চতুর্থ পাঠ

যান্ত্রিক সভ্যতালব্ধ অস্থির সামাজিক পরিবেশে কবি মানবিকতার অভাব বোধ করেছেন। সেজন্য মানবিকতার স্পর্শযুক্ত মানুষকে খুঁজতে চেয়েছেন। এখানে 'তোমার মতো' বলতে কোনো বিশেষ ব্যক্তি নয়, সমগ্র পৃথিবীর মানুষের মানবিকতা ও শুভবোধের প্রতি কবি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি মানুষের মানবিক গুণগুলির জেগে ওঠার কামনা করেছেন।

‘দাঁড়াও' কবিতায় মানুষ হয়ে বলতে মানবিক গুণসম্পন্ন হতে বলেছেন। একজন সুস্থ স্বাভাবিক সমাজবদ্ধ মানুষের মধ্যে কিছু গুণ আশা করা যায়। সেই গুণগুলি হল দয়া, পরোপকার, সহানুভূতিবোধ। কবি সমাজে বিপন্ন মানুষের কান্না শুনেছেন, তাই প্রকৃত মানুষই পারবে বিপন্ন মানুষের ব্যথায় প্রলেপ দিতে। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি 'মানুষ হয়ে' কথাটি ব্যবহার করেছেন।

একশো বিঘা মাঠের দক্ষিণদিকের বাঁধ কেটে না দিলে চাষিদের কত বড়ো ক্ষতি হবে তা বুঝতে পেরেও বেশী নিজের স্বার্থের জন্য সে বাঁধ কাটাতে রাজি হলেন না। তাঁর এই মনোভাব জেনে রমেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। এরপর বেণী জানালেন, চাষিরা নিরুপায় হলে তাঁদের কাছেই জমি বন্ধক রাখবে এবং সেই সুযোগে বেগীদের কিছু রোজগার হবে। বেশীর এরকম চরম স্বার্থপর নীচ মনোবৃত্তির পরিচয় পেয়ে সহানুভূতিশীল রমেশ বেণীর প্রতি ঘৃণায়, লজ্জায়, ক্রোধে, ক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলেন।

রমেশ ভেবেছিলেন, রমা চাষিদের সমস্যার কথা শুনে তাঁর মতোই বাঁধ কাটিয়ে দিতে রাজি হবেন। তিনি রমার প্রতি উচ্চধারণা পোষণ করতেন। কিন্তু তিনি যখন বুঝলেন যে রমা নিজের ক্ষতি স্বীকার করতে রাজি নন, এমনকি দরিদ্র চাষিদের আসন্ন সংকটের কথা জেনেও তিনি নিজের লোকসানের বিষয় নিয়েই চিন্তিত, তখন রমেশ বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন।

রমা জানতেন, বাঁধ কাটিয়ে দিলে বছরে দুশো টাকার লোকসান হবে। রমার পিতা রমা ও তাঁর ভাইয়ের নামে সম্পত্তি লিখে দিয়ে গেছেন। নাবালক ডাইয়ের সম্পত্তির ও জমিদারির অভিভাবক রমার পক্ষে এত টাকা লোকসান করা উচিত বলে মনে হয়নি। তাই তিনি রমেশের অনুরোধে রাজি হননি।

রমেশ রমা সম্বন্ধে এ কথা বলেছিল।

রমেশের মনে ধারণা ছিল, দরিদ্র চাষিদের সংকটের কথা চিন্তা করে রমা নিজের লোকসানের কথা না ভেবে বাঁধ কাটাতে রাজি হবেন। কিন্তু রমা ক্ষতি স্বীকার করতে চাননি। রমাকে রমেশ অনুরোধ করলে রমা রমেশের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। রমার এই স্পর্ধা দেখে রমেশ রাগে বিহ্বল হয়ে যান। তাঁর তখন রমাকে অতি নীচ বলে মনে হয়। রমার সম্বদ্ধে তাঁর ভুল ধারণা ভেঙে যাওয়ায় রমেশ এই মন্তব্য করেছিলেন।

একশো বিঘার মাঠে সমস্ত চাষিদেরই কিছু কিছু জমি ছিল। এই মাঠ জলে ডুবে গেছে চাষিদের আশঙ্কা, জমে থাকা জল বার করে না দিলে উত্তর সমস্ত ধান নষ্ট হয়ে যাবে। মাঠের দক্ষিণ ধারের ঘোষাল ও মুখুজ্জেদের বাঁধটা কাটিয়ে দিলে জমা জল বেরিয়ে যেতে পারে। সারাদিন জমিদার বেণীবাবুর নিজে কাছে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেও তাদের কোনো লাভ হয়নি। তাই তারা দয়ালু রমেশের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল।

 

একশো বিঘার মাঠের দক্ষিণ দিকে যে বাঁধ আছে তা ঘোষাল ও মুখুজ্জ্যেদের। চাষিদের আসন্ন বিপদের কথা চিন্তা করে সহানুভূতিশীল রমেশ সেই বাঁধ কাটাতে রাজি থাকলেও, বেশী রাজি ছিলেন না। অথচ বেশী বিষয়ে মত না দিলে চাষিদের বড়ো ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই বেণীকে বাঁধ ব কাটার ছুকুম দেওয়ার জন্য রমেশ অনুরোধ করেছিলেন।

বাঁধের গায়ে একটি জলা আছে যেখানে প্রতি বছর যা মাছ উৎপন্ন হয়, তাতে দুশো টাকা আয় হয়, জমিদার বেণীবাবু শুধু বৈষয়িক লোক। চাষিদের দুঃখকষ্ট বোঝার মতো মন বা ইচ্ছা কোনোটাই তাঁর নেই, নিজের লাভ-লোকসানের বিষয়েই তিনি সচেতন। গরিব চাষিদের জন্য বছরে দুশো টাকা লোকসান করার ইচ্ছা বেণীর ছিল না। তাই বেশী বাঁধের জল বার করে দিতে চাননি। কারণ, বাঁধ কাটলে জলের সঙ্গে সঙ্গে মাছও বেরিয়ে চলে যাবে।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'পল্লীসমাজ' পাঠ্যাংশে আলোচ্য উক্তিটির বক্তা জমিদার বেণী ঘোষাল।

একশো বিঘা জমির মাঠে জল জমে কৃষকদের সারা বছরের দু-মুঠো অন্নের জোগান নষ্ট হতে চলেছে। এই বিপদের হাত থেকে রক্ষার একমাত্র উপায় মাঠের দক্ষিণধারে অবস্থিত মুখুজে ও ঘোষালদের বাঁধটা কাটিয়ে ফেলা। কৃষকরা বেণী ঘোষালের কাছে সকাল থেকে সজল নয়নে অনুরোধ জানিয়েও বিফল হয়। রমেশ বেণীর মত নেওয়ার জন্য তাঁর কাছে এলে, বেনী জানান যে, দরিদ্র কৃষকদের সারা বছরের সর্বনাশ হলেও তাঁর পক্ষে বছরে দুশো টাকা লোকসান করা সম্ভব নয়। আর দরিদ্র কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরে তাঁরই কাছে জমি বন্ধক রেখে ধার করে খাবে। এই সুযোগের সদব্যাবহার করে বেণী নিজের জমিদারি আরও গুছিয়ে নিতে পারবেন। দরিদ্র কৃষকদের শুধু ক্ষতি করে এবং নিজের আখের গুছিয়েই বেনী ক্ষান্ত হননি। দরিদ্র কৃষকদের তিনি 'ছোটোলোক' ও বলেছেন। বেণীর এই আচরণ এবং মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি একজন অত্যন্ত হীন মানসিকতাসম্পন্ন, আত্মসর্বস্ব এবং বিষয়ী ব্যক্তি। তাঁর কোনো রুচিবোধ, কোনো মানবিকতা বা সহানুভূতিবোধ নেই।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা 'পল্লীসমাজ' পাঠ্যাংশ থেকে আমরা বুঝতে পারি, বেণী ঘোষাল একজন আত্মসর্বস্ব, নির্দয়, রুচিহীন বৈষয়িক জমিদার মাত্র। তাঁর লক্ষ্য যে-কোনো উপায়ে, এমনকি তা অসৎ হলেও, জমিদারিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুছিয়ে বাড়িয়ে রেখে যাওয়া। দরিদ্র কৃষকরা তাঁর কাছে 'ছোটোলোক'। তাদের সারা বছরের খাদ্য ফসল নষ্ট হলেও বেশীর তাতে কিছু এসে যায় না। তিনি শুধু বাৎসরিক দুশো টাকা লোকসানের কথাই ভাবেন। এমনকি এই সংকটাপন্ন দরিদ্র কৃষকদের অসহায়তার সুযোগে তিনি সুদ ও বন্ধকি কারবার চালিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নিতেও পিছপা নন। একই সঙ্গে তিনি কাপুরুষ। রমেশের উদাহ, শিক্ষা, রুটিকে মূল্য দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর নেই। বরং তিনি লাঠিয়াল আকবরকে বলেন পুলিশের কাছে গিয়ে রমেশের নামে মিথ্যে নালিশ জানাতে।এর মাধ্যমে তাঁর অসৎ, কপট ও ব্যক্তিত্বহীন চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।

অভিভাবকহীন পরিবারের নাবালক ভাইয়ের একমাত্র অভিভাবক রমা একইসঙ্গে জমিদারি এবং সংসারের ভার সামলে চলেছেন। তৎকালীন সমাজের নারী হলেও, তাঁকে একজন বৈষয়িক জমিদার হিসেবেই আমরা দেখতে পাই। বেণীর মতো অত কঠোর না হলেও রমা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে কৃষকদের জন্য বাঁধ কাটিয়ে দেওয়া হবে না। কারণ বাৎসরিক দুশো টাকা লোকসান করতে তিনি রাজি হননি। রমেশের কাছে তাঁর দৃঢ় সিদ্ধান্ত জানাতে তিনি বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হননি। রমেশের অনুরোধে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরেও আসেননি, বরং রমেশকেই ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছেন। এ সকল ঘটনা থেকে বোঝা যায় রমা একজন ব্যক্তিত্বময়ী নারী এবং পুঁজে জমিদারও বটে। তবে কোথাও যেন তিনি বেণী ঘোষালের থেকে পৃথক। তিনি বাঁধ কাটাতে রাজি হননি ঠিকই, কিন্তু রমেশ বাঁধ কাটিয়ে দেওয়ার মনে মনে যেন খুশিই হয়েছেন। রমেশের প্রতি তাঁর সম্মানবোধের কথাও প্রকাশ পেয়েছে।

জমিদার বংশের আর একজন সদস্য রমেশ, বেণী ঘোষাল ও রমার থেকে একেবারেই পৃথক। তিনি জমিদার হিসেবে নয়, বরং বন্ধুর মতো অভিভাবকের মতো সমস্ত গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। কৃষকদের মুখে তাদের আসন্ন সংকটের কথা শোনামাত্র তিনি তার গুরুত্ব উপলব্ধি করে নিজের লোকসানের কথা না ভেবেই বাঁধ কাটানোর বন্দোবস্ত করার জন্য সচেষ্ট হয়েছেন। প্রথমেই তিনি গায়ের জোর প্রয়োগ করেননি। নিয়মমতো দুই শরিক বেণী ও রমার সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দুজনেরই নীচ মানসিকতা এবং খারাপ ব্যবহারে ক্ষিপ্তপ্রায় রমেশ জোর করে বাঁধ কাটিয়ে গ্রামের লোকেদের সারাবছরের অন্নাভাবের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এ ছাড়াও নিজের খরচে তিনি গ্রামে পাকারাস্তা বানিয়ে দিয়েছেন। রমেশের ব্যবহার, যুক্তিবোধ, উদারতা, বিষয়ের প্রতি আসক্তি অপেক্ষা মানুষের প্রতি সহানুভূতি তাঁকে অনেক বেশি ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে তুলেছে। তাই পৌরুষ ও ব্যক্তিত্বের সুন্দর সমন্বয়ের জন্য আমার রমেশ চরিত্রটিকেই সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।

মানুষের যাবতীয় দুর্দশার কারণ মানুষ নিজেই প্রকৃতির বিরূপতাকে মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের তৈরি হিংসা-লোভ-লালসার হাত থেকে মানুষ বাঁচতে পারে না। কিছু মানুষের অর্থ ও ক্ষমতার প্রতি আসক্তি শেষ করে দেয় প্রায় সমগ্র মানবসমাজকেই মানুষের হাতে মানুষ যত সংখ্যায় মারা যায়, অত্যাচারিত হয় তা কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনীয় নয়।

“মানুষই ফাঁদ পাতছে” অংশে মানুষের প্রতি মানুষেরই বর্বরতার কথা জোর দিয়ে বোঝাতে 'ই' ধ্বনিটি যোগ করা হয়েছে।

‘দাঁড়াও' কবিতায় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় যে 'তুমি'র প্রসঙ্গ দিে এনেছেন, তা কোনো বিশেষ ব্যক্তি নন, বরং বলা যেতে পারে এই 'তুমি' হল মানবিকতা, সমগ্র পৃথিবীর মানুষের শুভবোধ। বর্তমান পৃথিবীতে নিত্যদিন মনুষ্যত্বের বিকৃতি, মানুষের প্রতি মানুষের হিংস্র আচরণ কবিকে পীড়িত করছে। তাই কবি চিরন্তন মানবিকতা ও মনুষ্যত্বকে মনে মনে কামনা করছেন এবং মানবিক গুণগুলির যাতে পুনর্জাগরণ ঘটে, তাই চেয়েছেন।

কবি ট্যাক্সি করে যে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, সে পথেই গলির মোড়ে তিনি লতা-পাতাহীন শুকনো মৃতপ্রায় একটি গাছ দেখেন। একটু দূরে পথের মাঝখানে একদল ছন্নছাড়া যুবক আড্ডা দিচ্ছিল, যারা যখন-তখন হাওয়া খাওয়ার জন্য গাড়ি থামিয়ে লিফট চায়। তাই ড্রাইভার সে পথে যেতে চায়নি।কিন্তু সে পথেই কবি যান এবং শেষপর্যন্ত সেইসব ছন্নছাড়া যুবক গাড়িচাপা পড়া এক ভিখারির দলা পাকানো রক্তাক্ত দেহকে ওই ট্যাক্সিতে তুলে নেয়। কবি ভিখারির রক্তের দাগ থেকে নিজেকে বাঁচাতে ট্যাক্সি থেকে নেমে পড়েন।

গাছ বলতে যা বোঝায় অর্থাৎ পাতা-ফুল-সতেজতা-সরসতা, এ সবের কোনো কিছুই কবির দেখা গাছটিতে ছিল না। বরং সেটি ছিল শুষ্ক, রুক্ষ, রিক্ত ও জীর্ণ, কাঠি দিয়ে সাজানো গাছের কঙ্কাল।কোনো লতাপাতা, ছাল-বাকল নেই, অথবা কোনো সবুজের ছোঁয়া ছিল না সেই গাছে। তাই কবি গাছ না বলে 'গাছের প্রেতচ্ছায়া' বলেছেন।

ওদের সাধারণ পরিচয় হল যে ওরা আমাদের দেশের হাজার হাজার বেকার যুবকদের কয়েকজন। কবিতায় এই ছন্নছাড়া যুবকদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে বেকার যুবকরা নীতিহীন, আদর্শহীন। এদের ভদ্রতাবোধ নেই, এরা শ্রীলতা শালীনতা বোঝে না। এদের জন্য কলেজে সিট নেই, অফিসে চাকরি নেই, কারখানায় কাজ নেই, ঘরে বাইরে কোথাও কোনো জায়গা নেই, প্রেম নেই, দরদ নেই, এমনকি সামান্য আড্ডা দেওয়ার জন্য মধ্যবিত্ত বাড়ির যে রকটি বরাদ্দ ছিল, সেটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তাই কবির মতে এরা 'নেই রাজ্যের বাসিন্দে'।

কবি যে ট্যাক্সিতে উঠেছিলেন তার ড্রাইভার এই সাবধানবাণী উচ্চারন করেছিলেন।

"ওদের' বলতে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়া একদল ছন্নছাড়া বেকার যুবককে বোঝানো হয়েছে, যাদের পরনে চোঙা প্যান্ট, চোখা জুতো, আর মেজাজ রুক্ষ।

উদ্দিষ্ট যুবকরা ছাড়া নীতিহীন, বিনয়-ভদ্রতাহীন এক 'নেই-রাজ্যের বাসিন্দা। ওরা গাড়ি দেখলেই লিফ্ট চায় এবং ড্রাইভার ও যাত্রীকে হেনস্থা করে। তাই ট্যাক্সি ড্রাইভার কবির প্রতি এই ধরনের সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন।

উত্তর: অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত 'ছন্নছাড়া' কবিতায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়া একদল ছন্নছাড়া বেকার যুবকের কথা এখানে বলা হয়েছে।

তাদের জীবনের এই পরিস্থিতির কারণ, শিক্ষার শেষে কাজের সুযোগ না পাওয়া। এদের জীবনে কিছুই নেই। কলেজের সিট থেকে আরম্ভ করে খেলার টিকিট, হাসপাতালের বেড, বাড়িতে ঘর, খেলার মাঠ, অনুসরণযোগ্য নেতা, প্রেরণা জাগানো প্রেম কিছুই নেই। এমনকি মধ্যবিত্ত বাড়ির একচিলতে রকটুকুও নেই। সেটিও ভাঙা পড়েছে। ফলে দেশের যুবসম্প্রদায় নেমে এসেছে রাস্তায়, সেখানেই তাদের আড্ডা।

ফেরার পথে কবি দেখতে পেলেন গলির মোড়ে শুকনো গাছটি বৈরাগ্য পেরিয়ে নতুন প্রাণের আনন্দে উদ্ভাসিত হয়েছে। হাজার হাজার সোনালি কচিপাতা এবং গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলের সম্ভারে গাছটির শাখা-প্রশাখা ঢেকে গেছে। সেই ফুলের গন্ধে সুবাসিত হয়ে উঠেছে সমগ্র প্রকৃতি। রং-বেরঙের পাখি গাছের স্নেহভরা ছায়া, শ্যামল আত্মীয়তার আমন্ত্রণে, 'কঠোরের প্রচ্ছন্নে মাধুর্যের বিস্তীর্ণ আয়োজন'। -এ শামিল হতে উড়ে এসেছে।

‘ছন্নছাড়া' কবিতায় ছন্নছাড়া যুবকের দল গাড়িচাপা পড়া আহত এক ভিখারির রক্তমাখা দেহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কবির ভাড়া করা ট্যাক্সিতে তোলার চেষ্টা করছিল। ভিখারির রক্তের দাগ থেকে নিজের জামাকাপড় বাঁচাতে কবি তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে যান। আসলে আলোচ্য অংশে কবি তথাকথিত ভদ্র ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির, সমাজের প্রতি তাদের কর্তব্য থেকে নিজেদের বিরত রাখার মানসিকতাকে কটাক্ষ করে মন্তব্যটি করেছেন।

‘ছন্নছাড়া' কবিতায় বেকার যুবকদের দল গাড়িচাপা পড়া আহত ভিখারির রক্তমাখা দলাপাকানো দেহ পাঁজাকোলা করে কবির ভাড়া করা ট্যাক্সির মধ্যে তুলে নেয়। আহত ভিখারির দেহে তখনও প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়ে ছন্নছাড়া যুবকের দল সমস্বরে আনন্দে ঝংকার তুলে চেঁচিয়ে বলে, "প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে।"

কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর 'ছন্নছাড়া' কবিতাটির মধ্য দিয়ে প্রাণের আশাবাদ এবং এক প্রত্যয়ের তপ্ত শঙ্খধ্বনি' ব্যক্ত করেছেন।

কবিতায় বর্ণিত তথাকথিত 'নেই রাজ্যের বাসিন্দো রোখা মেজাজের বেকার যুবকরা সমাজে ছন্নছাড়া হিসেবেই পরিচিত। তারা বিনয়ী নয়, তাদের ভদ্রতা শালীনতা নেই তাদের জন্য সর্বত্রই 'না'। আপাতভাবে ছন্নছাড়া এই যুবকরাই রাস্তায় পড়ে থাকা এক বেওয়ারিশ ভিখারির মরণাপন্ন অবস্থায় তার পাশে দাঁড়ায়। ভিখারিটির নিরীহ প্রাণকে বাঁচিয়ে তুলতে তারা তৎপর হয়। চারপাশের প্রতিবন্ধকতা ও নিরাশার মধ্যেও তারা প্রাণের সন্ধান করে। শুরু লতাপাতাহীন গাছটির সোনালি কচিপাতা এবং ফুলে ভরপুর হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তাদের এই ইতিবাচক মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে। অর্থাৎ সমস্ত নৈরাশ্য এবং প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও প্রাণের অমরত্বের বাণী ব্যক্ত হয়েছে। মনুষ্যত্ব হারিয়ে যায় না। বরং মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই প্রাণকে প্রাণ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ অনুভব করা যায়।

‘ছন্নছাড়া' কবিতার কথক তথাকথিত শিক্ষিত, সভ্য, শালীন সমাজের প্রতিনিধি। তাই ছন্নছাড়া হিসেবে পরিচিত যুবকগুলি সমস্ত প্রতিকধকতা ও নৈরাশ্যের মধ্যেও যখন বেওয়ারিশ ভিখারিটির প্রাণ বাঁচাতে তৎপর হয়েছে তখনই সভ্য, শিক্ষিত কথক সেই পরিস্থিতিতে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। কিন্তু দূর থেকেই যুবকদের প্রতি কথকের সহানুভূতিই শুধু নয়, গভীর শ্রদ্ধার মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মনে হয়েছে, এই যুবকেরা ‘নেই রাজ্যের বাসিন্দা হতে পারে কিন্তু চারপাশের এত প্রতিকধকতা ও নিরাশার মধ্যেও তাদের মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যায়নি। বরং সফল মানুষদের তুলনায় অনেক বেশিই আছে। সর্বহারা, উপেক্ষিত ভিখারির প্রাণ বাঁচানোর প্রয়াসের মাধ্যমে তাদের মনুষ্যত্ববোধেরই প্রকাশ ঘটেছে।

উপরের উক্তিটির বরা হলেন রমেশ।

গ্রামের জমিদার বংশের অন্যতম দাবিদার রমেশের চরিত্র বেণী ঘোষাল। রমার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি গরিব মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করে টাকার থেকে তাদের সাহায্য করাকে বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন কিন্তু রমা তাঁকে খোঁটা দিয়ে বলেন যে মাছ জলে ভেসে গেলে যে ক্ষতি হয়ে সেই ক্ষতিপূরণ যেন রমেশ দিয়ে দেন। এই কথায় রমেশ মানসিকভাবে অনে আহত হয়ে উপরের মন্তব্যটি করেছিলেন।

প্রশ্নোদ্ভূত উক্তিটিতে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি হলেন রমা। দু-দিনের এক বৃষ্টিতে চাষের জমি জলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠায় ধান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হয়। বাঁধ কেটে জল নিকাশের প্রস্তাবে বেশী ঘোষাল অসম্মত হলে রাখ রমার সম্মতি আদায় করতে যান। কিন্তু রমাও জলার মাছ নষ্ট লোকসান করতে রাজি হন না। রমাকে কয়েকটা টাকার ক্ষতিপূরণ করছে অনুরোধ জানালে রমা বিদ্রূপ করে জানান যে, রমেশ নিজেই ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে দেন। এই কথার উত্তরেই রমেশ রমাকে 'হীন' এবং 'নীচ' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

‘পল্লীসমাজ' রচনায় এই কথাটি রমেশ রমা সম্পর্কে বলেছেন।

দয়ালু রমেশ গরিব চাষিদের ফসল বাঁচানোর জন্য মাছ বিক্রির টাকা লোকসান করেও বাঁধ কেটে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি বেণী ও রমার সমর্থন পাননি। রমাকে সামান্য কটা টাকার জন্য গরিব প্রজাদের অন্নকষ্ট না দিতে অনুরোধ করলে রমা রমেশকে সেই টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলেন। তখন রমেশ তার অক্ষমতার কথা মনে করে অপমানিত হয়ে রমাকে এই কথাটা বলেছেন।