অষ্টম অধ্যায় ➤ উত্তর ঔপনিবেশিক ভারত : বিশ শতকের দ্বিতীয় পর্ব (১৯৪৭-১৯৬৪)

দেশভাগের ফলে সৃষ্ট সমস্যা

ভূমিকা: ক্ষ হিন্দু ও শিখ ‘ভারতের স্বাধীনতা আইন' (১৯৪৭ খ্রি.) অনুসারে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নাম দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। নবগঠিত ভারত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন হয়।

[1] দেশত্যাগ : দেশভাগের পর মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পৃথক পাকিস্তানের সৃষ্টি হলে সেখানে হিন্দু, শিখ প্রভৃতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন, ধর্ম ও সম্পত্তি নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হয়। ফলে পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও শিখ দেশত্যাগ করে ভারতে চলে আসে।

স্তু হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের অন্ন-বস্তু বাসস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা ভারত সরকারের সামনে কঠিন সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, পাঞ্জাব প্রভৃতি রাজ্যে উদ্বাস্তু সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

[3] সম্পদ হ্রাস: দেশভাগের ফলে ভারতের অর্থ, সম্পদ, সামরিক শক্তি প্রভৃতির একটি বড়ো অংশ পাকিস্তানে চলে যায়। ফলে ভারতের অর্থ ও সম্পদ যথেষ্ট হ্রাস পেয়ে দেশের অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

[4] কৃষি উৎপাদন ব্যাহত দেশভাগের ফলে ভারতের বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি পাকিস্তানের ভাগে পড়ে যায়। ফলে স্বাধীনতার পর ভারতের কৃষি উৎপাদন যথেষ্ট ব্যাহত হয় এবং দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়।

[5] শিল্পের কাঁচামালের অভাব : ভারতের পাট, তুলো প্রভৃতি কাঁচামাল উৎপাদক অঞ্চলের একটি বড়ো অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে ভারতে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাব দেখা যায়। ফলে শিল্প উৎপাদন যথেষ্ট। ব্যাহত হয়।

দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পর্কে গৃহীত পদক্ষেপ

ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা লাভের আগে ভারতীয় ভূখণ্ডে ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ শাসনাঞ্চল ছাড়াও ছোটোবড়ো মিলিয়ে অন্তত ৬০০টি দেশীয় রাজ্য অবস্থিত ছিল। রাজ্যগুলির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি।

[1] মন্ত্রী মিশনের প্রস্তাব: ‘মন্ত্রী মিশন' ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে (১৬ মে) ঘোষণা করে যে,i. ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর দেশীয় রাজ্যগুলির ওপর ব্রিটিশ আধিপত্যের অবসান ঘটবে। ii. স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ শাসিত ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিয়ে একটি ভারতীয় ইউনিয়ন' গঠন করা হবে। iii. বিদেশনীতি, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়গুলি ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে দেশীয় রাজ্যগুলিতে নিজ নিজ শাসকদের অধিকার বজায় থাকবে।

[2] ভারতের স্বাধীনতা আইন: 'ভারতীয় স্বাধীনতা আইন' (৪ জুলাই, ১৯৪৭ খ্রি.)-এ দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিজ নিজ স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখার অথবা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো একটি রাষ্ট্রে ইচ্ছানুসারে যোগদানের অধিকার দেওয়া হয়।

[3] কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি: জাতীয় কংগ্রেস ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুন ঘোষণা করে যে, স্বাধীনতা লাভের পর কংগ্রেস কোনো দেশীয় রাজ্যের স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করবে না। জুলাই মাসে কংগ্রেস নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের দায়িত্বে

‘দেশীয় রাজ্য দপ্তর' খোলা হয়। এই দপ্তরের মাধ্যমে ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়।

দেশীয় রাজ্যগুলির বৈশিষ্ট্য

ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা লাভের আগে ভারতীয় ভূখণ্ডে ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ শাসনাঞ্চল ছাড়াও

ছোটোবড়ো মিলিয়ে বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। এগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল নিম্নরূপ —

[1] সংখ্যাধিক্য: স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে ভারতীয় ভূখণ্ডে অন্তত ৬০০টি দেশীয় রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। অবস্থিত ছিল। এগুলি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে

[2] আয়তন: দেশীয় রাজ্যগুলির অধিকাংশই ছিল আয়তনে ক্ষুদ্র। কোনো কোনো রাজ্যকে শুধু জমিদারের শাসন এলাকা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। অল্প কয়েকটি দেশীয় রাজ্যের আয়তন যথেষ্ট বড়ো ছিল। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল হায়দ্রাবাদ, জম্মু ও কাশ্মীর, মহীশূর ও বরোদা।

[3] স্বৈরশাসন: দেশীয় রাজ্যগুলির শাসকগণ ছিলেন রাজ্যের চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। আইনের ঊর্ধ্বে থাকা এই শাসকরা নিজ নিজ রাজ্যে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করতেন।

[4] প্রজাদের দুর্দশা : দেশীয় রাজ্যগুলির প্রজাদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। তাদের ওপর করের বিপুল বোঝা চেপে বসেছিল।

[5] পশ্চাদ্‌গামিতা : বেশিরভাগ দেশীয় রাজ্য ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সামরিক, শিক্ষাগত প্রভৃতি ক্ষেত্রে যথেষ্ট পশ্চাৎপদ।

দেশীয় রাজ্য সম্পর্কে ভারতের উদ্যোগ

ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা লাভের প্রাক্-মুহূর্তে ভারতীয় ভূখণ্ডে দেশীয় শাসকদের শাসনাধীনে অন্তত ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। এ ছাড়া পোর্তুগাল, ফ্রান্স প্রভৃতি কয়েকটি রাষ্ট্রের উপনিবেশও ভারতে ছিল। স্বাধীনতা লাভের পর ভারত এসব স্থান ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করে।

[1] কংগ্রেসের ঘোষণা : স্বাধীনতা লাভের আগেই ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার কথা ঘোষণা করে। তারা ১৫ জুন (১৯৪৭ খ্রি.) ঘোষণা করে যে, ব্রিটিশ শক্তি ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর দেশীয় রাজ্যগুলির স্বাধীন অস্তিত্ব কংগ্রেস স্বীকার করবে না। ফ্রান্স এবং পোর্তুগালের ভারতীয় উপনিবেশগুলি সম্পর্কেও কংগ্রেস একই নীতি গ্রহণ করে।

[2] বল্লভভাই প্যাটেলের সক্রিয়তা : স্বাধীন ভারতের প্রথম  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সচিব ভঙ্গলা পঙ্গুন্নি মেনন (ভিপি মেনন) দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। প্যাটেল ভারতভুক্তির বিনিময়ে দেশীয় রাজ্যের শাসকদের বিপুল ভাতা, খেতাব ও অন্যান্য সুবিধা দানের প্রলোভন দেখান।

[3] ভারতভুক্তি : বল্লভভাই প্যাটেলের কূটনৈতিক চাপ ও হুমকির ফলে স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী ৩ সপ্তাহের মধ্যেই অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য ‘ভারতভুক্তির দলিল’-এ স্বাক্ষর করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রথমদিকে, জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ এবং কাশ্মীর ভারতে যোগদানে অস্বীকার করলেও শেষপর্যন্ত ভারতের চাপে তারা যোগদানে বাধ্য হয়। সিকিমও ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতে যোগ দেয়।

[4] অন্যান্য উপনিবেশ : ভারতের চাপে চন্দননগর, মাহে, কারিকল, পন্ডিচেরী, ইয়ানাম প্রভৃতি ফরাসি উপনিবেশ এবং গোয়া, দমন, দিউ, দাদরা ও নগর হাভেলি প্রভৃতি পোর্তুগিজ উপনিবেশও ভারতের সঙ্গে হয়।

দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পর্কে জাতীয় কংগ্রেসের মনোভাব

ভূমিকা: ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর দেশীয় রাজ্যগুলির স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় থাকবে, না তারা ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেবে সে বিষয়ে স্বাধীনতা লাভের আগেই বিতর্ক দেখা দেয়। জাতীয় কংগ্রেস দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির পক্ষে মত প্রকাশ করে।

[1] হরিপুরা কংগ্রেস : জাতীয় কংগ্রেস ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনে জানায় যে, দেশীয় রাজ্যগুলি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

[2] গান্ধিজির নীতি : কংগ্রেস নেতা মহাত্মা গান্ধি মনে করতেন যে, ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর কোনো দেশীয় রাজ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তা হবে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য।

[3] নেহরুর নীতি : কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু বলেন যে, ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবস্থিত কোনো দেশীয় রাজ্যের স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করা হবে না।

[4] কংগ্রেসের ঘোষণা : জাতীয় কংগ্রেস ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুন ঘোষণা করে যে, ব্রিটিশ শক্তি ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার পর দেশীয় রাজ্যগুলির স্বাধীন অস্তিত্ব ভারত স্বীকার করবে না।

দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির বিষয়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ভূমিকা

ভূমিকা: ভারতের স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই তৎকালীন বড়োলাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
[1] দেশীয় শাসকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা : ভারতের ব্রিটিশ শাসক মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে বহু দেশীয় রাজার বন্ধুত্ব ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে মাউন্টব্যাটেনের ভা ছিল। দেশীয় রাজ্যগুলি ভারতে যোগ না দিলে এই অখণ্ড সম্পর্ক ভেঙে যাবে এবং এতে দেশীয় রাজ্যগুলি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।এবং ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল। এই ঘনিষ্ঠতাকে মাউন্টব্যাটেন দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির ক্ষেত্রে কাজে লাগান।
[2] ব্রিটিশ সরকারের নীতি: মাউন্টব্যাটেন দেশীয় রাজ্যগুলিকে জানিয়ে দেন যে, ব্রিটিশ সরকার কোনো দেশীয় রাজ্যকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা দেবে না বা ব্রিটিশ কমনওয়েলথ-এর অন্তর্ভুক্ত করবে না। এর অর্থ হল- কোনো দেশীয় রাজ্য ভারত বা পাকিস্তানে যোগ না দিলে সেই রাজ্যের সঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন থাকবে।
[3] অর্থনৈতিক ক্ষতি: মাউন্টব্যাটেন বলেন যে, ভারতীয় উপমহাদেশ ইতিপূর্বে একটি অখণ্ড অর্থনৈতিক অঞ্চলচারত বিভাজনের প্রস্তাবের একটি ঐতিহাসিক দৃশ্য
[4] সমস্যার সৃষ্টি : মাউন্টব্যাটেন দেশীয় রাজ্যগুলিকে জানান যে, তারা নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করার চেষ্টা করলে সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সাম্যবাদী আন্দোলনের প্রসার ঘটবে।
[5] প্রতিশ্রুতি : মাউন্টব্যাটেন দেশীয় রাজ্যের শাসকদের প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি ভারতে যোগদানকারী দেশীয় রাজ্যগুলির নেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি রক্ষা করবেন, কেননা তিনি ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে কর্মরত থাকবেন।

দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তিতে সর্দার বল্লভাই প্যাটেলের ভূমিকা

ভূমিকা: ভারতের স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু এবং মহাত্মা গান্ধি ইঙ্গিত দেন যে, স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবস্থিত কোনো দেশীয় রাজ্যের স্বাধীন অস্তিত্ব ভারত সরকার মেনে নেবে না। স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল অধিকাংশ দেশীয় রাজ্যের ভারতভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

[1] কঠোর মনোভাব : ভারতীয় ভৌগোলিক সীমানায় অবস্থিত দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতে যোগদানে বাধ্য করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল কঠোর ও অনমনীয় মনোভাব গ্রহণ করেন।

[2] কূটনৈতিক চাপ: প্যাটেল বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্যে নানা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি তাঁর সচিব ভি পি মেননকে বলেন যে, আমরা দ্রুততার সঙ্গে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারলে আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা দেশীয় রাজ্যগুলির দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।

[3] সামরিক হুমকি : সর্দার প্যাটেল কোনো কোনো দেশীয় রাজ্যকে সামরিক অভিযানের ভয় দেখিয়ে ভারতে যোগদানে বাধ্য করেন ।

[4] অভিযান : সর্দার প্যাটেল কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, জুনাগড় প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় রাজ্যগুলির ওপর সামরিক অভিযান চালিয়ে রাজ্যগুলি ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন।

দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার কারণ

ভূমিকা: স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতের ভৌগোলিক সীমানায় অন্তত ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। এসব রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ভারতের বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য বা কারণ ছিল। যেমন—

[1] জাতীয়তাবাদ : ব্রিটিশ শাসনকালে ব্রিটিশ ভারত এবং দেশীয় রাজ্যগুলির জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশ বিরোধিতায় শামিল হয়। ভারতের জাতীয় নেতৃবৃন্দও অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন। তাই তাঁরা বিচ্ছিন্ন স্বাধীন ভারতের কথা কল্পনা করতেন না।

[2] ঐতিহ্যের সংকট: ভারতের ভৌগোলিক সীমানায় অবস্থিত ব্রিটিশ-ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলি দীর্ঘদিন ধরে একই ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। তাই দেশীয় রাজ্যগুলি স্বাধীন হলে তা ইতিহাস ও ঐতিহ্য- বিরোধী হবে।

[3] প্রজা আন্দোলন: বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার দাবিতে শক্তিশালী প্রজা আন্দোলন শুরু হয়। ফলে দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথ। প্রশস্ত হয়।

[4] পশ্চাদ্‌গামিতা : দেশীয় রাজ্যগুলির অধিকাংশই ছিল পশ্চাদ্‌গামি ও কুসংস্কারাচ্ছান্ন। স্বৈরাচারী শাসন ও পাতিয়ালা ও পূর্ব পাঞ্জাবের দেশীয় রাজ্যগুলি নিয়ে গঠিত হয় পেপসু (PE মধ্যযুগীয় ভাবধারায় আচ্ছন্ন এসব রাজ্যের মানুষ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পশ্চাদগামিতা থেকে মুক্তি চাইছিল।

সঙ্গে দেশীয় রাজ্যগুলির সংযুক্তিকরণের পদ্ধতি

ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর ভারত সরকার দেশীয় রাজ্যগুলি ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করার সক্রিয় উদ্যোগ নেয়। এই সংযুক্তির ক্ষেত্রে ভারত কয়েকটি পদ্ধতি গ্রহণ করে।

[1] প্রদেশগুলির সঙ্গে সংযুক্তি : কিছু কিছু দেশীয় রাজ্যকে তাদের সন্নিহিত ভারতীয় প্রদেশগুলির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। যেমন মাদ্রাজের রাজ্যগুলিকে মাদ্রাজ প্রদেশের সঙ্গে, পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিকে উড়িষ্যা ও মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে, দাক্ষিণাত্য ও গুজরাটের রাজ্যগুলিকে বোম্বাই প্রদেশের সঙ্গে, গাড়োয়াল, রামপুর ও বেনারসকে উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে, কোচবিহারকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে, খাসি পার্বত্য অঞ্চলকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই ভাবে ২১৬টি দেশীয় রাজ্য পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়।

[2] যুক্তরাজ্য গঠন : ২৭৮টি দেশীয় রাজ্যকে নিয়ে ৮টি প্রদেশ গঠন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল জম্মু- কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ ও মহীশূর। অবশিষ্ট ২৭৫টি দেশীয় রাজ্যকে অন্যান্য ৫টি প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করে বৃহৎ রাজ্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এই ৫টি প্রদেশ হল। রাজস্থান, মধ্যভারত, সৌরাষ্ট্র, ত্রিবাঙ্কুর-কোচিন ও পেপসু ।

[3] কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল: হিমাচল প্রদেশ, বিলাসপুর, ভূপাল, কচ্ছ, ত্রিপুরা, মণিপুর প্রভৃতি দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করে সেগুলি কেন্দ্রীয় শাসনাধীনে রাখা হয়। এরুপ ৬১টি দেশীয় রাজ্যকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়।

স্বাধীন ভারত ও তার অঙ্গরাজ্য

ভূমিকা: স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের নিজস্ব সংবিধান চালু হয়। এই সময় থেকে ভারত একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময় ভারতের রাজ্যগুলিকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। যথা-

[1] 'ক' শ্রেণি : গভর্নরশাসিত রাজ্য : এই শ্রেণিতে মোট ৯টি রাজ্য ছিল। যথা— i. পশ্চিমবঙ্গ, ii. আসাম, iii. বিহার, iv. উড়িষ্যা, v. উত্তরপ্রদেশ, vi. মধ্যপ্রদেশ, vii. বোম্বাই, viii. মাদ্রাজ ও ix. পাঞ্জাব।

[2] 'খ' শ্রেণি: রাজা বা ওই ধরনের শাসক দ্বারা শাসিত রাজ্য: এই শ্রেণিতে মোট ৮টি রাজ্য ছিল। যথা- 1. হায়দ্রাবাদ, ii. মধ্যভারত, iii. মহীশূর, iv. পাতিয়ালা ও পূর্ব পাঞ্জাব রাজ্য ইউনিয়ন (PEPSU), v. জন্ম ও কাশ্মীর, vi. রাজস্থান, vii. সৌরাষ্ট্র, vill. ত্রিবাঙ্কুর- কোচিন।

[3] 'গ' শ্রেণি : কমিশনারশাসিত রাজ্য। এই শ্রেণিতে মোট ১০টি রাজ্য ছিল। যথা— i. আজমীর, ii. ভূপাল, iii. বিলাসপুর, iv. হিমাচল প্রদেশ, v. কচ্ছ, vi. কুর্ণ, vii. দিল্লি, viii. মণিপুর, ix. ত্রিপুরা ও x. বিন্ধ্য প্রদেশ। [4] 'ঘ' শ্রেণি: কেন্দ্রশাসিত রাজ্য: এই শ্রেণিতে ছিল দুটি কেন্দ্রশাসিত রাজ্য। যথা— i. আন্দামান ও ii. নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।

দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির পদক্ষেপ

ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা লাভের আগে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ শাসনের বাইরে অন্তত ৫৬৫টি রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। এগুলি দেশীয় রাজ্য নামে পরিচিত। ‘ভারতের স্বাধীনতা আইন' (১৯৪৭ খ্রি.) অনুসারে এই রাজ্যগুলি স্বাধীন থাকার অথবা ভারত ও পাকিস্তানের যে-কোনো একটি রাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার অধিকার পায়।

[1] ভারতের উদ্যোগ : ভারতের অখণ্ডতা, জাতীয় সংহতি, নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ প্রভৃতি প্রয়োজনে অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য ভারত নিজের অন্তর্ভুক্ত করার বলিষ্ঠ উদ্যোগ গ্রহণ করে। দেশীয় রাজ্য দপ্তর'-এর দায়িত্বে থাকা ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এই বিষয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন।

[2] সাফল্য ও সমস্যা : ভারতের সক্রিয় উদ্যোগের ফলে স্বাধীনতা লাভের মাত্র ৩ সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য ভারতে যোগ দেয়। তবে জুনাগড়, কাশ্মীর ও হায়দ্রাবাদ ভারতে যোগদানে অনাগ্রহ দেখালে ভারতের অখণ্ডতা ও ঐক্য সমস্যার সম্মুখীন হয়।

[3] জুনাগড়: হিন্দু অধ্যুষিত দেশীয় রাজ্য জুনাগড় পাকিস্তানে যোগ দিতে চাইলে প্রজাবিদ্রোহের চাপে সেখানকার নবাব পাকিস্তানে পালিয়ে যান। ভারতীয় সেনা জুনাগড়ে প্রবেশ করে এবং সেখানকার মানুষের গণভোটের সম্মতির দ্বারা জুনাগড় ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়।

[4] কাশ্মীর : মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজা হরিসিং কাশ্মীরের স্বাধীনতা রক্ষায় তৎপর হলে পাক সেনা ও হানাদারবাহিনী কাশ্মীরে ঢুকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। এই অবস্থায় হরিসিং 'ভারতভুক্তির দলিল’-এ স্বাক্ষর করলে কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

[5] হায়দ্রাবাদ : হায়দ্রাবাদ নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান থেকে অস্ত্র আমদানি করে এবং রাজ্যের অভ্যন্তরে ও সীমান্ত এলাকায় হিন্দুদের ওপর তীব্র নির্যাতন শুরু করে। ফলে হায়দ্রাবাদে ভারতীয় সেনার অভিযান শুরু হয়। হায়দ্রাবাদ আত্মসমর্পণে বাধ্য হলে রাজ্যটি ভারতের দখলে আসে।

মোধপুর ও জয়সলমীরের ভারতভুক্তি

ভূমিকা: ভারতের স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে ভারতীয় ভৌগোলিক সীমার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় রাজ্য ছিল সীমান্তবর্তী যোধপুর ও জয়সলমীর। শেষপর্যন্ত অ-মুসলিম অধ্যুষিত যোধপুর ও জয়সলমীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

[1] হানওয়াত সিংহ-এর মনোভাব: যোধপুরের শাসক হানওয়াত সিংহ ছিলেন কংগ্রেসের তীব্র বিরোধী। তিনি মনে করতেন যে, ভারতে যোগ দিলে ভবিষ্যতে তাঁর বিশেষ লাভ হবে না। তাই তিনি জয়সলমীরের রাজার সঙ্গে মিলিতভাবে জিন্নার সঙ্গে সন্ধি স্বাক্ষর করেন।

[2] জিন্নার উদ্যোগ : পাকিস্তানের নেতা জিন্না যোধপুর ও জয়সলমীরকে যে-কোনো শর্তে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেন। জয়সলমীর এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। পরে জয়সলমীর ভারতে যোগ দেয়।

[3] মাউন্টব্যাটেনের উদ্যোগ : যোধপুর জিন্নার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরে প্রায় রাজি হয়ে গেলে মাউন্টব্যাটেন যোধপুরের শাসক হানওয়াত সিংহকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, দ্বি- জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত দ্বিখণ্ডিত হয়ে পৃথ

ক পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছে। তাই হিন্দু রাজ্য যোধপুরের পক্ষে পাকিস্তানে যোগদানের বিষয়টি দ্বি-জাতিতত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত।

[4] হানওয়াত বোধোদয় : মাউন্টব্যাটেনের সিংহের পরামর্শে হানওয়াত সিংহ প্রভাবিত হন এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও অবশেষে ভারতে যোগদান করেন।

জুনাগড়ের ভারতভুক্তি

ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর ভারতীয় ভূখণ্ডের অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য ভারতে যোগদান করলেও কয়েকটি রাজ্য ভারতে যোগ দিতে অস্বীকার করে। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল কাথিয়াবাড় উপদ্বীপে অবস্থিত জুনাগড়।

[1] জুনাগড়ের পরিস্থিতি: দেশীয় রাজ্য জুনাগড়ের জনসংখ্যার অন্তত ৮০ শতাংশই ছিল হিন্দু। কিন্তু সেখানকার মুসলিম নবাব জুনাগড়কে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। জুনাগড়ের দেওয়ান শাহনওয়াজ ভুট্টো ও ছিলেন মুসলিম লিগের উগ্র সমর্থক।

[2] প্ৰজাবিদ্রোহ : জুনাগড়ের নবাব রাজ্যটিকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইলে সেখানকার অ মুসলিম প্রজাদের মধ্যে প্রবল গণবিক্ষোভ ও ব্যাপক বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

[3] সেনা অভিযান : জুনাগড়ে তীব্র প্রজাবিদ্রোহের ফলে সেখানকার নবাব পাকিস্তানে পালিয়ে যান। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সেনাবাহিনী জুনাগড়ে প্রবেশ করে।

[4] গণভোট: জুনাগড়ের বাসিন্দারা ভারত, না পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে আগ্রহী তা জানার জন্য সেখানে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে গণভোট নেওয়া হয়। গণভোটে সেখানকার মানুষ ভারতে যোগদানের পক্ষে মত দেয়। 4.197

[5] ভারতে যোগদান : গণভোটের পর জুনাগড় ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে (জানুয়ারি) ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়।

কাশ্মীরের ইতিহাস

ভূমিকা: প্রাচীন লোককথা অনুসারে ‘কাশ্মীর' কথার অর্থ হল ‘শুষ্ক ভূমি’। প্রাচীন হিন্দু পুরাণ, খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে কলহনের লেখা ‘রাজতরঙ্গিনী’ থেকে কাশ্মীরের বহু ঐতিহাসিক তথ্য জানা যায়। কলহনের সময় কাশ্মীরে কার্কোট নাগ বংশীয় রাজারা রাজত্ব করতেন।

[1] ব্রাহ্মণদের বসতি: কলহন উল্লেখ করেছেন যে, অতীতে কাশ্মীর উপত্যকা ছিল একটি হ্রদ অঞ্চল। হিন্দু পুরাণে কাশ্মীরে ব্রাহ্মণদের বসতির কথা বলা হয়, অবশ্য পরে সেখানে বৌদ্ধ এবং শৈব ধর্মেরও ব্যাপক প্রসার ঘটে।

[2] মুসলিম শাসন : মধ্যযুগে কাশ্মীরে মুসলিম ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। জম্মু ও লাদাখ অঞ্চল ছাড়া সমগ্র কাশ্মীরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে শাহ মীর সেখানে মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠা করেন যা

অন্তত ৫০০ বছর টিকে ছিল। ১৫২৬ থেকে ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কাশ্মীরে মোগলদের এবং এরপর উপজাতীয় দুরানী বংশের আধিপত্য ছিল।

[3] হিন্দু শাসন: পাঞ্জাবের শিখ মহারাজা রণজিৎ সিংহ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে উপজাতীয় দুরানী বংশের পতন ঘটিয়ে কাশ্মীর দখল করেন। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কাশ্মীর দখল করে তা ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মর হিন্দু রাজা গুলাব সিং-কে বিক্রি করে দেয়। এই সময় থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কাশ্মীর হিন্দু মহারাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মীরের মহারাজা হন ইন্দর মহিন্দর হরিসিং।

[4] দেশীয় রাজ্য ভারতে ব্রিটিশ শাসনকালে কাশ্মীর যেহেতু ব্রিটিশদের অনুগত ছিল সেহেতু ব্রিটিশরা ভারত দত্যাগের সময় কাশ্মীর হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় রাজ্য।

[5] কাশ্মীরের ভারতভুক্তি : পাক সেনা ও হানাদার বাহিনী কাশ্মীরে প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে নিলে এবং মহারাজা হরিসিং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে (২৬ অক্টোবর) ‘ভারতভুক্তির দলিল’-এ স্বাক্ষর করলে ভারত সেনা অভিযান চালিয়ে কাশ্মীরের বৃহদংশ দখল করে নেয়। পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মীরের অংশ 'আজাদ কাশ্মীর’ নামে পরিচিত হয়।

কাশ্মীর সমস্যা /কাশ্মীরের ভারতভুক্তি

ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময় ভারতীয় ভূখণ্ডের উল্লেখযোগ্য দেশীয় রাজ্য ছিল কাশ্মীর। ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগের পর কাশ্মীরের মহারাজা হরিসিং কাশ্মীরের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে উদ্যোগী হন।

[1] জটিলতা: কাশ্মীরের মহারাজা হরিসিং হিন্দু হলেও এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দা ছিল মুসলিম। এই অবস্থায় মহারাজা হরিসিং কাশ্মীরের স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করলে পাকিস্তান ও ভারত উভয় রাষ্ট্রই কাশ্মীরকে নিজ রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে, ফলে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

[2] পাক হানা: পাক মদতপুষ্ট হানাদারবাহিনী ও পাক সেনাদল কাশ্মীরে প্রবেশ করে (২২ অক্টোবর, ১৯৪৭ খ্রি.) সেখানে ব্যাপক হত্যালীলা, লুণ্ঠন ও নির্যাতন শুরু করে। ফলে মহারাজা হরিসিং ভারত সরকারের কাছে সামরিক সহায়তা প্রার্থনা করে।

[3] ভারতভুক্তির দলিল স্বাক্ষর: কাশ্মীরের সামরিক সহায়তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত জানিয়ে দেয় যে, মহারাজা ‘ভারতভুক্তির দলিল’-এ স্বাক্ষর করলে তবেই তারা কাশ্মীরে সেনা পাঠাবে। এদিকে পাকবাহিনী কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থান দ্রুত দখল করতে থাকলে মহারাজা হরিসিং 'ভারতভুক্তির দলিল'-এ স্বাক্ষর করেন।

[4] ভারতের অভিযান : হরিসিং 'ভারতভুক্তির দলিল’-এ স্বাক্ষর করার পরের দিন ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে অভিযান শুরু করে দ্রুত কাশ্মীরের ২/৩ অংশ ভূখণ্ড দখল করে নেয়। এই বাহিনীর সহায়তায় ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা শেখ আবদুল্লাহ কাশ্মীরের শাসনক্ষমতা দখল করেন।

হায়দ্রাবাদের ইতিহাস

ভূমিকা: মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর (১৭০৭ খ্রি.) পরবর্তীকালে মোগল সাম্রাজ্যের অবক্ষয় শুরু হলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি স্বাধীন রাজ্য গড়ে ওঠে। এসব স্বাধীন রাজ্যের অন্যতম ছিল দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদ। ভারতের অন্তভুক্ত হওয়ার আগে হায়দ্রাবাদের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করো।

[1] হায়দ্রাবাদের প্রতিষ্ঠা দিল্লির মোগল রাজদরবারে তুরানি গোষ্ঠীর নেতা মির করমউদ্দিন চিন কিলিচ খাঁ ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে ‘উজির' বা প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করে। দাক্ষিণাত্যে চলে যান। সেখানে বেশ কয়েকটি মোগল শাসিত প্রদেশকে নিয়ে ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন হায়দ্রাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ইতিহাসে নিজাম-উল-মূলক নামে পরিচিত।

[2] খেদা-র যুদ্ধ : দিল্লির মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের নির্দেশে মুবারিজ খাঁ হায়দ্রাবাদের শাসক নিজামের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। কিন্তু খেদা-র যুদ্ধে (১৭২৪ খ্রি.। মোগলবাহিনী ধ্বংস হয় এবং মুবারিজ নিহত হন।

[3] দিল্লির স্বীকৃতি: হায়দ্রাবাদের নিজামের হাতে মোগল বাহিনী পরাজিত হলে মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহ নিজামকে হায়দ্রাবাদের শাসক বলে মেনে নেন এবং তাঁকে আসফ ঝা উপাধি দেন। এই সময় থেকে নিজাম কার্যত স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে থাকেন। তাঁর মৃত্যুর (১৭৪৮ খ্রি.) পরবর্তী অন্তত ২০০ বছর তাঁর বংশধররা দাক্ষিণাত্যের এক বড়ো অংশে রাজত্ব করেন।

[4] দেশীয় রাজ্য : ভারতে ব্রিটিশ শাসনকালে হায়দ্রাবাদ ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য জানিয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করে। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর হায়দ্রাবাদ ভারতীয় ভূখণ্ডের সর্ববৃহৎ দেশীয় রাজ্যরূপে আত্মপ্রকাশ করে।

হায়দ্রাবাদ সম্পর্কে নীতি

ভূমিকা: ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করার সময় ভারতীয় ভূখণ্ডে যে অসংখ্য দেশীয় রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল সেগুলির মধ্যে আয়তনে সর্ববৃহৎ ছিল হায়দ্রাবাদ। এখানকার শাসক মুসলিম হলেও জনসংখ্যার অন্তত ৮৭ শতাংশই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর হায়দ্রাবাদ সম্পর্কে ভারত সরকার ও হায়দ্রাবাদের নিজামের নীতি পরস্পর থেকে পৃথক ছিল।

[1] হায়দ্রাবাদের নীতি : ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর হায়দ্রাবাদের নিজাম এবং সেখানকার অভিজাত মুসলিম সম্প্রদায় হায়দ্রাবাদকে ভারত বা পাকিস্তান—কোনো রাষ্ট্রেরই অন্তর্ভুক্ত না করে হায়দ্রাবাদকে একটি পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। নিজাম ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ঘোষণা করেন যে, ব্রিটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তরের পর হায়দ্রাবাদ একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

[2] ভারতের নীতি : ভারতের পক্ষে হায়দ্রাবাদের পৃথক ও স্বাধীন অস্তিত্ব মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। কেননা, i. হায়দ্রাবাদ ছিল ভারতের মধ্যভাগে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। ii. হায়দ্রাবাদের মধ্য দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ ও সড়কপথ ছিল। iii. হায়দ্রাবাদের মানুষ ও ইতিহাস রাজ্যটির ভারতীয়ত্বের প্রমাণ দেয়। এসব কারণে হায়দ্রাবাদ রাজ্যটির স্বাধীনতা অস্তিত্বের বিরোধিতা করে ভারত ছাল সরকার রাজ্যটিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয।

হায়দ্রাবাদ রাজ্যের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি

ভূমিকা: ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন’ এর দ্বারা ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত দেশীয় রাজ্যগুলি নিজেদের ইচ্ছানুসারে ভারত বা পাকিস্তানে যোগদানের অথবা নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখার অধিকার পায়। এই অবস্থায় ভারতের সর্ববৃহৎ দেশীয় রাজ্য হায়দ্রাবাদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই ভারত ও হায়দ্রাবাদের মধ্যে টানাপোড়েন চলতে থাকে।

[1] তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ: হায়দ্রাবাদ রাজ্যের তেলেঙ্গানা অঞ্চলের কৃষকরা ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ শুরু করলে কাশিম রিজভি-র নেতৃত্বে মুসলিম রাজাকার বাহিনী তেলেঙ্গানার গ্রামে গ্রামে চরম অত্যাচার চালাতে থাকে।

[2] রাজনৈতিক দলের ভূমিকা : ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের হায়দ্রাবাদ শাখা হায়দ্রাবাদের ভারতভুক্তির দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। অবশ্য কমিউনিস্ট দলগুলি প্রথমদিকে কংগ্রেসের পক্ষে থাকলেও হায়দ্রাবাদের ভারতভুক্তির বিষয়ে তারা কংগ্রেসের বিরোধিতা করে।

[3] স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টা : হায়দ্রাবাদ নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে রাজ্যের ভেতরে এবং ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে হিন্দুদের ওপর ক্রমাগত অত্যাচার চালাতে থাকে। নিজাম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র আমদানি করে এবং ভারতের বিরুদ্ধে জাতিপুঞ্জে অভিযোগ জানিয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলেন।

[4] পারস্পরিক অভিযোগ : অবশেষে ভারত ও হায়দ্রাবাদের মধ্যে স্থিতাবস্থা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু হায়দ্রাবাদ বারংবার এই চুক্তি লঙ্ঘন করে বলে ভারত অভিযোগ জানায়। অন্যদিকে ভারতের বিরুদ্ধে হায়দ্রাবাদও অর্থনৈতিক অবরোধের অভিযোগ তোলে।

[5] ভারতের অভিযান : ভারত ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে (১৩ সেপ্টেম্বর) হায়দ্রাবাদে অভিযান শুরু করে। পরাজিত হায়দ্রাবাদ ভারতে যোগদানে বাধ্য হয়।

রাজ্যেরহায়দ্রাবাদ  পরিচয়

ভূমিকা: দিল্লির মোগল দরবারের তুরানি গোষ্ঠীর নেতা মির করমউদ্দিন চিন কিলিচ খাঁ ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে হায়দ্রাবাদ রাজ্যের

[2] জনসংখ্যা : স্বাধীনতার প্রাক্কালে হায়দ্রাবাদ রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল প্রাপ্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময় হায়দ্রাবাদের প্রধান কয়েকটি পরিচয় নীচে উল্লেখ করা হল—

[1] সর্ববৃহৎ দেশীয় রাজ্য : হায়দ্রাবাদ ছিল ভারতীয় ভূখণ্ডের সর্ববৃহৎ দেশীয় রাজ্য। এর আয়তন ছিল ২১২ হাজার বর্গকিলোমিটার।প্রায় ১.৭ কোটি। এর মধ্যে অন্তত ৮৭ শতাংশই ছিল হিন্দু অথচ এখানকার শাসক অর্থাৎ নিজাম ওসমান আলি খান ছিলেন মুসলিম।

[3] স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টা : নিজাম ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে এক ঘোষণার দ্বারা জানান যে, ব্রিটিশরা ক্ষমতা হস্তান্তরের পর স্বাধীন রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। সেই অনুসারে, ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগের পর হায়দ্রাবাদের নিজাম এবং অভিজাত মুসলিমরা ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রে যোগ দিতে অস্বীকার করে।