অধ্যায়-8, দ্বীপান্তরের বন্দিনী

‘দেড় শত বছর' বলতে কবি ভারতে ইংরেজ রাজত্বকালের বা বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শাসন শোষণের কথা বলেছেন।

বহুদূরে অবস্থিত কোনোকিছু বোঝাবার জন্য এই কথাটি ইঙ্গিত করা হয়, অর্থাৎ ব্যাপ্তি বা দূরত্ব বোঝাতে কথাটি ব্যবহার করা হয়।

বীণার তন্ত্রী শাসক ইংরেজ সরকার কাটে।

'রক্ষ-পুর' হল রাক্ষসপুরী, এখানে ইংরেজ সরকারের অন্দরমহল।

শস্ত্র-পাণির অস্ত্র-যায়'-এ শতদল শতভাবে ভিন্ন বা নষ্ট হয়।

রৌপ্য পঙ্ক হল রূপোর পাঁক এবং সেখানে রূপ-পদ্ম ফোটে।

উদ্ধৃত পত্তির কথাটি হল—পশ্নের মতো পা-কে রাখা হয়েছে পদ্মের ওপর।

পূজারির মধ্যে ভক্তি-শ্রদ্ধা ইত্যাদি থাকা বাঞ্ছনীয়, কিন্তু যে-পূজারি শুধুমাত্র সেটিকে পেশা নেন কিংবা কোনোভাবেই দায়বদ্ধ থাকেন না, তাই তাঁকে শখের পূজারি (শৌখিন পুজারি) বলা হয়।

"আরতির তেল” কবি জীবন-চূয়ানো ঘানি থেকে আনার কথা বলেছেন।

দেশমাতৃকার সম্মানরক্ষার্থে যারা স্বাধীনতা যজ্ঞে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, সেই স্বাধীনতা যজ্ঞ বা হোমের আগুনের কথা বলা হয়েছে।

 

সত্য বললে কবি নজবুল ইসলাম বন্দি হন।

সীতা যেমন বন্দিনী ছিলেন, কবির বাণী (রচনা)ও তেমনি নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত ঘোষিত হয়েছিল।

'বাণী-পূজা-উপচার হল দেবী সরস্বতী পূজার নানা সামগ্রী।

বীণা গুলি যেতে পারে না। এখানে ইংরেজ সরকার কর্তৃক কবিকৃত প্রশ্নানির বিদ্রোহাত্মক ভাষার আক্রমণের কথা বলা হয়েছে।

চন্দননগরে আয়োজিত সরস্বতী পূজার আয়োজক সন্তান সংঘের যুবকদের উদ্দেশে এ কথা বলা হয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলামের সমকালীন ও বিপরীতধর্মী কবি হলেন জীবনানন্দ দাশ।

বিদেশি ম্যাক্সিম গোর্কি, লোরকা, হুইটম্যান প্রমুখ লেখক ও কবির সঙ্গে নজরুল তুলনীয়।

দ্বীপান্তরের বন্দিনী' কবিতায় কবি বীণা, সেতার, শঙ্খ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের কথা বলেছেন।

সরস্বতী পুজোয় ব্যবহৃত শাঁখ এবং শ্রীকৃষ্মের পাঞ্চজন্য শব্দের কথা বলা আছে।

পাঞ্চজন্য শাঁখের উল্লেখ মহাভারত মহাকাব্যে আছে।

‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী' কবিতায় কবি পুরুষ দেবতা ধর্মরাজের উল্লেখ করেছেন।

‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী' কবিতায় কবি সিংহ ও বাঘের কথা বলেছেন।

দ্বীপান্তরের বন্দিনী' কবিতায় যুদ্ধসংক্রান্ত যেসব বস্তু বা বিষয় আছে সেগুলি হল কামান গোলার সিসা, অস্ত্রশস্ত্র, রক্ত, খুনখারাপ, ধ্বংস প্রভৃতি।

পৃথিবীর প্রায় বেশকিছু দেশে মধ্যযুগের ইতিহাসে দেখা গেছে রাজশক্তি ও পুরোহিত শক্তির আধিপত্য। কারণ একজনের হাতে শাসনদণ্ড, অন্যজনের হাতে ধর্মদন্ড। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'রাজর্ষি' উপন্যাসে এবিষয়ে সুন্দর পরিচয় দিয়েছেন। বস্তুত, প্রকৃত ধর্মীয় আচরণ হওয়া উচিত যুক্তিসংগত, মনুষ্য- কল্যাণকর, আচারসর্বস্ব নয় কিংবা অন্ধবিশ্বাস অনুগামী নয় ।

“দ্বীপান্তরের বন্দিনী' কবিতায় কবি এরকমই এক অর্থহীন, আচারসর্বস্ব দেবী সরস্বতীর পুজোর পূজারির উদ্দেশ্যে কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। যেমন—১. দ্বীপান্তরিত বাণী যেখানে রাত্রিদিন ঘানি টানছে, যে ঘানিতে শুধু জীবন চুঁইয়ে পড়ে, সেই ঘানি থেকে পূজারি কী আরতির তেল এনেছেন? দ্বিতীয়ত, হোমানল থেকে বাণীর রক্ষী বীর ছেলেদের চবি খি ও কী এনেছেন তিনি? যদি তা না-ই থাকে তাহলে শঙ্খবাদনসহ এই পুজো বৃথা। ২. যেখানে ভারতবর্ষে মুক্ত ভারতী নেই। সেখানে পূজারি কাকে অগুলি দিচ্ছেন। যেখানে সত্য বললে কবিকে বন্দি হতে হয়, অত্যাচারিত হয়ে বলা যায় না অত্যাচার, বন্দিনী সীতার মতো বাণী বিচার-চেড়ীর মার সহ্য করে, বাণীর মুক্ত শতদল বিদ্রোহী আখ্যা লাভ করে, সেখানে পূজারির আগমনের উদ্দেশ্য কী? তিনি কী বাণী-পূজা-উপচার বয়ে নিয়ে এসেছেন ?

আসলে এই প্রশ্নগুলির পিছনে আছে কবির তৎকালীন রাজশক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। কারণ ইংরেজ সরকার তাঁর রচনাসমূহের প্রতি কড়া নজর রাখতো। ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় এ বিষয়ে তিনি অন্যত্র লিখেছেন 'বন্ধু। তোমরা দিলে না ক দাম, রাজ-সরকার রেখেছেন মান।/যাহা কিছু লিখি অমূল্য বলে অ-মূল্যে নেন। আর কিছু শুনেছ কি, হুঁ হুঁ ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু? (আমার কৈফিয়ৎ/ সর্বহারা)। অর্থাৎ রাজশক্তির নানা অত্যাচারের বিরুদ্ধে নজরুল সরব ছিলেন বলে তাঁর বাণী (গ্রন্থবদ্ধ) বা কণ্ঠকে রোধ করেছিল উত্ত সরকার। তাঁর 'অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত' কবিতার কিছু অংশ দেখা যাক জাগো অনশন বন্দী, ওঠ রে যত জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত। যত অত্যাচারে আজি বজ্র হানি /... মূল সর্বনাশেরে, এবে ভাঙিব এবার ভেদি দৈত্য-কারা....।” আক্রমণাত্মক এইসব লেখার জন্য নজরুলের গ্রন্থ যেখানে রাজরোষে পড়ে, কারাবরণ করতে হয়, সেই নজ যখন সরস্বতী পুজোর উদ্বোধন (চন্দননগরের সন্তান সংঘের আহ্বানে) করতে আসেন, তখন পূজারিকে এই প্রশ্নই তিনি। করেন (কবিতার মাধ্যমে)। যে বাণী-পুজো তিনি করতে এসেছেন সেই বাণীই তো সরকার বন্দি (গ্রন্থ নিষিদ্ধকরণ বা বাজেয়াপ্তকরণের আদেশ) করে রেখেছে আবার যে বাণী স্বাধীনতাকামী মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত, তারা আন্দামানে নির্বাসিত! সুতরাং, যে পুজো তিনি করছেন, সেই বাণী-পুজো বা দেবীর আরাধনা করা একটা শৌখিনতা। (বলাবাহুল্য, পূজারি ছাড়া আহ্বায়ক সন্তান সংঘের উদ্দেশ্যেও কবি এ বিষয়ে সচেতন করেছেন)।

সাধারণত লেখক-কবিদের বই তিনটি কারণে নিষিদ্ধ, বাজেয়াপ্ত বা অভিযুক্ত হতে পারে : রাজনীতি, ধর্ম ও অম্লীলতা। তবে রাজনীতির পাশাপাশি একথাটি স্মর্তব্য, প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার। শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী' রাজনৈতিক-উপন্যাস এবং উত্তেজক (রবীন্দ্রকথিত), তাই তৎকালীন ইংরেজ সরকার উক্ত বইটিকে নিয়ে, তাদের যা কৃতকর্ম, তা করছিল। তার আগে দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' বা 'হিন্দু পেট্রিয়ট' পত্রিকা (যেখানে এটি ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়) ও উক্ত সরকারের বিষনজরে পড়ে এবং চারদিক উত্তাল হয়ে ওঠে। অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হন বুদ্ধদেব বসু সমরেশ বসু যথাক্রমে 'রাত ভর বৃষ্টি' ও 'প্রজাপতি' উপন্যাসের জন্য। তাঁদের আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিন্দিত হন কালীপ্রসা

কাব্যবিশারদ, মোহিতলাল মজুমদার কর্তৃক (যথাক্রমে কড়ি ও কোমল' ও 'চিত্রাঙ্গদা'য় অঙ্গীলতার জন্য: যদিও এই বিচারসাপেক্ষ)। ধর্মের দায়ে অভিযুক্ত হন এসময়ের অন্যতম ইংরেজি সাহিত্যিক সলমন রুশদি, তাঁর 'দ্য স্যাটানিক ভা (শয়তানের পদাবলি)-এর জন্য। অর্থাৎ এ খুবই পুরোনো ও প্রচলিত ঘটনা যে, যুগে যুগে লেখক-কবিরা নানাভাবে আক্রান্ত অভিযুক্ত (এমনকি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনও 'সরস্বতী'র ছবি নিয়ে বিতর্কিত হয়েছিলেন)।

অতএব নজরুলও তাঁর লেখা নিয়ে যে বিপাকে পড়বেন, তাতে আর আশ্চর্য কী? স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে, শুধু তৎকালীন রাজশক্তির নিয়মনীতির বিরোধিতা করেছেন। তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে তাঁর নানা গদ্যপদ্য রচনায় (রচনাবলির পরিচয়-সংক্রান্ত অংশ দ্রষ্টব্য)। আর তাঁর এই রচনাসমূহ বারবার পড়েছে ইংরেজ সরকারের বিষনজরে। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেনি বিষয়টা। কোনো সময় তাঁর গ্রন্থ নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত ঘোষিত হয়েছে। কখনো-বা রাজরোষ থেকে পেয়েছে মুক্তি । কখনো তাঁকে টানতে হয়েছে নানা জেলের ঘানি।

দ্বীপান্তরিত করার মতো কবির বাণী (প্রকারান্তরে গ্রন্থ) যাতে জনগণের থেকে দূরে থাকে, সেজন্য কবির রচনা নিয়ে ইংরেজ সরকার বারবার তাঁর ওপর হয়েছে খকাহন্ত। এই কারণেই কবি 'দ্বীপান্তরের বন্দিনী' কবিতায় বারবার বাল প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। দ্বিতীয়ত, এই প্রসতা অবতারণার আরেকটি কারণ হল, চন্দননগরের সন্তান সারে আহবানে সরস্বতী পুজোর উদ্বোধন। সরস্বতী আর বাণী প্রায় সমার্থক। তাই উদবোধনে এসে নিজের বাণীর বন্দিনী হওয়ার কথাকেই কৰি আভাসিত করেছেন কবিতার উল্লেখিত পছরিগুলির দিকে দৃষ্টিপাত করলেই এর সত্যতা প্রমাণিত হবে–১: মুক্ত কি আজ বন্দিনী বাণী। ২. বাণী যেথা ঘানি টানে নিশিদিন। ৩. হোমানল হতে বাণীর রক্ষী...। ৪. ... সত্য বলিলে বন্দী হই। ৫. অত্যাচারিত হইয়া যেখানে বলিতে পারি না অত্যাচার। ৬. যথা বন্দিনী সীতাসম বাণী...। ৭. বাণীর মুক্ত শতদল যথা। ৮......বাণী-পূজা-উপহার বহি। ৯. বাণীর কমল খাটিবে জেল। ১০. তবে কি বিধির বেতার-মন্ত্র / বেজেছে বাণীর সেতারে আজ...। অর্থাৎ কবিতায় বারবার বাণী প্রসঙ্গের অবতারণা করে কবি বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন বাণী 'বন্দিনী' এবং তার জন্যই তাঁর এই ক্ষোভ-বিস্ময় আর নানা প্রশ্ন।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতার ইতিহাসে সেই কবি, যিনি সবসময়ই মুখর (যদিও জীবনের অর্ধেক সময় প্রায় স্বপ্নবাক) ছিলেন। তবে সে মুখরতা ছিল প্রতিবাদে, ঘৃণায়, অত্যাচারে, শোষণ-নিপীড়নে, অন্যায় অবিচারে। পাশাপাশি ছিলেন ভাবুক, রোমান্টিক। এককথায় তিনি বজ্রকঠিন, কুসুমকোমল। একহাতে অসি, অন্যহাতে মসী। কবিতার জগতে উচ্চকণ্ঠ বা গুরুগম্ভীর যেমন, তেমনি লঘুচপল-মৃদুভাষী।

“দ্বীপান্তরের বন্দিনী' কবিতার অবশ্য দুই সুরের দুই স্বরের প্রকাশ ঘটেনি। আদ্যোপান্ত গুরুগম্ভীর। চাতুর্যময় ভাষার কারবারি। রূঢ়-কঠিন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। না হলে যে দেবীপুজোর উদ্বোধনে তিনি উদ্বোধক হিসেবে আহুত, সেখানে দেবী। সরস্বতীর প্রথাগত গুণকীর্তন না করে, আহ্বায়ক সন্তান সংঘের যুবকদের মনস্তুষ্টি সাধন না করে এমন কবিতা শোনান। যে কবিতায় কিনা এধরনের পুজোআচ্চাকে মোটেই ভালোভাবে দেখেননি! দৃষ্টান্ত লক্ষণীয় 'পূজারী, কাহারে দাও অগুলির মুক্ত ভারতী ভারতে কই?/আইন যেখানে ন্যায়ের শাসক,/সত্য বলিলে বন্দী হই'।

বস্তুত কবি দেখেছেন যে দেশের শুভাকাঙ্ক্ষী সব মানুষ বিদেশি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে সাঁড়িয়েছেন, উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন, সাহিত্য-শিল্পে তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন কিংবা সরাসরি সংঘাতে নেমেছেন, তাঁদেরকে নানাভাবে অত্যাচারিত, পীড়িত হতে হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেখানে এরকম অবস্থা, সেখানে সরস্বতীর মতো কোনে দেবীর পুজো করে কী লাভ? এসব পুজো শখের পুজো। পূজারিও শৌখিন। পুজোর আগে এটা ভাবা বাঞ্ছনীয় যে, দেবী সরস্বতী বাকদেবী, বিদ্যাদেবী, আর তাই তিনি যখন প্রতিবাদ-অন্যায়-অত্যাচারে মুখর (কথা বলেন) হন, কাব্যকবিতা রচন করেন, তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ শক্তি এসব প্রতিহত করে এবং এজন্য তাদের মতো করে তারা আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়। -যা কোনোভাবেই কবির কাঙ্ক্ষিত নয়। দেবীর পুজোআচ্চা-অঞ্জলিও নিষ্প্রয়োজন। বরং অশুভশক্তির বিনাশার্থে সংঘাতের প্রয়োজন। তার সূত্রপাত করার জন্য তাই কবি সরবে ঘোষণা করেন, পাঞ্চজন্য শঙ্খবাদন।

এ বিষয়ে কবি তাৎপর্যকে আরো একটু বিশেষিত করেছেন। অর্থাৎ, পাঞ্চজন্য হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের শব্দ। শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতের যিনি রণরাজনীতি-বিশেষজ্ঞ। সর্বোপরি কুরুপাণ্ডব-যুদ্ধের মূর্ত প্রতীকও বলা যায়। আর তাঁর পারজন্য শঙ্খবাদনে। ইতিও স্পষ্ট হয়। দ্বীপান্তরের বন্দিনী তে তাই পুজোর অঞ্চালিকে গৌণ করে কবি পাঞ্চজন্য শদাবাদনের কথ সেছেন, যাতে অশুভশক্তির সঙ্গে সংঘাত তথা নবযুগের সূচনা হবে। দেশের দশের মঙ্গলার্থে যার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। এ বিষয়ে কবি লিখেছেন: "দ্বীপান্তরের, ঘানিতে লেগেছে/যুগান্তরের ঘূর্ণিপাক।”

"আইন যেখানে ন্যায়ের শাসক, সত্য বলিলে বন্দী হই...।" পাঠ্য কবিতা অবলম্বনে কবির এ উক্তির যাথার্থ নিরূপণ করো।

উত্তা সমকালীন সমূহ ঘটনাই যে, সব লেখক-কবির রচনায় প্রতিফলিত হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কারণ | এই ঘটনা কোনো কবির মনকে নাড়া নাও দিতে পারে। তবে জোরপূর্বক কোনো কবি যদি তাঁর রচনায় সমকালকে তুলে ধরে চেষ্টা করেন, তাহলে সে-রচনা শিল্পসম্মত হতে পারে না। যেমন কেউ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে মানসচক্ষে কঠোর কঠিন দারিদ্র্য, বাস্তবকে দেখে অকৃত্রিম বাস্তবের ছবি আঁকতে পারেন না। মূলত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি থাকলে কবির লেখা ভাবে-ভাষায় অপরূপ হয়ে উঠতে পারে (যেমন সমরেশ বসু তাঁর 'গঙ্গা' উপন্যাস লিখেছিলেন)।

কবি কাজী নজরুল বাস্তবিক এমন কবি, যিনি সমকালকে তুলে ধরবার জন্য কল্পনালোকে বিচরণ করেননি (প্রসাত, কবিতায় কোনো বাকপ্রতিমা নির্মাণ ভিন্ন ব্যাপার)। দ্বীপান্তরের বন্দিনী' এইরকম একটি কবিতা, যা সমঝাল এবং কবির। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অপরূপ-অদ্ভূত কোলাজ। এবং এটি সেই অর্থে topical poem || এই কবিতায় কবি বলেছেন, আইন এমন একটি সরকারি নিয়ম কিংবা সমাজ ও দেশের একধরনের বিধি যা সবসময় মনুষ্যসমাজের কল্যাণার্থে রচিত। দ্বিতীয়ত, এই আইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ন্যায় বা ন্যায়ের শাসক, যেখানে বা যাঁকে যুক্তি স্মৃতি সুবিচারের কথা ভাবতে হয়। অর্থাৎ আইন কোনোভাবেই পক্ষপাত-দোষে দুষ্ট নয়, তা সবার জন্য এবং তা যুক্তিনীতি বিজ্ঞানসম্মত। তাই সেক্ষেত্রে কেউ সত্য কথা বললে তার কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত নয়। কারণ চিরকালীন যা মৃত্যু, তাকে মান্য করা উচিত। কিন্তু ন্যায়ের শাসক ন্যায়সংগত কাজ (সুবিচার) না করে কবিকে বন্দি করে।

কিন্তু এমন কোন সত্য? আর ন্যায়ের শাসকই-বা কে। সত্য কথাটি এই যে, তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক-শোষকগোষ্ঠীর নানারকম অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখরিত হওয়া, কাব্যরচনায় তার প্রকৃত রূপ তুলে ধরা। পক্ষান্তরে ন্যায়ের শাসক ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদ শক্তি। এটা সর্বজনবিদিত, কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী, তাঁর কলম তীব্র তীক্ষ্ণ, অকপট সত্য উদ্‌ঘাটনে সাহসীও। এই কারণে ব্রিটিশ শক্তির রাজরোষে পড়ে তিনি কখনও বন্দি হয়েছেন, কখনও তাঁর কাব্যকবিতাও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, বাজেয়াপ্তকরণের আদেশ জারি হয়েছে।

কিন্তু এ-ধরনের কথাগুলি বলার কারণ, চন্দননগরের সন্তান সংঘ কর্তৃক আয়োজিত দেবী সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠান, যেখানে কবি ছিলেন উদ্বোধক হিসেবে আহৃত। উল্লেখ্য, উদ্বোধক হিসেবে সেখানে থাকলেও দ্বীপান্তরের বন্দিনী' কবিতাটি সেখানে তিনি পাঠ করেন, যেখানে সরস্বতী পুজোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কারণ বাণী-সংগীত-সাহিত্য সবকিছুই দেবী সাহতীর দান আর সেই বাণী (যা প্রতিবাদের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে...) যখন কবি উচ্চারণ করেন, তাকে লিপিবদ্ধ করেন, তখন তিনি রোজরোষে পড়েন, কারাগারে যান। তবে কবির কণ্ঠরোধ বা সত্যের কণ্ঠরোধকে কবি প্রকৃতপক্ষে ভারত-ভারতীর দ্বীপান্তর বলেই মনে করেন। অর্থাৎ প্রকৃত দেবী যেখানে আইনের বেড়াজালে বন্দি, সেখানে এই মৃৎপ্রতিমার পুজো নিষ্প্রয়োজন। পরিশেষে, এইসব পুজো-অর্চনার নেতিবাচক দিকটার কথা বলতে গিয়ে কবি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করেছেন।

ইংরেজ সরকারের নানা নিয়মনীতির ফলে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে বহু ভারতীয়কে তারা আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বিচারে বন্দি করে । এই ঘটনা কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। কারণ বন্দি সকলেই স্বাধীনতাকামী, ইংরেজ শক্তির বিরোধী। তাই তাঁদেরকে প্রতিরোধ করবার জন্য ইংরেজ সরকার অন্যায়ভাবে জেলে পুরেছে। কবি কাজী নজরুলও এই সরকারের অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারকে ভালো চোখে দেখেননি। তিনিও তাঁর লেখনীর মাধ্যমে এসবের প্রতিবাদ করেছেন। ইংরেজ সরকারের টনক নাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। ফলে সরকার তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ বা চ বলন—লেখালেখি ইত্যাদির প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রেখে শেষপর্যন্ত তাঁর প্রতিও বিরূপ অন্যায় আচরণ করেছে। যুগবান বে বাঁশি', 'ভাঙার গান' প্রভৃতি গ্রন্থের ওপর খলাহত হয়ে 'নিষিদ্ধ', 'বাজেয়াপ্ত' ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করেছে  এরকম একটি অবস্থার মধ্যে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে চন্দননগরের সন্তান সংঘের আহ্বানে সরস্বতী পুজোর উদবোধনে আহত হন তিনি। সেখানে গিয়ে তিনি দ্বীপান্তরের বন্দিনী' কবিতাটি পড়ে শোনান। যার মধ্যে তিনি প্রকাশ করেন দেবী সরস্বতীর অবস্থান। অর্থাৎ চন্দননগরের সন্তান সংঘের যুবকরা যতই বাকদেবী সরস্বতী পুজোর আয়োজন করুন, মূল দেবীকে ইংরেজ সরকার বন্দি করে রেখেছে আন্দামানে। বস্তুত বন্দি-স্বাধীনতাকামী মানুষের মধ্যে করি সরস্বতীকে প্রত্যক্ষ করেছেন। হয় বন্দি বলতে বন্দিনী ভারতমাতা বা সমস্ত ভারতীয়, যাঁরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত, দ্বীপান্তরিত। ভিন্ন অর্থ স্বাধীনতাকামী-মুখর-ভারতীয়; যাদের সরব প্রতিবাদ-বিরুদ্ধাচরণকে নির্দিষ্ট স্থানে বন্দি করে রাখা হয়েছে। সর্বোপরি প্রতিবাদ-অন্যায়-অবিচার ইত্যাদির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হওয়া তো দেবী সরস্বতীর কৃপায়— তিনি তো ভাষারই অধিষ্ঠাত্রী দেবী। অর্থাৎ পুজোর জায়গায় দেবী সরস্বতী একটি মৃৎপ্রতিমামাত্র আসল সরস্বতী বন্দি অন্যত্র। সেখানে কী হচ্ছে? লক্ষণীয়। যন্ত্রী সেখানে সাঙ্গী বসায়ে বীণার তন্ত্রী কাটিছে হায় সেখান হতে কি বেতার-সেতারে এসেছে মুক্ত-বন্ধ সুর? মুক্ত কি আজ বন্দিনী বাণী :/ ধ্বংস হল কি রক্ষপুর?"

এইসঙ্গে মিশে গেছে কবির গ্রন্থ নিষিদ্ধকরণ, কারাবরণ ঘটনাও : "অত্যাচারিত হইয়া যেখানে বলিতে পারি না অত্যাচার / যথা বন্দিনী সীতা-সম বাণী/ সহিছে বিচার চেড়ীর মার...।

তবে দেবীর পূজার্চনাকে কবি কঠোর কঠিন ব্যঙ্গবিদ্রুপ না করে পূজারিকে এমন অনেক প্রশ্ন করেছেন, যেখানে প্রকাশ পেয়েছে দেশপ্রেম-সংক্রান্ত নানা উপকরণের কথা। সেসব (আরতির তেল, চর্বি ইত্যাদি) তিনি এনেছেন কি-না। না থাকে বৃথাই তিনি শঙ্খে ফুঁ দিচ্ছেন। সর্বোপরি তিনি চেয়েছেন, অঞ্জলি নয়, বেজে উঠুক পাহাজন্য শব্দ। কারণ দ্বীপান্তরের মানিতে যুগান্তরের ঘূর্ণিপাক লেগেছে। এককথায় কবি নবযুগের সূচনাকল্পে এই মানসিকতা পোষণ করেছেন (কুলি মজুর' কবিতারেও কবি শুভদিন আগমনের ইঙ্গিত দিয়েছেন এইভাবে)।

বিদ্রোহী কথাটির মূলে আছে 'কারও বা কিছুর বিরুদ্ধে কারোর অভ্যুত্থান'। সুতরাং, 'রাজা জমিদার শাসক প্রভৃতির বিরুদ্ধে যার অভ্যুত্থান, সে বিদ্রোহী। কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে এরকমই বিদ্রোহী ছিলেন, তার প্রমাণ তর বিভিন্ন গদ্য-পদ্যেই 'আছে। যদি তা না হত, তাহলে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে খরাহস্ত হত না কিবো তাঁর নানা গ্রন্থ 'নিষিদ্ধ', 'বাজেয়াপ্ত ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত হত না এবং নিজেও কারাবাস করতেন না। তাঁর এই বিদ্রোহীসত্তার মূলে ছিল নানা কারণ, যেমন—সমাজে বা দেশে নানা শ্রেণির মানুষের অন্যায়-অবিচার, শোষণ-পীড়ন মনুষ্যত্বহীনতা, কপট ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আচরণ। পাশাপাশি ছিল বিশ্ববন্দিত ম্যাক্সিম গোর্কি, রুশো, তুর্গেনিভ, মধে প্রতিবেশী রাজ্যের (অস্ত্র ও উড়িষ্যার সীমান্তবর্তী) বিপ্লবী কবি সুব্বারাও পাণিগ্রাহী প্রমুখ লেখক-কবির মতো প্রগতিশীল মানসিকতা: যেকারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাম্যবাদী।

“ঈীপান্তরের বন্দিনী' কবিতাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উপযুক্ত কথাগুলি মোটেই মিথ্যা নয়। কবিতায় উল্লেখি হয়েছে নানা প্রশ্ন, নানা রুঢ়-কঠিন ভাষা; যার উৎসে আছে ইংরেজ সরকারের নানা নিয়মনীতির বেড়াজালে। ভারতীয়দের আন্দামান সেলুলার জেলে নির্বাসন। যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাই চন্দননগরের সন্তান সংঘের যুবকরা সরস্বতী পুজোর আয়োজন করলেও আন্দামানে দ্বীপান্তরিত যিনি, তিনি ভারত-ভারতী। সেখানে তাঁর ওপর হ নানা অত্যাচার। শতদলের পাপড়ি, বীণার তার প্রভৃতির ছিন্নভিন্ন অবস্থা। আর এদিকের পুজোর আয়োজন দেখে মনে হয়ে বন্দিনী-বাণী মুক্ত, রাক্ষসপুরী ধ্বংস, যক্ষপুরীর রৌপ্য-পঙ্কে রূপ-কমল প্রস্ফুটিত, কামান গোলার সীসা স্তূপে শিশমহল নির্মিত। এভাবেই কবি আরো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। প্রশ্ন করেছেন শৌখিন পূজারিকেও। পুজোর আরতির  কি তিনি এনেছেন। ঘানির তেল। যেখানে বাণী রাত্রিদিন ঘানি টানছে। বন্দিরা ধান ভানছে। পুজোর জন্য চর্বি প্রয়োজন। কিন্তু কোথায় সে সব? “হায় শৌখিন পূজারী, বৃথাই/দেবীর শঙ্খে দিতেছ ফু...।" শুধু এখানেই শেষ নয়, এরপরেও কবি প্রশ্ন তুলেছেন, বিস্মিত হয়েছেন নানা ঘটনায়। যেখানে আভাসিত হয়েছে কবির সাম্রাজ্যবাদশক্তির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হওয়ার জন্য বা কাব্য কবিতা রচনার জন্য শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক তা নিষিদ্ধকরণ, বাজেয়াপ্তকরণ ইত্যাদির ঘোষণা, এমনকি উর ওপরও নানা পীড়ন।

কিন্তু কবি আশাবাদী, তবে তিনি বিশ্বাস করেন আঘাতের বদলে আঘাত, নাহলে পাঞ্চজন্য শঙ্খবাদনের কথা বলতেন ন তিনি। কারণ পাঞ্চজন্য শঙ্খবাদনের অর্থ যুদ্ধের সূচনা—বিপ্লবের সূচনা-নতুন যুগের সূচনা। বিশেষত, এই শঙ্খ মানেই শ্রীকৃষ্মের শঙ্খ, যিনি মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মহানায়ক। সুতরাং এ ধরনের কথা বলার মধ্য দিয়ে কবির যে বিদ্রোহীসত্তার প্রকাশ ঘটেছে, তা সহজেই অনুমেয়।

কোনো কবি যখন তাঁর কোনো কবিতার নামকরণ করেন, তখন বোঝা যায় তিনি কোনো অভিপ্রায়কে রাজ করতে চাইছেন। আর নামকরণ এমন একটি ব্যাপার, যা কবির মূল বক্তব্যের আভাস দেয়, কখনও কোনো তাৎপর্য বহন করে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নামকরণ হয়ে থাকে ব্যঞ্জনাধর্মী। কিন্তু কবি কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কিছু কবিতার নামকরণে আক্ষরিক অর্থ প্রকাশ পেয়েছে (যাকে বাচ্যার্থও বলা যেতে পারে)। বিশেষ করে সঞ্চিতা'র অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলিই তার প্রমাণ। সেক্ষেত্রে 'দ্বীপান্তরের বন্দিনী' বাঝানাময় । এ কবিতায় দুটি জিনিস লক্ষণীয়। দ্বীপান্তর ও বন্দিনী। প্রশ্ন উঠতে পারে, কোন দ্বীপ? সেটা কি আন্দামান (নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ)? আন্দামান হওয়া আশ্চর্যজনক কিছু ব্যাপার নয়। কারণ বহু স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী বা যোদ্ধাকে আন্দামানে সেলুলার জেলে যেতে হয়েছিল। কিন্তু বন্দিনী-টা কে? এমন কোন বীরাঙ্গানার কথা বলেছেন কবি? এরকম কোনো উজ্জ্বল যা বহুল পরিচিত দৃষ্টান্ত আমাদের জানা নেই। তাহলে কী? কবিতায় লক্ষ করা যায়, কবি এখানে সরস্বতী পুজো এবং পূজারির কথা উল্লেখ করেছেন। এবং তাঁকে নানা প্রশ্নে বিদ্ধ করেছেন। কিন্তু সেসব প্রশ্নের (দেশপ্রেম-সংক্রান্ত) উত্তর তিনি পাননি। সর্বোপরি কবি দেবীর পূজার্চনা করাকে বৃথা বলেছেন। এ বিষয়ে কবি বলেছেন: “হায় শৌখিন পূজারী, বৃথাই/ দেবীর শঙ্খো দিচ্ছে ফুঁ/ পুণ্য বেদীর শূন্য ভেদিয়া ক্রন্দন উঠিতেছে শুধু!”

আসলে কবি এ কবিতাটি লিখেছেন একটি বিশেষ উদ্দেশে। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে চন্দনন্যার সন্তান সংঘের আহ্বানে সরস্বতী পুজোর উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন তিনি। তখনই তিনি এই কবিতাটি পাঠ করে শোনান। কিন্তু তার তাৎপর্য কী? তাৎপর্য এই যে, যেসব যুবক আজ এই বাগদেবীর পুজোর আয়োজন করেছেন, যে পূজারি এই পুজো করছেন, তাঁরা এই সত্য জানুন, কবির স্বাধীনতা-আকাঙ্ক্ষা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা যা দেবী সরস্বতীরই ভাষা, সেই ভাষাকে বা কবির কণ্ঠকে রোধ করার জন্য ইংরেজ শাসক-শোষক সম্প্রদায় রাষ্ট্রদ্রোহীদের যেমন আন্দামানে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল, তেমনি তাঁকে এবং তাঁর রচনাকে কখনো নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, বাজেয়াপ্তকরণের আদেশ দিয়েছে। প্রকারান্তরে যা দেবীকেই দ্বীপান্তরিত করার শামিল। কবিতার প্রথম দুই পঙক্তি লক্ষণীয়। "আসে নাই ফিরে ভারত-ভারতী ?/মা'র কতদিন স্বীপান্তর? এইসব কথা বিবেচনা করলে দ্বীপান্তর ও বন্দিনীর স্বরূপ বুঝতে অসুবিধা হয় না। আবার কবি যখন আরেকটি উপমা দেন “যথা বন্দিনী সীতা-সম বাণী/সহিছে বিচার-চেড়ীর মার", তখন বোঝা যায় এ দ্বীপ লঙ্কাদ্বীপ (একসময় সিংহল নামে পরিচিত ছিল)। রাবণ সীতাকে যেমন স্থানান্তরিত করেছিলেন, ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীও তদ্রূপ বাণী (কবিকণ্ঠ বা রচনা) রূপ সীতাকে কারাগারে বা প্রশাসনিক দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন। এদিক থেকে কবিতার নামকরণ যে যুক্তিযুক্ত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পরিশেষে, কবিতায় দ্বীপান্তর ও বন্দিনী-প্রসঙ্গ আদ্যোপান্ত একাধিকবার (চারবার) ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এই কবিতার এ ছাড়া অন্য নাম হলে যথোপযুক্ত হত না।