তৃতীয় অধ্যায় ➤ বারিমণ্ডল

উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূল দিয়ে পাশাপাশি প্রবাহিত উত্তরমুখী উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের ঘন নীল জল এবং দক্ষিণমুখী শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের সবুজ জলের মাঝে এক বিভাজন রেখা বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। এই বিভাজন রেখাকে ‘হিমপ্রাচীর' বলা হয়। এর সাথে জলস্তম্ভের উচ্চতার কোনো সম্পর্ক নেই।

উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলনস্থলে শীতল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা হিমশৈল, উষ্ণ স্রোতের সংস্পর্শে গলে যায়। ফলে হিমশৈলের মধ্যে থাকা পাথর, নুড়ি, বালি প্রভৃতি সমুদ্রবক্ষে দীর্ঘকাল ধরে জমতে জমতে উঁচু হয়ে যে নিমগ্ন ভূভাগের সৃষ্টি করে তাকে মগ্নচড়া বলা হয়। যেমন—নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলের অদূরে গ্র্যান্ড ব্যাংক, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের অদূরে সমুদ্রবক্ষে ডগার্স ব্যাংক প্রভৃতি বিখ্যাত মগ্নচড়ার উদাহরণ। এই মগ্নচড়াগুলি মৎস্যক্ষেত্র হিসেবে বিখ্যাত।

আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তরাংশের একটি শীতল স্রোতের নাম ল্যাব্রাডর স্রোত। সুমেরু মহাসাগর থেকে মেরু বায়ুর প্রভাবে যে শীতল স্রোতটি গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূল ধরে (অর্থাৎ কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যভাগ দিয়ে) দক্ষিণদিকে এগিয়ে আসে এবং গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে এসে ল্যাব্রাডর উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল দিয়ে আরও দক্ষিণে প্রবাহিত হয়, তাকেই বলা হয় ল্যাব্রাডর স্রোত।

আটলান্টিক মহাসাগরের প্রায় মধ্যভাগে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ুর প্রভাবে পশ্চিমমুখী দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের উৎপত্তি হয়। পশ্চিমদিকে যেতে যেতে এই উষ্ণ দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ব্রাজিলের সাও রোক (সেন্ট রক) অন্তরীপের কাছে ধাক্কা খেয়ে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুটি শাখায় বিভক্ত হয়। এগুলির মধ্যে দক্ষিণের শাখাটির নাম ব্রাজিল স্রোত।

অবস্থান: কানাডার পূর্ব উপকূলের অদূরে নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপ অবস্থিত। এই দ্বীপটির কাছে আটলান্টিকের অগভীর অংশে অনেকগুলি মগ্নচড়া সৃষ্টি হয়েছে। এগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হল গ্র্যান্ড ব্যাংক।

সৃষ্টির কারণ: নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপটির পাশ দিয়ে প্রবাহিত দুটি বিপরীতধর্মী স্রোত অর্থাৎ দক্ষিণমুখী শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত এবং উত্তরমুখী উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের মিলনের ফলেই মগ্নচড়ার উৎপত্তি হয়েছে। সুমেরু মহাসাগরের ভাসমান হিমশৈলসমূহ শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের সঙ্গে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। নিউফাউন্ডল্যান্ডের অদূরে এগুলি যখন উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের সংস্পর্শে আসে, তখন গলে যায়। এর ফলে হিমশৈলের মধ্যে থাকা নুড়ি, কাদা, বালি, পাথর প্রভৃতি সমুদ্রবক্ষে জমা হতে থাকে। যুগ যুগ ধরে এইভাবে জমা হওয়ার ফলে এখানকার সমুদ্রবক্ষে মগ্নচড়ার সৃষ্টি হয়েছে।

অবস্থান: কানাডার পূর্ব উপকূলের অদূরে নিউফাউন্ডল্যান্ডদ্বীপ অবস্থিত। এই দ্বীপটির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে দুটি বিপরীতধর্মী স্রোত শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত ও উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত। এই দুই স্রোতের মিলনের ফলে নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে আটলান্টিক মহাসাগরের অগভীর অংশে সৃষ্টি হয়েছে গ্র্যান্ড ব্যাংক নামে একটি বিশাল মগ্নচড়া, যা মৎস্যচাষের জন্য বিখ্যাত। এই মগ্নচড়া মৎস্যক্ষেত্র হিসেবে বিখ্যাত হওয়ার কারণগুলি হল–[1] গ্র্যান্ড ব্যাংক মগ্ন চড়াটির আয়তন প্রায় 96000 বর্গকিমি এবং এখানে জলের গভীরতা 90 মিটারের কম। [2] নাতিশীতোয়মণ্ডলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে সারাবছর মাছের বসবাসের উপযোগী অনুকূল তাপমাত্রা পাওয়া যায়। [3] উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলনের ফলে এখানে মাছের খাদ্য প্ল্যাঙ্কটনও প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। [4] এজন্য গ্র্যান্ড ব্যাংককে কেন্দ্র করে নিউফাউন্ডল্যান্ডের উপকুলে বিভিন্ন প্রকার সামুদ্রিক মাছ (যেমন—কড, হেরিং, ম্যাকারেল, হ্যাডক, হ্যালিবাট প্রভৃতি) ভিড় করে। এর ফলে সমগ্র এলাকাটি মৎস্যক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

লন্ডনের অক্ষাংশ প্রায় 51°30'26" উত্তর এবং নিউইয়র্কের অক্ষাংশ প্রায় 40°30' উত্তর। স্বাভাবিকভাবেই লন্ডনের তুলনায় নিউইয়র্কের উষ্ণতা বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু নিউইয়র্কে লন্ডনের থেকে শীতের তীব্রতা বেশি। এর কারণ সমুদ্রস্রোত। নিউইয়র্কের পাশ দিয়ে সুমেরু থেকে শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত প্রবাহিত হয় বলে এই স্রোত নিউইয়র্কের পাশাপাশি অঞ্চলকে শীতার্ত করে তোলে। অন্যদিকে লন্ডনের পাশ দিয়ে উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক স্রোত প্রবাহিত হয় বলে লন্ডনের তাপমাত্রা বেশি হয়।

উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ: [1] উষ্ণ সমুদ্রস্রোত শীতল অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হলে সেখানকার তাপমাত্রা বেড়ে যায়। যেমন—উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলকে উষ্ণ রাখে। [2] শীতল সমুদ্রস্রোত উষ্ণ অঞ্চলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হলে সেখানকার তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়। যেমন— শীতল পেরু স্রোত পেরুর তাপমাত্রাকে খুব বাড়তে দেয় না।

বৃষ্টি, বন্যা, খরা: উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু বেশি জলীয় বাষ্প শোষণ করে বলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়ে। অন্যদিকে শীতল স্রোতযুক্ত অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হয়। এলনিনো এবং লা-নিনার প্রভাবে সন্নিহিত অংশে খরা ও বন্যা দেখা যায়।

কুয়াশা: শীতল এবং উষ্ণ স্রোত যেখানে মিলিত হয় সেখানে কুয়াশার, ঝড়-ঝঞ্ঝার সৃষ্টি হয়। যেমন—নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূল।

তুষারপাত: শীতল স্রোত শীতকালে বহু জায়গায় তুষারপাত ঘটায়।

সমুদ্রস্রোত পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটায়—

➀ পৃথিবীর তাপের সাম্য: উষ্ণ স্রোত মেরুর দিকে এবং মেরুর শীতল স্রোত নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রবাহিত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে তাপের আদান-প্রদান ঘটে।

➁ বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত: উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী অংশে বৃষ্টিপাত বাড়ে এবং শীতল স্রোত প্রবাহিত অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী অংশে তুষারপাত এবং বৃষ্টিহীনতা দেখা যায়।

➂ এলনিনো ও লা নিনা: এল নিনোর বছরগুলিতে দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, ইকুয়েডর উপকূলে উত্তর দিক থেকে উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত হয়। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এমনকী ভারতে খরা প্রবণতা বাড়ে। লা নিনার বছরে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবল বৃষ্টি, ভারতে স্বাভাবিক বর্ষা এবং পেরু ইকুয়েডরে অনাবৃষ্টি বা খরা দেখা যায়।

সমুদ্রস্রোতের প্রভাব: মানবজীবনের ওপর সমুদ্রস্রোতের নিম্নলিখিত প্রভাবগুলি লক্ষ করা যায়-

➀ বরফমুক্ত বন্দর: উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে সংশ্লিষ্ট উপকূলের বন্দরগুলি শীতকালেও বরফমুক্ত থাকে। যেমন—উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক স্রোতের প্রভাবে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের অধিকাংশ বন্দর বরফমুক্ত থাকায় সারাবছরই ব্যবহার করা যায়।

➁ নৌ-চলাচলের সুবিধা: উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের জন্য জাহাজ চলাচল সহজতর হয়। এর ফলে জ্বালানির সাশ্রয় হয়। আটলান্টিক মহাসাগরের অনুকূল উষ্ণ স্রোতকে অনুসরণ করে পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক জাহাজ যাতায়াত করে।

➂ জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ: কোনো অঞ্চলের পাশ দিয়ে উষ্ণ সমুদ্রস্রোত প্রবাহিত হলে জলবায়ু উষ্ণ হয়। আবার বিপরীতভাবে, শীতল স্রোত প্রবাহিত হলে জলবায়ুও শীতল হয়। যেমন— শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের প্রভাবে নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে বায়ুর উষ্ণতা কমে ও উষ্ণ কুরোশিয়ো স্রোতের প্রভাবে জাপানের পশ্চিম উপকূলে বায়ুর উষ্ণতা বাড়ে।

➃ বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত সৃষ্টি: উষ্ণ স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুতে জলীয়বাষ্প থাকে বলে ওই বায়ু স্থলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু শুষ্ক বলে বৃষ্টিপাত হয় না, তবে মাঝে মাঝে তুষারপাত হয়। আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে নামিবিয়া উপকূলে এই কারণে মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে।

➄ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া সৃষ্টি: সাধারণত যেসব অঞ্চলে উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলন ঘটে, সেখানে উষ্ণতার পার্থক্যের জন্য ঘন কুয়াশা এবং প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা হয়। ফলে জাহাজ বা বিমান চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি হয়। যেমন—নিউফাউন্ডল্যান্ড-সংলগ্ন সমুদ্র।

➅ মৎস্যক্ষেত্র সৃষ্টি: উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলনস্থলে মাছের খাদ্য প্ল্যাঙ্কটন প্রচুর পরিমাণে জন্মায়, এর ফলে মৎস্যক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। যেমন—নিউফাউন্ডল্যান্ড বা জাপানের উপকূল থেকে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়।

➆ মগ্নচড়ার সৃষ্টি: শীতল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা হিমশৈল উষ্ণ স্রোতের সংস্পর্শে এলে গলে যায়। ফলে হিমশৈলের মধ্যে থাকা পাথর, নুড়ি, বালি প্রভৃতি সমুদ্রবক্ষে দীর্ঘকাল ধরে, জমতে জমতে উঁচু হয়ে মগ্নচড়ার সৃষ্টি করে। যেমন—নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলের অদূরে গ্র্যান্ড ব্যাংক নামক মগ্নচড়ার সৃষ্টি হয়েছে।

➇ হিমশৈলজনিত বিপদ: শীতল সমুদ্রস্রোতের সঙ্গে যেসব বড়ো বড়ো হিমশৈল ভেসে আসে, সেগুলি জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। এই হিমশৈলের জন্যই বিখ্যাত জাহাজ টাইটানিক ডুবে গিয়ে প্রচুর প্রাণহানি ঘটেছিল।

সাগর-মহাসাগরের জল নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর এক জায়গায় স্ফীত হয় বা ফুলে ওঠে এবং অন্য জায়গায় অবনমিত হয় বা নেমে যায়। জলের এই ফুলে ওঠা বা স্ফীতিকে বলা হয় জোয়ার এবং নেমে যাওয়া বা অবনমনকে বলা হয় ভাটা। প্রধানত চন্দ্রের আকর্ষণ এবং কিছুটা সূর্যের আকর্ষণ ও পৃথিবীর আবর্তনজনিত কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে সাগর-মহাসাগরের জলরাশিতে এই জোয়ারভাটার সৃষ্টি হয়।

কারণ: বর্ষাকালে ভরা কোটালের দিন ভাগীরথী-হুগলি নদীর গতিপথের বিপরীত দিক থেকে ভীষণ গর্জন করে যে প্রবল বান ভাসে তাকে ষাঁড়াষাঁড়ির বান বলে।

নামকরণ: এই বান খুব উঁচু হয়, কখনো কখনো 6-8 মিটার পর্যন্ত এবং দুটি প্রাপ্ত বয়স্ক ষাঁড়ের মধ্যে লড়াইয়ের সময় যে ভীষণ গর্জন শোনা যায়, এই বান আসার সময় অনেকটা সেই রকম আওয়াজ পাওয়া যায় বলেই একে ষাঁড়াষাঁড়ির বান বলা হয়।

পৃথিবীর আবর্তনের সময় পৃথিবীপৃষ্ঠের যে অংশ চাঁদের সামনে আসে, তখন সেখানে চাঁদের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হয়। তাই পৃথিবীর জলরাশি সবচেয়ে বেশি ফুলে উঠে জোয়ারের সৃষ্টি করে। একে চান্দ্র জোয়ার বলে।

সূর্যের আকর্ষণে সমুদ্রে যে জলস্ফীতি ঘটে, তাকে সৌর জোয়ার বলে। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব বেশি হওয়ার জন্য পৃথিবীর ওপর সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের তুলনায় কম। তাই সৌর জোয়ারে প্রাবল্যও কম।

◉ মুখ্য জোয়ার: ভূপৃষ্ঠে জোয়ারভাটা সৃষ্টির কারণ হিসেবে চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ এবং পৃথিবীর আবর্তনজনিত কেন্দ্রাতিগ বলের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রধানত চাঁদের আকর্ষণেই পৃথিবীতে জোয়ারভাটা হয়। তাই আবর্তন করতে করতে পৃথিবীর যে জায়গা যখন চাঁদের সামনে আসে, সেই জায়গার জল চাঁদের আকর্ষণে খুব বেশি ফুলে ওঠে অর্থাৎ সেখানে তখন হয় জোয়ার। এইভাবে ভূপৃষ্ঠের কোনো জায়গায় চাঁদের সরাসরি আকর্ষণের ফলে যে জোয়ার হয়, তাকে মুখ্য জোয়ার বলা হয়।

◉ গৌণ জোয়ার: মুখ্য জোয়ারের সময় চাঁদের আকর্ষণস্থলের বিপরীত দিকে বা প্রতিপাদ স্থানে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কেন্দ্রাতিগ বল অনেক বশি প্রবল থাকে। ফলে ওই স্থানের জলরাশিও ফুলে ওঠে অর্থাৎ জোয়ারের সৃষ্টি হয়। একে বলা হয় গৌণ জোয়ার। অবশ্য অনেকে বলেন যে, গৌণ জোয়ার প্রকৃতপক্ষে, ভূপৃষ্ঠে চাঁদের আকর্ষণস্থলের বিপরীত প্রান্তে জলভাগ ও স্থলভাগের সরণের পার্থক্যের জন্য হয়।

◉ ভরা কোটাল: অমাবস্যা ও পূর্ণিমার দিনে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের মধ্যবিন্দু একই সরলরেখায় অবস্থান করে বলে চাঁদ ও সূর্য উভয়ের সম্মিলিত প্রভাবে পৃথিবীর মহাসাগরের জল অনেক বেশি ফুলে ওঠে। একে তেজ কোটাল বা ভরা কোটাল বলা হয়।

◉ মরা কোটাল: শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী/অষ্টমী তিথিতে চাঁদ ও সূর্য পরস্পর সমকোণে থেকে পৃথিবীকে আকর্ষণ করে অর্থাৎ চাঁদ ও সূর্য পরস্পর পরস্পরের আকর্ষণের বিরোধিতা করে। তাই এই দু-দিন মহাসাগরের জলস্ফীতি কিছুটা কম হয়। এই দু-দিনের জোয়ারকে বলা হয় মরা কোটাল।

পূর্ণিমা তিথিতে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে থাকে। এই অবস্থায় পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের ঠিক সামনে আসে সেখানে চাঁদের মুখ্য জোয়ার ও সূর্যের গৌণ জোয়ার হয়। একে পূর্ণিমা তিথির ভরা জোয়ার বলে। অন্যদিকে অমাবস্যা তিথিতে চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর একই দিকে ও একই সরলরেখায় অবস্থান করে। তাই চাঁদ ও সূর্যের মিলিত টানে পৃথিবীর জলরাশি বেশি আকর্ষিত হয়। তাই পূর্ণিমা অপেক্ষা অমাবস্যার জোয়ার বেশি প্রবল।

জোয়ারের সময় স্ফীত সমুদ্রের জল মোহানা দিয়ে প্রবল বেগে ফুলে ফেঁপে প্রায় 5-7 মিটার উঁচু হয়ে সশব্দে নদীতে প্রবেশ করে বলে, সেই ধ্বনি বা আওয়াজকে বলা হয় বান ডাকা। বর্ষাকালে গঙ্গানদীতে প্রায়ই বান ডাকার ঘটনা ঘটে।

এর কারণ – গঙ্গানদীর মোহানা ফানেল-আকৃতির (অর্থাৎ, নদী মোহানা বেশ প্রশস্ত কিন্তু নদীখাত অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ), নদীর মোহানায় অনেক চড়া আছে, বর্ষাকালে নদীতে প্রচুর জল থাকে এবং বঙ্গোপসাগরের জল গঙ্গানদীতে প্রবেশ করার সময় তা নদীর স্রোতে বাধা প্রাপ্ত হয়।

◉ জোয়ারভাটা সৃষ্টি: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় অন্তর সমুদ্রের জলস্তর কোথাও ফুলে ওঠে এবং কোথাও নেমে যায়। জলস্তরের এই ফুলে-ওঠা বা স্ফীতিকে জোয়ার এবং নেমে যাওয়াকে ভাটা বলা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রধানত দুটি কারণে জোয়ারভাটার সৃষ্টি হয়— পৃথিবীর আবর্তন গতিজনিত কেন্দ্রাতিগ বল এবং পৃথিবীর ওপর চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ বল।

➀ পৃথিবীর ওপর চাঁদ ও সুর্যের আকর্ষণ বল: নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুসারে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি বস্তুই একে অপরকে আকর্ষণ করে। সুতরাং গ্রহ, উপগ্রহ, সূর্য প্রভৃতি প্রতিটি জ্যোতিষ্কই পরস্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করে। এই হিসেবে চাঁদ ও সূর্য, পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। তবে সূর্যের তুলনায় পৃথিবীর ওপর চাঁদের আকর্ষণ বল বেশি হয়। কারণ যদিও চাঁদের তুলনায় সূর্য প্রায় ২ কোটি 60 লক্ষ গুণ বড়ো, কিন্তু পৃথিবী থেকে চাঁদ যত দূরে আছে, সূর্য রয়েছে তার থেকে প্রায় 380 গুণ বেশি দূরত্বে। এজন্য জোয়ারভাটা সৃষ্টির ক্ষেত্রে চাঁদের আকর্ষণ সূর্যের আকর্ষণের প্রায় দ্বিগুণ। তাই প্রধানত চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর জলরাশি ফুলে ওঠে অর্থাৎ জোয়ার হয়। সূর্যের আকর্ষণে পৃথিবীতে জোয়ার হলেও তা অতটা প্রবল আকার ধারণ করে না। তবে পৃথিবী, চন্দ্র ও সূর্য একই সরলরেখায় অবস্থান করলে জোয়ারের তীব্রতা বেশি হয়।

ভূপৃষ্ঠের যে স্থানে চাঁদের আকর্ষণে জোয়ার সৃষ্টি হয়, ঠিক তার বিপরীত দিকের স্থানটিতে অর্থাৎ প্রতিপাদ স্থানেও পৃথিবীর আবর্তনজনিত কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে জোয়ার হয়। আর, যে দুটি স্থানে জোয়ার হয়, ঠিক তার সমকোণে অবস্থিত স্থান দুটির জলরাশি সরে যায় বলে সেখানে তখন ভাটা হয়।

➁ পৃথিবীর আবর্তন গতিজনিত কেন্দ্রাতিগ বল: পৃথিবী নিজের মেরুরেখার চারদিকে অনবরত আবর্তন করে। চলেছে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠে একটি বিকর্ষণ শক্তি বা কেন্দ্রাতিগ বলের সৃষ্টি হয় এবং তার প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের জলরাশি বাইরের দিকে বিক্ষিপ্ত হওয়ার প্রবণতা লাভ করে। একেই কেন্দ্রাতিগ বল বলে। এই বল পৃথিবীর মহাকর্ষ শক্তির বিপরীতে কাজ করে। এইভাবে পৃথিবীর আবর্তন গতি সমুদ্রে জোয়ার সৃষ্টিতে সাহায্য করে।