অষ্টম পাঠ

'হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক হীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রশ্নোদ্ধৃত মন্তব্যটি করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের প্রথম যুগে অনেক মানুষই বিদ্যালয়ের কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে দু একজন অসাধারণ হলেও এমন অনেকেই ছিলেন বিদ্যাবুদ্ধিতে যাঁদের সমকক্ষ লোকের অভাব তখন ছিল না। কিন্তু তাদের নিষ্ঠা ও মনঃসংযোগের গুণে তাঁরা অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন। আলোল অংশে তথাকথিত সাধারণ মানুষেরও সাধনার শক্তিতে অসাধারণ হয়ে ওঠার কৃতিত্বের কথাই বলা হয়েছে।

আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে শান্তিনিকেতনের দান অপরিসীম। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই প্রথম আমাদের দেশকে শিখিয়েছে যে বিদ্যালয় বিদ্যাদানের স্থান ছাড়াও বিদ্যাচর্চা ও বিদ্যা-বিকিরণের স্থান। বিদ্যার্জনের পথ সহজ করে শিক্ষার্থীর মানসিকতা ও চিন্তাধারার সার্বিক বিকাশ ঘটানোই ছিল। শান্তিনিকেতনের একমাত্র উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সেবায় তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলেন। তাই এই প্রতিষ্ঠানের সংস্পর্শে এসে অনেকেই তাঁদের সাধারণত্বের গন্ডি পেরিয়ে অসাধারণ কৃতিত্ত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। শান্তিনিকেতনের জীবনই শান্তিনিকেতনের শিক্ষা। তাই শান্তিনিকেতন নিজ হাতে অনেক অসাধারণ ব্যক্তির জন্ম দিয়েছে। সেক্ষেত্রে তাঁদের কৃতিত্বের অনেকখানিই শান্তিনিকেতনের প্রাপ্য।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করার সুবাদে প্রাবন্ধিক হীরেন্দ্রনাথ দত্ত অনিবার্যভাবেই শান্তিনিকেতনের প্রসঙ্গ এনেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে শান্তিনিকেতনের অবদান অপরিসীম মনে করার কারণ হল এই যে, শান্তিনিকেতনই দেশকে প্রথম এই বার্তা দিয়েছে, বিদ্যালয় কেবলমাত্র বিদ্যাদানের স্থান নয়, সেটি হল বিদ্যাচর্চার স্থান। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধমাত্র বিদ্যাচর্চায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে না, তা প্রকৃতপক্ষে বিদ্যা-বিকিরণের স্থান। বিদ্যাকেন্দ্রের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হল বিদ্যার্জনের পথ সহজ করে। দেওয়া। সে সময়ের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো নয়ই, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এই কর্তব্যের কথা সেভাবে ভাবেনি। অথচ শান্তিনিকেতন তার শুরু থেকেই তা কার্যকরী করে সমগ্র বিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছিল। শান্তিনিকেতনেই সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার ভিত তৈরি হয়েছিল।

‘হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক হীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রশ্নোদ্ধৃত মন্তব্যটি করার সময় হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষুশেখর শাস্ত্রী, ক্ষিতিমোহন সেন প্রমুখের কথা স্মরণ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং শান্তিনিকেতনের সেবায় করেছিলেন। সেই জোর থেকেই তিনি খাঁদের শান্তিনিকেতন পড়ে তোমার কাজে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাঁদের কাজেও উৎসাহ ও সততার সঙ্গে কাজ করার দাবি জানাতে পেরেছিলেন। সাধারণ এক জমিদারি সেরেস্তার কর্মচারীকে অর্থাৎ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তিনি অধ্যাপনার কাছে নিয়োগ করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দিয়ে ছোটো ছেলেমেয়েদের উপযুক্ত বাংলা ভাষার প্রথম বিজ্ঞান প্রথমালা লিখিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁকে বাংলা ভাষার বৃহত্তম অভিধান সংকলনের ভার দিয়েছিলেন। বিধুশেখর শাস্ত্রী পর ছিলেন ইংরেজি ভাষায় অনভিজ্ঞ একজন চোলের সামান্য পণ্ডিত। তিনি রবীন্দ্রনাথের সহযোগিতায় বহুভাষাবিদ পণ্ডিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ভারতীয় পণ্ডিতসমাজে প্রথম সারির মানুষদের অন্যতম। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেনের কথাও প্রাবন্ধিক ও প্রসঙ্গে স্মরণ করেছেন। কবিগুরুর সংস্পর্শে এসে তাঁর জীবন-জিজ্ঞাসার উদ্দেশ্যই বদলে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রেরণায় এবং তাঁর উৎসাহে মধ্যযুগীয় সাধুসন্তদের বাণী সংগ্রহ করে তিনি ভারতীয় জীবনসাধনার এক বিস্তৃতপ্রায় অধ্যায়কে নতুনভাবে পরিবেশন করতে পেরেছিলেন।

শান্তিনিকেতনের প্রথম যুগে রবীন্দ্রনাথের আহবানে যাঁরা সেখানে। কাজ করতে গিয়েছিলেন, সেই কর্মবীর অধ্যাপকদের কথাই এখানে বলা হয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে নগণ্য ও সাধারণ মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা প্রকাশের দাবির কথছি এখানে উঠে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ যেমন তাঁর সর্ব শান্তিনিকেতনকেই দিয়েছিলেন তেমনই তিনি যাদের সেখানে এনেছিলেন, তাদের কাছেও নিঃসংকোচে সেই দাবিই পেশ করেছিলেন এবং কেউই তাঁকে হতাশ করেননি।

শান্তিনিকেতনে বিদ্যাতো এবং বিদ্যা-বিকিরণের স্বর্গীয় পরিবেশ খুঁজে পেয়ে, বিশেষত রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য, সাহায্য, উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এঁদের প্রত্যেকেই নিজেদের সাধ্যসীমাকে ছাপিয়ে গিয়ে সারস্বত-সাধনায় নিজেজদের প্রাণপণে নিয়োজিত করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ জমিদারি পরিদর্শনে এসে আমিনের সেরেস্তায় নিযুক্ত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্কৃত জ্ঞানের পরিচয় পান। ১৩০৯ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ অধ্যাপকরূপে তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন। এভাবেই শান্তিনিকেতনের সঙ্গে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগাযোগ গড়ে ওঠে।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় শান্তিনিকেতনে কাজে যোগ দিলেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে তাঁর 'সংস্কৃত প্রবেশ' গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব দেন। সেই গ্রন্থ শেষ করার পর রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছায় ১৩১২ বঙ্গাব্দে তিনি বৃহত্তম বাংলা অভিধান 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' সংকলনের কাজ শুরু করেন। ১৩৫২ বঙ্গাব্দে সেই কাজ সমাপ্ত হয়। সম্পূর্ণ একার চেষ্টায় এই মহাগ্রন্থের সংকলন ও সম্পাদনার কাজে তাঁর অসাধারণ ধৈর্য, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের পরিচয় পাওয়া যায়। আজীবন সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরোজিনী বসু স্বর্ণপদক, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ডি লিট' সম্মান “দেশিকোত্তম' উপাধি লাভ করেন।

প্রাবন্ধিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত "ছরিবেশ বন্দ্যোপাধ্যায়' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যায়। জমিদারি মহল্লা পরিদর্শনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ হরিচরণ  বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্কৃত জ্ঞানের বিষয়টি লক্ষ করেন। কবিগুরু তাঁর মধ্যে সুপ্ত বৃহতের সম্ভাবনাটি সেদিন চিনতে পেরেছিলেন। সে কারণেই অতি অল্পদিনে্র মধ্যেই তাঁকে শান্তিনিকেতনে ডেকে নিয়ে এক বিশাল কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নিজের পরিকল্পিত ও অর্ধসমাপ্ত 'সংস্কৃত  প্রবেশ' গ্রন্থটি পরিসমাপ্তির দায়িত্ব তিনি হরিচরণকেই দেন। এরপর তারই নির্দেশে তিনি বাংলা ভাষার বৃহত্তম অভিধান 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' সংকলনের কাজ শুর করেন। এই গ্রন্থ দীর্ঘ চল্লিশ বছরের সাধনায় শেষ হয়। রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ তাঁর কাছে দেবতার আশীর্বাদের মতো ছিল। তিনি তা মাথা নত করে গ্রহণ করেছিলেন। অর্থকষ্টের পরুন হরিচরণের কলকাতায় ফিরে যাওয়া, অভিধান সংকলনের কাজ কধ হয়ে থাকা কবিকেও দুঃখিত করেছিল। মূলত তারই আবেদনে বিদ্যোৎসাহী মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী অভিধান রচনায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য মাসিক পঞ্চাশ টাকা বৃত্তি ধার্য করেছিলেন। সংকলনের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ তেরে বছর তিনি এই বৃত্তি লাভ করেছিলেন। মুদ্রণের কাজ শুরু হওয়ার আগে মণীন্দ্রচন্দ্র এবং ১০৫ খন্ডে সমাপ্ত সমগ্র অভিধানের মুদ্রণ শেষ হওয়ার আগে রবীন্দ্রনাথ পরলোক গমন করেন।

জমিদারি মহল্লা পরিদর্শন করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমিনের সেরেস্তায় নিযুক্ত হরিচরণকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—“দিনে সেরেস্তার কাজ করো, রাত্রিতে কী করো?" হরিচরণ সংকোচের সঙ্গে বলেছিলেন যে, সন্ধেবেলায় তিনি একটু সংস্কৃতের চর্চা করেন। তাঁর একখানা বইয়ের পাণ্ডুলিপিও প্রস্তুত আছে।

কোনো বৃহৎ কাজের জন্য নিষ্ঠা এবং মনোযোগ—এই দুটি গুণ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে যেসব গুণী ব্যক্তি শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন, তাঁদের বিদ্যাবুদ্ধির পাশাপাশি এই দুটি গুণের দ্বারা অসাধারণ নানান কার্য সম্পাদিত হয়েছিল।

প্রাবন্ধিক এ কথা মনে করেছেন কারণ শান্তিনিকেতন নিজ হাতে গুণী মানুষ তৈরি করেছে। শান্তিনিকেতনের মাটি-জল-হাওয়ার গুণের পাশাপাশি এই স্থানও মানুষের কাছ থেকে বড়ো কিছু দাবি করতে জানে। শান্তিনিকেতন নিজের দান শক্তির দ্বারা তা অর্জন করতেও জানে।

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে বহু পণ্ডিত ও যশস্বী মানুষ এসেছিলেন। তাঁরা সকলেই যে অসাধারণ ছিলেন তা নয়, কিন্তু নিজের নিজের ক্ষেত্রে তাঁরা অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। এঁরা এমন সব কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন যা সাংসারিক বৃদ্ধিতে হঠকারিতা বলে মনে হতে পারে। নিজেদের কাজকে তাঁরা সাধনার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তাদের কাছে কাজের বিনিময়ে অর্থমূল্য একটুও গুরুত্ব পায়নি। এমনকি যে কাজ বহুজনের মিলিত প্রয়াস ছাড়া সম্ভব নয়, কখনো কখনো তা একক প্রচেষ্টাতেও সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রসঙ্গেই প্রাবন্ধিক "কর্তা অকিঞ্চন, কীর্তি ] সুমহান” কথাটির উল্লেখ করেছেন। লেখকের মতে কীর্তি মহান হলেও তা “কখনো কর্তাকে ছাপিয়ে যায় না।" চরিত্রের ভিতরের শক্তিই লেখাকে বা সৃষ্টিকে সম্ভব করে তোলে। সাধারণ মানুষও তাই অসাধারণ কাজ করতে পারে। ব্যক্তিস্বার্থের বাইরের এই সাধনা মানুষকে অমর করে তোলে।

প্রাবন্ধিক হীরেন্দ্রনাথ দত্তের বিবরণ অনুযায়ী হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় কবি রবীন্দ্রনাথের ডাকে তাঁদের জমিদারি সেরেস্তা থেকে ১৩০৯ সালে শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে কাজ করা হরিচরণের কাছে ছিল পরম কাঙ্ক্ষিত এবং দেবতার আশীর্বাদস্বরূপ। রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে হরিচরণ নিষ্ঠার মাধ্যমেই তাঁর 'সংস্কৃত প্রবেশ' নামক অসমাপ্ত গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করেন। তিনি অধ্যাপনার ফাঁকে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব ছিল রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদে বঙ্গীয় শব্দকোষ' রচনা করা। দীর্ঘ চল্লিশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে অভিধানের কাজে যুক্ত থাকলেও কখনও তাঁর মধ্যে বিন্দুমার ক্লান্তি বা অবসাদ দেখা যায়নি। সম্পূর্ণ একক প্রয়াসে এমন সুবৃহৎ কর্ম সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে তাঁর জ্ঞান ও সাধনার পরিচয় মেলে। মানুষের কাছে অভিধান পৌঁছে দিতে সীমিত সামর্থ্যেও তিনি মুদ্রণকার্যের আয়োজন করেন। রচনা, মুদ্রণ ও প্রকাশনার কাজে তিনি আশাতীত দক্ষতা দেখান। হরিচরণের বৃত্তি ও পরামর্শদাতা মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী ও রবীন্দ্রনাথ মুদ্রিত অভিধানটি দেখে যেতে পারেননি ও দুঃখ তিনি সারাজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। অভিধান न মুদ্রণ শেষ হলেও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কোনো-না-কোনো কাজে নিযুক্ত ছিলেন। মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর মস্তিষ্কের শক্তি ছিল অটুট। সদা প্রসন্নচিত্ত, সুখে-দুঃখে অবিচলিত এমন সাধক মানুষের মনে কোথাও একটা প্রশান্তি বিরাজ করত। তাই হীরেন্দ্রনাথ যথার্থ বলেছেন, “এ কাজ মহাযোগীর জীবনসাধনা।''

বিশ্বভারতীর কাজ থেকে অবসর নিলেও হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় নিম্ন আসনে বসে কাজে মগ্ন থাকতেন। বয়স পঁচাত্তর পেরোলেও হরিচরণ কাজ থেকে দূরে থাকতেন না। তিনি বঙ্গীয় শব্দকোষ' ছাড়া আরও কয়েকটি প্রবন্ধ রচনা করেন | কিন্তু তাঁর কাজের সঙ্গে মাস-মাহিনার কোনও সম্পর্ক ছিল না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্দেশে ১৩১২ সালে হরিচরণ ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ' রচনার কাজ শুরু করেন। রচনাকার্য শেষ হয় ১৩৩০ সালে। কিন্তু আর্থিক অনটনের জন্য হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় শান্তিনিকেতনের কাজ ছেড়ে কলকাতা গেলে অভিধান সংকলনের কাজ কধ থাকে। পরে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্রের মাসিক বৃত্তির সুবাদে অভিধান সংকলনের কাজ শেষ হয়।এর মুদ্রণকার্য শেষ হয় ১৩৫২ বঙ্গাব্দে।

বিশ্বভারতীর কাজে যোগ দেওয়ার পর একান্ত মনে কাজে মগ্ন হরিচরণকে দেখে প্রাবন্ধিক হীরেন্দ্রনাথ দত্তের দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা শ্লোকটি মনে পড়ে যেত। শ্লোকটি হল—

“কোথা গো ডুব মেরে রয়েছ তলে

হরিচরণ! কোন গরতে?

বুঝেছি! শব্দ-অবধি-জলে

মুঠাচ্ছ খুব অরথে!”

রবীন্দ্রনাথের লেখা 'সুভা' গল্পের সুভা বাণীকন্ঠের কনিষ্ঠ কন্যা। সুভার দিদি সুকেশিনী, সুহাসিনীর পর কনিষ্ঠ মেয়ের নাম রাখা হয় সুভাষিণী। সুভাষিণী নাম হলেও ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে মেয়েটি ছিল বোবা। সবাই তাকে সংক্ষেপে 'সুভা' বলে ডাকত। সুভা ছিল তার পিতার খুবই স্নেহের।তবে সুভার মা তাকে গর্ভের কলঙ্ক হিসেবেই মনে করতেন।

উত্তর: সুভার দুই বড়ো দিদি সুকেশিনী ও সুহাসিনীর নামের সাথে মিল রেখে বাণীকণ্ঠ তাঁর ছোটো মেয়ের নাম রাখেন সুভাষিণী।সকলে সংক্ষেপে তাকে সুভা বলে ডাকত। তার বন্ধু প্রতাপ তাকে ভালোবেসে 'সু' বলে ডাকত।

আলোচ্য গল্পে সুভার দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু, তার দুটি গাভি সর্বশী ও পাঙ্গুলির উল্লেখ আছে যারা ছিল সুভার সুখ-দুঃখের সঙ্গী। এ ছাড়াও ছাগল ও বিড়াল শাবক তার অনুগত সঙ্গী ছিল। তার একমাত্র মনুষ্যভাষাবিশিষ্ট সঙ্গী ছিল গোঁসাইদের ছোটো ছেলে প্রতাপ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা 'সুভা' গল্পে সুভা একজন বোবা মেয়ে। তার ভালো নাম সুভাষিণী । সংক্ষেপে সবাই তাকে সুভা বলে ডাকে। গল্পের প্রথমেই সুভার দুই বড়ো বোনের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তাদের নাম যথাক্রমে সুকেশিনী ও সুহাসিনী। দুই বোনের সঙ্গে নামের মিল রাখার জন্যই সুভার বাবা-মা তার নাম রেখেছিলেন সুভাষিণী। সুভার বড়ো দুই বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তাদের বিয়েতে অনেক খোঁজ করে পাত্র নির্বাচন করা হয়েছিল। দুই বোনের বিয়েতে অনেক টাকাও খরচ করা হয়েছিল। সুভা বোবা ছিল বলে বাবা মা তাকে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। তার মা সুভাকে নিজেরই একটা ত্রুটি বলে মনে করতেন। এর কারণ সাধারণত মায়েরা মেয়েকে নিজের অংশরূপেই দেখেন। সুভার বাবা সুভাকে তাঁর অন্য মেয়েদের থেকে বেশি ভালোবাসতেন।

বাণীকন্ঠের ঘর চণ্ডীপুর গ্রামে নদীতীরে। তার বাখারির বেড়া, আটচালা, গোয়ালঘর, ঢেঁকিশালা, খড়ের স্তুপ, তেঁতুলতলা, আম, কাঁঠাল ও কলার বাগান নৌকাবাহীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

 

আলোচ্য গল্পে সুভার গুটিকয়েক অন্তরঙ্গ বন্ধুর উল্লেখ পাওয়া যায়। যার মধ্যে অন্যতম হল গোয়ালের দুই গাভি, সর্বশী ও পাঙ্গুলি। এরা দুজন ছাড়াও ছাগল ও বিড়ালশাবক সুভার কধু ছিল এবং গোঁসাইদের ছেলে প্রতাপও তার বিশেষ বন্ধু ছিল এবং সুভা তার মাছ ধরার সঙ্গী ছিল।

সর্বশী ও পাঙ্গুলি, সুভার মুখে তাদের নাম কখনও না শুনলেও সুভার পদশব্দ তারা চিনত। তার কথাহীন করুণ সুর ও তার মর্ম গাভি দুটি বুঝত। সুভা কখন আদর করে, কখন শাসন করে, কখন মিনতি করে, তা মানুষ অপেক্ষা তারা ভালো বুঝতে পারত। সুভা গোয়ালে এসে সর্বশীর গলা জড়িয়ে নিজের গাল ঘষত। পাঙ্গুলি স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তা দেখে তার গা চাটত। দিনে তিনবার করে সুভা গোয়ালে আসত। তা ছাড়া বাড়িতে কোনোভাবে দুঃখ পেলে সুভা তার পোষ্য গাভি দুটির কাছে আসত। সুভার বিষণ্ণ দৃষ্টি দেখে তারা সুভার দুঃখকষ্ট উপলব্ধি করত। সুভার হাতে নিজেদের শিং ঘষে তার নীরব ব্যাকুলতায় সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করত তারা।

‘সুভা' গল্প থেকে উদ্ধৃতাংশে বোবা মেয়েটি হল সুভাষিণী বা সুভা।

সুভা জন্ম থেকেই বোবা। তাই তার সমবয়সিরা তাকে এড়িয়ে চলত। তার বাবা-মাও তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। 'সুভা'-র এই দুঃখভরা জীবনে কয়েকটি প্রাণী ও এই বিরাট প্রকৃতি ছিল আপনজন। সুভা ছিল নির্জন
দুপুরের শব্দহীন ও সঙ্গীহীন। দুপুরবেলা মাঝি ও জেলেরা খাওয়ার জন্য বাড়ি যেত। গৃহস্থ মানুষ ঘুমাত। পাখিরা ক্লান্ত হয়ে চুপ করে থাকত। তখন প্রচন্ড রোদে ঘেরা আকাশের নীচে বোবা মেয়ে সুভা ও তারই মতো শব্দহীন প্রকৃতি মুখোমুখি চুপ করে বসে থাকত। আবার গল্পে আছে, সুভার বড়ো হয়ে ওঠা যেন পূর্ণিমার দিন সমুদ্রের জোয়ার এসে তার হৃদয়কে আলোড়িত করে তোলা। এক-একদিন গভীর পূর্ণিমার রাতে দরজা খুলে সুভা বাইরে আসে। তখন প্রকৃতিও সুভার মতো একা একা ঘুমন্ত পৃথিবীতে জেগে বসে থাকে। আর একবার লেখক উল্লেখ করেছেন যে, নিস্তব্ধ ব্যাকুল প্রকৃতির প্রান্তে একটি নিস্তদ্ধ ব্যাকুল বালিকা দাঁড়িয়ে আছে। এইভাবেই গল্পে বোবা প্রকৃতি ও একটি বোবা বালিকা একাত্ম হয়ে উঠেছে।

প্রশ্নে উল্লিখিত ছেলেটি হল প্রতাপ ।

→ সে কর্মহীন অলস প্রকৃতির মানুষ। বহু চেষ্টার পর তার বাবা-মা তার ওপর আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কাজকর্মে আমোদে অবসরে যেখানে লোক কম পড়ত সেখানে প্রতাপকে পাওয়া যেত। সে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে ভালোবাসত।

কথা বলতে অক্ষম সুভার সঙ্গী ছিল মূলত দুটি গাভি সর্বশী এবং পাঙ্গুলি। এ ছাড়া ছাগল এবং বিড়ালশাবকও  ছিল তার সঙ্গী। একমাত্র যে মানুষটি তার সঙ্গী হতে পেরেছিল সে ছিল গোঁসাইদের ছোটো ছেলে প্রতাপ। অকর্মণ্য এই ছেলেটির প্রধান শখ ছিল মাছ ধরা। আর এই সময়েই সুভার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হত। বাক্যহীন এই সঙ্গীকে প্রতাপ বিশেষ মর্যাদা দিত। সুভাকে সে 'সু' বলে ডাকত। প্রতাপ যখন ছিপ ফেলে জলের দিকে তাকিয়ে থাকত, সুভা বসে থাকত কাছের তেঁতুলতলায়। প্রতাপের জন্য সুভা নিজের হাতে সাজা একটা পান নিয়ে আসত। প্রতাপকে কোনোভাবে সাহায্য করার জন্য সে উন্মুখ হয়ে থাকত। মনে মনে সে ঈশ্বরের কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত যার দ্বারা সে এমন কিছু করতে পারে যা দেখে প্রতাপ অবাক হয়ে যায় কিন্তু এসব কিছুই না ঘটে সুভার বিয়ে হয়ে যায় অন্যত্র। প্রতাপের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য না করতে পেরে অভিমান নিয়েই সুভা চলে যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সুভা' গল্প থেকে উদ্ধৃতাংশে বোবা মেয়ে সুভার কথা বলা হয়েছে।

সুভা মনে করত কোনো এক পূর্ণিমা তিথিতে কোনো-একটা সমুদ্র থেকে একটা জোয়ারের স্রোত ছুটে আসছে। সেই স্রোত তার হৃদয়কে এক নতুন, না বলা চেতনায় পূর্ণ করে তুলছে। সে নিজে নিজেকে দেখছে, ভাবছে, প্রশ্ন করছে কিন্তু বুঝতে পারছে না। এই ভাবেই সুভা ধীরে ধীরে নিজেকে অনুভব করতে পেরেছিল।

উত্তর: এখানে 'স্ত্রী-পুরুষ' বলতে 'সুভা' গল্পে সুভার বাবা ও মায়ের কথা বলা হয়েছে।

সুভা জন্ম থেকেই ছিল বোবা। তাই তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা ছিল। সুভা বড়ো হয়ে তার বিবাহ না দিলে একঘরে হওয়ার ভয় ছিল। তাই বাবা মার মধ্যে সুতার বিবাহ বিষয়ে পরামর্শ হয়েছিল।

প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশে সুভা-র বিবাহের কথা বলা হয়েছে।

→ বোবা মেয়ে সুভাকে পাত্রপক্ষের হাতে সমর্পণ করে সুভার বাবা-মা দেশে চলে যায়। সুভার স্বামী যেহেতু পশ্চিমে কাজ করে তাই বিবাহের ঠিক পরেই সে স্ত্রীকে সেখানে নিয়ে যায়। সপ্তাহখানেক পরে সকলেই বুঝতে পারে যে নববধূ বোবা। কিন্তু সেটা যে সুভার দোষ নয়, সে কাউকে প্রতারণা করেনি—সেটা কেউ বুঝতে চায়নি। তার চোখের ভাষা কেউ বুঝতে চায়নি। সুভার মনের মধ্যে যে চাপা কান্না বাজছিল তাও কেউ শুনতে পায়নি। উপরন্তু সুভার স্বামী ভালো করে দেখেশুনে কথা বলতে পারে এমন একটি মেয়েকে বিয়ে করে আনে।

 

'সুভা' গল্প থেকে উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে। এখানে বালিকা বলতে বোবা মেয়ে ‘সুভা’-কে বোঝানো হয়েছে।

এ কথা বুঝেছেন সুভার ভাবী স্বামী। তিনি ও তাঁর বন্ধু বিয়ের আগে সুভাকে দেখতে এসে একথা বুঝেছিলেন।

তাঁরা বুঝেছিলেন যে সুভার কান্না তাঁদের পক্ষে ভালো কারণ সুভার হৃদয় আছে তাঁরা হিসেব করে দেখেন যে, সুভার হৃদয় বাবা-মায়ের জন্য কাঁদছে। অতএব ভবিষ্যতে সুভা তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির জন্য এমনভাবেই ব্যাকুল হয়ে উঠবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'সুভা' গল্পের মূল চরিত্র বোবা বালিকা সুভাষিণী সম্পর্কে প্রশ্নোধৃত উপমাটি ব্যবহার করেছেন।

জন্ম থেকেই বোবা বালিকা সুভার ভাববিনিময়ের ভাষা বলতে ছিল তার বড়ো বড়ো কালো চোখের দৃষ্টি। সেইসঙ্গে তার মুখে ফুঠে উঠত নানান অনুভূতি। সুভার চোখের ভাষা ছিল 'অসীম উদার এবং অতলস্পর্শ গভীর—অনেকটা স্বচ্ছ আকাশের মতো। সুভার মধ্যে প্রকৃতির মতো নির্জনতা ও গভীরতা লক্ষ করেই বালক-বালিকারা তাকে ভয় করত এবং তার খেলার সাথী হতে চাইত না। তাই সে ছিল সঙ্গীহীন আবার নির্জন দুপুর যেমন নিঃস্তব্ধ সেরকমই সুভা। ছিল শব্দহীন। সেই কারণেই লেখক তাকে নির্জন দুপুরের মতো 'শব্দহীন' এবং 'সঙ্গীহীন' বলেছেন। আলোচ্য উপমাটিতে সুডার প্রকৃতিগত গভীরতা নিঃসঙ্গতার দিকটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

'সুভা' গল্পে সুভার পিতা রাণীকন্ঠের বাড়ি বাংলাদেশের চণ্ডীপুর গ্রামে। গ্রামটির একপাশ দিয়ে দ্রুত বয়ে চলেছে একটি ছোটো সরু নদী। নদীর দুপাশে লোকালয়, গাছের ছায়ায় ঘেরা উঁচু ভূমি। নদীর কলধ্বনি, মানুষের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, গাছের মর্মরধবনি—এই সবই গ্রামটিকে সদাচঞ্চল করে রেখেছে।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সুভা' গল্পের বোবা মেয়ে সুভার সঙ্গে তার সমবয়সি ছেলেমেয়েরা খেলতে আসত না। তাই তাদের বাড়ির গোয়ালের দুটি গাড়ি সর্বশী ও পাঙ্গুলির সঙ্গে সুভার এক নিবিড়, অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। মানুষের মুখের ভাষার চেয়ে তার কথাধীন করুণ সুর গাভি দৃষ্টির কাছে বেশি বোধগম্য ছিল। সুভা কখনও তাদের নাম ধরে ডাকতে পারেনি। তবু তার পায়ের শব্দ সর্বশী আর পাঙ্গুলির অত্যন্ত পরিচিত ছিল। সুভার বাকাহীন দৃষ্টিতে সেই শাসন বা মিনতির ভাষা মানুষের চেয়েও সহজে বুঝে নিতে পারত অবলা গাভি দুটি।

দিনের মধ্যে অন্তত তিনবার গোয়ালঘরে গিয়ে সুড়া তাদের আদর করে আসত এবং তারাও প্রত্যুত্তর দিত। এ ছাড়া অনিয়মিত যাতায়াত তো ছিলই। ঘরে কারোর কথা খারাপ লাগলে সান্ত্বনা লাভের জন্যও সুভা তাদের কাছে অসময়ে গিয়ে উপস্থিত হত।

চন্ডীপুর গ্রামের গোঁসাইদের অকর্মণ্য ছোটো ছেলেটির নাম প্রতাপ।ছিপ ফেলে মাছ ধরা ছিল প্রতাপের প্রধান শখ। সহজে সময় কাটানোর জন্য প্রায়ই বিকেলে যখন নদীতীরে প্রতাপ মাছ ধরত, তখন সুভার সঙ্গে তার দেখা হত। প্রতাপ সব কাজেই সঙ্গী খুঁজত। তার কাছে মাছ ধরার সঙ্গী হিসেবে বোবা মেয়ে সুডাই শ্রেষ্ঠ ছিল। এজন্যই প্রতাপের কাছে সুভার মর্যাদা ছিল। তাই সে আদর করে তাকে 'সু' বলে ডাকত।

প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা 'সুভা' শীর্ষক ছোটোগল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোচ্য অংশে ‘তাহাদের' বলতে সুভার পিতা বাণীকণ্ঠ ও মায়ের কথা বোঝানো হয়েছে।

লেখকের এরূপ মন্তব্যের কারণ হল এই যে, সুভা ছিল পিতা-মাতার ভয়ানক দুশ্চিন্তার কারণ। সে বোবা হলেও তার যে অনুভব করার শক্তি রয়েছে—এই কথাটাই অনেকে বুঝত না। তার সামনেই সবাই তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করত। সুভার পিতা বাণীকণ্ঠ অবশ্য তাকে তাঁর অন্য মেয়েদের চেয়ে একটু বেশিই ভালোবাসতেন।

সুভার বয়স বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতার দুশ্চিন্তাও বাড়তে থাকল। লোকনিন্দা শুরু হল। এমনকি মেয়ের বিয়ে দিতে না পারলে গ্রামে তাদের একঘরে করা হবে, এমন কথাও শোনা গেল। সুভার প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার অভিভাবকেরা তাকে গ্রামত্যাগে বাধ্য করলেন এবং কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিলেন।

লেখক 'তাহাদের জাতি ও পরকাল রক্ষা হইল' বলতে সামাজিক অসম্মানের হাত থেকে সুভার পিতা-মাতার মুক্তি পাওয়ার প্রসঙ্গটিই নির্দেশ করেছেন। এই বাক্যটিতে গ্রামের অধসংস্কারাচ্ছন্ন রীতিনীতির প্রতি লেখকের তাঁর ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও ব্যঙ্গ প্রকাশ পেয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সুভা' গল্পে স্বয়ং লেখক প্রশ্নোদ্ভূত মন্তব্যটি করেছেন। বোবা বালিকা সুভার ভাষার অভাব যেন মূক বিশ্বপ্রকৃতি তার বিচিত্র শব্দে পূরণ করে দেয় । নদীর কলকল শব্দ, মানুষের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, গাছের পাতার খসে পড়ার শব্দ সমস্ত একসাথে মিশে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মূক-বধির বালিকা সুভার মনের উপকূলে এসে ভেঙে পড়ে। প্রকৃতির বিচিত্র শব্দকে লেখক গল্পে 'বোবার ভাষা' হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। সুভার দীর্ঘ, আয়ত চোখের ইঙ্গিতের ভাষাকেই রবীন্দ্রনাথ ঝিঁঝির ডাকে আলোড়িত তৃণভূমি থেকে কোনো শব্দই যেখানে পৌঁছোয় না—সেই নক্ষত্রলোক পর্যন্ত লক্ষ করেছেন। মানুষ সুভাকে উপেক্ষা করলেও প্রকৃতি যেন তাকে কাছে ডেকে নিত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সুভা' গল্পে বোবা বালিকা সুভার সঙ্গে পরিবারের বা গ্রামের মানুষজন বা সমবয়সি ছেলেমেয়েদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পরিচয় সেভাবে ফুটে ওঠেনি। অথচ, তাদের গোয়ালঘরের দুটি বোবা পশু, গাত্তি সর্বশী ও পাঙ্গুলির সঙ্গে তার অন্তরঙ্গতার ছবি গল্পে ধরা পড়েছে। সুভার মুখে কখনও তারা তাদের নাম শোনেনি, অথচ তার পায়ের শব্দেই তারা তার উপস্থিতি টের পেত। তাদের প্রতি সুভার অনুভূতিটি তারা স্পষ্ট বুঝত।সারাদিনে নিয়মিতভাবে সুভা তাদের কাছে যাতায়াত করত। তাদের আদর করে আসত যেমন, তেমনি দুঃখ-কষ্টে সান্ত্বনাও খুঁজতে হাজির হত তাদের কাছে। গাড়ি দুটিও যথাসাধ্য তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করত।

এ ছাড়া ছাগল, বিড়ালছানারাও সুভার প্রতি যথেষ্ট আনুগত্য প্রকাশ করত। বিশেষত বিড়ালছানাটি দিনেরাতে সুভার কোলে উঠে ঘুমোনোর আয়োজন করত। সুভা তার ঘাড়েপিঠে নরম হাত বুলিয়ে দিলে যে তার ঘুম আসতে সুবিধা হবে, তা ইঙ্গিতে বলতে চাইত। কিন্তু সর্বশী ও পাঙ্গুলির সঙ্গে সুভার যে আন্তরিকতা গড়ে উঠেছিল, ছাগল বা বিড়ালছানার প্রতি তার তেমন গভীর বন্ধুত্বের অনুভূতি ছিল না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সুভা' গল্পে শুক্লা দ্বাদশীর রাত্রে সুভা তার শোওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে তার চিরপরিচিত গ্রামের শীর্ণ চঞ্চল নদীর পাড়ে নরম ঘাসের বিছানায় লুটিয়ে পড়েছিল। এভাবে লুটিয়ে পড়ে মূক বালিকা সুভা যেন ধরণিকে দু-হাতে ধরে বলতে চেয়েছিল, তিনি যেন তাকে গ্রাম ছেড়ে যেতে না দেন। সে যেমন দুই হাত বাড়িয়ে তাকে ধরেছে, মাতা ধরিত্রীও যেন তাকে দু-হাত বাড়িয়ে ধরে থাকেন।

অভিভাবকেরা তার বিয়ে দিতে চাইছেন সেটা সুভা বুঝতে পেরেছিল। সুভা তার গ্রামকে, গ্রামের উদার মুক্ত প্রকৃতিকে, পোষ্য প্রাণীগুলিকে অত্যন্ত ভালোবেসে অপরূপ মায়ায় জড়িয়ে পড়েছিল। তাই সে কোনো মূল্যেই তার শৈশব-কৈশোরের খেলার সঙ্গী এই গ্রামকে ছেড়ে যেতে চায়নি।

‘সুভা' গল্পের শেষ বাক্যটি হল—“এবার তাহার স্বামী চক্ষু এবং কর্ণেন্দ্রিয়ের দ্বারা পরীক্ষা করিয়া এক ভাষাবিশিষ্টা কন্যা বিবাহ করিয়া আনিল।”

পিতামাতার সঙ্গে সুভা কলকাতায় আসার পর একদিন যার সঙ্গে তার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছে, সে তার কন্ধুকে নিয়ে তাকে দেখতে আসে।

কাদতে থাকা সুভাকে পাত্রপক্ষ পছন্দ করেছিল। কিন্তু বিয়ের সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সবাই বুঝতে পারে যে নববধূ কথা বলতে পারে না। এ কথা কেউ বুঝল না যে এটা তার দোষ নয়। সে তো কাউকে প্রতারণা করেনি। শ্বশুরবাড়ির কেউ তার চোখের ভাষা বুঝতে পারেনি।

বালিকার কান্না দেখে একপ্রকার খুশি হয়ে যে পাত্র তাকে বিয়ে করেছিল, সেও সুভার মনের খবর পায়নি। তাই সে দ্বিতীয়বারে যুক্তিবোধের দ্বারা পরিচালিত হয়ে চোখে দেখে, কানে শোনে, কথা বলতে পারে—এমন মেয়েই বিয়ে করে আনল। মেয়েদের হেয় করার এই সামাজিক দিকটাই রবীন্দ্রনাথ গল্পের শেষ বাক্যটিতে ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

বীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা 'সুভা' গল্পে যেমন মানুষ এবং মনুষ্যেতর প্রাণীর বন্ধুত্বের কথা রয়েছে, এমন আরও কয়েকটি গল্প হল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কালাপাহাড়', প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের 'আদরিণী', শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'মহেশ' প্রভৃতি। কালাপাহাড় গল্পে সম্পন্ন কৃষক বংলালের তার মহিষদের প্রতি, ‘আদরিণী' গল্পে বৃদ্ধ জয়রাম মুখোপাধ্যায়ের ‘আদরিণী” হাতির প্রতি এবং ‘মহেশ' গল্পে আমিনা ও তার বাবার বোবা পশু বৃদ্ধ ষাঁড় মহেশের প্রতি অসামান্য ভালোবাসা সাহিত্যে অমর হয়ে রয়েছে।