দশম পাঠ ➤ পথের দাবী

নির্মটবাবু বাঙালি পুলিশ অফিসার। অথচ তিনি তাঁরই দেশের স্বাধীনতাযোদ্ধা সব্যসাচীকে ধরবেন বলে সুদূর রেঙ্গুনে এসেছেন।কিন্তু তাঁর অনুসন্ধানের দক্ষতা নিয়ে সে ব্যঙ্গ করেছে। কারণ সব্যসাচীকে তিনি ধরতে পারেন নি। ধরতে না পারাটাই অপূর্বর অভিপ্রেত বাসনা। কিন্তু বাঙালি হয়েও নিমাই বাবুরা বিট্রিশের দাসত্ব করেছেন-এটাতেই তার আপত্তি | অপূর্বর এই কথা শুনে রামদাস-একটু শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কারণ ইংরেজদের পুলিশ সম্পর্কে এরূপ মন্তব্য করা উচিত বলে তার মনে হয়নি। তাই সে একটু গম্ভীর হয়ে বসেছিল। অপূর্ব রামসাদের মুখ দেখে সেটাই বুঝেছিল।

★ বাঙালি পুলিশ অফিসার নিমাইবাবু হলেন বক্তা অপূর্বের বাবার বন্ধু।
• নিমাইবাবু বাঙালি। ইংরেজেদের অধীনে তিনি চাকরি করেন।বাঙালি তথা ভারতবাসী হয়েও তিনি স্বদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী সব্যসাচীকে গ্রেপ্তার করতে তৎপর হয়েছেন। নিমাইবাবুর এই কার্যকলাপ অপূর্ব মেনে নিয়ে পারেনি। নিজের দেশের যুক্ত সংগ্রামীকে গ্রেফতার করার তৎপরতা দেখে অপূর্ব আন্তরিকভাবে বেদনাহত হয়েছে। এই কারণেই সে নিমাইবাবুকে নিয়ে লজ্জা প্রকাশ করেছে।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পথের দাবী' উপন্যাসের থেকে গৃহীত। বাংলাদেশের ছেলে অপূর্ব রেঙ্গুনে
অবস্থানকালে ফিরিপি ও অন্যদের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছিল। সেই নিগ্রহের কথা বলতে গিয়েই আলোচ্য উক্তিটির অবতারণা।

অপূব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বাঙালি
সন্তান যে রেঙ্গুনে এসেছে। কিন্তু সেখানে একদিন না
ফিরিঙ্গি ছেলে তাকে লাথি মেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দেয়।
স্টেশনে থাকা কোনো ভারতীয়ই এই ঘটনার প্রতিবাদ করেনি।অপূর্বর হাড়গাজর খুব একটা ভাঙেনি জেনে তারা অতি বোধ করেছে। এর প্রতিবাদ জানাতে গেলে স্টেশনমাস্টার তাকে ভারতীয় বলে কুকুরের মতো বের করে দিয়েছিলেন। বিনা দোমে এই অত্যাচার সহ্য করে এক অন্যত্ত বেদনা তার বুকের মধ্যে মনে
ওঠে। তাই রামদাসের কাছে যে বলেছে, “তার লাঞ্ছনা এই কালো চামড়ার নীচে কম জ্বলে না তলয়ারকর।" অপূর্ব শিক্ষিত, সভ্য,বিচক্ষ যুবক। নিরুপদর স্বভাবের হলেও অকারণে অত্যাচারকে সে
সমর্থন করতে পারে না। শাসক ইংরেজদের বর্বরোচিত এই আচরণ সমস্ত স্তরের দেশবাসীকেই সহ্য করতে হচ্ছে বুঝে অপূর্ব তা অনুভব করেছে। আলোচ্য উত্তিটি তার সেই অব্যক্ত বেদনার
প্রকাশমাত্র।

> শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পথের দাবী' উপন্যাসের থেকে গৃহীত আমাদের পাঠ্যাংশে অপূর্ব এই মন্তব্যটি করেছে। অপূর্বর বাড়ির ওপরের তলায় যে ক্রিশ্চান মেয়েটি থাকত তার সম্বন্ধে এই কথাটি বলা হয়েছে। অপূর্বর অনুপস্থিতিতে তার ঘরে একদিন চুরি হয়ে
গিয়েছিল। ক্রিশ্চান মেয়েটির কৃপায় টাকাকড়ি ছাড়া বাকি সমস্ত কিছু চুরি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে | ক্রিশ্চান মেয়েটি নিজে চোরকে তাড়িয়ে অপূর্বর ঘর তালাবদ্ধ করে দেয়। অপূর্ব না ফেরা
পর্যন্ত অপেক্ষা করে, অপূর্ব ফেরার পর সে নিজে চাবি দিয়ে তার ঘর খুলে অনাহূতের মতো তার ঘরে যা কিছু ছড়ানো জিনিসপত্র ছিল সেগুলো সব নিজের হাতে গুছিয়ে দেয়। কী চুরি গেছে আর কী কী
জিনিস চুরি যায়নি তার এমন নিখুঁত হিসেব সে বানিয়েছিল যে, এই সমস্তকিছু দেখে অপূর্বর মনে হয়েছিল একজন পাস করা অ্যাকাউন্টেন্টের পক্ষেও তা বিস্ময়কর। অন্যের জন্য নিজের সবটুকু দিয়ে কীভাবে সাহায্য করা যায় তা এই মেয়েটিকে না
দেখলে অপূর্ব বুঝতেও পারত না। সবকিছু দেখে অপূর্বর তাকে একজন প্রকৃত বন্ধু বলেই মনে হয়েছিল। মেয়েটির প্রখর বুদ্ধি আর সব দিকে আদ্ভুত ত্রিব্র ভাবে আলোচনা করা ছিল ।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পথের দাবী' পাংশে অপূর্ব যেন থেকে ভাষো নগরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। অপূর্ব প্রথম শ্রেণির যাত্রী ছিল। সংখ্যা হলে সে প্রতিদিন নিয়ম করে যা করে সেসবই করেছিল। রাতের খাওয়ার পর অপূর্ব যখন শুতে যায় তখন যে ভেবেছিল প্রথম শ্রেণির যাত্রী হয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাকি রাস্তাটা যেতে পারবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারে এই ধারণা সেই রাতে পুলিশের লোক এসে বার তিনেক তার মুখ অভিয়ে নাম, ঠিকানা লিখে নিয়ে যায়। অবশেষে বিরক্ত হয়ে অপূর্ব এই ঘটনার প্রতিবাদ করলে বর্ষা সাব-ইনস্পেক্টর কটুকণ্ঠে তাকে বলে যে, সে ইউরোপিয়ান নয়, তাই এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এই কথা শুনে অপূর্ব, তাকে বলে, সে প্রথম শ্রেণির যাত্রী। তাই কেউ তার ঘুমের বিঘ্ন ঘটাতে পারে না। তার কথায় পুলিশ হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিল এইসব নিয়ম শুধুমাত্র রেলওয়ে কর্মচারীদের জন্য। তাই পুলিশ যদি ইচ্ছে করে তাহলে তাকে ট্রেন থেকে নামিয়েও দিতে পারে, তার প্রতিবাদ করার কোনো অধিকার নেই। পরাধীন ভারতবর্ষে ইংরেজদের হাতে অপমান, লাঞ্ছনার আর একটি ঘটনা একাে সংযোজিত হয় অপূর্বর অভিজ্ঞতায়।

• শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পথের দাবী' পাংশে দুটি ঘটনা দেখি যেখানে ইংরেজরা অপূর্বকে অপমান করেছে।

একবার অপূর্বকে বিনা দোখে দণ্ডভোগ করতে হয়েছে। স্টেশনে একবার কিছু ফিরিঙ্গি ছেলে কোনো দোষ ছাড়াই লাখি মেরে তাকে প্ল্যাটফর্ম থেকে বার করে দেয়। অপূর্ব যখন সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যায় তখন সাহেব স্টেশনমাস্টার তাকে শুধু ভারতীয় বলে অপমান করে কুকুরের মতো দূর করে দেয়। নিজের দেশে এইভাবে লাঞ্ছনার দুঃখ অপূর্ব কোনোদিন ভুলতে পারেনি।আর একবার রেলপথে অপূর্ব রেঙ্গুন থেকে ভালো নগরের উদ্দেশে যাত্রা করছিল। অপূর্ব ছিল প্রথম শ্রেণির যাত্রী। সারাদিনের সমস্ত কাজকর্ম শেষ করে অপূর্ব ভেবেছিল প্রথম শ্রেণির যাত্রী হওয়ায় শান্তিতে ঘুমোবে। কিন্তু তার সে ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। বারংবার পুলিশের লোক এসে অপূর্বর ঘুম ভাঙিয়ে তার নাম ঠিকানা লিখে নিয়ে যায়। একবার সে বিরত হয়ে প্রতিবাদ করলে সাব ইনস্পেক্টর তাকে কটুকণ্ঠে বলে যে, এসব তাকে সহ্য করতেই হবে কারণ সে ইউরোপিয়ান নয়। অপূর্ব যখন বলে সে প্রথম শ্রেণির যাত্রী, তার সঙ্গে এইরকম কিছু করা অনুচিত, তখন ইনস্পেক্টর জবাব দেয়, এই সমস্ত নিয়ম রেলের কর্মচারীর জন্য তার জন্য নয়। এইভাবেই শুধুমাত্র ভারতীয় বলে তাকে অপমানিত হতে হয়েছিল।