তৃতীয় অধ্যায় ➤ প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ : বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

অভ্যুত্থান

ভূমিকা: বিভিন্ন দেশে ক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট মানুষজন যে উপায়ে নিজেদের ক্ষোভ বা প্রতিবাদ প্রকাশ করে থাকে সেগুলির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য উপায় বা ধারা হল ‘অভ্যুত্থান’।
[1] অভ্যুত্থান কী?: অভুত্থান বলতে বোঝায় কোনো দেশ বা সমাজে কিংবা প্রশাসনে কোনো প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজ গোষ্ঠীর একাংশের সংগ্রাম। এক্ষেত্রে নিজে নেতা বা প্রভুদের বিরুদ্ধেই তাদের অধীনস্থ মানুষ সংগ্রাম করে।
[2] বৈশিষ্ট্য: অভ্যুত্থানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল— [1] নিজ গোষ্ঠীর ক্ষুব্ধ লোকজন অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পতন বা পরিবর্তন ঘটাতে চায়।
[2] অভ্যুত্থানের দ্বারা শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রের পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়।

[3] অভ্যুত্থান সফল বা ব্যর্থ যা-ই হোক না কেন তাতে সমাজ বা রাষ্ট্রের মূল কাঠামোর পরিবর্তন ঘটে না।
[3] উদাহরণ: অভ্যুত্থানের প্রধান উদাহরণগুলি হল—
[1] ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর
একাংশের উদ্যোগে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সিপাহি বিদ্রোহ।
[2] ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের ব্রিটিশ নৌবাহিনীর
মান সরকারের পতন (১৯৮৫ খ্রি.) ঘটিয়ে তাঁর
সেনাপতি এসেনাদের নেতৃত্বে নৌবিদ্রোহ,

[3] বাংলাদেশে জিয়াউর রহরশাদের ক্ষমতা দখল।

ভূমিকা: বিভিন্ন দেশে ক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট মানুষজন যে উপায়ে।নিজেদের ক্ষোভ বা প্রতিবাদ প্রকাশ করে থাকে সেগুলির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য উপায় বা ধারা হল বিদ্রোহ।
[1] বিদ্রোহ কী?: কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে কোনো প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে বিরোধী জনগোষ্ঠী সুসংগঠিত বা অসংগঠিতভাবে যে আন্দোলন গড়ে তোলে তা সাধারণভাবে বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
[2] বৈশিষ্ট্য: বিদ্রোহের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—–[1] বিদ্রোহ স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। [2] বিদ্রোহ পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে শুরু হতে পারে। [3] বিদ্রোহ সফল হলে পূর্বতন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে।[4] বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে পূর্বতন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে না।
[3] উদাহরণ : ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতে রংপুর বিদ্রোহ,পাবনা বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ প্রভৃতি কৃষক বিদ্রোহ,
সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭ খি.) প্রভৃতি হল বিদ্রোহের
উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। [1] ভারতে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের
সিপাহি বিদ্রোহ ছিল স্বল্পকালীন বিদ্রোহ, আবার চিনের
তাইপিং বিদ্রোহ দীর্ঘদিন ধরে চলেছিল। [2] নীল বিদ্রোহ পরিকল্পিতভাবে শুরু হলেও সিপাহি বিদ্রোহ অপরিকল্পিত ভাবে শুরু হয়েছিল।

[3] নীল বিদ্রোহ সফল হওয়ায় সরকার নীল কমিশন গঠন করে নীলচাষিদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষার উদ্যোগ নেয়।

[4] সিপাহি বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ায় ভারতীয় সিপাহিদের দুর্দশা হয়নি।
[5] অনেকসময় বিদ্রোহ এক বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষের
মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

চুয়াড় বিদ্রোহের (প্রথম পর্ব, ১৭৬৭ খ্রি.) বিবরণ
ভূমিকা: ব্রিটিশ শাসনকলে ভারতে যেসব আদিবাসী কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল চুয়াড় বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ দুটি পর্বে সংঘটিত হয়। প্রথম পর্বের বিদ্রোহ হয় ১৭৬৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দে।
[1] চুয়াড়দের পরিচয় : আদিবাসী চুয়াড় বা চোয়াড়
জনগোষ্ঠী বাংলার বর্তমান মেদিনীপুর জেলার উত্তর-
পশ্চিমাংশ ও বাঁকুড়া জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে বসবাস করত। চুয়াড়রা কৃষিকাজ ও পশুশিকারের পাশাপাশি
স্থানীয় জমিদারদের অধীনে পাইক বা সৈনিকদের কাজ করত। জমিদারদের কাজের বিনিময়ে তারা কিছু নিষ্কর জমি ভোগ করত।
[2] বিদ্রোহের কারণ: প্রথম পর্বের চুয়াড় বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি ছিল—[1] জীবিকা সমস্যা: ব্রিটিশ কোম্পানি চুয়াড়দের অধিকাংশ জমিজমা কেড়ে নিলে তাদের জীবিকানির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ে। [2] রাজস্ব বৃদ্ধি: কোম্পানি চুয়াড়দের কৃষিজমির ওপর রাজস্বের হারযথেষ্ট বাড়িয়ে দেয়। [3] অত্যাচার: রাজস্ব আদায়কারী ও অন্যান্য সরকারি কর্মচারীরা চুয়াড়দের ওপর চরম অত্যাচার চালাতে শুরু করে।
[3] বিদ্রোহের সূচনা: ঘাটশিলায় ধলভূমের রাজা জগন্নাথ সিংহ প্রথম কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। চুয়াড়রা এই বিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে যোগ দেয়।
[4] বিদ্রোহের প্রসার : জগন্নাথ সিংহের নেতৃত্বে চুয়াড়রা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। এরপর ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে চুয়াড়রা ধাদকার শ্যামগঞ্জন-এর নেতৃত্বে আবার বিদ্রোহ শুরু করে। কিন্তু এই বিদ্রোহও ব্যর্থ হয়। তবে ব্যর্থতা সত্ত্বেও চুয়াড়দের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন ধিকিধিকি জ্বলতেই থাকে।

কোল বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণ
ভূমিকা: বর্তমান বিহারের ছোটোনাগপুর, সিংভূম, মানভূম প্রভৃতি অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসনকালে কোল উপজাতির মানুষ বসবাস করত। তাদের ওপর ব্রিটিশ সরকার, বহিরাগত জমিদার ও মহাজনদের তীব্র শোষণের ফলে তারা বিদ্রোহ শুরু করে যা ‘কোল বিদ্রোহ' (১৮৩১-৩২ খ্রি.) নামে পরিচিত। কোল বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণ ছিল—[1] রাজস্ব আদায়: আগে কোলরা রাজস্ব দিতে অভ্যস্ত ছিল
না। কিন্তু ছোটোনাগপুর অঞ্চলের শাসনভার গ্রহণের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা চালু করে। বহিরাগত (দিকু) হিন্দু, মুসলিম ও শিখ মহাজনদের হাতে এখানকার জমির ইজারা দিয়ে তাদের হাতে রাজস্ব আদায়ের অধিকার তুলে দেওয়া হয়।
[2] রাজস্ব বৃদ্ধি: জমিদাররা দরিদ্র কোলদের ওপর রাজস্বের পরিমাণ অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেয় এবং নতুন নতুন কর আরোপ করে। এই কর আদায় করতে গিয়ে তাদের ওপর চরম অত্যাচার চালানো হয়। কোলদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পানীয় মদের ওপর উচ্চহারে কর ধার্য করা হয়।
[3] জমি থেকে উৎখাত : ইজারাদাররা কোলদের সর্বস্ব কেড়ে নিতে থাকে, এমনকি জমি থেকেও তাদের উৎখাত করতে শুরু করে।
[4] নির্যাতন : কোলদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালানো হয়। কোল রমণীদের মর্যাদা নষ্ট করা হত এবং নানা অজুহাতে কোল পুরুষদের বন্দি করে রাখা হত।
[5] অর্থনৈতিক শোষণ: রাস্তা তৈরির জন্য বিনা পারিশ্রমিকে কোলদের বেগার শ্রম দিতে বাধ্য করা হত। কোলদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের খাদ্যশস্যের পরিবর্তে আফিম চাষে বাধ্য করা হত।
[6] কোল ঐতিহ্য ধ্বংস: কোলদের নিজস্ব আইনকানুন, বিচারপদ্ধতি প্রভৃতি ধ্বংস করে তাদের ওপর জোর করে ব্রিটিশদের আইনকানুন ও বিচারপদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এসব কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে কোলরা বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায়।

১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বিহারের ছোটোনাগপুর অঞ্চলে
আদিবাসী কোলরা ব্রিটিশ সরকার এবং তাদের সহযোগী জমিদার
ও মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহে বুদ্ধ ভগত,
জোয়া ভগত, ঝিন্দরাই মানকি, সুই মুন্ডা প্রমুখ নেতা নেতৃত্ব দেন।

কোল বিদ্রোহের ফলাফল
ভূমিকা: কোল বিদ্রোহের ফলাফলগুলি ছিল নিম্নরূপ—
[1] ব্রিটিশ নীতির পরিবর্তন: কোল বিদ্রোহের ফলে কোল অধ্যুষিত অঞ্চলে ব্রিটিশ কোম্পানি তাদের নীতির কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটায়।
[2] দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি: ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে
কোল উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে কোলদের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি নামে একটি অঞ্চল গঠন করে।
[3] ব্রিটিশ আইন বাতিল: দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি অঞ্চলে ব্রিটিশ আইন বাতিল হবে এবং কোলদের নিজস্ব আইনকানুন কার্যকর হবে বলে সরকার ঘোষণা করে।
[4] জমি ফেরৎ : জমিদাররা কোলদের যেসব জমিজমা অন্যায়ভাবে দখল করে নিয়েছিল তা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে কোলদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

সাঁওতাল বিদ্রোহের বিবরণ

ভূমিকা: ভারতের প্রাচীন বাসিন্দা আদিবাসী সাঁওতালরা বর্তমান বিহারের ছোটোনাগপুর, পালামৌ, মানভূম এবং বাংলার বীরভূম, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলার বিস্তীর্ণ বনভূমি অঞ্চলে বসবাস করত। তারা ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ইংরেজ সরকার, জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যা ‘হুল বিদ্ৰোহ’ বা ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত।
[1] বিদ্রোহের কারণ : সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি ছিল –[1] সাঁওতাল কৃষকদের ওপর বিপুল পরিমাণ ভূমিরাজস্ব এবং অন্যান্য কর আরোপ, [2] নগদে রাজস্ব পরিশোধের অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে মহাজনদের হাতে দরিদ্র সাঁওতালদের উচ্চ সুদে ঋণের জালে জড়ানো,
[3] পণ্য ক্রয়বিক্রয়ে ব্যবসায়ীদের দ্বারা সরল সাঁওতালদের প্রতারণা, [4] রেলের কাজে নিযুক্ত সাঁওতাল শ্রমিকদের কম মজুরি প্রদান,
[5] সাঁওতালদের নিজস্ব আইন ও বিচার ব্যবস্থার বদলে ব্রিটিশ ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া,[6] সাঁওতালদের নীলচাষে বাধ্য করা প্রভৃতি।

[2] বিদ্রোহের প্রসার: ক্ষুব্ধ সাঁওতালরা ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ইংরেজ কোম্পানি, দেশীয় জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব, বীর সিং, কালো প্রামাণিক, ডোমন মাঝি প্রমুখ। ৩০ জুন প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল ভাগনাডিহির মাঠে জড়ো হয়ে শোষণমুক্ত স্বাধীন সাঁওতালরাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে। বিদ্রোহীরা রেলস্টেশন, থানা, ডাকঘর প্রভৃতি আক্রমণ করে এবং বহু জমিদার ও মহাজনকে হত্যা করে।

[3] বিদ্রোহের অবসান: সাঁওতাল বিদ্রোহ দমনে বিশাল
ব্রিটিশবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিধু, কানু-সহ বেশ
কয়েকজন নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। প্রায় ২৩ হাজার বিদ্রোহীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বহু বিদ্রোহীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই নিষ্ঠুরতার ফলে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্রোহ থেমে যায়।

মুন্ডা বিদ্রোহের কারণ
ভূমিকা: ভারতের প্রাচীনতম আদিবাসী মুন্ডা সম্প্রদায় বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে ১৮৯৯-১৯০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এক শক্তিশালী বিদ্রোহ শুরু করে। এই বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন—
[1] যৌথ মালিকানা বাতিল: ব্রিটিশ শাসনের আগে মুন্ডা অধ্যুষিত অঞ্চলে ‘খুঁৎকাঠি প্রথা’ অনুসারে জমিতে যৌথ মালিকানা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে এই যৌথ মালিকানা ব্যবস্থা বাতিল করে জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
[2] মুন্ডাদের ঐতিহ্য বাতিল: মুন্ডা অধ্যুষিত অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসন চালু হওয়ার পর এখানে মুন্ডাদের চিরাচরিত আইন, শাসন ও বিচারব্যবস্থা বাতিল করে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়।
[3] কর আরোপ : সরকার ও বহিরাগত জমিদাররা মুন্ডাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের কর চাপিয়ে দেয় এবং তা আদায়ে অত্যাচার চালায়।
[4] বেগার শ্রম : সরকারি কর্মচারী ও বহিরাগত জমিদাররা মুন্ডাদের বিনা বেতনে বেগার হিসেবে খাটতে বাধ্য করে।
[5] জমি দখল: বহিরাগত জমিদার, মহাজন ও ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে মুন্ডাদের ঠকিয়ে তাদের জমি দখল করে নিতে থাকে।
[6] চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক: দেশীয় ও ইউরোপীয় ঠিকাদাররা নানা প্রলোভন দেখিয়ে মুন্ডাদের চুক্তির মাধ্যমে আসামের চা- বাগান-সহ বাইরে বিভিন্ন স্থানে কাজে নিয়োগ করত এবং সেখানে তাদের ওপর নানা ধরনের শোষণ ও অত্যাচার চালাতো।
[7] ধর্মান্তকরণ: খ্রিস্টান মিশনারিরা নানা কৌশলে মুন্ডাদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করত।

সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ

ভূমিকা: ছোটোনাগপুরের সাঁওতাল উপজাতি ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার এবং তাদের সহযোগী জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিদ্রোহ শুরু করে। এই বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন—

[1] রাজস্ব আরোপ: আদিবাসী সাঁওতালরা অরণ্য অঞ্চলের পতিত জমি উদ্ধার করে চাষবাস করে সেই জমিকে উর্বর তোলে। ব্রিটিশ শাসনকালে সরকার-নিযুক্ত জমিদাররা সেই জমির ওপর উচ্চহারে রাজস্ব চাপালে সাঁওতাল কৃষকরা জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়

[2]অন্যান্য কর: ভূমিরাজস্ব ছাড়াও সরকার,জমিদার প্রমুখ সাঁওতালদের ওপর বিভিন্ন ধরনের করের বোঝা চাপিয়ে দেয়। ফলে দরিদ্র সাঁওতালদের দুর্দশা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।

[3] মহাজনদের শোষণ: সাঁওতালরা নগদে ভূমিরাজস্ব ও অন্যান্য কর পরিশোধে বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের নিয়োগ করে তাদের খুব কম মজুরি দেওয়া হত। তা ছাড়া রেলের ঠিকাদার ও ইংরেজ কর্মচারীরামহাজনদের কাছ থেকে অত্যন্ত চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হত। পরবর্তীকালে ঋণের দায়ে তার জমি, ফসল, বলদ কেড়ে নেওয়া হত।

[3] ব্যবসায়ীদের প্রতারণা : বহিরাগত ব্যবসায়ীরা কেনারাম নামক বাটখারা ব্যবহার করে সাঁওতালদের কাছ থেকে কৃষিপণ্য কেনার সময় এবং বেচারাম নামক বাটখারা ব্যবহার করে নিজেদের পণ্যগুলি সাঁওতালদের কাছে বিক্রির সময় ঠকাত।

[4]রেলপথ নির্মাণ: সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে রেলপথ নির্মাণের কাজে সাঁওতাল  সাঁওতাল পরিবারগুলির ওপর নানাভাবে অত্যাচার করত।

[5] সাঁওতাল আইন বাতিল: সরকার সাঁওতালদের নিজস্ব আইন ও বিচারপদ্ধতি বাতিল করে সাঁওতাল এলাকায় ইংরেজদের জটিল আইন ও বিচারব্যবস্থা চালু করে।

[6] খ্রিস্টধর্ম প্রচার: খ্রিস্টান মিশনারিরা সাঁওতালদের ধর্মকে অবজ্ঞা করত এবং সুকৌশলে সাঁওতালদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করত।

[7] নীলচাষ: নীলকর সাহেবরা সাঁওতাল কৃষকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের নীলচাষে বাধ্য করত।

সাঁওতাল বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য ভূমিকা:
ভারতের সুপ্রাচীন আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার ও তাদের সহযোগী জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। এই বিদ্রোহের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল নিম্নরূপ-
[1] সর্বস্তরের অংশগ্রহণ: সাঁওতাল বিদ্রোহে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বস্তরের এবং সব বয়সের সাঁওতালরা অংশগ্রহণ করে। ফলে বিদ্রোহ ব্যাপক আকার নেয়।
[2] গণবিদ্রোহ: সাঁওতালরা ছাড়াও স্থানীয় নিম্নবর্ণের বিভিন্ন মানুষ যেমন— কামার, কুমোর, তাঁতি, গোয়ালা, ডোম প্রভৃতি বর্ণ ও পেশার মানুষও সাঁওতাল বিদ্রোহে অংশ নেয়। ফলে সাঁওতাল বিদ্রোহ প্রকৃত গণবিদ্রোহে পরিণত হয়।
[3] অসম অস্ত্রের লড়াই: সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল সাঁওতাল ও ইংরেজ বাহিনীর মধ্যে অসম অস্ত্রশস্ত্রের লড়াই। আদিবাসী সাঁওতালরা সেকেলে তিরধনুক, বল্লম নিয়ে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল হয়।
[4] ব্রিটিশ-বিরোধিতা : সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে ব্রিটিশ শক্তির আধিপত্য লুপ্ত করাই ছিল বিদ্রোহীদের মূল লক্ষ্য।
[5] ব্রিটিশ সহযোগীদের বিরোধিতা: শুধু ব্রিটিশ শাসন নয়, ব্রিটিশদের সহযোগী বহিরাগত জমিদার ও মহাজনদের বিরোধিতা এবং তাদের ধ্বংসসাধনও বিদ্রোহীদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। ডাকটিকিটে সাঁওতাল বিদ্রোহের দুই নেতা–সিধু ও কানু
[6] আক্রমণের কেন্দ্র: সাঁওতাল বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুল কেন্দ্র ছিল থানা, ডাকঘর, রেলস্টেশন, ইউরোপীদের বাংলো, জমিদার ও মহাজনদের বাড়ি প্রভৃতি।

ভূমিকা: ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল দরিদ্র সাঁওতালদের আপসহীন এক সংগ্রাম। তবে এই বিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন— [1] আদিবাসী বিদ্রোহ: সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল বিহারের ছোটোনাগপুর অঞ্চলের আদিবাসী বা উপজাতি সাঁওতালদের বিদ্রোহ। আদিবাসী সাঁওতালরাই ছিল এই বিদ্রোহের প্রাণশক্তি।

[2] কৃষকবিদ্রোহ: সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল মূলত একটি কৃষকবিদ্রোহ। দরিদ্র ও শোষিত আদিবাসী সাঁওতাল কৃষকরা জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল।

[3] ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহ: সাঁওতাল বিদ্রোহ শুধু জমিদার শনিবা মহাজন-বিরোধী বিদ্রোহ ছিল না। এই বিদ্রোহ ছিল স্পষ্টতই ব্রিটিশ বিরোধী। বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর হ্যালিডে বলেন যে, ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানোই এই বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিল।

[4] গণবিদ্রোহ : সাঁওতাল কৃষকদের উদ্যোগে এই বিদ্রোহ শুরু হলেও স্থানীয় কামার, কুমোর, তেলী, গোয়ালা, মুসলিম তাঁতি, চামার, ডোম প্রভৃতি সম্প্রদায় ও পেশার মানুষও এই বিদ্রোহে শামিল হয়। তাই নরহরি কবিরাজ একে সকল সম্প্রদায়ের দরিদ্র জনগণের মুক্তিযুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।

[5] ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহ: কেউ কেউ সাঁওতাল বিদ্রোহে ধর্মের প্রভাব দেখতে পেলেও এই বিদ্রোহ প্রকৃতপক্ষে ধর্মকেন্দ্রিক ছিল না। বিদ্রোহী সাঁওতালরা ঈশ্বরকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। বরং তারা চিৎকার করে বলত— “ঈশ্বর মহান, কিন্তু তিনি থাকেন বহু বহু দূরে। আমাদের বাঁচাবার কেউ নেই।”

[4] গণবিদ্রোহ : সাঁওতাল কৃষকদের উদ্যোগে এই বিদ্রোহ শুরু হলেও স্থানীয় কামার, কুমোর, তেলী, গোয়ালা, মুসলিম তাঁতি, চামার, ডোম প্রভৃতি সম্প্রদায় ও পেশার মানুষও এই বিদ্রোহে শামিল হয়। তাই নরহরি কবিরাজ একে সকল সম্প্রদায়ের দরিদ্র জনগণের মুক্তিযুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।

[5] ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহ: কেউ কেউ সাঁওতাল বিদ্রোহে ধর্মের প্রভাব দেখতে পেলেও এই বিদ্রোহ প্রকৃতপক্ষে ধর্মকেন্দ্রিক ছিল না। বিদ্রোহী সাঁওতালরা ঈশ্বরকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। বরং তারা চিৎকার করে বলত— “ঈশ্বর মহান, কিন্তু তিনি থাকেন বহু বহু দূরে। আমাদের বাঁচাবার কেউ নেই।”

 

সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব ভূমিকা: ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের বিভিন্ন আদিবাসী বিদ্রোহগুলির মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৬ খ্রি.)। এই বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হলেও বিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্বকে মোটেই অস্বীকার করা যায় না। যেমন—

[1] ব্যাপকতা : আদিবাসী সাঁওতালরা এই বিদ্রোহ শুরু করলেও এই ক্ষোভের আগুন নিম্নবর্ণের কামার, কুমোর, তাঁতি, ডোম,

গোয়ালা প্রভৃতি হিন্দুদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।

[2] সুদের হার হ্রাস: সাঁওতালদের বিদ্রোহের ফলে সরকার তাদের ওপর মহাজনি শোষণ সম্পর্কে সচেতন হয়। সরকার সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় বহিরাগত মহাজনদের ঋণের সুদের হার বেঁধে দেয়।

[3] সাঁওতাল পরগনা গঠন: সরকার সাঁওতালদের পৃথক 'উপজাতি' হিসেবে ঘোষণা করে ছোটোনাগপুর অঞ্চলে তাদের জন্য সাঁওতাল পরগনা জেলা গঠন করে দেয়।

[4] সাঁওতালদের নিজস্ব আইন: সরকার ঘোষণা করে যে, সাঁওতাল পরগনায় ব্রিটিশ আইন কার্যকর হবে না। সেখানে সাঁওতালদের চিরাচরিত নিজস্ব আইন ও বিচারব্যবস্থা কার্যকরী হবে।

[5] বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ: সাঁওতালদের ওপর শোষণ-অত্যাচার লাঘব করার উদ্দেশ্যে সরকার সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় বাঙালি মহাজন-সহ বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে।

[6] খ্রিস্টধর্মের প্রসার: বহিরাগত দেশীয় মহাজনদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রবেশ ও সাঁওতালদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়। সাঁওতালদের‘উন্নতি’ ও ‘মঙ্গল’ সাধন করাই মিশনারিদের লক্ষ্য বলে বিবেচিত হয়।

 

[7] মহাবিদ্রোহের অগ্রদূত: ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায়ের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল “ভারতের যুগান্তকারী মহাবিদ্রোহের অগ্রদূতস্বরূপ।” ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করেন যে, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে অভিহিত করা হলে সাঁওতাল বিদ্রোহকেও স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্যাদা দেওয়া উচিত।

মুন্ডা বিদ্ৰোহ

ভূমিকা: বর্তমান ঝাড়খন্ড রাজ্যের ছোটোনাগপুর ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী মুন্ডা সম্প্রদায় বিরসা

মুন্ডার নেতৃত্বে ১৮৯৯-১৯০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ যে শক্তিশালী বিদ্রোহ শুরু করে তা সাধারণভাবে মুন্ডা বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

[1] বিদ্রোহের কারণ: মুন্ডা বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি ছিল – [1] জমিতে মুন্ডাদের চিরাচরিত যৌথ মালিকানা

ব্যবস্থা (খুঁৎকাঠি প্রথা বাতিল করা, [2] মুন্ডাদের নিজস্ব আইন, শাসন ও বিচারব্যবস্থা বাতিল করা, [3] মুন্ডাদের

ওপর ভূমিরাজস্বের হার বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ধরনের নতুন কর আরোপ, [4] মুন্ডা শ্রমিকদের বেগার শ্রমদানে বাধ্য করা,

[5] মুন্ডাদের জমিজমা বহিরাগত জমিদার ও মহাজনদের দ্বারা দখল, [6] মুন্ডাদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তকরণ প্রভৃতি।

[2] ক্ষোভের সূত্রপাত: বিরসা এক নতুন ধর্ম প্রচার করে মুন্ডাদের ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি মুন্ডাদের খাজনা দিতে

নিষেধ করেন এবং বিদেশিদের বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়ে এক স্বাধীন মুন্ডারাজ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। এর ফলে

তাঁকে দুই বছর (১৮৯৫-৯৬ খ্রি.) জেলে থাকতে হয়। [3] বিদ্রোহের প্রসার বিরসা ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে একটিসেনাদল গঠন করে নতুন উদ্যমে বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েন। খুঁটি, রাঁচি, চক্রধরপুর, বুন্দু, তামার, তোরপা,কারা বাসিয়া প্রভৃতি স্থানে তাঁর গোপন ঘাঁটি গড়ে ওঠে।
১৯০০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বিদ্রোহ প্রবল আকার ধারণ করে। ইংরেজ কর্মচারী, পুলিশ, জমিদার, মহাজন, থানা, গির্জা প্রভৃতির ওপর আক্রমণ চলে।
[4] বিদ্রোহের অবসান : প্রবল বিক্রমে লড়াই করেও
বিদ্রোহী মুন্ডারা শেষপর্যন্ত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত
ইংরেজ বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। বহু বিদ্রোহীর ফাঁসি
বা কারাদন্ড হয়। এভাবে বিদ্রোহ থেমে যায়। বিরসা মুন্ডা
রাঁচি জেলে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

মুন্ডা বিদ্রোহের ফলাফল
ভূমিকা: মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৯৯-১৯০০ খ্রি.) ভারতের ব্রিটিশ- বিরোধী এক শক্তিশালী আদিবাসী বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ আপাত দৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহের ফলাফলগুলিকে মোটেই অস্বীকার করা যায় না।
[1] সমস্যার সমাধান: বিদ্রোহের পর থেকে সরকার মুন্ডাদের অভাব-অভিযোগগুলি গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধি করার এবং সমাধানের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে।
[2] টেন্যান্সি অ্যাক্ট: সরকার মুন্ডাদের দুর্দশা লাঘবের উদ্দেশ্যে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ছোটোনাগপুর টেন্যান্সি অ্যাক্ট(১৯০৮ খ্রি.) পাস করে। এর দ্বারা সরকার মুন্ডাদের কিছু সুবিধা দেয়।
[3] খুঁৎকাঠি প্রথার স্বীকৃতি: সরকার মুক্তা সমাজে প্রচলিত খুঁৎকাঠি প্ৰথা অর্থাৎ জমিতে মুন্ডাদের যৌথ মালিকানা স্বীকার করে নেয়। এ ছাড়া সরকার জমি থেকে মুন্ডাদেরউচ্ছেদ নিষিদ্ধ করে।
[4] বেগার শ্রম নিষিদ্ধ : সরকার মুন্ডাদের দিয়ে বিনা বেতনে বেগার খাটানো নিষিদ্ধ করে। ফলে মুন্ডারা শোষণ থেকে মুক্তি পায়।
[5] একতার সৃষ্টি: বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে মুণ্ডাদের মধ্যে এক গভীর একতা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিরসা মুন্ডা প্রথমে নতুন ছিল ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এবং পরে বিদ্রোহ শুরু হলে সেই ঐক্য আরও শক্তিশালী হয়।
[6] বিরসা সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ: বিদ্রোহের পর বিরসার অনুগামীদের নিয়ে ‘বিরসা সম্প্রদায়' নামে একটি উপজাতি শাখার আত্মপ্রকাশ ঘটে।
[7] তানা ভগৎ আন্দোলন: মুন্ডা বিদ্রোহের প্রভাবে ছোটোনাগপুর অঞ্চলের আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের ভঁহিয়ারা জমির মালিকানা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তানা ভগৎ আন্দোলনের সূচনা করে।
[8] জমি জরিপ: সরকার মুন্ডা এলাকায় জমি জরিপ করে।
ফলে নিজেদের জমিতে মুন্ডাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

মুন্ডা বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য
ভূমিকা: ১৮৯৯-১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ছোটোনাগপুর তার সন্নিহিত অঞ্চলের মুন্ডারা বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ শুরু করে তা মুন্ডাদের ভাষায় ‘উলঘুলান’ বা ‘ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা’ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। যেমন—
[1] আদিবাসী বিদ্রোহ: মুন্ডা বিদ্রোহ ছিল মূলত আদিবাসী মুন্ডাদের দ্বারা পরিচালিত একটি বিদ্রোহ। মুন্ডারাই ছিল এই বিদ্রোহের প্রাণশক্তি।
[2] জমির মালিকানা: মুন্ডারা নিজেদের চাষ করা জমিতে জমিদারদের মালিকানা অস্বীকার করে এবং জমিতে নিজেদের মালিকানার দাবি জানায়।
[3] মুক্তির উপায় : মুন্ডারা শোষণ ও অত্যাচার থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে প্রথমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে মহারানি ভিক্টোরিয়ারকাছে আবেদন জানায়। কিন্তু তাতে কোনো কাজ না হলে
তারা বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায়।
[4]ব্রিটিশ বিরোধিতা : ব্রিটিশ শক্তির বিরোধিতাই ছিল মুন্ডা বিদ্রোহীদের মূল লক্ষ্য। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ সরকারের অফিস, থানা প্রভৃতি আক্রমণ করে।
[5] দিকু বিরোধিতা: বিদ্রোহী মুন্ডারা ব্রিটিশদের সহযোগী বহিরাগত ‘দিকু' অর্থাৎ জমিদার, মহাজন
ব্যবসায়ীদেরও বিরোধিতা করে এবং মুন্ডা অঞ্চল থেকে তাদের বিতাড়নের কথা ঘোষণা করে।
[6] স্বাধীনতা: বিরসা মুন্ডা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন।তিনি মুন্ডাদের নিয়ে স্বাধীন মুন্ডারাজ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন।

মুন্ডা বিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র
ভূমিকা: ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৯৯-১৯০০ খ্রি.)। এই বিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র ছিল বহুমুখী। যেমন—
[1] ঐক্য: বিরসার নেতৃত্বে মুণ্ডাদের ঐকা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিরসা প্রথমে নতুন ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে মুন্ডাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন। পরে প্রবল বিদ্রোহের সময় এই ঐক্য আরও জোরদার হয়। পরবর্তীকালে বিদ্রোহের অবসান ঘটলেও বিরসার ঐক্যবদ্ধ অনুগামীরা ‘বিরসাইট’বা বিরসা সম্প্রদায়' প্রতিষ্ঠা করে।
[2] আদিবাসী বিদ্রোহ: মুন্ডা বিদ্রোহ ছিল মূলত একটি
আদিবাসী বা উপজাতি বিদ্রোহ। কারণ আদিবাসী মুন্ডারাই ছিল এই বিদ্রোহের চালিকাশক্তি।
[3] কৃষকবিদ্রোহ: মুন্ডা বিদ্রোহে মূলত কৃষকরা অংশ
নিয়েছিল। এজন্য অধ্যাপক নরহরি কবিরাজ মুন্ডা
বিদ্ৰোহকে 'কৃষক বিদ্ৰোহ' বলে অভিহিত করেছেন।
[4] ব্রিটিশ বিরোধিতা: মুন্ডা বিদ্রোহ ছিল ভারতের ব্রিটিশ- বিরোধী একটি গণসংগ্রাম। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানোই ছিল বিদ্রোহীদের প্রধান লক্ষ্য।
[5] স্বাধীনতার দাবি: মুন্ডা বিদ্রোহে স্বাধীনতার দাবি খুবই স্পিষ্ট ছিল। বিরসা মুন্ডা বিদেশিদের বিতাড়িত করে স্বাধীন মুন্ডারাজ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন।

বিরসা মুন্ডা
ভূমিকা: ১৮৯৯-১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ছোটোনাগপুর ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে আদিবাসী মুভা সম্প্রদায় শক্তিশালী বিদ্রোহ শুরু করে। বিরসা মুন্ডা ছিলেন এই বিদ্রোহের প্রধান নেতা।
[1] প্রথম জীবন বিরসা মুন্ডা ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে রাঁচি জেলার উলিহাত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুগান মুন্ডা ছিলেন একজন বর্গাচাষি। বিরসা বাল্যকালে খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেন।
[2] ধর্মপ্রচার: বিরসা ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে এক নতুন ধর্মমত প্রচার করেন। তিনি নিজেকে অবতার বলে ঘোষণা করেন এবং দাবি করেন যে, তিনি ভগবানের দর্শন পেয়েছেন।তিনি মহাপ্লাবনের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তিনি মুন্ডা সমাজের প্রচলিত কুসংস্কারের বিরোধিতা করেন, পশুবলি বন্ধ এবং মাদক বর্জন করার কথা বলেন। তিনি মুন্ডাদের উপবীত ধারণ করতে বলেন।

[3] প্রথম আন্দোলন: ১৮৯৩-৯৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সরকারি বনবিভাগ মুন্ডা গ্রামের পতিত জমি অধিগ্রহণ করতে শুরু করলে বিরসা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।
[4] বিদ্রোহের সূচনা: বিরসা ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ
মুন্ডাদের ঐক্যবদ্ধ করে সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করনে। ২৪ ডিসেম্বর (১৮৯৯ খ্রি.) বিদ্রোহের দিন ঠিক হয়।
[5] বিদ্রোহের প্রসার: ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বিরসার নেতৃত্বে বিদ্রোহ প্রবল আকার ধারণ করে।বিদ্রোহীরা সরকারি অফিস, থানা, ইংরেজ পুলিশ ও কর্মচারীদের আক্রমণ করতে থাকে।
[6] মৃত্যু: প্রবল বিক্রমে লড়াই করেও বিরসা-র বাহিনী শেষপর্যন্ত ব্রিটিশবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। বিরসাকে রাঁচি জেলে বন্দি করা হয়। সেখানে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব
ভূমিকা: ইতিহাসের আলোচনায় আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ধারা হল ‘বিদ্রোহ’, ‘অভ্যুত্থান’ ও ‘বিপ্লব'। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন
দেশে শোষক ও অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী প্রতিবাদে শামিল হয়েছে। এই প্রতিবাদ বা ক্ষোভের প্রকাশ বিভিন্ন ‘বিদ্ৰোহ’ বা ‘অভ্যুত্থান' বা 'বিপ্লব'-এর মাধ্যমে হতে পারে।‘বিদ্রোহ’, ‘অভ্যুত্থান’ ও ‘বিপ্লব’-এর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। যেমন—
[1] বিদ্রোহ:
i.বিদ্রোহ কী?: বিদ্রোহ বলতে বোঝায় কোনো চলিত ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে বিরোধী নসমষ্টির আন্দোলন। বিদ্রোহ স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী হতে রে। বিদ্রোহ সফল হলে পূর্বতন ব্যবস্থার পরিবর্তনের ম্ভাবনা থাকে, ব্যর্থ হলেও বিদ্রোহের প্রতিক্রিয়ায় ধীরে রে পরিবর্তন সম্ভব। i. উদাহরণ: ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতে রংপুর দ্রোহ, পাবনা বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ প্রভৃতি ষকবিদ্রোহ এবং সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭ খ্রি.) প্রভৃতি বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিদ্রোহের গতি নেক সময় থেমে যায়। যেমন, রংপুর বিদ্রোহের তো ঘটনায় আগে প্রচলিত ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন টেনি। আবার নীল বিদ্রোহের পর সরকার নীল কমিশন। য়োগ করে নীলচাষিদের ওপর অত্যাচার লাঘবের বস্থা করে।
[2] অভ্যুত্থান:
i. অভ্যুত্থান কী?: অভ্যুত্থান বলতে বোঝায় কোনো চলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজ গোষ্ঠীর একাংশের গ্রাম। অভ্যুত্থান দীর্ঘমেয়াদী হয় না। অভ্যুত্থান সাধারণত ব দ্রুত সম্পন্ন হয়। অভ্যুত্থানে বিরোধী গোষ্ঠীর ভূমিকা কতে পারে, না-ও থাকতে পারে। তবে নিজ গোষ্ঠীর কাংশের স্বার্থসিদ্ধির বিষয়টি ‘অভ্যুত্থান'-এ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ii. উদাহরণ: [i] ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের ব্রিটিশ নাবাহিনীর একাংশ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সিপাহি দ্রোহ বা মহাবিদ্রোহ সংঘটিত করে। [ii] ১৯৪৬ স্টাব্দে ভারতের ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নৌসেনাদের বিদ্রোহ সম্পন্ন হয়। [iii] স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৫খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করে নাপতি মহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে। এগুলি ভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তবে এগুলি র্ঘস্থায়ী হয়নি।
[3] বিপ্লব:
i. ‘বিপ্লব’ কী?: ‘বিপ্লব' বলতে বোঝায় প্রচলিত বস্থার দ্রুত, ব্যাপক ও আমুল পরিবর্তন। 'বিপ্লব’ হল বিদ্রোহ’ এবং ‘অভ্যুত্থান’-এর চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক।
ii. উদাহরণ: [a] অষ্টাদশ শতকে ইউরোপেল্পবিপ্লবের দ্বারা ইউরোপের শিল্পব্যবস্থার আমুলপরিবর্তন ঘটে। [b] ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের রা ফ্রান্সের পূর্বতন সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জনৈতিক ব্যবস্থার দ্রুত ও আমূল পরিবর্তন ঘটে। দ্রোহকে আবার বিপ্লবের প্রাথমিক ধাপ বযেতে পারে – [1] ১৮৫৭ স্টাব্দের মহাবিদ্রোহকে কেউ কেউ ‘বিদ্রোহ’, ‘আবার কেউকেউ ‘অভ্যুত্থান' হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন। [2] ১৯৭১খ্রিস্টাব্দে পূর্ববঙ্গের মানুষের স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেউ কেউ গণবিদ্রোহ’ আবার কেউ কেউ ‘গণ অভ্যুত্থান' বলে বর্ণনা করে
থাকেন।

চুয়াড় বিদ্রোহের বিবরণ
ভূমিকা: ভারতের আদিবাসী চুয়াড় বা চোয়াড় জনগোষ্ঠী লার বর্তমান মেদিনীপুর জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশ ও বাঁকুড়া জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে বসবাস করত। তারা কৃষিকাজ ও শুশিকারের পাশাপাশি স্থানীয় জমিদারদের অধীনে পাইক বা সৈনিকের কাজ করত। জমিদারের কাজের বিনিময়ে তারা কিছু ষ্কর জমি ভোগ করত। এই চুয়াড়রা ইংরেজদের শোষণ ও ত্যাচারের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ শুরু করে তা চুয়াড় বিদ্রোহ নামে পরিচিত
[1]দুটি পর্ব : চুয়াড় বিদ্রোেহ অন্তত তিন দশক ধরে চলে। এই বিদ্রোহ দুটি পর্বে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
i. প্রথম পর্ব: প্রথম পর্বের বিদ্রোহ ১৭৬৭-৬৮ খ্স্টব্দে শুরু হয়।

ii. দ্বিতীয় পর্ব : দ্বিতীয় পর্বের বিদ্রোহ শুরু হয়
বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি ছিল—
[2] প্রথম পর্বের বিদ্রোহের কারণ: প্রথম পর্বের চুয়াড়
i. জীবিকা সমস্যা: ব্রিটিশ কোম্পানি চুয়াড়দের
অধিকাংশ জমিজমা কেড়ে নিলে তাদের জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ে।
ii. রাজস্ব বৃদ্ধি: কোম্পানি চুয়াড়দের কৃষিজমির
ওপর রাজস্বের হার যথেষ্ট বাড়িয়ে দেয়।

iii. অত্যাচার: রাজস্ব আদায়কারী ভ অন্যান্য
সরকারি কর্মচারীরা চুয়াড়দের ওপর চরম অত্যাচার
চালাতে শুরু করে।
[3] প্রথম পর্বের বিদ্রোহ: ঘাটশিলা ধলভূমের রাজা জগন্নাii. দ্বিতীয় পর্ব : দ্বিতীয় পর্বের বিদ্রোহ শুরু হয়বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি ছিল—
[2] প্রথম পর্বের বিদ্রোহের কারণ: প্রথম পর্বের চুয়াড়
i. জীবিকা সমস্যা: ব্রিটিশ কোম্পানি চুয়াড়দের
অধিকাংশ জমিজমা কেড়ে নিলে তাদের জীবিকা নির্বাহ
কঠিন হয়ে পড়ে।
ii. রাজস্ব বৃদ্ধি: কোম্পানি চুয়াড়দের কৃষিজমির
ওপর রাজস্বের হার যথেষ্ট বাড়িয়ে দেয়।
সিংহ প্রথম কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
চুয়াড়রা এই বিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে যোগ দেয়। শেষপর্যন্ত
চুয়াড়রা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। এরপর
১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে তারা ধাদকার শ্যামগঞ্জ-এর নেতৃত্বে
আবার বিদ্রোহ শুরু করে। কিন্তু এই বিদ্রোহও ব্যর্থ হয়।
[4] দ্বিতীয় পর্বের বিদ্রোহের কারণ : দ্বিতীয় পর্যায়ের চুয়াড়
বিদ্রোহের (১৭৯৮-৯৯ খ্রি.) বিভিন্ন কারণ ছিল—
i. নির্যাতন: ব্রিটিশ সরকার ও তাদের কর্মচারীরা
আদিবাসী চুয়াড় এবং স্থানীয় জমিদারদের ওপর নির্যাতন শুরু করে।
ii. জমি থেকে উৎখাত: প্রথম পর্যায়ের চুয়াড়
বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে ইংরেজরা দরিদ্র
চুয়াড়দের জমির মালিকানা বাতিল করে তাদের জমি
থেকে উৎখাত করে
iii. পেশা থেকে বিতাড়ন: সরকার বহু চুয়াড়কে
তাদের পাইকের পেশা থেকে বিতাড়িত করে।
iv. রাজস্ব বৃদ্ধি: জমিদারদের ওপর রাজস্বের
পরিমাণ যথেষ্ট বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব কারণে
জমিদার ও চুয়াড় কৃষকরা ক্ষুব্ধ হয়।
[5] দ্বিতীয় পর্বের বিদ্রোহ: জঙ্গলমহল-সহ মেদিনীপুর
জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দ্বিতীয় পর্যায়ের চুয়াড় বিদ্রোহ
ছড়িয়ে পড়ে। এই বিদ্রোহের নেতাদের মধ্যে
বাঁকুড়ার রায়পুরের জমিদার দুর্জন সিং, মেদিনীপুরের
রাণি শিরোমণি প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাঁরা বিভিন্ন জমিদার ও আদিবাসী চুয়াড়দের বিদ্রোহে শামিল করতে সক্ষম হন। প্রায় ১৫০০ অনুগামী নিয়ে প্রবল আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং চুয়াড়রা প্রায় ৩০টি গ্রামে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্রোহে অসামান্য অবদানের জন্য রানি শিরোমণি 'মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাঈ’ নামে পরিচিত হন।
[6] বিদ্রোহের অবসান: প্রবল বিদ্রোহের ফলে ইংরেজ
পুলিশ ও কর্মচারীরা বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র রায়পুর ছেড়ে প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ (153)
পালিয়ে যায়। কিন্তু শীঘ্রই পরিস্থিতি পালটে যায়। সশস্ত্র ব্রিটিশ সেনা এসে বিদ্রোহী জমিদার ও আদিবাসী
চুয়াড়দের পরাজিত করে। রানি শিরোমণিকে হত্যা এবং দুর্জন সিংকে গ্রেফতার করা হয়। এর ফলে বিদ্রোহ থেমে যায়।
উপসংহার: চুয়াড় বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল লক্ষ করা যায়। যেমন—
[1] বিদ্রোহের দৃষ্টান্ত : ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে
পশ্চাদপদ চুয়াড়রা বিদ্রোহ শুরু করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
[2] জমিদার ও কৃষকদের একতা : এই বিদ্রোহে  জমিদার ও কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহে শামিল হয়।
[3] জঙ্গলমহল জেলা গঠন: চুয়াড়দের ওপর কঠোর
নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সরকার এখানকার
শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটায়। বিন্নুপুর শহরটিকে কেন্দ্র করে দুর্গম বনাঞ্চল নিয়ে জঙ্গলমহল নামে একটি বিশেষ জেলা গঠন করা হয়।

কোল বিদ্ৰোহ
ভূমিকা: ভারতের প্রাচীন বাসিন্দা কোল উপজাতি সুপ্রাচীন কাল থেকে বর্তমান বিহারের সিংভূম, মানভূম ছোটোনাগপুর প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাস করত। উনিশ শতকে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কোলরা শক্তিশালী বিদ্রোহ শুরু করে যা কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-৩২ খ্রি.) নামে পরিচিত।
[1] কোলদের পরিচয় : আদিবাসী কোল সম্প্রদায় সুপ্রাচীন কাল থেকেই কৃষিকাজ এবং অরণ্যের সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। তারা ছিল স্বাধীনচেতা। ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত কোলরা নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে পেরেছিল। ব্রিটিশরা কোল অধ্যুষিত অঞ্চলের শাসনভার গ্রহণ করে এবং বহিরাগত লোকেদের এখানকার জমিদার নিযুক্ত করে। ফলে কোলদের স্বাধীনতা লোপ পেতে থাকে।
[2] বিদ্রোহের কারণ: কোল বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণ ছিল।
i. শোষণ: ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার
সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী কোল অধ্যুষিত অঞ্চলে ব্রিটিশদের শোষণ শুরু হয়।
ii. কোল ঐতিহ্য ধ্বংস: ব্রিটিশরা কোল অধ্যুষিত
অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে কোলদের
চিরাচরিত ঐতিহ্য ধ্বংস করে। তারা সেখানে নতুন আইন ও বিচারব্যবস্থা চালু করে। ফলে কোলদের নিজস্ব আইন ও বিচারব্যবস্থা ধ্বংস হতে থাকে।

ii. রাজস্ব বৃদ্ধি: ইংরেজরা কোল অধ্যুষিত অঞ্চলে
বহিরাগত বিভিন্ন জমিদারদের ইজারা দেয়। জমিদাররা কোলদের ওপর রাজস্বের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি করে।
iv. নগদে খাজনা আদায়: সরকার ও জমিদাররা
দরিদ্র কোলদের নগদে খাজনা দিতে বাধ্য করে। ফলে
কোলরা নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে মহাজনদের দ্বারা
প্রতারিত হয়।
v. জীবিকায় আঘাত: সরকার 13 জমিদাররা
কোলদের খাদ্য উৎপাদনের পরিবর্তে আফিম চাষে বাধ্য করে। ফলে তারা খাদ্যাভাবের শিকার হয়।
vi. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ত্রুটি: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
(১৭৯৩ খ্রি.) প্রবর্তনের পর জমিদার ও মহাজনরা
কোলদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি করে।
[3] বিদ্রোহের প্রসার : বুদ্ধু ভগৎ, জোয়া ভগৎ, ঝিন্দন রাই, মানকি, সুই মুন্ডা প্রমুখ নেতা কোল বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। কোলরা প্রথমে ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহ করলেও তা শীঘ্রই ব্যর্থ হয়। এরপর ১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রাঁচি, হাজারিবাগ, সিংভূম, মানভূম, পালামৌ,
ছোটোনাগপুর প্রভৃতি অঞ্চলে কোল বিদ্রোহ তীব্র আকার নেয়। সাধারণ চাষি, কামার, কুমোর, গোয়ালা প্রমুখও কোলদের সঙ্গে বিদ্রোহে যোগ দেয়। বিদ্রোহীরা সরকারি দপ্তর ও থানায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। চার্লস মেটকাফের মতে, ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটানোই ছিল কোল বিদ্রোহীদের প্রধান লক্ষ্য।
[4] বিদ্রোহের অবসান: শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সেনা নির্মম
দমনপীড়ন চালিয়ে বিদ্রোহ দমন করে। ঐতিহাসিক
জগদীশচন্দ্র ঝা মনে করেন যে, সুযোগ্য নেতার অভাব, আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা, শিক্ষিত মানুষের সমর্থনের অভাব, বিদ্রোহীদের মধ্যে যোগাযোগের অভাব প্রভৃতি কারণে কোল বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
উপসংহার: কোল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল লক্ষ করা যায়। যেমন- [1] সরকার ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে কোল উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে কোলদের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি নামে একটি অঞ্চল গঠন করে। [2] এই অঞ্চলে ব্রিটিশ আইন কার্যকর হবে না বলে সরকার ঘোষণা করে।