চতুর্থ অধ্যায় ➤ তাপের ঘটনাসমূহ

কঠিনের সমদৈশিক ও অসমদৈশিক প্রসারণ : তাপ প্রয়োগে কঠিন পদার্থের প্রসারণ যদি সবদিকে সুষমভাবে হয়, তবে তাকে কঠিনের সমদৈশিক প্রসারণ বলে ।  অসমদৈশিক প্রসারণ বলে।  আর তাপ প্রয়োগে কঠিন পদার্থের প্রসারণ যদি সবদিকে সুষমভাবে
না হয়, তবে ওই ধরনের প্রসারণকে অসমদৈশিক প্রসারণ বলে। সাধারণত বেশিরভাগ কঠিন। পদার্থে সমদৈশিক প্রসারণ ও কিছু কঠিন পদার্থে অসমদৈশিক প্রসারণ ঘটে।

কারণ : সূর্যের তাপে এবং চাকার সাথে লাইনের ঘর্ষণে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপের ফলে রেললাইনের উন্নতা বৃদ্ধি হয় এবং দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ঘটে। দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি হওয়ার জন্য লাইনগুলি যাতে বিনা বাধায় প্রসারিত হওয়ার জায়গা পায় সেজন্য দুটি লাইনের জোড়ের মুখে একটু ফাঁক রেখে দেওয়া হয়। ফাঁক না রাখলে লাইনগুলি প্রসারণজনিত বলের জন্য বেঁকে যেত এবং দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকত।

কাচের শিশির মুখে ধাতব ছিপি জোরে এঁটে গেলে শিশি খোলার সময় শিশির মুখটি উত্তপ্ত করা হয়।ছিপিটি উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত হয়।  এর ফলে ছিপি আলগা হয়ে যায় এবং সহজেই খোলা যায়।

গোর গাড়ির চাকায় লোহার বেড় পরাবার সময় ব্যাসের চেয়ে বড়ো বেড়ের ব্যাস ছোটো থাকে । বেড়কে উত্তাপ্ত করলে সেটি প্রসারিত হয়ে  চাকার গায়ে ঠিক এঁটে যাই । পরে বেড়টি ঠান্ডা হলে সেটির সংকোচন হয় এবং ঢাকার গায়ে দৃঢ়ভাবে আটকে যায়।

পুরু কাচের পাত্রে হঠাৎ ফুটন্ত জল ঢাললে পাত্রটি ফেটে যায় কারণ :
পুরু কাচের পাত্রে হঠাৎ পুরু কাচের পাত্রে গরম জল ঢাললে তা ফেটে যায়। এক্ষেত্রে পাত্রটিতে গরম জল ঢাললে ফুটন্ত জলঢাললে পাত্রটি এর ভিতরের দিকে তাপীয় প্রসারণ ঘটে কিন্তু কাচ তাপের কুপরিবাহী হওয়ায় পাত্রের বাইরের অংশ অপরিবর্তিত থাকে। সুতরাং, শুধুমাত্র ভিতরের তলের তাপীয় প্রসারণের জন্য উদ্ভুত বলের প্রভাবে পাত্রটি ফেটে যায়।

মাটির মধ্যে আলগাভাবে গাঁথা হয়  কারণ : মাটির উনুনের লোহার শিকগুলি দৃঢ়ভাবে মাটির সঙ্গে না গেঁথে সামান্য আলগা করে রাখা হয়। কারণ  উষ্ণতা বাড়ার ফলে শিকগুলির তাপীয় প্রসারণ ঘটে শিকগুলি বেঁকে যেতে গিয়ে উনু ভেঙে যেতে পারে।

(i) এই প্রসারণ পদার্থটির সবদিকেই হয় অর্থাৎ ত্রিমাত্রিক।

(ii) একই উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কঠিন পদার্থের প্রসারণ বিভিন্ন।

(iii) সাধারণত সমস্ত কঠিন পদার্থই উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাে বিভিন্ন দিকে সমান পরিমাণে প্রসারিত হয়।

উন্নতা বৃদ্ধি বা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে ধাতব স্কেলের দৈর্ঘ্যও বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। ফলে স্কেলে
দাগগুলির মধ্যে ব্যবধানও পরিবর্তিত হয়। সেজন্য যে উন্নতায় স্কেলটি অংশাঙ্কিত করা হয় কেবলমাত্র সেই উয়তাতেই ধাতব স্কেল সঠিক পাঠ দেয় ।

বৈদ্যুতিক বা টেলিফোনের  তারকে  দুটি খুটির মাঝে টান টান করে না রেখে একটু বুলিয়ে রাখা হয়। কারণ, টান করে খুঁটির সঙ্গে আটকানো থাকলে, শীতকালে উন্নতা হ্রাসের কারণে তারগুলির তাপীয় সংকোচন হয়। ফলে যে টানের উদ্ভব হয় তাতে খুঁটিগুলি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

প্রতি ডিগ্রি উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে কোনো কঠিন পদার্থের প্রতি একক দৈর্ঘ্যে যে দৈর্ঘ্য প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের দৈঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।
কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক নির্ণয়ের সময় যে-কোনো উষ্ণতাকে প্রাথমিক উষ্ণতা করা যেতে পারে, তবে সূক্ষ্ম পরিমাণের ক্ষেত্রে 0°C উষ্ণতাকে প্রাথমিক উষ্ণতা ধরা হয় ।

দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্কের মাত্রীয় সংকেত : দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক,

α= দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি / প্রাথমিক দৈর্ঘ্য × তাপমাত্রা বৃদ্ধি

∴ α-এর মাত্রীয় সংকেত = L / L* θ= θ-1
∴ দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্কের মাত্রা হল তাপমাত্রায় θ= θ-1

(ii) লোহার সেতুর একপ্রান্ত রোলারের ওপর রাখার কারণ : লোহার সেতুর একপ্রান্ত ওপর দিয়ে প্রসারিত হয়। সেতুটি উত্তপ্ত হলে ওই মুক্ত প্রাপ্তটি রোলারের ওপর দিয়ে   প্রসারিত হয় । এর ফলে সেতুটির কোনো ক্ষতি হয় না।

ব্যাখ্যা: তামার দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক, লোহার দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাদের চেয়ে বেশি হওয়ায় একই উষ্ণতা  বেশিতে তামার দন্ডের প্রসারণ লোহার দত্তের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ সমবায়টি উত্তপ্ত  করা হলে সেটি বেঁকে  যাবে  এবং বাঁকের বাইরের দিকে তামার পাতটি এবং ভিতরের দিকে লোহার পাতটি থাকবে ।

(i) প্রাথমিক দৈর্ঘ্য : উন্নতার বৃদ্ধির পাল্লা স্থির থাকলে কোনো কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ তার প্রাথমিক দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক।

(ii) উষ্ণতা বৃদ্ধি  : প্রাথমিক দৈর্ঘ্য থাকলে দৈর্ঘ্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলির প্রসারণ কঠিন পদার্থটির উষ্ণতা বৃদ্ধির সমানুপাতিক।

(iii) কঠিনের উপাদান  : কঠিন পদার্থটির দৈর্ঘ্য বা রৈখিক প্রসারণ পদার্থটির উপাদানের ওপর নির্ভর করে।

কারণ : কাচ এবং তামার প্রসারণ গুণাঙ্ক ভিন্ন হওয়ায় উচ্চ তাপমাত্রায় সিল করার পর ঠান্ডা হলে তামা ও কাচ আলগা হয়ে যাবে। কিন্তু প্ল্যাটিনাম ও কাচের প্রসারণ গুণাঙ্ক প্রায় সমান বলে কাচের ভিতর প্ল্যাটিনাম সিল করে আটকানোর পর শীতল হলেও কাচ ও প্ল্যাটিনাম আলাদা হয়ে যায় না।

দ্বি-ধাতব পাত : দুটি সমান দৈর্ঘ্যের ভিন্ন ধাতব পাতকে রিভেট করে যুক্ত করে দিলে যে পাত পাওয়া যায়, তাকে দ্বি-ধাতব পাত বলে ।

দ্বি-ধাতব পাতকে বৈদুতিক ইস্ত্রি , রেফ্রিজারেটর  ইত্যাদি যন্তের  সুইচ হিসাবে কাজ করা হয়  ।

রান্নার পাত্র অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরির কারণ : অ্যালুমিনিয়াম তাপের সুপরিবাহী। অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি রান্নার পাত্র বার্নারের ওপর বসালে, বার্নারের আগুনের তাপ অ্যালুমিনিয়ামের মধ্যে দিয়ে সহজে পরিবাহিত হয়ে পাত্রে রাখা খাদ্যদ্রব্য এবং জলে প্রবেশ করে। এর ফলে মাদ্যদ্রব্য দ্রুত সুসিদ্ধ হয়।

শীতকালে দরজার ধাতব হাতলে হাত দিলে বেশি ঠাণ্ডা  বোধ হয়  কারন : শীতকালে মানবদেহের উন্নতা পারিপার্শ্বিকের তুলনায় বেশি থাকে অর্থাৎ মানবদেহের উষ্ণতা
দরজার ধাতব হাতলে দরজার ধাতব হাতলের চেয়ে বেশি থাকে।
এর ফলে ধাতব হাতল স্পর্শ করলে মানবদেহ থেকে তাপ হাতলে পরিবাহিত হয়। ধাতু
মনে হওয়ার কারণ: তাপের সুপরিবাহী বলে বেশি পরিমাণে তাপ মানবদেহ থেকে ধাতব হাতলে পরিবাহিত হয়। ফলে দরজার ধাতব হাতল বেশি ঠান্ডা মনে হয়।

 

লোহার তারজালি তাপের সুপরিবাহী। আগনের শিখার উপরে কাচপাত্র গরম করার সময় লোহার তারজালি লোহার তারজালি ব্যবহার করা হয়। এটি আগুনের তাপাকে দ্রুত সমানভাবে পাত্রের নীচে ছড়িয়ে দেয়, ফলে কাচপাত্র ফেটে যায় না।

খড় এবং খড়ের চালে আবদ্ধ বায়ু উভয়ই তাপের কুপরিবাহী। ফলে গরমকালে সূর্যের প্রখর তাপ খড়ের মধ্য দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতে পারে না। তাই ঘরটি অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা থাকে। অপরপক্ষে, শীতকালে ঘরের ভিতরের তাপ বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না, সেহেতু ঘরটা বাইরের তুলনাই গরম বোধ হয় ।