দশম পাঠ ⇒ আবহমান

‘আবহমান' কবিতায় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আলোচ্য পক্তিটির মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, যে অনাদি অতীতে এই বাংলার ভূখণ্ডে প্রথম মানুষরা বসবাস করতে এসেছিলেন তার কথা কোনো ইতিহাস বইয়ের পাতায় লেখা নেই। কিন্তু যিনি বা যাঁরা এখানে এসেছিলেন, তাঁরা এই সুজলা সুফলা-শস্যশ্যামলা দেশকে ভালোবেসেই এখানে বসতি গড়েছিলেন। পরম মমতায় তাঁরা এই দেশকে নিজেদের আত্মার আত্মীয় করে নিয়েছিলেন।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর 'আবহমান' কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে। মানুষের জীবনধারণের প্রাথমিক তিনটি চাহিদা হল অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান। বাস করতে মানুষ ঘরবাড়ি তৈরি করে। কিন্তু ঘর বাঁধা' কথাটি ব্যাপকতর অর্থে ব্যবহৃত = হয়। এর অর্থ শুধু ইট-কাঠ-পাথর দিয়ে বাসস্থান তৈরি করা নয়। এর ভিত তৈরি হয় স্নেহ-মমতামাখা সম্পর্কের উন্নতা দিয়ে এবং আপন করে নেওয়ার চেষ্টা থেকেই। বাংলায় আসা মানুষজনও সেভাবেই এদেশকে ভালোবেসে এখানে ঘর বেঁধেছে।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর "আবহমান' কবিতায় নগরজীবনের যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত মানুষের গ্রামজীবনের টানে ফিরে। আসার কথা বলা হয়েছে। একদা মানুষ তার গভীর ভালোবাসায়। আশ্রয় নিয়েছিল গ্রামবাংলায়। আপন করে নিয়েছিল তার আশ্রয়কে। কিন্তু গ্রামীণ সভ্যতার ভাঙন ঘটিয়ে নগরসভ্যতার = বিকাশে মানুষ শহরমুখী হয়। কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য, বিলাস, আড়ম্বরের উলটোদিকে সেখানে তৈরি হয় ব্যস্ততা, ক্লান্তি, অবসান। মানুষকে তাই বারবার শিকড়ের সন্ধানে বেঁচে থাকার তাগিদে ফিরে আসতে হয় তার ফেলে যাওয়া গ্রাম আর প্রকৃতির কাছে।

নগরসভ্যতার সৃষ্টির সঙ্গেই গ্রাম থেকে মানুষের শহরের উদ্দেশ্যে চলা এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সুখ-স্বাচ্ছ্যন্দের খোঁজে মানুষের এই চলা অবিরাম। কিন্তু ফিরে আসার প্রক্রিয়াও এর মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে থাকে। যন্ত্রসভ্যতার চাপে ক্লান্ত, অবসন্ন মানুষ চায় অবসর। তখনই সে ফিরে আসে গ্রামে। প্রকৃতির সহজ জীবনধারার সংস্পর্শে এসেই নাগরিক মানুষ পেতে চায় মুক্তির নিশ্বাস। এভাবেই অবিরাম যাওয়া-আসা চলতেই থাকে।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর 'আবহমান' কবিতায় দেখিয়েছেন যে, একদা মানুষ নিবিড় অনুরাগে ঘর বেঁধেছিল গ্রামবাংলায়। পরবর্তীকালে গ্রামসভ্যতার সমৃদ্ধি নষ্ট হয়ে যায়। নাগরিক সভ্যতার আগ্রাসনে। কিন্তু প্রকৃতি সেখানে নিজের হাতে একইভাবে সাজিয়ে রাখে, জীবন বয়ে চলে স্বচ্ছন্দ সহজ গতিতে। আর শহরের ক্লান্ত মানুষেরা শান্তির খোঁজে বারবার ফিরে আসে তার কাছে। নটে গাছটা বুড়িয়ে ওঠে; কিন্তু 'মুড়য় না' অর্থাৎ তার গ্রহণযোগ্যতা শেষ হয় না।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর 'আবহমান' কবিতায় সৌন্দর্যের জন্য যে মানুষের মধ্যে আকুলতা দেখা যায়, তাকেই 'একগুঁয়ে' বলা হয়েছে। 'একগুঁয়ে মানুষটির মধ্যে রয়েছে প্রকৃতি এবং গ্রামজীবনের কাছে ফিরে আসার আকর্ষণ। এই ফিরে আসার ইচ্ছাকেই কবি 'দুরন্ত পিপাসা' বলেছেন।

একদা গ্রামজীবনকে নিবিড়ভাবে ভালোবেসে মানুষ তার বসতি তৈরি করেছিল। নিজের মতো করে গড়ে তুলেছিল জীবনের ছন্দ। বাংলার মাটিকে, হাওয়াকে ভালোবেসে তারা ঘর বেঁধেছিল। উঠোনের লাউমাচায় ছোট ফুল ছিল সেই সযত্নলালিত জীবনের প্রতীক। পরবর্তীকালে নগরসভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য এবং সুখের সন্ধানে মানুষ শহরমুখী হয়। কিন্তু শহরজীবন তাকে বিত্ত-বৈভবের অধিকারী করলেও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সন্ধান দিতে পারে না। ক্লান্তি আর অবসন্নতা ঘিরে ধরে তাকে। যন্ত্রসভ্যতার দমবন্ধ করা চাপে হাঁপিয়ে ওঠে মানুষ। এখান থেকে তার মধ্যে তীব্র হয় ফিরে আসার আর্তি। গ্রামজীবনের সারল্য আর প্রকৃতির সহজতা তার মধ্যে এই ফিরে আসার আকর্ষণ তৈরি করে। মাটিকে, হাওয়াকে ভালোবেসে ফিরে আসা তাই চলতেই থাকে। সারাদিন আপন মনে ঘাসের গন্ধ মেখে আর সারারাত তারায় তারায় স্বপ্ন এঁকে প্রকৃতির কাছে ফিরে আমার যে আকাঙ্ক্ষা, তা মানুষের মনে চিরকালীন, কখনোই ফুরোয় না।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর 'আবহমান' কবিতায় প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য মানুষের চিরকালীন আকাঙ্ক্ষা তা না ফুরোনোর কথা বলা হয়েছে।

অনেক বছর আগে মানুষ যখন গ্রামবাংলায় এসেছিল এবং ঘর বেঁধেছিল—তার সেই চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ছিল গভীর ভালোবাসা। এদেশের মাটি, বাতাসের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেছিল সে। শুধুই আশ্রয় নয়, তার কাছে স্বদেশ এবং স্বভূমি ছিল আবার কখন। কিন্তু পরবর্তীকালে গ্রামসভ্যতার গৌরব অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। মানুষ ক্রমশ শহরমুখী হয়েছে। নগরসভ্যতার সুযোগসুবিধা, স্বাচ্ছন্দ্য তাকে আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু শহরজীবনে মানুষ সমৃদ্ধি পেলেও শান্তি পায়নি। বরং যন্ত্রসভ্যতার ক্রমাগত চাপে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এখানেই তার আশ্রয় হয়ে ওঠে বাংলার প্রকৃতি আর সেই প্রকৃতির ছন্দে গাঁথা জীবন। একদা যে মানুষ ভালোবেসে তার ঘর বেঁধেছিল গ্রামবাংলায়, তার উত্তর-প্রজন্মের মধ্য দিয়ে সে যেন আবার ফিরে আসে এই প্রকৃতিলালিত জীবনে—যখনই সুযোগ পায়। তার আগমনের পটভূমি তৈরি করে রাখে উঠোনের লাউমাচা, সন্ধ্যার বাতাসে দুলতে থাকা ছোট ফুল। একগুঁয়ে মানুষের দুরন্ত পিপাসা যেভাবে তাকে বারেবারে এনে ফেলে পুরোনো জীবনের চেনা ছন্দে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই কবির মনে হয়েছে কোনো কিছুই শেষ হয়ে যায় না। বাগানের কুন্দফুলের হাসি থেকে সূর্য ওঠা, ছায়া নামা, সন্ধ্যাবেলা নদীর বাতাসের বয়ে চলা—কিছুই শেষ হয় না, যেমন শেষ হয় না সেই প্রকৃতির কাছে ফিরে আসার জন্য মানুষের আকুলতার।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর 'আবহমান' কবিতায় গ্রামবাংলার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে। দরিদ্র মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তার দারিদ্র্যের যন্ত্রণা আর দুঃখময়তাকে বহন করে চলে, তাই তা কখনোই নেভে না বা শেষ হয় না।

গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রাম অত্যন্ত কঠোর। অভাব-অনটন-দৈন্য তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। মোটা ভাত-কাপড়টুকুর সংস্থান করতেও তাদের উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হয়। যুগ যুগ ধরে গ্রামবাংলার মানুষের এই জীবনছবির কোনো পরিবর্তন হয় না। দরিদ্র মানুষকে যে শুধু দারিদ্র্যের সঙ্গেই লড়াই করতে হয় তা নয়, তাদের উপর সামাজিক শোষণ এবং অত্যাচারও চলে সীমাহীনভাবে। তাই তাদের জীবনে দুঃখদুর্দশা কখনও পুরোনো অর্থাৎ বাসি হয় না। তাদের বাগানে কুন্দফুলের হাসি যেমন সত্য তেমনি সত্য এই যন্ত্রণা আর দুঃখের রোজকার জীবন। প্রতিদিন তাদের জীবনে নিত্যনতুন বা টাটকা দুঃখের অফুরন্ত জোগান থাকে। এক দুঃখের রাত ভোর হলে তারা আর একটি দুঃখের দিনকে প্রত্যক্ষ করে। এই দুঃখময় জীবনের পথ চলা তাই কখনোই শেষ হয় না।