চতুর্থ অধ্যায় ➤ সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা : বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

১৮৫৭-এর মহাবিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ
ভূমিকা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন-
[1] স্বত্ববিলোপ নীতি : লর্ড ডালহৌসি তাঁর স্বত্ববিলোপ নীতির দ্বারা একে একে ঝাঁসি, সাতারা, নাগপুর, সম্বলপুর-
সহ বিভিন্ন দেশীয় রাজ্য দখল করেন। ফলে ওইসব রাজ্যের শাসকরা ব্রিটিশদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়।
[2] রাজপ্রাসাদ লুণ্ঠন : ব্রিটিশরা কুশাসনের অজুহাতে মযোধ্যা ও নাগপুরের রাজপ্রাসাদ লুণ্ঠন করে। এর ফলে এসব রাজ্যের শাসকরা ক্ষুব্ধ হয়।
[3] ব্রিটিশ রাজকর্মচারীদের অত্যাচার : উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ রাজকর্মচারীরা তাদের অধস্তন ভারতীয় কর্মচারীদের ঘৃণা ও অবজ্ঞা করত। ভারতীয় কর্মচারীরা কারণে-অকারণে ব্রিটিশ কর্মচারীদের কাছে হেনস্থার শিকার হত। অত্যাচারিত এই ভারতীয়দের মনে এভাবে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ কর্মচারীদের কাছে হেনস্থার শিকার হত। অত্যাচারিত এই ভারতীয়দের মনে এভাবে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

[4] ব্রিটিশ আশ্রিত রাজ্যে ক্ষোভ: ব্রিটিশ সরকার ত্রিবাঙ্কুর- সহ ব্রিটিশ আশ্রিত কয়েকটি রাজ্যের সেনাদের ভাতা কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে তারা ব্রিটিশদের ওপর ক্ষুগ্ধ হয়।

১৮৫৭-এর বিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ
ভূমিকা: ড. এ আর দেশাহ বলেছেন যে, “১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনে নির্যাতিত বিভিন্ন শ্রেণির অসন্তোষের ফল।” এই বিদ্রোহের প্রধান অর্থনৈতিক কারণগুলি ছিল নিম্নরূপ—
[1]অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের অর্থ ও সম্পদ একনাগাড়ে লুণ্ঠন করলে দেশীয় রাজ্যগুলির রাজকোশ শূন্য হয়ে পড়ে। দেশের আর্থিক দুর্দশা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
[2] অবশিল্পায়ন: ব্রিটিশ কোম্পানির শোষণমূলক শিল্প ও বাণিজ্যনীতির ফলে ভারতে অবশিল্পায়ন ঘটে। ব্রিটিশ শিল্পজাত পণ্য বিনাশুল্কে ভারতে ঢুকলে দেশীয় বণিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
[3] বেকারত্ব : ভারতের বস্ত্রশিল্প-সহ বিভিন্ন কুটিরশিল্প ধ্বংস হলে এসব শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ও কারিগরদের একটি বড়ো অংশ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ে। আবার ব্রিটিশদের একচেটিয়া বাণিজ্যের ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীরা যথেষ্ট ক্ষতির শিকার হয়।
[4] রাজস্ব বৃদ্ধি : ব্রিটিশরা ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে সেখানকার প্রজাদের ওপর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব চাপিয়ে দেয়।
[5] ব্রিটিশ সহযোগীদের শোষণ: ব্রিটিশ কোম্পানির সহযোগী দেশীয় জমিদার, মহাজন প্রমুখও প্রজাদের ওপর নানাভাবে শোষণ চালায়। ফলে প্রজাদের ক্ষোভ ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

১৮৫৭-এর বিদ্রোহের সামাজিক কারণ
ভূমিকা: ব্রিটিশ শাসন ভারতীয় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করলে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহের শুরু হয়। এই বিদ্রোহের সামাজিক কারণগুলি ছিল নিম্নরূপ—
[1] শাসক-শাসিত সম্পর্ক : ইংরেজ ভারতীয় শাসক ও শাসিতের মধ্যে ব্যবধান ও বৈষম্য ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং ভারতীয়রা নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে পড়ে।
[2] ভারতীয়দের ঘৃণা : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত সর্বত্র ইংরেজরা ভারতীয়দের ঘৃণার চোখে দেখত। বহু ইউরোপীয় ক্লাবের দরজায় লেখা থাকত ‘কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।'ওয়ারেন হেস্টিংস বলেছেন, “কয়েক আগে পর্যন্ত অধিকাংশ ইংরেজ ভারতীয়দের প্রায় বর্বর মনে করত।”
[3] রক্ষণশীল মনোভাব : ভারতীয়রা এদেশে বিদেশি শ্বেতাঙ্গ শাসন কখনই মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি। মোগল শাসনের পতন ঘটানোর জন্য মুসলিমরা ব্রিটিশদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। আবার সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ, বিধবাবিবাহ প্রচলন প্রভৃতির জন্য রক্ষণশীল হিন্দুরা ব্রিটিশদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। অত্যাচার ও
[4] ব্রিটিশ কর্মচারীদের অত্যাচার: ব্রিটিশ প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ব্যভিচার ভারতীয়দের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। কোল, ভিল, সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি চরম অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়। এর ফলে ভারতবাসী প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়।

মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ
ভূমিকা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে এনফিল্ড রাইফেল-এর ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সিপাহিরা ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহ শুরু করে। এই রাইফেলের ব্যবহারই বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ সৃষ্টি করে।
[1] এনফিল্ড রাইফেল : ব্রিটিশ কোম্পানি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে এনফিল্ড রাইফেল নামে এক বিশেষ ধরনের বন্দুকের ব্যবহার শুরু করে। এই রাইফেলে ব্যবহৃত কার্তুজ বা টোটার খোলসটি দাঁত দিয়ে কেটে রাইফেলে ভরতে হত।
[2] ধর্মচ্যুতির আশঙ্কা: সেনাবাহিনীতে গুজব ছড়ায় যে, এনফিল্ড রাইফেল-এর টোটার খোলসটি গোরু ও শূকরের চর্বি দিয়ে তৈরি। ফলে হিন্দু ও মুসলিম সিপাহিরা ধর্মচ্যুত হওয়ার ভয়ে এই টোটা ব্যবহারে অসম্মত হয়।
[3] বিদ্রোহ: ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এনফিল্ড রাইফেল ব্যবহারের জন্য ভারতীয় সেনাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে সেনারা বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায়। ব্যারাকপুর সেনানিবাসের সিপাহি মঙ্গল পান্ডে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ২৯ মার্চ প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
[4] বিতর্ক: ঐতিহাসিক সি বল এনফিল্ড রাইফেল-এর কার্তুজের ঘটনাকে সিপাহি বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ বলে মনে করেন না। তিনি দেখিয়েছেন যে, বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী সিপাহিরা এই কার্তুজ ইংরেজদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেন

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের সূত্রপাত ও প্রসার
ভূমিকা: ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার ও শোষণ ভারতের সর্বস্তরের মানুষের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এই
পরিস্থিতিতে এনফিল্ড রাইফেল-এর টোটার ব্যবহারকে কেন্দ্র। করে ভারতীয় সিপাহিরা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে।
[1] বহরমপুরে বিক্ষোভ : সর্বপ্রথম মুরশিদাবাদের বহরমপুর সেনানিবাসের ১১ নং নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সিপাহিরা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম বিক্ষোভ দেখায়।
[2] মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহ ঘোষণা: ব্যারাকপুর সেনানিবাসের ৩৪ নং নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সিপাহিরা অভ্যুত্থান ঘটায়। এখানকার সিপাহি মঙ্গল পান্ডে (১৮২৭-৫৭ খ্রি.) ২৯ মার্চ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সরকার মঙ্গল পান্ডেকে গ্রেফতার করে। বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। তিনি হলেন বিদ্রোহের প্রথম শহিদ।
[3] সেনা বিদ্রোহের প্রসার : ব্যারাকপুরের সেনা অভ্যুত্থানের খবর শীঘ্রই দেশের অন্যান্য সেনানিবাসে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে বিদ্রোহ শুরু হয়। ১০ মে মিরাট এবং ১১ মে দিল্লি সেনানিবাসে বিদ্রোহ শুরু হয়।
[4] জনগণের অংশগ্রহণ : সিপাহি বিদ্রোহ ক্রমে অযোধ্যা, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, এলাহাবাদ, মোরাদাবাদ, ফৈজাবাদ, ঝাঁসি, পাটনা প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

মহাবিদ্রোহের নেতৃত্ব
ভূমিকা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুর সেনানিবাসের সিপাহি মঙ্গল পান্ডে প্রথম ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন। ক্রমে এই বিদ্রোহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা ব্যক্তির নেতৃত্বে ছড়িয়ে পড়ে।
[1] দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ: বিদ্রোহী সিপাহিরা সিংহাসনচ্যুত মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ (১৭৭৫-১৮৬২ খ্রি.) কে বিদ্রোহের নেতা বলে ঘোষণা করে। মোগল শাসনের উত্তরাধিকারী এবং অখণ্ড ভারতবর্ষের প্রতীক হিসেবে তাঁর নামে বিদ্রোহ পরিচালিত হয়। প্রকৃতপক্ষে ৮০ বছর বয়সের বৃদ্ধ বাহাদুর শাহ ছিলেন নামসর্বস্ব নেতা মাত্র।
[2] কানপুর: কানপুরে মহাবিদ্রোহের নেতা ছিলেন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাও-এর দত্তক পুত্র নানা সাহেব (প্রকৃত নাম গোবিন্দ ধন্দ পন্থ)। তিনি কানপুর থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করে নিজেকে ‘পেশোয়া’ বলে ঘোষণা করেন। তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর তাঁতিয়া টোপি (প্রকৃত নাম আত্মারাম পাণ্ডুরঙ্গ টোপি) এবং হাকিম আজিমুল্লা ও বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন।
[3] অযোধ্যা : অযোধ্যার বিদ্রোহের অন্যতম নেতৃ ছিলেন বেগম হজরত মহল। তিনি লক্ষ্ণৌ-এর সিপাহি এবং অযোধ্যার জমিদার ও কৃষকদের সহায়তায় এক সর্বাত্মক বিদ্রোহী সংগঠন গড়ে তোলেন।
[4] ঝাঁসি: ঝাঁসিতে সিপাহি বিদ্রোহের নেত্রী ছিলেন বিধবা রানি লক্ষ্মীবাঈ। ইংরেজ সেনাপতি হিউ রোজ ঝাঁসি আক্রমণ করলে তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শেষপর্যন্ত ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে কাল্লির যুদ্ধে তিনি নিহত হন। তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ নেতৃত্ব ভবিষ্যতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা দেয়।
[5] বিহার : বিহারে সিপাহি বিদ্রোহের অন্যতম নেতা ও সংগঠক ছিলেন রাজপুত বীর কুনওয়ার সিং। ব্রিটিশ- বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি গুরুতর আহত হন এবং এর পরে মারা যান।
[6] ফৈজাবাদ : ফৈজাবাদের মৌলবি আহম্মদুল্লা সিপাহি বিদ্রোহের সময় ইংরেজদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরা ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। অবশেষে তিনি ইংরেজদের অনুগত এক রাজার হাতে নিহত হন।

ভূমিকা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপা১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের প্প্রকৃতি বা চরিত্র হি বিদ্রোহের প্রকৃতি বিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। যেমন-

(1) সিপাহি বিদ্রোহ: অক্ষয়কুমার দত্ত ,হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় দাভাই নওরোজি, চার্লস রেকস্, জন মিলি প্রমুখ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে নিছক 'সিপাহি বিদ্রোহ' বলে মনে করেন। চালস রেকস্-এর মতে, "এটি ছিল কেবল সিপাহিদের আভুথান ।"
(2) সামন্ত বিদ্রোহ: রজনীপাম দত্ত, রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে রক্ষণশীল ও সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলির অভ্যুত্থান বলে অভিহিত করেছেন মতে, নানা সাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, কুনওয়ার সিং প্রমুখ সামন্তশ্রেণির মানুষ নিজের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন।
তাঁদের [3] গণবিদ্রোহ: ঐতিহাসিক নর্টন, ম্যালেসন, বল, জন কে প্রমুখ এই বিদ্রোহের গণচরিত্র লক্ষ করে একে ‘গণবিদ্রোহ' বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, এই বিদ্রোহ দিল্লি, অযোধ্যা, লক্ষ্ণৌ, কানপুর, বেরিলী, ঝাঁসি, বিহার-সহ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
[4] জাতীয় বিদ্রোহ: ঐতিহাসিক আউট্রাম, ডাফ, রবার্টসন, টোরি দলের নেতা ডিসরেলী, সমাজতন্ত্রবিদ কার্ল মার্কস প্রমুখ এই বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, মুজাফফরনগর, বিহার, উত্তরপ্রদেশে সিপাহিদের সঙ্গে সংযোগ ছাড়াই অসামরিক লোকজন ও জমিদারশ্রেণি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

[5] প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ: বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকার সহ কেউ কেউ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক সুশোভন সরকার প্রমুখও এই বিদ্রোহকে স্বাধীনতা যুদ্ধ ও জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম বলে অভি[হিত করেছেন।
[6] মহাবিদ্রোহ : ভারতের জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকরা এই বিদ্রোহের ব্যাপকতা লক্ষ করে একে মহাবিদ্রোহ নামে অভিহিত করেন।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রকৃতি/ চরিত্র/স্বরুপ
ভূমিকা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ব্রিটিশ-বিরোধী মহাবিদ্রোহ অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে এবং ভারতে ইংরেজ শাসনের ভিতকে কাঁপিয়ে দেয়। এই বিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
[1] সিপাহি বিদ্রোহ: স্যার জন লরেন্স, জন সিলি, চার্লস রেক্স প্রমুখ ইউরোপীয় ঐতিহাসিক এবং অক্ষয়কুমার দত্ত, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, কিশোরীচাঁদ মিত্র, দাদাভাই নওরোজি প্রমুখ ভারতীয় ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ‘সিপাহি বিদ্ৰোহ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে
এই বিদ্রোহে যোগদানকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল। নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধি করা। এই বিদ্রোহে সারা ভারতের সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ এতে যোগ দেয়নি। দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড়ো অংশ বিদ্রোহকে
সমর্থন করেনি। শিখ ও গোরখা সেনারা বরং বিদ্রোহের সময় ইংরেজদের সহায়তা করেছিল। কিশোরীচাঁদ মিত্র বলেছেন, “এই বিদ্রোহ ছিল একান্তভাবেই সিপাহিদের অভ্যুত্থান”।
[2] সামন্ত বিদ্রোহ: রজনীপাম দত্ত, রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ সেন, মানবেন্দ্রনাথ রায় প্রমুখ ১৮৫৭-র
বিদ্রোহকে রক্ষণশীল ও সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলির অভ্যুত্থান বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, নানা
সাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, কুনওয়ার সিং প্রমুখ সামন্তশ্রেণির মানুষ এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। এটি ছিল ভারতের সনাতনপন্থীদের শেষ বিদ্রোহ। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন যে, এই বিদ্রোহ ছিল ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত শ্রেণি ও মৃতপ্রায় সামন্তশ্রেণির মৃত্যুকালীন আর্তনাদ'।
[3] গণবিদ্রোহ: নর্টন, ম্যালেসন, বল, জন কে প্রমুখ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে একটি ‘গণবিদ্রোহ' হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন বিদ্রোহে সামন্ত নেতাদের নেতৃত্বের কথা স্বীকার করেও তাঁর ‘১৮৫৭’ গ্রন্থে বলেছেন যে, এই বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত নানা স্থানে গণবিদ্রোহের আকার নেয়। ভারতের এক বৃহৎ অঞ্চল, যথা—পশ্চিম বিহার থেকে পূর্ব পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে বিদ্রোহ বিস্তার লাভ করে। অন্তত কিছুদিনের জন্য এই অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, কারিগর, স্বেচ্ছায় এই বিদ্রোহে যোগ দেয়।
[4] জাতীয় বিদ্রোহ: ঐতিহাসিক আউট্রাম, ডাফ, রবার্টসন, টোরি দলের নেতা ডিজরেইলি, সমাজতন্ত্রবিদ কার্ল মার্কস প্রমুখ এই বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক শশীভূষণ চৌধুরী বলেছেন যে, এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয় যুদ্ধ। তাঁদের মতে, মুজাফফরনগর, বিহার, উত্তরপ্রদেশে সিপাহিদের সঙ্গে সংযোগ ছাড়াই অসামরিক লোকজন ও জমিদারশ্রেণির ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠে। সিপাহিরা সিংহাসনচ্যুত মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করলে দেশবাসীর মনে জাতীয়তাবাদী মনোভাব জেগে ওঠে।
[5] স্বাধীনতা সংগ্রাম : বিপ্লবী দামোদর বিনায়ক সাভারকার (বীর সাভারকার) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ভারতের 11 যুদ্ধ বলে অভিপ্রথম স্বাধীনতা হিত করেছেন। এ ছাড়া কার্ল মার্কস, এঙ্গেল্স, পি সি জোশী, অশোক মেহতা, ঐতিহাসিক অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক সুশোভন সরকার প্রমুখ ১৮৫৭-এর বিদ্রোহকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছেন ।

[6] মহাবিদ্রোহ: ভারতের জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকগণ এই বিদ্রোহের ব্যাপকতা লক্ষ করে একে মহাবিদ্রোহ নামে অভিহিত করেন। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় একে মহান বিপ্লব বলে অভিহিত করেছেন। এরিক স্টোক্স বলেছেন যে, এই বিদ্রোহ ছিল ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের শেষ অধ্যায়। এই আন্দোলনে ইংরেজদের বিতাড়নের কথা ভাবা হয়েছিল।

উপসংহার: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করলেও এসব দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধেও বিভিন্ন যুক্তি দেওয়া হয়। যেমন—ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের তথাকথিত প্রথম জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম – প্রথম নয়, জাতীয় নয় এবং স্বাধীনতা সংগ্রামও নয়। ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ এই বিদ্রোহের গণচরিত্র অস্বীকার করে বলেছেন, বিদ্রোহে যত সংখ্যক সৈন্য যোগ দিয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি সৈন্য বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের সাহায্য করেছিল। এজন্যই বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব হয়। অধ্যাপক এরিক স্টোক্স, বেইলি প্রমুখ মনে করেন যে, এই বিদ্রোহে স্থানীয় কৃষকদের প্রতিরোধ, জাতীয় প্রতিরোধ প্রভৃতি বিভিন্ন ধারা-উপধারার সংমিশ্রণ ঘটেছিল।

মহাবিদ্রোহ : ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ
ভূমিকা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রকৃতি বা স্বরূপ সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদের অন্ত নেই। বিভিন্ন পণ্ডিত এই বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ, গণবিদ্রোহ, সামন্ত বিদ্রোহ, জাতীয় বিদ্রোহ প্রভৃতি বিভিন্ন নামে ব্যাখ্যা করেছেন। বিপ্লবী বিনায়ক। দামোদর সাভারকার (বীর সাভারকার) তার 'দ্য ইন্ডিয়ান ওয়ার অব ইনডিপেন্ডেন্স' (১৯০৯ খ্রি.) নামক গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ সাভারকরের মতের সপক্ষে অভিমত ব্যক্ত করলেও কেউ কেউ আবার এর বিপক্ষেও অভিমত দিয়েছেন। এ

[1] সপক্ষে : সাভারকারের মতামতকে সমর্থন করে কোনো কোনো পণ্ডিত ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে মেনে নিয়ে এর সপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন।
i. লন্ডনের স্মরণসভা: ভারতীয় বিপ্লবীরা লন্ডনে মহাবিদ্রোহের এক স্মরণ সভায় এই বিদ্রোহকে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।
ii. বিদেশি বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা: অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক সুশোভন সরকার প্রমুখ বীর সাভারকারের অভিমতকে মেনে নিয়েছেন। সুশোভন সরকারের মতে, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ জাতীয় সংগ্রাম বলে স্বীকার না করলে ইটালির কার্বোনারি আন্দোলনকে ইটালির মুক্তিযুদ্ধ বা নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে রুশ কৃষকদের যুদ্ধকে জাতীয় সংগ্রাম বলা যাবে না।
iii. মার্কসবাদীদের অভিমত: মার্কসবাদী কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেল্স এই বিদ্রোহকে ভারতীয়দের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম বলে মেনে নিয়েছেন।
iv. জোশীর অভিমত: কমিউনিস্ট নেতা পি সি জোশী তাঁর '1857, in our History' প্রবন্ধটিতে ১৮৫৭- এর বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে স্বীকার করে নিয়েছেন।
[2] বিপক্ষে : কোনো কোনো পণ্ডিত ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে মানতে অস্বীকার করে এর বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন

i. সুরেন্দ্রনাথ সেনের অভিমত: ঐতিহাসিক ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন তাঁর 'Eighteen Fifty Seven' নামক গ্রন্থে ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে মেনে নেননি। তাঁর মতে, সিপাহি বিদ্রোহের নেতাদের লক্ষ্য ছিল ‘প্রতিবিপ্লব।
ii. রমেশচন্দ্র মজুমদারের অভিমত: ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার দেখিয়েছেন যে, এই বিদ্রোহে ভারতের সকল অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেনি, বরং শিখ ও গোরখা সৈনিক এবং কোনো কোনে দেশীয় রাজা ইংরেজদের পক্ষে ছিল। এজন্য তিনি বলেছেন যে, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের তথাকথিত প্রথম জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম “প্রথম নয়, জাতীয় নয় এবং স্বাধীনতা সংগ্রামও নয়।”

উপসংহার: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে জাতীয়তাবাদ বা দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়নি। তাই ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলে স্বীকার করা যায় না। তবে এই বিদ্রোহই ভারতে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম বৃহত্তম অভ্যুত্থান ছিল এবং পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রেরণা জুগিয়েছিল—একথা অস্বীকার করা যায় না।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব
ভূমিকা: সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার ঘটে। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রথম প্রসার শুরু হয় বাংলাদেশে। এর ফলে ইংরেজি ও আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাগ্রহণ করে একদল শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে। তারা রক্ত-মাংসে ভারতীয় হলেও চিন্তাভাবনায় পাশ্চাত্যের অনুরাগী ছিলেন। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের ব্রিটিশ-বিরোধী মহাবিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করলেও শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই বিদ্রোহের বিরোধিতা করে।
[1] ব্রিটিশ শাসনের ওপর বিশ্বাস: পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তদের একটি বড়ো অংশ মনে করত যে,
ব্রিটিশ শাসন ভারতীয়দের পক্ষে কল্যাণকর। এজন্য তারা ভারতের ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহেরও বিরোধী ছিল।
[2) সিপাহি বিদ্রোহের বিরোধিতা: শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি বড়ো অংশ ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে সমর্থন করেনি। বিদ্রোহের মাধ্যমে ইংরেজদের বিতাড়নের পর কেউ ভারতে জাতীয় রাষ্ট্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে কিনা এই বিষয়ে তারা যথেষ্ট সন্দিহান ছিল। তাই শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি বড়ো অংশ এই বিদ্রোহকে সমর্থন করেনি।
[3] খ্যাতনামা বাঙালিদের অভিমত: সমকালীন বিভিন্ন শিক্ষিত বাঙালি ১৮৫৭-র বিদ্রোহের বিরোধিতা করেন।
1. হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকায় দিল্লি ও মিরাটের বিদ্রোহের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিদ্রোহীদের নৃশংস, বর্বর এবং নরহত্যাকারী দস্যু বলে অভিহিত করেন।

II. সমসাময়িক বাঙালি পণ্ডিত রাজনারায়ণ বসু ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে 'নৈরাজ্যবাদী' এবং নানা সাহেব, আজিমউল্লার মতো বিদ্রোহী নেতাদের অন্যায়কারী দানব' বলে অভিহিত করেন।
iii. সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি জনসভায় বলেন যে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল নিছক একটি সামরিক বিদ্রোহ। এতে জনগণের সমর্থন ছিল না।
[4] পরিণাম : শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিরা প্রথমদিকে বিদ্রোহকে সমর্থন না করলেও বিদ্রোহ দমনে সরকার যে নিষ্ঠুর দমননীতির আশ্রয় নেয় তা শিক্ষিতদের চোখ খুলে দেয়। তারা উপলব্ধি করে যে, ব্রিটিশ শাসন কখনও ভারতীয়দের কল্যাণ করবে না। এই চেতনা পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে।
উপসংহার: শিক্ষিত বাঙালি সমাজ ব্রিটিশদের অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করে জীবিকানির্বাহ করত। এজন্য তারা মহাবিদ্রোহের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ব্রিটিশদের বিরাগভাজন হতে চায়নি। যাই হোক, সিপাহিদের বিদ্রোহের প্রতি তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমর্থন না জানানোয় সিপাহিরা তাদের শত্রু বলে মনে করত।

জমিদার সভা
ভূমিকা: উনিশ শতকের মধ্যভাগে ভারতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এজন্য ড. অনিল শীল এই যুগকে 'রাজনৈতিক সভাসমিতির যুগ' বলে অভিহিত করেছেন। এই সময় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠনগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল জমিদার সভা। এটি ছিল ভারতের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সংগঠন।
[1] প্ৰতিষ্ঠা : ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে (১৯ মার্চ) দ্বারকানাথ ঠাকুরের উদ্যোগে এবং রাজা রাধাকান্ত দেবের সভাপতিত্বে কলকাতায় জমিদার সভা প্রতিষ্ঠিত হয়। জমিদার সভা প্রতিষ্ঠার পর ‘ভূমিমালিক সমিতি' নামে এটি অধিক পরিচিতি লাভ করে।
[2] সদস্য : জমিদার সভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন জমিদার এবং ধনী ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজা রাধকান্ত দেব, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রাজকমল সেন, ভবানীচরণ মিত্র প্রমুখ বড়ো বড়ো ভূস্বামী। বাংলার ব্যাবসাবাণিজ্যে নিযুক্ত বেসরকারি ব্রিটিশরাও জমিদার সভার সদস্য হতে পারত। তবে সাধারণ মানুষ জমিদার সভার সদস্য হওয়ার বিশেষ সুযোগ পেত না।

[3] লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: জমিদার সভার প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল জমিদার শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করা। এই উদ্দেশ্যে সভার সদস্যরা কলকাতার ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা চালায়। তারা লন্ডনের ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সোসাইটির সভাপতি জর্জ থম্পসনকে লন্ডনে ভূমি মালিক সমিতির প্রতিনিধি নিয়োগ করে।
[4] কর্মসূচি: জমিদার সভা বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে— i. জমিদারদের স্বার্থরক্ষার জন্য তারা সরকারের কাছে দাবি জানায়। ii. তারা ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে। iii. তারা ভারতের সর্বত্র চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রসার ঘটানোর দাবি জানায়। iv. তারা নিষ্কর জমি ভোগদখলের অধিকার পুনঃপ্রবর্তন বন্ধ করার চেষ্টা চালায়। v. শাসনসংস্কারের জন্য তারা সরকারের কাছে দাবি জানায়। vi. তারা সরকারের কাছে পুলিশবিভাগ, বিচারবিভাগ, রাজস্ববিভাগের সংস্কারের দাবি জানায়।
[5] অবদান : জমিদার সভা ভারতে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারার সূচনা করে। এই সভার আবেদনে সরকার ১০ বিঘা পর্যন্ত ব্রশ্নোত্তর জমির খাজনা মকুব করে। ড. রাজেন্দ্রলাল মিত্র মনে করেন যে, জমিদার সভাই ছিল ভারতের স্বাধীনতার অগ্রদূত।
[6] বিলুপ্তি: বাংলার বাইরে জমিদার সভা তাদের প্রভাব বিস্তারে সফল হয়নি। তা ছাড়া ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ জমিদার সভা ক্রমে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তবে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এর অস্তিত্ব কোনোরকমে টিকে ছিল। পরবর্তীকালে এর স্থান দখল করে নেয় বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি।
উপসংহার: জমিদার সভা ছিল একান্তভাবেই জমিদার ও বানিয়াদের একটি সংগঠন। এর সদস্যরা এর আভিজাত্য রক্ষায় সর্বদা যত্নবান থাকতেন। ব্রিটিশরাজের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনেও তারা সচেষ্ট থাকতেন। তবে এই সংগঠন ভারতে আধুনিকপ্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এই সংগঠনের অনুকরণে পরবর্তীকালে ভারতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। ফলে এদেশে ব্রিটিশ-বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ভারতসভার প্রতিবাদ আন্দোলন
ভূমিকা: উনিশ শতকে ভারতে যেসব রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে সেগুলির মধ্যে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ‘ভারতসভা’ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভারতসভা বিভিন্ন কার্যাবলি বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
[1] প্রতিষ্ঠা : সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি প্রমুখের উদ্যোগে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ভারতসভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই কলকাতার অ্যালবার্ট হলে ভারতসভার প্রথম অধিবেশন বসে।
[2] সুরেন্দ্রনাথের উদ্যোগ : সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতসভাকে একটি সর্বভারতীয় সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করেন এবং সভা সমাবেশের মাধ্যমে জনমত গঠনের উদ্যোগ নেন। তাঁর সক্রিয় উদ্যোগ ও প্রচারের ফলে লক্ষ্ণৌ, মিরাট, লাহোর, সিন্ধু প্রভৃতি অঞ্চলে শীঘ্রই ভারতসভার শাখা স্থাপিত হয়।
[3] কর্মসূচি : ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার প্রসার 'ঘটানোর উদ্দেশ্যে ভারতসভা বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। এগুলি হল—i. ভারতীয়দের জনমত গঠন করা, ii. রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ করা, iii. হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপন করা, iv. স্বল্প শিক্ষিত ও সাধারণ ভারতীয়দের রাজনৈতিক গণ- আন্দোলনে শামিল করা।
[4] আই সি এস পরীক্ষার বয়স নিয়ে আন্দোলন: ব্রিটিশ সরকার আই সি এস বা ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীদের ঊর্ধ্বর্তম বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ১৯ বছর করে। ফলে ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ইংল্যান্ড ও ভারতে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহণ এবং এই পরীক্ষায় বসার ঊর্ধ্বতম বয়স ২২ বছর করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন।
[5] লিটনের দমনমূলক আইনের বিরোধিতা: ভারতসভা চরম স্বৈরাচারী ব্রিটিশ শাসন লর্ড লিটনের তীব্র দমনমূলক আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। i. লিটন দেশীয় ভাষা দ্বারা দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেন। ভারতসভা এর তীব্র প্রতিবাদ করে। ii. লিটন অস্ত্র আইন (১৮৭৮ খ্রি.) প্রণয়ন করে সরকারের অনুমতি ছাড়া ভারতীয়দের আগ্নেয়াস্ত্র রাখা নিষিদ্ধ করেন। এর বিরুদ্ধে ভারতসভা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুললে পরবর্তী বড়োলাট লর্ড রিপন এই আইন প্রত্যাহার (১৮৮১ খ্রি.) করেন। [6] ইলবার্ট বিল আন্দোলন: লর্ড রিপন-এর (১৮৮০-৮৪ খ্রি.) পূর্বে এদেশে কোনো ভারতীয় বিচারক কোনো ইংরেজের বিচার করার অধিকারী ছিল না। রিপন ইলবার্ট বিল-এর দ্বারা ভারতীয় বিচারকদের এই অধিকার দিলে শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়রা এই বিলের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। বিলের সমর্থনে সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ভারতসভাও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে।

[7] অন্যান্য আন্দোলন: কৃষকদের ওপর সরকার জমিদারদের শোষণ ও অত্যাচার, শোষণমূলক আমদানি ও শুল্ক আইন, সম্পদের নিষ্ক্রমণ, আসামের চা বাগানের কুলিদের ওপর অত্যাচার প্রভৃতির বিরুদ্ধে ভারতসভা আন্দোলন চালায়। ভারতসভা প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন-পরিষদ গঠন, স্বায়ত্ত্বশাসন প্রবর্তন, প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন, মদ্যপান নিবারণ প্রভৃতির দাবিতেও আন্দোলন করে।
উপসংহার: ভারতসভার বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সহায়তায় সুরেন্দ্রনাথের সক্রিয় উদ্যোগে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলন বা অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কনফারেন্স নামে মহাসভা অনুষ্ঠিত হয়। ড. অমলেশ ত্রিপাঠী সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলনকে ‘জাতীয় কংগ্রেসের মহড়া’ বলে অভিহিত করেছেন। কেননা, এই সম্মেলনের প্রেরণায় অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশন বসলে সুরেন্দ্রনাথ তাঁর অনুগামীদের নিয়ে অধিবেশনেযোগ দেন। এর ফলে কংগ্রেস অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।