চতুর্থ অধ্যায় ➤ ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া ও পৃথিবীর বিভিন্ন ভূমিরূপ

উত্তর পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রাথমিক ভূমিরূপ সৃষ্টির জন্য দায়ী ভূ-অভ্যন্তরের ক্রিয়াশীল প্রক্রিয়া হল নি । ভূ-আলোড়ন প্রধানত দুই প্রকার। যথা—মহীভাবক ও গিরিজনি আলোড়ন।

ভূপৃষ্ঠে উল্লম্বভাবে ক্রিয়াশীল ভূগাঠনিক আলোড়ন হল মহীভাবক আলোড়ন) (epeirogenic movement)। এর প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে চ্যুতির সৃষ্টি হয় এবং ভূমিভাগের উত্থান বা অবনমন ঘটে।

ভূপৃষ্ঠে অনুভূমিকভাবে ক্রিয়াশীল ভূগাঠনিক আলোড়ন হল গিরিজনি আলোড়ন (orogenic movement)। এর প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে ভাঁজের সৃষ্টি হয় এবং শিলামনের বিকৃতি ঘটে।

ভূপৃষ্ঠের প্রধান ভূমিরূপগুলি (পর্বত, মালভূমি ও সমভূমি) ভূমিভাগের ওপর নিজেদের মধ্যে এক বিশেষ ভারসাম্য বজায় রেখে অবস্থান করে। কোনো কারণে ওই ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে যে ভূ-আলোড়নের সৃষ্টি হয়, তাকে সমস্থিতিগত আলোড়ন বলে।

(ভূ-অভ্যন্তরীণ শক্তির ফলে প্রাথমিক ভূমিরূপ গঠন প্রক্রিয়া হল ভূ-আভ্যন্তরীণ বা অন্তর্জাত প্রক্রিয়া। যেমন—ভূ-আন্দোলন,অগ্ন্যুৎপাত, পাত সঞ্চরণ প্রভৃতি। এই প্রক্রিয়াগুলি অনেকক্ষেত্রেই হঠাৎ ঘটে এবং ভূপৃষ্ঠে তার প্রভাব পড়ে।

ভূপৃষ্ঠের ওপরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির ভূমিরূপ গঠন ও বিবর্তনের পদ্ধতি হল ভূবহিঃস্থ বা বর্হিজাত প্রক্রিয়া। যেমন— আবহবিকার, ক্ষীন প্রভৃতি। এই প্রক্রিয়াগুলি দীর্ঘসময় ধরে ক্রিয়াশীল হয়ে ভূপৃষ্ঠে নানা ধরনের ভূমিরূপ সৃষ্টি করে।

ভূপৃষ্ঠে বহুদূর বিস্তৃত, সমুদ্রতল থেকে প্রায় 1,000 মিটারের বেশি উঁচু, শপবিশিষ্ট, শিলাময় ভূতা হল পর্বত।
যেমন— হিমালয় পর্বত। ভূ-আন্দোলন, ক্ষয়, সঞ্চয় প্রক্রিয়ায় পর্বতের সৃষ্টি হয়।

(গিরিজনি আলোয়নে, মা সঞ্চিত পলিতে ভাজ পড়ে ক্রম উত্থানের মাধ্যমে সুউচ্চ, শৃঙ্গবিশিষ্ট ভূমিরূপ হল। ভঙ্গিল পর্বত) যেমন— হিমালয়, রকি, আন্দিজ, ইত্যাদি পর্বত।

যেসব ভঙ্গিল পর্বত বহু প্রাচীন। তাদের উচ্চতা ক্ষয়ের ফলে কম হয়। যেমন— আরাবল্লি। অপরদিকে, নবীন জলিল পর্বত অপেক্ষাকৃত পরে সৃষ্টি হয়েছে এবং এদের উচ্চতাও বেশি। যেমন হিমালয়।

মহাদেশ ও মহাসাগর গঠনকারী শীল, বিশাল ভূত্বকীয় শিলাখন্ডগুলি এক একটি পাত। যেমন—এশীয় পাত, প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত। এরকম দুটি পাতের সীমানাবর্তী অঞ্চলকে বলে পাত সীমান্ত (plate margin)।

পাত সীমান্ত প্রধানত তিন প্রকার। যথা— [1] অভিসারী বা বিনাশকারী পাত সীমান্ত (পরস্পরের দিকে চলন) [2] প্রতিমার বা গঠনকারী পাও সীমান্ত পরস্পরের বিপরীতে চলন) [3] নিরপেক্ষ পাত সীমান্ত (পাশাপাশি চলন)।

উত্তর। যে রেখা বরাবর দুটি মহাদেশীয় পাত জোড়া লেগে যায়, তাকে সুচার রেখা বলে। এই রেখা বরাবর ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয় এবং পর্বতের উচ্চতাও বৃদ্ধি পায়।

মহাসাগরের অগভীর সংকীর্ণ অংশ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে পলি, বালি, নড়ি সজ্জিত হয়ে পার্শ্বচাপের ফলে ওই পলিস্তরে ভাঁজ পড়ে ভলিগ পর্বতের সৃষ্টি হয়, তাকে মহীখাত বলে। যেমন—টেথিস মহীখাত থেকে হিমালয় পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে।

বিভিন্ন প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তির (আবহবিকার, জলপ্রবাহ, বায়ু প্রভৃতি) দ্বারা কোনো সুউচ্চ, বিস্তৃত শিলাময় ভূভাগের ক্ষয়ীভূত অবশিষ্ট অংশ পর্বতের মতো বৈশিষ্ট্যযুক্ত হলে, তাকে ক্ষয়জাত পর্বত বলে। যেমন— ভারতের আরাবল্লি পর্বত।

ভূ-আন্দোলনের ফলে গুরুমণ্ডলের ম্যাগমা ভূতকের ফাটলপথে বাইরে বেরিয়ে এসে সন্দিত হয়ে যে পর্বতের মতো শিলাময়, বহুদূর বিস্তৃত উচ্চভূমি সৃষ্টি করে তা সঞ্চয়জাত পর্বত নামে পরিচিত। যেমন-জাপানের ফুজিয়ামা।

 

মহীভাবক আলোড়নে সৃষ্ট চ্যুতি বরাবর ভূপৃষ্ঠের শিলাস্তর স্তূপাকারে ওপরে উঠে পর্বতের মতো উচ্চভূমি সৃষ্টি করে, এটিই স্তূপ পর্বত নামে পরিচিত। যেমন—ভারতের সাতপুরা, জার্মানির

রাকফরেস্ট।

মহীভাবক আলোভনে ভূপৃষ্ঠে সৃষ্ট দুটি চ্যুতির মধ্যবর্তী ভূভাগ পার্শ্ববর্তী অংশ থেকে নীচে বসে গেলে যে উপত্যকার সৃষ্টি হয় তা গ্রস্ত উপত্যকা নামে পরিচিত। যেমন—ভারতের নর্মদা নদীর উপত্যকা।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পড়ে 300 মিটারের বেশি উঁচু, তরলায়িত, খাড়া পার্শ্বদেশযুক্ত, টেবিলের নাম ভূমিশে হল মালভূমি। যেমন—ছোটোনাগপুর মালভূমি, দাক্ষিণাত্যের মালভূমি ।

ভূ-আন্দোলনের ফলে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টির সময়, কোনো

ভূভাগ উঁচু হয়ে গেলে পাশাপাশি সমান্তরাল দুটি ভঙ্গিল পর্বতের মাঝে এই মালভূমি সৃষ্টি হয়। যেমন— হিমালয় ও কুয়োনলুন পর্বতের মাঝে বিজ্ঞত মালভূমি অবস্থিত।

ভারতের ছোটোনাগপুর মালভূমি, পক্ষিণাত্য মালভূমি ও মেঘালয় মালভূমির অংশবিশেষে বাবচ্ছিন্ন মালভূমি দেখা যায়।

ডেকান ট্র্যাপ হল দক্ষিণ ভারত তথা দাক্ষিণাত্য মালভূমির ধাপযুক্ত ভূমিরূপ (সুইডিশ শব্দ 'map', এর অর্থ সিঁড়ি)। দক্ষিণ ভারতের (মহারাষ্ট্র সংলগ্ন) বিস্তীর্ণ অংশে অগ্ন্যুৎপাতের লাভা সঞ্চয়ের পরে প্রাকৃতিক শক্তির ক্ষয়ের ফলে ব্যাসল্ট শিলাস্তরে এরকম ধাপের ন্যায় ভূমিভাগ সৃষ্টি হয়েছে।

আগ্নেয় পর্বতের সৃষ্টির কারণ—[1] অভিসারী বা সংঘর্ষকারী দুটি পাতের সংযোগস্থলের দুর্বল অংশে ম্যাগমা উদ্‌গিরণের ফলে আগ্নেয় পর্বত তৈরি হতে পারে। [2] দুটি পাত পরস্পরের থেকে দূরে সরে গেলে অপসারী পাত সীমা বরাবর দুর্বল অংশে ম্যাগমা উদ্‌গিরণের ফলে আগ্নেয় পর্বত গঠিত হতে পারে। [3] কখনো-কখনো পাতের মধ্যস্থলে তেজস্ক্রিয়তাজনিত কারণে সৃষ্ট হওয়া উত্তাপ কেন্দ্র (hot spot) থেকে তৈরি হওয়া ঊর্ধ্বমুখী পরিচলন স্রোতের সাথে উঠে আসা ম্যাগমা এ ধরনের আগ্নেয়গিরি তৈরি করতে পারে। জাপানের ফুজিয়ামা, ইটালির ভিসুভিয়াস, ভারতের ব্যারন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য আগ্নেয় পর্বত। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে এই পর্বতের উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে পারে।

আগ্নেয় পর্বতের বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

[1] আকৃতি : আগ্নেয় পর্বতের আকৃতি কিছুটা ত্রিভুজ বা
শঙ্কুর মতো।
[2] জ্বালামুখের উপস্থিতি এর চূড়ায় যে মুখ থাকে,
তাকে জ্বালামুখ বলা হয়।
[3] একাধিক জ্বালামুখ: বড়ো বড়ো আগ্নেয়গিরির একাধিক
জ্বালামুখ থাকতে পারে।
[4] ম্যাগমা গহ্বরের সঙ্গে সংযোগ : জ্বালামুখ একটি
নলাকৃতি পথের মাধ্যমে ভূগর্ভের ম্যাগমা গহ্বরের সঙ্গে
যুক্ত থাকে।
[5] ঢাল : আগ্নেয় পর্বতের চারপাশে যথেষ্ট খাড়া ঢাল থাকে।
[6] উচ্চতা: আগ্নেয় পর্বতের উচ্চতা মাঝারি ধরনের হয়।

জনজীবনের ওপর পর্বতের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যেমন—[1] সুউচ্চ পার্বত্য অঞ্চলসমূহ নানা ধরনের বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ হয়। [2] এখানে বহু বড়ো নদীর উৎপত্তি হয়। [3] পার্বত্য অঞ্চলের খরস্রোতা নদীগুলি থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।[4] হিমালয়, আস, রকি, আন্দিজের মতো সুউচ্চ এবং সুবিস্তৃত পর্বতশ্রেণিগুলি বহু এলাকার জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে। [5] এ ছাড়া পর্যটন শিল্প, পশুপালন ও কাষ্ঠ শিল্পের জন্য পার্বত্য অঞ্চল বিখ্যাত তবে, পার্বত্য অঞ্চলে বন্ধুর ও পাথুরে বলে কৃষিকাজ ভালো হয় না। [6] খাড়া ঢাল এবং পাত্রে ভূমির জন্য উন্নত ধরনের রাস্তাঘাট নির্মাণ করা খুবই কষ্টকর ও ব্যয়সাধ্য বলে পার্বত্য অঞ্চলে জনবসতি কম।

প্রধানত তিনটি কারণে মালভূমির সৃষ্টি হয়— [1] ভূ-আলোড়ন। ভূ-আলোড়নের ফলে ভূপৃষ্ঠের প্রাচীন স্থলভাগগুলি পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং উচ্চতায় বৃদ্ধি পেয়ে এক একটি মালভূমিরূপে অবস্থান করে, একে মহাদেশীয় মালভূমি বলে। উদাহরণ-দাক্ষিণাত্য মালভূমি, আরবের মালভূমি প্রভৃতি।

[2] প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তিসমূহের কার্য। সৌরতাপ, বায়ুপ্রবাহ, নদী, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক ক্ষমাকারী শক্তিসমূহ উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল বা অন্য কোনো উচ্চভূমিকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে প্রায় সমতল শিখরদেশবিশিষ্ট মালভূমিতে পরিণত করে। উদাহরণ ছোটোনাগপুরের মালভূমি।

[[3] লাভা । - অভার ম্যাগমা লাভারূপে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে এসে ক্রমশ সঞ্চিত হয়েও মালভূমির সৃষ্টি হয়। উদাহরণ—ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমির উত্তর-পশ্চিমাংশ হল লাভা মালভূমি।

জনজীবনের ওপর মালভূমির বিচিত্র প্রভাব লক্ষ করা যায়। যেমন—[1] অধিকাংশ প্রাচীন মালভূমি নানা ধরনের খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হয়। যেমন—ভারতের ছোটোনাগপুর মালভূমি অঞ্চল, ব্রাজিলের উচ্চভূমি অঞ্চল, কানাডার শিল্ড অঞ্চল প্রভৃতি খনিজ সম্পদের জন্য বিখ্যাত। [2] মালভূমির বন্ধুর ভূমিরূপের জন্য এর ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলি বেশ খরস্রোতা হয়, ফলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুকূল অবস্থা থাকে। উদাহরণ— দাক্ষিণাত্য মালভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত অধিকাংশ বড়ো নদীকেই জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। [3] মালভূমি কিছুটা বন্ধুর ও পাথুরে হয় বলে কৃষিকাজে যথেষ্ট ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়।

মালভূমি নানাভাবে তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে যেসব মালভূমি আগ্নেয় বা রূপান্তরিত শিলায় গঠিত হয় সেইসব মালভূমি সাধারণত খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ থাকে। ভূগর্ভের লাভা বাইরে বেরিয়ে এলে ধীরে ধীরে শীতল হয়ে যেসব মালভূমি: গঠিত হয়, সেইসব মালভূমিতে লোহা, আলুমিনিয়াম প্রভৃতি খনিজের প্রাধান্য দেখা যায়। আবার, রূপান্তরিত শিলায় গঠিত মালভূমিতে কালা সোনা, রূপা, তামা ও আরও নানা প্রকার খনিজ দ্রব্য পাওয়া যায়। ভারতের ছোটোনাগপুর মালভূমি নানাবিধ খনিজসম্পদে পরিপূর্ণ বলে একে ভারতের খনিজ ভাণ্ডার বলে।

সমুদ্রগর্ভে যখন স্তরে স্তরে পলি জমা হয়, তখন তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহ চাপা পড়ে। পলি জমাট বেঁধে পাললিক শিলা সৃষ্টির সময় ওগুলিও প্রবল চাপে ধীরে ধীরে প্রস্তরীভূত হয়ে যায়। এজন্য পাললিক শিলার মধ্যে উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের ছাপযুক্ত জীবাশ্মের সন্ধান পাওয়া যায়। সমুদ্রগর্ভে সৃষ্ট ওই পাললিক শিলাস্তরে ভাঁজ পড়ে ভঙ্গিল পর্বতের উৎপত্তি হয়। এই কারণে ভঙ্গিল পর্বতে জীবাশ্ম দেখা যায়।

স্তূপ পর্বতের বৈশিষ্ট্যগুলি হল— [1] দুটি চ্যুতিরেখার মাঝখানের অংশ পার্শ্বচাপের ফলে ওপরে উঠে পড়লে হোস্ট জাতীয় স্তূপ পর্বতের সৃষ্টি হয় এবং এর দু-পাশে দুটি গ্রস্ত উপত্যকার সৃষ্টি হয়। উদাহরণ—সাতপুরা এই ধরনের স্তূপ পর্বত এবং এর দু-পাশের দুটি গ্রস্ত উপত্যকা দিয়ে যথাক্রমে নর্মদা ও ভারী নদী প্রবাহিত হয়েছে। [2] দুটি চ্যুতিরেখার মধ্যবর্তী অংশের ভূমি খাড়াভাবে বসে গেলে সৃষ্টি হয় গ্রস্ত  উপত্যকা এবং ওই অবনমিত অংশের দু-পাশে দুটি স্তূপ পর্বত সৃষ্টি হয়। উদাহরণ—ফ্রান্সের ভোজ এবং জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট এই ধরনের দুটি স্তূপ পর্বত এবং এ-দুয়ের মধ্যবর্তী গ্রস্ত উপত্যকা দিয়ে রাইন নদী প্রবাহিত হয়েছে। [3] স্তূপ পর্বতের দু-পাশের ঢাল বেশ খাড়া এবং মাথা কিছুটা চ্যাপটা হয়। [4] স্তূপ পর্বতের উচ্চতা এবং বিস্তৃতি খুব বেশি হয় না এবং এই পর্বত সাধারণত শৃঙ্গবিহীন হয়।

[1] এই ধরনের পর্বতের আয়তন খুব কম হয়। [2] উচ্চতা কম হয়। [3] দীর্ঘদিন ধরে না হয় বলে এদের চাল কম। [4] পর্বতের শীর্ষদেশ গোলাকার বা গম্বুজাকার [5] তিন ধরনের শিলা দিয়েই এধরনের পর্বত পঠিত [6] এইগুলি খুবই কঠিন ও প্রাচীন শিলা দিয়ে তৈরি।

ভূ-আন্দোলনে গঠিত এইধরনের মালভূমির বৈশিষ্ট্য হল—[1] এই মালভূমির চারিদিকে মূলত ভঙ্গিল পর্বত অবস্থান করে। [2] এইধরনের মালভূমির উচ্চতা খুব বেশি হয়। [3] এই মালভূমি মূলত পাললিক শিলায় গঠিত হয়। [4] এই মালভূমিগুলি সুউচ্চ এবং গঠনের ভিত্তিতে জটিল প্রকারের হয়। রা-ভিরতের মানভূমি, আনাতোলিয়ার মালভূমি প্রভৃতি।

দুটি পাতের অনুভূমিক চলনের ফলে যে অঞ্চল বরাবর ভারী পাত হালকা পাতের নীচে প্রবেশ করে সেই অঞ্চলকে অধঃপাত মণ্ডল বা বেনিয়ফ জোন বলে। বিজ্ঞানী হুগো বেনিয়ফ-এর নামানুসারে এই অঞ্চলকে বেনিয়ফ জোন বলা হয়। বৈশিষ্ট্য: বেনিয়ফ জোন-এ পাতের গলন, ম্যাগমার পরিচলন স্রোত, ভূমিকম্প এবং অগ্ন্যুৎপাত দেখা যায়।

উদাহরণ: ইউরেশিয়ান পাত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত পরস্পরের দিকে সরে আসার ফলে ভারী প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত হালকা ইউরেশিয়ান পাতের নীচে প্রবেশ করে বেনিয়ফ জোন-এর সৃষ্টি করেছে।

পৃথিবীর সর্বাধিক আগ্নেয়গিরি প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশে রয়েছে। মেখলা শব্দের অর্থ— কোমর বন্ধনী। প্রায় 500 টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি (সমগ্র পৃথিবীর 70% ) প্রশান্ত মহাসাগরের বন্ধনীর মতো ঘিরে আছে। একেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলা বলে। এটি দক্ষিণ আমেরিকায় হন। অন্তরীপ থেকে শুরু করে আন্দিজ পর্বত ও রকি পর্বতমালার মধ্যে নিয়ে বিস্তৃত হয়ে পশ্চিমে অ্যালুসিয়ান, কাচটিকা, জাপান, ফিলিপাইন দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত।

আগ্নেয় পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিকম্প হওয়ার কারণ— [1] ধ্বংসাত্মক বা অভিসারী পাত সীমান্ত বরাবর আগ্নেয় পর্বত গঠিত হলে দুটি পাতের সংঘর্ষের কারণে সেটি ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে ওঠে।
[2] গঠনাত্মক বা প্রতিসারী পাত সীমান্তে আগ্নেয় পর্বত গঠিত হলে অ্যাসথেনোস্ফিয়ার থেকে যে তরল ম্যাগমা উঠে আসে তার চাপে ভূমিকম্প হতে পারে। [3] উত্তাপ কেন্দ্রে আগ্নেয় পর্বত গঠিত হলে ভূঅভ্যন্তরের ম্যাগমা, গ্যাস প্রভৃতি ভূপৃষ্ঠে ঊর্ধ্বমুখী চাপ দেয় এবং ভূমিভাগের কম্পন ঘটে।

ভারী মহাসাগরীয় পাত হালকা মহাদেশীয় পাতের সংযোগস্থলে মহাসাগরীয় পাতের সামনের অংশ মহাদেশীয় পাতের নীচে 30°-80° কোণের ঢালু তল বরাবর ঢুকে যায়। এই দুটি পাতের সংঘর্ষ স্থলে সঞ্চিত পলি ভাঁজ খেয়ে ভঙ্গিল পর্বত গঠিত হবার সময় অনুপ্রবিষ্ট মহাসাগরীয় পাতের গলনের ফলে ম্যাগমা বাইরে বেরিয়ে আসে। অর্থাৎ ভঙ্গিল পর্বত এবং ম্যাগমা একসঙ্গে ভূমিরূপ তৈরি করে। সেকারণে ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ করে মহাদেশ-মহাসাগরীয় পাতের সীমানায় আগ্নেয় পর্বত দেখা যায়।

বহুকাল ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি ভূমিভাগের ক্ষয় করে এবং ভূমিরূপের পরিবর্তন করে। উঁচু পার্বত্যভূমির কোমল শিলায় গঠিত অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হলে নীচু পর্বতে পরিণত হয়। কিন্তু পর্বতের মধ্যের কঠিন শিলাগঠিত অংশ কম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পর্বত বা উচ্চভূমি হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষা করে। তাই এই ধরনের পর্বতকে ক্ষয়জাত পর্বত বা অবশিষ্ট পর্বত বা নগ্নীভূত পর্বত বলে। পুরোনো ভঙ্গিল পর্বতগুলি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নীচু পর্বত হিসেবে অবস্থান করছে। আরাবল্লি, অ্যাপালেচিয়ান এইজাতীয় পর্বত।

যেসকল প্রাকৃতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে ভূপষ্ঠে নানা ধরনের ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় ও ক্রমাগত বিবর্তন ঘটতে থাকে, তাদেরকে ভূগাঠনিক প্রক্রিয়া বলে। ভূগাঠনিক প্রক্রিয়াগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে— অন্তর্জাত প্রক্রিয়া: ভূ-অভ্যন্তরে সৃষ্ট বলের প্রভাবে ভূত্বকে যে ধীর ও আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে, তাকে অন্তর্জাত প্রক্রিয়া (endogenic process) বলে। (গ্রিক শব্দ 'endon' অর্থ হল ভিতর বা অভ্যন্তর)। অন্তর্জাত প্রক্রিয়াকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা—[1] ধীর আলোড়ন ও [2] আকস্মিক আলোড়ন । [1] ধীর আলোড়ন : ভূ-অভ্যন্তরীণ যেসকল আলোড়নের প্রভাবে ধীরগতিতে ভূমিরূপের সৃষ্টি বা বিবর্তন ঘটে, তাদের ধীর আলোড়ন বলে। এই আলোড়ন দুই প্রকার, যথা— [a] মহীভাবক আলোড়ন : যে আলোড়নের ফলে মহাদেশ বা মহাসাগরের সৃষ্টি হয়, তাকে মহীভাবক আলোড়ন (epeirogenic movement) বলে। গ্রিক শব্দ 'epeiros' অর্থ মহাদেশ। এই বল উল্লম্বভাবে কাজ করে ভূত্বকে চ্যুতির সৃষ্টি হয়।গিরিজনি আলোড়ন: যে আলোড়নের ফলে শিলাস্তরে ভাঁজ পড়ে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়, তাকে গিরিজনি আলোড়ন (orogenic movement) বলে (গ্রিক শব্দ ‘oros' অর্থ পর্বত)। এই বল অনুভূমিকভাবে কাজ করে। [[2] আকস্মিক আলোড়ন : খুব দ্রুত এই আলোড়ন ঘটে। ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাত ইত্যাদি এই ধরনের আলোড়ন। বহির্জাত প্রক্রিয়া: ভূপৃষ্ঠের ওপরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শান্ত বহন ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে ভূমিরূপের বিবর্তন ঘটায় ভূমিরূপের সৃষ্টি করে, এদের বহির্জাত প্রক্রিয়া (exogen processes) বলে। গ্রিক শব্দ 'exo' অর্থ বাহির। বহির্জা প্রক্রিয়াগুলির মধ্যে অন্যতম হল

[1] আবহবিকার : আবহাওয়ার বিভিন্ন (যেমন—উন্নতা, বৃষ্টিপাত প্রভৃতি) মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠ শিলার যে খণ্ডীকরণ, বিচূর্ণন ও বিয়োজন ঘটে, তারে আবহবিকার (weathering) বলে। উপাদানের

[2] পুঞ্জিত ক্ষয় : ঢালু ভূভাগ বরাবর অভিকর্ষের টানে আবহবিকারপ্রাপ্ত শিলাচূর্ণ, পাথর, মাটি প্রভৃতি পু স্তূপাকারে নেমে আসে, এই প্রক্রিয়াকে পুঞ্জিত ক্ষ (mass wasting) বলে।

[3] ক্ষয়: যে প্রক্রিয়ায় নদী, বায়ু, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতি প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তির দ্বারা ভূপৃষ্ঠের ভূমিরূপসমূহ (যেমন—পর্বত, মালভূমি, সমভূমি) ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং নতুন নতুন ভূমিরূপ গঠিত হয়, সেই প্রক্রিয়াকে ক্ষয় (erosion) বলে।

[4] সঞ্চয় : প্রাকৃতিক শক্তিগুলি (যেমন—নদী, হিমবাহ, বায়ু প্রভৃতি) শিলাচূর্ণ, পাথর, বালুকণা প্রভৃতিকে বিভিন্ন স্থানে জমা করে নানা ধরনের ভূমিরূপ সৃষ্টি করে, এই প্রক্রিয়াকে সঞ্চয় (deposition) বলে।

ভূপৃষ্ঠের ওপর বহুদূর বিস্তৃত, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে 1000 মিটারের বেশি উঁচু, শৃঙ্গ বিশিষ্ট শিলাময় ভূভাগকে পর্বত বলে। ভারতের হিমালয়, বিন্ধ্য, সাতপুরা প্রভৃতি পর্বতের উদাহরণ।
শ্রেণিবিভাগ: পর্বতকে প্রধানত চারভাগে ভাগ করা যায়। যথা—
[1] ভঙ্গিল পর্বত : অনুভূমিক ভূ-আলোড়নে সৃষ্ট পার্শ্বচাপের ফলে সমুদ্র বা হ্রদে সঞ্চিত পলিরাশিতে ভাঁজ পড়ে উঁচু হয়ে যে পর্বতের সৃষ্টি হয়, তাকে ভঙ্গিল পর্বত বলে। ভাঁজ পড়ে সৃষ্টি হয় বলে এর নাম ভঙ্গিল পর্বত। ভঙ্গিল পর্বতের উঁচু উত্তল অংশকে ঊর্ধ্বভঙ্গ বলে এবং নীচু অবতল অংশকে অধোভঙ্গ বলে। উৎপত্তির সময়কালের ভিত্তিতে ভলি পর্বত প্রধানত দুই প্রকার। যথা—
(a) প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত: ভারতের আরাবল্লি, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালেচিয়ান পর্বতশ্রেণি এর উদাহরণ। [b] নবীন ভঙ্গিল পর্বত। ভারতের হিমালয়, উত্তর আমেরিকার রকি পর্বতমালা এর উদাহরণ।
[2] আগ্নেয় পর্বত: ভূ-আন্দোলনের ফলে, ভূ-অভ্যন্তরের ম্যাগমা ফাটল দিয়ে ভূপৃষ্ঠের বাইরে বেরিয়ে এসে সঞ্চিত হয়ে আগ্নেয় পর্বতের সৃষ্টি করে। একে সঞ্চয়জাত পর্বতও বলা হয়। যেমন—জাপানের ফুজিয়ামা, ইটালির ভিসুভিয়াস পর্বত প্রভৃতি। আকৃতি অনুযায়ী আগ্নেয় পর্বত শঙ্কু আকৃতি, গম্বুজ আকৃতি প্রভৃতি ধরনের হয়। আবার, অগ্ন্যুৎপাতের সক্রিয়তা অনুযায়ী তিন ধরনের হয়ে থাকে। যথা—জীবন্ত, সুপ্ত এবং মৃত। স্তূপ পর্বত: মহীভাবক আলোড়নের ফলে ভূপৃষ্ঠে সৃষ্ট চ্যুতি বরাবর কোনো শিলাস্তর যখন পার্শ্ববর্তী অংশ থেকে উঁচু হয়ে স্তূপাকৃতি পর্বতের সৃষ্টি করে, তখন তাকে স্তূপ পর্বত বলে। যেমন—ভারতের সাতপুরা, জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট। ক্ষয়জাত পর্বত : কোনো ভঙ্গিল পর্বত বা স্তূপ পর্বত বা উচ্চভূমি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তির দ্বারা (যেমন—নদী, হিমবাহ, বায়ু প্রভৃতি) ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পর্বতের মতো অবস্থান করলে, তাকে ক্ষয়জাত পর্বত বলে। ভারতের আরাবল্লি, উত্তর আমেরিকার হেনরি পর্বত এর উদাহরণ।