্বীকার করলেও তিনি সত্যটাকে জনসমক্ষে প্রচার করে চেষ্টা করেছেন। এটাই তাঁর চরিত্রের একটি বড়ো গুণ। তাই তো আজও তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন সকলের কাছে।

নাম নামির পরিচয় বর্তিকা, ব্যক্তি নাম যচ্ছে হতে পারে, কিন্তু শিল্প সাহিত্যের নাম সর্বদা তাৎপর্যবাই। কোনো রচনার সঠিক নাম নির্বাচন রচনাটির তাৎপর্য বাড়িয়ে দেয়, বিশেষত প্রবন্ধের ক্ষেত্রে। প্রবন্ধ যেহেতু প্রকৃষ্টরূপে কখন যুক্ত আত্মসচেতনমূলক লেখা, তাই নামকরণও সেখানে সচেতনতার স্বাক্ষর বহন করে। 'গালিলিও' প্রবন্ধটির নামকরণ লেখক সত্যেন্দ্রনাথ বোস করেছেন প্রবন্ধটির মূল চরিত্র গালিলিয়োর নাম অনুসারে।

প্রবন্ধটিতে লেখক সত্যেন্দ্রনাথ বোস গালিলিওর জন্ম পরিচয় থেকে ছাত্রজীবন, পারিবারিক জীবন, শিক্ষকতা এবং বিজ্ঞানীর জীবনের সমগ্র পরিচয় তুলে ধরেছেন সহজ-সরল প্রাঞ্জল ভাষায়। ছাত্রজীবনে নানা বাঁক পরিবর্তন অর্থাৎ কখনো সাহিত্য, নায় ও ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন, কখনো ডাক্তারি পড়া আবার কখনো গণিতশাস্ত্রে আকৃষ্ট হয়ে গণিতশাস্ত্র অধ্যয়ন সবই প্রকাশিত হয়েছে প্রবন্ধটিতে। তাঁর পারিবারিক জীবনেও অর্থ সমস্যার জন্য কখনো ছাত্র পড়ানো, কখনো উমেদারি, কখনো ব্যাবসা—ইত্যাদি। নানাভাবে তিনি পরিবারের অর্থ সংকট মোচনে তৎপর হয়েছেন। শিক্ষকতা জীবনেও তিনি তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। গালিলিওর জীবন প্রকৃত বিজ্ঞানীর জীবন; সেখানে তিনি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আবিষ্কারের দ্বারা সারা বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। যদিও এই বিজ্ঞানীর জীবনেই তাঁকে পেতে হয়েছে অশেষ দুঃখ, কষ্ট ও লাঞ্ছনা। শেষ পর্যন্ত তাঁকে হতে হয়েছে কারারুদ্ধ। এভাবে সমগ্র প্রবন্ধটি গড়ে উঠেছে গালিলিওর জীবনকথাকে কেন্দ্র করে। প্রবন্ধের সূচনা, অগ্রগতি এবং পরিণতি—সবই গালিলিও কেন্দ্রিক। সুতরাং প্রবন্ধটির নাম 'গালিলিও' হওয়াই বাঞ্ছনীয় এবং তাই-ই হয়েছে।