বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার বাধা ও দোষ দূর করতে লেখক কী কী পরামর্শ দিয়েছেন ও বক্তব্য রেখেছেন? ৫
• বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার বাধা ও দোষ দূর করতে রাজশেখর এই উক্তি তাঁর সুচিন্তিত অভিমত ও পরামর্শ দিয়েছেন।
লেখকের মতে, বাংলায় পরিভাষা সংকলনে সমবেত উদ্যোগ আবশ্যক। উপযুক্ত বাংলা প্রামাণিক শব্দ রচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাংলা বানানে ইংরেজি শব্দই চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
আমাদের দেশের জনসাধারণের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নগণ্য, তাই যাঁরা বিজ্ঞান প্রবন্ধ লিখবেন তাঁদের তিনি প্রাথমিক বিজ্ঞানের মতো গোড়া থেকেই আলোচনার কথা বলেছেন।
লেখক মনে করেন, ভাষার আড়ষ্টতা এবং ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদের ত্রুটি দূর করা দরকার।
ইংরেজি শব্দের অর্থব্যাপ্তির দিকে নজর না দিয়ে বাংলায় অর্থভেদে বিভিন্ন শব্দের প্রয়োগকেই তিনি যথাযথ বলেছেন। যেমন—'Sensitized paper'-এর অনুবাদ 'স্পর্শকাতর কাগজ' না বলে 'সুগ্রাহী কাগজ' লেখাই লেখকের মতে সংগত।
তাঁর মতে, সাধারণের জন্য লিখিত বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভে স্বল্প পরিচিত পারিভাষিক শব্দের প্রথমবার প্রয়োগের সময় তার ব্যাখ্যা দেওয়া আবশিক।
বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের ভাষা সরল, স্পষ্ট এবং অলংকারবর্জিত হওয়া উচিত।
সবশেষে লেখকের অভিমত, পত্র-পত্রিকায় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশের আগে সম্পাদকের উচিত অভিজ্ঞ লোককে দিয়ে সন্দৰ্ভটি যাচাই করিয়ে নেওয়া।
“যে লোক আজন্ম ইজার পরেছে তার পক্ষে হঠাৎ ধুতি পরা অভ্যাস করা একটু শক্ত।”— মন্তব্যটির তাৎপর্য 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধ অবলম্বনে আলোচনা করো। ৫
রাজশেখর বসু তাঁর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' শীর্ষক রচনায় ইংরেজি জানা এবং ইংরেজি ভাষায় বিজ্ঞান পড়তে অভ্যস্ত মানুষদের বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে সমস্যার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে মন্তব্যটি করেছেন।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ বা প্রবন্ধের পাঠকদের লেখক দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। প্রথম শ্রেণির পাঠকেরা ইংরেজি ভাষায় দক্ষ নন এবং বিজ্ঞানের সঙ্গেও তাদের অতি সামান্য যোগাযোগ | কয়েকটি পারিভাষিক শব্দ বা বৈজ্ঞানিক ঘটনা সম্পর্কে স্থূল তথ্য ছাড়া তাঁদের আর কিছুই জানা নেই। এঁদের ক্ষেত্রে বাংলা পরিভাষা আয়ত্ব করে বাংলায় বিজ্ঞান শেখা কোনো সমস্যার নয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখক বলেছেন যে তিনিও এভাবেই ব্রজমোহন মল্লিকের বই থেকে বাংলা জ্যামিতি শিখেছেন। কিন্তু সমস্যাটা হল যাঁরা ইংরাজি ভাষায় দক্ষ এবং তাতেই শিক্ষাগ্রহণ করেছেন তাঁদের নিয়ে। এঁদের মনে 'ভাষাগত বিরোধী সংস্কার' তৈরি হয় | অর্থাৎ বাংলায় কিছু শিখতে গেছে ইংরেজিতে শেখা জ্ঞান বাধা হয়ে দাঁড়ায় | এই ‘পূর্ব সংস্কার দমন করে' তাকে বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভের পাঠ গ্রহণ করতে হয়, যা তাঁদের পক্ষে শ্রম ও সমস্যার । বিষয়টা আজন্ম ইজার পরা লোকের হঠাৎ ধুতি পরতে বাধ্য হওয়ার মতো। অত্যন্ত মনোযোগ আর প্রীতির সঙ্গে মাতৃভাষায় পদ্ধতি গ্রহণের মধ্যে দিয়ে সমস্যার সমাধান হতে পারে।
“পরিভাষা রচনা একজনের কাজ নয়...।” ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' নামক রচনায় পরিভাষা বিষয়ে লেখকের যে মতামত উল্লিখিত হয়েছে তা নিজের ভাষায় লেখো। ৫
রাজশেখর বসু ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' নামক প্রবন্ধে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে যেসব বাধার কথা ভেবেছেন তার অন্যতম হল পারিভাষিক শব্দের অপ্রতুলতা একদা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী লেখক নানা বিষয়ে পরিভাষা রচনা করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তাঁরা কাজটি একত্রে করেননি, ফলে সংকলনের পরিভাষাগুলির মধ্যে সমতা ছিল না। একই বিষয়ের অনেকগুলি করে পরিভাষা তৈরি হয়েছিল। বরং ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিযুক্ত পরিভাষা সমিতি অনেক একত্রিত ভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মানুষদের নিয়ে পরিভাষা সংকলন তৈরি করতে পেরেছিল। তবে সংকলনটি আরও পূর্ণাঙ্গ হওয়া প্রয়োজন বলে লেখক মনে করেছেন। পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা সম্ভব নয়, আবার পরিভাষা তৈরির সময় বিজ্ঞান আলোচনায় যে নিজস্ব রচনাপদ্ধতি সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কিন্তু সবার আগে প্রয়োজন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাগুলির সমন্বয়ের মাধ্যমে সমবেত উদ্যোগ তৈরি করে পরিভাষা গড়ে তোলা।
পরিভাষা রচনার ক্ষেত্রে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বিশদে লেখো। ৫
বাংলাভাষায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে খুব বড়ো সমস্যা হল পারিভাষিক শব্দের অপ্রতুলতা। যথাযথ পরিভাষা না থাকায় বাংলাভাষায় লেখা বিজ্ঞান বিষয়টি দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন লেখক নানা বিষয়ের পরিভাষা রচনা করতে উদ্যোগী হন। পরিভাষা রচনা একজনের কাজ নয়, সমবেতভাবে না করলে নানা ত্রুটি দেখা দেয়। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগের ত্রুটি ছিল এটিই। তার ফলে সংকলিত পরিভাষার সাম্য রক্ষিত হয়নি। একই ইংরেজি সংস্কার বিভিন্ন প্রতিশব্দ রচিত হয়েছে।
এরপর ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে পরিভাষা সমিতি নিযুক্ত করেছিলেন, তাতে বিভিন্ন বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, সংস্কৃতের অধ্যাপক এবং কয়েকজন লেখক একযোগে কাজ করছিলেন। এরফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচেষ্টা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের চেয়ে অধিকতর সফল হয়েছিল।
কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকলন খুব বড়ো নয়। আরও শব্দের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রয়োজনমতো বাংলা পরিভাষা পাওয়া না গেলেও বৈজ্ঞানিক রচনা চলতে পারে। সেক্ষেত্রে ইংরেজি শব্দই বাংলা বানানে চালানো ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়-নিযুক্ত সমিতি বিস্তর ইংরেজি শব্দ বজার রেখেছেন। যেমন, অক্সিজেন, প্যারাডাইক্লোরোবেনজিন, ফার্ন, আরথ্রোপোডা ইনসেকটা ইত্যাদি ।
বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ কী? বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক সন্দৰ্ভ লেখার জন্য কীরূপ রচনাপদ্ধতি আবশ্যক বলেছেন লেখক ? ৫
রাজশেখর বসু রচিত 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে আমরা ‘বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ' শব্দকধ পেয়েছি। বিজ্ঞান-সংক্রান্ত প্রকধ বা গ্রন্থকে বলা হয় বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ।
বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ রচনার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দেশের পাঠকদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই অজ্ঞ। তাই লেখার ভাষা হবে ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ-মুক্ত। বাংলায় অর্থভেদে বিভিন্ন শব্দ প্রয়োগ করে লেখাকে জনসাধারণের কাছে সুবোধ্য করে তুলতে হবে। প্রয়োজনে বাংলা শব্দের পরিবর্তে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা সংগত। লেখার সময় লেখক যদি ইংরেজিতে ভেবে বাংলায় অনুবাদের চেষ্টা করেন তবে তা হবে বাংলা ভাষার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। তাই বাংলা ভাষার প্রকৃতি বজায় রেখে বাক্য তৈরি করতে হবে। যেমন "পরমাণু ইঞ্জিন নীল চিত্রের অবস্থাতে পৌঁছায়নি।”—এই 'মাছিমারা নকল' না করে বাংলা ভাষার সৌন্দর্য রক্ষা হতে পারে এই অনুবাদে "পরমাণু ইঞ্জিনের নকশা পর্যন্ত এখনও প্রস্তুত হয়নি।" বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ রচনার ক্ষেত্রে লেখকদের একটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল করতে বলেছেন প্রাবন্ধিক, তা হল লেখা হবে অলংকারবর্জিত, স্পষ্ট এবং সরল। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক তথ্য পরিবেশনে যত্নবান হতে হবে। লেখার মানে সুবোধ্য, সুস্পষ্ট হবে। পাঠকদের মানসিকতা, জ্ঞান এবং বিজ্ঞান সম্পর্কে তাদের পরিচিতি মাথায় রেখে রচনায় লিপ্ত হতে হবে।
"আমাদের আলংকারিকগণ শব্দের ত্রিবিধ শক্তির কথা বলেছেন।”— এগুলি কী কী? উদাহরণসহ এই 'ত্রিবিধ শক্তি' বুঝিয়ে দাও। ১+৪
শব্দের ত্রিবিধ শক্তি বলতে —অভিধা, লক্ষণা এবং ব্যঞ্জনাকে বোঝানো হয়েছে।
শব্দবৃত্তির প্রথমটি হল অভিধা শব্দের মুখ্যার্থ বা বাচ্যার্থ প্রকাশিত হয় যে বৃত্তির দ্বারা, তাকে বলা হয় অভিধা। এই বৃত্তিতে শব্দটি বাচক। শব্দের অর্থটি বাচ্য বা অভিধেয়। যেমন- পঙ্কজ শব্দে পদ্ম অর্থটাই মুখ্য (পাঁকে জন্মে যা, তা 'পঙ্কজ' হলেও শব্দটির অভিথা 'পদ্ম' অর্থেই সীমাবদ্ধ)।
শব্দবৃত্তির দ্বিতীয় ভাগ হল লক্ষণা। কোনো শব্দের মুখ্যার্থ অতিক্রম করে শব্দটির গৌণ অর্থ যখন প্রধান হয়ে ওঠে, তখন তা হয় লক্ষণা। যেমন-- "এই রিকশা, এদিকে এসো" - রিকশা জড়পদার্থ। কিন্তু বাক্যে রিকশা শব্দটির মধ্যে দিয়ে রিকশাওয়ালাকে বোঝানো হয়েছে।
শব্দবৃত্তির তৃতীয় ভাগ হল বাঞ্ছনা। অভিধা ও এবং লক্ষণা দ্বারা শব্দার্থ যখন ব্যাখ্যা করা যায় না, এবং শব্দ যখন নতুন অর্থের দ্যোতনা তৈরি করে, তখন তাকে বলা হয় ব্যঞ্জনা। যেমন “সোনার হাতের সোনার কাঁকন কে কার অলংকার?"
এই বাক্যে সোনা— ধাতু (অভিধা)। সোনার হাত এবং সোনার কারন- রং (লক্ষা) কে কার অলংকার হাতের অলংকার হয়ে সোনা হাতকে অলংকৃত করেছে। স্বর্ণকাররের কারুকার্য ঈশ্বরের সৃষ্ট হাতের অহংকার। আবার ফরসা হাতের সৌন্দর্য সোনার রঙে প্রতিভাত। সোনা শব্দের প্রয়োগ এখানে বাঞ্ছনা এনেছে।