তৃতীয় অধ্যায় ➤ পৃথিবীপৃষ্ঠের কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়

উত্তরা সুমেরুবিন্দু থেকে কুমেরুবিন্দু পর্যন্ত ভূপৃষ্ঠের ওপর উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত অর্ধবৃত্তাকার কাল্পনিকরেখাগুলি হল দ্রাঘিমারেখা ( meridian)। ভূপৃষ্ঠের ওপর একই দ্রাঘিমায় অবস্থিত স্থানগুলিকে কাল্পনিকরেখার সাহায্যে যোগ করে এই অর্ধবৃত্তাকাররেখা আঁকা হয়। যেমন- -মূলমধ্যরেখা।

[1] অক্ষরেখাগুলি প্রত্যেকটি পূর্ণবৃত্ত) এবং পরস্পরের সমান্তরাল হয়। [2] অক্ষরেখাগুলি পৃথিবীকে পূর্ব-পশ্চিমে বেষ্টন করে থাকে। [3] অক্ষাংশের মান বৃদ্ধি পেলে অক্ষরেখার পরিধি কমে যায়। [4] একই অক্ষরেখায় অবস্থিত বিভিন্ন স্থানের স্থানীয় সময়ের পার্থক্য দেখা যায়।

প্রত্যেকটি দ্রাঘিমারেখা অর্ধবৃত্ত। 21 সব দ্রাঘিমারেখার পরিধি সমান।[3] দ্রাঘিমারেখাগুলি পৃথিবীকে উত্তর-দক্ষিণে বেষ্টন করে থাকে। [4] একই দ্রাঘিমারেখায় অবস্থিত বিভিন্ন স্থানের স্থানীয় সময় একই হয়,

সুমেরুবিন্দু ও কুমেরুবিন্দু থেকে সমান দূরত্বে পৃথিবীর মাঝবরাবর যে কাল্পনিক বৃত্তাকাররেখা পৃথিবীকে পূর্ব পশ্চিমে বেষ্টন করে রয়েছে, তা নিরক্ষরেখা নামে পরিচিত। এর অক্ষাংশের মান ০° ।

উত্তর লন্ডনের গ্রিনিচ শহরের ওপর দিয়ে উত্তরে সুমেরু থেকে দক্ষিণে কুমেরু পর্যন্ত বিস্তৃত যে দ্রাঘিমারেখা কল্পনা করা হয়েছে, তাকে মূলমধ্যরেখা বলে) এর মান O"। এটি পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধে ভাগ করেছে।

কোথায় দেখা যায়? টার। হ্যাডলির অকট্যান্ট একটি নক্ষত্র। এটি দক্ষিণ মেরুমুখী। নক্ষত্র। তাই দক্ষিণ গোলার্ধের যে-কোনো জায়গা থেকে রাত্রিবেলা এটিকে দেখা যায়।

উত্তর (কোনো দ্রাঘিমারেখায় মধ্যাহ্নকাল অনুসারে সেই স্থানের পশনায় প্রাপ্ত সময় হল সেই স্থানের স্থানীয় সময় (local time)। এরপর এই মধ্যাহ্ন সময় অনুসারে দিনের অন্যান্য সময় গণনা করা হয়।

উত্তর এক বা একাধিক নির্দিষ্ট দ্রাঘিমারেখার স্থানীয় সময়ের সাপেক্ষে কোনো দেশ বা বিস্তৃত অঞ্চলের গণনায় প্রাপ্ত সময় হল প্রমাণ সময় (standard time)। এই সময়ের সাহায্যে কোনো দেশের সময় নির্ধারণ করা যায়।

উত্তরা আন্তর্জাতিক তারিখরেখা হল এমন একটি কাল্পনিকরেখা যে রেখাটি মোটামুটিভাবে 180 দ্রাঘিমারেখা অনুসরণ করে, সুমেরু থেকে কুমেরু পর্যন্ত বিস্তৃত এই রেখাটিকে বার ও তারিখের শুরু ও শেষ হিসেবে ধরা হয়।

গেলে) উত্তর নিরক্ষরেখা থেকে পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুর দিকে গেলে, পৃথিবীর মধ্যভাগ বরাবর যে কাল্পনিক তল পাওয়া যায়, তাকে নিরক্ষীয় তল বলে। নিরক্ষীয় তল, পৃথিবীকে সমান ভাগে উত্তর এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বিভক্ত করে।

যে যন্ত্রের সাহায্যে ধ্রুবতারার উন্নতি কোণ দেখে অক্ষাংশে পরিমাপ করা যায়, তাকে সেক্সট্যান্ট বলে।

মুলনধারেখার পূর্ব বা পশ্চিমে অবস্থিত কোনো স্থানের কৌণিক দূরত্বের মান হল প্রাঘিমাংশ (longitude) যেমন--- কলকাতার প্রাঘিমাংশ 88 30° পূর্ব। একই দ্রাঘিমাংশ যুক্ত স্থানগুলিকে যোগ করে দ্রাঘিমারেখা আঁকা হয়।

নিরক্ষরেখার উত্তরে বা দক্ষিণে অবস্থিত কোনো স্থানের কৌশিক ধররের মান হয় অ Antitude যেমন 22.30 একই অক্ষাংশের স্থানগুলিকে যোগ করে অক্ষরেখা অঙ্কিত হয়।

প্রতিপাদ স্থান উত্তর ভূগোলকের কেন্দ্র স্পর্শকারী যে-কোনো ব্যাসের দুই প্রান্তবিন্দুর একটি, অপরটির প্রতিপাদ স্থান। যেমন— কলকাতার (22-30 ) প্রতিপাদ স্থানের অক্ষাংশ 22°30° দক্ষিণ।

পৃথিবী নিজ অক্ষের চারিদিকে 24 ঘণ্টায় একবার আবর্তন করে। এই আবর্তন গতির জন্য প্রতিদিন প্রতিটি দ্রাঘিমারেখাই একবার সূর্যের সামনে আসে। সূর্যের আলো যখন যে দ্রাঘিমার ওপর লম্বভাবে পড়ে তখন সেখানে মধ্যাহ্ন হয়। এই সময় অনুসারে ওই দ্রাঘিমার স্থানীয় সময় নির্ণয় করা হয়। সুতরাং পৃথিবীর দ্রাঘিমারেখাগুলির ওপর সময় কী হবে তা পৃথিবীর আবর্তন এবং সূর্যরশ্মির পতনকোণের ওপর নির্ভর করে। তাই, এই দ্রাঘিমারেখা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সময়েরও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে ঠিক কুমেরুর ওপর হ্যাডলির অকট্যান্ট নামে একটি নক্ষত্র আছে। নিরক্ষরেখা থেকে হ্যাডলির অট্যান্টকে একেবারে দিগন্তরেখায় দেখা যায়। তাই নিরক্ষরেখা থেকে কুমেরুর দিকে 1° বা 111.3 কিমি করে অগ্রসর হলে আকাশে হ্যাডলির অকট্যান্টের উন্নতিও 1° করে বেড়ে যাবে। এইভাবে বাড়তে বাড়তে কুমেরুতে পৌঁছোলে হ্যাডলির অকট্যান্টকে একেবারে মাথার ওপর বা 90° কোণে দেখা যায়। এইভাবে হ্যাডলির অকট্যান্টের উন্নতি লক্ষ করে অক্ষাংশ নির্ণয় করা যায়।

কোনো স্থানের দ্রাঘিমা দু-রকমভাবে নির্ণয় করা যায়।

যথা— [1] সময়ের পার্থক্য অনুযায়ী 1 দ্রাঘিমার পার্থক্যে সময়ের পার্থক্য হয় 4 মিনিট। তাই কোনো স্থানের স্থানীয় সময়ের সঙ্গে 4 মিনিট সময় যোগ করলে, ওই স্থানের অবস্থান তার 1° পূর্বে এবং 4 মিনিট সময় বিয়োগ করলে, ওই স্থানের অবস্থান তার 1° পশ্চিমে হবে।

[2] গ্রিনিচের সময়ের মাধ্যমে গ্রিনিচের দ্রাঘিমা 0"। সুতরাং, গ্রিনিচের সময় এবং অন্য কোনো জায়গার স্থানীয় সময় জানা থাকলে সময়ের পার্থক্য থেকে ওই জায়গার দ্রাঘিমা নির্ণয় করা যায়। যেমন—ভারত ও গ্রিনিচের সময়ের পার্থক্য 5 ঘণ্টা 30 মিনিট, সুতরাং দ্রাঘিমার পার্থক্য হবে 82°30।

পৃথিবীর নানা দেশের প্রমাণ সময় বিভিন্ন হয়। এতে আন্তর্জাতিক কাজকর্ম চালাতে অসুবিধা হয়। এই অসুবিধা দূর করার জন্য [1] মূলমধ্যরেখার (0) স্থানীয় সময়কে সারা পৃথিবীর প্রমাণ সময় হিসেবে ধরা হয়। [2] এই দ্রাঘিমারেখাটি লন্ডনের উপকণ্ঠে গ্রিনিচ শহরের মানমন্দিরের ওপর দিয়ে প্রসারিত বলে মূলমধ্যরেখার সময়কে গ্রিনিচ সময় বলা হয়। [3] যেহেতু এই সময় আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তাই এটি পৃথিবীরও প্রমাণ সময় নির্দেশ করে।

বার এবং তারিখ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নানা সমস্যার সৃষ্টি হওয়ায় এর সমাধানে 180° দ্রাঘিমারেখাকেই আন্তর্জাতিক তারিখরেখা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। 1884 খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডি.সি-তে অধ্যাপক ডেভিডসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত 'আন্তর্জাতিক দ্রাঘিমা সম্মেলন'-এ 180° দ্রাঘিমারেখাকে 'আন্তর্জাতিক তারিখরেখা' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই রেখার দু পাশে সময়ের প্রভেদ 1 দিন। আন্তর্জাতিক তারিখরেখা থেকে পশ্চিম গোলার্ধে গেলে 1 `দিন কমিয়ে এবং পূর্ব
গোলার্ধের দিকে গেলে 1 দিন বাড়িয়ে নিতে হয়। এই রেখা তারিখ বিভাজনে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূলভূখণ্ডে এটি, রাশিয়ায় 11টি ও
অন্যান্য কয়েকটি দেশে একাধিক প্রমাণ সময় আছে। কারণ—
[1] এই দেশগুলির পূর্ব-পশ্চিমে ব্যাপক বিস্তার রয়েছে। তাই পূর্ব দিকের তুলনায় পশ্চিম দিকের সময়ের বিপুল পার্থক্য দেখা যায়।
[2] পূর্বপ্রান্তের সাথে পশ্চিমপ্রান্তের ব্যাপক সময়ের পার্থক্যের জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কাজকর্মে অসুবিধা হয়।

পৃথিবীর উচ্চ অক্ষাংশের দেশগুলিতে দিন এবং রাত্রের
পার্থক্য খুব বেশি হয় ঋতুপরিবর্তনের সাথে সাথে। সেই কারণে ওইসব দেশে সারাবছরই ঘড়ির সময় একই নিয়মে চলে না। দিনের দৈর্ঘ্যের হ্রাসবৃদ্ধি অনুযায়ী এবং সূর্যের আলোকে কাজে লাগানোর জন্য ঘড়ির সময় পরিবর্তন করা হয়। বিশেষ করে 21
মার্চ থেকে ঘড়ি এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় এগিয়ে রাখা হয় আবার 23 সেপ্টেম্বর থেকে সময় এক থেকে দু-ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়। নরওয়ে, সুইডেন, কানাডা প্রভৃতি দেশে এভাবে সময়ের পরিবর্তন ঘটানো হয়।

যে-কোনো দেশের ওপর দিয়ে, অনেকগুলি দ্রাঘিমারেখা বিস্তৃত হলে স্থানীয় সময় অনুযায়ী দেশের নানা কাজকর্ম চালাতে খুবই অসুবিধা হয়। দ্রাঘিমা অনুযায়ী ভারত পূর্ব গোলার্ধে 6807 থেকে 97-25 দ্রাঘিমা পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যবর্তী দ্রাঘিমা হল। 82*46' পূর্ব। কিন্তু হিসাবের সুবিধার জন্য 82*30' পূর্ব দ্রাঘিমাকে ভারতের প্রমাণ দ্রাঘিমা ধরে তার স্থানীয় সময়কে ভারতের প্রমাণ সময় হিসাবে করা হয়। এই রেখাটি এলাহাবাদ শহরের ওপর দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে।

[1] মূলমধ্যরেখার ব্যবহার : (a) মূলমধ্যরেখার পূর্বদিক পূর্ব গোলার্ধ এবং পশ্চিমদিক পশ্চিম গোলার্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়। [b] এই রেখার স্থানীয় সময়কে পৃথিবীর প্রমাণ সময় হিসেবে মানা হয়। (৩) পৃথিবীর কোনো স্থান মূলমধ্যরেখা থেকে কতটা পূর্বে বা পশ্চিমে যা জানার জন্য এই রেখা জরুরি। [2] আন্তর্জাতিক তারিখরেখার ব্যবহার : (a) এটি তারিখবিভাজন রেখা। [b] এই রেখার পূর্ব দিকের সঙ্গে পশ্চিম দিকের সময়ের একদিনের প্রভেদ হয়।

অক্ষরেখার সাহায্যে পৃথিবীকে তিনটি তাপমণ্ডলে ভাগ
করা যায়। সেগুলি হল-
(1) উদ্বুমণ্ডল : নিরক্ষরেখা থেকে 231/2° উত্তর ও 231/2° দক্ষিণ অক্ষরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত উপমণ্ডল।
(2) নাতিশীতোহ্ণ মণ্ডল: কর্কটক্লান্তিরেখা (231/2° উত্তর) ও মকরক্রান্তিরেখা (23° দক্ষিণ) থেকে যথাক্রমে
সুমেরুবৃত্তরেখা (661/2° উত্তর) ও কুমেরুবৃত্তরেখা (661/2° দক্ষিণ) পর্যন্ত বিস্তৃত নাতিশীতোয়মণ্ডল।
[3] হিমমণ্ডল: সুমেরুবৃত্তরেখা ও কুমেরুবৃত্তরেখা থেকে দুই মেরুবিন্দু (90° উ: ও 90°দ:) পর্যন্ত বিস্তৃত হিমমণ্ডল।

অক্ষরেখা: ভূপৃষ্ঠকে পূর্ব-পশ্চিমে বেষ্টন করে থাকা
সম-অক্ষাংশযুক্ত কাল্পনিক বৃত্তাকার রেখাগুলিকে বলে অক্ষরেখা। অক্ষরেখা আঁকা হয়। ভূপৃষ্ঠের ওপর একই অক্ষাংশে অবস্থিত স্থানগুলিকে যোগ করে বৈশিষ্ট্য: [1] দুই মেরুবিন্দু ছাড়া বাকি সব অক্ষরেখাগুলি প্রত্যেকটি পূর্ণবৃত্ত এবং পরস্পর সমান্তরাল

[2] অক্ষাংশের মান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অক্ষরেখার পরিধি কমে যায়।

[3] উভয় মেরুতে অক্ষরেখা বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। [4] কোনো নির্দিষ্ট অক্ষরেখা বরাবর ভূপৃষ্ঠের প্রতিটি স্থানের অক্ষাংশ সমান।
[5] অক্ষরেখার পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রারও পার্থক্য হয়। তাই ভিন্ন অক্ষাংশবিশিষ্ট স্থানগুলির জলবায়ুও ভিন্ন হয়।
[6] একই অক্ষরেখায় অবস্থিত ভিন্ন স্থানের স্থানীয় সময়ও ভিন্ন হয়ে থাকে।

ব্যবহার: [1] নিরক্ষরেখা ও অন্যান্য, অক্ষরেখাগুলির সাহায্যে পৃথিবীর কোনো স্থান কতটা উত্তরে বা দক্ষিণে তা জানা যায়।
[2] অক্ষরেখার সাহায্যে কোনো কোনো দেশের বা রাজ্যের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। যেমন –48° উত্তর অক্ষরেখার সাহায্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
[3] অক্ষরেখার সাহায্যে পৃথিবীকে বিভিন্ন তাপমণ্ডলে
(যেমন—উয়মণ্ডল, 0°-23½° উ:/দ:) ভাগ করা যায়।

দ্রাঘিমারেখা: সুমেরুবিন্দু থেকে কুমেরুবিন্দু পর্যন্ত ভূপৃষ্ঠের ওপর উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত সমান দ্রাঘিমাযুক্ত কাল্পনিক অর্ধবৃত্তাকার রেখাগুলিকে বলে দ্রাঘিমারেখা। ভূপৃষ্ঠের ওপর একই দ্রাঘিমায় অবস্থিত স্থানগুলিকে যোগ করে দ্রাঘিমারেখা আঁকা হয়।
বৈশিষ্ট্য: [1] দ্রাঘিমারেখাগুলি প্রত্যেকটি . অর্ধবৃত্ত।
[2] দ্রাঘিমারেখাগুলি পরস্পর সমান্তরাল নয়।
[3] নিরক্ষীয় অঞ্চলে দ্রাঘিমারেখাগুলির পারষ্পরিক দূরত্ব বেশি এবং মেরুর দিকে ক্রমশ কম।
[4] দ্রাঘিমারেখাগুলির পরিধি সমান। অর্থাৎ, প্রতিটি দ্রাঘিমারেখার দৈর্ঘ্য সমান।
[5] কোনো নির্দিষ্ট দ্রাঘিমারেখা বরাবর ভূপৃষ্ঠের প্রতিটি স্থানের দ্রাঘিমাংশ সমান।
[6] একই দ্রাঘিমারেখার বিভিন্ন স্থানে জলবায়ুর ব্যাপক পার্থক্য
সময় একইরকম হয়। লক্ষ করা যায়।
[7] একই দ্রাঘিমারেখার বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় ব্যবহার: [1] পৃথিবীর কোনো স্থান মূলমধ্যরেখার কতটা পূর্বে বা পশ্চিমে অবস্থিত তা দ্রাঘিমারেখার সাহায্যে সহজেই জানা যায়। [2] পৃথিবীর যে-কোনো স্থানের সময় দ্রাঘিমারেখার সাহায্যে নির্ণয় করা যায়। [3] অনেকসময় কোনো দেশ বা রাজ্যের সীমানা নির্ধারণে দ্রাঘিমারেখা ব্যবহার করা হয়। যেমন— আফ্রিকা মহাদেশের সীমানা নির্দেশ করার জন্য দ্রাঘিমারেখার প্রয়োজন হয়।

অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখার সাহায্যে ভূপৃষ্ঠে
কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়: অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখার সাহায্যে গোলাকার ভূপৃষ্ঠের ওপর যে-কোনো জায়গার অবস্থান নির্ণয় করা হয়। অক্ষরেখাগুলি বৃত্তাকার এবং ভূপৃষ্ঠকে
পূর্ব-পশ্চিমে বেষ্টন করে আছে। অন্যদিকে, দ্রাঘিমারেখাগুলি অর্ধবৃত্তাকার এবং উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত। ফলে, অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখাগুলি পরস্পরকে ছেদ করে এবং ভূপৃষ্ঠে সৃষ্টি হয় এক
ভৌগোলিক জালক। এই জালকের ছেদবিন্দুগুলির সাহায্যেই ভূপৃষ্ঠে যে-কোনো জায়গার সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা যায়। তাই মানচিত্রে অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা উভয়ই দেখানো হয়ে থাকে এবং ভূপৃষ্ঠে যে-কোনো জায়গার সঠিক অবস্থান নির্ণয় করার
জন্য উভয়েরই প্রয়োজন হয়। কোনো জায়গার অবস্থান বা স্থানাঙ্ক জানতে হলে জায়গাটির অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমা—উভয়ই জানাতে হয়। কলকাতার অবস্থান বা স্থানাঙ্ক 22°30′ উত্তর অক্ষাংশ এবং 88°30′ পূর্ব দ্রাঘিমা। অর্থাৎ, 22°30′ উত্তর অক্ষরেখা এবং ৪8°30′ পূর্ব দ্রাঘিমারেখা পরস্পর যেখানে ছেদ করেছে, সেই ছেদবিন্দুটিই হল ভূপৃষ্ঠের ওপর কলকাতার সঠিক অবস্থান। দ্রাঘিমারেখার পরিবর্তনের সঙ্গে স্থানীয় সময়ের পরিবর্তণের কারণ: পৃথিবীপৃষ্ঠে কল্পিত দ্রাঘিমারেখাগুলি অর্ধবৃত্তাকার এবং উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত। যেহেতু সূর্যের সামনে পৃথিবী 24 ঘণ্টায় একবার করে পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন করে, তাই প্রতিটি দ্রাঘিমারেখাই 24 ঘণ্টায় একবার করে সূর্যের সামনে আসে। সূর্য যখন পৃথিবীর যে দ্রাঘিমারেখার ওপর লম্বভাবে অবস্থান করে, সেখানে তখন মধ্যাহ্ন হয়। এই মধ্যাহ্ন অনুসারে সেই স্থানে যে সময় গণনা করা হয়, তাকে স্থানীয় সময় বলে । সুতরাং, প্রতিটি দ্রাঘিমারেখায় বিভিন্ন সময়ে 24 ঘণ্টায় একবার করে মধ্যাহ্ন হয় এবং তাই প্রতিটি দ্রাঘিমারেখার স্থানীয় সময়ও আলাদা। এজন্যই দ্রাঘিমারেখার পরিবর্তনের সঙ্গে স্থানীয় সময়েরও পরিবর্তন হয়।

আন্তর্জাতিক তারিখরেখা: আন্তর্জাতিক তারিখরেখা
একটি কাল্পনিকরেখা, যা 180° দ্রাঘিমারেখাকে অনুসরণ করে সুমেরুবিন্দু থেকে কুমেরুবিন্দু পর্যন্ত টানা হয়েছে। এই রেখা পৃথি তারিখ বিভাজিকা হিসেবে কাজ করে। প্রয়োজনীয়তা: গোলাকার (360°) পৃথিবী নিজের অক্ষ বা মেরুরেখার চারিপাশে একবার সম্পূর্ণ আবর্তন করতে সময় নেয় 24 ঘণ্টা বা 1,440 মিনিট। এজন্য ভূপৃষ্ঠে প্রতি 1° দ্রাঘিমার
ব্যবধানে সময়ের পার্থক্য হয় 4 মিনিট। আবার পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন করে বলে, পূর্ব দিকে স্থানীয় সময় এগিয়ে থাকে এবং পশ্চিম দিকে স্থানীয় সময় পিছিয়ে থাকে। এজন্য স্থানীয় সময় অনুসারে ভূপ্রদক্ষিণ করলে সময়, বার ও তারিখ
নিয়ে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং কাজেরও অসুবিধা ঘটে। যেমন—180° পূর্ব এবং 180° পশ্চিম দ্রাঘিমা একটিই রেখা। অথচ একই জায়গায় পৌঁছে বিমান বা জাহাজের সময়ের ব্যবধান হয়—12 ঘণ্টা + 12 ঘণ্টা = 24 ঘণ্টা বা 1 দিন। এই সমস্যা সমাধানের জন্য 1884 সালে ‘দ্রাঘিমা ও সময়’ সম্পর্কিত এক ‘আন্তর্জাতিক দ্রাঘিমা সম্মেলনে' (International
Meridian conference)-এ 180° দ্রাঘিমারেখাকে আন্তর্জাতিক তারিখরেখা হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়, যা পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধের মধ্যে তারিখ বিভাজিকার কাজ করে। এর ফলে পূর্ব গোলার্ধগামী জাহাজ বা বিমান এই রেখাটি অতিক্রম করলে তার দিনপঞ্জিতে 1 দিন যোগ করে (অর্থাৎ, সেদিন রবিবার থাকলে
সোমবার ধরে) নেয় এবং পশ্চিম গোলার্ধগামী জাহাজ বা বিমান এই রেখাটি অতিক্রম করলে 1 দিন বিয়োগ করে (অর্থাৎ, সেদিন সোমবার হলে রবিবার ধরে) নিয়ে স্থানীয় সময়ের সঙ্গে মিল রাখে। আর্ন্তজাতিক তারিখরেখা সর্বত্র 180° দ্রাঘিমারেখাকে অনুসরণ না করার কারণ: 180° দ্রাঘিমার ওপর অবস্থিত জায়গাগুলির অধিবাসীরা যাতে তাদের নিজেদের দেশের সময় ও বার অনুসারে কাজকর্ম করতে পারে তাই আন্তর্জাতিক তারিখরেখাকে ওইসব জায়গায় একটু পূর্বে বা পশ্চিমে জলভাগের ওপর দিয়ে বাঁকিয়ে নেওয়া হয়েছে। যেমন—
[1] উত্তরে র‍্যাঙ্গাল দ্বীপের কাছে সামান্য পশ্চিমে।
[2] সাইবেরিয়ার উত্তর-পূর্ব অংশে বেরিং প্রণালীর মধ্য দিয়ে কিছুটা পূর্ব দিকে ।

[3] অ্যালুশিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কাছে 7° পশ্চিমে।
[4] ফিজি, চ্যাথাম প্রভৃতি দ্বীপপুঞ্জের কাছে 11° পূর্বে বেঁকে সম্পূর্ণভাবে জলভাগের (প্রশান্ত মহাসাগর) ওপর দিয়ে এই রেখাটি বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে সাইবেরিয়াবাসীরা সাইবেরিয়ার আঞ্চলিক সময়
ধরে, অ্যালুশিয়ানবাসীরা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় সময় ধরে এবং দক্ষিণে ফিজি, টোঙ্গা, চ্যাথাম প্রভৃতি দ্বীপবাসীরা নিউজিল্যান্ডের প্রমাণ সময় অনুসারে কাজকর্ম করে।