দ্বাদশ পাঠ ⇒ চিঠি

বিষয়বস্তু অনুসারে চিঠিকে নানা শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে প্রধান দুটি ভাগ হল ব্যক্তিগত পত্র ও সামাজিক পত্র। পাঠ্য চিঠিটি একজন ব্যক্তি স্বামী বিবেকানন্দ মিস নোবলের উদ্দেশ্যে লিখেছেন। সেদিক থেকে এই চিঠিকে ব্যক্তিগত পত্র বলাই যায়। কিন্তু সব চিঠিই ব্যক্তির সঙ্গে কোনো-না- কোনোভাবে সম্পর্কিত। যে চিঠিতে ব্যক্তিগত খবরাখবর বা তথ্যাদি প্রাধান্য পায়, মূলত তাকেই ব্যক্তিগত চিঠি বলা হয়। স্বামীজির এই চিঠিটি ব্যক্তিগত স্তর অতিক্রম করে সামাজিক স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে। এই চিঠিতে উনিশ শতকীয় ভারত ও তার দুর্দশাময় সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে। মানবসেবার
বৃহত্তর স্বার্থে এ চিঠি লিখিত, ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়।

ভারতীয় সমাজে মানবসেবার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে মিস নোবল এদেশে আসতে চান। একথা জেনে স্বামীজি তাকে এদেশের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতটি বোঝানোর  জন্য এ চিঠি লিখেছেন। ভারতীয়দের দাসত্ব, দুঃখদারিদ্র্য, কুসংস্কার,বর্ণবৈষম্য, অস্পৃশ্যতার কথা স্বামীজি মিস নোবেলকে জানিয়েছেন। শ্বেতাঙ্গদের প্রতি ভারতবাসীর মনোভাব, এখানকার আবহাওয়া ইত্যাদি সম্পর্কেও আগাম ধারণা দিতে চেয়েছেন তিনি। এ চিঠিতে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কথা নেই, আছে সমষ্টির দুঃখ এবং দুঃখ-মুক্তির পথ সন্ধানের প্রসঙ্গ। তাই আলোচ্য 'চিঠি 'কে সামাজিক পত্ররূপে গ্রহণ করাই যথাযথ।

পাঠ্য 'চিঠি'র লেখক স্বামী বিবেকানন্দ এবং প্রাপক মিস নোবল—উভয়েই ঐতিহাসিক ব্যক্তি। দুজনেই ভারতের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছিলেন এবং মানবসভ্যতার ইতিহাসে অমূল্য অবদান রেখে গেছেন। অন্যদিকে, উনিশ শতকের শেষভাগে ভারতবাসীর জীবনযাত্রা, মানুষের বিশ্বাস-ধারণা, দুঃখ- বেদনা ইত্যাদির উল্লেখে একটি বিশেষ সময়ের পরিচয় আলোচ্য চিঠি থেকে পাওয়া যায়। তাই 'চিঠি'-কে একটি ঐতিহাসিক দলিলরূপে গ্রহণ করা যায়।

পক্ষান্তরে, যে দুর্দশাগ্রস্ত ভারতে মানবসেবার ব্রত নিয়ে মিস নোব্‌ল্ আসতে চান তার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতটি এই চিঠিতে বর্ণিত হয়েছে। চিঠিতে স্বামীজি নোলকে জানিয়েছেন এদেশের দুঃখ, কুসংস্কার, দাসত্ব প্রভৃতির শিকড় অনেক গভীরে গাঁথা। জাতি-বর্ণের বৈষম্য, অস্পৃশ্যতা ভারতীয়
জনজীবনের অভিশাপ স্বরূপ। অন্নবস্ত্রের অভাবে এদেশের অসংখ্য নরনারী অর্ধ-ভুক্ত, অর্ধ-উলঙ্গ। নারীদের শিক্ষার সুযোগ নেই। তার ওপর রয়েছে ইংরেজ শাসকদের শোষণ- অত্যাচার। ভারতীয়রা শ্বেতাঙ্গদের ভয় এবং ঘৃণা করে। শ্বেতাঙ্গরাও ঘৃণার চোখে দেখে এদেশের মানুষকে। এমনই সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে মিস নোব্‌ল্‌কে মানবসেবার কাজ করতে হবে।

সুতরাং আলোচ্য ‘চিঠি’-কে উনিশ শতকীয় ভারতের একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক দলিলরূপে চিহ্নিত করাই যায়।

স্বামী বিবেকানন্দের লেখা পাঠ্য ‘চিঠি’তে তাঁর চরিত্রের নানা বৈশিষ্ট্যকেই লক্ষ করা যায়।

দূরদর্শিতা : মিস নোবল যে ভারতের, বিশেষত ভারতীয় নারীসমাজের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবেন,  তা স্বামীজি বুঝেছিলেন এবং এই কারণে তাঁকে ভারতে স্বাগত জানিয়েছেন।

বিচক্ষণতা: ভারতের জলবায়ু, সমাজকেন্দ্রিক নানা সমস্যা যে ইংল্যান্ডের থেকে আলাদা এবং নানা বাধাবিপত্তির মধ্যে মিস নোবলকে কাজ করতে হবে, সে বিষয়ে তাঁকে স্বামীজি আগে থেকে সচেতন করেছেন। পরোক্ষে কর্মে ঝাপ দেবার আগে মানসিকভাবে দৃঢ় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

স্নেহশীলতা ও উদারতা: ভারতের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে মিস নোবল স্বামীজির সাহায্য পাবেন এবং এদেশের জন্য কাজ না করলেও বা বেদান্ত ধর্ম ত্যাগ করলেও আমরণ তিনি নোবলের পাশে থাকবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

নারীজাতির প্রতি সম্মান: নিপীড়িত ভারতীয় নারীদের শিক্ষা ও উন্নতির চিন্তা, মিস মুলারকে 'চমৎকার মহিলা' বলা এবং মিসেস সেভিয়ারকে 'নারীকুলের রত্নবিশেষ' বলে অভিহিত করার মধ্যে নারীজাতির প্রতি স্বামীজির সম্মানবোধ প্রকাশ পায়।

সমাজচেতনা ও স্বদেশপ্রীতি: প্রখরভাবে সমাজসচেতন স্বামীজি এদেশের সামাজিক ব্যাধিগুলিতে বিচলিত হয়েছেন। ইংরেজ কুশাসনের পাশাপাশি দুঃখদারিদ্র্য, কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা ইত্যাদি থেকে তিনি ভারতবাসীকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন।

মিস্টার স্টার্ডির চিঠি থেকে স্বামী বিবেকানন্দ যখন জেনেছেন মিস নোব্‌ল্ ভারতে আসতে এবং এদেশের জন্য কাজ করতে দৃঢ়সংকল্প তখন তিনি তাঁকে প্রয়োজনীয় কতকগুলো তথ্য ও উপদেশ দিয়েছেন। ইউরোপ বা আমেরিকার পরিবেশের তুলনায় ভারতের সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিবেশ
সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। তাই সরাসরি মিস নোবলকে চিঠি লিখে স্বামীজি তাঁকে এদেশের মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক সমস্যা, বাধাবিঘ্ন আর জলবায়ু সম্পর্কে সচেতন করেছেন এবং নিজের পায়ে দাঁড়াবার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে স্বামীজির বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, স্বামীজির উদারতা প্রকাশ পায় যখন তিনি মিস নোব্‌ল্‌কে লেখেন যে, মিস নোব্‌ল্ ভারতবর্ষের জন্য কাজ করুন বা না করুন এবং বেদান্ত ধর্ম গ্রহণ করুন বা ত্যাগ করুন, স্বামীজি তাঁকে আজীবন সাহায্য করে যাবেন। আবার, মিস মুলারের স্বভাবের কিছু ত্রুটির কথা জেনেও স্বামীজি তাঁর সহৃদয়তার প্রশংসা করেছেন। মিসেস সেভিয়ারকে ‘নারীকুলের রত্নবিশেষ’, ‘ভালো’, ‘স্নেহময়ী' বলে উল্লেখ করে তাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য তিনি নোলকে পরামর্শ দিয়েছেন। দীর্ঘ যাত্রাপথের একঘেয়েমি দূর করার জন্য স্বামীজি মিস ম্যাকলাউড ও মিসেস বুলের সহযাত্রী হয়ে নোবলকে ভারতে আসার পরামর্শ দিয়েছেন। এসব ভাবনা ও সুপরামর্শের মধ্য দিয়ে স্বামীজির উদারতার পরিচয়টি স্পষ্ট হয়েছে।