চতুর্থ অধ্যায় ⇒ অভিব্যাক্তি ও অভিযোজন

   জীবনের জৈব রাসায়নিক উৎপত্তি সম্পর্কে মিলার ও উরের পরীক্ষা : একটি সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানী নিলার এবং উরে 1953 খ্রিস্টাব্দে জীবনের জৈব রাসায়নিক উৎপত্তি সম্পর্কে মতবাদের সত্যতা প্রমা করেছিলেন। পরীক্ষা চলাকালীন তাঁরা পরীক্ষ পরিবেশ তৈরি করেন তার সঙ্গে আদিন পৃথিবীর পরিবেশের প্রায় নিল ছিল। পরীক্ষাগারের যন্ত্রটি ফ্রান্সসহ কাচের না দিয়ে তৈরি। তাঁরা প্রথনে যন্ত্রটি নির্জীব বা বায়ুশূন্য করে তার মধ্যে স্টিন, মিথেন হাইড্রোজেন ও অ্যামেনিয়া গ্যাসের মিশ্রণ প্রবেশ করান। যন্ত্রটিতে মুক্ত অক্সিজেনও ছিল না। তারপর উল্লিখিত গ্যাসগুলিকে উত্তপ্ত করে বাষ্প সৃষ্টি করা হয়। যাতে যন্ত্রটির ভিতরের সংবহন ব্যবস্থা ভালো হয়। এরপর ইলেকট্রোডের মাধ্যমে তড়িৎ বিচ্ছুরণ সৃষ্টি করে যন্ত্রের গ্যাস প্রকোষ্ঠে শক্তি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। আদি পৃথিবীতে গ্যাস, তাপ, বৃষ্টিপাত, আলোক বিচ্ছুরণ ঠিক যা-যা ছিল সেই শর্তগুলি মেনে এক সপ্তাহের বেশি নিরবচ্ছিন্নভাবে পরীক্ষা করা হয় ।

পর্যবেক্ষণ : পরীক্ষার শেষে উৎপাদিত বস্তুগুলিকে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় জীবন সৃষ্টিতে যেসব রাসায়নিক বস্তুগুলি প্রয়োজন হয়েছিল এখানেও সেইসব রাসায়নিক পদার্থের সৃষ্টি হয়েছে। রাসায়নিক বস্তুগুলি প্রধানত অ্যামাইনো অ্যাসিড (অ্যালানিন, মাইসিন, অ্যাসপারটিক আসিড ইত্যাদি), বিভিন্ন শর্করা ও অ্যালডিহাইড ইত্যাদি। এইসব জৈব অণু হল জীবন সৃষ্টির প্রথম পদক্ষেপ।

সিদ্ধান্ত:(i) অজীবীয় বস্তু থেকে অজীবীয় সংশ্লেষণের মাধ্যমে জৈব বস্তু ও জীবন সৃষ্টি হয়েছিল। (ii) আদি সম্ভবত পৃথিবীতে কোশের মতো পদার্থ একইভাবে সৃষ্টি হয়েছিল। (iii) তাপশক্তি, তড়িৎশক্তি ও UV রশ্মির প্রভাবে CH4, NH3, H2O থেকে জটিল জৈব যোগ উৎপন্ন হয় যা সমুদ্রে গরম তরল সুপ তৈরি করে যা থেকে কোয়াসারভেট ও প্রাণ সৃষ্টি হয়।

রাসায়নিক বিবর্তন : পৃথিবীতে জীবন সৃষ্টির অনেক আগে বিভিন্ন মৌলের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় জল (H2O), মিথেন (CH4), অ্যামোনিয়া (NH3), কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2), হাইড্রোজেন সায়ানাইড (HCN) প্রভৃতি অণু সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে সূর্যরশ্মি, বজ্রপাত, বিদ্যুৎ শক্তির প্রভাবে উক্ত যৌগগুলির মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি হয় অ্যামাইনো অ্যাসিড, পিউরিন, পিরিমিডিন ও শর্করা। পরবর্তী পর্যায়ে সৃষ্টি হয় প্রোটিন, নিউক্লিক অ্যাসিড ও পলিস্যাকারাইড। এইভাবে বিভিন্ন মৌল থেকে পর্যায়ক্রমে উপরিউক্ত জটিল জৈব যৌগের সৃষ্টিকে রাসায়নিক বিবর্তন বলে। শুরু হয় জৈব বিবর্তন।

জৈব অভিব্যক্তি : জৈব অভিব্যক্তি সম্পর্কে যেসব প্রমাণগুলি আছে সেগুলি হল- ((i)জীবাশ্মঘটিত প্রমাণ: উদাহরণ—আর্কিওপটেরিক্স। (ii)অভাসংস্থানঘটিত প্রমাণ – (a) সমসংস্থ অঙ্গ, উদাহরণ- পাখি ও বাদুড়ের ডানা। (b) সমবৃত্তীয় অঙ্গ, উদাহরণ- তিমির ফ্লিপার ও মাছের পাখনা। (c) নিষ্ক্রিয় অঙ্গ, উদাহরণ-অ্যাপেনডিক্স। (d) তুলনামূলক শারীরস্থানঘটিত প্রমাণ। উদাহরণ-বিভিন্ন প্রাণীর অগ্রপদের গঠন। ভ্রুণতত্ত্বঘটিত প্রমাণ, উদাহরণ বিভিন্ন প্রকার ভ্রুণের গঠন প্রভৃতি।

বিবর্তন সম্পর্কে ল্যামার্কের মতবাদ :  জে বি ল্যামার্ক (1809) জৈব অভিব্যক্তির ওপর যে বিশ্লেষণী তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন তা তাঁর লেখা বই 'ফিলোসফিক জুওলজিক'-এ লিপিবদ্ধ করেন। ল্যামার্কের তত্ত্বকে ল্যামার্কবাদ বলা হয়।

ল্যামার্কের বিবর্তনতত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি নীচে আলোচনা করা হল-

(i)পরিবেশের প্রভাব ও জীবের সচেষ্টতা : সদা পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সকল জীব সর্বদা সচেষ্ট হয়—এটি জীবের সহজাত প্রবৃত্তি। ল্যামার্কের মতে, পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে সামস্য রক্ষার জন্য জীব সচেতনভাবে দেহের হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটাতে সক্ষম। এইভাবে অঙ্কের ক্ষয় অথবা অভিযোজন বিবর্তনের অন্যতম কারণ। এটি জীবের অর্জিত বৈশিষ্ট্য (acquired character) |

(ii)ব্যবহার ও অব্যবহার সূত্র : ল্যামার্কের মতে জীবদেহের কোনো অঙ্গ ক্রমাগত ব্যবহার হতে থাকলে সেই অঙ্গটি শক্তিশালী, সরল ও সুগঠিত হবে। আবার দীর্ঘদিন অব্যবহারের ফলে যে-কোনো অঙ্গ দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় হতে হতে অবশেষে অবলুপ্ত হবে।

ব্যবহারের সপক্ষে উদাহরণ: জিরাফের পূর্বপুরুষদের গ্রীবা ঘোড়ার গ্রীবার মতোই ছোটো ছিল। কিন্তু কালক্রমে খাদ্য হিসেবে লম্বা গাছের পাতা সংগ্রহের ক্রমাগত চেষ্টার ফলে জিরাফের গ্রীবা লম্বা হয়েছে।

অব্যবহারের সূত্রের উদাহরণ:  অতীতে উড়তে সক্ষম উট পাখির ডানা ক্রমাগত অব্যবহারের ফলে বর্তমানের ক্ষুদ্রাকার নিষ্ক্রিয় ডানায় পরিণত হয়েছে। সাপের পূর্বপুরুষের গিরগিটির মতো চারটি পা ছিল। কয়েক হাজার বছর ধরে অব্যবহরের ফলে ভূগর্ভ অভিযোজনের জন্য সাপের পা অবলুপ্ত হয়েছে।

(iii)অর্জিত বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলির বংশানুসরণ: ল্যামার্কের মতে, কোনো জীবের জীবনকালে জীব যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য বা গুণ অর্জন করে, সেগুলি এক জনু থেকে পরবর্তী জনুতে বংশানুক্রমে সম্মানিত হয়।  উদাহরণঃ  ক্রমাগত গাছের উঁচু ডালের পাতা যাওয়ার চেষ্টার ফলে সৃষ্ট লম্বা গলা হল জিরাফের অর্জিত বৈশিষ্ট্য। ল্যামার্কের মতে, এই অর্জিত বৈশিষ্ট্যটি বংশপরম্পরায় সম্ভাবিত হয়ে আধুনিক লম্বা গ্রীবাযুক্ত জিরাফের আবির্ভাব ঘটেছে।।

(iv) নতুন প্রজাতির উত্তরঃ অর্জিত গুণাবলির বংশানুসরণের জন্য প্রতিটি জনুতে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জিত হওয়ার ফলে প্রজাতির মধ্যে পরিবর্তন আসে এবং ধীরে ধীরে অপর একটি নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়। ল্যামার্কের মতে, এটিই হল বিবর্তনের মূল কারণ।

জৈর বিবর্তনের সপক্ষে ডারউইনের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় : ডারউইনের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি নীচে আলোচনা করা হল -

(i) অত্যধিক হারে বংশবৃদ্ধি : প্রত্যেক প্রজাতির জীব জ্যামিতিক ও গাণিতিক অনুপাতে বংশবৃদ্ধি করে। এটি জীবের সহজাত বৈশিষ্ট্য। উহ একটি স্ত্রী স্যালমন মাছ প্রজনন ঋতুতে প্রায় ও কোটি ডিম পাড়ে। ঝিনুক একবারে প্রায় 12 কোটি ডিম্বাণু উৎপাদন করে।

(ii)  সীমিত খাদা ও বাসস্থান ভূপৃষ্ঠের আয়তন নির্দিষ্ট থাকায় জীবের বাসস্থান ও খাদ্যও সীমিত হয়ে থাকে।

(iii) অস্তিত্বের জন্য জীবন সংগ্রাম পৃথিবীতে মান্য ও বাসস্থানের সীমাবদ্ধতার জন্য সমস্ত জীবই বেঁচে থাকে। না। যারা কেবল জীবন সংগ্রামে জয়ী হয়, তারাই পৃথিবীতে বেঁচে থাকে। ডারউইন এই ধরনের সংগ্রামকে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম' বলে অভিহিত করে।

এই সংগ্রাম তিন প্রকারের-  (a) অন্তঃপ্রজাতির সংগ্রাম (Intraspecific Struggle) একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্যদের খাদ্য ও বাসস্থান একই রকমের হওয়ায়, এদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে নিজেদের মধ্যে যে সংগ্রাম শুরু হয় তা হল অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম বা স্বপ্রজাতির সংগ্রাম। উদাহরণ : হরিশ শিকারের জন্য বাঘেদের মধ্যে যে সংগ্রাম দেখা যায় ।

(b)অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম (Interspecific Struggle) : খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য যে-কোনো দুই বা ততোধিক র জন্য যে সংগ্রাম দেখা যায় তা হল। বা বিষণ্ন প্রজাতির মধ্যে। সংগ্রাম। উদাহরণ ব্যাং একদিকে ক্ষণ করে, অন্যদিকে তেমন ব্যাঙেরা সাপ  কর্তৃক ভক্ষিত হয়। আবার মর কর্তৃক ব্যাং ও সাপ উভয়ই  ভক্ষিত হয়। এইভাবে জৈবিক কারণে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে মান্য মাদক সম্পর্কযুক্ত এক জীবন সংগ্রাম গড়ে ওঠে। (c)পরিবেশগত সংজ্ঞান (Environmental Struggle)খরা , বন্যা, ভুমিকম্প প্রভৃতি প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে জীবতে সংগ্রাম করে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়। উত্তর ও মধ্য কোয়েল পাখি প্রচন্ড ঠান্ডা ও তুষারপাতের ফলেই লুপ্ত হয়েছে ।

(iv) প্রকরণ বা ভেদ বা পরিবেক্তি : একই প্রজা সকল জীব একই রকম হয় না, তার কারণ বা ভেন ডারউইন মনে করেন অবিরত বিবিধ (প্রতি, প্রতি ও পরিবেশজনিত সংক্রান জীব লিপ্ত থাকার ফলে জীবনের মধ্যে যে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়, তা প্রজননকালে অপত্যের দেহে সদারিত হয়। কোনো কোনো প্রকরণ জীবকে জীবন সংগ্রামে সাহায্য করে, জীবন সংগ্রামে সহায়ক প্রকরণকে অনুকূল প্রকরণ বলে। প্রতিকূল প্রকরণ জীবন সংগ্রামে সহায়ক নয়। ডারউইনের মতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধারাবাহিক পরিবর্তন প্রজাতি সৃষ্টি করে। আকস্মিক হঠাৎ পরিবর্তন হল প্রকৃতির ওপর এর প্রভাব নেই।

(v)  যোগ্যতমের উদবর্তন : প্রকরণের ওপর ভিত্তি করে ডারউইন বলেন অনুকূল প্রকরণযুক্ত জীবেরা প্রকৃতির যারা যোগ্যতম বিবেচিত হওয়ায় ভারা পৃথিবীতে টিকে থাকে এবং পুনরায় বংশবিস্তার করে জীবের সংখ্যা বৃদ্ধি করে, অপরপক্ষে প্রতিকূল প্রকরণযুক্ত জীবেরা প্রকৃতির দ্বারা অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় তারা ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়। উদাহরণ মেরু অঞ্চলের বড়ো গোমযুক্ত কুকুর সেই দেশে বসবাসের যোগ্য হলেও   গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে বসবাসের অযোগ্য।

(V) প্রকৃতির নির্বাচন : ডারউইনের মতবাদের এই প্রতিদানটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন সংগ্রামের মাধ্যমে যোগ্যতমের নির্বাচনকেই ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচন বলেছেন। প্রকৃতিই যোগ্যতম জীবকে নির্বাচন করে। প্রাকৃতিক নির্বাচনে যারা অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার পায় তারা অধিক সংখ্যায় বেঁচে থাকে ও বংশবিস্তার করে এবং তাদের সন্তান-সন্ততিরা উত্তরাধিকার সূত্রে অনুকূল প্রকরণগুলি লাভ করে।

(v) নতুন প্রজাতির সৃষ্টি : কয়েক প্রজন্ম ধরে যদি কোনো প্রজাতির মধ্যে কোনো বিশেষ জীবগোষ্ঠী অর্থাৎ কেবল যোগ্যতমরাই অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার লাভ করে এবং বাকিরা অবলুপ্ত হয়ে যায়। তাহলে অনুকূল প্রকরণগুলি ওই বিশেষ জীবগোষ্ঠীতে পুঞ্জীভূত হওয়ায় পূর্বপুরুষ ও উত্তরপুরুষের মধ্যে বৈশিষ্ট্যের অনেক পার্থক্য দেখা যায় এবং এই বৈসাদৃশ্যযুক্ত উত্তর পুরুষই নতুন প্রজাতিরূপে চিহ্নিত হয়।

জৈর বিবর্তনের সপক্ষে ডারউইনের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় : ডারউইনের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি নীচে আলোচনা করা হল -

(i) অত্যধিক হারে বংশবৃদ্ধি : প্রত্যেক প্রজাতির জীব জ্যামিতিক ও গাণিতিক অনুপাতে বংশবৃদ্ধি করে। এটি জীবের সহজাত বৈশিষ্ট্য। উহ একটি স্ত্রী স্যালমন মাছ প্রজনন ঋতুতে প্রায় ও কোটি ডিম পাড়ে। ঝিনুক একবারে প্রায় 12 কোটি ডিম্বাণু উৎপাদন করে।

(ii)  সীমিত খাদা ও বাসস্থান ভূপৃষ্ঠের আয়তন নির্দিষ্ট থাকায় জীবের বাসস্থান ও খাদ্যও সীমিত হয়ে থাকে।

(iii) অস্তিত্বের জন্য জীবন সংগ্রাম পৃথিবীতে মান্য ও বাসস্থানের সীমাবদ্ধতার জন্য সমস্ত জীবই বেঁচে থাকে। না। যারা কেবল জীবন সংগ্রামে জয়ী হয়, তারাই পৃথিবীতে বেঁচে থাকে। ডারউইন এই ধরনের সংগ্রামকে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম' বলে অভিহিত করে।

এই সংগ্রাম তিন প্রকারের-  (a) অন্তঃপ্রজাতির সংগ্রাম (Intraspecific Struggle) একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্যদের খাদ্য ও বাসস্থান একই রকমের হওয়ায়, এদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে নিজেদের মধ্যে যে সংগ্রাম শুরু হয় তা হল অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম বা স্বপ্রজাতির সংগ্রাম। উদাহরণ : হরিশ শিকারের জন্য বাঘেদের মধ্যে যে সংগ্রাম দেখা যায় ।

(b)অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম (Interspecific Struggle) : খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য যে-কোনো দুই বা ততোধিক র জন্য যে সংগ্রাম দেখা যায় তা হল। বা বিষণ্ন প্রজাতির মধ্যে। সংগ্রাম। উদাহরণ ব্যাং একদিকে ক্ষণ করে, অন্যদিকে তেমন ব্যাঙেরা সাপ  কর্তৃক ভক্ষিত হয়। আবার মর কর্তৃক ব্যাং ও সাপ উভয়ই  ভক্ষিত হয়। এইভাবে জৈবিক কারণে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে মান্য মাদক সম্পর্কযুক্ত এক জীবন সংগ্রাম গড়ে ওঠে। (c)পরিবেশগত সংজ্ঞান (Environmental Struggle)খরা , বন্যা, ভুমিকম্প প্রভৃতি প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে জীবতে সংগ্রাম করে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়। উত্তর ও মধ্য কোয়েল পাখি প্রচন্ড ঠান্ডা ও তুষারপাতের ফলেই লুপ্ত হয়েছে ।

(iv) প্রকরণ বা ভেদ বা পরিবেক্তি : একই প্রজা সকল জীব একই রকম হয় না, তার কারণ বা ভেন ডারউইন মনে করেন অবিরত বিবিধ (প্রতি, প্রতি ও পরিবেশজনিত সংক্রান জীব লিপ্ত থাকার ফলে জীবনের মধ্যে যে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়, তা প্রজননকালে অপত্যের দেহে সদারিত হয়। কোনো কোনো প্রকরণ জীবকে জীবন সংগ্রামে সাহায্য করে, জীবন সংগ্রামে সহায়ক প্রকরণকে অনুকূল প্রকরণ বলে। প্রতিকূল প্রকরণ জীবন সংগ্রামে সহায়ক নয়। ডারউইনের মতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধারাবাহিক পরিবর্তন প্রজাতি সৃষ্টি করে। আকস্মিক হঠাৎ পরিবর্তন হল প্রকৃতির ওপর এর প্রভাব নেই।

(v)  যোগ্যতমের উদবর্তন : প্রকরণের ওপর ভিত্তি করে ডারউইন বলেন অনুকূল প্রকরণযুক্ত জীবেরা প্রকৃতির যারা যোগ্যতম বিবেচিত হওয়ায় ভারা পৃথিবীতে টিকে থাকে এবং পুনরায় বংশবিস্তার করে জীবের সংখ্যা বৃদ্ধি করে, অপরপক্ষে প্রতিকূল প্রকরণযুক্ত জীবেরা প্রকৃতির দ্বারা অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় তারা ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়। উদাহরণ মেরু অঞ্চলের বড়ো গোমযুক্ত কুকুর সেই দেশে বসবাসের যোগ্য হলেও   গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে বসবাসের অযোগ্য।

(V) প্রকৃতির নির্বাচন : ডারউইনের মতবাদের এই প্রতিদানটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন সংগ্রামের মাধ্যমে যোগ্যতমের নির্বাচনকেই ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচন বলেছেন। প্রকৃতিই যোগ্যতম জীবকে নির্বাচন করে। প্রাকৃতিক নির্বাচনে যারা অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার পায় তারা অধিক সংখ্যায় বেঁচে থাকে ও বংশবিস্তার করে এবং তাদের সন্তান-সন্ততিরা উত্তরাধিকার সূত্রে অনুকূল প্রকরণগুলি লাভ করে।

(v) নতুন প্রজাতির সৃষ্টি : কয়েক প্রজন্ম ধরে যদি কোনো প্রজাতির মধ্যে কোনো বিশেষ জীবগোষ্ঠী অর্থাৎ কেবল যোগ্যতমরাই অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার লাভ করে এবং বাকিরা অবলুপ্ত হয়ে যায়। তাহলে অনুকূল প্রকরণগুলি ওই বিশেষ জীবগোষ্ঠীতে পুঞ্জীভূত হওয়ায় পূর্বপুরুষ ও উত্তরপুরুষের মধ্যে বৈশিষ্ট্যের অনেক পার্থক্য দেখা যায় এবং এই বৈসাদৃশ্যযুক্ত উত্তর পুরুষই নতুন প্রজাতিরূপে চিহ্নিত হয়।

উদাহরণ:  ডারউইনের মতে বহু বছর আগে জিরাফের পূর্বপুরুষের গ্রীবাদেশ ও অগ্রপদের দৈর্ঘ্যের মধ্যে ভেদ বা পার্থক্য ছিল। কিছুসংখ্যক জিরাফের তাঁরা ও অগ্রপদ ছিল বেশ দীর্ঘ, কিছু সংখ্যক জিরাফের গ্রীবা ও অগ্রপদ ছিল বেশ দীর্ঘ, কিছু সংখ্যক জিরাফের ধারা ও অগ্রপদ ছিল মাঝারি প্রকৃতির, আবার বেশ কিছু সংখ্যক জিরাফের গ্রীবা ও অগ্রপদ ছিল খর্ব প্রকৃতির। দীর্ঘ গ্রীবা ও অগ্রপদযুক্ত জিরাফেরা উঁচু গাছের ডালপালা খেয়ে সহজেই প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছিল। এরা খর্ব গ্রীবা ও খর্ব অগ্রপদযুক্ত জিরাফের তুলনায় প্রকৃতির কাছে যোগাতম ছিল। এই কারণে এরা প্রকৃতির দ্বারা নির্বাচিত হয় এবং ক্রমাগত প্রজননের দ্বারা দীর্ঘ গ্রীবা ও অগ্রপদযুক্ত জিরাফের নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়।

জৈব অভিব্যক্তিতে সমবৃত্তীয় অঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা: প্রাণীর ক্ষেত্রে পতশের (আরশোলার) ডানা, পাখির ডানা ও বাদুড়ের ডানা (পার্টিাডিয়াম ) – পতঙ্গের ডানা বহিঃকঙ্কালের রূপান্তর, পাখির ডানা তাদের অগ্রপদের বাদুড়ের প্যাটাজিয়াম হল অগ্রপদ ও পশ্চাৎপদের মধ্যবর্তী চামড়ার প্রসারিত উপবৃদ্ধি। এই অঙ্গগুলির উৎপত্তি ও গঠন আলাদা, কিন্তু প্রত্যেকের কাজ উড়তে সাহায্য করা।

উদ্ভিদের ক্ষেত্রে-  ঝুমকোলতার আকর্ষ ও মটর গাছের আকর্ষ। এই দুটি অঙ্গের উৎপত্তি ও গঠন আলাদা হলেও প্রত্যেকে উদ্ভিদকে আরোহণে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে ঝুমকোলতার আকর্ষ কাক্ষিক মুকুলের রূপান্তর এবং মটর গাছের আকর্ষ যৌগিক পত্রের পত্রকের রূপান্তর।

সুতরাং, উপরিউক্ত আলোচনা থেকে জানা যে, জীবগুলির একই পরিবেশে বসবাস করার জন্য তাদের অল্যের সাদৃশ্যযুক্ত পরিবর্তন ঘটেছে। এই তথ্য জৈব বিবর্তনকে সমর্থন করে। সমবৃত্তীয় অন্য অভিসারী বিবর্তনকে প্রমাণ করে।

সমবৃত্তীয় অঙ্গগুলি একই পরিবেশে একই রকম কাজ করার জন্য একইভাবে অভিযোজিত হয়েছে, এটি হল সমান্তরাল বিবর্তন।

সমসংস্থ অঙ্গ : জীবদেহের যে সকল অঙ্গগুলি আকৃতিগত এবং কার্যগতভাবে বিভিন্ন কিন্তু উৎপত্তিগত এবং গঠনগতভাবে একই প্রকার সেই অঙ্গগুলিকে সমসংস্থ অঙ্গ বলা হয় ।

জৈব অভিব্যক্তিতে সমসংস্থঅঙ্গের গুরুত্ব :প্রাণীর ক্ষেত্রে সমসংস্থ অঙ্গাগুলির, যেমন- তিমির , প্যাডেল, মানুষের হাত, বাদুড় ও পাখির ডানা ও ঘোড়ার অগ্রপদ প্রভৃতির অন্তঃকাঠামো বিশ্লেষণে সকলের ক্ষেত্রে হিউমেরাস, রেডিয়াস, আলনা, কারপাল, মেটাকারপাল অস্থি দেখা যায়। এই সকল অজাগুলির মধ্যে আপাত যে পার্থক্য দেখা যায় সেগুলি বিভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ধরনের কাজের জন্য ঘটেছে।

তিমির অগ্রপদ সাঁতার কাটার অঙ্কা, মানুষের হাত কোনো বস্তুকে ধরার জন্য, বাদুড় ও পাখির ডানা আকাশে উড়বার অভা, ঘোড়ার অগ্রপদ দৌড়াবার জন্য উপযুক্ত।

উদ্ভিদের ক্ষেত্রে : ফণীমনসার পর্ণকাণ্ড, শতমূলীর একক পর্ণকাণ্ড, হাতজোড়ার শাখা আকর্ষ, আলুর স্ফীতকন্দ, আদার গ্রন্থিকান্ড, এগুলি প্রত্যেকে পরিবর্তিত কাণ্ড। এদের উৎপত্তি এক কিন্তু কাজ আলাদা।  সমসংস্থ অঙ্গের সাদৃশ্য থেকে বোঝা যায় জীবগুলি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এদের উৎপত্তি একই হলেও ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বসবাসের কারণে বাহ্যিক পরিবর্তন বা বিবর্তন ঘটেছে। এই সকল কারণে বলা যায় যে, সমসংস্থ অঙ্গবিশিষ্ট জীবগুলির উৎপত্তি একই পূর্বপুরুষ থেকে ঘটেছে।

অর্থাৎ, সমসংস্থ অঙ্গগুলি অপসারী বিবর্তনকে নির্দেশ করে।

(i) ডারউইনবাদ বা ডারউইন তত্ত্বের ত্রুটি :  ডারউইন প্রকরণের কথা বললেও প্রকরণের ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।(ii) ডারউইন ছোটো ও অস্থায়ী প্রকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ওইগুলির বংশানুসরণ না হওয়ায় বিবর্তনে ওদের ভূমিকা নেই।(iii) যোগ্যতমের উদবর্তন-এর সঠিক ব্যাখ্যা তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয়নি। (iv) যোগা জীবেরা বেঁচে থাকলেও তাদের আবির্ভাবের কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেননি। (v) কোনো অঙ্কোর অভিস্বতন্ত্রীকরণে প্রজাতি বিলুপ্ত হয়। ডারউইনতত্ত্বে এর কোনো উল্লেখ নেই। ডারউইন মিউটেশনকে প্রকৃতির খেলা (Sports of Nature) বলে উপেক্ষা করেছেন।(vi) নিষ্ক্রিয় অকোর উৎপত্তি এর ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।(vii) প্রাকৃতিক নির্বাচন একমুখী। সেক্ষেত্রে অঙ্গের অত্যধিক বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটার ফলে একাধিক জীবনের বিলুপ্তি ঘটেছে (যেমন: এলক হরিণ)। (viii) জলজ প্রাণী কীভাবে স্থলজ প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছে, প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদ তার ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

আধুনিক সংশ্লেষণবাদ : ডারউইন মতবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরে প্রাকৃতিক নির্বাচনকে জীববিজ্ঞানীগণ অভিব্যক্তির মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত করেন। পরবর্তী সময়ে বংশগতি বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার ও উন্নতির সঙ্গে ধারণা পাওয়া গেল যে, জীবসৃষ্টির প্রধান কারণ কেবলমাত্র প্রাকৃতিক নির্বাচন নয়। তা ছাড়া ডারউইন মতবাদ যখন প্রকাশ হয়েছিল তখন বংশগতি বিজ্ঞান, জিন মিউটেশন ইত্যাদি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণার অভাব ছিল। তাই প্রকরণ ও প্রকরণের কারণ সম্পর্কে ধারণা ডারউইন দিতে ব্যর্থ হন। বর্তমানকালে প্রজনন বিদ্যার জ্ঞানের আলোকে ডারউইন মতবাদকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। যা হল আধুনিক সংশ্লেষণবাদ (Modern Synthetic theory)। অনেকে একে নয়া ডারউইনবাদও বলে।

 

 

তুলনামূলক অভ্যন্তরীণ অঙ্গসংস্থানগত প্রমাণ : নিম্নতর প্রাণী থেকে উচ্চতর প্রাণীদের দেহে বিভিন্ন অঙ্গগুলি গঠনগত ও কার্যগতভাবে অভিন্ন। কিন্তু পরিবেশের বিভিন্নতার জন্য তাদের দেহের সেই অাগুলি আপাতভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে, যদিও মৌলিক গঠন একই থেকে গেছে। একে তুলনামূলক অভ্যন্তরীণ অঙ্গসংস্থানগত প্রমাণ বলে।

জৈব অভিব্যক্তির সমর্থনে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের হূৎপিণ্ডের মৌলিক গঠনের তুলনামূলক আলোচনা : মাছ, উভচর (ব্যাং), সরীসৃপ (সাপ, টিকটিকি, গিরগিটি), পাখি, স্তন্যপায়ী (বাদুড়, মানুষ) প্রভৃতি মেরুদণ্ডী প্রাণীর হৃৎপিণ্ডের গঠন ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে যেসব বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তা হল -

(i)মাছের হৃৎপিণ্ড : মাছের হৃৎপিণ্ড দুই প্রকোষ্ঠযুক্ত, যেমন—একটি অলিন্দ ও একটি নিলয়। গঠন খুবই সরল ও জলে বাস করার পক্ষে উপযুক্ত। এইপ্রকার হূৎপিণ্ডকে ভেনাস হৃৎপিণ্ড বলে।

(ii) উভচরের হূৎপিণ্ড : এদের হূৎপিণ্ডটি তিন প্রকোষ্ঠযুক্ত, যেমন—দুটো অলিন্দ (বাম ও ডান) এবং একটি নিলয়। এই হৃৎপিণ্ডে দূষিত ও শুদ্ধ রক্তের মিশ্রণ ঘটে।

(iii) সরীসৃপের হৃৎপিণ্ড : সরীসৃপের হৃৎপিণ্ডটি উন্নত। দুটি অলিন্দ (বাম ও ডান) ও একটি অর্ধবিভক্ত নিলয়। (কুমিরের হৃৎপিণ্ডটি বাম নিলয় ও ডান নিলয়ে বিভক্ত)। এই হূৎপিণ্ডে দুষিত ও শুদ্ধ রক্তের মিশ্রণ রোধ করার প্রবণতা লক্ষণীয়।

(iv) পাখি ও নাপায়ীর হৃৎপিণ্ড : পাখি ও স্তন্যপায়ীর হূৎপিণ্ডটি চারটি প্রকোষ্ঠ নিয়ে গঠিত। এই হৃৎপিণ্ডে দূষিত ও শুদ্ধ রক্তের মিশ্রণ কখনোই ঘটে না।

 

 

No Content