দ্বিতীয় অধ্যায় ➤ পৃথিবীর গতিসমূহ

নিরক্ষরেখার উভয়দিকে ভূ-পৃষ্ঠকে পূর্ব-পশ্চিমে বেষ্টনকারী সমান অক্ষাংশযুক্ত কাল্পনিক রেখাগুলি হল অক্ষরেখা বা সমাক্ষরেখা। নিরক্ষরেখাও একটি অক্ষরেখা, অক্ষরেখাগুলি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত থাকে।

পৃথিবী তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথে, প্রায় 365 দিনে সূর্যের চারিদিকে একবার ঘুরে আসে। পৃথিবীর এই গতিকেই বার্ষিক গতি বলে। বার্ষিক গতির কারণেই পৃথিবীতে ঋতুপরিবর্তন হয়, দিনরাত্রির দৈর্ঘ্যের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে।

কোনো নির্দিষ্ট দ্রাঘিমারেখায় পরপর দুটি মধ্যাহ্নের (স্থানীয় সময় বেলা 12টা) সময়ের ব্যবধান হল সৌরদিন (solar day)। যেমন—পৃথিবীর একটি সৌরদিনের সময় 24 ঘণ্টা।

মহাকাশে সূর্য ছাড়া দূরের কোনো নক্ষত্রকে স্থির বিন্দু হিসেবে ধরে একটি নির্দিষ্ট দ্রাঘিমারেখায় সেই নক্ষত্রটির পরপর দুবার একই কোণে অবস্থান করার সময়ের ব্যবধান হল নাক্ষত্রদিন (sidereal day)। পৃথিবীর একটি নাক্ষত্রদিনের সময় 23 ঘণ্টা 56 মিনিট 4 সেকেন্ড।

মার্কিন বিজ্ঞানী উইলিয়াম ফেরেল 1855 সালে বলেন যে, পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলে সমুদ্রস্রোত ও বায়ুপ্রবাহ উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। দিকবিক্ষেপ-সংক্রান্ত এই সূত্রটি ‘ফেরেলের সূত্র’ নামে পরিচিত।

1835 সালে ফরাসি গণিতজ্ঞ গ্যাসপার্ড ডি. কোরিওলিস প্রমাণ করেন যে, পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য একটি কেন্দ্রবহির্মুখী বলের সৃষ্টি হয়। এটি তাঁর নাম অনুসারে কোরিওলিস বল নামে পরিচিত।

21 মার্চ থেকে 23 সেপ্টেম্বর উত্তরমেরু অঞ্চলে একটানা 6 মাস দিন এবং দক্ষিণ মেরুতে 6 মাস রাত্রি বিরাজ করে। অনুরূপভাবে, 23 সেপ্টেম্বর থেকে 21 মার্চ উভয়মেরু অঞ্চলে এর বিপরীত অবস্থা দেখা যায়।

নিরক্ষীয় অঞ্চলে পৃথিবীর আবর্তনের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি (ঘণ্টায় প্রায় 1670 কিমি) কারণ নিরক্ষীয় অঞ্চলে পৃথিবীর পরিধি সর্বাধিক। মেরুতে সবচেয়ে কম (0) হয় কারণ মেরুতে পৃথিবীর পরিধি শূন্য।

নিরক্ষীয় অঞ্চলে ঋতুপরিবর্তন ঘটে না। কারণ নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যরশ্মি সারাবছর লম্বভাবে পড়ে, ফলে সারাবছরই উন্নতা বেশি থাকে। তা ছাড়া, ছায়াবৃত্ত লম্বভাবে নিরক্ষরেখাকে ছেদ করায় সারাবছরই দিন ও রাত্রির দৈর্ঘ্য সমান হয়।

‘অয়ন' কথাটির অর্থ ‘পথ’ বা ‘গতি’। 'অয়নান্ত' (অয়ন + অন্ত) দিবস বলতে বোঝায় পথ বা গতির শেষ দিন।

| 22 ডিসেম্বর থেকে 21 জুন পর্যন্ত, মকরক্রান্তিরেখা (232 দঃ) থেকে কর্কটক্রান্তিরেখার (234° উঃ) দিকে সূর্যের উত্তরমুখী আপাত গতি লক্ষ করা যায়। এটিই হল সূর্যের উত্তরায়ণ।

21 জুনের পর থেকে 22 ডিসেম্বর পর্যন্ত, কর্কটক্রান্তিরেখা (232° উঃ) থেকে মকরক্রান্তিরেখার (2312° দঃ) দিকে সূর্যের দক্ষিণমুখী আপাত গতি লক্ষ করা যায়। এটিই সূর্যের দক্ষিণায়ন।

পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার। এই উপবৃত্তাকার কক্ষপথের একটি নাভিতে সূর্যের অবস্থান। ফলে, সূর্যকে পরিক্রমণকালে পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব সমান থাকে না।

| মহাকাশের একটি কাল্পনিক পথ, যে পথ বরাবর পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে সেটিই হল পৃথিবীর কক্ষপথ (orbit)। পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার।

সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরতম অবস্থান। 4 জুলাই তারিখে এই অবস্থান ঘটে। এই সময়ে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব হয় 15 কোটি 20 লক্ষ কিমি।

সূর্য থেকে পৃথিবীর নিকটতম অবস্থান। 3 জানুয়ারি তারিখে এই অবস্থান ঘটে। এই সময়ে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব হয় 14 কোটি 70 লক্ষ কিমি।

সূর্যোদয়ের ঠিক আগে, পৃথিবীর অন্ধকার অংশ ছায়াবৃত্ত পেরিয়ে আলোকিত অংশে প্রবেশ করতে শুরু করে। এই সময়টি হল ঊষা।

সূর্যাস্তের ঠিক পরে, পৃথিবীর আলোকিত অংশ ছায়াবৃত্ত পেরিয়ে অন্ধকার অংশে প্রবেশ করতে শুরু করে। এই সময়টি হল গোধূলি।

ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত প্রধানত এই চারটি ঋতু পর্যায়ক্রমিকভাবে আবর্তিত হয়। এটিই ঋতুচক্র।

আবর্তনের সময় পৃথিবীর যেসব স্থান অন্ধকার থেকে ছায়াবৃত্ত পেরিয়ে আলোকিত অংশে আসে, সেখানে প্রভাত হয়। অন্যদিকে আলোকিত অর্ধাংশ ছায়াবৃত্ত পেরিয়ে অন্ধকার অংশে এলে, সেখানে সন্ধ্যা হয়।

পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রস্রোত সোজা পথে প্রবাহিত না হয়ে একটু বেঁকে প্রবাহিত হয়। যে বলের কারণে বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রস্রোতের এই দিকবিক্ষেপ ঘটে তাকে কোরিওলিস বল (coriolis force) বা কোরিওলিস এফেক্ট বলে। 1835 সালে ফরাসি গণিতবিদ গ্যাসপার্ড গুস্তাভ দ্য কোরিওলিস (G. G. De Coriolis) এটি প্রথম আবিষ্কার করেন। তিনি বলেন পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্যই এই বলের সৃষ্টি হয়। তাঁর নামানুসারে এই বলকে কোরিওলিস বল বা কোরিওলিস এফেক্ট নাম দেওয়া হয়েছে।

কোরিওলিস বলের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে প্রবাহিত কোনো গতিশীল বস্তুর দিকবিক্ষেপ ঘটে। এই বলের প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে সোজাসুজি প্রবাহিত না হয়ে একটু ডানদিকে (ঘড়ির কাঁটার গতির দিকে) বেঁকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে একটু বামদিকে (ঘড়ির কাঁটার গতির বিপরীত দিকে) বেঁকে প্রবাহিত হয়। বিজ্ঞানী ফেরেল এই সূত্রটি আবিষ্কার করেন বলে, তাঁর নামানুসারে এই সূত্রকে ফেরেলের সূত্র বলে।

কোরিওলিস বলের প্রভাব মেরু অঞ্চল অপেক্ষা নিরক্ষরেখায় বেশি। পৃথিবীর আবর্তন গতিবেগও মেরু অঞ্চলে কম ও নিরক্ষরেখায় বেশি। এই আবর্তন বেগের পার্থক্যের জন্য নিরক্ষরেখায় প্রবাহিত বায়ুর গতিবেগ বেশি হয় ও মেরুর দিকে প্রবাহিত বায়ুর গতিবেগ কম থাকে। কিন্তু উভয় দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু তার পূর্বের গতিবেগ বজায় রাখার চেষ্টা করে। ফলে গতিবিক্ষেপ হয়। এই গতিবিক্ষেপের ফলে, নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে প্রবাহিত বায়ু উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। একই রকমভাবে সমুদ্রস্রোতেরও গতিবিক্ষেপ ঘটে।

যে নির্দিষ্ট পথে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে তাকে পৃথিবীর কক্ষপথ বলে। বৈশিষ্ট্য: [1] পৃথিবীর কক্ষপথটি উপবৃত্তাকার। [2] পৃথিবীর কক্ষপথের পরিধি প্রায় 96 কোটি কিলোমিটার। [3] পৃথিবীর কেন্দ্র এবং সূর্যের কেন্দ্র কক্ষপথের সমতলে অবস্থান করে। [4] পৃথিবীর কক্ষপথের একটি নাভিতে সূর্য অবস্থান করে।

উৎপত্তির পর থেকেই সূর্যকে সামনে রেখে পৃথিবী নিজের মেরুদণ্ডের চারিদিকে আবর্তন করে চলেছে। পৃথিবীর ওপরে অবস্থান করায় আমাদের মনে হয় পৃথিবী স্থির আর সূর্য পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে ঘুরে চলেছে। এজন্য সূর্যকে প্রতিদিন পূর্ব দিকে উদিত হতে আর পশ্চিম দিকে অস্ত যেতে দেখি। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন করছে বলেই সূর্যকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যেতে দেখি। আপাতভাবে সূর্যের এই পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরে যাওয়াকে সূর্যের দৈনিক আপাত গতি বলে।

সূর্যকে একবার সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর সময় লাগে 365 দিন 5 ঘণ্টা 48 মিনিট 46 সেকেন্ড। এই সময়কালকে বলে এক সৌরবছর। তবে, হিসাবের সুবিধার জন্য পৃথিবীর একবার সম্পূর্ণ পরিক্রমণের সময়কালকে 365 দিন ধরা হয়। এর ফলে, প্রত্যেক বছর যে প্রায় 6 ঘণ্টা (5 ঘণ্টা 48 মিনিট 46 সেকেন্ড) সময় কম ধরা হয়, তা প্রতি চতুর্থ বছরে ফেব্রুয়ারি মাসের সঙ্গে একদিন (6 × 1 = 24 ঘণ্টা বা 1 দিন) বাড়িয়ে পূরণ করা হয়। তাই প্রতি চতুর্থ বছরে ফেব্রুয়ারি মাস 29 দিনের এবং বছরটি 366 দিনের হয়। এজন্য যে বছরের ফেব্রুয়ারি মাস 29 দিনের হয় সেই বিশেষ বছরটিকে বলা হয়  লিপইয়ার বা অধিবর্ষ।

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অক্ষরেখায় পৃথিবীর আবর্তন গতিবেগ—

অক্ষরেখা    আবর্তনের গতিবেগ

0                               1,670 কিমি/ঘণ্টা

 

232° উঃ ও দ:         1,531 কিমি/ঘণ্টা

 

662° উঃ ও দ:       666 কিমি/ঘণ্টা

 

90° উঃ ও দ:           0

পৃথিবীর অক্ষ কক্ষতলের সঙ্গে 662° কোণ করে। অবস্থান করে অর্থাৎ, পৃথিবীর অক্ষ কিছুটা হেলানো অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে—[1] দিন ও রাত্রির দৈর্ঘ্যের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে।। [2] উন্নতার তারতম্য হওয়ায় ঋতুপরিবর্তন ঘটে। [3] সূর্যরশ্মির পতনকোণের পার্থক্য হয়। [4] একই সময়ে উত্তর গোলার্ধে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বিপরীত ঋতু দেখা যায়। [5] সূর্যকে কখনও বড়ো ও কখনও ছোটো দেখায় ।

3 জানুয়ারি সূর্য এবং পৃথিবীর মধ্যে দূরত্ব সবচেয়ে কম হয় (প্রায় 14 কোটি 70 লক্ষ কিমি)। এই সময়কে অনুসূর অবস্থা বলে। এই অবস্থায় পৃথিবীর পরিক্রমণ বেগ কিছুটা বেড়ে যায়। ফলে পৃথিবী অপেক্ষাকতে দ্রুতবেগে তার কক্ষপথে এগিয়ে যায়। এই সময় উত্তর গোলার্ধে শীতকালে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল থাকে। পৃথিবীর দ্রুত পরিক্রমণের জন্য এই সময় উত্তর গোলার্ধে শীতকালে দিনের সংখ্যা কম হয়।

সূত্র: নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে পৃথিবীর আবর্তন বেগ ক্রমশ কমে যায়। এর ফলে যে কোরিওলিস বলের সৃষ্টি হয় তার প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত প্রভৃতি ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি গতিশীল পদার্থই উত্তর থেকে দক্ষিণে বা দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রবাহিত হওয়ার সময় বেঁকে যায় বা গতিবিক্ষেপ ঘটে। ফল: এই গতিবিক্ষেপের ফলে বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে যায়। নামকরণ: মার্কিন বিজ্ঞানী উইলিয়ম ফেরেল 1855 খ্রিষ্টাব্দে এই সূত্রটি প্রতিষ্ঠা করেন বলে একে ফেরেলের সূত্র বলে।

পৃথিবী 23 ঘণ্টা 56 মিনিট 4 সেকেন্ড-এ নিজ অক্ষের ওপর একবার আবর্তন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন অক্ষরেখায় পরিধি বিভিন্ন হবার কারণে বিভিন্ন অক্ষরেখার আবর্তন বেগের তারতম্য হয়। নিরক্ষরেখা বরাবার পৃথিবীর পরিধি সবচেয়ে বেশি তাই নিরক্ষরেখা বরাবর পৃথিবীর আবর্তন বেগও সর্বাধিক। নিরক্ষরেখায় পৃথিবীর আবর্তন বেগ ঘণ্টায় 1670 কিমি। নিরক্ষরেখা থেকে যত মেরুর দিকে যাওয়া যায় ততই পৃথিবীর পরিধি ক্রমশ কমে যায় ও মেরুতে শূন্য হয়। তাই নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে আবর্তন কমে যায়।

পৃথিবীর নিজ অক্ষের চারিদিকে আবর্তন করার জন্য কেন্দ্রবহির্মুখী বলের সৃষ্টি হয়। পৃথিবী যখন গ্যাসীয় ও তরল অবস্থার ছিল তখন ওই বলের প্রভাবে মেরু অঞ্চলের বস্তু নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে সরে আসে। তার ফলে নিরক্ষীয় অঞ্চলটি ফোলা হয়েছে। অন্যদিকে দুই মেরুতে কেন্দ্রমুখী বলের কারণে মেরু প্রদেশ চ্যাপ্টা বা চাপা হয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীর অভিগত গোলীয় আকৃতি সৃষ্টির জন্য পৃথিবীর আবর্তনই দায়ী। বৃহস্পতি, শনি প্রভৃতি গ্রহগুলির আবর্তন বেগ পৃথিবী অপেক্ষা বেশি হবার জন্য এদের মেরুপ্রদেশ অনেক বেশি চ্যাপ্টা বা তাদের দুই মেরুপ্রদেশ বেশি চাপা।

বহু প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর গতির প্রমাণ সম্পর্কে নানা ধরনের মতপার্থক্য ছিল। প্রাচীনকালে মানুষ পৃথিবীকেন্দ্রিক মতবাদে বিশ্বাস করতেন। এই মতবাদে বলা হয় মহাবিশ্বের মাঝখানে রয়েছে পৃথিবী এবং তার চারপাশে গ্রহ, নক্ষত্র এবং অন্যান্য জ্যোতিষ্ক ঘুরে বেড়াচ্ছে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গ্রিক দার্শনিক থালে, অ্যানাক্সিম্যনডার, পরবর্তীকালে হেরাক্লিড, অ্যারিস্টার্কাস, টলেমি প্রমুখরা পৃথিবী

ডিসেম্বর মাসে অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে যাওয়ার স্বপক্ষে তিনটি যুক্তি হল—

[1] দিবাভাগের পরিমাণ বৃদ্ধি : ডিসেম্বর মাসে সূর্যের দক্ষিণায়ন হওয়ায় দিন বড়ো ও রাত্রি ছোটো হয়। দিনের আলো বেশিক্ষণ থাকায় পরীক্ষানিরীক্ষা ও গবেষণার সুবিধা হয়।

[2] উন্নতা বৃদ্ধি : ডিসেম্বর মাসে দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল থাকে। অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে উন্নতা হিমাঙ্কের ওপরে ওঠে, ফলে শীতের তীব্রতা কমে।বিজ্ঞানীরা

[3] পমনে সুবিধা : গ্রীষ্মে বরফ গলে যাওয়ার ফলে মহাদেশের প্রান্তসীমানা হ্রাস পায়, ফলে বিজ্ঞানীরা মহাদেশের অভ্যন্তরে অনেকটা জলপথে প্রবেশ করতে পারেন।

আমরা পৃথিবীর আবর্তন গতি বুঝতে পারি না, তার কারণ হল-

[1] সমান গতি : আমরা পৃথিবীর আবর্তন গতির সঙ্গে সমান গতিতে পৃথিবীর সঙ্গে ঘুরে চলেছি। ফলে, পৃথিবীর আবর্তন গতি আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।

[2] মাধ্যাকর্ষণ শক্তি : পৃথিবী মাধ্যাকর্ষণ বলের দ্বারা আমাদের ও ভূপৃষ্ঠের অন্যান্য বস্তুগুলিকে কেন্দ্রের দিকে আকর্ষিত করে। ফলে, আমরা পৃথিবীর আবর্তন গতি থাকা সত্ত্বেও বাইরে ছিটকে যাই না।

[3] ক্ষুদ্রাকার : পৃথিবীর আয়তনের তুলনায় আমরা এতই ক্ষুদ্র যে আমাদের পক্ষে পৃথিবীর আবর্তন গতি বোঝা সম্ভব নয়।

নিরক্ষীয় অঞ্চল অর্থাৎ নিরক্ষরেখার (0° অক্ষাংশ) পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ঋতুপরিবর্তন অনুভূত হয় না, কারণ—

[1] দিনরাত্রি সমান : ছায়াবৃত্ত নিরক্ষরেখাকে সমকোণে ছেদ করায় সারাবছরই নিরক্ষরেখা সন্নিহিত অংশে দিনরাত্রির দৈর্ঘ্য সমান হয়। অর্থাৎ, দিনরাত্রির হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে না।

[2] লম্বভাবে সূর্যরশ্মির পতন: নিরক্ষরেখা বরাবর সারাবছরই সূর্যরশ্মি প্রায় লম্বভাবে পড়ে। ফলে, এই অঞ্চলে বছরের সবসময় অধিক উন্নতা থাকে।

[3] বৃষ্টিপাত : নিরক্ষীয় অঞ্চলে জলভাগ বেশি বলে বছরের বেশিরভাগ সময়ই পরিচলন বৃষ্টিপাত ঘটে।

নিশীথ সূর্যের দেশে রাতের আকাশে সূর্যকে দেখা যায় তার কারণ হল-21 মার্চ থেকে 23 সেপ্টেম্বর পর্যন্ত 6 মাস সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবী এমন অবস্থানে থাকে যে, উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। ফলে, এই 6 মাস সুমেরুবৃত্ত থেকে সুমেরুবিন্দু পর্যন্ত অঞ্চলে 24 ঘন্টা দিন থাকে। তাই নরওয়ের হ্যামারফেস্ট বন্দর (710 : অক্ষাংশ) সন্নিহিত স্থান থেকে স্থানীয় সময় অনুযায়ী গভীর রাতেও আকাশে সূর্যকে দেখা যায়। এইজন্যই নরওয়ের হ্যামারফেস্ট বন্দর ও তার আশেপাশের স্থানসমূহকে বলে নিশীথ সূর্যের দেশ।

সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রন্থের গতির ধারণা: সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীসহ আরও সাতটি অর্থাৎ মোট আটটি গ্রহ, অসংখ্য উপগ্রহ, হাজার হাজার গ্রহাণুপুঞ্জ এবং অসংখ্য ধূমকেতু ঘুরে চলেছে। প্রতিটি গ্রহই নিজ মেরুদণ্ডের ওপর আবর্তন করে চলেছে। প্রতিটি গ্রহের এই অক্ষকেন্দ্রিক ঘূর্ণনকে আবর্তন গতি বলে। আবার, পৃথিবীর মতো প্রতিটি গ্রহ নিজ নিজ কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। প্রতিটি গ্রহের এই সূর্যকেন্দ্রিক প্রদক্ষিণকে পরিক্রমণ গতি বলে।

বুধ, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, নেপচুন প্রভৃতি গ্রহের আবর্তন গতি ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘটে। এরা পরস্পর থেকে দূরে অবস্থান করে নিজ নিজ কক্ষপথে অবিরাম ঘুরে চলেছে। অন্যদিকে শুক্র এবং ইউরেনাসের ঘড়ির কাঁটার অভিমুখে আবর্তন গতি রয়েছে।

সৌরজগতের গ্রহগুলির আবর্তনের সময়কাল ভিন্ন ভিন্ন এবং পরিক্রমণ কালও স্বতন্ত্র। সাধারণভাবে দেখা গেছে গ্রহদের আবর্তন সময়, পরিক্রমণ সময় অপেক্ষা কম। তবে শুক্রগ্রহ এর ব্যতিক্রম। শুক্রগ্রহের আবর্তনকাল প্রায় 243 দিন কিন্তু একবার পরিক্রমণের সময়কাল প্রায় 225 দিন। অর্থাৎ, পরিক্রমণকাল থেকে আবর্তনকালের সময় বেশি লাগে।

পৃথিবীর গতি সম্বন্ধীয় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ইতিহাস: বহু প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর গতির প্রমাণ সম্পর্কে নানা ধরনের মতপার্থক্য ছিল। প্রাচীনকালের বহু দার্শনিক, বিজ্ঞানী, ভৌগোলিক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নানা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর গতি সম্পর্কে নানা ধারণার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এরূপ মতপার্থক্যের ফলশ্রুতি হিসেবে দু-ধরনের মতবাদের সৃষ্টি হয়। যথা— [1] পৃথিবীকেন্দ্রিক (geocentric) মতবাদ এবং [2] সূর্যকেন্দ্রিক (heliocentric) মতবাদ।

[1] পৃথিবীকেন্দ্ৰিক মতবাদ : প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা পোষণ করতেন। তাঁরা মনে করতেন, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকার পথে সূর্য, চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহরা ঘুরছে। এঁদের মধ্যে অ্যারিস্টটল (384-322 খ্রিস্টপূর্বাব্দ), হেরাক্লিড (330 খ্রিস্টপূর্বাব্দ), অ্যারিস্টার্কাস (312-230 খ্রিস্টপূর্বাব্দ), টলেমি (90-168 খ্রিস্টাব্দ) প্রমুখ প্রধান। প্লেটো মনে করতেন, ব্রহ্মাণ্ডের ঠিক মাঝখানে পৃথিবী অবস্থান রোমান ক্যাথলিক চার্চও এই করছে। মধ্যযুগে মতবাদের সমর্থক ছিলেন। ও তার বিভিন্ন বহু

[2] সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ : ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্ট (476-550 খ্রি.) প্রথম বলেন যে, পৃথিবী স্থির নয়, এটি গতিশীল এবং পৃথিবী প্রতিদিন একবার করে নিজ অক্ষে পাক খায়। তবে 1530 খ্রিস্টাব্দে পোল্যান্ডের

জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাস তাঁর গ্রন্থে প্রথম উল্লেখ করেন, পৃথিবী তার নিজের অক্ষের ওপর সর্বদা ঘুরছে। অর্থাৎ, তিনিই প্রথম সূর্যকেন্দ্রিক ধারণা দেন। পরবর্তীকালে জোহানেস কেপলার 1609 খ্রিস্টাব্দে বলেন, গ্রহগুলির কক্ষপথ উপবৃত্তকার। গ্যালিলিয়ো গ্যালিলি দূরবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করেন এবং উপগ্রহগুলির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদকে সমর্থন করেন। পরে 1687 খ্রিস্টাব্দে স্যার আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষ সূত্রের সাহায্যে প্রমাণ করেন পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহগুলি সূর্যের চারিদিকে পরিক্রমণ করছে। এডমন্ড হ্যালি (1656-1742 খ্র.) ধুমকেতু পর্যবেক্ষণ করে বলেন যে পৃথিবীই সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে।

বর্তমানকালে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে প্রমাণ করা গেছে যে, সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদটিই সঠিক।

পৃথিবীর আহ্নিক গতির সপক্ষে প্রমাণসমূহ: যে গতির দ্বারা পৃথিবী নিজ অক্ষ বা মেরুদণ্ডের ওপর পশ্চিম থেকে পূর্বে (ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে) 23 ঘণ্টা 56 মিনিট 4 সেকেন্ডে বা প্রায় 24 ঘণ্টায় একবার আবর্তন করে, সেই গতিকেই আবর্তন বা আহ্নিক গতি (rotational movement) বলা হয়। পৃথিবীর যে আহ্নিক গতি আছে তা বিভিন্নভাবে প্রমাণ করা যায়, যেমন—

[1] দিন ও রাতের পর্যায়ক্রমিক সংঘটন: আবর্তন গতি আছে বলেই মোটামুটি প্রতি 24 ঘণ্টায় পৃথিবীর যে-কোনো স্থান পর্যায়ক্রমে একবার সূর্যের সামনে আসে। যদি পৃথিবীর আবর্তন গতি না থাকত, তাহলে পৃথিবীর যে অংশ সূর্যের সামনে থাকত সেখানে সবসময়েই দিন ও বিপরীত অংশে চির অন্ধকার বা রাত বিরাজ করত।

[2] পৃথিবীর অভিগত গোলীয় আকৃতি: কোনো নমনীয় বস্তু তার অক্ষরেখার চারিদিকে অনবরত আবর্তন করলে মাঝখানে সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রবিমুখ শক্তির উদ্ভব হয় এবং এর ফলে বস্তুর মধ্যভাগ কিছুটা স্ফীত এবং প্রান্তদ্বয় কিছুটা চাপা হয়। পৃথিবীও নিজের মেরুদণ্ডের চারিদিকে অনবরত আবর্তন করে চলেছে বলেই পৃথিবীর মেরুদ্বয় চাপা ও নিরক্ষীয় অংশ স্ফীত হয়েছে।

[3] খুব উঁচু স্থান থেকে পতনশীল প্রস্তরখণ্ডের আপাত সঞ্চালন পর্যবেক্ষণ: খুব উঁচু স্থান থেকে একটি প্রস্তরখণ্ড নিশ্চল বায়ুর মধ্য দিয়ে নীচে ফেলে দিলে দেখা যায় পাথরটি সোজাসুজি না পড়ে একটু পূর্বদিকে এগিয়ে পড়ে। পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্যেই এই ঘটনা ঘটে।

[4] কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি : মহাকাশে পাঠানো বিভিন্ন কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে যে ছবি তোলা হয়েছে তা থেকে পৃথিবীর আবর্তন গতির নির্ভুল ও সর্বাধুনিক প্রমাণ পাওয়া যায়।

[5] অন্যান্য গ্রহের আবর্তন গতি: সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ, যেমন–– বুধ, শুক্র প্রভৃতি সূর্যকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কক্ষপথে নিজ মেরুদণ্ডের চারদিকে আবর্তন করে চলেছে। পৃথিবী যেহেতু একটি গ্রহ, সে-ও সূর্যকে কেন্দ্র করে নিজ অক্ষের চারদিকে আবর্তন করছে।

[6] সমুদ্রস্রোত ও বায়ুপ্রবাহের দিকবিক্ষেপ : সমুদ্রস্রোত ও বায়ুপ্রবাহ দুই গোলার্ধে সোজাসুজি উচ্চচাপ বলয় থেকে নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত না হয়ে, উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে যায়। আবর্তন গতির ফলেই এই দিকবিক্ষেপ ঘটে।

[7] জোয়ারভাটার নিয়মিত সংঘটন : প্রধানত চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীতে জোয়ারভাটা হয়। পৃথিবীর আবর্তন গতি না থাকলে প্রতি 27 দিন অন্তর একবার মুখ্য জোয়ার হত। কিন্তু আবর্তন গতি আছে বলেই পৃথিবীর যে-কোনো স্থানে প্রতিদিন একবার মুখ্য জোয়ার সংঘটিত হয়।

[8] ফুকোর পরীক্ষা : ফরাসি বিজ্ঞানী ফুকো (1851 সাল)-এর দোলকের পরীক্ষার সাহায্যেও প্রমাণ করা যায়। যে, পৃথিবীর আবর্তন গতি রয়েছে।

পৃথিবীর যে-কোনো একটি গতি বা আহ্নিক গতির ফলাফল: যে গতির দ্বারা পৃথিবী নিজ অক্ষ বা মেরুদণ্ডের ওপর পশ্চিম থেকে পূর্বে (ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে) 23 ঘণ্টা 56 মিনিট 4 সেকেন্ডে বা প্রায় 24 ঘণ্টায় একবার আবর্তন করে, সেই গতিকেই আবর্তন বা আহ্নিক গতি বলা হয়। পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলাফলসমূহ-

[1] পর্যায়ক্রমে দিন ও রাত সংঘটন : পৃথিবী গোলাকার এবং নিজস্ব কোনো আলো নেই। সূর্যের আলোতেই পৃথিবী আলোকিত এবং উত্তপ্ত হয়। তাই আবর্তন করার সময় পর্যায়ক্রমে গোলাকার পৃথিবীর যে অংশে সূর্যের আলো পড়ে, সেখানে হয় দিন। বিপরীত অংশে সূর্যের আলো পড়ে না, ফলে সেখানে হয় রাত।

[2] সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত : পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করে বলেই প্রতিদিন পূর্ব দিকে সূর্যোদয় এবং পশ্চিম দিকে সূর্যাস্ত হয়।

[3] সময় নির্ধারণ : নিজ অক্ষের ওপর একবার সম্পূর্ণভাবে আবর্তন করতে পৃথিবীর সময় লাগে প্রায় 24 ঘণ্টা বা 1 দিন। প্রতিটি ঘণ্টাকে 60 মিনিটে এবং প্রতিটি মিনিটকে 60 সেকেন্ডে ভাগ করে সহজে সময় নির্ধারণ করা যায়।

[4]  নিয়ত বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রস্রোতের দিকবিক্ষেপ : নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে পৃথিবীর পরিধি ক্রমশ কমতে থাকে ফলে নিরক্ষরেখাতে পৃথিবীর আবর্তনের গতিবেগও সবচেয়ে বেশি হয় এবং মেরুর দিকে ক্রমশ কমে যায়। পৃথিবীর আবর্তন বেগের এই তারতম্যের জন্য নিয়ত বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রলেত প্রভৃতি উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।

[5] জোয়ারভাটা সৃষ্টি : মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম অনুসারে চাঁদ ও সূর্য উভয়ই পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। কিন্তু সূর্যের তুলনায় চাঁদ পৃথিবীর নিকটবর্তী বলে পৃথিবীর ওপর চাঁদের আকর্ষণের প্রভাব অপেক্ষাকৃত বেশি। আবর্তনের সময় পৃথিবীর যে স্থান চাঁদের সামনে আসে সেই স্থানের জলরাশি ফুলে ওঠে অর্থাৎ সেই স্থানে মুখ্য জোয়ার হয়। একই সময় এর ঠিক বিপরীত দিকে, পৃথিবীর আবর্তনের ফলে উদ্ভূত কেন্দ্রবহির্মুখী বা বিকর্ষণ শক্তির প্রভাবে গৌণ জোয়ার হয় এবং এর সমকোণে অবস্থিত স্থানগুলিতে তখন ভাটা হয়।

[6] উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ সৃষ্টি : আবর্তন গতি না থাকলে পৃথিবীর নির্দিষ্ট একটি অর্ধাংশে চিরকাল রাত থাকত, ফলে আলো ও উত্তাপের অভাবে কোনো কিছুই জন্মাতেপারত না। আর, অপর অর্ধাংশে চিরকাল

দিন থাকত—প্রচণ্ড উত্তাপে সেখানেও কোনো কিছু জন্মাতে পারত না। আবর্তন গতির জন্য পর্যায়ক্রমে দিন ও রাত হয় বলে উত্তাপের সমতা বজায় থাকে এবং পৃথিবীতে জীবজগৎ সৃষ্টি হয়েছে।

পৃথিবীর বার্ষিক গতির সপক্ষে প্রমাণসুস্থ: যে গতিতে পৃথিবী তার মেরুরেখা বা অক্ষের চারিদিকে আবর্তন করতে করতে একটি নির্দিষ্ট উপবৃত্তাকার কক্ষপথে নির্দিষ্ট গতিতে 365 দিন 5 ঘণ্টা 48 মিনিট 46 সেকেন্ডে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে, তাকে পৃথিবীর পরিক্রমণ গতি বা বার্ষিক গতি বলা হয়।

পৃথিবীর যে বার্ষিক গতি আছে তা বিভিন্নভাবে প্রমাণ করা যেমন

[1] সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের স্থান পরিবর্তন: পৃথিবীর পরিক্রমণ গতির জন্য আকাশে সূর্যের একটি আপাত

বার্ষিক গতি দেখা যায়। 21 মার্চ ও 23 সেপ্টেম্বর সূর্য ঠিক পূর্ব দিকে উদিত হয়ে পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। কিন্তু,

বছরের বাকি দিনগুলিতে সূর্য হয় একটু উত্তরে অথবা একটু দক্ষিণে সরে উদিত হয় এবং অস্ত যায়। পৃথিবীর

[4] অন্যান্য গ্রহের বার্ষিক গতি পর্যবেক্ষণ: শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায়, সৌরজগতের যেমন বুধ, মঙ্গল, বৃহস্পতি প্রভৃতি সূর্যকে পরিক্রমণ করে। পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ। সুতরাং, পৃথিবীও সূর্যকে পরিক্রমণ করে ।

[5] উপগ্রহ থেকে তোলা আলোকচিত্র : উপগ্রহ থেকে যে আলোকচিত্রগুলি পাওয়া যায় তার সাহায্যে সহজেই যদি বার্ষিক গতি না থাকত তবে প্রত্যেক দিন সূর্য ঠিক পূর্ব দিকেই উদিত হয়ে পশ্চিম দিকে অস্ত্র যেত।

[2] নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ: রাতের আকাশে কয়েকটি নির্দিষ্ট নক্ষত্র লক্ষ করলে দেখা যায়, নক্ষত্রগুলি প্রতি রাতে নিজের স্থান থেকে সামান্য একটু একটু করে সরে উদিত হয় এবং অস্ত যায়। এইভাবে কিছুদিন পরে এরা একেবারেই অদৃশ্য হয়ে যায়। এর পরিবর্তে কতকগুলি নতুন নক্ষত্র আকাশে দেখা যায় এবং ক্রমশ সেগুলিও ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়। একবছর পরে নক্ষত্রগুলিকে আবার আগের জায়গায় উদিত হতে এতে প্রমাণিত হয়, পৃথিবী সূর্যকে

দেখা যায়। পরিক্রমণ করতে করতে একবছর পরে আবার পূর্বের স্থানে ফিরে আসে।

[3] ঋতুপরিবর্তন এবং দিনরাত্রির দৈর্ঘ্যের হ্রাসবৃদ্ধি : পৃথিবীর পরিক্রমণ গতির জন্যই বছরের বিভিন্ন সময়ে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে ঋতুপরিবর্তন এবং দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যের হ্রাসবৃদ্ধি হয়।

প্রমাণ করা যায় যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে। অর্থাৎ, পৃথিবীর বার্ষিক গতি আছে।

ঋতু পরিবর্তনের কারণসমূহ: বিভিন্ন কারণে ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র সূর্যরশ্মি সারাবছর সমানভাবে পড়ে না। ফলে কোথাও হয় শীত, আবার কোথাও হয় গ্রীষ্ম।শীত ও গ্রীষ্মের এই পার্থক্য অনুসারে বছরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়, এবং প্রত্যেকটি ভাগকে বলে ঋতু। আর এই শীত ও গ্রীষ্মের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের নাম ঋতুপরিবর্তন। যেসব কারণে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে ঋতুপরিবর্তন হয়, সেগুলি হল—

[1] পৃথিবীর পরিক্রমণ গতি : পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপরঅবিরাম ঘুরতে ঘুরতে, একটি নির্দষ্ট পথে, নির্দিষ্ট দিকে (ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে) এবং নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে। একে পরিক্রমণ গতি বলে। এর ফলে, ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে সূর্যালোক প্রাপ্তির তারতম্য অনুযায়ী বছরের বিভিন্ন সময়ে উন্নতার যে তারতম্য হয়, প্রধানত তার ওপর ভিত্তি করেই আঞ্চলিক আবহাওয়া তথা জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন ঘটে।

[2] পৃথিবীর মেরুরেখার 662° কোণে অবস্থান: পরিক্রমণের সময় পৃথিবীর মেরুরেখা সর্বদাই কক্ষতলের সঙ্গে 664° কোণে অবস্থান করে বলে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যের হ্রাসবৃদ্ধি হয়। এর ফলে, ওইসব অংশে উয়তারও তারতম্য ঘটে। যেমন—যদি দিন বড়ো ও রাত ছোটো হয়, তবে দিনেরবেলায় ভূপৃষ্ঠে যে পরিমাণ তাপ সঞ্চিত হয়, রাত ছোটো হওয়ায় ওই তাপের সবটাই বিকীর্ণ হতে পারে না, কিছুটা সঙ্গিত অঞ্চলে গরম বাড়তে থাকে থেকে যায়। এর ফলে, এবং সেখানে গ্রীষ্মকালের সৃষ্টি হয়। আবার, দিন ছোটো ও রাত বড়ো হলে দিনেরবেলায় সজ্জিত তাপের সবটাই রাতে বিকীর্ণ হয়। ফলে, জায়গাটি ঠান্ডা হয়ে যায় এবং শীতকাল শুরু হয়।

[3] পৃথিবীর আবর্তন গতি: পৃথিবী নিজের মেরুদণ্ডের চারিদিকে আবর্তন করে বলে ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র দিন ও রাত হয় অর্থাৎ উয়তার তারতম্য হয় ও ঋতুপরিবর্তন হয়। আবর্তন গতি না থাকলে পৃথিবীর এক অর্ধে চিরগ্রীষ্ম এবং অপর অর্ধে চিরশীত বিরাজ করত।

[4] পৃথিবীর অভিগত গোলীয় আকৃতি: পৃথিবীর আকৃতি অভিগত গোলাকার বলে ভূপৃষ্ঠে সূর্যরশ্মির পতনকোণের তারতম্য হয়। ফলে সূর্যরশ্মি কোথাও লম্বভাবে, আবার কোথাও তির্যকভাবে পড়ে। তির্যকভাবে পতিত রশ্মির তুলনায় লম্বভাবে পতিত রশ্মিতে ভূপৃষ্ঠ অধিক গরম হয়, ফলে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে উয়তার তারতম্য হয়।

অনুসূর ও অপসুরের ধারণা: পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার। এই উপবৃত্তের একটি বড়ো অক্ষ (semi major axis) ও একটি ছোটো অক্ষ (semi minor axis) থাকে। সূর্য এই উপবৃত্তাকার কক্ষপথের ঠিক কেন্দ্রে নয়, একটি নাভি বা ফোকাস-এ অবস্থিত। এজন্য পরিক্রমণের সময় সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সারাবছর সমান থাকে না, কখনও একটু বাড়ে বা একটু কমে। সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্ব প্রায় 15 কোটি কিমি।

অনুসূর : 3 জানুয়ারি সূর্য থেকে পৃথিবীর দুরত্ব সবচেয়ে কম থাকে, প্রায় 14 কোটি 70 লক্ষ কিমি। কক্ষপথে সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর এই নিকটতম অবস্থানের নাম ‘অনুসূর' (perihelion) (অন’ শব্দের অর্থ কাছে, ‘সূর’ শব্দের অর্থ সূর্য)।

ফলাফল: [1] অনুসুর অবস্থানে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যেকার দুরত্ব কমে যায়। [2] অনুসূর অবস্থানের ফলে উত্তর গোলার্ধে শীতকালে সূর্যকে একটু বড়ো দেখায়। [3] এই সময়ে পৃথিবীর পরিক্রমণ গতিবেগও সামান্য বৃদ্ধি পায়। অপসূর : 4 জুলাই সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে, প্রায় 15 কোটি 20 লক্ষ কিমি। কক্ষপথে সূর্যের সাপেক্ষে

পৃথিবীর এই দূরতম অবস্থানের নাম 'অপসূর' (aphelion) (‘অপ’ শব্দের অর্থ দূরে, ‘সুর’ শব্দের অর্থ সূর্য)।

ফলাফল: [1] অপসূর অবস্থানে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যেকার দূরত্ব বেড়ে যায়। [2] অপসূর অবস্থানের ফলে উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে সূর্যকে একটু ছোটো দেখায়। [3] এই সময়ে পৃথিবীর পরিক্রমণ গতিবেগও সামান্য কমে যায়।