দ্বিতীয় অধ্যায় ➤ জীবন সংগঠনের স্তর

কার্বোহাইড্রেটের প্রধান উৎস হল উদ্ভিজ্জ পদার্থ। যেমন— চাল, গম, ভুট্টা, আলু, বিট ইত্যাদি থেকে শ্বেতসার বা স্টার্চ; আঙুর, আপেল, খেজুর, খেজুরের রস, তালের রস, আখের রস ইত্যাদি থেকে গ্লুকোজ; শাকসবজি, তরমুজ, বেল ইত্যাদি থেকে সেলুলোজ; আম, পাকা কলা, কমলালেবু ইত্যাদি থেকে ফ্রুক্টোজ; গুড়, চিনি, মিছরি ইত্যাদি থেকে ইক্ষু শর্করা বা সুক্রোজ পাওয়া যায়। কিছু কিছু কার্বোহাইড্রেট প্রাণীজ উৎস থেকেও পাওয়া যায়, যেমন— পাঠার যকৃৎ ও পেশি থেকে পাওয়া যায় গ্লাইকোজেন।

চিনি—কার্বোহাইড্রেটের একটি উৎস।

 

একশর্করা বা মনোস্যাকারাইড হল সরলতম শর্করা। অর্থাৎ, এই জাতীয় শর্করাকে বিশ্লিষ্ট করলে কোনো শর্করাধর্মী যৌগ অবশিষ্ট থাকে না। এটি হল দুই বা ততোধিক হাইড্রক্সিল মূলকবিশিষ্ট অ্যালডিহাইড অথবা কিটোন-জাতীয় যৌগ। যেমন—গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, গ্যালাকটোজ ইত্যাদি।

> দুই থেকে নয়টি মনোস্যাকারাইড বা একশর্করার সমন্বয়ে গঠিত কার্বোহাইড্রেটকে অলিগোস্যাকারাইড বা স্বল্পর্শকরা বলে। যেমন—ল্যাকটোজ, মলটোজ, র‍্যাফিনোজ ইত্যাদি।

 

দুটি মনোস্যাকারাইড একশর্করা পরস্পর যুক্ত হয়ে এবং এক অণু জল মুক্ত হয়ে যে কার্বোহাইড্রেট গঠিত হয়, তাকে ডাইস্যাকারাইড বা দ্বিশর্করা বলে। যেমন—ল্যাকটোজ, সুক্রোজ, মলটোজ ইত্যাদি।

 

দশ বা দশের অধিক মনোস্যাকারাইড বা একশর্করার সমন্বয়ে গঠিত কার্বোহাইড্রেটকে পলিস্যাকারাইড বা বহুশর্করা বলে। যেমন—শ্বেতসার, গ্লাইকোজেন, ডেক্সট্রিন, ইনিউলিন ইত্যাদি।

যেসব কার্বোহাইড্রেটে বিজারণধর্মী মূলকগুলি মুক্ত অবস্থায় থাকায় সেগুলি বেনেডিক্ট-এর বিকারককে বিজারিত করতে পারে, তাদের বিজারণধর্মী কার্বোহাইড্রেট বলে। যেমন—গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, মলটোজ ইত্যাদি।

যেসব কার্বোহাইড্রেটে বিজারণধর্মী মূলকগুলি মুক্ত অবস্থায় না থাকায় তারা বেনেডিক্ট-এর বিকারককে বিজারিত করতে পারে না, তাদের অবিজারণধর্মী কার্বোহাইড্রেট বলে। যেমন— সুক্রোজ, শ্বেতসার, গ্লাইকোজেন ইত্যাদি।

 

খাদ্যতালিকায় উপযুক্ত পরিমাণে শ্বেতসার উপস্থিত থাকলে তা শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। প্রোটিনজাতীয় খাদ্যগ্রহণ না করেও শুধুমাত্র শ্বেতসারজাতীয় খাদ্য গ্রহণ করে মানুষ সুস্থ শরীরে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। তাই একে 'প্রোটিন বাঁচোয়া’, ‘প্রোটিন বিকল্প' বা 'প্রোটিন স্পেয়ারিং' খাদ্য বলে।

কার্বন পরমাণুর সংখ্যার ভিত্তিতে মনোস্যাকারাইডের শ্রেণিবিভাগ-

কার্বন পরমাণুর সংখ্যার তারতম্যের ভিত্তিতে একশর্করা বিভিন্ন প্রকারের হয়। এগুলি হল-

[1] ট্রায়োজ এটিতে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা তিন। যথা—মিসারালডিহাইড। [2] টেট্রোজ : এটিতে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা চার। যথা—এরিথ্রোজ। [3] পেন্টোজ: এটিতে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা পাঁচ। যথা— রাইবোজ। [4] হেক্সোজ : এটিতে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা ছয়। যথা- গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ। [5] হেপ্টোজ  : এটিতে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা সাত। যথা— সেডোহেপটিউলোজ।

মনোস্যাকারাইডের ধর্ম -

এল শর্করার ধর্মগুলি হল— [1] এদের বিশ্লিষ্ট করে কোনো সরলতর কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যায় না। [2] এরা বর্ণহীন কেলাসিত গ। [3] এরা অ্যালকোহল প্রভৃতির সঙ্গে বিক্রিয়া করে মাইকোসাইড বন্ধন গঠন করে। [4] এদের অণুতে মুক্ত অ্যালডিহাইড কিটোন গ্রুপ থাকায়, এরা সাধারণত বিজারণধর্মী হয়। [5] এরা ক্ষারের সঙ্গে বিক্রিয়ায় এনেডিয়লজাতীয় যৌগ গঠন করে।

কার্বোহাইড্রেটের ধর্ম-

[1] কার্বোহাইড্রেট বর্ণহীন, জলে দ্রাব্য যৌগ। সরল শর্করা ও দ্বি-শর্করা স্বাদে মিষ্ট হয়। [2] রাসায়নিকভাবে এগুলি পলিহাইড্রিক কোহলজাত যৌগ। [3] অ্যালকোহল গ্রুপ যুক্ত থাকায় কার্বোহাইড্রেট সহজেই অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে এস্টার গঠন পারে। [4] অ্যালডিহাইড এবং কিটোন গ্রুপের উপস্থিতির কারণে কার্বোহাইড্রেট বিজারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। [5] অপ্রতিসম কার্বন পরমাণুর উপস্থিতির জন্য একশ করাগুলি বিভিন্ন ধরনের আইসোমাররূপে অবস্থান করে।[6] কার্বোহাইড্রেটের গঠন যেমন সরল শৃঙ্খলাকারের হয়, তেমনি এরা বলয়াকারেও থাকতে পারে। [7]সাধারন একশর্করাগুলি ছত্রাকের দ্বারা সন্ধান ক্রিয়ার ফলে কার্বন ডাই আক্সাইড এবং ইথাইল অ্যালকোহল উৎপন্ন করে।

 

কার্বোহাইডেটের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি

খাদ্যে গৃহীত কার্বোহাইড্রেট দেহে নিম্নলিখিত কার্যাবলিতে অংশগ্রহণ করে পুরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

[1] শক্তি সরবরাহ: কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাদ্যের প্রধান কাজ হল বিভিন্ন জৈবিক ক্রিয়াকলাপের জন্য তাপশক্তি সরবরাহ করা। কার্বোহাইড্রেটের ক্যালোরি মুলা 4.1 kcal /g । প্রতি গ্রাম কার্বোহাইড্রেটের কারণে 4.1 kcal শক্তি মুক্ত হয়।

[2] দেহের শক্তিসায় ডান্ডার গঠন: খাদ্যের সঙ্গে গৃহীত প্রয়োজনারি কার্বোহাইড্রেট যকৃতে এবং পেশিতে মাইকোজেনবুর্গে এবং দেহের মেলায় ও কৃতে ফ্যাটে পরিণত হয়ে ভবিষ্যতের ব্যবহারের জন্য শক্তির সময় ভাণ্ডার গঠন করে।

[3] প্রোটিনের চাহিদা হ্রাস: প্রাণীদেহে কার্বোহাইড্রেটের বিপাক সব বন্ধুসমূহ থেকে কতকগুলি অপ্রয়োজনীয় অ্যাি অ্যাসিডের হাইড্রোকার্বন কাঠানো গঠিত হতে পারে। এ ছাড়া ে মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করলে দেহে প্রোটিনের অপচিতিমূলক বিপাক কম হয়। এই কারণে রে কার্বোহাইড্রেট দেহে প্রোটিনের চাহিদা কমায়।

[4] কিটোসিস প্রতিরোধ : খাদ্যে কার্বোহাইড্রেটের ঘাটতি দেখা দিলে দেহে ফ্যাটের ভাঙন বেড়ে যায়। ফ্যাটের ভাঙনের ফলে দেহে কিটোনবডি উৎপন্ন হয় এবং কিটোনবডির আধিক্যজনিত রোগ তথা কিটোসিস দেখা দেয়। উপযুক্ত পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট কিটোসিস রোগ প্রতিরোধ করে।

[5] মস্তিষ্কের বিকাশ: ল্যাকটোজ নামক বিশর্করা থেকে উৎপন্ন গ্যালাকটোজ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

[6] মলের বহিষ্করণ : শাকসবজিতে উপস্থিত সেলুলোজ নামক কার্বোহাইড্রেট খাদ্যতন্তু হিসেবে গৃহীত হয় ও মল গঠন করে। এটি রাফেজ (roughage) হিসেবে পরিপাকতন্ত্রের আশ্বিক জনসংকোচনে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে।

[7] সংশ্লেষ ক্রিয়া: মানবদেহে বিপাকক্রিয়ায় কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাদ্য থেকে জৈব অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড, অ্যামিনো অ্যাসিড প্রভৃতি উৎপন্ন হয়। ওই সমস্ত অ্যাসিড প্রোটিন সংশ্লেষে এবং চর্বিজাতীয় পদার্থ সংশ্লেষে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

[৪] ভিটামিনের চাহিদাপূরণ : কার্বোহাইড্রেটের উপস্থিতিতে একপ্রকার জীবাণু মানুষের অস্ত্রে ভিটামিন K এবং ভিটামিন B কমপ্লেক্স উৎপন্ন করে। ফলে দেহে ওইসব ভিটামিনের চাহিদা কিছুটা পূরণ হয়।

 

কমপক্ষে একটি অ্যামিনো (— NH2) মূলক এবং একটি কার্বক্সিল (—COOH) মূলক নিয়ে গঠিত যে জৈব অ্যাসিড প্রোটিন অণুর গঠনগত একক হিসেবে কাজ করে, তাকে অ্যামাইনো বা অ্যামিনো অ্যাসিড বলে। উদাহরণ—মিথায়োনিন, সেরিন ইত্যাদি।

অ্যামিনো অ্যাসিডের কাজ

(1) দেহগঠন: অ্যামিনো অ্যাসিড জীবদেহের কোশের প্রোটোপ্লাজন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অ্যামিনো অ্যাসিড। বিভিন্ন প্রকার গঠনধর্মী প্রোটিন, যেমন— ইলাস্টিন, কেরাটিন প্রভৃতি গঠনে অংশ নেয়।

[2] দেহের রাসায়নিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ: অ্যামিনো অ্যাসিড উৎসেচক গঠনে অংশ নেয়। আবার উৎসেচক আমাদের দেহের নানা প্রকার শারীরবৃত্তীয় এবং জৈবিক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।

[3] হিমোগ্লোবিন গঠন: অ্যামিনো অ্যাসিড আমাদের রক্তে অবস্থিত বাহক প্রোটিন (হিমোগ্লোবিন)-এর গঠনে অংশ নেয়। হিমোমোবিন অক্সিজেন এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিবহণে সাহায্য করে। সেই অর্থে অ্যামিনো অ্যাসিড পরোক্ষভাবে গ্যাসটি পরিবহণে অংশ নেয়।

[4] হরমোন উৎপাদনঃ অ্যামিনো অ্যাসিড বিভিন্ন প্রকার হরমোন, যেমন— ACTH, ইনসুলিন ইত্যাদি উৎপাদনে অংশ নেয়।

[5] রোগ প্রতিরোধঃ আমাদের দেহে অ্যান্টিবডি নামক এক প্রকার প্রোটিনজাতীয় পদার্থ সৃষ্টি হয়, যা রোগজীবাণুর আক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করে।

[6] নাইট্রোজেন সঞ্চয়: অ্যামিনো অ্যাসিড অ্যামাইড-রূপে দেহে নাইট্রোজেন সম্বয়ে সাহায্য করে।

[7] গ্লুকোজ উৎপাদন: অ্যামিনো অ্যাসিড নিওগ্লুকোজেনেসিস পদ্ধতির দ্বারা অ্যামিনো গ্রুপ ত্যাগ করে গ্লুকোজ তৈরি করে।

 

 

প্রোটিনের রাসায়নিক গঠন

[1] প্রোটিন একপ্রকার জটিল নাইট্রোজেন মাটিত জৈব যৌগ। প্রোটিনে নাইট্রোজেন ছাড়াও কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং কখনো কখনো সালফার ও ফসফরাস থাকে। [2] প্রোটিনের মৌলিক উপাদানগুলির শতকরা পরিমাণ হল -কার্বন 54 ভাগ (C=54%), হাইড্রোজেন 7 ভাগ ( H=7%), নাইট্রোজেন 16 ভাগ (N 16%) এবং অক্সিজেন 22 ভাগ (0=22%)। [3] প্রতিটি প্রোটিন অণু অনেকগুলি অ্যামিনো অ্যাসিডের সমন্বয়ে গঠিত। অ্যামিনো অ্যাসিড একপ্রকার জৈব পদার্থ। [4] প্রতিটি অ্যামিনো অ্যাসিডের মধ্যে অন্ততপক্ষে একটি অ্যামিনো মূলক (-NHHg) এবং একটি মুক্ত কারমিন মূলক (-COOH) থাকে। অ্যামিনো অ্যাসিডের আণবিক সংকেত হল R-CINI COOH, এখানে R = পার্থ গ্রুপ। [5] বিভিন্ন অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্ষেত্রে 'R' বিভিন্ন হয়। এর ফলে একটি [6] অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে অপর অ্যামিনো অ্যাসিড পৃথক হয়। অ্যামিনো অ্যাসিডগুলি পরস্পরের সঙ্গে পেপটাইড যখন যারা যুক্ত থাকে। অনেকগুলি অ্যামিনো অ্যাসিড পরপর যুক্ত হয়ে পলিপেপটাইড গঠন করে। একটি প্রোটিন অণু এক বা একাধিক পলিপেপটাইড দ্বারা গঠিত।

মানবদেহে প্রোটিনের কাজ

1 গঠনগত উপাদানঃ কোশ ও কলার গঠনগত উপাদান হল প্রোটিন। প্রোটিন দেহগঠনে যেভাবে কাজ করে তা হল [A] কোশ অঙ্গানু গঠন: কোশপর্দা, প্লাস্টিড, মাইটোকনড্রিয়া, রাইবোজোম, ক্রোমোজোম, অনুনালিকা সবগুলির গঠনগত উপাদান হল প্রোটিন। [8] কলা গঠন: তরুণাস্থির ধারের কনড্রিন প্রোটিন, অস্থিধারের অসেইন, পেশি গঠনকারী অ্যাকটিন মায়োসিন, যোগকলার ধাত্রে বিন্যস্ত কোলাজেন ধরনের প্রোটিন। অর্থাৎ, কোশ, কলা তথা সমগ্র দেহের গঠনগত প্রধান উপাদান হল প্রোটিন।

2 উৎসেচক রূপে প্রোটিনের ভূমিকা: মানবদেহে বিভিন্ন প্রকার উৎসেচক উৎপাদনে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমস্ত উৎসেচক মূলত প্রোটিনজাতীয় উপাদান। আর এই উৎসেচক জীবদেহের সমস্ত বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

3 হরমোন গঠন: প্রোটিন মানবদেহে বিভিন্ন প্রকার হরমোন গঠনে অংশ নেয়। এইসব হরমোনগুলির মধ্যে কয়েকটি হল ইনসুলিন, গ্লুকাগন, ACTH, GTH. STH, TSH, MSH অক্সিটোসিন, ভেসোপ্রেসিন প্রভৃতি।

জীবদেহ এক বা একাধিক কোশ দিয়ে গঠিত হয়। সেজন্য কোশকে জীবদেহের গঠনগত একক বলে। জীবের শ্বসন, পুষ্টি, রেচন, জনন, বৃদ্ধি প্রভৃতি জৈবনিক কাজও কোশ এককভাবে সম্পন্ন করতে পারে। সেই কারণে, কোশকে জীবদেহের কার্যগত এককও বলে। তাই কোশকে জীবনের একক বলা হয়।

80 kg ওজনের একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির দেহকোশের সংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ কোটি ( 100 x 1012)।

7.5-10 nm পুরু প্রোটিন-লিপিড-প্রোটিন-এর তিনটি স্তর দ্বারা গঠিত আবরণীকে একক পর্দা বলে। এই ত্রিস্তরীয় সংগঠন কোশের কোশপর্দা ও সাইটোপ্লাজমের সব অঙ্গাণুগুলির পর্দার বৈশিষ্ট্য। তাই বিজ্ঞানী রবার্টসন ‘একক পর্দা' নামকরণটি করেছেন।

পিনোসাইটোসিস : ইউক্যারিওটিক প্রাণীকোশের ক্ষেত্রে, যে প্রক্রিয়ায় কোশপর্দা কোশের ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে তরল বস্তুকে গ্রহণ করে, তাকে পিনোসাইটোসিস বলে।

পিনোজোম: পিনোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট কোশমধ্যস্থ তরল বস্তুসহ গহ্বরকে পিনোজোম বলে।

ফ্যাগোসাইটোসিস : ইউক্যারিওটিক প্রাণীকোশের ক্ষেত্রে, যে প্রক্রিয়ায় কোশপর্দা কোশের ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে কঠিন বস্তু (খাদ্যবস্তু, জীবাণু ইত্যাদি) গ্রহণ করে, তাকে ফ্যানোসাইটোসিস বলে।

ফ্যাগোজোম : ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট কাশমধ্যস্থ কঠিন বস্তুসহ গহ্বরকে ফ্যাগোজোম বলে।

>> জীবদেহের স্বপ্রজননশীল এবং জীবদেহের গঠনগত ও কার্যগত একককে কোশ বলে।

পিনোসাইটোসিস পদ্ধতিতে কোশের বাইরের তরল পদার্থ কোশপর্দার মাধ্যমে কোশের ভিতরে গৃহীত হয়। তাই একে ‘সেল ড্রিঙ্কিং' বা 'কোশ পান' বলে।

প্রাণীকোশের প্লাজমা পর্দার বা কোশপর্দার বাইরে বহুশকরা ও গ্লাইকোপ্রোটিন দিয়ে তৈরি যে পাতলা আবরণ থাকে, তাকে গ্লাইকোক্যালিক্স বলে।

 

মাইক্রোডিলিঃ কোনো কোনো প্রাণীকোশে (ক্ষুদ্রান্ত্রের কোশ) কোশপর্দা একটানা না হয়ে, কিছু নির্দিষ্ট অংশে আঙুলের মতো ভাঁজ হয়ে উপবৃদ্ধি তৈরি করে। এদের মাইক্রোডিলি বলে।

কাজ: এরা পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধির মাধ্যমে শোষণে সাহায্য করে।

 

হায়ালোপ্লাজম : কোশের সাইটোপ্লাজমের কোশীয় অংশাণু ব্যতীত বিভিন্ন জৈব ও অজৈব পদার্থ সমন্বিত স্বচ্ছ, বর্ণহীন ও স্বপ্ন-ঘন ধাত্র অংশকে সাইটোসল বা হায়ালোপ্লাজম বলে।

টোনোপ্লাজম: কোশগহ্বর বা ভ্যাকুওলকে ঘিরে অবস্থিত সাইটোপ্লাজমের পাতলা স্বচ্ছ করতে টোনোপ্লাজম বলে।

 

এক্টোপ্লাজম: সাইটোপ্লাজমের ফল, পাতলা, স্থিতি স্থাপক এবং প্রায় দানাবিহীন বহিঃস্তরটিকে এক্টোপ্লাজম বলে।

এন্ডোপ্লাজম: সাইটোপ্লাজমের ভিতরের দানাদার তরল সাম্প্র অংশকে এন্ডোপ্লাজম বলে।

যেসব অকোশীয় সংগঠনে সাইটোপ্লাজম থাকে না, তাদের প্রোটোবায়োটা বা অকোশীয় জীব বলে। উদাহরণ ভাইরয়েড।

যেসব জীবের দেহকোশে সাইটোপ্লাজম থাকে, তাদের সাইটোবায়োটা বা কোশীয় জীব বলে।

উদাহরণ-উন্নত উদ্ভিদকোশ ও প্রাণীকোশ।

সন্নিহিত উদ্ভিদকোশের কোশপ্রাচীরে অবস্থিত সুক্ষ্ম সূক্ষ্ম ছিদ্রের মাধ্যমে উভয় কোশের মধ্যে রক্ষিত পরাণুবীক্ষণিক সাইটোপ্লাজমিক যোগসূত্রকে প্লাজমোডেসমাটা বলে।

পাশাপাশি অবস্থিত দুটি প্রাণীকোশের প্লাজমা পর্দায় যে কোশান্তর সংগঠন কোশটিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত রেখে সাইটোপ্লাজমীয় যোগসূত্র বজায় রাখতে সাহায্য করে, তাকে ডেসমোজোম বলে।

প্রোটোপ্লাজমের মধ্যে সবচেয়ে ঘন গোলাকার, পর্দা পরিবেষ্টিত, ক্রোমোজোম সমন্বিত যে অংশ কোশের মস্তিষ্ক হিসেবে সমস্ত শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে নিউক্লিয়াস বলে।

 

কোশের মস্তিষ্ক- নিউক্লিয়াস: কোশমধ্যস্থ বিভিন্ন প্রকার বিপাকীয় কাজকে নিউক্লিয়াস নিয়ণ করে, তাই একে কোশের মস্তিষ্ক বলে।

বহু নিউক্লিয়াসযুক্ত প্রাণীকোশ: বহু নিউক্লিয়াসযুক্ত প্রাণীকোশ হল ওপালিনা এবং মানবদেহের ঐচ্ছিক পেশিকোশ।

নিউক্লীয় রস: নিউক্লিয়াসের মধ্যে যে স্বচ্ছ, দানাদার, অম্লধর্মী ধাত্র থাকে, তাকে নিউক্লীয় রস বলে।

নিউক্লীয় রসে উপস্থিত লবণসমূহ: এই রসে পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস প্রভৃতি লবণ থাকে।

ক্রোমাটিন জালিকা: নিউক্লিয়াসের ধাত্রে লম্বা সুতোর মতো বস্তুর জালক থাকে, যা DNA হিস্টোন প্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত। একে ক্রোমাটিন জালিকা বলে।

গুরুত্ব: ক্রোমাটিন জালিকা কোশ বিভাজনের সময়ে ঘনীভূত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে।

কোশপ্রাচীর

ব্যাকটেরিয়া এবং অধিকাংশ উদ্ভিদকোশের কোশ আবরণীর বইরে যে বহুশকরা (মূলত সেলুলোজ) নির্মিত, স্থিতিস্থাপক, জড়, ভেদ এবং স্থূল আবরণী থাকে, তাকে কোশপ্রাচীর বা সেল ওয়াল বলে।
অবস্থান

উদ্ভিদ ও ব্যাকটেরিয়া কোশের ক্ষেত্রে এটি কোশপর্দার বাইরে থাকে। প্রাণীকোশে, কোশপ্রাচীর উদ্ভিদ জনন কোশে (পরাগরেণু ও ডিম্বাণু) ও কিছু ব্যাকটেরিয়া কোশে (মাইকোপ্লাজমা) কোশপ্রাচীর থাকে না।
গঠন

প্রোটোপ্লাজম থেকে ক্ষরিত বিভিন্ন বিপাকজাত নির্জীব পদার্থ, কোশের বাইরের দিকে সঞ্চিত হয়ে কোশপ্রাচীর গঠন করে।
কোশপ্রাচীরের মূল রাসায়নিক উপাদন হল — সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, পেকটিন, লিগনিন, সুবেরিন, কাইটিন, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ইত্যাদি। পরিণত কোশপ্রাচীর নিম্নলিখিত তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত-
1 প্রাথমিক প্রাচীর : এটি কোশের সবথেকে বাইরের স্তর। এটি পাশাপাশি অবস্থিত দুটি কোশের মধ্যপর্দার উভয়দিকে থাকে। এটি তুলনামূলকভাবে পাতলা, ভেদ) ও স্থিতিস্থাপক প্রকৃতির। এই স্তরটি প্রধানত সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, লিগনিন "ও মাইক্রোফাইব্রিল দিয়ে তৈরি হয়।

2 গৌণ প্রাচীর: এটি কোশের প্রাথমিক কোশপ্রাচীরের ভিতরের দিকের স্তর। এটি প্রাথমিক কোশপ্রাচীর ও কোশপর্দার মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত। কোশের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর স্থূলত্বও বৃদ্ধি পায়। এটি প্রাথমিক কোশপ্রাচীরের তুলনায় অনেক বেশি পুরু এবং দৃঢ় হয়। এটির প্রধান উপাদান হল — লিগনিন, সুবেরিন, সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ ইত্যাদি।
3 মধ্যচ্ছদা: সন্নিহিত দুটি উদ্ভিদকোশের মধ্যবর্তী অংশে বর্তমান জেলিসদৃশ সান্দ্র আন্তঃকোশীয় ধাত্রবিশেষ। এটি সংশ্লিষ্ট কোশদুটিকে সিমেন্টের মতো সংযুক্ত রাখে। এটি ক্যালশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম পেকটেট দ্বারা গঠিত।
কাজ-
[1] কোশপ্রাচীর উদ্ভিদদেহে কোশের আকৃতি নির্দিষ্ট করে। [2] কোশপ্রাচীর সজীব প্রোটোপ্লাজমকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে এবং কোশকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে। [3] সংলগ্ন কোশের মাঝখানে থাকা প্লাজমোডেসমাটা, জল ও খনিজ লবণ আদানপ্রদানে সাহায্য করে। [4] কোশপ্রাচীর স্থিতিস্থাপক হওয়ায় কোশের মধ্যে জলের চাপ বৃদ্ধি পেলেও কোশটি ফেটে যায় না। [5] পার্শ্ববর্তী কোশগুলির সঙ্গে কোশপ্রাচীর সংযোগ রক্ষা করে।

কোশপর্দা
সজীব কোশের প্রোটোপ্লাজমকে আবৃত করে প্রোটিন ও ফসফোলিপিড অণু লিপিডের সমন্বয়ে গঠিত, স্থিতিস্থাপক, সজীব অর্ধভেদ্য পর্দাকে কোশপর্দা বা প্লাজমা পর্দা বলে।
অবস্থান
সজীব কেশের প্রোটোপ্লাজমকে পরিবৃত করে সাইটো- প্লাজমের অব্যবহিত বহিঃতল বরাবর অবস্থিত।
গঠন
বিভিন্ন বিজ্ঞানী কোশপর্দার গঠন বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হল সিঙ্গার ও
নিকলসন প্রস্তাবিত ফ্লুইড মোজেইক মডেল। এই মডেল অনুসারে—[1] কোশপর্দাতে দুটি ফসফোলিপিড স্তর
রয়েছে, একে লিপিড দ্বিস্তর বলে। [2] লিপিড দ্বিস্তরের মধ্যে গ্লোবিডলার প্রোটিন অণু মোজাইকের মতো ইতস্তত ছড়িয়ে থাকে [3] এই প্রোটিনগুলি তরল লিপিড স্তরের মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে সক্ষম। আবার, লিপিড অণুগুলিও নিজের স্থান পরিবর্তনে সক্ষম, যার জন্য এর নাম তরল মোজাইক গঠন। [4] প্রোটিনগুলি দু-প্রকারের হয়। কিছু কিছু প্রোটিন, দুটি লিপিড স্তরকে আংশিক বা পুরোপুরি ভেদ করে অবস্থান করে। এদের অভ্যন্তরীণ প্রোটিন বা পদান্তর প্রোটিন বলে। অন্য প্রোটিনগুলি আলগাভাবে বাইরে বা ভেতরের দিকে লিপিড স্তর বা পর্দান্তর প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, এদের বাহ্যিক বা প্রান্তীয় প্রোটিন বলে।

কাজ
[1] কোশের আকৃতি প্রদান করে এবং প্রোটোপ্লাজমকে রক্ষা করে। [2] কোশস্তরে ব্যাপন ও অভিস্রবণ সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা নেয়। [3] পিনোসাইটোসিস ও ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে এটি যথাক্রমে তরল ও কঠিন খাদ্য, কোশের ভিতরে প্রবেশে সাহায্য করে। [4] বিভিন্ন পদার্থের পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ করে। [5] কোশ-অঙ্গাণু উৎপন্ন করে ও তাদের রক্ষা করে। [6] রাইবোজোমযুক্ত পর্দা প্রোটিন সংশ্লেষে অংশ নেয়।

সাইটোপ্লাজম
প্রোটোপ্লাজমের সজীব, বর্ণহীন, অর্ধস্বচ্ছ, জেলির মতো অর্ধতরল সান্দ্র ধাত্রকে সাইটোপ্লাজম বলে।
অবস্থান
সাইটোপ্লাজম কোশের ভিতরে কোশপর্দা থেকে নিউক্লীয় পর্দা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। এটি সকল সজীব কোশে থাকে। মৃত কোশে সাইটোপ্লাজম থাকে না।

গঠন
[1] সাইটোপ্লাজম দানাদার, জালকাকার, সুত্রাকার এবং কলয়েড-জাতীয় পদার্থ। [2] এটি প্রধানত দুটি অংশ নিয়ে গঠিত- এক্টোপ্লাজম এবং এন্ডোপ্লাজম। সাইটোপ্লাজমের স্বচ্ছ, স্থিতিস্থাপক, দানাবিহীন, অধিক সান্দ্র, কোশপর্দা সংলগ্ন অংশকেই এক্টোপ্লাজম বলে। এক্টোপ্লাজম ছাড়া কোশের ভিতর পর্যন্ত বিস্তৃত অস্বচ্ছ, দানাদার অংশকে এন্ডোপ্লাজম বলে। [3] এন্ডোপ্লাজমের যে অংশ কোশগহ্বর বা ভ্যাকুওলকে ঘিরে থাকে, তাকে টোনোপ্লাজম বলে। [4] সাইটোপ্লাজমের শতকরা 75 ভাগ জল এবং বাকি অংশ কঠিন জৈব ও অজৈব পদার্থে পূর্ণ। [5] বিভিন্ন প্রকার অণুতত্ত্বনালিকা, কোশীয় অঙ্গাণু এবং অজীবীয় পদার্থ সাইটোপ্লাজমের অন্তঃকঙ্কাল (cytoplasmic skeleton) গঠন করে।
কাজ
[1] সাইটোপ্লাজম কোশের সকল অঙ্গাণুর ধাত্র হিসেবে কাজ করে। [2] কোশীয় বিপাকক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। [3] বাহ্যিক উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। [4] সাইটোপ্লাজমিক আবর্তনের সাহায্যে হরমোন, খাদ্য, উৎসেচক ইত্যাদি স্থানান্তরিত করে। [5] কোশ বিভাজনে অংশগ্রহণ করে।

নিউক্লিয়াস

ইউক্যারিওটিক কোশের প্রোটোপ্লাজমের মধ্যে সবচেয়ে ঘন, গোলাকার, পর্দাবেষ্টিত, ক্রোমোজোম সমন্বিত যে অংশ কোশের সমস্ত শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে নিউক্লিয়াস বলে।
অবস্থান
সকল প্রকার ইউক্যারিওটিক কোশের প্রোটোপ্লাজমে প্রকৃত নিউক্লিয়াস পাওয়া যায়। উদ্ভিদকোশের কোশপ্রাচীরের কাছাকাছি এবং প্রাণীকোশে সাধারণত কোশের কেন্দ্রে নিউক্লিয়াস অবস্থিত। প্রোক্যারিওটিক কোশে কোনো সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না।
গঠন
নিউক্লিয়াস সাধারণত গোলাকার বা উপবৃত্তাকার হয়। এটি প্রধানত চারটি অংশ নিয়ে গঠিত। এগুলি হল—–নিউক্লীয় পর্দা, নিউক্লীয় রস, নিউক্লিওলাস ও নিউক্লীয় জালিকা।
1 নিউক্লীয় পর্দা: নিউক্লিয়াসকে ঘিরে যে সজীব দ্বিস্তরীয় আবরণী থাকে, তাকে নিউক্লীয় পর্দা বলে। এই পর্দা প্রোটিন ও স্নেহপদার্থ দিয়ে তৈরি। দ্বিস্তরীয় পর্দার দুটি স্তরের অন্তবর্তী স্থানকে পেরিনিউক্লিয়ার সিস্টারনি বলে। নিউক্লীয় পর্দার গায়ে অসংখ্য ছিদ্র থাকে। এদের নিউক্লীয় ছিদ্র বলে।
2 নিউক্লীয় রস: নিউক্লিয়াসের অর্ধতরল, স্বচ্ছ পদার্থকেই নিউক্লীয় রস বা নিউক্লিওপ্লাজম বলে। নিউক্লিওপ্লাজম, সাইটোপ্লাজমের তুলনায় অনেক বেশি দানাদার এবং ঘন জেলির মতো হয়।
3  নিউক্লিওলাস: নিউক্লিয়াসের অপেক্ষাকৃত ঘন, গোলাকার অংশকে নিউক্লিওলাস বলে। সাধারণত একটি নিউক্লিয়াসে একটিমাত্র নিউক্লিওলাস থাকে। নিউক্লিওলাসের গুরুত্বপূর্ণ চারটি অংশ হল—

[1] দানাদার অংশ, [2] সূত্রাকার অংশ, [3] অনিয়তাকার অংশ এবং [4] ক্রোমাটিন অংশ।
4 নিউক্লীয় জালিকা: নিউক্লীয় রসের মধ্যে যে সুক্ষ্ম সুতোর মতো অংশ অস্পষ্টভাবে জালকাকারে অবস্থান করে, তাদের নিউক্লীয় জালিকা বা ক্রোমাটিন জালিকা বলে। কোশ বিভাজনকালে জল বিয়োজনের ফলে নিউক্লীয় জালিকাগুলি স্পষ্ট ও মোটা হয়। তখন তাদের ক্রোমোজোম বলে। ক্রোমোজোমে জিন থাকে।
কাজ
[1] কোশের মস্তিষ্ক হিসেবে নিউক্লিয়াস সমস্ত শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

[2] কোশ বিভাজনের সময়ে ক্রোমোজোম গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ক্রোমোজোমে অবস্থিত জিন বংশগত বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে।
[3] নিউক্লিয়াসে অবস্থিত ক্রোমোজোম DNA সংশ্লেষে অংশগ্রহণ করে।

[4] নিউক্লিয়াস প্রোটিন সংশ্লেষ ও RNA গঠনে অংশ নেয়।

আরগ্যাসটিক পদার্থ কোশের প্রোটোপ্লাজমে অবস্থিত সজীব কোশ-অঙ্গাণুগুলি ছাড়া কোশের বিপাকজাত তরল বা কঠিন জড়বস্তুকে সামগ্রিকভাবে আরগ্যাসটিক পদার্থ বা সাইটোপ্লাজমিক ইনক্লুসন বা অজীবীয় বস্তু বলে।
অবস্থান আরগ্যাসটিক পদার্থ সজীব কোশের সাইটোপ্লাজমে বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করে।
গঠন কোশে সাধারণত তিন ধরনের আরগ্যাসটিক পদার্থ দেখা যায় – [1] সঞ্চিত পদার্থ, [2] ক্ষরিত পদার্থ এবং [3] বর্জ্য পদার্থ।
1 সঞ্ছিত পদার্থ: উদ্ভিদকোশে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চিত পদার্থ থাকে। শর্করাজাতীয় পদার্থের মধ্যে শ্বেতসার ও গ্লাইকোজেন, প্রোটিন-জাতীয় পদার্থের মধ্যে অ্যালিউরোন দানা সঞ্চিত থাকে। শর্করা ও প্রোটিন কঠিন বস্তু হিসেবে সাইটোপ্লাজমে এবং তৈলবিন্দু তরল হিসেবে কোশগহ্বরে জমা থাকে। আলু, ভুট্টা প্রভৃতি উদ্ভিদে শ্বেতসার, সরষে, বাদাম প্রভৃতি বীজে প্রচুর তেল সঞ্চিত থাকে।
2 ক্ষরিত পদার্থ : কোনো কোনো উদ্ভিদকোশের সাইটোপ্লাজমে ক্ষরিত পদার্থ সঞ্চিত থাকে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—
নেকটার বা মকরন্দ, রঙ্গক পদার্থ এবং বিভিন্ন ধরনের উৎসেচক।
3 বর্জ্য পদার্থ: উদ্ভিদকোশে বিপাকের ফলে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পদার্থ উৎপন্ন হয়। সেগুলি কোশের সাইটোপ্লাজমে সঞ্চিত থাকে। উল্লেখযোগ্য বর্জ্য পদার্থ হল গঁদ, রজন, তরুক্ষীর, ধাতব কেলাস, ট্যানিন, উপক্ষার ইত্যাদি। যেমন—বট, রবার প্রভৃতি গাছের পাতায় ক্যালশিয়াম কার্বোনেট নামক ধাতব কেলাস গুচ্ছাকারে সঞ্চিত থাকে। উদ্ভিদদেহের নাইট্রোজেনযুক্ত রেচন পদার্থ হল উপক্ষার (alkaloids)। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সর্পগন্ধা মূলের রেসারপিন, তামাক গাছের পাতার নিকোটিন প্রভৃতি।

উৎপত্তিগত ও কার্যগতভাবে এক, এমন সম বা বিষম আকৃতির কোশসমাধিকে কলা বলে।

যেমন- জাইলেম কলা।

মুখের ও কাজের অভাগে অবস্থিত যে অপরিণত কলার কোশগুলি ক্রমাগত বিভাজিত হয়ে নতুন কোশের সৃষ্টি করে, তাকে ভাজক কলা বা মেরিস্টেমাটিক টিস্যু বলে। যেমন—ক্যামবিয়াম।

ভাজক কলার দুটি কাজ হল-

[1] কোশ বিভাজন ঘটিয়ে কোশের সংখ্যা বৃদ্ধি করে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ঘটানো।

[2] স্থায়ী কলা উৎপন্ন করা।

"Three in one"-উরিটি ভাজক কলার তিনটি কাজের নিরিখে যথার্থ। কার্য অনুসারে ভাজক কলা তিনটি ভাগে বিভক্ত—প্রোটোডার্ম, প্রোক্যামবিয়াম এবং গ্রাউন্ড মেরিস্টেম। প্রোটোডার্ম ভাজক কলার সর্বাপেক্ষা বাইরের স্তর, যা কান্ড ও মূলের বহিত্বক গঠন করে। প্রোক্যামবিয়াম থেকে শিরাত্মক কলা বা ভাসকুলার বান্ডিল গঠিত হয়। গ্রাউন্ড মেরিস্টেম থেকে উদ্ভিদদেহের বহিঃস্তর, মজ্জা ও মজ্জাংশ গঠিত হয়।

অঃস্থ ভাজক কলা : যে ভাজক কলা মূল ও কাণ্ডের অগ্রভাগে অবস্থান করে, তাকে অগ্রস্থ ভাজক কলা বলে। কাজ: মূল ও কাণ্ডের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করা।

পার্শ্বস্থ ভাজক কলা:  মূল ও কাণ্ডের পার্শ্বদেশে লম্বালম্বিভাবে অবস্থিত বিভাজনক্ষম কলাকে পার্শ্বস্থ ভাজক কলা  বলে।

কাজ : মূল ও কান্ডের প্রস্থের বা পরিধির দিকের বৃদ্ধি ঘটানো।

নিবেশিত ভাজক কলা : যে ভাজক কলা দুটি স্থায়ী কলাস্তরের মধ্যবর্তী স্থানে অন্তর্নিহিতভাবে অবস্থান করে, তাকে নিবেশিত ভাজক কলা বলে।

কাজ: সংশ্লিষ্ট উদ্ভিদ-অঙ্গের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ঘটানো।

দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের কাণ্ডের নালিকা বান্ডিলে জাইলেম ও ফ্লোয়েমের মাঝে যে গৌণ বা পার্শ্বস্থ ভাজক কলার স্তরটি অবস্থান করে, তাকে ক্যামবিয়াম বলে।

 

>> পাতার ফলকের কিনারা বরাবর ট্রাকিড প্রান্তে অবস্থিত বিশেষ আকৃতির যে অঙ্গের মাধ্যমে উদ্ভিদদেহের জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ নির্গত হয়, তাকে হাইডাথোড বা জলরস্ত্র বলে। টম্যাটো, কচু প্রভৃতি উদ্ভিদের পাতার কিনারায় হাইডাথোড থাকে।

 

ভাজক কলা থেকে উৎপন্ন যে কলার কোশগুলির বিভাজন ক্ষমতা না থাকায় নতুন কোশের সৃষ্টি করতে পারে না, সেই কলাকে স্থায়ী কলা বলে।

যেমন— প্যারেনকাইমা কলা।

সরল স্থায়ী কলা: যে স্থায়ী কলা সম আকৃতির কোশগুচ্ছ দ্বারা গঠিত এবং একই কাজ করে, তাকে সরল স্থায়ী কলা বলে। যেমন— প্যারেনকাইমা কলা।

প্রকারভেদ: সরল স্থায়ী কলা তিন প্রকারের হয়। যথা—

[1] প্যারেনকাইমা (2) কোলেনকাইমা ও [3] ফ্লেরেনকাইমা।

জটিল স্থায়ী কলা: গঠন ও আকৃতিগতভাবে পৃথক, কিন্তু একইরকম কাজে লিপ্ত এবং একই উৎস থেকে উৎপন্ন, এমন বিভাজনে অক্ষম কোশসমষ্টিকে জটিল স্থায়ী কলা বলে।

যেমন—জাইলেন কলা।

প্রকারভেদ: জটিল স্থায়ী কলা দুই প্রকারের। যথা— [1] জাইলেন এবং [2] ফ্লোয়েম।

ভাজক কলা

মুলে ও কাণ্ডের অগ্রভাগে অবস্থিত যে অপরিণত কলার কোশগুলি ক্রমাগত বিভাজিত হয়ে নতুন কোশের সৃষ্টি করে, তাকে ভাজক কলা বলে।

ভাজক কলার গঠন

[1] ভাজক কলার কোশগুলি আকৃতিতে ছোটো এবং দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে প্রায় সমান হয়। [2] কোশগুলি সাধারণত গোলাকার, ডিম্বাকার এবং বহুভুজাকার হয়। [3] এই কলার কোশগুলির কোশপ্রাকার সাধারণত পাতলা হয়। [4] কোশের প্রোটোপ্লাজমে সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস সহ ঘন সাইটোপ্লাজম থাকে। [5] কোশে সাধারণত কোশাকের অনুপস্থিত। [6] কোশগুলি ঘনসন্নিবিষ্টভাবে থাকায় সেগুলির মধ্যে কোনো কোশান্তর রন্ধ্র থাকে না।

ভাজক কলার অবস্থান

উদ্ভিদদেহের সমস্ত বর্ধনশীল অঙ্গে, অর্থাৎ মূল, কান্ড ও পাতার অগ্রভাগে, পার্শ্বে এবং স্থায়ী কলার মধ্যবর্তী অংশে ভাজক কলা অবস্থান করে।

ভাজক কলার কাজ

[1] কোশ বিভাজনের মাধ্যমে কোশের সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটিয়ে ভাজক কলা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ঘটিয়ে ভাজক কলা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ঘটায়। [2] ভাজক কলা পরিণত হয়ে স্থায়ী কলা সৃষ্টি করে।

 

অবস্থান অনুসারে ভাজক কলার শ্রেণিবিভাগ

অবস্থান অনুসারে ভাজক কলাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়-

[1] অগ্রস্থ ভাজক কলা, [2] পার্শ্বস্থ ভাজক কলা এবং [3] নিবেশিত ভাজক কলা।

1 অগ্রস্থ ভাজক কলা : যে ভাজক কলা উদ্ভিদের মূল ও কাণ্ডের অগ্রভা অবস্থান করে, তাকে অগ্রস্থ ভাজক কলা বলে।

কাজ: কোশ বিভাজনের দ্বারা কান্ড ও মূলের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ঘটানো।

2 পার্শ্বস্থ ভাজক কলা : যে ভাজক কলা উদ্ভিদের মূল ও কাণ্ডের পার্শ্বদেশে সমান্তরালে অক্ষীয়ভাবে অবস্থান করে, তাকে পার্শ্বস্থ ভাজক কলা বলে।

কাজ: কোশ বিভাজনের দ্বারা মূল ও কান্ডের প্রস্থের বা পরিধির বৃদ্ধি ঘটানো।

3 নিবেশিত ভাজক কলা:  যে ভাজক কলা দুটি স্থায়ী কলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত, তাকে নিবেশিত ভাজক কলা বলে।

কাজ: সংশ্লিষ্ট উদ্ভিদের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ঘটানো।

বৈশিষ্ট্য

ভাজক কলা মুলে ও কাণ্ডের অগ্রভাগে অবস্থিত যে অপরিণত কলার কোশগুলি ক্রমাগত বিভাজিত হয়ে নতুন কোশের সৃষ্টি করে, তাকে ভাজক কলা বলে।

ভাজক কলার কাজ

[1] কোশ বিভাজনের মাধ্যমে কোশের সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটিয়ে ভাজক কলা উদ্ভিদের বৃদ্ধি  ঘটায়।

[2] ভাজক কলা পরিণত হয়ে স্থায়ী কলা সৃষ্টি করে।

 

 

স্থায়ী কলা

ভাজক কলা থেকে উৎপন্ন সম বা বিষম আকৃতিবিশিষ্ট বিভাজনক্ষমতাহীন কোশের সমন্বয়ে গঠিত কলাকে স্থায়ী কলা বলে।
স্থায়ী কলার গঠন

[1] স্থায়ী কলার কোশের কোশপ্রাকার সাধারণত শুরু হয়। [2] কোশগুলি জীবিত ও মৃত উভয় প্রকৃতির হয়। [3] কোশে প্রোটোপ্লাজম থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে। [4] কোশগুলির মধ্যে কোশান্তর রাষ্ট্র বর্তমান। [5] অনেকক্ষেত্রে কোশপ্রাকারে অলংকরণ দেখা যায় এবং কোশগুলি নির্দিষ্ট আকারের হয়। [6] কোশগুলির নিউক্লিয়াস অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র, কেন্দ্রে বড়ো কোশাহার থাকে এবং সাইটোপ্লাজন পরিধির দিকে থাকে।

স্থায়ী কলার অবস্থান

স্থায়ী কলা মূল ও কাণ্ডের ত্বক, বহিঃস্তর, মজা, কান্ডের অধস্বর, দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের বান্ডিল টুপি, নালিকা বান্ডিল ইত্যাদিতে অবস্থান করে।

স্থায়ী কলার কাজ

(1)সরল স্থায়ী কলা খাদ্য সঞ্ছয়,খাদ্য প্রস্তুত ও খাদ্য পরিবহনে সহায়তা করে।

[2] জটিল স্থায়ী কলা উদ্ভিদ অঙ্গে দৃঢ়তা প্রদান করে, জল ও খনিজ লবণ সংবহনে সহায়তা করে এবং জল ও কোশরস সঞ্ছয় করে।

 

কোলেনকাইমা কলা

যে সরল স্থায়ী কলার সঙ্গীর কোশগুলির কোশপ্রাচীর অসমভাবে স্থূল হয়, তাকে কোলেনকাইমা কলা বলে।

কোলেনকাইমা কলার গঠন

[1] কোলেনকাইমা কলার কোশগুলি সজীব, কৌণিক, প্রস্থচ্ছেদে বহুভুজাকৃতি এবং লম্বচ্ছেদে আয়তাকার হয়। [2] কোশপ্রাকার স্থূল। তবে স্থূলীকরণ সর্বত্র সমান হয় না। কোশপ্রাকার সেলুলোজ নির্মিত হলেও অতিরিক্ত কিউটিন, সুবেরিন বা লিগনিন জমা হওয়ার ফলে অত্যন্ত পুরু হয়ে যায়। [3] কোশাদুর রশ্ন থাকতে পারে, আবার না-ও থাকতে পারে। [4] কোলেনকাইমার কোশগুলি শহররমুক্ত হয় ও প্রোটোপ্লাজমে পূর্ণ থাকে। অনেক সময় তাতে ক্লোরোফিল দেখা যায়। [5] কোলেনকাইমা কলা প্রধানত তিন প্রকারের হয়। যথা—কৌণিক, কৃপাকৃতি ও স্তরীভূত।

কোলেনকাইমা কলার অবস্থান

এই কলা দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের কাণ্ডের অবস্তুত, পাতার মধ্যশিরা, পাতার বোঁটা, ফুলের বোঁটা প্রভৃতি অংশে অবস্থান করে।

কোলেনকাইমা কলার কাজ

[1] কোলেনকাইমা কলা উদ্ভিদকে দৃঢ় রাখতে সাহায্য করে। [2] এই কথা স্থিতিস্থাপক প্রকৃতির হওয়ায় বর্ধনশীল অঙ্গগুলিকে  যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে। [3] ক্লোরোপ্লাসটিড সমন্বিত কোলেনকাইমা কলা খাদ্য তৈরির কাজে সহায়তা করে।

[1] আবরণী কলার কোশগুলি ঘনসন্নিবিষ্টভাবে ভিত্তিপর্দা নামক একটি সূক্ষ পর্দার ওপর এক বা একাধিক স্তরে সাজানো থাকে।

[2] আবরণী কলায় রক্তবাহ থাকে না।

কোশস্তরের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে আবরণী কলাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়—

[1] সরল আবরণী কলা, [2] যৌগিক বা স্তরীভূত আবরণী কলা ও [3] ছদ্মস্তরীভূত আবরণী কলা।

 

[1] সরল আবরণী কলা—এটি ভিত্তিপর্দার ওপর একক স্তরে বিন্যস্ত থাকে। [2] যৌগিক আবরণী কলা—এটি অনেকগুলি স্তরে বিন্যস্ত থাকে, যার ফলে এটি পুরু হয়। [3] ছদ্মস্তরীভূত আবরণী কলা—এটি একটি স্তরে বিন্যস্ত থাকে, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে বহুস্তরী বলে মনে হয়।

> ছদ্মস্তরীভূত আবরণী কলা : যে আবরণী কলার কোশগুলি প্রকৃতপক্ষে একটি স্তরেই সজ্জিত থাকে, কিন্তু কোশগুলির দৈর্ঘ্য অসমান হওয়ায় আপাতদৃষ্টিতে বহুস্তরী বলে মনে হয়, তাকে ছদ্মস্তরীভূত আবরণী কলা বলে।

কাজ : ছদ্মস্তরীভূত আবরণী কলা ক্ষরণ, বিশোষণ ও সংশ্লিষ্ট অঙ্গকে রক্ষা করে। এ ছাড়া কোনো বস্তু সঞ্চালনে সাহায্য করে।

সরল স্তম্ভাকার আবরণী কলা সংশ্লিষ্ট অঙ্গকে যান্ত্রিক সুরক্ষা প্রদান করে। এ ছাড়া এটি বিভিন্ন পদার্থ শোষণ ও ক্ষরণে সহায়তা করে।

যৌগিক বা স্তরীভূত আবরণী কলা : যে আবরণী কলার সংগঠক কোশগুলি ভিত্তিপর্দার ওপর একাধিক স্তরে সজ্জিত থাকে, তাকে স্তরীভূত আবরণী কলা বলে।

> কাজ : এটি বহুস্তরী, তাই সংশ্লিষ্ট অংশকে সুরক্ষা প্রদান করে। এ ছাড়া রেচন পদার্থের পুনঃবিশোষণে বাধা দান করে।

আবরণী কলার অবস্থান

[1] মুখগহবর, ফুসফুস প্রভৃতি মনের বাইরের আবরণে এবং লালাগ্রন্থি, পাকস্থলী, বৃহদ প্রকৃতির ভিতরের আবরণ ভাবী বলা অবস্থান করে। [2] তা ছাড়া, বাহের অন্তঃআবরণে, থাইরয়েড প্ররি অন্তঃআবরণে এরূপ কলা বর্তমান। এমনকি বৃক্ক ও গবিনিতে ও এই কলা দেখা যায়।

আবরণী কলার কাজ

[1] আবরণী কলার প্রধান কাজ হল সামির অবাতন্ত্রের অভ্যন্তরস্থ কলাকে সুরক্ষা প্রদান করা। [2] তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের চলাচলে এই কলা সহায়তা করে। [3] রস ক্ষরণ ও শোষণে এই কলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। [4] মামুর সঙ্গে যুক্ত থাকা অনেক কলা স্বণে সহায়তা করে।

যোগকলা

ভিত্তিপর্দাবিহীন যে কলা আদি যুগের মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন হয়ে দেহের বিভিন্ন কলা ও অঙ্গ সমূহের মধ্যে সংযোগ সাধন করে, তাকে যোগকলা বলে।
যোগকলার অবস্থান

এই কলা রঙ পেশি, অস্থি, তরুণাস্থি ইত্যাদিতে অবস্থিত।

যোগকলার গঠন

[1] এটি প্রধানত ধার, স্বল্প পরিমাণ কোশীয় উপাদান ও তত্ত্বর সমন্বয়ে গঠিত। যার কঠিন, তরল বা অর্ধতরল প্রকৃতির হতে পারে। [2] এই কলায় কোশাত্তর পদার্থের পরিমাণ বেশি এবং কোশের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। [3] এই কলায় ভিত্তিপর্দা অনুপস্থিত। [4] কোশে বড়ো, ডিম্বাকার ও সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস বর্তমান। [5] এই কলায় স্থির কোশ ও ভ্রাম্যমান কোশ উপস্থিত।

যোগকলার কাজ

[1] যোগকলা দেহের অন্যান্য কলা ও অংগসমূহের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে। [2] অ্যারিওলার কলা দেহের অন্যান্য কলাকোশের বর্তী স্থান পূরণে সাহায্য করে। [3] অ্যাডিপোজত কলা ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে রাখে। [4] অস্থি ও তরুণাস্থি প্রাণীদেহের ভার বহনে সহায়তা করে। [5] শ্বেত রক্তকণিকা জীবাণু ধ্বংস করে ও অনাক্রম্যতা বৃদ্ধি করে দেহ প্রতিরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। [6] রক্ত ও লসিকা খাসবায়ু ও অন্যান্য পদার্থকে দেহের একস্থান থেকে অন্যস্থানে পরিবহণ করে।

পেশিকলা

মায়োফাইব্রিল তত্ত্বযুক্ত প্রাণীদেহের যে কোশগুলি সংকোচন ও প্রবল ক্ষমতার এবং যাদের কার্যকারিতার ফলে বিভিন্ন অঙ্গের সম্পাদন ক্রিয়া ঘটে, সেই কোশগুচ্ছকে একত্রে পেশিকলা বলে।

পেশিকলার অবস্থান

দেহের বিভিন্ন অস্থির সঙ্গে পেশি যুক্ত থাকে। এ ছাড়া, দেহের ভিতরকার বিভিন্ন অঙ্গে, যেমন—খাদ্যনালীর প্রাকারে, শিরা-ধমনির পারে, এমনকি হূৎপিণ্ডেও পেশি থাকে।

পেশিকলার পঠন

[1] প্রতিটি পেশিকলা অসংখ্য লম্বা ও সরু পেশিকোশ (মায়োপ্লাস্ট)।

বিভিন্ন প্রকার পেনিবেশে

বা পেশিতত্ত্ব নিয়ে গঠিত। [2] পেশিতন্তুগুলি পরস্পর যোগকলার দ্বারা যুক্ত থাকে। [3] পেশিকোশ বা পেশিতে এক বা একাধিক নিউক্লিয়াস থাকে। [4] পেশিদুর সাইটোপ্লাজমকে সারকোপ্লাজন বলে। এতে গলগি বস্তু, মাইটোকনডিয়া
এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকিউলাম উপস্থিত। [5] পেশিকোশ বা পেশিতন্ত্রর সাইটোপ্লাজমে যে সূক্ষ্ম সুতোর মতো তনু তাদের মায়োফাইব্রিল বলে। [6] পেশিকোশ বা পেশিতত্ত্ব সাধারণত এক অতি সূক্ষ্ম, পাতলা আবরণ দ্বারা আবৃত থাকে সারকোলেমা বলে। [7] এটি প্রধানত তিন প্রকারের হয়—ঐচ্ছিক পেশি, অনৈচ্ছিক পেশি ও হৃদপেশি।

পেশিকলার কাজ

[1] এই কলা দেহগঠনে অংশ নেয়। [2] খাদ্যগ্রহণ, পাচন, মল-মুত্রত্যাগ ইত্যাদি কাজে এই কলা সাহায্য করে। [3] সম্মলেনে এই কলা সহায়তা করে। [4] হূৎপিণ্ডের সংকোচন-প্রসারণ ও রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

স্নায়ুকলা

নিউরোন ও নিউরোগ্লিয়া দ্বারা গঠিত যে কলার মাধ্যমে প্রাণীদেহে উদ্দীপনা গ্রহণ, প্রেরণ, উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া এবং বিভিন্ন অঙ্গের কাজে সমন্বয়সাধন সম্ভব হয়, তাকে স্নায়ুকলা বা নার্ভ কলা বলে।

অবস্থান

এই কলা প্রাণীদের মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডে এবং মানুতে অবস্থান করে।

গঠন

[1] নার্ভ কলা অসংখ্য নিউরোন (স্নায়ুকোশ) এবং নিউরোমিয়ার সমন্বয়ে গঠিত। [2] নার্ভ কোশ বা স্নায়ুকোশকে নিউরোন বলে। নিউরোনই স্নায়ুকলার প্রধান। উপাদান। নিউরোন কোশদেহ, অ্যাক্সন ও ডেনড্রন নিয়ে গঠিত। কোশনেহে কোশপর্দা, সাইটোপ্লাজম, নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া এবং ছোটোছোটো দানা সাইটোপ্লাজমে ছড়িয়ে থাকে, যাদের নির্মূল দানা বলে। [3] কোশদেহ থেকে বহির্গত, ক্ষুদ্র শাখাপ্রশাখার প্রবর্ধক হল ডেনড্রন। ডেনড্রনের আবরণ অনুপস্থিত। [4] কোশদেহ থেকে বহির্গত, দীর্ঘ শাখাবিহীন প্রবর্ধক হল অ্যাক্সন। অ্যাক্সনের শেষ অংশে প্রান্তৰুৰুশ থাকে। [5] অ্যাক্সনে নিউরোলেমা, মায়েলিন সীন এবং র‍্যানভিয়ারের পর্ব থাকে। [6] নিউরোগ্লিয়া একপ্রকার ধারক কোশবিশেষ, যা স্নায়ুকোশগুলিকে সুরক্ষা প্রদান করে।

কাজ

[1] স্নায়ুকলার কাজ হল পরিবেশ থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করা এবং উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া।

[2] দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে সমন্বয়সাধন করা।

আবরণী কলা

এক বা একাধিক কোশস্বরযুক্ত যে কলা প্রাণীদেহের বাইরের ও বিভিন্ন অন্যের ও শহরের আবরণ সৃষ্টি করে, তাকে আবরণী কলা বলে।

আবরণী কলার বৈশিষ্ট

(1) আবরণী কলার কোশগুলি যোগকলা-নির্মিত ভিত্তিপর্দা নামক এ মুগ্ধ শর্মার ওপর এক বা একাধিক স্তরে নরবিষ্টভাবে সাজানো থাকে। ভিত্তিপনার বিপরীত প্রান্তে মুক্ত থাকে। [2] কোশগুলি মধ্যে কোশান্তর মান প্রায় থাকে না বললেই চলে। [3] এই কলায় কোনো প্রকার বরবাহ থাকে না। [4] প্রতিটি কোনে সাইটোপ্লাজম ও একটি বড়ো সুষ্পষ্ট নিউক্লিয়াস থাকে। [5] সন্ধিপদ প্রাণীদের বহিস্থ আবরণী কলা শক্ত খোলকে (বহিঃকঙ্কাল পরিণত হয়। [5] এই কলা থেকে সরীসৃপের আঁশ, পাখির পালক ও মানুষসহ স্তন্যপায়ী প্রাণীর গায়ের লোম প্রভৃতি উৎপন্ন হয়।

 

অঙ্গ : একাধিক কলা একত্রিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করলে, এই কলাসনটিকে অঙ্গ বলে। যেমন- হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ইত্যাদি।

তন্ত্র : কতকগুলি অংশ একত্রিত হয়ে যখন পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রমবন্টনের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় কাজ সম্পন্ন করে, তখন ওই অঙ্গসমষ্টিকে তন্ত্র বলে।

যেমন -পরিপাকতন্ত্র, সংবহনতন্ত্র ইত্যাদি।

 

ত্বক: মানবদেহের কোমল অংশে আচ্ছাদন সৃষ্টিকারী যে জ্ঞানেন্দ্রিয় চাপ, তাপ, স্পর্শ, বেদনা প্রভৃতি অনুভব করতে সাহায্য করে ও যান্ত্রিক প্রতিরক্ষা দেয়, তাকে ত্বক বা চর্ম বলে।

প্রধান অংশঃ ত্বক বা চর্মের প্রধান অংশদুটি হল -

[1] বহিত্বক বা এপিডারমিস এবং [2] অন্তত্বক বা ডারমিস।

 

ত্বকের কাজ: ত্বকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল — [1] বাইরের আঘাত থেকে দেহকে রক্ষা করা, [2] ঘর্ম নিঃসরণ করা এবং [3] দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা।

 

ঘর্মগ্রন্থি: ত্বকের ডারমিস স্তরে অবস্থিত যে গ্রন্থির সাহায্যে রেচন পদার্থপূর্ণ ঘাম দেহের বাইরে নিঃসৃত হয় এবং দেহকে শীতল রাখে, তাকে ঘর্মগ্রন্থি বলে। মানুষের ত্বকের ডারমিসে প্রায় 20-30 লক্ষ ঘর্মগ্রন্থি বর্তমান ।

মিশ্র গ্রন্থি: অন্তঃক্ষরা এবং বহিঃক্ষরা, উভয় গ্রন্থির সমন্বয়ে গঠিত গ্রন্থিকে মিশ্র গ্রন্থি বলে। যেমন—অগ্ন্যাশয়, শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়।

 

ঘর্মের কাজ হল— [1] দেহতাপ ও জলসাম্য নিয়ন্ত্রণ করা, [2] খনিজ পদার্থের ভারসাম্য বজায় রাখা ও [3] ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখা।

> উদরগহ্বরের ওপরের দিকে, অবস্থানকারী পৌষ্টিকনালীর সর্বাপেক্ষা স্ফীত অংশটিকে পাকস্থলী বলে। এটি J আকৃতিবিশিষ্ট পেশিময় থলি।

গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থি: পাকস্থলীর অন্তর্গাত্রে অসংখ্য এককোশী গ্রন্থি থাকে। এদের গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থি বলা হয়।

> কাজ : গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত প্রোটিনজাতীয় খাদ্যের পরিপাকে সহায়তা করে।

অ্যালভিওলাই : ফুসফুসে রক্তজালক দ্বারা আবৃত, পাতলা প্রাচীরযুক্ত, থলি সদৃশ যে অসংখ্য ছোটো ছোটো অংশের মাধ্যমে রক্ত ও ফুসফুসের বাতাসের মধ্যে গ্যাসীয় আদানপ্রদান ঘটে, সেগুলিকে অ্যালভিওলাই বলে।

> কাজ : অ্যালভিওলাই-এর কাজ হল রক্তজালকের মাধ্যমে প্রশ্বাস বায়ু থেকে রক্তে অক্সিজেন গ্রহণ ও কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগ করায় সাহায্য করা।

পুরা প্লুরা হল মানুষের ফুসফুসের দ্বিস্তরীয় বহিরাবরক।

কাজ : পুরা ফুসফুসের আবরকরূপে ফুসফুসকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে এবং ফুসফুসকে বক্ষপিত্তরের ভিতরের শহরের সঙ্গে বায়ুনিরুদ্ধভাবে ধরে রাখে।

মানুষের যকৃতের অবস্থান

মানুষের যকৃতটি মধ্যচ্ছদার নীচে এবং উদরগহবরের ওপরে ডানদিকে অবস্থিত।

মানুষের যকৃতের কাজ

[1] যকৃৎ ভবিষ্যতের জন্য মাইকোজেন সন্ধ্যয় করে। [2] এটি লোহিত রক্তকণিকা সৃষ্টি করে ও পরিণত লোহিত রক্তকণিকাকে ধ্বংস করে। [3] এটি শর্করা, প্রোটিন ও স্নেহপদার্থ পরিপাক এবং শোষণে সাহায্য করে। [4] প্রো

মানুষের যকৃতের অবস্থান

মানুষের যকৃতটি মধ্যচ্ছদার নীচে এবং উদরগহবরের ওপরে ডানদিকে অবস্থিত।

মানুষের যকৃতের কাজ

[1] যকৃৎ ভবিষ্যতের জন্য মাইকোজেন সন্ধ্যয় করে। [2] এটি লোহিত রক্তকণিকা সৃষ্টি করে ও পরিণত লোহিত রক্তকণিকাকে ধ্বংস করে। [3] এটি শর্করা, প্রোটিন ও স্নেহপদার্থ পরিপাক এবং শোষণে সাহায্য করে। [4] প্রো

মানুষের যকৃতের অবস্থান

মানুষের যকৃতটি মধ্যচ্ছদার নীচে এবং উদরগহবরের ওপরে ডানদিকে অবস্থিত।

মানুষের যকৃতের কাজ

[1] যকৃৎ ভবিষ্যতের জন্য মাইকোজেন সন্ধ্যয় করে। [2] এটি লোহিত রক্তকণিকা সৃষ্টি করে ও পরিণত লোহিত রক্তকণিকাকে ধ্বংস করে। [3] এটি শর্করা, প্রোটিন ও স্নেহপদার্থ পরিপাক এবং শোষণে সাহায্য করে। [4]

4] প্রোথ্রম্বিন, ফাইব্রিনোজেন ইত্যাদি রজতখন উপাদান ও প্লাজমা-প্রোটিন সংশ্লেষে যকৃৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মানুষের পাকস্থলির অবস্থান

গ্রাসনালি এবং গ্রহণির সংযোগস্থলে বক্ষপিণ্জরের বাঁদিকে পাকস্থলী অবস্থিত। 

মানুষের পাকস্থলীর কাজ

[1] পাকস্থলীর অন্তর্গার নিঃসৃত হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড থানাভ্রব্যের সঙ্গে মিশে থাকা জীবাণুকে ধ্বংস করে। [2] পাকস্থলির মধ্যে প্রোটিন এবং স্নেহপদার্থজাতীয় খাদ্যের আংশিক পরিপাক ক্রিয়া ঘটে এবং জন, গ্লুকোজ প্রভৃতি সরাসরি শোষিত হয়।

[3] এ ছাড়াও পাকস্থলি রসে ক্ষরিত লাইসোজাইম ব্যাকটেরিয়ার কোশপ্রাচীর ধ্বংস করে।

 

 

ত্বক

আমাদের দেহের আবরণকে ত্বক বলে।

ত্বকের অবস্থান

ত্বক আমাদের সমগ্রদেহে বাহ্যিক আবরক হিসেবে অবস্থান করে।

ত্বকের কাজ

1 দেহের নরম অংশকে রক্ষা করা : ত্বক দেহকে আবৃত রেখে দেহের নরম অংশকে রক্ষা করে।

2 ঘাম নিঃসরণ করা : ঘাম নিঃসরণের মাধ্যমে বিভিন্ন রেচন পদার্থ, অতিরিক্ত জল ইত্যাদি দেহ থেকে বাইরে নির্গত হয়।

3 জলের ভারসাম্য রক্ষা করা : দেহে জলের ভারসাম্য বজায় রাখা ত্বকের কাজ।

4 ভিটামিন সংশ্লেষ করা : ত্বক সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে ভিটামিন D সংশ্লেষে সহায়তা করে। 6 তাপ, চাপ, স্পর্শ অনুভব করা : তাপ, চাপ, স্পর্শ ইত্যাদি অনুভূতি ত্বকের মাধ্যমে অনুভূত হয়। এ ছাড়া স্পর্শের মাধ্যমে কোনো বস্তুকে শনাক্ত করা সম্ভবপর হয়।

 

মানুষের ফুসফুসের অবস্থান

মানুষের ফুসফুস দুটি বক্ষগহ্বরে হৃৎপিণ্ডের দু-পাশে মধ্যচ্ছদার ওপরে অবস্থিত।

ফুসফুসের কাজ

[1] ফুসফুস পরিবেশের সঙ্গে শ্বাসবায়ু আদান প্রদানে সহায়তা করে। পরিবেশ থেকে বারে 0, প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে। আবার, ফুসফুসের অ্যালভিওলাই-এর রক্তবাহে বেশি ঘনে CO2. নিশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুস থেকে নির্গত হয়। এভাবে শ্বাসগ্যাসের গ্রহণ ও রেচন পদার্থের বর্জনে ফুসফুস কাজ করে। [2] ফুসফুস রবের pH নিয়ন্ত্রণ করে।

মানুষের হৃৎপিন্ডের অবস্থান

বক্ষগহবরে, দুটি ফুসফুসের মাঝবরাবর সামান্য বাঁদিক ঘেঁষে তির্যকভাবে মানব হূৎপিণ্ড অবস্থিত।

মানব হৃৎপিণ্ডের কাজ

[1] রব সংবহনে কেন্দ্রীয় পাম্প হিসেবে কাজ করে। [2] হূৎপিণ্ড থেকে নিঃসৃত ANF এয়া ন্যাটিইউরেটিক ফ্যাক্টর) নামক হরমোন দেহে রত্নের চাপ ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। [3] হূৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রপ্রসারণের মাধ্যমে রকের সঙ্গে Og, খাদ্য উপাদান, হরমোন প্রভৃতি সহদেহের কলাকোশে পৌঁছে যায়।

অগ্ন্যাশয়ের অবস্থান

অগ্ন্যাশয় পাকস্থলীর নীচে, গ্রহনির ভাজের মধ্যবর্তী অংশে  এবং প্লিহার সঙ্গে সমান্তরালভাবে অবস্থিত।।

[1] অগ্ন্যাশয় নিঃসৃত অগ্ন্যাশয় রস হল গুরুত্বপূর্ণ পাচকরস। এটি শর্করা, প্রোটিন ও স্নেহপদার্থ পরিপাককারী উৎসেচক ক্ষরণ করে।

[2] এটি ইনসুলিন, গ্লুকাগন ও সোমাটোস্ট্যাটিন হরমোন ক্ষরণ করে।

বৃক্কের অবস্থান

মানবদেহে দুটি বৃত্ত উদরগহারের পৃষ্ঠদেশ সংলগ্ন অবস্থায়, মেরুদণ্ডের দু-পাশে দ্বাদশ বক্ষদেশীয় কশেরুকা অঞ্চল থেকে শুরু করে তৃতীয় কটিদেশীয় কশেরুকা অঞ্ছল পর্যন্ত বিস্তৃত।

বৃক্কের কাজ

[1] প্রোটিনজাতীয় খাদ্যদ্রব্যের বিশ্বাবের ফলে উদ্ভূত নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য পদার্থকে (যেমন—ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, ক্রিয়েটিনিন, আমোনিয়া ইত্যাদি) মুত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে বর্জন করা। [2] দেহে জলসাম্য বজায় রাখা। [3] রবে অম্লকারের সাম্যাবস্থা বজায় রাখা।

মস্তিষ্কের অবস্থান

মানুষের মস্তিষ্ক করোটির মধ্যে সুরক্ষিত থাকে।

মস্তিষ্কের কাজ

[1] দেহের বিভিন্ন অংশের শারীরবৃত্তীয় কাজের মধ্যে সমন্বয়সাধন করা। [2] বাহ্যিক পরিবেশ থেকে চাপ, তাপ, স্পর্শ, যন্ত্রণা ইত্যাদি অনুভূতি গ্রহণ, বিশ্লেষণ ও সমন্বয়সাধন করা। [3] দর্শন, প্রবণ, আস্বাদন, ঘ্রাণ ইত্যাদি গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করা। [4] স্মৃতিশক্তি, বিচারবুদ্ধি, চিন্তাশীলতা ইত্যাদি মানসিক বোধ নিয়ন্ত্রণ করা। [6] শ্বাসকার্য, লালাক্ষরণ, মুত্রত্যাগ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করা।

সুষুম্নাকাণ্ডের অবস্থান

এটি মস্তিষ্কের সুষুম্নাশীর্ষকের শেষভাগ থেকে শুরু হয়ে করোটির ফোরামেন ম্যাগনাম ও মেরুদণ্ডের নিউরাল ক্যানালের ভিতর দিয়ে প্রথম লাম্বার কশেরুকা পর্যন্ত বিস্তৃত।

সুষুম্নাকাণ্ডের কাজ

(1) সুষুম্নাকাণ্ড বহু প্রতিবর্ত ক্লিয়ার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। [2] এটি মস্তিষ্ক থেকে স্নায়ু উদ্দীপনা গ্রহণ করে পেশি ও আন্তরযন্ত্রীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যের মধ্যে সমন্বয়সাধন করে। [3] এটি দেহের প্রায় সকল অংশের সঙ্গে মস্তিষ্কের যোগসূত্র স্থাপন করে।

শুক্রাশয়

পুরুষের মুখ্য যৌনাঙ্গ বা গোনাডকে শুক্রাশয় বলে।

শুক্রাশয়ের অবস্থান

ভ্রুন দশায় শুক্রাশয় উদরগহ্বরে অবস্থান করে। শিশুর জন্মের প্রায় দু-মাস আগে এটি ধীরে ধীরে নীচে নেমে আসে এবং স্ট্রোটাম নামক থলির মধ্যে অবস্থান করে।

শুক্রাশয়ের কাজ

[1] শুক্রাশয়ের প্রধান কাজ হল পরিণত অবস্থায় এর সেমিনিফেরাস নালিকায় স্পার্মাটোজেনেসিস পদ্ধতিতে শুক্রাণু উৎপাদন করা। [2] শুক্রাশয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল লেভিগ-এর আন্তরকোশ থেকে টেস্টোস্টেরন নামক পুরুষ যৌন হরমোন ক্ষরণ করা।