তৃতীয় অধ্যায় ⇒ বংশগতি এবং কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ

পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্যগুলি সন্তান-সন্ততিতে সঞ্চারিত হওয়ার কারণ : যৌন জননের সময় পিতা-মাতার শুক্রাণু
ও ডিম্বাণুর মিলনের মাধ্যমে, পিতা-মাতার বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জাইগোটের মধ্যে একত্রিত হয়। এই জাইগোটের বিভাজনের মাধ্যমেই অপত্য জীবের সৃষ্টি হয়। ফলে সন্তান-সন্ততির মধ্যে পিতৃ-মাতৃ বৈশিষ্ট্যগুলি সঞ্চারিত হয়। বা তার সার্থক রূপায়ণ ঘটে ।
সিবলিং বা অফস্প্রিং : পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্যগুলি সন্তান-সন্ততিতে সঞ্চারিত হওয়ায় তারা অনেকটা পিতা-মাতার মতো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য বহনকারী সন্তান- সন্ততিকে অফস্প্রিং বা সিবলিং বলে।

মেন্ডেলিজম : 1866 খ্রিস্টাব্দে মিষ্টি মটর গাছের (Pisum sativum) ওপর পরীক্ষানিরীক্ষা করে বিজ্ঞানী
গ্রেগর জোহান মেন্ডেল বংশগতি সংক্রান্ত যে সকল মৌলিক নিয়মাবলি ও সূত্র রচনা করেন, সেগুলিকে একত্রে মেন্ডেলিজম বা মেন্ডেলবাদ বলে।

মেন্ডেলের বিখ্যাত হওয়ার কারণ : গ্রেগর জোহান মেন্ডেল বংশগতি সংক্রান্ত একসংকর ও দ্বিসংকর জননের পরীক্ষার মাধ্যমে বংশগতি সংক্রান্ত প্রাথমিক মৌলিক ধারণাগুলির প্রথম অবতারণা করেন। তিনি প্রকট-প্রচ্ছন্নতার নীতি, পৃথকীকরণের সূত্র ও স্বাধীন সঞ্চারণের সূত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে বংশগতির ভিত্তি স্থাপন করেন। বংশগতি সংক্রান্ত এই অসামান্য কাজের জন্য তিনি বিখ্যাত হন। তাই তাকে জিনতত্ত্বের বা বংশগতি বিদ্যার জনক নামে অভিহিত করা হয়।

জেনেটিক্স : জীববিজ্ঞানের যে শাখায় মাতৃজনু থেকে অপত্য জনুতে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঞ্চারণের বিজ্ঞানসম্মত
ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাকে জেনেটিক্স বলে।

প্রকরণ : প্রকরণ হল জীবের জিন বস্তুর মধ্যে আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে জীবদেহে প্রকাশিত বৈশিষ্ট্যসমূহ যা বংশপরম্পরায় সঞ্চারনের মাধ্যমে নতুন জীবপ্রজাতির সৃষ্টি করে অর্থাৎ বিবর্তন ঘটায়।

জীবদেহে প্রকরণ সৃষ্টির কারণ : জিন হল জীবদেহের সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক ও বাহক। জিন ক্রোমোজোমের মধ্যে রৈখিক সজ্জাক্রমে অবস্থান করে, এবং DNA-ই জিনের রাসায়নিক রূপ। পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদান, যেমন— এক্স রে, অতিবেগুনি রশ্মি ইত্যাদির প্রভাবে ক্রোমোজোমের গঠনগত ও সংখ্যাগত পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে জীবদেহে জিনগত সজ্জার পরিবর্তন ঘটে অনেক নতুন বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি বা পুরনো বৈশিষ্ট্যের অবলুপ্তি ঘটে এবং জীবদেহে প্রকরণ সৃষ্টি হয়।

মানুষের ক্ষেত্রে প্রকরণের দুটি উদাহরণ সম্পর্কে নীচে ব্যাখ্যা করা হল—
(i) মুক্ত ও সংযুক্ত কানের লতি : সাধারণ অবস্থায় বেশির ভাগ মানুষের কানের লতি মুক্ত অবস্থায় থাকে, তাই
এটি মানুষের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সংযুক্ত কানের লতি, যা আকস্মিক জিনগত পরিবর্তনে উৎপন্ন প্রকরণ কিছুকিছু মানুষের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়। এই প্রকরণ সাধারণত প্রকট ও প্রচ্ছন্ন জিনের ক্রিয়াশীলতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটি একটি অটোজোমবাহিত প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য, ফলে এই বৈশিষ্ট্যেরনিয়ন্ত্রক প্রচ্ছন্ন জিন দুটি হোমোজাইগাস অবস্থায় থাকলেই এই বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়।
(ii)  রোলার ও স্বাভাবিক জিভ : আমাদের মধ্যে অনেকে অতি সহজেই জিভকে দু-পাশ থেকে গুটিয়ে নলের মতো বাইরে বের করতে পারে, এদের রোলার বলে। এটি অটোজোমাল জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত প্রকট বৈশিষ্ট্য, যা হোমোজাইগাস ও হেটারোজাইগাস উভয় অবস্থাতেই প্রকাশিত হয়। কিন্তু কিছুকিছু ব্যক্তি তাদের জিভকে ওইভাবে ঘোরাতে পারেন না অর্থাৎ তাদের জিভ স্বাভাবিক থাকে।

ফ্যাক্টর বা জিন : DNA দ্বারা তৈরি বংশগতির যে গঠনগত একক ক্রোমোজোমের একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান
করে জীবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে, তাকে ফ্যাক্টর বা জিন বলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মটর গাছের লম্বা বৈশিষ্ট্য ‘TT” জিন দ্বারা এবং খর্বাকার বৈশিষ্ট্য ‘tt’ জিন দ্বারা নির্ধারিত হয়।

অ্যালিল বা অ্যালিলোম : সমসংস্থ ক্রোমোজোমের একই লোকাসে অবস্থিত সম বা বিষম বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রক
উপাদান বা যুগ্ম জিনের এক-একটিকে অ্যালিল বা অ্যালিলোমর্ফ বলে।

উদাহরণ— যদি লম্বা মটর গাছের জিন T এবং বেঁটে গাছের জিন t হয় এবং T ও t একই লোকাসে অবস্থান করে, তবে T ও t-কে পরস্পরের অ্যালিল বা অ্যালিলোমর্ফবলে।

একসংকর জনন: এক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে সংকরায়ণ ঘটানোকে একসংকর জনন বলে।

দ্বিসংকর  জনন :  দু-জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে সংকরায়ণ ঘটালে, তাকে দ্বিসংকর জনন বলে।

সংকরায়ণ : একই প্রজাতিভুক্ত বিপরীত প্রলক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যযুক্ত দুটি জীবের মিলন ঘটিয়ে সংকর জীব সৃষ্টির পদ্ধতিকে সংকরায়ণ বলে।

বিশুদ্ধ জীব : যদি কোনো জীব তাঁর সকল বৈশিষ্ট্যগুলিকে অপরিবর্তিত রেখে সকল অপত্য জনুতে সঞ্চারিত করতে পারে, তবে তাকে বিশুদ্ধ জীব বা খাঁটি জীব বলে।

সংকর জীব : দুটি বিশুদ্ধ বিপরীত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবের মধ্যে পরনিষেক ঘটালে যে উভয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীব উৎপন্ন হয়, তাকে সংকর জীব বলে।

প্রকট বৈশিষ্ট্য : দুটি বিশুদ্ধ বিপরীত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবের মধ্যে পরনিষেক ঘটালে প্রথম অপত্য বংশে (F1) উৎপন্ন সংকর জীবে যে বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়, তাকে প্রকট বৈশিষ্ট্য বলে।
প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য : দুটি বিশুদ্ধ বিপরীত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবের মধ্যে পরনিষেক ঘটালে প্রথম অপত্য বংশে (F1) উৎপন্ন সংকর জীবে যে বৈশিষ্ট্য অপ্রকাশিত থাকে, তাকে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য বলে।

ফিনোটাইপ : জীবের বাহ্যিক প্রকাশিত বৈশিষ্ট্যকে ফিনোটাইপ বলে।
উদাহরণ : মটর উদ্ভিদের দৈর্ঘ্য চরিত্রটির বাহ্যিক প্রকাশ অথবা লম্বা ও বেঁটে।

জিনোটাইপ : কোনো জীবের জিন সংযুক্তি দ্বারা নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যকে জিনোটাইপ বলে।
উদাহরণ : বিশুদ্ধ লম্বা মটর গাছের জিনোটাইপ হল TT এবং বিশুদ্ধ বেঁটে মটর গাছের জিনোটাইপ হল tt ।

মেন্ডেলের সংকরায়ণ পরীক্ষার জন্য মিষ্টি মটর গাছ নির্বাচনের কারণ : মেন্ডেল নিম্নলিখিত কারণে তার সংকরায়ণ পরীক্ষার জন্য মটর গাছ নির্বাচন করেন।

(i) মটরগাছ বর্ষজীবী হওয়ায় দ্রুত বংশবিস্তারে সক্ষম, ফলে অল্পসময়ের মধ্যেই কয়েক পুরুষ ধরে (জনু) পরীক্ষানিরীক্ষা করা সম্ভব। (ii)  মটর গাছের ফুলগুলি উভলিঙ্গ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে স্বপরাগযোগ ঘটে, আবার প্রয়োজনে এদের ইতর পরাগযোগও ঘটানো যায়। (iii) মটর গাছে অনেক বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যের (প্রকরণ) সমন্বয় ঘটার ফলে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ওপর পরীক্ষানিরীক্ষা করার সুযোগ থাকে। (iv) মটর গাছ বংশপরম্পরায় নির্দিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত খাঁটি অপত্য উদ্ভিদ উৎপাদনে সক্ষম।(v)  মটর গাছ স্বপরাগযোগী হওয়ায় বাইরে থেকে কোনো অবাঞ্ছিত বৈশিষ্ট্য মিশে যাবার সম্ভাবনা কম থাকে।(vi)  সংকরায়ণের ফলে উৎপন্ন সংকর মটর গাছগুলি প্রজননক্ষম হওয়ায় সহজেই বংশবিস্তার করতে পারে।

মেন্ডেলকে বংশগতিবিদ্যার জনক বলার কারণ : মেন্ডেলকে বংশগতিবিদ্যার জনক বলার কারণ গ্রেগর জোহান মেন্ডেল বংশগতি সংক্রান্ত একসংকর ও দ্বিসংকর জননের পরীক্ষার মাধ্যমে বংশগতি সংক্রান্ত প্রাথমিক মৌলিক ধারণাগুলির প্রথম অবতারণা করেন। এ ছাড়া প্রকট-প্রচ্ছন্নতার নীতি, পৃথকীকরণের সূত্র ও স্বাধীন সঞ্চারণের সূত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে বংশগতির ভিত্তি স্থাপন করেন। বংশগতি সংক্রান্ত এই অসামান্য কাজের জন্য তিনি বিখ্যাত হন। তাই তাকে জিনতত্ত্বের বা বংশগতি বিদ্যার জনক বলা হয়।।
→ সংকরায়ণ পরীক্ষায় মেন্ডেলের সাফল্য লাভের কারণ : (i)  মেন্ডেল সংকরায়ণ পরীক্ষার জন্য কেবলমাত্র বিশুদ্ধ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মিষ্টি মটর গাছ নির্বাচন করেন।(ii)  মেন্ডেল নির্বাচিত মটর গাছগুলি স্বপরাগযোগী হওয়ায় স্বপ্রজননক্ষম ছিল, আবার প্রয়োজনে কৃত্রিমভাবে ইতর পরাগযোগ ঘটানোরও উপযোগী ছিল।(iii)  মেন্ডেল সংকরায়ণ পরীক্ষা একাধিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে না করে একজোড়া অথবা দু-জোড়া বিপরীতধর্মী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সম্পন্ন করেন, যার মাধ্যমে ফলাফল বিশ্লেষণ সহজ হয়েছিল। (iv)  মেন্ডেল প্রতিটি পরীক্ষালব্ধ ফলাফল অন্তত তিনটি জনু ধরে বিশ্লেষণ করেন, ফলে অনুপাতের ভিত্তিতে সূত্র নির্ধারণ সহজ হয়েছিল। (v) মটর গাছের ক্ষেত্রে সংকর উদ্ভিদগুলি প্রজননে সক্ষম হওয়ায় দ্বিতীয় (F2) ও তৃতীয় (F3) জনু পর্যন্ত পরীক্ষা করতে সক্ষম হন যা তার সূত্র নির্ধারণে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল।(vi)  সর্বোপরি অধিক সংখ্যক অপত্যের বিশ্লেষণ এবং সংকরায়ণ পদ্ধতিতে সৃষ্ট অপত্যের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সূত্র নির্ধারণ তাঁর সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।

মেন্ডেলের একসংকর জনন পরীক্ষার বর্ণনা—মটর গাছ : একজোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যের ওপর  করে সংকরায়ণ ঘটানোকে একসংকর জনন বলে।

পরীক্ষা : (i) মেন্ডেল জনিতৃ জনু (P-জনু) হিসেবে খাঁটি হলুদ বীজপত্রযুক্ত (YY) ও খাঁটি সবুজ বীজপত্রযুক্ত (yy) মটর গাছ নিলেন। (ii) ইমাসকুলেশন পদ্ধতিতে যে-কোনো জনিতৃ উদ্ভিদের ফুলগুলিকে স্ত্রী ফুলে পরিণত করলেন। (iii) অপর জনিতৃ উদ্ভিদটির ফুলের পরাগরেণু কৃত্রিমভাবে স্ত্রীফুলে স্থানান্তরিত করে ইতর পরাগযোগ ঘটালেন(iv) ইতর পরাগযোগের মাধ্যমে উৎপন্ন বীজগুলি সংগ্রহ করে, তা থেকে অপত্য মটর গাছ (F1-জনু) সৃষ্টি করলেন। (v) F1 জনুতে উৎপন্ন অপতা মটর গাছগুলির ফুলে স্ব-পরাগযোগ ঘটালেন। (vi) স্ব-পরাগযোগের মাধ্যমে উৎপন্ন বীজগুলি সংগ্রহ করে, তা থেকে পুনরায় নতুন অপত্য মটর গাছ (F2-জনু) সৃষ্টি করলেন।

পর্যবেক্ষণ : (i) পরীক্ষার সময় তিনি দেখলেন F1 জনুতে উৎপন্ন মটর গাছে (Yy) জনিতৃ জনুর মটর গাছের পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত বৈশিষ্ট্য দুটির কেবলমাত্র হলুদ বীজপত্রের বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়েছে। (ii) তা ছাড়া F2-জনুতে উৎপন্ন মটর গাছগুলির প্রায় তিনভাগ হলুদ বীজ বৈশিষ্ট্যযুক্ত ও একভাগ সবুজ বীজপত্র বৈশিষ্ট্যযুক্ত মটর গাছ।

ব্যাখ্যা : (i) ইতর পরাগযোগের মাধ্যমে (যৌন জনন) জনিতৃ মটর গাছগুলির বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাক্টরগুলি (জিন) Fi-জনুর প্রতিটি অপত্যে সঞ্চারিত হয়েছে এবং প্রতিটি অপত্য হলুদ ও সবুজ বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাক্টর (জিন) পেয়েছে। সুতরাং, F1 জনুর প্রতিটি অপত্য সংকর বৈশিষ্ট্যযুক্ত (হেটারোজাইগাস)। (ii) Fi-জনুর সংকর উদ্ভিদগুলিতে যেহেতু জনিতৃ জীবের কেবলমাত্র হলুদ বীজপত্র বৈশিষ্ট্যটি প্রকাশিত হয়েছে, সুতরাং হলুদ বীজপত্র বৈশিষ্ট্যটি হল প্রকট বৈশিষ্ট্য ও প্রকট বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাক্টরটি বা জিনটি (Y) হল প্রকট জিন। (iii) F1 জনুর সংকর উদ্ভিদগুলিতে যেহেতু জনিতৃ মটর গাছের সবুজ বীজপত্র বৈশিষ্ট্যটি প্রকাশিত হয়নি, সুতরাং, সবুজ বীজপত্র বৈশিষ্ট্যটি হল প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য ও সবুজ বীজপত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী জিনটি (y) হল প্রচ্ছন্ন জিন। একট ও প্রচ্ছন্ন জিন একত্রে থাকলে, প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয় না। (iv) F2-জনুর মটর গাছগুলিতে যেহেতু জনিতৃ মটর গাছগুলির দুটি বৈশিষ্ট্য—হলুদ বীজপত্র ও সবুজ বীজপত্র উভয়ই প্রকাশিত হয়েছে, সুতরাং Fi-জনুতে বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাক্টরগুলি পরস্পর মিশে যায়নি বরং পরাগরেণু (গ্যামেট) উৎপাদনের সময় তারা পরস্পর পৃথক হয়ে গেছে। (v) জনিত্ব ও অপত্য মটর গাছগুলিতে প্রকাশিত বৈশিষ্ট্য হল ফিনোটাইপ ও ফিনোটাইপ নিয়ন্ত্রণকারী জীবের জিন (ফ্যাক্টর) সংযুক্তি (YY, yy, Yy) হল জিনোটাইপ।

সিদ্ধান্ত : জনিতৃ জীবদেহ থেকে বিপরীত বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাক্টরগুলি (জিন) গ্যামেটের মাধ্যমে অপত্য জীবে সঞ্চারিত হওয়ার সময় একত্রিত হলেও কখনো মিশে যায় না বরং অপত্যের গ্যামেট গঠনকালে ফ্যাক্টরগুলি বা জিনগুলি পরস্পর পৃথক হয়ে যায়।

গিনিপিগের একসংকর জনন পরীক্ষা : একটি বিশুদ্ধ কালো (BB) গিনিপিগের সঙ্গে একটি বিশুদ্ধ সাদা (bb)
গিনিপিগের সংকরায়ণ ঘটালে প্রথম অপত্য জনুতে (F1 জনু) শুধুমাত্র সংকর কালো (BB) গিনিপিগের সৃষ্টি হবে (এখানে কালো রংটি সাদা রঙের ওপর প্রকট)। প্রথম অপত্য জনুতে উৎপন্ন দুটি সংকর কালো গিনিপিগের মধ্যে সংকরায়ণ (Bb x Bb) ঘটালে দ্বিতীয় অপত্য জনুতে বা F2 জনুতে 3 ভাগ কালো ও 1 ভাগ সাদা গিনিপিগের সৃষ্টি হবে। ওই তিন ভাগ কালো গিনিপিগের মধ্যে একভাগ হবে বিশুদ্ধ কালো (BB) গিনিপিগ এবং দু-ভাগ হবে সংকর কালো (Bb) গিনিপিগ। সমস্ত ক্ষেত্রেই সাদা গিনিপিগগুলি বিশুদ্ধ সাদা (bb) হবে, অর্থাৎ এক্ষেত্রেও জিনোটাইপিক অনুপাত হবে (1:2:1)।

ফিনোটাইপিক অনুপাত = 3 (কালো) : 1 (সাদা)

জিনোটাইপিক অনুপাত =

1 (বিশুদ্ধ কালো) : 2 (সংকর কালো) : 1 (বিশুদ্ধ সাদা)

সিদ্ধান্ত :জনিতৃ জীবদেহ থেকে বিপরীত বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাক্টরগুলি (জিন) গ্যামেটের মাধ্যমে অপত্য জীবে সঞ্চারিত হওয়ার সময় একত্রিত হলেও কখনও মিশে যায় না, বরং অপত্যের গ্যামেট গঠনকালে ফ্যাক্টরগুলি বা জিনগুলি পরস্পর পৃথক হয়ে যায়।

দ্বিসংকর জনন পরীক্ষার বর্ণনা-মটর গাছ : একই প্রজাতিভুক্ত দুজোড়া বিপরীত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দুটি জীবের সংকরায়ণকে দ্বিসংকর জনন বা ডাইহাইব্রিড ক্রস বলে।
পরীক্ষা : (i) মেন্ডেল জনিতৃ জনু (P-জনু) হিসেবে খাঁটি হলুদ (YY) ও গোল বীজ (RR) বিশিষ্ট মটর গাছ ও খাঁটি সবুজ (yy) ও কুঞ্চিত বীজ (rr) বৈশিষ্ট্যযুক্ত মটর গাছ নিলেন। (ii) ইমাসকুলেশন পদ্ধতিতে যে-কোনো জনিতৃ উদ্ভিদের ফুলগুলিকে স্ত্রী ফুলে পরিণত করলেন। (iii) অপর জনিতৃ উদ্ভিদটির ফুলের পরাগরেণু কৃত্রিমভাবে স্ত্রী ফুলে স্থানান্তরিত করে ইতর পরাগযোগ ঘটালেন। (iv) ইতর পরাগযোগের মাধ্যমে উৎপন্ন বীজগুলি সংগ্রহ করে, তা থেকে অপত্য মটর গাছ (F1-জনু) সৃষ্টি করলেন। (v) F1-জনুতে উৎপন্ন মটর গাছগুলির ফুলে স্ব-পরাগযোগ ঘটালেন। (vi) স্ব-পরাগযোগের মাধ্যমে উৎপন্ন বীজগুলি সংগ্রহ করে, তা থেকে পুনরায় নতুন অপত্য মটরগাছ (F2-জনু) সৃষ্টি করলেন।

ব্যাখ্যা : (i) ইতর পরাগযোগের মাধ্যমে জনিতৃ মটরগাছগুলির বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাক্টর বা জিনগুলি (Y,y,R,r) প্রতিটি অপত্যে সঞ্চারিত হয়েছে। সুতরাং, F1-জনুর প্রতিটি মটর গাছ সংকর (হেটারোজাইগাস) প্রকৃতির হয়। (ii) F1-জনুর সংক্রর গাছগুলিতে হয়। (ii) F1-জনুর সংক্রর গাছগুলিতে যেহেতু জনিতৃ জীবের কেবলমাত্র হলুদ ও গোলবীজ বৈশিষ্ট্য দুটি প্রকাশিত হয়েছে, সুতরাং হলুদ ও গোলবীজ বৈশিষ্ট্যদুটি হল প্রকট বৈশিষ্ট্য এবং ওই বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী জিনগুলি হল প্রকট জিন। (iii) F1-জনুর সংকর গাছগুলিতে যেহেতু জনিতৃ জীবের সবুজ ও কুঞ্ঝিত বীজ বৈশিষ্ট্যদুটি প্রকাশিত হয়নি। সুতরাং সবুজ ও কুঞ্জিত বীজ বৈশিষ্ট্য দুটি হল প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য এবং ওই বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী জিনগুলি হল প্রচ্ছন্ন জিন। (iv) F2-জনুর মটর গাছগুলিতে জনিতৃ জীবের হলুদ ও গোল বীজ বৈশিষ্ট্য এবং সবুজ ও কুঞ্ঝিত বীজ বৈশিষ্ট্য যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনই নতুন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় হিসাবে হলুদ ও কুঞ্ঝিত বীজ বৈশিষ্ট্য এবং সবুজ ও গোল বীজ বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং F1-জনুর উদ্ভিদগুলিতে জনিতৃ জীবের বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাক্টর বা জিনগুলি পরস্পর মিশে না গিয়ে যেমন পৃথক হয়ে গেছে, তেমনই য: একটি ফ্যাক্টর (জিন) অপর যে-কোনো ফ্যাক্টরের (জিনের) সঙ্গে স্বাধীনভাবে ও সম্ভাব্য সকল সমন্বয়ে বিন্যস্ত হয়েছে।  v) জনিতৃ ও অপত্য মটর গাছগুলিতে প্রকাশিত বৈশিষ্ট্য হল ফিনোটাইপ এবং ফিনোটাইপ নিয়ন্ত্রণকারী জীবের জিন সংযুক্তি হল জিনোটাইপ।
পর্যবেক্ষণ : (i) পরীক্ষার সময় তিনি দেখলেন Fiজনুতে উৎপন্ন সকল মটর গাছে, জনিতৃ জনুর মটর গাছের পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত দুজোড়া বৈশিষ্ট্যের কেবলমাত্র হলুদ ও গোলবীজ (YyRr) বৈশিষ্ট্য দুটি প্রকাশিত হয়েছে। (ii) তা ছাড়া F2-জনুতে উৎপন্ন মটর গাছগুলির প্রায় 9 ভাগ হলুদ ও গোলবীজ, 3 ভাগ হলুদ ও কুঞ্ছিত বীজ, 3 ভাগ সবুজ ও গোলবীজ এবং I ভাগ সবুজ ও কুঞ্চিত বীজযুক্ত মটর গাছ।

সিদ্ধান্ত : জনিতৃ জীবদেহ … সিদ্ধান্ত : জনিতৃ জীবদেহ থেকে বিপরীত বৈশিষ্টা নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাক্টরগুলি (জিন) গ্যামেটের মাধ্যমে অপত্য জীবে সঞ্চারিত হওয়ার সময় একত্রিত হলেও কখনো মিশে না গিয়ে অপত্যের গ্যামেট গঠনের সময় যেমন পরস্পর-এর থেকে পৃথক হয়ে যায়, তেমনই যে-কোনো ফ্যাক্টর স্বাধীনভাবে ও সম্ভাব্য সকল সমন্বয়ে অপর যে-কোনো ফ্যাক্টরের সঙ্গে বিন্যস্ত হয়।

দ্বিসংকর জনন পরীক্ষা (গিনিপিগ) : একটি বিশুদ্ধ প্রলক্ষণযুক্ত কালো ও কর্কশ বা অমসৃণ রোম বিশিষ্ট গিনিপিগের সঙ্গে একটি বিশুদ্ধ প্রলক্ষণযুক্ত সাদা ও মসৃণ রোম বিশিষ্ট গিনিপিগের (P জনু) সংকরায়ণ ঘটালে প্রথম অপত্য (F1) জনুতে সব কালো ও অমসৃণ গিনিপিগ সৃষ্টি হবে। কারণ, কালো এবং অমসৃণ রোম প্রকট গুণসম্পন্ন। F1 জনুর দুটি গিনিপিগের মধ্যে আবার সংকরায়ণ ঘটালে দ্বিতীয় অপত্য জনু বা F2জনুতে 9 ভাগ কালো ও অমসৃণ, 3 ভাগ কালো ও মসৃণ, 3 ভাগ সাদা ও অমসৃণ এবং 1 ভাগ সাদা ও মসৃণ রোম বিশিষ্ট গিনিপিগের সৃষ্টি হবে। কালো রঙের জন্য ফ্যাক্টর B এবং কর্কশ বা অমসৃণ রোমের জন্য ফ্যাক্টর Rধরা হলে কালো ও অমসৃণ গিনিপিগের জিনোটাইপ হবে BBRR; একই ভাবে সাদা রঙের জন্য ফ্যাক্টর b এবং মসৃণ রোমের জন্য ফ্যাক্টর rধরা হলে সাদা ও মসৃণ রোম বিশিষ্ট গিনিপিগের জিনোটাইপ হবে bbrr (P জনুতে)। উভয় গিনিপিগের সংকরায়ণ ঘটানোর ফলে F1 জনুতে যে সংকর কালো ও অমসৃণ গিনিপিগ সৃষ্টি হয়েছিল তাদের জিনোটাইপ ছিল BbRr F1 জনুর গিনিপিগগুলি হেটেরোজাইগাস এবং এদের থেকে চার রকমের করে গ্যামেট সৃষ্টি হয়। এই গ্যামেটগুলি হল—BR, Br, bR এবং br। F1জনুতে সৃষ্ট চার রকম গ্যামেটের পুং ও স্ত্রী মিলনের ফলে মোট 16 রকমের গিনিপিগ সৃষ্টি হবে।