তৃতীয় পাঠ

"পথচলতি" রচনায় প্রথমেই কাবুলিওয়ালাদের উগ্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। তারা ট্রেনের একটি কামরায় কাবুলিওয়ালা ছাড়া অন্য কোনো যাত্রীকে উঠতে দেয় না। কিন্তু লেখক ঠিকই অনুমান করেছেন যে জবরদস্ত ও মারমুখী হলেও পাঠানদের মধ্যে একটু শিশুসুলভ ভাব থাকে। পরে এই কথাটিই সত্য হয়। তারা লেখককে মর্যাদা দিয়ে তাদের সঙ্গী করে নেয়। তাছাড়া কাবুলিরা সংগীতপ্রিয়, বন্ধুবৎসল ও ধর্মনিষ্ঠ হয়।

প্রশ্নে দেওয়া অংশটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা 'পথচলতি গদ্য থেকে নেওয়া হয়েছে।

লেখক গয়ায় অবস্থিত শ্বশুরালয় থেকে ফেরার জন্য দেরাদুন এক্সপ্রেসে উঠতে চেয়েছিলেন। স্টেশনে পৌঁছে দেখেন বড়ো একটা বগিতে কয়েকজন মাত্র পাঠান রয়েছে। অন্য কামরাগুলিতে ছিল ভীষণ ভিড়। ফারসিতে কথা বলতে পারতেন—এই সাহসে ভর করে প্রায় জোর করেই তিনি পাঠানদের কামরায় ওঠেন। ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে গান-আড্ডা-কাহিনির মধ্য দিয়ে লেখকের আলাপ জমে ওঠে। এই অভিনব ট্রেনযাত্রার ব্যাপারটি তাই লেখকের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।

লেখকের দেহরাদুন এক্সপ্রেসে কলকাতা ফেরার সময় ওপরের বাংকে বসে থাকা পাঠানটি খুশ হাল খাঁ সাহেবের গজল গেয়েছিল। ভাবের বাড়াবাড়ির সঙ্গে কখনও কানে হাত দিয়ে, কখনও বুকে হাত দিয়ে সে গান গেয়েছিল। তারপর “ঢাকের বাদ্যি থামলেই যেমন মিষ্টি লাগে”, তেমন করেই তাঁর গান থেমেছিল।

পথচলতি রচনার এই অংশে বরা একজন পাঠান, যে কামরার উপরের বাংকে বসেছিল। আর বাবুটি হলেন লেখক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।

বক্তা লেখকের অনুরোধে পশতু ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি খুশ হাল খাঁ খট্টকের গজল শুনিয়েছিল। সে গান ছিল ভাবের বাড়াবাড়িতে ভরা। সেই গান থামলে "ঢাকের বাদ্যি থামলেই যেমন মিষ্টি লাগে তেমনই মিষ্টি লেগেছিল লেখকের।

গুরুবল হল গুরুর দয়া অথবা ঈশ্বরের আশীর্বাদ।

"পমচলতি" রচনার লেখক চেনযাত্রায় পাঠানদের সাথে কাে থেকে রক্ষা পেছেন। তিনি ফারসি ভাষায় কথা বলে কাবুলিওয়ালা জায়গা পেয়েছিলেন। কালিরা সবাই ছিল ইংরেজোর দখল ক উপজাতি অঞ্চলের লোক। খাস কাবুলিদের মতন তারা ফারসি ভাষা জানত না। তাই লেখকের কথাবার্তা সহজ হয়েছিল, কারণ তিনি খুব বেশি ফারসি জানতেন না। ওদের সঙ্গে তিনি ট্রেন যাত্রার সময় হিন্দুস্তানি আর বাংলা ভাষায় কথা বলেছিলেন, যেটা তাঁর পক্ষে সুবিধার ছিল।

আলোচা কথাটির বক্তা "পথচলতি' রচনার লেখক সুনীতিকু চট্টোপাধ্যায়। এই কথাটির মাধ্যমে লেখকের হাস্যরস সৃষ্টির মনোভাব ফুি ওঠে। ট্রেনে জায়গা পাওয়া অসম্ভব ছিল বলে তিনি কাবুলিওয়ালাদের প্রত বণিতে উঠতে বাধ্য হন। তাদের গায়ে ছিল কয়েক দিনের না কাচা বাসি কাপড়চোপড়। সাধারণত কাবুলিওয়ালারা সমস্ত শরীর ঢাকা জামাকা পরে। তাই তাদের শরীরের ঘাম জামাকাপড়ে লেগে গন্ধ হয়ে যায়। তার সঙ্গে ব্যবসার কারণে কাবুলিদের ঝোলায় রাখা হিং-এর উগ্র গন্ধ মিলেমিশে প্রশ্ন লেখকের নাকে প্রবল আক্রমণ করে। এখানে 'আক্রমণ' শব্দটির মাধ্যমে লেখকের কষ্টকে বোঝানো হয়েছে।

কবি তারাপদ রায় একটি চড়ুই পাখি কবিতায় তাঁর ঘরে বাসা বেঁধেছে এমন একটি চড়ুইপাখির কথা বর্ণনা করেছেন।

কবি মনে করেন, তাঁর এই নিরুপদ্রব, শান্ত, আয়োজনহীন, আড়ম্বরশূন্য গৃহস্থালির রূপ দেখে চড়ুইপাখিটি হয়তো ভাবে, কবি যখন এই গৃহে আর থাকবেন না তখন এই ঘর, জানালা-দরজা, টেবিলে রাখা ফুলদানি, বই-খাতা প্রভৃতি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা বিধাতা তাকেই দান করবেন। চতুর চড়ুইপাখিটি যেভাবে কবির নির্জন বাসস্থানে নিজের আশ্রয়টি সুনিশ্চিত করেছে এবং নিশ্চিন্তমনে যেভাবে ঘরের ভিতরে বিচরণ করছে, তাতে তার মনে এমন ভাবনার উদয় হওয়া নেহাত অসম্ভব নয়।

কবি তারাপদ রায়ের লেখা 'একটি চড়ুই পাখি' কবিতা থেকে আলোচ্য উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে।

কবির ঘরে বাসা বাঁধা একটি ছোট্ট চড়ুইপাখি তার চঞ্চল চলাফেরায়, বিচিত্র শব্দে, শরীরের নানান ভঙ্গিতে কবি-হৃদয়কে অধিকার করে তার শূন্য মরকে ভরিয়ে তুলেছে। কবির ঘরের শান্ত, নিরুপদ্রব পরিবেশটিতে চড়ুই তার নিশ্চিন্ত আশ্রয় গড়ে তুলেছে। কিন্তু নিতান্ত কৌতুকপ্রবণ হয়েই সে যেন ঘরের কার্নিশে বসে তাচ্ছিল্যভরা মজার চাহনিতে কবির দিকে তাকায়। কবির মনে হয় সে যেন তাঁকে বোঝাতে চায় যে নিতান্ত মায়ার শরীর বলেই সে কবির বাড়িতে রয়েছে। মায়া-মমতা আছে বলেই পাখিটি এপাড়ায় ওপাড়ায় পালেদের, বোসেদের বাড়িতে চলে না গিয়ে একাকী কবির সঙ্গী হয়ে সেই বাজে ঘরটিতে বসবাস করছে।

কবি তারাপদ রায়ের লেখা ‘একটি চড়ুই পাখি' কবিতা থেকে প্রশ্নে উদ্ধৃত আলোচ্য পরিষ্টিতে কবির প্রতি তাঁর ঘরে বাসা বাধা অতিক্ষুদ্র একটি চড়ুইপাখির অপূর্ব সমানুভূতির প্রতিফলন ঘটেছে।

ছোট্ট চড়ুইপাখিটি তার চলা-ফেরায় স্বাধীন। সে যে-কোনো জায়গাতেই উড়ে চলে যেতে পারে, অন্য কোথাও গড়ে তুলতে পারে তার আশ্রয়। তবুও যে সে কবির শ্রীহীন ঘরটিতে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে, নিশ্চিন্তে, আলাপে -কৌতুকে প্রসন্নতায় বিরাজ করে, তাকে কবি তাঁর প্রতি পাখিটির 'দয়া' হিসেবেই দেখেছেন। এই পাখিটি কবির ঘরে থাকায় একাকিত্বের মধ্যেও কবি তার এক সঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর সব চিন্তাভাবনা আর কাজের মধ্যে সেই পাখিটির উপস্থিতি ছাপ ফেলে। কবির আশঙ্কা, ইচ্ছের ঝোঁকে পাখিটি এপাড়ার ওপাড়ার পালেদের, বোসেদের বাড়ি চলে গেলে কবি তাঁর এই হৃদয়ের সঙ্গীটিকে হারাবেন এবং নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বেন। চড়ুইপাখিটি ক্ষুদ্র হলেও কবিতায় তার প্রতি কবির মনোভাব, তাঁর সঙ্গী পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং একাকিত্ব দূর করার অনুভূতিকেই প্রকাশ করেছে।

একটি চড়ুই পাখি' ছাড়া কবিতাটির যে নামকরণটি আমি করতে চাই, তা হল 'আমি, আমার ঘর ও একটি চড়ুই'।কবিতাটির এমন নাম আমি দিতে চাই, কারণ 'একটি চড়ুই পাখি' শীর্ষক নামকরণটিতে কবির উপস্থিতি অপ্রধান নয়। কবির ঘরে বাসা বেঁধেছে যে নির্দিষ্ট পাখিটি, তাকে নিয়েই কবিতাটি রচিত। তাই স্থানের গুরুত্ব কবিতাটির নামকরণের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। কবির ঘরের ভূমিকা এক্ষেত্রে কম নয়, কেননা তাঁর ঘরেরই নির্জনতা ও নিরাপত্তা চড়ুইপাখিটিকে নির্ভয়ে আর স্বচ্ছন্দে বিচরণের সুযোগ করে দিয়েছে। অতএব, নামকরণের ক্ষেত্রে কবি তাঁর ঘর এবং সেই চড়ুইপাখি—এই তিনেরই উল্লেখ থাকা প্রয়োজন বলে আমি এই নামকরণ করতে চাই।

কবি তারাপদ রায় রচিত 'একটি চড়ুই পাখি' কবিতায় কবি তাঁরই ঘরে বাসা-বাঁধা একটি চড়ুইপাখির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। এই ছোটো পাখিটির কথা কবির বর্ণনাশৈলীর গুণে অনবদ্য হয়ে উঠেছে।

কবিতায় বা গদ্যে শব্দের মাধ্যমে ছবি ফুটিয়ে তোলাকেই বলা হয় চিত্রকল্প বা 'imag'।আলোচ্য কবিতায় “অন্ধকার ঠোঁটে নিয়ে সন্ধ্যা ফেরে যেই সে'ও ফেরে”—পক্তিটিতে নিঃশব্দে সংখ্যা নেমে আসার মুহূর্তের চিত্রের মাধ্যমে চড়ুইপাখিটির নিঃশব্দে বাসায় ফিরে আসার ঘটনাটিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘ছড়ায় শব্দের টুকরো" বলতে ছোট্ট পাখিটির থেমে থেমে ডেকে চলাকে বোঝানো হয়েছে। এ ছাড়াও পাখিটির "কৌতূহলী দুই চোখ মেলে অবাক দৃষ্টিতে" চেয়ে থাকায়, “আবার কার্নিশে বসে চাহনিতে” মজার তাচ্ছিল্যের ভাব জাগিয়ে তোলার বর্ণনাতেও সেই চিত্রকল্পেরই বর্ণময় ব্যবহার লক্ষ করা যায়। 'রাত্রির নির্জন ঘরে' বলতে কবির নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বকে বোঝানো হয়েছে। কবিতায় কখনও পাখিটির বর্ণনায়, কখনও বা তার ফিরে আসার সময়ের সন্ধানে, আবার কখনও তার বিচিত্র, কুশলী ভাবনাচিন্তা বা মানসিক অবস্থানের ভাষাচিত্র রচনায় কবি চিত্রকল্পের প্রয়োগকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছেন।

উপরের অংশটি একালের বিশিষ্ট কবি তারাপদ রায়ের লেখা 'একটি চড়ুই পাখি' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

এখানে কবির ঘরে বাসা বাঁধা চড়ুইপাখিটিকে 'চতুর' বলা হয়েছে। 'চতুর' শব্দের অর্থ হল ‘চালাক', 'কুশল' বা 'কর্মদক্ষ'। চড়ুইটি একাকী কবির নির্জন ঘরটিকে শুধু যে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে তা নয়, কবির ধারণায় অতি কুশলতার সঙ্গে সে কবির অনুপস্থিতিতে ওই ঘরের মালিকানাও ভোগ করতে চায়। এ কারণেই কবি তাকে 'চতুর' আখ্যা দিয়েছেন।

‘একটি চড়ুই পাখি কবিতার এই অংশটি প্রকৃতির একটি বিশেষ সময়কে তুলে ধরেছে। সূর্য ওঠার মতোই অস্ত যাওয়াও প্রতিদিনের একটা চেনা ঘটনা। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু করে অন্ধকার নেমে আসে। কবি এই চেনা দৃশ্যটিকেই তাঁর কবিতায় রূপ দিয়েছেন। বলেছেন যে, অন্ধকারকে সঙ্গী করে প্রতিদিনের মতোই সন্ধ্যা নেমে আসে। চড়ুই পাখিটিও একইভাবে সন্ধ্যা নামলেই কবির ঘরে ফিরে আসে। রাখা সংখ্যা নেমে আসার মধ্য দিয়ে তাই চড়ুইপাখিটির ঘরে ফেরা অনুভব করতে পারেন কবি।

কবি তারাপদ রায়ের ভাবনায় তিনি একাকী চুপচাপ বসে থাকেন বলেই তাঁর নিঃসঙ্গতা দূর করতে পাখি দয়া করে তাঁর বাজে ঘরে আছে। সে অন্য কোথাও চলে যায় না। কবি সারাদিন ঘরে একা থাকেন, পাখি দিনের শেষে খড়কুটো, ধান নিয়ে ঘরে আসে। নিজের জিনিস গুছিয়ে কিচিরমিচির শব্দ করে, নির্জনতা ভেঙে যেন নির্জন ঘরে সুরের ছোঁয়া আনে। কবির মতে তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের কথা ভেবেই পাখিটি যেন কবিকে একা ফেলে চলে যায় না।

এখানে কবি তারাপদ রায়ের ‘একটি চড়ুই পাখি' কবিতায় উল্লিখিত চড়ুইপাখিটির চাহনির কথা বলা হয়েছে ।

পাখিটার তাচ্ছিল্য প্রকাশের কারণ হল সে যেন মনে করে তার নিতান্ত মায়ার শরীর বলেই সে কবির ওই বাজে ঘরে' রয়ে গেছে। ইচ্ছে হলেই সে এপাড়া ওপাড়ায় পাল অথবা বোসেদের বাড়িতে উড়ে যেতে পারে।