তৃতীয় পাঠ

উঃ-‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক শ্রদ্ধেয় রামানন্দ  চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে  রামকিঙ্করের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যোগাযোগ হয়।

উঃ-আচার্য নন্দলাল বসু কারও কাজে কখনও ইমপোজ করতেন না। অর্থাৎ নিজের মতামত অন্যের উপর চাপিয়ে না দিয়ে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেন।

উঃ-সাধারণ চরিত্র, কমন ল্যান্ডস্কেপ, একেবারে গ্রামের কমপ্লিট ক্যারেকটার নিয়ে যে-সমস্ত ছবিতে সাধারণ বাস্তবতার পরিচয় মেলে, নন্দলাল বসুর কাজের সেই দিকটা শিল্পী রামকিঙ্করকে বেশি প্রভাবিত করেছিল।

উঃ-শৈশব থেকে শিল্পী রামকিঙ্করের ছবি আঁকার প্রতি একটা বিশেষ আগ্রহ ছিল। বাড়িঘরের চারদিকের দেয়ালে নানান দেবদেবীর ছবি টাঙানো থাকত, সেগুলি দেখে তিনি খুব আনন্দ পেতেন এবং সেগুলি দেখে দেখে আঁকতে চেষ্টা করতেন। এভাবেই ভিসুয়াল আর্টের সঙ্গে বা ছবির সঙ্গে চিত্রশিল্পী রামকিঙ্করের প্রথম বর্ণপরিচয় হয়েছিল।

উঃ-‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় লেখক রামকিঙ্কর বেইজকে জেনারেল লাইব্রেরির উপরতলায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় কলাভবনে নিয়ে গিয়ে আচার্য নন্দলাল বসুর সঙ্গে রামকিঙ্কর বেইজের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

উঃ-উদ্ধৃত উক্তিটি লেখক রামকিঙ্কর বেইজ  নিজে করেছিলেন।

‘গার্ল অ্যান্ড দ্য ডগ’ একটি চিত্রের নাম।

লেখক রামকিঙ্কর যখন শান্তিনিকেতনে আসেন তখন এখানকার কোনো শিল্পী অয়েল পেন্টিং-এর কাজ করতেন না। লেখক দোকানদারের কাছ থেকে টিউবে থাকা রং নিয়ে তেলের সঙ্গে মিশিয়ে তুলি ডুবিয়ে কী করে কাজ করতে হয়, তা শিখেছিলেন।

উঃ-লেখক রামকিঙ্কর বেইজকে সাদামাটা সুর টানে।

নন্দলাল বসুর আঁকা ছবির মধ্যে একটা অতি সাধারণ গ্রামীণ সুর খুঁজে পাওয়া যেত। তাঁর সব আঁকাই সাধারণ চরিত্র, কমন ল্যান্ডস্কেপ, একেবারে গ্রামের কমপ্লিট ক্যারেকটার নিয়ে সৃষ্ট। একেই লেখক সাদামাটা সুর বলেছেন।

শান্তিনিকেতনে পৌঁছে আচার্য নন্দলাল বসুর কাছে আচরণে মুগ্ধ হন লেখক রামকিঙ্কর। তাঁর প্রতি ছিল লেখকের অসীম শ্রদ্ধা। এত বড়ো শিল্পীর সান্নিধ্যলাভ তাঁর অতিরিক্ত পাওনা এবং সৌভাগ্য বলে তিনি মনে করতেন। নন্দলাল বসুর সব ছবির বিষয় ছিল অতি সাধারণ। এই সাদামাটা সুরটাই লেখককে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত।

উঃ-ছেলেবেলা থেকেই মূর্তি গড়ার প্রতি রামকিঙ্করের বেশ টান ছিল। এব্যাপারে তাঁর উৎসাহ জেগেছিল বাড়ির পাশের কুমোরপাড়া থেকে। এপ্রসঙ্গে নিজের মূর্তিগড়ার যে মজার কথা তিনি জানিয়েছেন, তা হল—তাঁদের বাড়ির সামনের রাস্তা লাল-মোরামে ঢাকা থাকত। একদিন তিনি দেখলেন, হঠাৎ বৃষ্টির পরে উপরের মোরাম ধুয়ে রাস্তায় নীলরঙের মাটি বেরিয়ে এসেছে। সেই মাটি খাবলে তুলে তিনি নানারকম পুতুল তৈরি করেছিলেন

উঃ-জাতির জনক মহাত্মা গান্ধির ডাকে সেকালে যে অসহযোগ আন্দোলন হয়েছিল, তাই ‘নন্-কোঅপারেশন আন্দোলন।' পাঠ্য ‘আত্মকথা’ রচনায় তারই একটু ছবি এঁকেছেন লেখক—“স্কুল-কলেজ বন্ধ। ন্যাশনাল স্কুলে ভর্তি হলাম আর কংগ্রেসের কাজে যোগ দিলাম।” লেখকের উপর ভার ছিল, মহাপুরুষদের বাণী থেকে উদ্ধৃতি লিখে ঝুলিয়ে দেওয়ার। তা ছাড়া প্রসেশনের সময় তাঁকে তেলরঙে লিডারদের পোর্ট্রেট এঁকে দিতে হত।

উঃ-ন্যাশনাল স্কুলে ভরতির পর রামকিঙ্করের উপর ভার ছিল মহাপুরুষে বাণী থেকে উদ্ধৃতি লিখে ঝুলিয়ে দেওয়া আর প্রসেশনের সময় লিডারদের পোর্ট্রেট এঁকে অয়েল-পেন্ট করা।

উঃ-চিত্রশিল্পেরও কিছু নিজস্ব ধারণা থাকে। এক্ষেত্রে তেমন ধারণাটি হল—বাস্তবতার ভিতর দিয়ে না গেলে চিত্ররচনা সার্থক হয় না।

এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে প্রাকৃতিক-বাস্তবতার সূচনা হয় যা এখনও চলছে। এরই ফলশ্রুতিতে “ছাত্রদের অ্যানাটমি ও মাস্ল সম্বন্ধেও শিক্ষা দেওয়া হয়।”

উঃ-প্রখ্যাত চিত্রকর ও ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ  শান্তিনিকেতনের শিক্ষণরীতিতে প্রথম অয়েল-পেন্টিং বা তেলরঙে কাজ করা শুরু করেন।

যেহেতু তখনও শান্তিনিকেতনের কলবিভাগে অয়েল-পেন্টিং চিত্রমাধ্যমটির সূচনাই হয়নি, তাই রামকিঙ্করের এব্যাপারে চরম কৌতূহল ছিল। তাই তিনি চিত্রসামগ্রীর দোকানে গিয়ে বলেন—“অয়েল-পেন্টিং করব, কী রং আছে? কীভাবে করতে হয়। দেখান?” তারা অয়েল-পেন্টিং-এর সরল পদ্ধতি তাকে বলে দেন। এরপর তিনি ‘গার্ল অ্যান্ড দ্য ডগ’ নামের একটা ভালো তেলরঙের কাজ করেন।

উঃ-বিখ্যাত শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু শিল্পী রামকিঙ্করকে এ কথা বলেছেন।

এ কথা বলার পর একটু ভেবে বলেছিলেন ‘আচ্ছা দু-তিন বছর থাকো তো।'

উঃ-প্রায়শই দেখা গেছে, ভবিষ্যতে যাঁরা কোনো বিষয়ে মহৎ ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে ওঠেন, তাঁদের শৈশবেই সেই বিষয়ে একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ দেখা দেয়। রামকিঙ্কর এক অপরিমেয় শিল্পপ্রতিভার অধিকারী হয়েছিলেন। তার সূচনার একটা মুকুলও তাঁর শৈশবে বিকশিত হতে দেখা যায়। তাঁর বাড়িঘরের চারদিকের দেয়ালে নানা দেবদেবীর ছবি দেখে শৈশবে তাঁর ভালো লাগত। তিনি সেগুলি কপি করে সেই বয়সেই ‘ভিসুয়াল আর্ট’-এ নিজের বর্ণপরিচয় ঘটিয়ে ফেলেন। মূর্তিগড়ার ক্ষেত্রেও সূচনাপর্বটি ছিল মজার। বাড়ির সামনের লাল-মোরামে ঢাকা রাস্তা একদিন হঠাৎ-বৃষ্টিতে ধুয়ে গেলে তিনি দেখেন নীলরঙের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। সেখান থেকে এক খাবলা মাটি তুলে, তা দিয়ে তিনি নানারকম পুতুল তৈরি করেন। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন—‘আমার প্রথম শিল্পের-ইস্কুল বাড়ির পাশের কুমোর পাড়া' সেখানেই ছেলেবেলায় অনেকক্ষণ ধরে কুমোরদের মূর্তিগড়া ও অন্যান্য কাজ দেখতেন তিনি আর ‘সুযোগ পেলেই মাটিতে হাত লাগিয়ে ছানাছানি’ করতেন। এভাবেই তাঁর মনে শৈশবেই একটা শিল্প প্রভাব গড়ে উঠেছিল।

উঃ-একজন চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর হিসেবে বিস্ময়কর প্রতিভা ছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ। জীবনের একটা বিশেষ বয়সে এসে শান্তিনিকেতনের পরিবেশ ও শিল্প তাঁর উপর যে অসাধারণ প্রভাব ফেলেছিল, তা তাঁর ছেলেবেলায় ছিল না। কিন্তু ‘আত্মকথা’ রচনায় ছেলেবেলা সম্পর্কে কিছু বলতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, পারিপার্শ্বের নানা উপকরণ থেকে তিনি সংগ্রহ করে নিতেন তাঁর শিল্পবোধের উপকরণ। এর মধ্যে একটি বিশেষ দিক হল—রং। দেয়ালে টাঙানো দেবদেবীর ছবি এঁকে দিত ছবির বিষয়, নরম মাটি দিত তাঁকে মূর্তি গড়ার প্রেরণা। একইভাবে তিনি রঙের উৎসও খুঁজে নিয়েছিলেন নিজস্ব ভাবনায়। গাছের পাতার রস,  বাটনা-বাটা শিলের হলুদ, মেয়েদের পায়ের আলতা, মুড়ি-ভাজা খোলার চাঁদা ভুষোকালি—এগুলি তাঁর রঙের প্রয়োজন মেটাত। একইভাবে তুলি গড়ার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্ভাবনা ছিল অভিনব। পাড়ার প্রতিমা-প্রস্তুতকারক মিস্ত্রিদের দেখে ছাগলের ঘাড়ের লোম কেটে নিয়ে, তা বাঁশের কাঠির ডগায় বেঁধে নিয়ে তা দিয়ে তিনি তুলির কাজ চালতেন।

উঃ-লেখক রামকিঙ্কর বেইজ বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত এক গ্রামের মানুষ ছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতে পারতেন। কুমোরপাড়ায় বাড়ির সুবাদে মাটি দিয়ে নানান মূর্তিও তৈরি করতে শিখেছিলেন। ঘরের দেয়ালে টাঙানো দেবদেবীর ছবি দেখে তিনি ছবি আঁকা অভ্যাস করতেন। লেখকের পারিবারিক অবস্থা ভালো ছিল না। কিন্তু আঁকার দক্ষতার জন্য বিদ্যালয়ে অবৈতনিক বা বিনা বেতনের ছাত্র হিসেবে তিনি পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। পড়াশোনার থেকে আঁকার দিকে তাঁর আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। ভালো মাটি দেখতে পেলে তা নিয়ে তিনি পুতুল তৈরি করতেন। সুযোগ পেলে মাটিতে হাত লাগিয়ে ছানাছানি করতেন। মূর্তি তৈরি করে অতি অল্প বয়সেই তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। শৈশবকাল থেকে তাঁর আঁকা এবং মূর্তি গড়াকে কেন্দ্র করে পরবর্তী জীবনে বহু জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির সান্নিধ্যলাভ করেছিলেন।

উঃ-‘তাঁরই’ বলতে ‘প্রবাসী’ পত্রিকার পরম শ্রদ্ধেয় সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলা হয়েছে।

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় বাঁকুড়ায় গিয়েছিলেন এবং রামকিঙ্করের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তাঁরই সৌজন্যে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা না দিয়েই রামকিঙ্কর চলে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ে। প্রথমেই জেনারেল লাইব্রেরির উপরতলার কলাভবনে পরিচয় হল স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী আচার্য নন্দলাল বসুর সঙ্গে। তিনি তাঁর কয়েকটি আঁকা ছবি দেখে বলেছিলেন “তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?" একটু ভেবে তিনি বলেছিলেন, “আচ্ছা, দু-তিন বছর থাকো তো।" এই কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি প্রাকৃতিক বাস্তবতাকে খুঁজে পেয়েছিলেন নন্দলাল বসুর সান্নিধ্যে থেকে। ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রবর্তক নন্দলালবাবুর পরোক্ষ প্রভাবে তিনি ছবির মধ্যে অতি সাধারণ ব্যাপারটাকে আরও বেশি প্রাণবন্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সত্যিকারের একজন শিল্পীর কাছে শিক্ষালাভ করায় তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করতেন।

উঃ-রামকিঙ্কর বেইজ প্রখ্যাত ভাস্কর এবং চিত্রশিল্পী ছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকায় পারদর্শী ছিলেন। কুমোরপাড়ার শিল্পীদের দেখে নানা দেবদেবীর ছবি। আঁকতেন। ম্যাট্রিক পাস করার পর ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে শিল্পী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। এখানকার প্রখ্যাত শিল্পগুরু নন্দলাল বসুর কাছে শিল্পশিক্ষার সৌভাগ্য ঘটে। তাঁর আঁকা ছবি দেখে নন্দলাল বসু বলেছিলেন, “তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?” অতঃপর দু-তিন বছর থাকার কথা বলেন। সেই দু-তিন বছর আর শেষ হয়নি; আজীবন শিল্পশিক্ষা চর্চা করেছিলেন তিনি। প্রথম প্রথম অয়েল-পেন্টিং-এ ছবি আঁকলেও পরবর্তীকালে ওরিয়েন্টাল আর্টের শিক্ষাগ্রহণ করেন। নন্দলাল বসুর শিল্পের সাদামাটা সুরটা শিল্পী রামকিঙ্করকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। তাই তাঁর ছবি বা মূর্তির অধিকাংশ ক্যারেকটারই যে খুব সাধারণ, তা অনেকটা নন্দলালবাবুর পরোক্ষ প্রভাবে। এতেই রামকিঙ্করের শিল্পচর্চার সার্থকতা।

উঃ-কবি যখন দিনেরবেলায় ছবি আঁকেন তখন তিনটি শালিক ঝগড়া থামায়, অবাক হয়ে তা চড়ুই পাখি লক্ষ করে। মাছরাঙা মৎস্যশিকার ভুলে তার আঁকায় নীল রং ধার দিয়ে সাহায্য করতে চায়, প্রজাপতিরা ছবিতে তাদের রেখে ছবি রঙিন করে তোলার অনুরোধ জানায়। কোনো এক ইঁদুর গর্ত থেকে বেরিয়ে চোখ পিটপিট করে সব কিছুর উপর দৃষ্টি রাখে আর রংতুলিরা আনন্দ সহকারে তাদের কাজে মেতে ওঠে।

উঃ-কবি যখন ছড়া লিখতে শুরু করেন তখন চাঁদের আলো পুরু হয়ে মাঠে জমে ওঠে দুধের সরের মতো আর বাতাস ঈষৎ কাঁপতে থাকে।

উঃ-পাঠ্য কবিতাটিতে কবি তিনটি শালিকের ঝগড়া থামানোর কথা বলেছেন। এমন তিনটি শালিকের প্রসঙ্গ অন্যভাবে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায়। তিনি তাঁর 'সহজপাঠ' শিশুশিক্ষা বিষয়ক বইয়ের ২-য় ভাগের নবম পাঠে লিখেছেন—“তিনটি শালিক ঝগড়া করে/রান্নাঘরের চালে।”

উঃ-মাছরাঙা অত্যন্ত রঙিন পাখি। লাল-নীল-হলুদ রঙে পূর্ণ তার দেহ, তবে নীল রঙের প্রাচুর্যই অধিক।

সে কবির ছবিকে পূর্ণতা দিতে এবং রঙিন করতে তার নীল রং ধার দিতে গিয়ে মৎস্যশিকারে উদাসীন হয়ে পড়ে।

উঃ-রং-তুলিরা বেজায় খুশি তার কারণ সকালবেলায় প্রকৃতির মনোহর রুপে তারা আবিষ্ট হয়ে মনের আনন্দে রঙিন চিত্র অঙ্কনে মত্ত হয়ে ওঠে। প্রকৃতির মধ্যে তারা যেন ছবির সমস্ত রসদ খুঁজে পায়। প্রকৃতি মা যেন রঙের সম্ভার নিয়ে হাজির হন।

উঃ-জোনাকিরা বকুল গাছে তাদের আলো দিয়ে ‘অ’ ‘আ’ লিখছে।

তাদের দেখে মনে হয় রাত্রিকালীন মধুর পরিবেশে তারাও মগ্ন, তাই পরিবেশকে আলোকময় করতে তারাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

উঃ-ছড়াকার মৃদুল দাশগুপ্ত তাঁর ‘আঁকা, লেখা’ কবিতার এই উদ্ধৃতাংশের কথাগুলি তাঁর প্রিয় পাঠক তথা শিশু-কিশোরদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন।

কবি আঁকেন ও লেখেন। তিনি যখন রং ছড়িয়ে খুশির খেয়ালে ছবি আঁকেন, তখন প্রকৃতির কত পরিবর্তন ধরা পড়ে। আর ধরা পড়ে কবির আনন্দ। কবির আনন্দের তখন শরিক হতে চায় প্রকৃতির আপনজনেরা, মালিকরা ঝগড়া থামিয়ে দেয়, চড়ুই,  মাছরাঙা, প্রজাপতির ঝাঁক, গর্তবাসী পিটপিটে চোখের ইঁদুর পর্যন্ত। হয় কবির অঙ্কন প্রচেষ্ট দেখে, নয়তো আঁকার মধ্যে থাকতে চায়। আঁকার নিজস্ব উপকরণ রংতুলিরা দুপুরবেলায় কবিকে পেয়ে খুশিতে উপচে পড়ে। একইভাবে রাতের মাঠে চাঁদের আলো যখন দুধের সরের মতো ঘন হয়ে ওঠে, বাতাস যখন একটু কাপিয়ে নাড়া দেয়, তখন কবি ছড়া লেখেন। দেখা যায়—গোপনতা বজায় রেখে আকাশের তারাগুলি যেন কবির কাছে ঘনিয়ে আসে। গাঢ় আঁধারে ঘনপাতার বকুল গাছে দশটি জোনাকি খুশিতে ‘অ’ ‘আ’ লেখে। প্রকৃতির নিপুণ ছোঁয়ায়, প্রাণের প্রাচুর্য এখানে কবিমনের হর্ষের সঙ্গে লেখে এক হয়ে যেতে দেখা যায়। এই তো সার্থক সৃষ্টির ক্ষণ। কবির মতে, পাঠকের উপস্থিতি না থাকলে কোনো সৃষ্টিই যেন সার্থক হয় না।

উঃ-কবিতায় উপমা-প্রয়োগ একটি চিরাচরিত রীতি। এই উপমা আসে তুলনাত্মকভাবে। প্রখ্যাত আধুনিক কবি ও ছড়াকার মৃদুল দাশগুপ্তের ‘আঁকা-লেখা’ কিশোর কবিতাটিতেও চমৎকার ও সার্থক কয়েকটি উপমা-প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকে দেখা যায়—মাঠে ছড়ানো চাঁদের আলোর সঙ্গে কবি দুধের সরের তুলনা এনেছেন। আবার একই স্তবকে আকাশভরা তারাগুচ্ছকে বলেছেন ‘তারার মালা’। কবিতাশেষেও লক্ষ করা যায়—যাদের জন্য এই ছড়া লেখা, তাদের সঙ্গে একাত্মতার পরমানন্দকে তিনি তুলনা করে বলেছেন—‘পদক পাওয়া'। উপমাগুলির প্রয়োগনৈপুণ্য লক্ষ করার মতো, যাতে কবিতাটিতে একটা ভাবের শিল্পিত প্রকাশ যেমন এসেছে, তেমনি কবিতাটিতে ভাবরস গাঢ় হয়েছে। অতএব এব্যাপারে কবি যথেষ্ট সার্থক।

উঃ-ছবি আঁকা, ছড়া/কবিতা লেখার মধ্যে আমার পছন্দ হল ছবি আঁকা। ছড়া বা কবিতা লিখতে গেলে চাই ছন্দ, অলংকার, উপমার যথাযোগ্য মিলন। তার সঙ্গে উপযুক্ত শব্দ প্রয়োগ ও সুন্দর ভাষা। তাই ছড়া বা কবিতা লেখা মোটেই সহজ বিষয় নয়। তুলনায় ছবি আঁকা অনেকটা যেন সহজসাধ্য।

ছোটোবেলা থেকেই আমি ছবি আঁকতে ভালোবাসি। বিশেষ করে  রংতুলি দিয়ে ছবি আঁকা আমার বিশেষ পছন্দের। সাধারণত ছবির মধ্যে মনের ভাব ফুটে ওঠে। সুন্দরভাবে আঁকা ছবি যেন আমাদের মনের কথাই প্রকাশ করে দেয়।

উঃ-কবি মৃদুল দাশগুপ্ত রচিত ‘আঁকা, লেখা’ কবিতায় মৎস্যশিকারি পক্ষী মাছরাঙা মৎস্যশিকারে উদাসীন হয়ে কবিকে ছবি আঁকায় সাহায্য করতে তার ডানার নীল রং ধার দিতে চায়।

উঃ-ছবি আঁকতে কবি যখন ব্যস্ত থাকেন প্রকৃতির বুক থেকে রঙিন প্রজাপতি তাঁর চিত্রে থাকতে চায়। প্রকৃতির চিত্রে তার ছবিও অন্য মাত্রা যোগ করে আরও রঙিন করে তুলতে পারে বলে কবির কাছে তার অনুরোধ সে যেন চিত্রে স্থান পায়।

উঃ-কবি যখন ছড়া লিখতে বসেন, তখন রাত্রিকাল। মাঠময় চাঁদের জ্যোৎস্না প্লাবিত হয়ে জমিয়ে তুলেছে পুরু দুধের সর। আর পরিবেশ তখন ছড়িয়ে দিয়েছে মৃদুমন্দ বাতাস ফলে কবির মন উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছে সৃষ্টিকর্মে।

উঃ-বর্ণবিন্যাসে রাত্রে জোনাকিরা ব্যস্ত থাকে।

বকুল গাছে দশটি জোনাকি অ-আ লিখে যেন তাদের বর্নবিস্তারে ব্যস্ত থাকে।

উঃ-‘আমার’ বলতে কবি নিজেকেই বুঝিয়েছেন।

এক্ষেত্রে তাঁর পুলকিত হওয়ার কারণ হল, ছবি এঁকে ছড়া লিখে তিনি তাঁর দর্শক ও পাঠকের সঙ্গে সত্যকার যোগসূত্র গড়ে তুলতে পেরেছেন।

উঃ-পরমা প্রকৃতির রূপমুগ্ধ কবি ছবি ও ছড়ায় পাঠকের কাছে তাঁর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতির কথা তুলে ধরেছেন। কোনো বিষয়ে পদক দানের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে তার কৃতিত্বের স্বীকৃতি দান করা হয়। কবি মনে করেন, ছবি ও ছড়ার মাধ্যমে পাঠকের সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় যোগসূত্র গড়ে উঠেছে, তা পদকপ্রাপ্তির থেকেও  শ্রেষ্ঠ।

উঃ-প্রখ্যাত কবি ও ছড়াকার মৃদুল দাশগুপ্ত তাঁর কিশোরমনস্ক কবিতা ‘আঁকা, লেখা’-তে যখন ঠিক দুপুরে খুশির খেয়ালকে সঙ্গী করেন, রত হন অঙ্কন প্রচেষ্টায়, তখন দেখা যায় তাঁর ছবি আঁকার প্রধান উপকরণ হয়েছে রংতুলি। এই যে কবি-শিল্পী তাঁর ছবি আঁকার ক্ষেত্রে রং আর তুলিকে উপকরণ করেছেন, দেখা যায়—এতে তারা ‘বেজায় খুশি’ হয়। এখানেই কবি বক্তব্যের বিশেষত্বটি জোরালোভাবে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। রংতুলি জীবন্ত পদার্থ নয়, তবুও কবির জীবন্ত হয়ে ওঠা আঁকায় রংতুলিরাও যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

উঃ-কবিরা নানাভাবে তাঁদের সৃষ্টিকর্মে উৎসাহিত হন। তার মধ্যে প্রকৃতির উৎসাহ প্রদান একটি বিশেষ ঘটনা। আধুনিক কবি ও ছড়াকার মৃদুল দাশগুপ্তের তাঁর ‘আঁকা, লেখা’ কবিতাটিতে প্রকৃতির দ্বারা উৎসাহিত হয়ে, প্রকৃতির অনুষঙ্গে তাঁর কবিতার দেহগঠন করেছেন। অতএব বোঝা যায়—তাঁর এই সৃষ্টিকর্মের পিছনে প্রকৃতির একটা ভূমিকা আছে। কবি তাঁর প্রকৃতিমুগ্ধতা থেকেই উদ্ধৃত উক্তিটি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন। তিনি যখন রাতেরবেলা মুগ্ধ চোখে দেখেন মাঠ জুড়ে চাঁদের-চন্দন দুধের সরের মতো পুরু হয়ে জমেছে, তখনই তিনি অনুভব করেন। বাতাসের মৃদুমন্দ স্পর্শ। এই বাতাসের স্পর্শেই তিনি ছড়া লিখতে শুরু করেন।

উঃ-প্রকৃতিসচেতন কবি মৃদুল দাশগুপ্ত তাঁর প্রকৃতির রূপমুগ্ধতাকে ছবি ও ছড়ার মাধ্যমে পাঠকমহলে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। এই সূক্ষ্ম অনুভূতিকে প্রকাশ করতেই তিনি ‘পদক’ পাওয়ার প্রসঙ্গ এনেছেন। ‘পদক’ হল সেই বস্তু, যা এক সম্মানজনক ভক্তি বা সম্মানজক অথবা প্রশংসাসূচক মেডেল। এ বস্তু দানের মাধ্যমে ব্যক্তিকে তার কৃতিত্বে স্বীকৃতি দান করা হয়। অতএব কবি মনে করেছেন, ছবি আঁকা বা ছড়া লেখার মাধ্যমে পাঠকের সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় যোগসূত্র গড়ে উঠেছে, তা পদক পাওয়ার থেকেও অমূল্য। তাই তিনি এমন তুলনা করেছেন।

উঃ-প্রকৃতি এক বিপুল-বিশাল অনুভব কিংবা অস্তিত্ব, যার পাশে প্রাণীকুল নেহাতই তুচ্ছ। তবু মানুষ প্রকৃতির অঙ্গনেই থাকে, আর বুদ্ধিধর জীব বলে প্রকৃতির কোল থেকেই তাকে জীবনের খোরাক সংগ্রহ করে নিতে হয়। কবি স্বভাবতই প্রকৃতিপ্রেমিক। তিনি তাঁর ‘আঁকা, লেখা’ কবিতাটিতে প্রকৃতির সংস্পর্শ থেকেই নানা প্রসঙ্গে উপাদান সংগ্রহ করেছেন। দুপুরবেলা খুশ-খেয়ালে কবির চিত্রচর্চা শুরু হলে প্রকৃতির কুশীলব শালিক-চড়ুই- মাছরাঙা-প্রজাপতি ও ইঁদুর চিত্রমুগ্ধ দর্শক হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এই পক্ষীকুল বা পশু-পতঙ্গ তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য-সহ হাজির হয় কবিতায়। কিচিরমিচির করা শালিক, চড়ুই কবির অঙ্কন প্রচেষ্টায় হতবাক হয়ে যায়। আর যে মাছরাঙা মৎস্যশিকারি, সে মাছ ভুলে নিজের গায়ের রঙের নীলটুকু কবিকে আঁকার রং হিসেবে ধার দিতে চায়। প্রজাপতিও বর্ণময়, রঙে রঙে তার বর্ণময় প্রকাশ,/তারাও চায়, কবির ছবিতে নিজেদের রাখতে। আপন স্বভাববৈশিষ্ট্যে অতি উজ্জ্বল গর্তের ইঁদুরও পিটপিটে চোখ মেলে কবির ছবি দেখে। আবার দেখা যায় রাতের বেলা সারা মাঠ জুড়ে চাঁদের চন্দনের দুধের সরের মতো জমে ওঠার ঘটনা কবিতায় ছায়া ফেলে, যখন কবি তাঁর ছড়া লেখার কাজে হাত দেন। কবি অনুভব করেন এমন জোছনার সঙ্গে মৃদুমন্দ বাতাসের প্রবাহ যেন যুগল গানের সুরের মিলন। এইসময় প্রকৃতির আর-এক প্রসঙ্গ ‘তারার দল’ যেন নীরবতার মধ্যে কবির খুব কাছে এসে পড়ে। কবি দেখেন রাতের জোনাকিদের। মনে হয় যেন দূরের গাছে জোনাকিরা আলো জ্বেলে নানা রঙের ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তুলেছে। কবি প্রকৃতির রাজ্যে হারিয়ে যান।

উঃ-খোকন যে স্কুলে পড়ত, সেখানকার ড্রহং-এর মাস্টারমশাই তাকে প্রকৃতি থেকে বিষয় সংগ্রহ করে ছবি আঁকার কথা বলেছিলেন। ব্যাপারটি খোকন ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। তখন তিনি তাকে বুঝিয়েছিলেন, প্রকৃতিতে ছড়িয়ে আছে অনেক ছবি। সেইগুলোই দেখে দেখে অনবরত ছবি আঁকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। খোকনদের বাড়ির সামনে যে ইউক্যালিপটাস গাছটি ছিল, সেটা তিনি একদিন এঁকে ফেলতে বলেছিলেন। খোকন সত্যি সত্যি একদিন সেটির ছবি এঁকে প্রথম ‘প্রকৃতি-চিত্র’ এঁকেছিল। মাস্টারমশাই সে ছবিই প্রশংসা করে বলেছিলেন ‘আরো আঁকো’। এরপর তিনি খোকনকে তাদের বাড়ির ছাদ থেকে দেখতে পাওয়া পুলটার ছবি আঁকতে বলেছিলেন তা আঁকা হলে, সে ছবিও মাস্টারমশাইয়ের দ্বারা খুব প্রশংসিত হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, 'চারপাশে যা দেখবে এঁকে ফেলবে।' এভাবেই তিনি খোকনকে প্রকৃতি দেখতে শিখিয়েছিলেন।

উঃ-খোকন ছোটোবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসত। স্কুলজীবন থেকে টুল, টেবিল, চেয়ার, কলসি, গোরু প্রভৃতির ছবি আঁকা সে শিখেছিল অনায়াসে। ড্রইংয়ের মাস্টারমশাইয়ের অনুপ্রেরণাতে প্রকৃতিরও ছবি আঁকতে শিখেছিল সে। একদিন সে দেখল আকাশের মেঘ একটা হাতির মতো; ঠিক যেন একটি হাতি পিছনের দু-পায়ে ভর করে শুঁড় তুলে আছে। খোকন তাড়াতাড়ি তার ড্রইং খাতায় ছবিটা আঁকতে শুরু করেছিল। কিন্তু আঁকা শেষ হবার পর মিলিয়ে দেখতে গিয়ে সে দেখে—হাতি নেই, প্রকাণ্ড একটা কুমির শুয়ে আছে অর্থাৎ হাতি কুমির হয়ে গেছে। এই দেখেই খোকন বুঝতে পারে প্রকৃতির দৃশ্যের বদল অহরহ ঘটে।

উঃ-ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই-এর কাছ থেকে খোকন প্রকৃতি দেখতে শিখেছিল। তাঁর অনুপ্রেরণায় খোকন প্রকৃতির যা কিছু দেখত তাই মহা উৎসাহে আঁকত। তার আঁকা ছবি দেখে তার বাবার একজন চিত্রকর বন্ধু প্রথমে তাকে বাহবা দিলেও পরে যখন জিজ্ঞাসা করেন খোকনের নিজের আঁকা ছবি কোথায়—তখন খোকন প্রথমবার অবাক হয়ে যায়।

তারপর, খোকনের বাবার চিত্রকর বন্ধু চলে যাওয়ার মুহূর্তে খোকনকে বলে যান—“চোখ বুজে বসে কল্পনা করো। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেলো।” তাই খোকন নিজের ঘরে বসে অন্ধকারের ছবি আঁকবে স্থির করে। কালো রং আর তুলি নিয়ে শুরু করে দেয় আঁকতে। ড্রইং খাতার একটা পাতা কালো রঙে ভরে যায়। তারপর সেই ছবির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সেই কালোর ভিতরে সে একটা মুখ-চোখ দেখতে পায়। নিজের প্রথম সৃষ্টির দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে।

উঃ-‘খোকনের প্রথম ছবি' গল্পে উল্লিখিত চিত্রকর হলেন খোকনের বাবার বন্ধু। তিনি লখনউ শহরে থাকেন।

চলে যাওয়ার আগে খোকনের বাবার চিত্রকর বন্ধু খোকনকে চোখ বুজে কল্পনা করে, সেই কল্পনার ছবি আঁকতে বলেন। কারণ তবেই খোকনের পক্ষে মৌলিক ছবি আঁকা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

উঃ-লখনউ থেকে আসা বাবার চিত্রকর বন্ধু একসময় খোকনদের বাড়ি থেকে চলে যান। যাওয়ার আগে তিনি খোকনকে বলে গিয়েছিলেন, চোখ বুজে কল্পনা করতে এবং কল্পনায় যা দেখবে তাই এঁকে ফেলতে। এই পরামর্শ মেনেই খোকন একদিন নিজের ঘরে অনেকক্ষণ চোখ বুজে বসে থাকে কিন্তু অন্ধকার ছাড়া কিছুই সে দেখতে পায় না। তখনই খোকন ঠিক করে, সে অন্ধকারেরই ছবি আঁকবে।

খোকন অন্ধকারের যে ছবি এঁকেছিল, তা ছিল নিছকই সাদা কাগজের উপর কালো রঙের গভীর প্রলেপ। কিন্তু সেটার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকার পর সে দেখতে পায়, কেবল অন্ধকারের কালো নয়, তার ভিতর “একটা মুখ রয়েছে। চোখও আছে। অদ্ভুত হাসি সে চোখে।”

উঃ-‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্পে খোকনের প্রথম ছবি হিসেবে আমি সেটাকেই স্বীকৃতি দেব, যেটা খোকন অন্ধকারে কল্পনা করে এঁকেছিল। কালো রঙের ভিতর সে একটা মুখ ও অদ্ভুত হাসিযুক্ত চোখ দেখতে পেয়েছিল।

কারণ, প্রকৃতির ছবি বা অন্য কোনো ছবি যে কেউ আঁকতে পারে আর এগুলি সবই নকল ছবি। কিন্তু, মানুষের নিজের মনের ভিতর থেকে যে ছবি আসে সেটা আসল ছবি। তার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই। সেটাই তার মনন এবং চিত্তনের বিকাশ। কপি বা নকল করা ছবিতে যে আনন্দ তার থেকে অনেক বেশি আনন্দ হয় নিজের সৃষ্টিতে।

উঃ-আমি যদি বড়ো হয়ে সাহিত্যিক হই তাহলে আমি ‘কোকিল' ছদ্মনাম নেব।

কারণ ‘কোকিল’ একটি পাখি। তার কুহু স্বর শুনে মানুষ ঘুম থেকে জেগে ওঠে। আবার সেই কোকিল মানুষের কর্মময় সময় নির্ঘণ্টকে মনে করিয়ে দেয়, অলস জীবনধারাকে জাগরিত করে। কোকিল প্রভাতের গায়ক পাখি। প্রভাতী সংগীতে মানুষের মনে যেমন নতুন ছন্দ ধ্বনিত হয়, তেমনি কর্মে গতি আসে। তার কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই আর কেউ নিদ্রিত থাকতে চায় না।

আমি কোকিলের মতো সুমিষ্ট স্বরে সাহিত্যরচনা করতে চাই। আমার লেখা পড়ে মানুষ যেন কর্মবিমুখ না হয়। অলস জীবন ত্যাগ করে নতুন নতুন কর্মে মনোনিবেশ করতে পারে। সে যেন ছন্দহীন-গতিহীন না হয়। যে-কোনো কর্মে আনন্দ থাকবে এবং সেই আনন্দরস পরিবেশন করাই হবে আমার সাহিত্যরচনার একমাত্র লক্ষ্য। তাই ‘কোকিল’ ছদ্মনাম পছন্দের বলেই এই নাম নিতে চাই।

উঃ-বনফুলের লেখা ‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্পে ছবি আঁকার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিল খোকন। তাকে ছবি আঁকতে যে দুজন প্রেরণা দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন হলেন ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই, অন্যজন তার বাবার একজন বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধু। খোকন যে ছবিই আঁকত তার মাস্টারমশাই তাতেই তাকে বাহবা দিতেন। তিনি বলতেন চারপাশে যা দেখবে এঁকে ফেলবে। অপরদিকে, খোকনের বাবার বন্ধু বলেছিলেন পরিবেশের থেকে কপি করে ছবি আঁকা ঠিক নয়। তিনি তাকে নিজের মন থেকে ছবি আঁকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন।

এই দুই পদ্ধতির মধ্যে খোকনের বাবার চিত্রকর বন্ধুর নির্দেশিত দ্বিতীয় পদ্ধতিটিই আমার পছন্দ। কেন-না আমার মনে হয়, খোকনের আঁকার মাস্টারমশাইয়ের পদ্ধতিতে রয়েছে নিছকই কপি করা। আলোকচিত্র তোলার মতো সহজতা ও সাধারণত্ব। এমন অনুকরণপ্রিয়তার পথে কোনো ছবিতে নিজস্বতা আসে না। অন্যদিকে দ্বিতীয় পদ্ধতিটিতে আছে নিজে করার দৃঢ় মানসিকতা, শিল্পীর কল্পনার সক্ষম প্রকাশ এবং মনের রং মিশিয়ে ছবি করার চেষ্টা।

উঃ-‘খোকনের প্রথম ছবি’ পাঠ্যাংশের অন্তর্গত উদ্ধৃতাংশের বক্তা হলেন খোকনের ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই।

‘তার ছবিটা’ বলতে এখানে খোকনের বাড়ির সামনে চমৎকার ইউক্যালিপটাস গাছের ছবি আঁকার কথা বলা হয়েছে।

উঃ-প্রকৃতির ছবি আঁকার প্রচেষ্টায় খোকন একদিন মেঘের ছবি আঁকতে গিয়েছিল। সে দেখল আকাশে একটা মেঘ ‘হাতির মতো’। রূপটিও তার সুন্দর, ঠিক যেন একটি হাতি পিছনের দু-পায়ে ভর দিয়ে শুঁড় তুলে আছে। কিন্তু সে ছবি এঁকে মিলিয়ে দেখতে গিয়ে খোকন বেকুব বনে গেল, কারণ হাতি তখন হাতি নেই, প্রকাণ্ড একটা কুমির হয়ে শুয়ে আছে।

উঃ-উদ্ধৃতাংশের বক্তা হলেন খোকনের বাবার এক চিত্রকর বন্ধু।

‘নিজের আঁকা ছবি’ বলতে কোনো কিছু দেখে কপি বা নকল করা ছবি নয়, চোখ বুজে বসে কল্পনা করা ছবির কথা বুঝিয়েছেন।

উঃ-খোকন তার বাবার বন্ধুর কথা শুনে একদিন নিজের ঘরে চোখ বুজে বসে রইল এবং সে কল্পনায় শুধু অন্ধকার দেখতে পেল। তারপর কালো রং আর তুলি নিয়ে খোকন সেই অন্ধকারের ছবি আঁকল ড্রইং খাতার একটি পাতা কালো রঙে ভরে দিয়ে। এইভাবেই খোকন তার নিজের ছবি আঁকল।

উঃ-ড্রইং মাস্টারমশাই-এর অনুপ্রেরণায় যখন খোকন বাড়ির সামনের ইউক্যালিপটাস বা বাড়ির অদূরে পুলের ছবিটা চমৎকার এঁকেছিল, তখন তাকে উৎসাহ দিতে এ কথা বলেছিলেন তার মাস্টারমশাই।

খোকন ছোটোবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসত। তার ছবি আঁকার ঝোঁক এবং নৈপুণ্য দেখেই ড্রইং-এর মাস্টারমশাই উক্ত ভবিষ্যদ্‌বণীটি করেছিলেন।

উঃ-বনফুলের লেখা ‘খোকনের প্রথম ছবি’ পাঠ্যাংশ থেকে উৎকলিত উদ্ধৃতাংশে ‘সে’ বলতে খোকনের কথা বলা হয়েছে।

ড্রইং মাস্টারের কথামতো প্রকৃতির ছবি আঁকতে বসে সূর্যের যে ছবিটা সে এঁকেছে সেটা সূর্যের মতো নয়। কারণ সূর্যের দীপ্তি ছবিতে ফোটেনি, গোলাপের সৌন্দর্য ছবিতে প্রকাশ পায়নি। এইসব প্রাকৃতিক দৃশ্যের অহরহ বদল হয় বলেই খোকন উপরোক্ত মন্তব্য করেছিল।

উঃ-বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের (বনফুল) ‘খোকনের প্রথম ছবি’ থেকে আলোচ্য অংশটি নেওয়া হয়েছে।

সূর্যের ছবিটা সূর্যের মতো নয়, কারণ সূর্য একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড, তার নিজস্ব তেজ বা দীপ্তি আছে। সেই দীপ্তিময় সূর্যের ছবি ড্রইং বুকের পাতায় রংতুলি নিয়ে যখন আঁকা হয়, তখন তার সেই দীপ্তি আর থাকে না।

উঃ-প্রকৃতি হল এই বাইরের জগৎ বা নিসর্গ। অর্থাৎ বিশ্বচরাচর যেসব উপাদানে গঠিত, তার সমগ্র রূপকেই বলা যেতে পারে প্রকৃতি।

ঈশ্বর এই প্রকৃতির স্রষ্টা। তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা সবই সুন্দর। তিনি সমস্ত জীবজগৎকে এমন কি মানুষকেও সৃষ্টি করেছেন। আর মানুষ সেই প্রকৃতির ছবি আঁকে তা ঠিক হয় না। অর্থাৎ ঈশ্বরের সৃষ্টিপ্রকৃতি মানুষের তুলির টানে উৎকর্ষতা হারায়।

উঃ-বনফুলের লেখা ‘খোকনের প্রথম ছবি’ পাঠ্যাংশ থেকে উদ্ধৃত তাৎপর্যনিহিত অংশটি গৃহীত।

  তাৎপর্য : খোকন একদিন আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে যে মেঘের ছবি এঁকেছিল তার আকৃতি ছিল অনেকটা হাতির মতো। ঠিক যেন একটি হাতি পিছনের দু-পায়ে ভর করে শুঁড় তুলে আছে। কিন্তু প্রকৃতির যে-কোনো দৃশ্যের অহরহ বদল ঘটে। হাতির মতো আকৃতির মেঘ যেহেতু প্রকৃতিতে দৃশ্যমান সেহেতু তারও পরিবর্তন হয়। সেই হাতিসদৃশ মেঘও পরক্ষণে কুমিরে পরিণত হয়ে যায়।

উঃ-বাংলা সাহিত্যের অনন্য গল্পকার বনফুল তথা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের একটি অসাধারণ কিশোরমনস্ক গল্প ‘খোকনের প্রথম ছবি'। অনেক কিশোরের মতোই খোকনও ছবি আঁকতে ভালোবাসে। ছোটো বয়স থেকেই কাগজের উপর রঙিন পেনসিল দিয়ে হিজিবিজি কাটত সে। বিদ্যালয় জীবনে অঙ্কন শিক্ষকের সাহচর্যে সে আঁকা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে। মাস্টারমশাই তাকে প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকার পরামর্শ দেন কিন্তু এ যেন নিছকই আঁকা, বাস্তব-বিষয়ের প্রতিলিপি বা অনুকরণ। এ ধরনের ছবিকে কপি করা বা নকল করা ছবি বলা যেতে পারে। ছবি গড়ে ওঠে বাস্তব-দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়ের সঙ্গে কল্পনার সুসমন্বয়ে। খোকনের প্রাথমিক ছবিতে ছিল না কল্পনার মিশেল বা সৃষ্টিশীলতার স্পর্শ। তাই সেগুলি ছিল যেন কৃত্রিমতায় ভরা। ছোটোরা কল্পনাপ্রবণ, তাই খোকনের মনের মধ্যেও ছিল কল্পনাশক্তির অস্তিত্ব, তবে তা যেন ছিল ঘুমন্ত। তার বাবার এক বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধু এসে এই কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে দেন। তিনি বলেন—“চোখ বুজে বসে কল্পনা করো। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেলো।” খোকন একদিন নিজের ঘরে চোখ বুজে বসে থাকে। কেবল অন্ধকারই তার চোখে পড়ে। অবশেষে সেই অন্ধকারেরই ছবিই সে আঁকে। খাতার পুরো পাতা ভরে যায় কালো রঙে। আর সেটার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে সে দেখে, শুধু কালোই নেই, তার ভিতর রয়েছে একটা মুখ, চোখ, যে চোখে মাখানো রয়েছে অদ্ভুত হাসি। এ হল সৃষ্টি। কারণ এ ছবিতে নকল করার কৃত্রিমতা নেই, আছে মনের মিশেল, কল্পনার রং।

উঃ-শিশু ও কিশোরদের মন কোনো বন্ধন মানে না। তাদের কল্পনাশক্তিও অবারিত হয়। ছোটোবেলা থেকে যে খোকন কাগজে হিজিবিজ কেটে রঙের ফোয়ারা তুলত, বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে তা অনেক প্রশংসা পায়। বিশেষত, তার আঁকার মাস্টারমশাই যখন প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকতে শেখান, তখন সেই ছবি এঁকে সে প্রশংসা পায় অনেক। চেয়ার-টেবিল-কাপ- গোরু, ইউক্যালিপটাস গাছ কিংবা ছাদ থেকে দেখতে পাওয়া পুলের ছবিও সে সুন্দর করে আঁকতে পারে। ড্রইং বুক থেকে কপি করেও ছবি আঁকে খোকন। তবুও নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে এ পর্বের কোনো ছবিতেই খোকনের নিজের মন কিংবা কল্পনাশক্তি তেমনভাবে কার্যকরী হয়। এসব ছবিকে বলা যেতে পারে ‘নকল করা ছবি’।

হঠাৎ লখনউ থেকে আসা বাবার এক চিত্রকর বন্ধুর পরামর্শে খোকনের মানসিকতা বদলে যায়। নিজের কল্পনাশক্তির পরীক্ষা করতে একদিন সে ঘরে চোখ বুজে বসে সামনে কেবলই অন্ধকার দেখে। তারপর রং ও তুলি নিয়ে সেই অন্ধকারের ছবিই ড্রইং বুকের একটি সাদা পাতায় সে এঁকে ফেলে। সেই অন্ধকার ছবির মধ্যেই সে দেখতে পায় একটি মুখ ও অদ্ভুত হাস্যময় চোখ। এই ছবিতেই খোকনের নিজস্বতা ধরা পড়ে বলে একেই খোকনের আঁকার প্রথম ছবি বলা যায়।

উঃ-তুঘলক বংশের অন্যতম প্রজাহিতৈষী সম্রাট, হেনরি এলিয়ট যাকে আকবরের সঙ্গে তুলনা করেছেন, সেই ফিরোজ শাহ তুঘলক অশোক স্তম্ভকে দিল্লি নিয়ে এসেছিলেন।

উঃ-কুতুবমিনার নামটি দাস বংশের অন্যতম সম্রাট কুতুবউদ্দিন আইবকের নামানুসারে হয়, কেন-না এটি ইলতুৎমিস শেষ করলেও শুরুটা কিন্তু করেছিলেন আইবক। আবার কুতুবউদ্দিন আইবকের গুরু কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীকে স্মরণ করে কুতুবউদ্দিন এই মিনারটি তৈরি করতে চেয়েছিলেন তাই এরকম নাম।

উঃ-কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য খলজি বংশের অন্যতম দুঃসাহসী সম্রাট আলাউদ্দিন খলজি কুতুবের দ্বিগুণ ঘের দিয়ে দ্বিগুণ উঁচু একটি মিনার গড়তে চেয়েছিলেন।

উঃ-মিনার হল সু-উচ্চতাবিশিষ্ট স্তম্ভ। মোচা বা শাঁখের মতো ঊর্ধ্বমুখী অবনত চূড়াকে বলে মিনারেট বা মিনারিকা।

মিনারের সঙ্গে মিনারেট বা মিনারিকার মূল পার্থক্য চূড়ার উচ্চতার ক্ষেত্রে, অর্থাৎ মিনারেট মিনারের চেয়ে অনেক ছোটো হয়।

উঃ-‘আহমদাবাদ’ শহরটি সুলতান আহমেদের নামানুসারে হয়েছে।

আহমদাবাদ শহরটি গুজরাট রাজ্যের রাজধানী।

উঃ-কার্নিংহাম : আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ভাষাতত্ত্ববিদ। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি নিয়ে এদেশে আসেন। বিশ্বের প্রায় হারিয়ে যাওয়া ভাষা নিয়ে তাঁর গবেষণা ও সুচিন্তিত মতামত আধুনিক ভাষাবিদদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অবসর নেওয়ার পর তিনি ভারত সরকার নিযুক্ত পরাতত্ত্ববিভাগের সার্ভেয়ার পদে কাজ করেন।

ফার্গুসন : বিখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ জেমস ফার্গুসন ভারতের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। এমনকি অজন্তা-ইলোরা গুহাচিত্র নিয়েও তাঁর গবেষণা ভারতের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে কিছু অফিসার এই অজন্তা গুহা দেখেন। পরে ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে লেফট্যানেন্ট-ই আলেকজান্ডার ব্যক্তিগতভাবে নিজামের দরবারে বেড়াতে আসেন এবং এই গুহা সম্বন্ধে রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটিকে জানান। ফার্গুসন এই ব্যাপারটি তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডাইরেক্টরকে জানান এবং এই গুহাগুলিকে সংরক্ষণ করার অনুরোধ করেন।

সৈয়দ আহমেদ : দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে এই ইতিহাসবিদের জন্ম হয়। ভারতীয় ইসলামিক সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম এক নেতা এই ব্যক্তি ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আলিগড় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। পুরাতত্ত্ব ও স্থাপত্য বিষয়ে তাঁর গবেষণা ভারত ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। মুসলিম সমাজের সংস্কারসাধন-সহ পাণ্ডিত্যপূর্ণ নানা কর্মের জন্য তিনি ‘স্যার’ উপাধি লাভ করেন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।

উঃ-কুতুবমিনারই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার। এই সর্বশ্রেষ্ঠ মিনারের শিরোপা পাওয়ার পিছনে কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে। সেগুলি হল—এক, কুতুব সোজা বা খাড়া স্তম্ভ। এমন স্তম্ভে সৌন্দর্য সৃষ্টি করা কঠিনই। কিন্তু এক্ষেত্রে শিল্পীরা চমরভাবে সফল হয়েছেন। স্তম্ভটিকে কয়েকটি তলায় বিভক্ত করে এবং যথাসাধ্য সামঞ্জস্য রেখে প্রতিতলায় তাকে একটু করে ছোটো করে, গুটিকতক ব্যালকুনি লাগিয়ে মিনারটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। দুই, পাঁচতলাবিশিষ্ট এই মিনারটির প্রথম তলায় আছে ‘বাঁশি’ ও ‘কোণ’-এর পরপর সাজানো নকশা। তিন, দ্বিতীয় তলাতে আছে শুধু বাঁশি, আর তৃতীয় তলাতে শুধু কোণ, এর চতুর্থ ও পঞ্চম তলা বজ্রাঘাতে বিনষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার শিল্পকর্ম সম্পর্কে বিশেষ জানা যায় না। চার, সমগ্র মিনারটি লাল বেলে-পাথর দিয়ে নির্মিত। এই মিনারকে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে। পাঁচ, মিনারটি সৃজনের ক্ষেত্রে শিল্পীদের প্রপর্শন (Proportion) বা সামঞ্জস্য-ধারণা ছিল লক্ষ করার মতো। এতে স্থাপত্যরীতির হিন্দু-মুসলমান উভয় স্থাপত্যধারার মিশ্রণ লক্ষ করা যায়।

উঃ-সুলতানি যুগের স্থাপত্যে হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্যরীতির সমন্বয় লক্ষ করা যায়, কারণ ভারতে ইসলামের আসার আগেই হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন স্থাপত্যের একটি বিশেষ ধারা ছিল। কুতুব মিনারের যে কারুকার্য তা হিন্দু-মুসলিম স্থাপত্যের এক অভূতপূর্ব মিলন। বাঁশি ও কোণের উপর দিয়ে সমস্ত মিনারটিকে কোমরবন্ধের মতো ঘিরে রয়েছে সারি সারি লতাপাতা, ফুলের  মালা, চক্রের নকশা। এগুলি জাতে হিন্দু এবং এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে আরবি লেখার সার সেগুলি জাতে মুসলমান। গোটা মিনারটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গিয়েছে মিনারটির পরিকল্পনা করেছেন মুসলমান এবং যাবতীয় কারুশিল্প ও খোদাই-এর কাজ করেছেন হিন্দু। ভারতবর্ষে মুসলমানদের সর্বপ্রথম সৃষ্টিকার্যে হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে, যা আজও অটুট আছে অন্তত কলাশিল্পের ক্ষেত্রে।

উঃ-কুতুবমিনার যে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার এ কথা যেমন লেখক বিভিন্ন ঐতিহাসিক সমালোচকদের দেওয়া তথ্য দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, তেমনি তিনি স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম পীঠস্থান ইরান-তুরানের প্রসঙ্গ এনেছেন ও ইংরেজদের স্বীকারোক্তির কথাও তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া তাজমহল, হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্র, আলাউদ্দিনের ব্যর্থ প্রয়াস, আহমদাবাদের রানি সিপ্রির মসজিদের প্রসঙ্গ এনেছেন। তা ছাড়া ইংরেজদের তৈরি দিল্লির সেক্রেটারিয়েট এবং কলকাতার রাজভবন ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের কথাও বলা হয়েছে।

উঃ-দিল্লির সুলতানি শাসনের অন্যতম দুঃসাহসী সম্রাট হলেন আলাউদ্দিন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই সম্রাট নিজেকে খ্যাতির চূড়ায় স্থাপন করার জন্য এবং কুতুবমিনারকে টেক্কা দেওয়ার জন্য এর দ্বিগুণ ঘের দিয়ে তিনি আর-একটি মিনার গড়তে চেয়েছিলেন। যার উচ্চতা হবে কুতুবমিনারের দ্বিগুণ। যে-কোনো বড়ো অট্টালিকার মাপের ক্ষেত্রে একটা সামঞ্জস্য থাকে এবং অট্টালিকাটি তৈরির সময় সেটি অক্ষরে অক্ষরে মানতে হয়, তা না হলে অট্টালিকার সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব দুই-ই বিপন্ন হয়। আলাউদ্দিনের স্বপ্নের মিনারের বাস্তবতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। তা ছাড়া এটি সম্পন্ন হওয়ার আগেই তিনি মারা যান। তাই তাঁর চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

উঃ-উদ্ধৃত অংশটিতে উল্লিখিত ‘প্রথম দিন’-এর কালখণ্ডটি আটশত বছর আগেকার।

সেসময় কলাসৃষ্টির ক্ষেত্রে, অর্থাৎ স্থাপত্য-নৃত্য-সংগীত ইত্যাদির প্রাঙ্গণে হিন্দু-মুসলমান এই শিল্পচেতনার মিলন হয়েছিল।

উঃ-স্থাপত্যের অন্যতম পীঠস্থান ইরান, তুরানে যা নেই এবং স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন তাজমহলকে পিছনে ফেলে কুতুবমিনারকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মিনার রূপে তুলে ধরার যে কলাকৌশল শিল্পী দেখিয়েছেন তা কোথা থেকে—অর্জন করেছিলেন, সে-বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এই সমালোচকরা।

উঃ-দিল্লির স্থাপত্যশিল্পের বর্ণনা প্রসঙ্গে সুলেখক সৈয়দ মুজতবা আলি ‘কুতুব মিনার’-কে ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার' আখ্যা দিয়েছেন। এর পাঁচটি ‘তলা’ যার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রথম তলাটিতে স্থপতি ও শিল্পীরা কেবল ‘বাঁশি', ও ‘কোণ’-এর পরপর সাজানো নকশা রেখেছিলেন। এর দ্বিতীয় তলাটিতে ছিল শুধু ‘বাঁশি'। তৃতীয় তলটিতে ঠাঁই পেয়েছিল। কেবলই ‘কোণ’। এত মিনারটির চতুর্থ ও পঞ্চম তলাদুটিতে কী ছিল, তার রূপ কেমন ছিল, তা আজ আর জানার কোনো উপায়ই নেই, কেন-না বজ্রাঘাতে তা ভেঙে যায়। তার উপর ফিরোজ তুঘলক সেখানে মার্বেল বসিয়ে মেরামত করে দেন বলে তা অন্যরূপ পায়। পঞ্চম তলটিতে আবার সিকন্দর লোদির হস্তক্ষেপ ছিল বলে, তার প্রকৃতরূপ কেমন ছিল তা জানা কোনোপ্রকারেই সম্ভব নয়।

উঃ-‘প্রপর্শন’ শব্দটির অর্থ হল সংগতি বা সামঞ্জস্য।

কুতুবমিনার তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো বিষয় হল স্থপতির কল্পনাশক্তি। ইমারত তৈরি একরকম আর খাড়া স্তম্ভে সৌন্দর্য আনা অন্যরকম। এখানে শিল্পী সফল হয়েছে শুধুমাত্র  কুতুবকে কয়েক তলাতে ভাগ করে, সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তলায় তাকে একটু ছোটো করে গুটিকয়েক ব্যালকনি লাগিয়ে দিয়ে এবং মিনারের গায়ে কখনও ‘বাঁশি’ কখনও ‘কোণের’ নকশা কেটে। ‘প্রপর্শন’ বা ‘সংগতি’র এরকম চূড়ান্ত নিদর্শন পৃথিবীর আর কোনো মিনারে পাওয়া যায় না।

উঃ-‘তিনি’ হলেন সুলতানি যুগের খলজি বংশের অন্যতম সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি।

আলাউদ্দিন চেয়েছিলেন কুতুবমিনারের চেয়ে উচ্চতম মিনার বানাতে। তাই তিনি কুতুবেব চেয়ে দ্বিগুণ ঘের দিয়ে একটা মিনার বানাতে শুরু করেন। ইতিমধ্যে আলাউদ্দিনের মৃত্যুর ফলে মিনারের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদিনা কাজ বন্ধ না হত তবে তার এই স্বপ্ন সফল হত কি না বলা মুশকিল। কারণ কোনো স্থাপত্যশিল্পের মূল সূত্র অপটিমাম সাইজটিই এক্ষেত্রে মানা হয়নি।

উঃ-সৈয়দ মুজতবা আলি তাঁর ‘কুতুব মিনারের কথা’ রচনাংশে উদ্ধৃত কথাটি বলেছেন। কথাটির বিচারবিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রথমে মিনার ও মিনারেট বা মিনারিকার মধ্যে সাধারণ পার্থক্যটুকু বুঝতে হবে। খুব সোজা কথায় মিনার বলতে সুউচ্চ চূড়াযুক্ত ইমারতকে বোঝায় এবং স্বল্প উচ্চ চূড়াযুক্ত মিনারকে মিনারেট বা মিনারিকা বলা হয়। পাঠান-মোগলদের যে মিনারেট তার চেয়ে সময়ের নিরিখে কুতুবমিনার আগে। সমালোচনা ও শৈলীর বিচারে কুতুবমিনার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিনার। তাই পরবর্তীকালে নির্মিত তাজমহল ও হুমায়ুনের সৌধ-নির্মাতারা নতমস্তকে কুতুবের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। তাই তারা মিনারেটগুলি নির্মাণের সময় এমন ন্যাড়াভাবে তৈরি করেছে যে, দর্শকের মনে অজান্তেও যেন মিনারেটগুলি দেখতে দেখতে কুতুবমিনারের কথা স্মরণে না আসে। যে তাজের সর্বাঙ্গে গয়নার ছড়াছড়ি তার চারটি মিনারিকার হাতে নোয়া পর্যন্ত নেই। হুমায়ুনের সমাধি-নির্মাতা আরও এক ধাপ এগিয়ে, মিনারিকা সম্পূর্ণ বর্জন করেছেন।

উঃ-‘তার’ বলতে এখানে গুজরাটের রাজা আহমেদের দ্বারা নির্মিত বেগম রানি সিপ্রির মসজিদের কথা বলা হয়েছে।

মিনারের ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত কুতুবমিনার। কুতুবমিনারের পরবর্তী সময়ে যারাই যে মিনার তৈরি করতে গিয়েছে তাতেই কুতুবের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; এমনকি মিনারেট বা মিনারিকা তৈরির ক্ষেত্রেও। রবীন্দ্রনাথের ব্যাপকতা কাটিয়ে যেমন বাংলা সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকেরা বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না অনেকটা সেরকম। রানি সিপ্রির মসজিদ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। দিল্লি-আগ্রার বহুদূরে গুজরাটে অবস্থিত মিনারিকাটির কুতুবের সঙ্গে কোনো মিল নেই। সেজন্যই এর একটা আলাদা মূল্য আছে এবং সেইজন্যই মসজিদটির মধুরদর্শন ভূপর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রাজপুত রমণীদের মতো বিচিত্র আকার ও বিচিত্র দর্শনের অসংখ্য বলয়বন্ধন পরে মিনারিকাটি আপন মাহিমায় ভাস্বর।