অধ্যায়-9, নুন

বিশেষত ভাষা প্রয়োগে কবির কোনোরকম শুচিবায়ুগ্রস্ততার পরিচয় না-দেওয়া।

'নুন' কবিতায় কথক যখন বলেন, তাঁরা দু-ভাই মিলে গণিকায় টান দেন সেই ঘটনা পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। ইত্যাদি ছবি স্নান।

‘নুন' কবিতায় সাধারণ ভাতকাপড়, অসুখ, ধারদেনা, নুন ছাড়া শুকনো ঠান্ডা ভাত

'নুন' কবিতাটি ১৬ পক্তির এবং ৮টি স্তবক ও প্রতি  দু-পত্তি অন্ত্যমিলবিশিষ্ট ।

'নুন' কবিতায় গাঁজা খাওয়ার প্রসঙ্গ দু-বার আছে।

'গণিকা'-র পরিবর্তে 'গাঁজা' ব্যবহৃত হলে ছন্দের মাত্রাহ্রাস (কম) এবং শ্রুতিমাধুর্য নষ্ট হত।

বাবা একদিকে ও দু-ছেলে অন্যদিকে; মোট তিনজন। কিন্তু কবিতার শ্রুতিমাধুর্য রক্ষা করতে গিয়ে দু-রকম ভেবে কথা বলেছেন কবি একরকম ভাবনা: বাবা ও দু-ব্যাটা আর অন্যরকম ভাবনা—দু-ভাই ও বাবা। (বস্তুত ‘ব্যাটা' ও 'ভাই' কথা দুটির ব্যবহারে পাঠককে একটু ভাবতে হয়)।

প্রশ্নোক্ত পংক্তিটির অর্থ—ঠাণ্ডা ভাতে নুন না-থাকার জন্য মধ্যরাতে অশান্তি সৃষ্টি করা বা সারাপাড়া ঐ নিয়ে তোলপাড় করা।

উদ্ধৃত পংক্তিটিতে নুন না-থাকা নিয়ে অশান্তি সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে।

উদ্ধৃত পঙক্তিতে কবি বিষয়টি পারিবারিক, ব্যক্তিস্বাধীনতা বা গণতান্ত্রিক এবং এই কারণে তাতে অন্যের নাক গলানো নিষ্প্রয়োজন—এসবই ইঙ্গিত করেছেন।

কথক আর্থ-সমাজব্যবস্থার শিকার, তাই এ আবেদন সেইরকমই কোনো হৃদয়বান মানুষের কাছে, যিনি তাঁদের আর্থিক অনটন দূর করবেন বা নুনের ব্যবস্থা করবেন।

'নুন' কবিতায় নুন ছাড়া শাক-ডাল দুধ-ভাত ইত্যাদির কথা না থাকায় আমাদের মনে হয় কবি মূলত মানুষের প্রাত্যহিক চাহিদা ও দৈন্যকে ভালোভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন।

নুন আবশ্যিক, এতে মানুষের চাহিদা সম্পর্কে ন্যূনতম চাহিদা ব্যক্ত করেছেন।

মানুষের মনুষ্যত্ব প্রকাশ পায় খাওয়াদাওয়া, বংশবিস্তার ছাড়া শিল্প-সৌন্দর্যপিপাসা বা চর্চায় তাই কবি মানুষের দৈন্যের ভেতরেও তার শৌখিন শিল্পীমনের পরিচয় তুলে ধরতে এই প্রসঙ্গ এনেছেন।

'নুন' কবিতা পড়তে গিয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথা মনে পড়ে এবং তিনিও 'হে মহাজীবন' কবিতায় ক্ষুধা ও সৌন্দর্যের (যথা রুটি ও চাঁদ) কথা বলেছেন।

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের কথা মনে পড়ে কারণ তিনি সেখানে ঈশ্বরী পাটনি যিনি খেয়া পারাপারের কাছ করেন এবং তিনিও দরিদ্রের সস্তানের জন্য দুধ-ভাত খাওয়ার বাসনাকে প্রকাশ করেছিলেন।

“নুন খাওয়া সম্পর্কে একটি প্রচলিত শব্দ নিমকহারাম, যার অর্থ কৃতঘ্ন অর্থাৎ যে নুন খেয়েও অর্থাৎ উপকার পেয়েও তা স্বীকার করে না'।

মানুষের দৈন্য বোঝাতে নুন সম্পর্কিত প্রচলিত কথাটি হল নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।

রসায়ন শাস্ত্রে নুনকে বলে সোডিয়াম ক্লোরাইড (Sodium Chloride)।

নুন খাদ্যের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান, ভাতের অনুষঙ্গে এটি অবশ্য প্রয়োজন আর তা হতদরিদ্র মানুষের প্রধানতম চাহিদার অবসান ঘটায়, তাই কবিতার নাম নুন না হয়ে অন্য কিছু হলে মোটেই মানানসই হত না।

'নুন' কবিতায় কবি প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার ইত্যাদি অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।

হ্যাঁ, স্বীকার্য ।কারণ আপাত যা তুই, নগণ্য, ব্রাতা, লোকচক্ষুর বা ভাবনার বাইরে, সেগুলির যে কারা-শিল্পে ব্যবহৃত হতে পারে, সেটি বোঝাবার জন্য একেবারে কথ্যভাষা নুনা স্বীকৃত হিসেবে মানানসই।

কবিতার পিতা-পুত্র প্রতিপক্ষ হিসেবে যতটা মানানসই, সেক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা থাকলে, বাড়ির যে দৃশ্যময়তার ছবি আমরা পাই, সেটি আর পাওয়া যাবে না।

যে-কোনো করি, শিল্পীমাত্রেই তাঁর সৃষ্টির নামকরণ যে ভাবনায় ভাবিত হয়ে করেন, সেই গোপন ভাবনাটি কী, তা অন্য কোনো পাঠক বা কবি, কবিতাপ্রেমী জানেন না। অন্য কারোর দেওয়া নামকরণও যথাযথ হয় না সবসময়। যেমন, বিস্তৃতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পথের পাঁচালি'-র নামকরণ নীরদ সি. চৌধুরী করতে চেয়েছিলেন নিশ্চিন্দিপুরের া চাননি। আবার কবি দীনেশ দাশের 'রাম গেছে বনবাসে' কিংবা কেতকীকুশারী ডাইসনের "মনের করিডর ধরে" কাব্যএর দুটির নামকরণের নেপথ্যে অন্যান্য করিনের ভূমিকা।

তবে জয় গোস্বামীর "নুন" একটি কবিতামাত্র এবং তার বক্তব্য বিখ্যা কী, সেটা বুঝতে আমাদের তেমন অসুবিধা হয় না। এই নামটি বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। কবিতাটির আদ্যোপ্রান্ত যা বৃত্তান্ত, তাতে 'নুন'-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি সর্বত্র নেই। নুনের ভূমিকা যৎসামান্য শেষাংশে। সুতরা 'নুন' না হয়ে কবিতার নামকরণ যদি হত মধ্যরাতের হইচই কাণ্ড', 'সাধারণ ভাত-কাপড়ের কথা', 'অসুখ-ধারদেনা বৃত্তান্ত', 'মুনহীন ঠাণ্ডাভা কিংবা দুপুররাতের মা তাহলে পাঠক প্রতিটি নামকরণের মধ্য দিয়ে এক একটি কল্পনার লেন এবং তাতে খুব বেশি অসুবিধাও হত না। কিন্তু কবির intention আলাদা তিনি শিল্পী-কবি অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টিকে রূপময় করে তুলতে প্রয়াসী, তাই 'নুন' নামকরণের মধ্য দিয়ে একটি অভিনবত্ব প্রকাশ করতে চেয়েছেন, যা পাঠকের চিরকালীন ভাবনা থেকে স্বতন্ত্র। কবির এই মানসিকতার প্রমাণ তাঁর বিভিন্ন কাব্যের নামকরণে যেমন লক্ষণীয়, তেমনি কবিতার ক্ষেত্রে (যদিও এটি আজ আর নতুন বলে মনে হয় না কখনও)। কবিতার মূল বক্তব্য এবার বিশ্লেষণ করে দেখা যাক, এই নামকরণ কতটা মানানসই, যুক্তিযুক্ত। 'নুন'-এর কথক এবং তার অন্যান্য স্বজন অল্পে খুশি। সাধারণ মোটা ভাত-কাপড়ে ধারদেনাতে তাঁদের দিনাতিপাত হয়। কোনোদিন হাটবাজার হ প্রতিকির, কোনোদিন মাত্রাছাড়া (সেদিন আবার গোলাপচারা কিনে আনা হয়, যদিও তা পুঁতবার জায়গা নেই, ফুল ফোটার ভাবনাও সংশয়। অন্যদিকে কথক কর্মহীন কিংবা কর্মসন্ধানী, অনিশ্চিত-অসুখী জীবনযাপন, নেতিবাচক চিন্তাভাবনায় জানি মধ্যরাতে বাড়ি ফেরেন, গঞ্জিকা সেবন করেন। মধ্যরাতে ঠাণ্ডা ভাত খেতে বসে তাঁর মাথায় আগুন জ্বলে, কারণ একে া ভাত তদুপরি তাতে নুন-ও নেই। এতে সারাবাড়িতে তিনি হইচই কাও বাঁধিয়ে দেন। পাড়াপড়শিও জেগে ওঠে। এবং বা তাদের এই ব্যাপারে অন্যের নাকগলানো তাঁর অপছন্দ। এটি ব্যক্তিস্বাধীনতা। গণতান্ত্রিক। এমন ভাবই পোষণ করেন ন। তার চেয়ে অন্যেরা তাদের শুকনো ভাতে নুনের ব্যবস্থা করলে ভালো। শেষাংশে এই 'নুন' থাকায় কবিতার এই করা যেন মধুরেন সমাপয়েং এবং এই মর্মে এই নামকরণ সার্থক। দ্বিতীয়ত 'নুন' থাকলে (ঠাণ্ডা-শুকনো ভাতে) হয়তো কবিতাই লেখা হত না। সর্বোপরি মধ্যবিত্ত জীবন সংকটের ছবিও পাওয়া যেত না এমন অপরূপভাবে।

জয় গোস্বামী বরাবরই এমন কবি, যিনি তাঁর কবিতায় প্রধানত খুব সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের কথাই করেছেন। আমাদের চারপাশের যে অতিপরিচিত কর্মজগৎ, তার নিপুণ ছবি তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতায় শ্রমজীবী।

না পুরুষ এবং তাদের সুখ-দুঃখ, কামনা-বাসনার কথা বেআব্রুভাবেই প্রকাশ পেয়েছে। এবিষয়ে কবি অকপটে যা উচ্চারণ করেছেন, তাতে কবিতা কখনও কষ্টকল্পিত শিল্প বলে মনে হয়নি আদৌ, মনে হয়নি কোনো কবিতা কৃত্রিমভাবে রচিত 'নুন' এইরকমই একটি কবিতা, যার কথক জানাচ্ছেন তাদের জীবনে বেঁচে থাকতে হলে কোনো বেশি জিনিসের। প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত, এজন্য কোনো দুঃখ করাও বৃদ্ধা। জীবনে দুঃখ-সুখ চক্রবং ঘুরে-ফিরে আসে (চক্রবং পরিবর্তে সুখ দুঃখানি, যা প্রকৃতির নিয়মেই ঘটে। এটাই সাধারণ সভা এবং মধ্যবিত্ত মানসিকতায় ছায়ার মতো সম্প করে সেইজন্য অনেশের নমুনা পেশ করেছেন। আমাদের দিন চলে যায় সাধারণ ভাত-কাপড়ে।

জীবনে দুঃখের বিপরীতে সুখ ছাড়া, সুখের বিপরীতে অসুখও আছে, যা শরীরের-মনের স্বাভাবিকতা নষ্ট করে আবার . প্রতিকূলতার মুখোমুখিও করে। তা হল আর্থিক অনটন। কবির ভাষায় কথকের দিন অতিক্রান্ত হয় 'অসুখে ধারদেনাতো । শুধু এসবই নয়, সব মধ্যবিত্তও নয়, কোনো কোনো মধ্যবিত্ত এইসব জ্বালাযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জীবনকে নানাভাবে কষ্ট দেয়। কেউ বেছে নেয় আত্মহননের পথ। কেউ নেশাভাঙ করে বিস্তৃত হতে চায়। এ কবিতায় কথক তেমনি। রাত্তিরে দু-ভাই মিলে টান দিই গঞ্জিকাতে'। এরপরেই লক্ষ করা যায়, হাটবাজার, শঙ্খ-স্বপ্ন বা নন্দনচেতনার কথা। কথক জানাচ্ছেন, সবদিন বাজার হয় না, আবার কোনোদিন মাত্রাছাড়া হয় আর সেদিন ক্ষুন্নিবৃত্তির চিন্তার পাশাপাশি মধ্যবিত্ত গৃহী মানুষের ইচ্ছা হয় গোলাপচারা কেনার (বস্তুত সমস্ত মধ্যবিত্ত-বাঙালিরই এরকম চিন্তা। একদিকে তথাকথিত অভিজাত মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ আবার যারা আর্থিক দিক দিয়ে বিশেষভাবে পিছিয়ে পড়া, তাদের সঙ্গেও তার ওঠা-বসা, যেন টানাপোড়েনের মতো তার জীবন । গোলাপফুল বা তার প্রস্ফুটন দৃশ্য মনোরম সন্দেহ নেই, কিন্তু তার জমি, তার পরিচর্যা প্রয়োজন। তা ছাড়া 'ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়' আর তাই চাঁদ ক্ষুধিত মানুষের কাছে ঝলসানো রুটির মতো। যা সুকান্ত ভট্টাচার্য আগেই বলে গেছেন। এখানেও কবি জয় গোস্বামীর 'গোলাপচারা' তাই আপাতত নিষ্প্রয়োজন (রবীন্দ্রনাথ যেমন সাহিত্যতত্ত্বের আলোচনায় মুলোর খেত বনাম গোলাপ চাষ বা পুষ্পপ্রিয়তার কথা বলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বা মানসিকতার ভিন্নতার কথা বলেছিলেন)। নুনের কথক এইভাবেই পুনশ্চ জানান, তাঁদের ন্যূনতম চাহিদার কথা। কোনো কোনোদিন তাঁদের দিন চলে না। বড়ো কষ্টেই কাটান। ওদিকে তিনি কর্মহীন বা কর্মসন্ধানে সারাচীন ঘুরেফিরে মধ্যরাতে বাড়ি ফিরে যখন খেতে বসেন, তখন লেখন ঠান্ডা ভাতে নুন নেই। শুরু হয় চিৎকার-চেঁচামেচি। পারিবারিক অশান্তি। পড়শির নিদ্রাভঙ্গ। তিনি চান না তাতে কেউ মাথা ঘামাক। তিনি চান, তাঁরে শুকনো ভাতে অন্তত নুনের ব্যবস্থা কেউ করুক। ভাববাচ্যে এই যে উচ্চারণ আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না। এ আবেদন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মনুষ্যসমাজের কাছে। এছাড়া কথক কোনো জায়গাতেই আর যথার্থ মনে করেননি। এভাবেই এ কবিতায় মধ্যবিত্ত জীবনের চলচ্ছবি মূর্ত হয়ে উঠেছে।

কবি-লেখক-শিল্পী সকলেই সকলের মতো সমাজবদ্ধ প্রাণী, তাই তাঁদের শিল্পে জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি বা সময়ের ছবি নানাভাবে শিল্পরূপ লাভ করে। তবে কেউ কেউ (বিশেষত চিত্রে ভাস্কর্যে) তাঁর শিল্পকে বিমূর্ত বা মূর্ত করে তোলেন, কেউ সরাসরি (বিশেষত কবি-লেখক) তা মূর্তরূপ দান করেন। এবং এইভাবই সেই সৃষ্টি হয়ে ওঠে সমাজ, জীবন বা বাস্তবের বিশ্বস্ত দলিল। পাশাপাশি রচয়িতাও লাভ করেন শিল্পানুসারী নানা আখ্যা (যেমন কেউ "দুঃখবাদী', কেউ 'ভোগবাদী', কেউ-বা 'বিপ্লবী', 'বিদ্রোহী' ইত্যাদি)। তবে সমাজজীবন-সাহিত্য ইত্যাদির মধ্যে যে পারস্পরিক অভিন্ন সম্পর্ক, এ বিষয়ে অ্যারিস্টটল থেকে রবীন্দ্রনাথ সকলেই সাহিত্যতত্ত্ব আলোচনাসূত্রে অনেক আগেই বলে গেছেন।।

সুতরাং জয় গোস্বামী সেই অর্থে মোটেই ব্যতিক্রমী নন। 'নুন' কবিতায় তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি রূপময় করে। তুলেছেন সাধারণ মানুষের জীবনের নানা টানাপোড়েন, যা মোটেই কবির কল্পনাপ্রসূত কোনো ছবি নয়। চারদিকে যে সমুদ্রসকেন-জীবন, তারই মধ্য থেকে সামান্য একটুকু তুলে নিয়েছেন কবি, যা একেবারেই ঘরের কথা, ঘরের হেঁশেলের কথা, জঠরানল নির্বাপণের কথা।

জানা যায়, কবিতায় (উত্তম পুরুষের ভাষায়) বলেছেন, তাঁদের যৌথ পরিবার। (সম্ভবত) কর্মহীন। তাঁদের দুঃখ-দারিদ্র্যময় জীবন। সাধারণ তাঁরা সন্তুষ্ট। হাটবাজার যেদিন মাত্রাছাড়া বাজার সেদিন গোলাপচারা কেনা হয়। কিন্তু পুঁতবার জন্য জায়গা নেই। সময় নেই। প্রস্ফুটন দৃশ্য সৌন্দর্য উপভোগের অবকাশ নেই। ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য গোলাপ নিষ্প্রয়োজন। কবি বা বক্তা বুঝতে পারেন নেশায় হওয়া এর চেয়ে শ্রেয়। সেজন্য তিনি (এবং ভাই) গাজার কক্ষেতে হয়তো এই নেশায় সাময়িক জ্বালাযন্ত্রণা বিস্তৃত হওয়া কিন্তু শরীর-মনের বিনাশসাধন করে। হয়তো একারণেই নিজেকে তিলেতিলে শেষ করতে চান। এখানেই নয়, এরপরেও তিনি অশান্তির চূড়ান্ত করে দুপুররাতে বাড়ি (যা বাউন্ডুলে ফলশ্রুতি অথবা কর্মসন্ধান শেষে ঠাণ্ডা ভাত খেতে বসেন। তৃপ্তিদায়ক হয় না মোটেই, কারণ ভাতে যৎসামান্য নুন তিনি না। সংসার এমনই নুনও নেই। এজন্য (দু-ভাই) মিলে এবং জুড়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাঁধান। থেকে নিশ্চয়ই প্রতীয়মান নুন এখানে আর্থিক অনটন বা জীবনের টানাপোড়েনই এ কবিতায় মূর্ত, সম্পূর্ণ রক্ত-ঘাম-ক্রোধময় বাস্তবেরই প্রতিছছবি ।

নির্মাণের বিষয় কোন মাধ্যমে প্রকাশ পাবে, সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ওপর। তিনিই ভালো বোঝেন কোন মাধ্যমে তাঁর অভিপ্রায় স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা যাবে। মর্মে তিনি বা সাহিত্যকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। তবে তারও অনেক শাখাপ্রশাখা আছে এবং সেই মোতাবেক তিনি মাধুরী মিশিয়ে কামা করেন। গোস্বামীও তদ্রুপ। তিনি নুন নুনের অনুষঙ্গো যা বলতে চেয়েছেন, সাহিত্যের কবিতা শাখাকে যথার্থ মাধ্যম মনে করেছেন এবং যাবতীয় কথা তিনি স্বল্প পরিসরে, স্বপ্ন ব্যঞ্জনায়, প্রায় অর্থেই বলবেন বলে প্রাত্যহিক জীবনের ভাষায় লিখেছেন কবিতা। তাঁর সম্পূর্ণ নিজস্ব মন-মর্জির ব্যাপার সেইজন্য এবিষয়ে ভাষার করাটাই

তবে কবিতার যা বক্তব্যবিষয়, বাকুশিমা লিখনরীতি তাতে এটি গল্প হতে পারত, কারণ কবির বক্তব্য বিন্যস্ত হয়েছে, তাতে কথাসাহিত্যিক হতে পারতেন (যদিও বাস্তবে তিনি কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্য ও গদ্যরচনা লিখে থাকেন)। এখন কবিতাটিকে একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক যৌথ পরিবারে বক্তা (কবিতার) তাঁদের চাহিদা সামান্য। সাধারণ ভাত-কাপড়ে তাঁদের দিন অতিবাহিত। সংসারে ধারদেনা। সুতরাং, গঞ্জিকায় টান দু-ভায়ের উচ্ছন্নে যাওয়া ছাড়া আর কাজ কী? হাটবাজার সবদিন হয় না। তবে কোনোদিন আবার মাত্রাতিরিক্ত হলে শখের গোলাপ আনা হয়। কবিতার এই অংশটুকু মধ্যবিত্ত জীবনের ক্ষুধা-নেশা-সৌন্দর্য প্রিয়তার কথা ব্যক্ত, এটি কবিতার চেয়ে হতে পারত আরও রূপময়, হতে অনুজ্জ্বল বর্ণময় জীবনের এবং শেষপর্যন্ত এ কবিতায় যে দৃশ্যটি আমরা পাই, তাতে বক্তার অশান্তি অনুক্ত থাকত, পরিবর্তে বক্তার মধ্যরাতে ফেরার দৃশ্য, ঘড়ির কাঁটায় নির্দেশিত সময়, শুধু শুকনো ঠাণ্ডা ভাত, শূন্য লবণপাত্র ইত্যাদি ভাষায় চিত্রিত হতে কিংবা বিরক্তিসূচক কোনো মুখ। কিন্তু হয়নি। যেমনটি হয়নি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর 'চণ্ডীমণ্ডল' এবং যার ছিল উপন্যাসের শর্ত। অনেক অধ্যাপক-গবেষকরাই এমন (উপন্যাসের) কথা মুকুন্দরামের কাব্য পড়ে।

অবশ্য হয়নি মানমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে (এমনকি কবিরও), এ কথা বলা যাবে না। কারণ কবিতাটি হয়ে উঠেছে অন্য ক্ষেত্রে যেমন—দু-ভাই মিলে গঞ্জিকা সেবন সাহসী-অকপট-দ্বিধাহীন উচ্চারণ) কবিতাটির চিরাচরিত প্রথা ভাষা থেকে সরে আসা; ব্যাপারটির মধ্যে সংঘাত অভিনব)। কবিতার নামকরণে আটপৌরে জীবনাচরণের ইঙ্গিত। এইদিক কবিতাটিকে কল্পনালতা তৈরি করেননি। গল্প না হয়েও এটি অভিনব রসাত্মক একটি কবিতা। এতে অতৃপ্ততার কোনো কারণ নেই ।

মৃৎপ্রতিমার অতুলনীয় সৌন্দর্য থাকলেও তাকে সম্পূর্ণতা দেবার জন্য মৃৎশিল্পী একটি চালচিত্র তৈরি করেন। সাহিত্য-শিল্পীরাও মূল বিষয়কে প্রকাশ করবার জন্য অনুষঙ্গ হিসেবে যেসব তথ্য-তর-ঘটনা-উপমার সাহায্য নেন, তাতে তাঁর শিল্পও রূপময় হয়ে ওঠে। তা ছাড়া কবি-শিল্পীরাও সৃষ্টিকালীন অনেকসময় স্বতঃস্ফূর্তভাবে যেসব কারুকাজ করেন তখন তাঁর অসচেতনতায় আনুষঙ্গিক বিষয় বা ঘটনা মূল সৃষ্টির সঙ্গে জুড়ে যায়। আবার কেউ কেউ অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করেই সাহিত্যসৃষ্টি করেন। তবে সেসব রচনার নেপথা-বৃত্তান্ত সবসময় জানা সম্ভব হয় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ঘরে বাইরে' লিখতে গিয়ে রাজনীতি বা দেশের সমকালীন ঘটনাকে নিয়ে এসেছিলেন। তবে তাকে তিনি প্রাধান্য দেননি। সেটি এসেছিল অনুষঙ্গ হিসেবে মূল বক্তব্যকে শিল্পময়ভাবে প্রকাশ করার জন্য এই ভনিতার কারণ, জয় গোস্বামীর 'নুন' কবিতায় গঞ্জিকার প্রাসঙ্গিকতা আছে কিনা। কবিতার বিষয়বস্তু হল, দুঃখ-হাসি, অভাব-অনটন, নাদন-চেতনা, সাধারণ ভাত-কাপড়, কর্মহীন জীবনযন্ত্রনা ইত্যাদির পারস্পরিক সম্পর্ক; কিন্তু নুন না থাকলে কবিতা শিল্পমণ্ডিত হবে না। আবার কবির অভিপ্রায়ও বাজ হবে না। সেজন্য কবিতার শেষাংশে এসেছে নুনহীন ঠাণ্ডা ভাত, খেতে বসা এবং নুন নিয়েই অশান্তির চূড়ান্ত। এমন একটি কবিতায় (আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়) গঞ্জিকা সেবনের প্রথা না থাকলে কোনো ক্ষতি হত না। কিন্তু 'নুন'-এর ওপর চূড়ান্ত অধিকার একমাত্র কবি জয় গোস্বামীর, শিল্পী জয় গোস্বামীর তার নাড়ি নক্ষত্র সমস্তই তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত। সুতরাং গঞ্জিকা সেবন প্রসঙ্গ আনার তাৎপর্য বুঝতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না। কারণ কবিতায় বক্তাকে কর্মহীন বেকার ভবঘুরে বাউন্ডুলে বলেই মনে হয়। জীবনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা নেই, তাই প্রবল অবজ্ঞায় ঘৃণায় নিজেকে নষ্ট করবার জন্য অথবা জ্বালা-যন্ত্রণাকে বিস্তৃত হবার জন্য তিনি গণিকার কক্ষেতে মুখ দেন। দ্বিতীয়ত, কর্মসন্ধানে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে বিফল মনোরথে তিনি মধ্যরাতে বাড়ি ফেরেন। এমন যুবকের গঞ্জিকা সেবন তাই যথাযথ। তা ছাড়া গঞ্জিকা এমন একটি নেশার সামগ্রী, যা সেবন করলে ব্যক্তির অবনমনের মাত্রাটা যে কত নিম্নাভিমুখী সেটি বোঝা যায়। (তুলনায় মদ খেলে সেটার মান অবনমনের ক্ষেত্রে একটু উঁচু পর্যায়ের সেটি বোঝা যেত) এবং তাকে ঘিরে যে রূপকল্প, আবহ তৈরি হয়, তাতে কবিতাটিও অভিনবত্বে শিল্পময় হয়ে ওঠে এবং সেটি 'নুন'-এর ক্ষেত্রে হয়েছেও। কবিতাটি শিল্প হিসেবে ভিন্ন। মাত্রা পেয়েছে। এজন্য গঞ্জিকা সেবন প্রথম কবিতায় স্বাভাবিক, কাঙ্ক্ষিত এবং সৌন্দর্যবর্ধক হয়ে উঠেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপকরণ বলতে চিত্র ও সংগীতের কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ চিত্রধর্মিতা ও সংগীতধর্মিতা। কিন্তু এটি যে সব সাহিত্যিককে মেনে চলতে হবে, সেকথা তিনি বলেননি। এবং সেইকারণে সব সাহিত্যে এমনটি পাওয়া যাবে না। তবে এই দুটি বস্তু সাহিত্যকে যে বিশেষ গুণান্বিত করে, তা সহজেই আমরা বুঝতে পারি। কারণ এতে সেই সাহিত্য পাঠকের হৃদয়গ্রাহ্য হয়।

জয় গোস্বামীর 'নুন' কবিতায় এইরকম চিত্রধর্মিতার পরিচয় ফুটে উঠেছে তাঁর নিজস্ব লিখন ভঙ্গিমায়। দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় এইসব পতি ১. রাত্তিরে দু-ভাই মিলে টান দিই গঞ্জিকাতে ৷৷ এখানে লক্ষণীয় তিনটি জিনিস, রাত্রিবেলা (সময় বা কালনির্দেশক), দু-ভাই (পাত্রনির্দেশক) আর গঞ্জিকায় টান (ঘটনা নির্দেশক)। (বাজার মাত্রাছাড়া হলে) বাড়িতে ফেরার পথে কিনে আনি গোলাপচারা ।। এই অংশে ফুটে উঠেছে মাত্রাছাড়া বাজারের দৃশ্য অর্থাৎ থলেভর্তি দু-হাত, বাড়ি ফেরার মুখে কাঁটাভর্তি কয়েকটি গোলাপচারা। যেন এইটাই প্রমাণিত, শুধু প্রাণধারণের জন্য এই মনুষ্যজীবন নয়, জীবনে নান্দনিকতা প্রয়োজন।

কিন্তু, পুঁতৰ কোথায়? ফুল কি হবেই তাতে?... টান দিই গঞ্জিকাতে ৷৷ এই অংশে ফুটে উঠেছে বাড়িতে স্থানাভাবের দৃশ্য আর ফুল-প্রস্ফুটন নিয়ে চিন্তাকুল বা সংশয়াচ্ছন্ন অবস্থা। এসবকে তুচ্ছজ্ঞান করে বক্তার গঞ্জিকাসেবনের প্রতি বিশেষ আগ্রহী হওয়ার দৃশ্যও প্রকাশ পেয়েছে।

৪. বাড়ি ফিরি দুপুররাতে খেতে বসে রাগ চড়ে যায়, নুন নেই ঠাণ্ডা ভাতে। এখানে বরার মধ্যরাতে বাড়ি ফেরা ঘটনাটি বেশ নাটকীয় পরিবেশের সূচনা করেছে। তারপর একা একা ভাত খেতে বসা, যা বেশ নির্জনতায় পরিপূর্ণ আর নুনহীন ঠাণ্ডা ভাতের জন্য বন্ধার যে রুল হওয়ার বিষয়টি, সেটি অবশ্য চিত্রধর্মিতার ইঙ্গিতবাহী। ৫. ব্যাপব্যাটা দু-ভাই মিলে সারাপাড়া মাথার করি। মূর্ত হয়ে উঠেছে এই দৃশ্যটিও। তবে এখানে পার কলে তিনজন। একদিকে বাবা, অপরদিকে দু-ভাই। এখানে রাতের নৈঃশব্দ্য ভেঙে ছত্রখান। বাড়ির অন্দরমহল আর সমস্ত পাড়া সচকিত। বিশেষত পাড়ার লোকেদের বিরক্তি, কৌতূহল, পারস্পরিক সরবে নীরবে, আভানে ইঙ্গিতে আলোচনা। ঘটনার উৎসে কী, কে, কেন ইত্যাদি। অর্থাৎ জয় গোস্বামী নুন-কে কেন্দ্র করে বা উপলক্ষ্য করে যা বলতে চেয়েছেন, তা অত্যন্ত নাটকীয় দৃশ্যের সূচনা করে। বলেছেন। এতে অবশ্য কবিতাটি হয়ে উঠেছে নাট্য-গুণাণিত। সেজনা কবিতাটি অযথা মস্তিষ্কে আবেদন রাখেনি, রেখেছে হৃদয়ে (বস্তুত কবিতার আবেদন ঘুমনোরই কাছে) আর তা সম্ভব হয়েছে কবির বক্তব্য বিষয়গুলি মূর্তরূপ লাভ করার ফলে। সর্বোপরি সেসমস্ত রূপাঙ্কনে অনুসৃত হয়েছে প্রাত্যহিক জীবন।

জয় গোস্বামীর 'নুন' কবিতায় করা নিজের একার কথা বললেও, প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত একান্নবর্তী পরিবারের কথাই বলেছেন। এতে তাঁকে দেখে আমাদের বাহবা দিতেই হনা। কারণ সকলকে নিয়েই তিনি থাকতে চান। সুখ-দুঃখ সকলের মধ্যে ভাগ করে নিতে চান। তিনি স্বার্থপর নন। শুভাকাঙ্ক্ষী। এর অনুকূলে পঙক্তিগুলি উদ্ধৃত করা যেতে পারে—১. আমরা তো অল্পে খুশি। ২. আমাদের দিন চা... যায় দিন আমাদের। ৪. রাঙিরে দু-ভাই মিলে। ৫. আমরা তো এতেই খুশি। ৬. হেসে খেলে, কা করে, আমাদের দিন চলে যায়। ৭. বাপব্যাটা দু-ভাই মিলে। ৮. আমরা তো সামান্য লোক/ আমাদের শুকনো ভাতে..

দ্বিতীয়ত, শুকনো ভাত বলতে বক্তা তরিতকারি ছাড়া ভাতের কথা বলেছেন। কথাটি এক অর্থে সত্য বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ 'সবদিন হয় না বাজার'। কিন্তু বাস্তবিক শুকনো ভাত খাওয়া একেবারেই অসম্ভব। বরং বন্ধাকে এখানে মাঝেমধ্যে ভাত এমনভাবে খেতে হয়, পর্যাপ্ত বা প্রয়োজনমতো তরকারি পাতি জোটে না। শুকনো ভাত কথাটি তাই এই বাপ্পানার্থে উচ্চারিত 'চরম দারিদ্র, ফলে ভাত খাওয়াটা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। অন্যভাবে বলা যায়, বস্তার বাড়িতে এমন আর্থিক-অনটন যেখানে, সেক্ষেত্রে তাঁর এবং তাঁর ভাবের গঞ্জিকা সেবন মোটেই শোভন নয়, কাঙ্ক্ষিতও নয়। কারণ গণিকা। ক্ষুন্নিবৃত্তির বিকল্প নয় কখনোই। এ ছাড়া যে বাড়িতে এমন দুর্দশা, সে বাড়ির ছেলেদের গঞ্জিকা সেবন নিন্দনীয় ঘটনা।

তৃতীয়ত, বরা দুপুররাতে বাড়ি ফিরে যখন ভাত খেতে বসেন, সে ভাত ঠান্ডা, তারপর সে ভাত সবজিপাতি ছাড়া এবং সামান্যতম নুনও নেই যে, সেটা দিয়ে তিনি ঠাণ্ডা ভাতটা খেয়ে ফেলবেন। এজন্য তিনি রেগে গিয়ে বাড়িতে বাবার সঙ্গে তর্কবিতর্ক বা অশান্তি করেন। তাঁর পাশে তিনি গণিকাসেবনের দোসর ভাইকেও পান। সারা পাড়া জেগে ওঠে। তাতে তিনি মনে করেন, এতে কারোর ভূমিকা নোকগলানো বা মাধ্যঘামানো) অবান্বিত। তাঁর ইঙ্গিত এই যে, ভাতে নুন না থাকায় চিৎকার-চেঁচামেচি করাটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার, ব্যক্তিস্বাধীনতা। গণতান্ত্রিক দেশে এ অধিকার তাঁর আছে। তা ছাড়া এ বিষয়ে যারা নাক গলাচ্ছে, তারাই বরং বক্তার নুনের ব্যবস্থা করে দিক। তাঁরা তো অসামান্য লোক নন। সামান্য লোক। সামান্য চাহিদা। এটুকু মিটে গেলেই আর অশান্তি হয় না।

তবে বক্তার এই আবেদন (লবণের ব্যবস্থা) পাড়াপড়শির কাছে আপাত পেশ করা হলেও, প্রকারান্তরে এই আবেদন আর্থ-সমাজ ব্যবস্থার কর্তাব্যক্তি বা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সমাজ বা দেশহিতৈষীর কাছে, যাঁরা সমাজের কাছে নানাভাবে প্রতিশ্রুতিবন্ধ (committed) । বস্তুত দায় তাঁদেরই। নাগরিকদের জনসমর্থনে তারা প্রশাসনিক বা রাজ্য পরিচালনার বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তাঁরাই শিক্ষার আয়োজন করেন, বেকার তৈরি করেন। পরিশেষে শিক্ষিত বেকার নিজের সর্বনাশসাধন করেন। সুতরাং 'নুন'-এর বক্তার আবেদন এক চিমটে নুন (সামান্য চাহিদা) যদিও, আসলে তাঁর কামা বরাবর 'নুন' পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট নিতেবীর আনুকূলা।