অষ্টম পাঠ ⇒ খেয়া

উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। এই কবিতায় কবি দুটি নাম-না-জানা গ্রামের মধ্য দিয়ে সারা বাংলার পল্লিসমাজের চিরন্তন ছবিকে তুলে ধরেছেন। গ্রামের মানুষের জীবন সহজসরল অনাড়ম্বর এবং মানুষে-মানুষে সম্পর্ক অনেক নিবিড়। গ্রামের সাধারণ মানুষ খেয়া নৌকা করে কেউ কাজ সেরে ঘরে ফেরে, কেউ-বা ঘর থেকে বেরিয়ে কাজে যায়। ক্ষমতা দখলের রক্তাক্ত লড়াইয়ে এই মানুষগুলি সামিল নয়। এরা পৃথিবীর আদি, অকৃত্রিম জীবনধারার বাহক।

উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘খেয়া’ কবিতা থেকে গৃহীত। কবিতাটিতে কবি নাগরিক জীবন ও গ্রামীণ জীবনের একটি তুলনামূলক ছবি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।

নাগরিক জীবন দ্বন্দ্ব-সংঘাতে উত্তাল। গ্রামের তুলনায় নগরে সুযোগসুবিধা-সুখস্বাচ্ছন্দ্য অনেক বেশি কিন্তু সেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের যোগ খুব কম। মানুষের সুখের পালসা সেখানে অনেক বেশি বলেই তাদের নিজেদের মধ্যে হানাহানি, রক্তারক্তিও বেশি। এই রক্তাক্ত সংঘাতই পৃথিবীর বুকে
ডেকে আনে চরম সর্বনাশ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'খেয়া' কবিতা থেকে পঙ্ক্তিটি উদ্ধৃত হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় যে বিভিন্ন সময়ে  নানা যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্য দিয়ে এক একটি দেশে রাজশক্তির পালা বদল হয়েছে। সুখ-সম্পদ ক্ষমতার লোভে মানুষ খুব সহজেই একে অন্যকে আঘাত করেছে। অন্যের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করতে গিয়েই হয়েছে হানাহানির সূত্রপাত। এভাবেই এক সাম্রাজ্যের পতনে অন্য সাম্রাজ্যের উত্থান হয়ে রচিত হয়েছে। মানবসভ্যতার নতুন নতুন ইতিহাস।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজারা মাথায় সোনার মুকুট পরতেন। তাই 'সোনার মুকুট’ ক্ষমতার প্রতীক। ক্ষমতার মোহ মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। আবহমান কাল ধরে পৃথিবীতে মানুষ ক্ষমতা দখলের লড়াই চালিয়ে এসেছে। আজ যে ক্ষমতার শীর্ষে, কাল হয়তো সে ক্ষমতাচ্যুত। যে যখন জিতেছে তার
মাথায় শোভা পেয়েছে সোনার মুকুট পরাজিত ব্যতি ক্ষমতার প্রতীক সোনার মুকুট ভেঙে পড়েছে।

উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান জীব মানুষ। সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই মানুষ তার জীবনযাত্রার মানকে ক্রমাগত উন্নতির পথে নিয়ে গেছে। এই ক্রম-উন্নতির ইতিকথাই হল মানবসভ্যতার ইতিহাস। সভ্যতার অগ্রগতি মানুষকে সুখসমৃদ্ধি দিয়েছে। কিন্তু উন্নতির লাগামছাড়া নেশা আবার প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনে। সেই ক্ষতির কথা না ভেবে বেপরোয়াভাবে সভ্যতার উন্নতি করার চেষ্টাই হল তার ‘নব নব তৃষ্ণা ক্ষুধা’।

রবীন্দ্রনাথের ‘খেয়া’ কবিতা থেকে নেওয়া পঙ্ক্তিটিতে ‘হলাহল' ও 'সুধা' শব্দ দুটির অর্থ হল যথাক্রমে বিষ ও অমৃত।

সভ্যতার অগ্রগতি যেমন মানুষকে উন্নততর জীবনযাত্রা দিয়েছে, তেমনি তাকে প্রকৃতির কাছ থেকে অনেক দূরেও সরিয়ে নিয়ে গেছে। ক্ষমতার লড়াইতে মানুষের হাতে ভয়ংকর অস্ত্রের জোগানও দিয়েছে তথাকথিত সভ্যতা, যা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে রক্তাক্ত করেছে। সভ্যতার এই ক্ষতিকারক
দিককে কবি হলাহল আর কল্যাণকর দিককে সুধা বলেছেন।

যে-কোনো সাহিত্যকর্মের মতোই কবিতার ক্ষেত্রেও নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কবিতার ক্ষেত্রে সাধারণত তার বিষয়বস্তু অনুযায়ী অথবা তার ভাববস্তু অনুসারে প্রতীকী নামকরণ হয়ে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের ‘চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘খেয়া’ কবিতাটিতে কবি নাগরিক জীবন এবং গ্রামীণ জীবনের তুলনামূলক দুটি ছবি পাশাপাশি তুলে ধরেছেন। এক নাম-না- জানা নদীর দু-পাশে দুটি নাম-না-জানা গ্রাম সারা বাংলার গ্রামজীবনের প্রতিনিধিত্ব করেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজসরল অনাড়ম্বরভাবে তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করে। নাগরিক জীবনের সুবিধা সেখানে নেই, কিন্তু খেয়ানৌকা সেখানে নদীর ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সেতু তৈরি করে।

অন্যদিকে, নাগরিক জীবনে সুখস্বাচ্ছন্দ্যের অভাব নেই, সেখানে অভাব শুধু মানবিক সম্পর্কের। তাই ক্ষমতার লোভে মানুষ সেখানে খুব সহজেই একে অন্যকে রক্তাক্ত করে। এক সাম্রাজ্যের পতনে আর-এক সাম্রাজ্যের উত্থান হয়। সভ্যতা মানুষকে উন্নততর জীবন দিয়েছে। আবার একইসঙ্গে এই সভ্যতাই মানুষকে প্রকৃতির থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে, তার হাতে তুলে দিয়েছে ভয়ংকর সব মারণাস্ত্র। তাই সভ্যতার বিষাক্ত রূপ অনেকক্ষেত্রেই ছাপিয়ে গেছে তার কল্যাণময় রূপকে।

পল্লিগ্রামের জীবন কিন্তু নাগরিক জীবনের এই উত্থানপতনে এতটুকুও আন্দোলিত হয় না। আবহমান কাল ধরে। সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা একইরকম সহজসরল শান্ত গতিতে বয়ে চলে। মানুষে-মানুষে নিবিড় সম্পর্কই গ্রামজীবনের মূলভিত্তি। খেয়ানৌকা তাদের এই সম্পর্কের যোগসূত্র বা
প্রতীক। তাই বলা যায় কবিতাটির প্রতীকী নামকরণ ‘খেয়া’ সবদিক থেকে সার্থক।

'খেয়া' কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদিরে পৃথিবীর দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় রক্তাক্ত নাগরিক জীবন আর অন্যদিকে শান্ত-স্নিগ্ধ মানবিক সম্পর্কমাখা গ্রামজীবনের ছবি পাশাপাশি তুলে ধরেছেন।

একটি নাম না জানা নদীর দু-পাশের দুটি নাম-না-জানা গ্রাম এখানে সারা বাংলার পল্লিগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজসরল অনাড়ম্বরভাবে তাদের জীবন কাটায়। নাগরিক জীবনের সুখস্বাচ্ছন্দ্য তাদের জীবনে নেই কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক আছে। নদী পারাপারের খেয়ানৌকাটিই দু-পাশের দুটি গ্রামের মানুষকে আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধেছে।

অন্যদিকে, নগরজীবনে সুখস্বাচ্ছন্দ্য অনেক বেশি কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের যোগ খুব কম। তাই ক্ষমতা বা সম্পদের লোভে তারা খুব সহজেই একে অন্যকে আঘাত করতে পারে। রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক সাম্রাজ্যের পতনে সূচিত হয় আর-এক সাম্রাজ্যের উত্থান। সভ্যতার অগ্রগতি
মানুষকে উন্নততর জীবন দিয়েছে। একইসঙ্গে তার ক্ষতিকারক দিক মানুষের জীবনকে বিষাক্তও করেছে। নাগরিক মানুষ প্রকৃতির থেকে অনেক দূরে সরে গেছে, অজস্র উন্নত মারণাস্ত্র তাদের পরস্পরের মধ্যেও ব্যবধান তৈরি করেছে ।

নগরজীবনের এই উত্থানপতন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে দূরে পৃথিবীর এককোণে পল্লিগ্রামের জীবন কিন্তু আবহমান কাল ধরে একইরকমভাবে বয়ে চলে। কবিতাটিতে সভ্যতাগবী,  হৃদয়হীন নাগরিক জীবনের থেকে সহজসরল অনাড়ম্বর এবং মানবিক পল্লিজীবনের প্রতিই রবীন্দ্রনাথের গভীর ভালোবাসা ব্যক্ত হয়েছে ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের ‘খেয়া’ কবিতায় মানবসভ্যতার তথাকথিত অগ্রগতি প্রসঙ্গে উক্ত মন্তব্যটি করেছেন।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব বুদ্ধিমান মানুষ। সৃষ্টির আদিযুগ থেকেই সে তার জীবনযাত্রার মানকে ক্রমাগত উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। তার এই ক্রম-উন্নতির ইতিকথাই হল মানবসভ্যতার ইতিহাস।

মানুষ যত সুখস্বাচ্ছন্দ্য পেয়েছে, ততই তার মধ্যে আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জেগেছে। সভ্যতার তথাকথিত অগ্রগতি মানুষের হাতে ভয়ংকর অস্ত্রের জোগান দিয়েছে। মানুষ মেতে উঠেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। এক সাম্রাজ্যের অবসানে সূচনা হয়েছে নতুন সাম্রাজ্যের। একজনের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে আর-
একজন ক্ষমতাশালী হয়েছে কিন্তু দ্বন্দ্ব-সংঘাত থামেনি। রক্তস্রোতের মধ্যে লেখা হয়েছে মানবসভ্যতার রক্তাক্ত ইতিহাস।

পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী সমুদ্রমন্থনে হলাহল এবং সুধা অর্থাৎ বিষ ও অমৃত দুই-ই উঠেছিল। কবির মতে সভ্যতার অগ্রগতিতেও তেমনি বিষ এবং অমৃত দুই-ই উঠে এসেছে। কবি সভ্যতার ক্ষতিকারক রুপকে বিষ আর কল্যাণময় রূপকে সুধা বলেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই সভ্যতার ক্ষতিকারক রূপ তার কল্যাণময় রূপকে ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের যোগ কমে গেছে বলেই নাগরিক জীবনে এত অশান্তি, এত সংঘাত নেমে এসেছে। নাগরিক জীবনের এই পরিণতি কবিকে কষ্ট দিয়েছে। তাই তিনি প্রকৃতির কোলে বেঁচে থাকা পল্লিজীবনের শান্ত-স্নিগ্ধ-মাটির গন্ধমাখা রূপটির উল্লেখ করেছেন। সেখানে সভ্যতার অগ্রগতি তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি বলেই বোধহয় আবহমান কাল ধরে মানুষের সঙ্গে মানুষের মানবিক সম্পর্ক বেঁচে আছে।