চতুর্থ অধ্যায় ➤ জীববিদ্যা ও মানবকল্যাণ

অ্যান্টিজেন : যেসব বহিরাগত বস্তু জীবদেহে প্রবেশের মাধ্যমে দেহের অনাক্রম্যতা তন্ত্রকে উত্তেজিত করে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে, তাদের অ্যান্টিজেন বলে। অ্যান্টিজেন প্রধানত প্রোটিন, লিপিড বা শর্করা-জাতীয় হয়। যেমন— ভাইরাল প্রোটিন, প্যাথোজেনের দেহ-নিঃসৃত টক্সিন ইত্যাদি।

অ্যান্টিবডি: বাইরে থেকে প্রবিষ্ট অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর B- লিম্ফোসাইট কোশে যে গ্লোবিউলিন কণার সৃষ্টি হয়, তাকে অ্যান্টিবডি বলে।

সক্রিয় অনাক্রম্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

[1] ইমিউনোজেন প্রবেশ করার কিছু দিন পরে এই অনাক্রম্যতা কার্যকারী হয়।

[2] একবার কার্যকারী হলে বহুদিন পর্যন্ত এই ধরনের অনাক্রম্যতা স্থায়ী হয়।

[3] স্বাভাবিক রোগসংক্রমণ বা সক্রিয় টিকাকরণে এই ধরনের অনাক্রম্যতা গড়ে ওঠে।

অনাক্রম্যতা প্রক্রিয়াটির দুটি উদ্দেশ্য হল-

[1] মাইক্রোঅর্গানিজম বা অণুজীবদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা।

[2] ক্ষতিগ্রস্ত কোশের প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দেহকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করা।

প্যারাটোপ (Paratope): অ্যান্টিবডির যে অংশ অ্যান্টি জেনের সঙ্গে সংযোগস্থাপন করে, তাকে প্যারাটোপ বলে।  এপিটোপ (Epitope): অ্যান্টিজেনের যে অংশের সঙ্গে প্যারাটোপের সংযোগস্থাপিত হয়, তাকে এপিটোপ বলে।

অনাক্রম্য বিক্রিয়ায় শরীরে প্রবিষ্ট পূর্ব সম্পর্কহীন অণুজীব বা বিজাতীয় বস্তু দেহে প্রবেশের ফলে যে প্রতিরোধী ইমিউন রেসপন্স সৃষ্টি হয়, তাকে প্রাথমিক বা প্রাইমারি ইমিউন রেসপন্স বলে।

যেমন, প্রথমবার হাম বা জলবসন্ত দ্বারা আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির দেহে যে প্রতিরোধী ব্যবস্থা কার্যকারী হয়।

যে অনাক্রম্য বিক্রিয়ায় কোনো জীবাণু বা বিজাতীয় বস্তু শরীরে গৃহীত হওয়া মাত্র অতীত সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিরোধী ব্যবস্থা দ্বারা ধ্বংস হয়, দেহে সৃষ্ট এই ধরনের ইমিউন রেসপন্সকে গৌণ বা ইমিউন রেসপন্স বলে।

যেমন, যদি কোনো ব্যক্তি জলবসন্ত দ্বারা একবার আক্রান্ত হন, তবে তার দেহে এই রোগগুলির অ্যান্টিবডি চিরকাল স্থায়ী হবে। দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে সেকেন্ডারি ইমিউন রেসপন্স সৃষ্টি হবে।

 

 

আমাদের দেহের মধ্যে যে ব্যবস্থা সাধারণভাবে যে-কোনো পরজীবীর আক্রমণ প্রতিরোধ করে, সেই ব্যবস্থাপনাগুলিকে অনির্দিষ্ট অনাক্রম্যতা বলে। দেহের তাপ বৃদ্ধি করে জীবাণু দমন পদ্ধতি অনির্দিষ্ট অনাক্রম্যতার অন্তর্গত।

AIDS-এর সংক্রমণ নিম্নলিখিতভাবে ঘটে—[1] AIDS আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত কোনো সুস্থ ব্যক্তির দেহে সঞ্চারণের মাধ্যমে। [2] AIDS আক্রান্ত স্ত্রী অথবা পুরুষের সঙ্গে অন্য সুস্থ পুরুষ অথবা স্ত্রীর অসুরক্ষিত যৌন সংসর্গের মাধ্যমে। [3] সংক্রমিত ব্যক্তির দেহে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, নিডিল, ব্লেড ইত্যাদি অন্য কেউ ব্যবহার করলে। [4] সংক্রমিত গর্ভবতী মায়ের দেহ থেকে সন্তানের দেহে এই রোগ ছড়ায়।

নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণগুলি হল—

[1] এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি হয় এবং মাঝারি মানের জ্বর হয়।

[2] নাক দিয়ে সর্দি বের হয় এবং কাশির সঙ্গে কফ বের হয়।
[3] রোগীর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। শ্বাসের গতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এ ছাড়া রক্তচাপ কম থাকে, হৃৎস্পন্দনের হার বাড়ে।

[4] কিছু ক্ষেত্রে ঠোঁট, জিভ, হাতের ও পায়ের পাতা নীলচে রঙের হয়ে যায়।

[5] নিউমোনিয়ার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া বিঘ্নিত হয়।

[6] যথাসময়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করলে, রোগীর শ্বাসকার্য বন্ধ হয়ে আসে। অর্থাৎ, রেসপিরেটরি ফেলিওর (respiratory failure) হয়।

[7] এ ছাড়া ক্ষুধামান্দ্য, ক্লান্তি, বমিভাব, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, উদরাময় প্রভৃতি দেখা যায়।

ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ প্রধানত তিনভাবে হতে পারে—

[1] ভেক্টরের মাধ্যমে সংক্রমণ: ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো ব্যক্তিকে ইডিস মশকী কামড়ালে, ওই মশকীর দেহে ডেঙ্গু ভাইরাস প্রবেশ করে। পরবর্তীকালে সংক্রামিত ইডিস মশকী কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে, ওই সুস্থ ব্যক্তির দেহে ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে পারে।

[2] প্রত্যক্ষ সংক্রমণ : সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দেহে কোনো ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের রক্ত সঞ্চালন করলে সুস্থ মানুষটি ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

প্রতিষেধণ বা অনাক্রম্যতা

যে পদ্ধতিতে প্রাণীদেহে পরজীবীর আক্রমণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সৃষ্টি করা হয়, তাকে প্রতিষেধণ বা অনাক্রম্যতা বলে।

অনাক্রম্যতার প্রকারভেদ

প্রতিষেষণ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতাকে প্রধানত দুভাগে ভাগ করা যায়।যথা-

1 সহজাত অনাক্রম্যতাঃ যে অনাক্রম্যতা জন্মগতভাবে পাওয়া যায় সহজাত অনাক্রম্যতা বলে। এইজাতীয় অনাক্রম্যতা ব্যক্তির জিনের গঠননির্ভর হয়। এই অনাক্রম্যতা সারাজীবন কার্যকরী থাকে। আমাদের দেহের ত্বক, শ্লেষ্মাপদ,পাকস্থলীর HCI এই ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

2 অর্জিত অনাক্রম্যতাঃ যে অনাক্রম্যতা জন্মের পর রোগজীবাণুর আক্রমণ প্রতিরোধের মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাকে অর্জিত অনাক্রম্যতা বলে। এই ধরনের অনাক্রম্যতা আবার দুই ভাগে ভাগ [A] স্বাভাবিকভাবে অর্জিত অনাক্রম্যতা এবং [B] কৃত্রিমভাবে অর্জিত অনাক্রম্যতা।

স্বাভাবিকভাবে অর্জিত অনাক্রম্যতাঃ  যে অনাক্রম্যতা শিশু মাতৃদেহ থেকে বা রোগজীবাণুর সংক্রমণ বা অ্যান্টিবডির প্রবেশের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে অর্জন করে, তাকে স্বাভাবিকভাবে অর্জিত অনাক্রম্যতা বলে। এই অনাক্রম্যতা আবার দু প্রকারের হয়-

[1] স্বাভাবিকভাবে অর্জিত সক্রিয় অনাক্রম্যতা : কোনো রোগের স্বাভাবিক সংক্রমণ ঘটলে রোগীর দেহে ওই রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে যে অনাক্রম্যতা সৃষ্টি হয়, তাকে স্বাভাবিকভাবে অর্জিত সক্রিয় অনাক্রম্যতা বলে। যেমন, চিকেন পক্ষ সংক্রমণের পর দেহে গড়ে ওঠা অনাক্রম্যতা।

[2] স্বাভাবিকভাবে অর্জিত নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা:  সাধারণভাবে পোষক কোশের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে শুধুমাত্র অ্যান্টিবডি বা অনাক্রম্যতাতন্ত্রীয় কোশ স্বাভাবিক উপায়ে এক ব্যাক্তিরা দেহ থেকে অপর ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করলে যে অনাক্রম্যতা গড়ে ওঠে, তাকে স্বাভাবিকভাবে অর্জিত নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা বলে।

যেমন, [A] মায়ের দেহ থেকে প্লাসেন্টার মাধ্যমে শিশুর দেহে ig G-এর প্রবেশ। [৪] মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে শিশুর দেহে বিভিন্ন অ্যান্টিবভিন্ন প্রবেশ ঘটে।

কৃত্রিমভাবে অর্জিত অনাক্রম্যতা: যে অনাক্রম্যতা কৃত্রিমভাবে জীবদেহে অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডি প্রয়োগের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়, তাকে কৃত্রিমভাবে অর্জিত অনাক্রম্যতা বলে। কৃত্রিমভাবে অর্জিত অনাক্রম্যতা আবার দু-প্রকারের হয়। যথা-

[1] সক্রিয় অর্জিত কৃত্রিম অনাক্রম্যতা : এইজাতীয় অনাক্রম্যতার ক্ষেত্রে রোগের জীবাণু নিয়ে তাতে তাপ অথবা রাসায়নিক প্রয়োগ করে মেরে ফেললে বা দুর্বল করলে, জীবাণুটির রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা হ্রাস পায়, কিন্তু তার বিরুদ্ধে দেহে অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হয়। ফলে ওই অ্যান্টিজেন দেহে প্রবেশ করিয়ে এই প্রকার অনাক্রম্যতা সৃষ্টি করা হয়। যেমন, টিকাকরণের মাধ্যমে অর্জিত অনাক্রম্যতা।

[2] নিষ্ক্রিয় অর্জিত কৃত্রিম অনাক্রম্যতা: উপযুক্ত প্রাণীদেহে রোগের জীবাণু কৃত্রিম উপায়ে প্রবেশ করিয়ে কিছু

দিনের মধ্যে ওই জীবদেহে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করা হয়। ওই প্রাণীর সিরাম সংগ্রহ ও পরিশোধন করে অন্য জীবদেহে প্রবেশ করিয়ে এইপ্রকার অনাক্রম্যতা গড়ে তোলা হয়। যেমন, ATS ইনজেকশন, কৃত্রিমভাবে ঘোড়ার দেহে তৈরি অ্যান্টিবডির মানবদেহে প্রবেশ।

 

 

 

 

অনাক্রম্যতা

জীবদেহে প্রবিষ্ট জীবাণু যেমন, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও তাদের অধিবিষ এবং বিজাতীয় প্রোটিন দ্বারা দেহের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি বিপর্যস্ত হলে, সেগুলির বিরুদ্ধে দেহে যেসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাকে অনাক্রম্যতা বলে।

ব্যাখ্যা

দেহে প্রবিষ্ট রোগজীবাণু বা বহিরাগত প্রোটিনকে অ্যান্টিজেন বলে। রোগজীবাণু জীবদেহে প্রবেশ করে যে রাসায়নিক পদার্থ  নিঃসরণ করে তাকে অ্যান্টিবডি বলে। এইভাবে নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি করে রোগজীবাণু প্রতিরোধ করার ক্ষমতাকে বলে অনাক্রম্যতা।

অংশগ্রহণকারী কোশ

মানুষের দেহে রোগ প্রতিরোধে অংশগ্রহণকারী কোশগুলি হল নিউট্রোফিল, লিম্ফোসাইট, প্লাজমা কোশ ও ম্যাক্রোফাজ ইত্যাদি।

রোগজীবাণু ধ্বংসের প্রক্রিয়া

দেহে রোগজীবাণু প্রবেশ করলে নিউট্রোফিল ও ম্যাক্রোফাজ কোশগুলি ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে ধ্বংস করে। এ ছাড়া দেহে প্রবিষ্ট অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে -লিম্ফোসাইট থেকে উৎপন্ন প্লাজমা কোশ অ্যান্টিবডি উৎপাদন করে। এই অ্যান্টিবডি রোগজীবাণু ধ্বংস করে ও প্রাথমিক ইমিউন রেসপদ সৃষ্টি করে। B-কোশ থেকে উৎপন্ন অপর কোশটি অর্থাৎ, স্মৃতি কোশটি গৌণ ইমিউন রেসপন্স সৃষ্টির মাধ্যমে পরবর্তীকালে ওই অ্যান্টিজেনের সংক্রমণের হাত থেকে দেহকে রক্ষা করে।

 

রসনির্ভর অনাক্রম্যতা
রসনির্ভর অনাক্রম্যতা (humoral immunity) হল একপ্রকারের অর্জিত অনাক্রম্যতা। এক্ষেত্রে B-লিম্ফোসাইট সক্রিয় হয়ে দেহে প্রবিষ্ট রোগ জীবাণুদের ধ্বংস করে। দেহে প্রবিষ্ট অ্যান্টিজেন বা রোগজীবাণুর প্রভাবে ৪-লিম্ফোসাইট কোশ সক্রিয় হয়ে প্লাজমা কোশ ও মেমরি কোশ তৈরি হয়। এই প্লাজমা কোশ থেকে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হয়। এই অ্যান্টিবডিগুলি প্রাথমিক ইমিউন রেসপন্স সৃষ্টি করে, অ্যান্টিজেনকে প্রতিহত করে। অপরদিকে মেমরি কোশগুলি গৌণ ইমিউন রেসপন্স সৃষ্টির জন্য অ্যান্টিজেনের গঠন ও প্রকৃতিকে স্মৃতিতে রাখে। পরবর্তীকালে ওই অ্যান্টিজেন পুনরায় দেহে প্রবেশ করলে, স্মৃতি কোশ বা মেমরি কোশ দ্রুত অ্যান্টিবডি। উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। দেহে প্রবিষ্ট অ্যান্টিজেনকে অ্যান্টিবডি নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে প্রতিহত করে।

1 অ্যাগ্লুটিনেশন (Agglutination) : রোগজীবাণু বা অ্যান্টিজেন রক্তে প্রবেশ করলে রক্তের অ্যান্টিবডি রোগজীবাণুগুলিকে পুঞ্জীভূত (agglutinate) করে এবং এর ফলে আগ্রাসী কোশ বা ম্যাক্সোফাজ সহজেই তাদের গ্রাস করে।

2 অধঃক্ষেপণ (Precipitation): অ্যান্টিজেনগুলিকে পুঞ্জীভূত করার পর অ্যান্টিবডি তাদের অধঃক্ষেপণ ঘটায়। এর ফলে ম্যাক্লোফাজ বা আগ্রাসী কোশেরা সহজেই অ্যান্টিজেনগুলিকে গ্রাস করে।

3 অপসোনাইজেশন (Opsonisation): অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেনগুলির বাইরে আবরণী সৃষ্টি করে। ফলে আগ্রাসী কোশেরা সহজেই অ্যান্টিজেনগুলিকে গ্রাস করে।

4. প্রশমকরণ (Neutralisation): অ্যান্টিবডি অ্যান্টিটক্সিন বা প্রতিবিধরূপে কাজ করে সংক্রমণকারী দ্বারা নিঃসৃত অধিবিধ না টক্সিনকে প্রশমিত করে।

 

 

ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট

Vaccine শব্দটি লাতিন শব্দ 'vacca' (যার অর্থ গোধু) থেকে এসেছে। ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার 1796 খ্রিস্টাব্দে গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন। জেনার লক্ষ করেন যে, যেসব মানুষেরা একবার গো-বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁরা গুটিবসন্ত রোগের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। তিনি গো-বসন্তে আক্রান্ত এক গো-পালিকার হাতের গোবসন্তের ক্ষত থেকে রস সংগ্রহ করেন। এরপর ওই রস একটি আট বছরের শিশু জেমস ফিপস্-এর দেহে প্রয়োগ করেন। প্রথমে সে অসুস্থ হলেও পরে সুস্থ হয়। কিছুদিন পরে জেমসকে গুটিবসন্তের জীবাণু দিয়ে সংক্রামিত করা হলেও সে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয় না এবং সুস্থই থাকে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার টিকা আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে রবার্ট কচ, লুই পাস্তুর প্রমুখ বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রোগের টিকা আবিষ্কার করেন।

 

ভ্যাকসিন

টিকা: কোনো নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ওই রোগের জীবাণুর সমগ্র দেহ বা কোশীয় অংশ বা ক্ষরিত বস্তু থেকে প্রস্তুত যে উপাদান জীবদেহে প্রবেশ করলে, ওই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়, তাকে টিকা বা ভ্যাকসিন বলে।
প্রস্তুতি

টিকা তৈরির জন্য গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে বিশেষ দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টিকারী রোগজীবাণুর কালচার করা হয়। নানা পদ্ধতিতে সব রোগজীবাণুকে দুর্বল করা হয় বা তাদের মেরে ফেলা হয়। এরপর সেই জীবাণু বা তাদের দেহাংশ দিয়ে টিকা তৈরি করা হয়। এখানে ভ্যাকসিন প্রস্তুতির পদ্ধতিগুলি আলোচনা করা হল।

[1] রোগ সৃষ্টিকারী কোনো জীবাণুকে দুর্বল করে। উদাহরণ -যক্ষ্মা রোগের টিকা।

[2] রোগ সৃষ্টিকারী কোনো মৃত জীবাণু নিয়ে। উদাহরণ- হুপিং কাশির টিকা।

[3] জীবাণু নিঃসৃত অধিবিষকে কার্যহীন করে। উদাহরণ- টিটেনাস এবং ডিপথেরিয়ার টিকা।

[4] দু-তিন রকম রোগের জন্য দু-তিন রোগজীবাণু মিশিয়ে তৈরি টিকা। উদাহরণ—DIT টিকা (ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও ধনুষ্টংকারের টিকা)।

গুরুত্ব

টিকাকরণের গুরুত্ব হল— [1] টিকাকরণের দ্বারা দেে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করা হয় যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। [2] টিকাকরণের ফলে দেহে কৃত্রিম সক্রিয় অনাক্রম্যতা উৎপন্ন হয়। [3] টিকাকরণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে জল দেহে প্রায় সারা জীবনের জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। [4] টিকাকরণের মাধ্যমে ডিপথেরিয়া, হুপিং কাফ, যক্ষ্মা, জল বসন্ত প্রভৃতি রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।

অ্যান্টিবডির প্রকৃতি

অ্যান্টিবডি গ্লাইকোপ্রোটিন নিয়ে গঠিত।

অ্যান্টিবডির গঠন

অ্যান্টিবডি প্রধানত “Y” আকৃতিবিশিষ্ট প্রোটিন। এটি চারটি পলিপেপটাইড শৃঙ্খল— [1] দুটি ভারী শৃঙ্খল (heavy chain) ও [2] দুটি হালকা শৃঙ্খল (light) chain) নিয়ে গঠিত। এই শৃঙ্খলগুলি পরস্পরের সাথে ভাই সালফাইড কখন দ্বারা যুক্ত থাকে। অ্যান্টিবডির যে অংশের সাথে অ্যান্টিজেন যুক্ত হয়, তাকে অ্যান্টিজেন বাধকস্থান বা প্যারাটোপ (paratope) বলে। অ্যান্টিবডিল ভারী ও হালকা শৃঙ্খলের যে অংশ অ্যান্টিজেনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তাকে Fab অংশ বলে। আন্টিবডির Fab শৃঙ্খলের নীচের দিকে ভারী শৃঙ্খলের অবশিষ্ট অংশকে Fc অংশ বলে।

অ্যান্টিবডির কাজ

বহিরাগত রোগজীবাণুর সাথে আবদ্ধ হয়ে, রোগজীবাণুকে ধ্বংস করা।

উত্তর

সংক্রমণ রোধে টিকাকরণ ও অনাক্রম্যতার ভূমিকা

টিকাকরণ হল এমন একটি ব্যবস্থা যাতে কোনো নির্দিষ্ট রোগের জীবাণু বা ভাইরাস থেকে প্রস্তুত প্রতিষেধক মানুষের দেহে টিকা বা ভ্যাকসিন হিসেবে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। বাইরে থেকে অ্যান্টিজেন দেহে প্রবেশ করলে, ওই অ্যান্টিজেনকে ধ্বংস করার জন্য দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ফলে দেহে রোগ প্রতিরোধের জন্য অনাক্রম্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে কোনো রোগের জীবাণু প্রবেশ করলে, টিকাকরণের ফলে সৃষ্ট অনাক্রম্যতার জন্যই অ্যান্টিবডি ওই জীবাণুকে ধ্বংস করে। পৃথিবীর নানা দেশে পোলিও, টাইফয়েড, কলেরা, যক্ষ্মা ইত্যাদি অণুজীবঘটিত রোগের বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা গড়ে তুলতে টিকাকরণ পদ্ধতি চালু রয়েছে।

ভ্যাকসিনের প্রকারভেদ

ভ্যাকসিন বিভিন্ন প্রকারের হয়। যথা-

1 মৃত টিকা (Killed vaccine): মৃত জীবাণু দিয়ে এইপ্রকার টিকা তৈরি হয়। যেমন টাইফয়েড A ও B।

2 জীবিত কিন্তু নিষ্ক্রিয় টিকা (Live but attenuated vaccine): এক্ষেত্রে রোগের জীবাণুটি জীবিত হলেও তা ভৌত বা রাসায়নিক উপায়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়। যেমন— যক্ষ্মা রোগের BCG টিকা।

3 অধিবিষজাত টিকা (Toxold vaccine): জীবাণু নিঃসৃত নি বা টক্সয়েডকে নিষ্ক্রিয় করে এই টিকা তৈরি হয়। যেমন— ডিপথেরিয়া বা  টিটেনাস রোগের টিকা।

4 অধঃএকক টিকা (Subunit vaccine): এক্ষেত্রে পূর্ণ হেটেরোটাইপিক ব্যবহার না করে দেহের অংশবিশেষ বা অন্যএকক, টিকাতে ব্যবহার হয়। যেমন- হেপাটাইটিস B-এর টিকা।

5 সংযুক্ত টিকা (Conjugate vaccine): কিছু ব্যাকটেরিয়ার বাইরের বহুশর্করার আস্তরণ ব্যাকটেরিয়াকে টিকা-রুপে করতে বাধা দেয়। এই অসুবিধা দূর করতে এই অংশের সাথে প্রোটিন যোগ করে টিকা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেমন -ইনফ্লুয়েন্ডা টাইপ B-এর টিকা।

6 হেটেরোটাইপিক টিকা (Heterotypic vaccine): কোনো একটি জীবাণু যা কোনো একটি জীবের ক্ষতি কর মানুষের পক্ষে ক্ষতিকারক নয়, তাদের থেকে তৈরি টিকাকে হেটেরোটাইপিক টিকা বলে। যেমন—টিউবারকিউলোসিসের টিকা।

স্বাস্থ্যবিধি,

যেসব নিয়ম অবলম্বণের মাধ্যমে মানুষ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়, তাকে স্বাস্থ্যবিধি বলে। সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি প্রধানত দু-প্রকার-

[1] ব্যাক্তিগত ভাবাদিহি, [2] সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি।

ব্যাক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি : নিজের শরীরের প্রতি যত্নবান হওয়ার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নীরে ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারে। যেমন— [[1] পরিচ্ছন্নতা: [A] খাবারের আগে ও পরে নিয়মিতভাবে সাবান দিয়ে হাত ও মুখ পরিষ্কার করা। [8] নিয়মিত স্নান করা। [C] চোখ, কান, নখ, নাক পরিষ্কার [0] কাটা পরিষ্কার করা। [E] অতিরিক্ত মিষ্টি, চকলেট না যাওয়া।

[2] স্বাস্থ্যকর অভ্যাস: [A] ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করা, হাত-মুখ ধোওয়া। [B] নির্দিষ্ট সময়ে মলমূত্র ত্যাগের অভ্যাস। [C] যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগ না করা ও থুতু না ফেলা।

[3] শরীর চর্চা: সমস্ত বয়সের ব্যক্তিদের, বিশেষত শিশু ও কিশোরদের নিয়মিত শরীরচর্চা করার অভ্যাস রাখা উচিত।

সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা: [1] উন্নত পয়ঃপ্রণালীর মাধ্যমে মল ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ দূরীকরণের বিজ্ঞা [2] বিশুদ্ধ পানীয় জলের সুব্যবস্থা করা। [3] নিয়মিত ও সঠিক পদ্ধতিতে আবর্জনা ।

4] জনসেবারদের যাওয়ার জারগা যেমন— হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বাড়ির রান্নাঘর ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।

ইমিউন রেসপন্স

দেহে অ্যান্টিজেনের প্রভাবে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হওয়াকে অনাক্রম্য সাড়া বা ইমিউন রেসপন্স বলে।

ইমিউন রেসপন্সের প্রকার

ইমিউন রেসপন্স প্রধানত দুই প্রকার- [1] প্রাইমারি ইমিউন রেসপন্স [2] সেকেন্ডারি ইমিউন রেসপন্স।

হেপাটাইটিস

হেপাটাইটিস হল যকৃৎ বা লিভারের প্রদাহ জনিত (Inflammation) একটি মারাত্মক ব্যাধি। এটি মুখ্যত ভাইরাসঘটিত রোগ। তবে ভাইরাস ছাড়া অন্য কারণেও হেপাটাইটিস হতে পারে। ভাইরাস ঘটিত হেপাটাইটিস বিভিন্ন ধরনের হয়, যথা— হেপাটাইটিস A, B, C, D, E ইত্যাদি। এর মধ্যে হেপাটাইটিস হল DNA ভাইরাসঘটিত রোগ। অন্যগুলি RNA ভাইরাসঘটিত রোগ। হেপাটাইটিস B-কে সিরাম হেপাটাইটিসও বলে। হেপাটাইটিস A এবং E হল খাদ্য ও জলবাহিত রোগ।

হেপাটাইটিস রোগের লক্ষণ

[1] প্রবল জ্বর, মাথায় যন্ত্রণা, ক্লান্তিভাব, দুর্বলতা। [2] সুধামান্দ্য ও বমি বমি ভাব।

[3] সংক্রমণের এক সপ্তাহ পর থেকে ঘন হলদে রঙের মূত্র এবং সাদা মল নির্গত হয়।

[4] বিলিরুবিন বেড়ে যায়, গায়ের রং হলদে হয়ে যায় (জন্ডিস)।

[5] মূত্রের বর্ণ গাঢ় হলদে হয়।

[6] যকৃতে প্রদাহ হয়য়।

হেপাটাইটিস রোগের সংক্রমণ

[1] হেপাটাইটিস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত সুস্থ ব্যক্তির শরীরে গেলে ওই সুস্থ ব্যক্তিও হেপাটাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়।

[2] হেপাটাইটিস রোগের জীবাণু জল বা খাদ্য দ্বারা বাহিত হয়ে সুস্থ শরীরে প্রবেশ করে। এই রোগ সংক্রামিত করে।

[3] সংক্রামিত  জলের মাধ্যমেও হেপাটাইটিস (A ও E) ছড়ায়।

[4] সংক্রামিত ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্কে এই রোগ (হেপাটাইটিস A, B সংক্রামিত হয়।

[5] সংক্রামিত ছুট ব্যবহারে, মায়ের দেহ থেকে গর্ভস্থ সন্তানের দেহে এই রোগ (হেপাটাইটিস B) সংক্রামিত হয়।

AIDS

AIDS বা Acquired Immune Deficiency Syndrome একটি ভাইরাসঘটিত মারণ রোগ। এই রোগের ভাইরাসটি হল Human Immunodeficiency Virus বা HIV । এই ভাইরাস মানুষের দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে অনাক্রম্যতা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে। HIV মানুষের রক্তে প্রবেশ করে T লিম্ফোসাইটকে ধ্বংস করে। এই ভাইরাসকে HTLV-III বা Human T- Lymphotropic Virus Type-III-ও বলা হয়। এই ভাইরাস RNA-যুক্ত রেট্রোভাইরাস।

AIDS রোগের লক্ষন

AIDS রোগে আক্রান্ত হলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সহজেই AIDS রোগী অন্য নানারকম রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন— যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, মুখে-জিতে ঘা, দেহের ওজন হ্রাস পাওয়া, প্রায়ই জ্বর হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দেখা যায়।

আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে এক ঘরে বসবাস করলে AIDS ছড়ায় কিনা

AIDS আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে একই ঘরে বসবাস, তার ব্যবহৃত জামাকাপড়, বাসন, আসবাবপত্র ব্যবহার, করমর্দন প্রভৃতির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় না, এমনকি মশার মাধ্যমেও বাহিত হয় না। এই রোগ প্রধানত রক্ত সম্ভারন, অরক্ষিত যৌন মিলন, HIV পজিটিভ মায়ের থেকে অমরার মাধ্যমে শিশুদেহে সঞ্ছারিত হয়।

ডিপথেরিয়া

ডিপথেরিয়া একটি বায়ুবাহিত ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ। এই রোগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার নাম করিনিব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরি (Corynebacterium diptheriae)! এটি মূলত 2-5 বছর বয়সি শিশুদের রোগ। তবে DPT প্রতিষেধক না নেওয়া থাকলে, যে-কোনো বয়সের মানুষের এই রোগ হতে পারে।

ডিপথেরিয়া রোগের লক্ষণ

এই রোগের লক্ষণগুলি হল— [1] প্রাথমিক অবস্থায় ত্বক নীলাভ হয়ে যায় এবং নাক দিয়ে ক্রমাগত জল পড়ে। [2] গলায় ব্যথা অনুভূত হয়। খাদ্য গলাধঃকরণে এবং ঢোক গিলতে অসুবিধা হয়। গলার পেছন দিকে টনসিল সংলগ্ন অঞ্চলে 'গ্রেই হোয়াইট মেমব্রেন' দেখা যায়। [3] রোগটি টনসিল সংলগ্ন অঞ্চল থেকে শ্বাসনালীর দিকে এগিয়ে গেলে, রোগীর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এই শ্বাসকষ্টের সময়ে রোগীর CROUP শব্দ (একটি বিশেষ শব্দ) শোনা যায় এবং প্রাণসংশয় দেখা দেয় [4] ডিপথেরিয়া রোগের আর একটি লক্ষণ হল এতে রোগীর মাঝারি মানের জ্বর হয় এবং সামান্য কাশি হয়।

ডিপথেরিয়া রোগের সংক্রমণ

ডিপথেরিয়া রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সর্দি, কফ এবং হাঁচির সঙ্গে করিনিব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরি (Corynebacterium diphtheriae) নামক জীবাণু শরীর থেকে বেরিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। পরে প্রশ্বাসের সঙ্গে সেই জীবাণু নাক, মুখ দিয়ে সুস্থ ব্যক্তির দেে প্রবেশ করে এবং সুস্থ ব্যক্তির গলা আক্রান্ত হয়। খুব জ্বর আসে। এইভাবে ওই ব্যক্তি ডিপথেরিয়াতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

 

টিটেনাস

এই রোগটি 'লক -জ' (lockjaw) নামে পরিচিত। কারণ এই রোগের শেষ পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তির চোয়াল দুটি পরস্পর শত্রুভা আটকে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যু ঘটে। দেহে জীবাণু প্রবেশের পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেে প্রায় 4 দিন থেকে 20 দিন সময় লাগে। এই রোগের জন্য দায়ী জীবাণু হল এসট্রিডিয়াম টিটেনি (Clostridium tetani) ।
টিটেনাস এর লক্ষণ

[1] শুরুতে চোয়ালে মৃদু খিঁচুনি হয়। পরে তা বুক, ঘাড়, পিঠ এবং তলপেটের পেশিতে ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে চোয়াল আটকে যায়। [2] দীর্ঘসময় খিঁচুনি চলতে থাকলে আকস্মিক যন্ত্রণাদায়ক পেশি সংকোচন ঘটে, যাকে টিটেনি বলা হয়। [3] এ ছাড়াও অত্যধিক ঘাম, জ্বর, হাত ও পায়ের খিঁচুনি, খাবার চিবোনোর সমস্যা ইত্যাদি দেখা যায়।

টিটেনাস যেভাবে সংক্রামিত হয়।

ঘোড়া, গোরু প্রভৃতি প্রাণীর মলে টিটেনাস রোগের জীবাণু ক্লসট্রিডিয়াম টিটেনি (Clostridiurn tetani) থাকে। দেহের কোনো অংশ কেটে গেলে, সেই ক্ষতস্থানের মাধ্যমে জীবাণুর দেহে প্রবেশ ঘটে ও এই রোগ সংক্রামিত হয়।

যক্ষ্মা

যক্ষ্মা

যক্ষ্মা একটি বায়ুবাহিত ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ। এই রোগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াটি হল- মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস (Mycobacterium tuberculosis)। শরীরের যে-কোনো অংশ বা তন্ত্র এই রোগের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগে প্রধানত ফুসফুসে সংক্রমণ হয়। তবে, দেহের অন্যান্য অঙ্গ (যেমন—অস্থি, যকৃৎ ইত্যাদি)-ও আক্রান্ত হয়।

যক্ষ্মা রোগের লক্ষণ

যক্ষ্মা রোগের লক্ষণগুলি হল—–[1] এতে রোগীর জ্বর হয়। জ্বর প্রধানত সন্ধ্যের দিকে আসে। [2] আক্রান্ত অঙ্গে ব্যথা অনুভূত হয়। [3] সারাক্ষণ কাশি হয়। কাশির সঙ্গে মাঝে মাঝে কফ বের হয়। অনেক সময় কফের সঙ্গে রক্তও বের হয়। [4] ধীরে ধীরে দেহের ওজন হ্রাস পায়। দেহ শীর্ণকায় হয়। [5] রোগীর খিদে পায় না। [6] রোগী ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

যক্ষ্মা রোগের সংক্রমণ

যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত ব্যক্তির নাক-মুখ দিয়ে হাঁচি, কাশি ও নিঃশ্বাসের সঙ্গে মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস (Mycobacterium tuberculosis) নামক জীবাণু শরীর থেকে বেরিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্বাসের সঙ্গে সেই জীবাণু নাক, মুখ দিয়ে সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করে এবং সংক্রামিত হয়।

জল, স্থল, অন্তরীক্ষে অবস্থানকারী অতিক্ষুদ্র (0.1mm এর কম আয়তনযুক্ত) আণুবীক্ষণিক জীবদের এককথায় অণুজীব বা মাইক্রোবস্ বলে। উদাহরণ—ব্যাকটেরিয়া, আদ্যপ্রাণী হল অণুজীব।

 

মাটির উর্বরাশক্তি বাড়ানোর জন্য যেসব জৈব ও অজৈব উপাদান মাটিতে প্রয়োগ করা হয়, তাদের সার বা ফার্টিলাইজার বলে। যেমন—ইউরিয়া সার।

যেসব সক্রিয় জীবাণু (যেমন—ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল, ছত্রাক) চাষের জমিতে প্রয়োগ করলে মাটিতে নাইট্রোজেন সংবন্ধন ঘটে এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়, তাদের জীবসার বা বায়োফার্টিলাইজার বলে।

যে উপায়ে কেঁচো প্রতিপালনের মাধ্যমে মাটির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য জৈব সার প্রস্তুত করা হয়, তাকে ভার্মিকালচার বা কেঁচো সার প্রস্তুতি বলে। প্রকৃতপক্ষে, কেঁচোর মলে প্রচুর জৈব সার থাকে। মাটিতে কেঁচো প্রতিপালন করলে 10-12 দিনের মধ্যে ওই মাটি জৈব সারে পরিণত হয়।

ব্যাকটেরিয়া: আদি নিউক্লিয়াসযুক্ত, কোশপ্রাচীরবিশিষ্ট, সরল, এককোশী, আণুবীক্ষণিক জীবদের ব্যাকটেরিয়া বলে।

উপকারী ব্যাকটেরিয়া: দুইটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া হল— [1] অ্যাজোটোব্যাকটর [2] রাইজোবিয়াম।

প্রোটোজোয়া: আণুবীক্ষণিক, সুস্পষ্ট আদর্শ নিউক্লিয়াস যুক্ত এককোশী প্রাণীকে প্রোটোজোয়া বা আদ্যপ্রাণী বলে।  জৈবনিয়ন্ত্রক প্রোটোজোয়া: জৈবনিয়ন্ত্রক হিসেবে ব্যবহৃত দুটি প্রোটোজোয়া হল— [1] নোসেমা (Nosema sp.) [2] লেপ্টোমোনাস (Leptomonas sp.)।

ভাইরাস: নিউক্লিওপ্রোটিন দ্বারা নির্মিত পরাণুবীক্ষণিক, জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী অকোশীয় সংগঠনকে ভাইরাস বলে।

ব্যাকিউলোভাইরাস: ব্যাকিউলোভাইরাস হল একটি ভাইরাস গোষ্ঠী, যার অন্তর্গত ভাইরাস (যেমন, NPV, CPV) সমূহ পতঙ্গ পেস্ট নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা নেয়।

অ্যাজোটোব্যাকটর (Azotobacter) বাতাসের নাইট্রোজেনকে নাইট্রেট লবণ হিসেবে মাটিতে সংযুক্ত করে মাটির উর্বরাশক্তি বাড়ায়। তাই একে উপকারী ব্যাকটেরিয়া বলা হয়।

 

অ্যাজোল্লা: জলে ছোটো পানার মতো ভাসমান এক ধরনের ফার্নকে অ্যাজোল্লা (Azolla) বলে।

গুরুত্ব: অ্যাজোল্লার পাতায় অ্যানাবিনা (Anabaena) নামক নীলাভ-সবুজ শৈবাল বাস করে। ওই শৈবাল পরিবেশের নাইট্রোজেন শোষণ করতে পারে। জলপূর্ণ ধান ক্ষেতে অ্যাজোল্লা সহজে বংশবিস্তার করতে পারে। এ ছাড়া দ্রুত পচে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে, মাটির নাইট্রোজেনের পরিমাণও বৃদ্ধি করে। এই কারণে অ্যাজোল্লা-কে জীবসাররূপে ব্যবহার করা হয়।

 

ব্যাকটেরিয়ারূপে ব্যবহৃত বায়োফার্টিলাইজার প্রধানত দুই প্রকারের হয়। যথা— [1] নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী বায়োফার্টি লাইজার এবং [2] ফসফেট দ্রবীভূতকারী বায়োফার্টিলাইজার।

জীবজ নিয়ন্ত্রণ

কীটপতঙ্গ ও শস্যশত্রু দমনে অণুজীব ও প্রাণীকে কাজে লাগিয়ে যে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, তাকে জীবজ নিয়ন্ত্রণ বলে।

জীবজ নিয়ন্ত্রণের সুবিধা

[1] পরিবেশ বান্ধব: জীবজ নিয়ন্ত্রণে কোনো প্রকার পরিবেশদূষণ ঘটে না।

[2] নির্দিষ্ট পতঙ্গ ধ্বংস: এইজাতীয় নিয়ন্ত্রণে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট ক্ষতিকর পতঙ্গকেই মারার ব্যবস্থা করা হয়। [3] অণুজীব সুরক্ষা: এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় উপকারী অণুজীবদের মৃত্যু ঘটে না।

[4] স্বল্প প্রয়োগ: জীবজ নিয়ন্ত্রক একবার প্রয়োগেই উপকারী অণুজীব এবং পতঙ্গগুলি নিজেরাই বংশবৃদ্ধি করে শস্যক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বারে বারে এদের প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় না।

জীবজ নিয়ন্ত্রণের অসুবিধা

[1] উপকারী পতঙ্গের শত্রুতা: অনেক ক্ষেত্রে জীবজ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত উপকারী পতঙ্গেরা শত্রু পতঙ্গদের ধ্বংস করার পর নিজেরাই অন্য কোনো শস্যের ক্ষতিকারক পতঙ্গে পরিবর্তিত হয়।

[2] বাস্তুরীতির ভারসাম্য নষ্ট: কিছু ক্ষেত্রে উপকারী পতঙ্গরা অপকারী পতঙ্গ নিধনের পাশাপাশি নিরীহ পতঙ্গদের হত্যা করে বাস্তুরীতির ভারসাম্য নষ্ট করে।

বায়োফার্টিলাইজার ব্যবহারের সুবিধা

[1] খরচ কম: খুবই অল্প পরিমাণ অণুজীব বায়োফার্টিলাইজার হিসেবে ব্যবহার করলেই জমির ঊর্ধ্বাতা বৃদ্ধি সম্ভব। কারণ, এগুলি নিজেরাই জননের মাধ্যমে সংখ্যা বৃদ্ধি করে, ফলে গুদামজাতকরণ এবং পরিবহণের খরচ কম হয়।

[2] পরিবেশ বন্ধু : কৃষিক্ষেত্রে জীবসার ব্যবহার করলে তা পরিবেশদূষণ ঘটায় না। ফলে জীবদেহের ওপর কোনোরূপ বিষক্রিয়া ঘটার সম্ভাবনা থাকে না।

[3] দীর্ঘমেয়াদী সুফল: বায়োফাটিলাইজার একবার ব্যবহার করলে অনেকদিন ধরে এর সুফল পাওয়া যায়।

[4] জমির উর্বরতা বৃদ্ধি: বায়োফার্টিলাইজার ব্যবহারে জমির উর্বরতা কখনোই কমে না, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়।

বায়োফার্টিলাইজার ব্যবহারের অসুবিধা

[1] ব্যাবহারিক প্রতিবদ্ধকতা যে-কোনো ধরনের বায়োফার্টিলাইজার কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় না। যেমন, নস্টক, অ্যানাবিনা প্রভৃতি নীলাভ সবুজ শৈবাল জল ছাড়া বাঁচতে পারে না। তাই শুধুমাত্র জলাজমিতে ধানচাষের ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার করা যায়।

[2] বিশেষ প্রশিক্ষণ বায়োফাটিলাইজার উৎপাদন এবং তার যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়।