ত্রয়োদশ পাঠ ➤ অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান

উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি কবি জয় গোস্বামীর 'অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান" কবিতা থেকে গৃহীত। গানের মধ্যে দিয়ে অস্ত্রের আতঙ্ককে অতিক্রম করে যেতে চেয়েছেন কবি। যাবতীয় সন্ত্রাস, নৈরাজ্য এবং মানবিক অপচয় যে রক্তক্ষরণের সৃষ্টি করে, তৈরি করে দেয় যে বিপন্নতা তা থেকে কবি যুক্তি খুঁজেছেন শুধু গানকে অবলম্বন করেই। তাই কবি যখন 'গানের গায়ে' রক্ত মোছার কথা বলেন, তখন আসলে সংগীতকে অবলম্বন করে বাস্তব জীবনের সব হিংসা এবং রক্তাক্ততাকে ভুলে যেতে চান।

জয় গোস্বামীর 'অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত। যুদ্ধবাজ আগ্রাসী মানুষদের কথা বলতে গিয়েই কবি মন্তব্যটি করেছেন। কবি দেখেছেন, স্বার্থপর মানুষেরা যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠেছে। মনুষ্যত্বের অবমাননা করে তারা কারেনি স্বার্থকে প্রতিষ্ঠা দিতে সদা তৎপর। লুব্ধ চিল শকুনের মতো তারা সমাজের মাথার ওপরে ঘুরে বেড়ায় সর্বহ করায়ত্ত করার নেশায়। এই শকুন বা চিলরূপী মানুষদের বিরুদ্ধেই কবি গানের অস্ত্র ধারণ করেছেন।

কবি তাঁর মাথার ওপরে শুধুই চিল শকুনের উড়ে চলা অর্থাৎ হিংসা এবং অরাজকতার বিস্তার লক্ষ করেছেন। এরই মধ্যে একটা কাকিলা, যা কবির নিজস্ব, তা কবিকে আশাবাদী করে রাখে। কারণ সহস্র উপায়ে এই কোকিল গান বাঁধে। এখানে কোকিলটি তে পারে কবির ভেতরের সত্তা কিংবা ধ্বংসের পৃথিবীতে সৃষ্টির তারিগর। কিন্তু উল্লেখযোগ্য হল 'সহস্র উপায়ে তার গান, প্রেম বা " প্রতিবাদ বা যে ধারাতেই তৈরি হোক না কেন, তা আসলে সুন্দরেরই  প্রতিস্তা ঘটায়।

• করি বলেছেন, তার শুধু একটা কোকিল আছে। কোকিল গান বাঁধবে বলে জানিয়েছেন।

→ চিল শকুন পাখি, এদের আমরা  দেখি। কিন্তু মধুর কন্ঠের কোকিল সৌন্দর্যের প্রতীক। কোকিলের রূপক ব্যবহার করে কবি নিজেকে তুলে ধরতে হয়েছেন। যে গানকে তিনি জীবনযুদ্ধের বা করতে চেয়েছেন, বিবিধ উপায়ে সেই গান বাধবে কোকিল। তা হতে পারে প্রেম অথবা প্রতিবাদ যে কোনো ধারাতে অর্থের আঞ্চালনকে মুখ করে তা পৃথিবীতে পাখির বার্তা নিয়ে আসবে।

• জয় গোস্বামী তাঁর "অম্লের বিরুদ্ধে গান" কবিতায় মুখবাজ মানুষদের উদ্দেশে এই আহবান জানিয়েছেন। ক্ষমতা অদমত মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে হাতে তুলে নেয় আয়। আ হিংস্রতার প্রতীক। মানুষের পৃথিবীতে অম্লের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ অই সভ্যতার শেষ কথা নয়। তার বদলে गान সাম্যের আর সুন্দরের কথা বলে। তাই কবি আবর্তন করে গানকেই জীবনযুদ্ধের হাতিয়ার করতে বলেছেন। এখানে কবির মানবতাবাদী মনোভাবটিই প্রকাশিত।

উদ্ধৃত পত্তিটি কবি জয় গোস্বামীর অম্লের বিরুদ্ধে গান" কবিতা থেকে গৃহীত। গানের মধ্যে কবি অসীম ক্ষমতা লক্ষ করেছেন। এই গান বুলেটকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু গানের কোনো নির্দিষ্ট বিষয় কিংবা নির্দিষ্ট আঙ্গিক নেই। সহস্র উপায়ে গান বাঁধা হয়। সেখানে গান কখনও হয়ে যায় ঋবিবালকের মতো। ধি, সতেজ, স্বতঃস্ফূর্ত এবং আন্তরিক। গানের মধ্য দিয়ে হৃদয়ের যে উচ্ছ্বাস, নিবিড়তা ইত্যাদির প্রকাশ ঘটে সে কারণেই গানকে ঋষিবালকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

  • গানরূপী ঋষিবালকের মাথায় ময়ূর পালক গোঁজা।

• অস্ত্রের বিরুদ্ধে গানকে প্রতিরোধের হাতিয়ার করে কবি এগিয়ে যেতে চেয়েছেন। গানকে কবি ঋষিবালকের চিত্রকর হিসেবে ব্যবহার করে অন্য বার্তা দিয়েছেন। মানসিক পবিত্রতাই হিংসা দূরীকরণের একমাত্র পথ। ঋষিবালক যাবতীয় হিংস্রতা বর্জিত পবিত্রতার প্রতীক। তার মাথায় ময়ূরপালক গোঁজার মধ্যে শাশ্বত মানবপ্রেমই দ্যোতিত হয়েছে। হিংসার বিরুদ্ধে হিংসা নয়, হিংসাকে জয় করতে হবে হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা দিয়ে। উক্তিটির মধ্যে এই সত্যই প্রকাশিত।

• অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান কবিতায় কবি জয় গোস্বামী অম্লের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সংগীতের ক্ষমতার কথা বলেছেন। রাষ্ট্র হোক কিংবা কোনো সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী শক্তি-মানুষের বিক্ষোজে, প্রতিবাদেই গান হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। কবির কথায় গান শুধু আনন্দের উৎস নয়, লড়াই সংগ্রামেও গান হয়ে উঠতে পারে 'বম'। এই 'গানের বম' পরেই কবি বন্দুকের বিরুদ্ধে লড়াই এ নেমেছেন। বুলেটকে প্রতিহত করেছেন। আর সেই সংগ্রামেও কবি দেখেছেন তিনি একা নন, সহস্র মানুষ তাঁর সহযাত্রী হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কিংবা পৃথিবীর বিভিন্ন গণমুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, যুগে যুগে মানুষের প্রতিবাদের অস্ত্র হয়েছে গান। মিলিত কণ্ঠে গান হয়ে উঠেছে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ'। গান-এর এই শক্তি এবং মিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতার দিকেই কবি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

• কবি জয় গোস্বামীর কাছে কবিতা হল নানাভাবে বেঁচে থাকার যে অন্তহীন লড়াই, তার অবলম্বন। 'অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান' কবিতায় কবি উদ্যত বন্দুকের সামনে গানকে প্রতিবাদের অস্ত্র এবং বই হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। গান হয়ে উঠেছে মানব সংহতির অন্যতম ভিত্তি। শিল্প-সাহিত্যকে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে এখানে নান্দনিক প্রতিরোধ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন কবি।

* জয় গোস্বামী তাঁর 'অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান' কবিতায় দেখেছেন সন্ত্রাসের নগ্নরূপ, কিন্তু তাকে মেনে নেননি। মাথার ওপরে 'শকুন' এবং 'চিল' অর্থাৎ নেতিবাচক শক্তিকে প্রত্যক্ষ করেও ভরসা রেখেছেন নিজের শুভবোধে, যা সামাজিক নৈরাজ্য এবং ধ্বংস ও মারণ-উম্মত্ততাকে প্রতিহত করতে পারে। এই শুভবোধ এবং সৃজনশীল সত্তাকেই কবি 'একটা কোকিল' বলে অভিহিত করেছেন। ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবি সৃষ্টিকেই প্রতিরোধের উপায় করে তুলতে চেয়েছেন। সৃষ্টিশীল সত্তারই আনন্দ হল সংগীত। এই সংগীতই তার অপূর্ব আবেশের মাধ্যমে মানুষকে। পৃথিবীর যাবতীয় জ্বালা, যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়, ভুলিয়ে দেয় ওপরে নেমে আসা অম্লের অভিশাপ। যেসব যুদ্ধাপ্রয় বন্দুকবাজরা আমাতে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে চায় পৃথিবীকে, তাদের আমান হিংসার ওপরে মায়াময় এক প্রলেপ দিয়ে যায় স গানকে কবি ব্যবহার করেছেন অম্লের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে। গানের বর্ম পরে কবি অনায়াসে বুলেটকে প্রতিহত করতে পারেন। এই গানই তাকে হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত করে। তাঁকে এি যাওয়ার, উঠে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়। যাবতীয় রক্তাতারে ভুলে যেতে সাহায্য করে এই গান। এই কারণেই সহস্র উপায়ে পান বাঁধা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।

গানের হাত ধরে জয় গোস্বামীর পরিক্রমা যখন-তখন এবং অনায়া ধ্রুপদী সংগীতের দরিয়ায় নিজের অবগাহনের কথা বারেবারে স্বীকার করেছেন কবি। (গোঁসাইবাগান, ১ম খণ্ড, পূ ৫৮) 'অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান কবিতায় গানকে শুধু আনন্দ বা সুন্দরের প্রকাশ বলেই ভাবেননি কবি, তাঁর মনে হয়েছে গান হয়ে উঠতে পারে প্রতিবাদের ভাষা। অস্ত্রের সঙ্গে লড়াইয়ে মানুষে সঙ্গে সংযোগে এই গান থেকেই কবি সংগ্রহ করেছেন শক্তি এবং সাহস। দেশে দেশে, যুগে যুগে বাস্তবিকই গান হয়েছে প্রতিবাদের বিকল্প ভাষা। গানের ইতিহাসে 'প্রতিবাদের গান" নামে একটি আলাদা এবং সর্বাংশে স্বতন্ত্র সংরূপই তৈরি হয়ে গেছে। পৃথিবী জুড়ে যে-কোনো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে, অথবা, প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াইয়ে গান জুগিয়েছে অসীম শক্তি, জোট বাঁধার সাহস, মনের জোর। গানের শক্তিকে আবিষ্কার করাই শুধু নয়, তার মধ্যে প্রবল বৈচিত্ৰাও কৰি খুঁজে পেয়েছেন। গান তাই কখনো কবির করে হয়েছে ঋষিবালক—যার 'মাথায় গোঁজা ময়ূর পালক', গান তখন সহজ, নিবিড়, ধ্যানমগ্ন। আবার এই গানের সূত্রেই বিস্তার ঘটে আমাদের অভিজ্ঞতার, চেনা জগতের। শহরজীবন ছাড়িয়ে তখন প্রান্তবর্তী লোকজীবনের সুর। গানের এই বিহারের কথা প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে প্রকাশিত হয়েছে।