একাদশ পাঠ ⇒ ভাঙার গান

পরাধীন ভারতবর্ষে অত্যাচারী ইংরেজ শাসক স্বাধীনতাসংগ্রামী ভারতীয়দের কারারুদ্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ভারতমাতার বীর বিপ্লবী সন্তানরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশের মুক্তির জন্য। সন্ত্রস্ত ইংরেজরা বিপ্লবীদের কারারুদ্ধ করে দমন করতে চেয়েছিলেন সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামকে। শোষক ইংরেজদের অত্যাচারে বিপ্লবীদের অনেক রক্ত ঝরেছে। শাসক ইংরেজের অত্যাচারে কারাগারে। লেগেছে রক্ত। আর বিপ্লবীদের রক্ত লেগে থাকা সেই কারাগারই কবির কাছে হয়েছে দেশমাতৃকার পূজার পাষাণ বেদি, যাতে শহিদের রক্ত জমাট হয়ে আছে।

ঈশান হলেন ধ্বংস ও সৃষ্টির দেবতা শিব। জরাজীর্ণকে, অশুভকে বিনাশ করার জন্য তিনি যখন প্রলয় নৃত্য করেছিলেন, তার আগে বাজিয়েছিলেন বিষাণ অর্থাৎ শিঙা। কবি নবীন বিপ্লবীদের ঈশানের সঙ্গে তুলনা করে ইংরেজশাসন বিনাশের বিষাণ বাজাতে বলেছেন। দেশমাতার মুক্তির জন্য যেসব ভারতসন্তান সংগ্রাম করছেন তাঁদের ওপর অত্যাচার করে, তাঁদের কারারুদ্ধ করে ইংরেজরা তাঁদের স্বাধীনতা- স্পৃহাকে দমন করতে চাইছে। তাই তরুণ ঈশানকে অশুভ ইংরেজ শাসনের ধ্বংসের জন্য প্রলয় বিষাণ বাজাতে হবে।

পরাধীন ভারতবর্ষ ইংরেজদের শাসন-শোষণ-অত্যাচারে জর্জরিত। তাই দেশের সুসন্তানরা দেশকে স্বাধীন  করার ব্রত নিয়েছেন। বিদ্রোহী বিপ্লবী তরুণদের শৃঙ্খলিত কারারুদ্ধ করছে অত্যাচারী শাসক। কবি চান, কারাগারের লৌহকপাট ভাঙতে অর্থাৎ ইংরেজদের অধীনতা অস্বীকার করতে এবং শাসকের প্রতি ভয়ভক্তির অভ্যস্ত বেড়াজাল ছিন্ন করতে ধ্বংস নিশান ওড়াতে হবে। আর তাহলেই সত্য, মানবতা ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে। তাই কবি ধ্বংসের নিশান ওড়াতে এত উৎসাহ দিয়েছেন।

বাংলা বছরের শেষ মাসের শেষদিনে অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তিতে দেবাদিদেব শিবের পূজাকে কেন্দ্র করে গাজন উৎসব হয়। এটি একটি লৌকিক উৎসব। একে চড়কপূজাও বলা হয়। এই পার্বন উপলক্ষ্যে গ্রামবাংলায় মেলাও বসে। গাজনের উৎসবে ঢাক, ঢোল, কাঁসি, বাঁশি ইত্যাদি দেশি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে প্রলয়ের দেবতা শিবকে বন্দনা করা হয়।

চৈত্রসংক্রান্তিতে প্রলয়ের দেবতা শিবের পুজো হয়, যা গ্রামবাংলায় গাজন নামে পরিচিত। এই গাজনের বাজনা বাজিয়েই কবি চেয়েছেন বিপ্লবী যুবশক্তি ইংরেজের কারাগারের প্রাচীরকে ভেঙে দিক, প্রতিষ্ঠা করুক ‘মুক্ত স্বাধীন সত্য’-এর। গাজনের বাজনার মধ্যে প্রলয়ের যে ইঙ্গিত আছে তাকেই স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণের জন্য কবি ব্যবহার করেছেন।

যা মানবতার অনুকূল, তা-ই সত্য। সত্য সর্বদা মুক্ত এবং স্বাধীন। মানবতাবিরোধী কার্যকলাপ তাকে কলুষিত করতে চাইলেও শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়। সত্যকে জগতের কোনো কারাগারে বন্দি করা যায় না। সেই সত্যমন্ত্রে উজ্জীবিত, মানবতার মন্ত্রে দীক্ষিত দেশের মুক্তিকামী তরুণদের ইংরেজ শাসক কারাগারের অন্তরালে রাখতে পারবে না, ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে পারবে না। ব্যক্তিকে ফাঁসি দেওয়া ব্যক্তিকে ফাঁসি দেওয়া যায় বা সাজা দেওয়া যায়  কিন্তু সত্য- আদর্শ সমস্ত শাস্তির ঊর্ধ্বে।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ নামাঙ্কিত গানটি যে মূলগ্রন্থ থেকে আহরিত হয়েছে সেটির নামও ‘ভাঙার গান' (১৯২৪)। এই বইয়ের প্রথম রচনাটিই 'ভাঙার গান' এবং সমগ্র বইটির নাম এই প্রথম রচনাটির নামেই চিহ্নিত। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ সম্পাদিত 'বাঙ্গালার কথা' সাপ্তাহিক পত্রিকায়
১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২০ জানুয়ারি গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

শিরোনামের মধ্যে অনেক সময় কোনো সাহিত্যসৃষ্টির মর্মকথা আভাসিত হয়। আলোচ্য গানটির নামকরণেও এর মর্মকথা এবং কবির মনোভঙ্গির আভাস পাওয়া যায়। অসহযোগ আন্দোলনের সময় রচিত এ গানে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে কারারুদ্ধ স্বাধীনতাসংগ্রামীদের মুক্তি তথা স্বদেশের মুক্তির দুর্বার সংকল্প প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম পঙ্ক্তিতেই কবি ভাঙার কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন—

“কারার ওই লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট”।
শেষের আগের পঙ্ক্তিতে বলেছেন-
“লাথি মার ভাঙরে তালা”।

এই দুটি দৃষ্টান্তে ভাঙার প্রসঙ্গ সরাসরি রয়েছে। এ ছাড়া গানটির সর্বত্র ভাঙা বা ধ্বংসের অনুরণন লক্ষ করা যায়। বলিষ্ঠ বিদ্রোহের মাধ্যমে কারার লৌহকপাট ভেঙে লোপাট করে, তার প্রাচীর ভেদ করে ধ্বংসনিশান ওড়ানোর ডাক দিয়েছেন কবি। তিনি চেয়েছেন ঈশানের মতো প্রলয় বিষাণ বাজিয়ে,
ভোলানাথের মতো তাণ্ডব নৃত্যে শাসকের সমস্ত চক্রান্ত ধূলিসাৎ করে দিক নবযুগের নওজোয়ানেরা। অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের হাড় হিম করে দিতে বলিষ্ঠ হাঁক ছাড়ুক বিপ্লবীরা। মৃত্যুকে ডেকে আনুক জীবনপানে। গোটা দেশটাই যেন এক বন্দিশালা। বিদ্রোহের আগুনে এই বন্দিশালাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে, শুভ, সুন্দর, স্বাধীন দেশ গঠনের জন্যই কবির এই ভাঙার ডাক।
সমগ্র গানটিতে ভাঙার কথা এত প্রকটভাবে আছে বলেই ‘ভাঙার গান' শিরোনামটি সুপ্রযুক্ত হয় তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে

'ভাঙার গান' পাঠ্যাংশটি গানটি কাজী নজরুল ইসলাম অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে রচনা করেছিলেন ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে। এই গানটিতে পরাধীন দেশজননীর শৃঙ্খলমোচনের কথা বিদ্রোহাত্মক ভঙ্গিতে প্রকাশিত হয়েছে। অত্যাচারী ইংরেজ শাসক স্বাধীনতাসংগ্রামীদের কারারুদ্ধ করেছে। কবি সেই কারাগারের লৌহকপাট ভেঙে লোপাট করার ডাক দিয়েছেন। ইংরেজের অত্যাচারে দেশমাতার পূজার বেদি রক্তে রাঙা। বিদেশি শাসক স্বদেশপ্রেমীদের গলায় ফাঁসির দড়ি পরাতে চায় কিন্তু তারা জানে না বিপ্লবী বীরদের মৃত্যু নেই, তাঁরা মৃত্যুঞ্জয়ী। রুদ্র মহেশ্বরের মতো, খ্যাপা ভোলানাথের মতো প্রলয় নৃত্যে
সমস্ত বন্ধন চূর্ণ করে তরুণ দেশপ্রেমীরা স্বদেশকে মুক্ত করবেই। অর্থাৎ পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন হবে। তীব্র ঘৃণার পদাঘাতে ভেঙে পড়বে ভীমকারার তালা। গোটা দেশটাই আজ যেন এক কারাগার। সেই কারাগার থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন কবি। তিনি বিশ্বাস করেন, জাতীয়চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ ভারতবাসী দেশজননীকে সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত করবেই।

কাজী নজরুল ইসলাম প্রখরভাবে যুগ-সচেতন কবি। তিনি অন্যত্র স্বয়ং বলেছেন

“বর্তমানের কবি আমি ভাই ভবিষ্যতের নই নবি”।

অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রচিত 'ভাঙার গান’-এ গানে কবি বিদ্রোহের বার্তা দিয়েছেন। এই গানে কবির সমকাল অর্থাৎ বিশ শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূর্ত হয়ে উঠেছে। স্বদেশের মুক্তিকামী বিপ্লবীদের কারারুদ্ধ করা, ফাঁসিতে ঝোলানো, ভয় দেখানো, অত্যাচার করা ইত্যাদির বিরুদ্ধে কবি দেশের তরুণ সমাজকে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তরুণ বিপ্লবীরা মুক্ত স্বাধীন সত্যের সাধক। সত্যকে কেউ সাজা দিতে পারে না। তাই অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের কারাগারের লৌহকপাট ভেঙে ফেলতে তরুণদের ডাক দিয়েছেন কবি।

দেশমাতার বন্ধনমোচনের গান গেয়েছেন স্বদেশপ্রেমী নজরুল। অত্যাচারী বিদেশি শাসকদের হাতে বন্দি দেশজননী। তাঁকে মুক্ত করার জন্য দেশমাতার সুসন্তান সশস্ত্র বিপ্লবীদের উৎসাহ জুগিয়ে কবি বলেছেন—

“লাথি মার ভাঙরে তালা, যত সব বন্দিশালায়
আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা ফেল উপাড়ি।”

দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি আছেন যেসব বীরসন্তান, তাঁদের মুক্ত করতে হবে। শুধু তাই নয়, পুরো দেশটাই যেন এক কারাগার। সেখান থেকে মুক্তি দিতে হবে সমগ্র দেশবাসীকে। তাই কবি তরুণ দেশপ্রেমীদের ‘কারার ওই লৌহকপাট’ ভেঙে ফেলার ডাক দিয়েছেন। এভাবেই কবির স্বদেশ ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে।