ত্রয়োদশ পাঠ ⇒ আমরা

উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা ‘আমরা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

বঙ্গভূমির বর্ণনা করতে গিয়ে কবি উক্ত কথাটি বলেছেন। এই বাংলার ভূমিতে রয়েছে অজস্র তীর্থক্ষেত্র। মানুষ বিশ্বাস  করে তীর্থদর্শন করলে পুণ্য অর্জন করা যায়, ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করা যায়। বাঙালি জাতির সৌভাগ্য যে তারা এমন একটি দেশে বাস করে যে দেশের মাটি তাদের শত তীর্থের পুণ্য আর বর দান করে।

উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা ‘আমরা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থান অনুসারে বাংলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কল্পনায় সাগর যেন বাংলামায়ের চরণ ছুঁয়ে আছে। বাঙালির সংস্কৃতিতে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করার রীতি প্রচলিত আছে। তাই কবির মনে হয়েছে, তটভূমিতে আছড়ে পড়া অজস্র ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে সাগর যেন বাংলামায়ের চরণে তার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাচ্ছে আর ঢেউয়ের কলতান রচনা করছে মায়ের বন্দনাগান।

‘বাঞ্ছিত ভূমি’ অর্থাৎ যে দেশ সকলের আকাঙ্ক্ষার স্থান। বাংলার উপর দিয়ে বয়ে গেছে পুণ্যসলিলা গঙ্গা, তার মাথায় তুষারমৌলি হিমালয়ের মুকুট আর তার পা ধুয়ে দেয় সমুদ্রের জল। বাংলামায়ের কোলভরা সোনার ধান আর দেহ অজস্র ফুলে শোভিত। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পূর্ণ, সুজলা-সুফলা, বাংলার মাটিতে শত তীর্থের পুণ্য অর্জন করা যায় বলে বঙ্গদেশকে কবি ‘বাঞ্ছিত ভূমি’ বলেছেন।

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা 'আমরা' কবিতা থেকে উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি নেওয়া হয়েছে।
বাংলার দক্ষিণের বনভূমি অঞ্চল সুন্দরবন প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। সুন্দরবনের রাজকীয় বাঘ বা রয়াল বেঙ্গল টাইগার সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত। কিন্তু এই অঞ্চলের বাসিন্দা এবং জীবিকার কারণে কাঠ, মধু, মাছ ইত্যাদি সংগ্রহের জন্য যাদের জঙ্গলে যেতে হয় তাদের প্রতিনিয়ত এই হিংস্র প্রাণীটির
আক্রমণের মুখে পড়তে হয়। তাই কবি বলেছেন যে বাঙালি বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে।

উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা 'আমরা্রিত কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।
খাল-বিল-নদী-জঙ্গলে পূর্ণ বাংলায় অসংখ্য রকমের নাগ অর্থাৎ সাপ রয়েছে। তাই বাংলার বেশ কিছু সংখ্যক মানুষের জীবিকা সাপ ধরে সাপখেলা দেখানো। অন্যদিকে, পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ কালিয় নাগকে দমন করে তার মাথার উপর নেচেছিলেন। কৃষ্ণ বাংলার মানুষ না হলেও
ভালোবেসে বাঙালি তাঁকে আপন করে নিয়েছে। তাই কবি শ্রীকৃষ্ণের উপাখ্যানটিকেও বাঙালির কৃতিত্বের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিতার ক্ষেত্রে সাধারণত বিষয়বস্তু অনুসারে অথবা ভাব অনুযায়ী ব্যঞ্জনাময় নামকরণ হয়।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘আমরা' কবিতাটিতে কবির স্বদেশ ও স্বজাতি সম্পর্কে তীব্র ভালোবাসা ও গৌরববোধের প্রকাশ  ঘটেছে। কবিতাটির শুরুতে কবি বাংলামায়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা করে তারপরেই বাঙালি জাতির গৌরবগাথা রচনা করেছেন। শুধুমাত্র জন্মসূত্রেই বাঙালি নয়, বাঙালি যাঁদের ভালোবেসেছে যেমন শ্রীকৃষ্ণ, কপিলমুনি—তাঁদেরও কবি বাংলার গৌরবে শামিল করেছেন। বরভূধরের বৌদ্ধস্তূপ এবং ক্রম্বোজের ‘ওঙ্কার-ধাম’ মন্দিরও বাঙালির কৃতিত্ব বলে কবি মনে করেছেন।

কবি ইতিহাস ও জনশ্রুতির উপর ভিত্তি করে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় যাঁরা বীরত্বে-শিক্ষায় সাহিত্যে-শিল্পে স্বনামধন্য হয়েছেন তাঁদের সকলকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তিনি তাঁর সমসাময়িক কৃতী বাঙালিদের শ্রদ্ধা জানাতেও ভোলেননি। আমরা' কবিতায় কবি একদিকে যেমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ
বাঙালিদের অবদান স্মরণ করেছেন তেমনি অন্যদিকে বাংলার সংস্কৃতির মূলসুরটিও তুলে ধরেছেন। এই সুর হল মানুষের সঙ্গে মানুষের মহামিলনের সুর। আবেগপ্রবণ বাঙালি জাতি ভালোবেসে দেবতা থেকে মানুষ সকলকে আত্মার আত্মীয় করে নেয়। যারা তার সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে তাদের সকলকে
সাদরে গ্রহণ করে, কাউকে ফিরে যেতে দেয় না। কীর্তন আর বাউলগানে এই ভালোবাসার সুরই ধ্বনিত হয়। সবশেষে কবি আশা করেছেন একদিন নিশ্চয়ই বাঙালি জগৎসভায় শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পাবে।
কবিতাটি আমাদের অর্থাৎ বাঙালি জাতিকে কেন্দ্র করে রচিত। তাই ‘আমরা’ নামটি বিষয়বস্তু নির্ভর এবং সুপ্রযুক্ত।

'আমরা' কবিতাতে স্বদেশ এবং স্বজাতি সম্পর্কে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের তীব্র ভালোবাসা ও গৌরববোধের প্রকাশ ঘটেছে। বঙ্গভূমি তাঁর কাছে ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ একটি ভূখণ্ড মাত্র নয়, এই দেশ তাঁর কল্পনায় মাতৃরূপে ধরা দিয়েছে।

মুক্তধারা গঙ্গা নদী বাংলার ভূখণ্ডের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে সমুদ্রে মিশেছে। কবির মতে গঙ্গা এদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে গিয়ে আনন্দে উচ্ছল হয়েছেন এবং তাঁর পবিত্র জলের স্পর্শে এখানকার মানুষকে মুক্তিদান করেছেন। এই বাংলার বুকে রয়েছে অসংখ্য তীর্থস্থান। তাই বাংলার মানুষ নিজের জন্মস্থানেই তীর্থদর্শনের পুণ্য অর্জন করতে পারে।

কবির কল্পনায় বাংলামায়ের বাম হাতে আছে ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মীর পদ্মফুল আর তাঁর ডানদিকে মধুলোভী অসংখ্য মধুকরের আনাগোনা। বাংলার উত্তরে বরফে ঢাকা হিমালয়। পর্বতমালা সূর্যের কিরণে মায়ের মাথায় সোনার মুকুটের মতো বিমল করে। সেই মুকুট থেকে ঠিকরে পড়া আলোতে
বিশ্বচরাচর আলোকিত হয়। বাংলার দিগন্তপ্রসারী সোনালি ধানখেতকে কবি বাংলামায়ের কোলভরা সোনার ধান বলেছেন। চত্তের বুকভরা অসাম স্নেহ কারণ তিনি তাঁর সন্তান অর্থাৎ বাবাসীদের ফুলে-ফলে সমৃদ্ধিতে লালন করেন। মায়ের দেহ অতসী- অপরাজিতা ফুলে শোভিত। বাংলার দক্ষিণে
লোপসাগর অজস্র ঢেউ দিয়ে মায়ের পা ধুইয়ে দেয়। কবিও মনে হয়েছে সাগর যেন তটভূমিতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের  মাধ্যমে বাংলামাকে তার প্রণাম জানায়, ঢেউয়ের কলতানে সৃষ্টি হয় মায়ের বন্দনাগীতি। এভাবেই কবি সারা পৃথিবীর মানুষের 'বাঞ্ছিত ভূমি’ বাংলার রূপ বর্ণনা করেছেন।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্ৰবল জাতীয়তাবাদী কবি । জাতীয়তাবাদ বলতে বোঝায় স্বদেশ ও স্বজাতি বিশ্বের অন্য কোনো দেশ ও জাতির তুলনায় কোনো অংশে কম নয় বরং উন্নততর— এই বোধ। 'আমরা' কবিতাটিতে সত্যেন্দ্রনাথের এই মানসিকতারই প্রকাশ ঘটেছে।

কবিতাটির প্রথম স্তবকেই কবি তাঁর মাতৃভূমি বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা করে তাকে সারা পৃথিবীর মানুষের ‘বাঞ্ছিত' ভূমি’ বলে তাঁর স্বদেশের শ্রেষ্ঠত্বকেই প্রমাণ করতে চেয়েছেন।

পরবর্তী স্তবকগুলিতে বাঙালি জাতির গৌরবগাথা রচনা করতে গিয়ে কবি প্রথমেই শ্রীকৃষ্ণের কথা বলেছেন, যিনি বাঙালি ছিলেন না। কিন্তু বাঙালি শ্রীকৃষ্ণকে ভালোবেসে আত্মার আত্মীয় করে নিয়েছে বলেই কবি তাঁকে স্বজাতির অন্তর্ভুক্ত করতে দ্বিধা করেননি। আবার গঙ্গাসাগরে সাংখ্যদর্শন প্রণেতা
কপিলমুনির আশ্রম থাকায় কবি বাংলাকেই তাঁর কর্মভূমি বলে গর্ববোধ করেছেন।

কবি বলেছেন যে রামচন্দ্রের প্রপিতামহ রঘুর সঙ্গে বাঙালি যুদ্ধ করেছে। আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থাপত্যে পাল- সেন যুগের স্থাপত্যের প্রভাবের সূত্র ধরে কবি 'বরভূধর স্তূপ ও 'ওঙ্কার-ধাম মন্দিরকে বাঙালির তৈরি বলেছেন। এই আবেগের আতিশয্য স্বজাতির প্রতি তীব্র ভালোবাসারই প্রমাণ।

প্রাচীন যুগ থেকে তাঁর সমসাময়িক যুগ পর্যন্ত প্রায় সব কৃতী বাঙালির কৃতিত্বের উল্লেখ করে কবি আশা করেছেন আগামীদিনে বাঙালি বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান পাবে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে সত্যেন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদে অন্য দেশ বা জাতির প্রতি কোনো ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছিল না। তিনি বিশ্বাস। করতেন বাঙালি তার প্রতিভা ও কর্মপ্রচেষ্টাতেই নিজেকে বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণ করবে।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘আমরা' কবিতাটি বাংলা ও বাঙালিকে কেন্দ্র করে রচিত। কবিতার শুরুতে বাংলার রূপ বর্ণনার পরেই কবি বাঙালির গৌরবগাথা রচনা করেছেন।

জলে-জঙ্গলে পূর্ণ বাংলায় বাঙালি জাতি সাপ ও বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে। সিংহলি পুরাণ অনুসারে রাঢ় বাংলার সিংহপুরের রাজপুত্র বাঙালি বিজয়সিংহ লঙ্কা জয় করেন এবং তাঁর নামানুসারেই লঙ্কার সিংহল নামকরণ করা হয়। বাঙালি বহির্দেশীয় আক্রমণকারী মগ ও মোগলের সঙ্গেও প্রাণপণ লড়াই করেছে। বারোভুঁইয়ার অন্যতম চাঁদ রায়, প্রতাপাদিত্যকে পরাজিত করতে দিল্লির মোগল সম্রাটকে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছিল।

বাংলার গঙ্গাসাগরে কপিলমুনির আশ্রম আছে। তাই কবি ধরে নিয়েছেন তাঁর সুপ্রাচীন সাংখ্যদর্শনের রচনাভূমি এই বাংলা। বাঙালি পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও শিক্ষাবিস্তার করেন। নবদ্বীপের রঘুনাথ শিরোমণি মিথিলার পণ্ডিত পক্ষধর মিশ্রকে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে বাংলার গৌরব বৃদ্ধি করেন। বাঙালি কবি জয়দেবের লেখা কাব্য ‘গীতগোবিন্দ’ সংস্কৃত সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

স্থাপত্য-ভাস্কর্য-শিল্পকলাতেও বাঙালি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। পাল যুগের বিখ্যাত ভাস্কর ছিলেন বিটপাল ও ধীমান।  মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাঙালিকে অপূর্ব মহিমা দান করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের বাণী মুগ্ধ করেছে বিশ্ববাসীকে। বাঙালি বিজ্ঞানী
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু গাছের মধ্যে প্রাণের স্পন্দন আবিষ্কার করেছেন। ড. প্রফুল্লচন্দ্র রায় রসায়নশাস্ত্রে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বাঙালির কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় মানুষের মহামিলনের কথা বলেছেন।

সবশেষে কবি আশা প্রকাশ করেছেন যে বাঙালি একদিন তার প্রতিভা ও কর্মপ্রচেষ্টায় বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা লাভ করবে।