অষ্টম পাঠ ➤ সিরাজদ্দৌলা

অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কর্তৃক ওয়াটসকে লেখা একটি চিঠি
নবাবের হস্তগত হলে তিনি বুঝতে পারেন, ওয়ার্টস বহুদিন
ধরেই সিরাজবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশীদার। লর্ড ক্লাইডের
নেতৃত্বে এবং অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের উদ্যোগে ওয়াটসের সক্রিয়
ভূমিকা গ্রহণের মাধ্যমেই বাংলার সিরাজের বিরুদ্ধে সৈন্যদল
প্রেরিত হতে চলেছে। এমনকি এই যুদ্ধে যে ওয়াটসের প্রত্যক্ষ
প্রণোদনা রয়েছে, তা ও সিরাজ জানতে পারেন ওয়ার্টসের নিজের
হাতে লেখা একটি চিঠি পেয়ে। সেই চিঠিতে ওয়ার্টস সরাসরি
অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে জানিয়েছেন যে, সিরাজের ওপরে ভরসা
করা অসম্ভব এবং অর্থহীন। ফলে ফরাসি ঘাঁটি চন্দননগর আক্রমণ
করাই হবে বিচক্ষ সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া, পেরেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিস্বরূপ তাঁর দরবারে জায়গা করে নেওয়ার সুবাদে ওয়াটস তাঁর পরিবার এবং রাজসত্তার
সদস্যদের অন্তর্কলহ ও রাজদ্রোহের বিষয়ে ওয়াকিবহাল। নিজের করছেন। তাই সিরাজ ওয়াটসকে এর যথোচিত শাস্তি দিতে চেয়ে উদ্ধৃত উত্তিটি করেছেন।

  • উদ্ধৃত উত্তিটি শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত ‘সিরাজদ্দৌলা নাটকের
    দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে সংকলিত 'সিরাজদ্দৌলা
    পাঠ্যাংশ থেকে গৃহীত।
  • বাংলায় ফরাসি বণিকদের প্রতিনিধি মঁসিয়ে না উদ্বৃত উদ্ভিটি বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলার উদ্দেশে করেছিলেন।
  •  ইংরেজরা বাংলায় ফরাসিদের বিরদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আয়োজন শুরু করলে ফরাসিদের পক্ষে তা ঠেকানো মুশকিল হয়ে পড়ে। কারণ, ইতিপূর্বেই ফরাসিরা ইংরেজ আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য দুর্গনির্মাণের চেষ্টা করলে নবাবই তাতে আপত্তি জানান | নবাবের আদেশ ফরাসিরা শিরোধার্য করলেও ইংরেজরা তা মানেনি। ফলে বাংলায় সামরিক শন্তিতে পিছিয়ে থাকা ফরাসিরা দুই আক্রমণের মুখোমুখি হলে, তাদের পক্ষ থেকে মঁসিয়ে না নবাবের কাছে সামরিক সাহায্যপ্রার্থী হয়ে আসেন। কিন্তু সিরাজের পক্ষে সেই মুহূর্তে এই প্রত্যাশা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, ও কোম্পানির স্বার্থে এই অন্তদ্বন্দ্বকে ওয়াটস যথেচ্ছ ব্যবহারও ইতিপূর্বেই কলকাতা জয়ে এবং পৃশিয়ার যুদ্ধে তার লোকবল ও অর্থবল যথেষ্ট কমে যায়। ফলে নবাবের কাছ থেকে সাহায্য পেয়ে ব্যথিত মঁসিয়ে না এ কথা বলেন।

● সিরাজ ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা-কে উদ্দেশ্য করে কথাটি
বলেছেন।

  • ইংরেজরা ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর অধিকার করে নিয়ে নবাবের সাহায্য পাওয়ার আশার ইসিয়ে না সিরাজের রাজসভায় আসেন। নবাব সিরাজ ফরাসিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও জানান যে ইংরেজদের হারিয়ে কলকাতা জয় করতে গিয়ে এবং পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গের সঙ্গে লড়াইয়ে তাঁর বহু লোকক্ষর ও অর্থব্যয় হয়েছে। তাঁর শ্রীমঙনও নতুন যুদ্ধের পক্ষপাতী নন। এই অবস্থায় সহানুভূতি থাকলেও ফরাসিদের সাহায্য করা সম্ভব নয়। জানিয়ে সিরাজ মন্তব্যটি করেন।

• নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত তাঁর 'সিরাজদ্দৌলা' নামক
নাটাদৃশ্যে ইতিহাসের অনুসৃতি ঘটিয়ে মীরজাফরের স্বার্থপর
চরিত্রটিই অঙ্কন করেছেন।
১. অসহিষ্ণু ও উ: সিরাজ দরবারকক্ষে হোসেনবুলী খাঁর প্রাণদানের প্রসঙ্গ তুললে মীরজাফর মুখ খুলেছেন। নবাবের বিলুপ্ত কর্মচারী মীরমদন তাঁকে নবাবের প্রতি বিশ্বস্ততার কথা স্মরণ করালে, তিনি তাঁর পক্ষের সভাসদদের সঙ্গে নিয়ে দরবার আগ
করতে উদ্যত হন। এই আচরণের মধ্যে মীরজাফর চরিত্রের অসহিঞ্চুতা এবং উন্নতা ধরা পড়েছে।
২. আত্মকেন্দ্রিক ও অহংকারী মোহনলালকে মীরজাফর বলেছেন—'নীচপদস্থ কর্মচারীদের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের কাজের সমালোচনা করা উচিত নয়। এই উত্তিতে নিজের পদমর্যাদা নিয়ে মীরজাফরের অহংকার প্রকাশিত হয়েছে।
৩. যড়যন্ত্রকারী: বাংলার ঘোর সংকটময় সময়ে মীরজাফর
নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ওয়ার্টস্ তাঁকে যে পত্র লিখেছেন,
তার প্রসঙ্গ যখন নবান তোলেন, তখন মীরজাফরকে লজ্জিত হতে
দেখা যায় না: এ থেকে বোঝা যায় মীরজাফরই নবারের বিরুদ্ধে পরিচয় দিয়েছেন।
প্রধান ষড়যন্ত্রকারী এবং বিরূপ মনোভাবাপন্ন।

নাট্যকার মীরজাফর চরিত্রটিকে প্রচলিত ইতিহাসের ধারা
মেনে জীবন্ত করে তুলেছেন।

● পলাশির যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাকে সামনে রেখে 'সিরাজদ্দৌলা' নাটকটি রচিত নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত বিশেষ কিছু চরিত্রের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সত্যকে হুবন্ধু রক্ষা করেছেন। এই চরিত্রগুলির মধ্যে অন্যতমা হলেন ঘসেটি বেগম।
১. ষড়যন্ত্রকারী: ঘসেটি বেগম সিরাজের মাসি। তিনি চেয়েছিলেন পিতা আলিবর্দির মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বাংলার মসনদে বসুন। কিন্তু তাঁর স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু হলে সিরাজের
সিংহাসনলাভ নিশ্চিত হয়ে ওঠে। নিজের মনোবাসনা পূর্ণ না হওয়া ঘসেটি সিরাজের প্রতি ঈর্ষা থেকেই ইংরেজদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
২. প্রতিহিংসাপরায়ণ: ঘসেটি বেগমের প্রথম সংলাপ- 'ওখানে কী দেখচ মূর্খ, বিবেকের দিকে চেয়ে দেখো।" একজন মাতৃসমা নারীর মুখে সিরাজের প্রতি এই উক্তি সমীচীন বলে মনে হয়। না। ঘসেটির উত্তিতে প্রতিহিংসাপরায়ণতা স্পষ্ট—'আমার রাজা নাই, তাই আমার কাছে রাজনীতিও নাই—আছে শুধু প্রতিহিংসা। নিরীহ বেগম লুৎফাকেও দুর্বিনীত ঘসেটি অকারণে শ্লেষপূর্ণ বাকা শুনিয়েছেন।

নাট্যদৃশ্যে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিতেই ঘসেটি তাঁর সক্রিয়তায় এবং বাক্‌চাতুর্যে নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন।

• অ্যারিস্টইল নাটকের যে ছয়টি উপাদানের কথা বলেছেন।
তারমধ্যে চতুর্থ উপাদান হল সংলাপ | নাট্যকাহিনির সার্থক রূপায়ণে
সংলাপের বিশেষ ভূমিকা আছে।
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কালজয়ী নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা'পাঠাংশে সংকলিত অংশে সিরাজ ও ওয়াটসের সংলাপ দিয়ে নাট্যদৃশ্যের সূচনা। ওয়াটস্ ইংরেজ চরিত্র। তাই তাঁর সংলাপ
ইরেজি ভাষায় রচিত হয়েছে। তিনি যে বাংলা ভাষা ব্যবহার। করেছেন, তা অরয়গত দিক থেকে ত্রুটিযুক্ত। এই ত্রুটিমুক্ত ভাষা একজন ইংরেজ চরিত্রের পক্ষেসুপ্রযুক্ত হয়েছে বলা যায়। অন্যদিকে সঁসিয়ে লা পুরোপুরিই ইংরেজিতে কথা বলেছেন। না হলে তাঁর
চরিত্রটি বাস্তবতা দ্বারাত। নাট্যদৃশ্যে সিরাজের সংলাপগুলি সম্রাটবুলভ গাস্তীর্য এবং ব্যক্তিত্বের পরিচয়বাহী। আবার মীরজাফর ও ঘসেটি বেগমের সঙ্গে কথোপকথনে সিরাজ চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভ ধরা পড়েছে। অপ্রধান চরিত্রগুলিও উপযুক্ত সংলাপের গুণ স্বমহিমায় ভাষা। বলা যায় ঐতিহাসিক নাটকের গাম্ভীর্য বজায়
রাখতে নাট্যকার সংলাপ রচনার ক্ষেত্রে বিশেষ শিল্পকৌশলের পরিচয় দিয়েছেন ।

  • শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের 'সিরাজদ্দৌলা' নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথমটি পাঠ্যাংশে সংকলিত হয়েছে। সংকলকগণ মূল নাটকের শিরোনামটিই এখানে অক্ষত রেখেছেন। দৃশ্যটির ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে নামকরণটিকে অপরিবর্তিত রাখার যৌক্তিকতা ও সার্থকতা। প্রতিপন্ন হবে।
  • নাট্যদৃশ্যটির মুখ্য উপজীব্য বিষয় হল নবাব সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে সংগঠিত ষড়যন্ত্র এবং তারজন্য নবাবের মানসিক উদ্ভবো। বাইরে ইংরেজ আর ঘরে প্রধান সেনাপতি মীরজাফর এবং নিজের মাসি ঘসেটি বেগমের যৌগ বড়যন্ত্র সিরাজকে মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। নিজের যাবতীয় অপরাধ স্বীকার করে
    নিয়ে বাংলাকে রক্ষার জন্য কর্মচারীদের কাছে তিনি নতজানু হয়েছেন। মাত্র পনেরো মাসের রাজত্বকালে দরবারি ষড়যন্ত্রে মানুষের নির্মমতায়, আপনজনদের প্রতিহিংসায় সিরাজ মর্মপীড়া অনুভব করেছেন। নাট্যদৃশ্যের উপসংহারে তার উত্তির মধ্যে ধরা পড়েছে অন্তহীন নিষ্ফলতা—“পলাশি! লাখে লাখে পলাশ ফুলের
    অগ্নি-বরণে কোনোদিন হয়তো পলাশির গ্রান্ডর রাঙা হয়ে থাকত, তাই আজও তার বুকে রক্তের তৃষা।” সিরাজের উদ্‌বেগ, উৎকণ্ঠা, হতাশা, দেশপ্রেম দৃশ্যটির মুখ্য উপজীব্য বলে 'সিরাজদ্দৌলা' নামকরণটিই অগ্রাধিকার পাবার যোগ্য।