দ্বিতীয় অধ্যায় ➤ বল ও গতি

আমাদের চারপাশে বাড়িঘর, গাছপালা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের সাপেক্ষে স্থান পরিবর্তন করে না, তাই এরা হল পৃথিবীপৃষ্ঠের সাপেক্ষে স্থির বস্তু। কিন্তু পৃথিবী নিজেই সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে। অর্থাৎ
ঘরবাড়ি, গাছপালা ইত্যাদি পৃথিবীর সাপেক্ষে স্থির হলেও পরম স্থির নয়। আসলে মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই এইভাবে একে অপরের সাপেক্ষে গতিশীল । তাই প্রকৃতিতে পরম স্থিতি বলে কিছু নেই। যেহেতু পরম স্থিতিশীল বস্তুর কোনো অস্তিত্ব নেই, তাই পরম গতিশীল বস্তু বলেও কিছু হয় না। অর্থাৎ সব স্থিতি বা গতিই আপেক্ষিক ।

কোনো বস্তু যদি সরলরেখা বরাবর চলে, তবে তার গতিকে চলন গতি বলা হয় । এই ধরনের কোনো গতিশীল বস্তুর ওপর অবস্থিত যে-কোনো দুটি বিন্দুর সংযোজক সরলরেখা সর্বদা পূর্বের যে-কোনো অবস্থানে ওই দুটি বিন্দুর সংযোজক সরলরেখার সঙ্গে সমান্তরাল থাকে।

ছাদ থেকে একটি ঢিলকে ছেড়ে দিলে সেটি সোজাসুজি নীচের দিকে পড়তে থাকে। এক্ষেত্রে চিলটির গতি চলন গতি।

কোনো বস্তু যদি কোনো অক্ষের সাপেক্ষে ঘুরতে থাকে তাহলে বসন্নি গতিকে ঘূর্ণন গতি বলা হয়।
চলন্ত বৈদ্যুতিক পাখার গতি, বৃত্তাকার পথে চলা কোনো গাড়ির গতি ইত্যাদি হল ঘূর্ণন গতি। আবার পৃথিবী যে নিজের অক্ষের চারিদিকে লাট্টুর  মতে দিনরাত পাক খেয়ে চলেছে, সেই আহ্নিক  গতিও হল পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি।

কোনো বস্তু যদি এমনভাবে গতিশীল হয় যে, বস্তুর গতি বিশুদ্ধ চলন গতি বা ঘূর্ণন গতি নয় কিন্তু উভয় গতির সমন্বয়, তাহলে বস্তুর এরূপ গতিকে মিশ্র গতি বলা হয়।

কোনো গতিশীল গাড়ির চাকার গতি। গাড়ির চাকার কেন্দ্রবিন্দুস্থ কপাটি ছাড়া সকল কণার গতি হল মিশ্র গতি।

কোনো কণা  যদি কোনো নির্দিষ্ট অক্ষ বা বিন্দুর চারিদিকে বৃত্তপথে  পরিভ্রমণ করে, তবে কণার গতিকে বৃত্তীয় গতি বলা হয়।
সূর্যের চারিদিকে পৃথিবী বৃত্তাকার পথে ঘুরছে ধরে নিলে [পৃথিবীকে কণা হিসেবে কল্পনা করে] পৃথিবীর বার্ষিক গতি হল বৃত্তীয় গতি। সূর্যের চারিদিকে পৃথিবী প্রদক্ষিণকালে নিজ অক্ষের সাপেক্ষে আবর্তন করে যাকে আমরা আহ্নিক গতি বলি। এটি হল পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি।

কোনো কণা  যখন কোনো নির্দিষ্ট অক্ষ বা বিন্দুর চারিদিকে পরিভ্রমণ করে তখন ঘূর্ণনশীল অবস্থায় কণাটি যে বৃত্ত রচনা করে, সেই বৃত্তের তলটিকে ঘূর্ণন তল বলা হয়।
একটি কণা যখন বৃত্তপথে পরিভ্রমণ করে তখন বৃত্তপথের কেন্দ্রগামী ও ঘূর্ণন তলের ওপর লম্ব সরলরেখাকে ঘূর্ণাক্ষ বলে।

কোনো বস্তু যদি নির্দিষ্ট সময় অন্তর একই পথ বারবার অতিক্রম করে বা গতির পুনরাবৃত্তি করে, তবে বস্তুর গতিকে পর্যাবৃত্ত গতি বলা হয়।
সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর গতি, ঘড়ির কাঁটার গতি, সরল দোলকের গতি ইত্যাদি হল পর্যাবৃত্ত গতি।

কোনো বস্তু যদি একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর বারবার একই সরলরেখা বরাবর যাওয়া আসা করে, তবে তার গতিকে সরলরৈখিক দোলগতি বলা হয়।

কোনো নির্দিষ্ট দিকে কণার স্থান পরিবর্তনকে সরণ বলা হয়।  সরণ একটি ভেক্টর রাশি, কারণ সরণের মান ও অভিমুখ উভয়ই আছে।

কোনো গতিশীল কণার সরণ কখনও অতিক্রান্ত দূরত্বের চেয়ে বেশি হতে পারে না । কণাটি যদি সরলরৈখিক পথে একটি বিন্দু থেকে অপর বিন্দুতে পৌঁছোয় সেক্ষেত্রে সরণের মান অতিক্রান্ত দূরত্বের সমান হয় কিন্তু কণাটি বক্রপথে গতিশীল হলে সরণের মান অতিক্রান্ত দূরত্বের চেয়ে কম হয় ।

কোনো গতিশীল কণা একক সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে দ্রুতি বলে ।

দ্রুতির শুধু মান আছে অভিমুখ নেই, তাই দ্রুতি স্কেলার রাশি ।

কোনো গতিশীল কণা, যদি সমান সময়ের ব্যবধানে সমান দূরত্ব অতিক্রম করে, তাহলে ওই কণার দ্রুতিকে সমদ্ৰুতি বলা হয়।
কোনো গতিশীল কণা, যদি সমান সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন দূরত্ব অতিক্রম করে, তাহলে ওই কণার দ্রুতিকে অসমদ্রুতি বলা হয় ।

কোনো কণার বেগের মান ও অভিমুখ যদি সর্বদা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে কণাটির বেগকে সমবেগ বলা হয় ।
কোনো কপার বেগের মান বা অভিমুখ বা উভয়ের যদি সময়ের সাপেক্ষে পরিবর্তন হয়, তাহলে কণাটির বেগকে অসমবেগ বলা হয়।

কোনো দৃঢ় বস্তু হল একাধিক কণার সমষ্টি। এরূপ একটি দৃঢ় বস্তু যদি কোনো নির্দিষ্ট অক্ষের সাপেক্ষে ঘুরতে থাকে, তবে তার গতিকে ঘূর্ণন গতি (rotational motion) বলা হয়। এক্ষেত্রে দৃঢ় বস্তুটি ঘূর্ণাক্ষের সাপেক্ষে স্থানান্তরিত না হয়ে কেবলমাত্র দিক-সজ্জা (orientation) পরিবর্তন করে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্যানের ব্লেডের গতি হল ঘূর্ণন গতি। এক্ষেত্রে ফ্যানের কেন্দ্র-স্থিত অক্ষের সাপেক্ষে এর ব্লেডের ঘূর্ণন হয় | একইরকমভাবে লাট্টুর গতি, CD ড্রাইভে ডিস্কের গতি, পৃথিবীর আহ্নিক গতি ইত্যাদি সবই ঘূর্ণন গতির উদাহরণ।
অপরদিকে বৃত্তাকার পথ বরাবর একটি কণার গতি হল কপাটির বৃত্তীয় গতি (circular motion)। যেহেতু কণার আকার একটি বিন্দুর সমান, তাই কপার ঘূর্ণন গতি থাকা সম্ভব নয় ।  উদাহরণস্বরূপ, নিউক্লিয়াসের চারিদিকে বৃত্তপথে চলমান ইলেকট্রন কণার গতিকে বৃত্তীয় গতি বলা হয়। আবার সূর্যের
চারদিকে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ হল পৃথিবীর বৃত্তীয় গতি।

কোনো বস্তুর ওপর ক্রিয়াশীল কতকগুলি বলের পরিবর্তে একটি বল ক্রিয়া করলে যদি ক্রিয়াশীল বলগুলির মতো একই ফল সৃষ্টি করে তবে তাকে ওই বলগুলির লব্ধি বল বলা হয়।

বল প্রয়োগ করে—(1) স্থির বস্তুকে গতিশীল করা যায়,(2) গতিশীল বস্তুর বেগের মান বা অভিমুখ বা উভয়ই পরিবর্তন করা যায়, (3) গতিশীল বস্তুকে থামানো যায় এবং( 4) বস্তুর আকার বা আকৃতির পরিবর্তন করা যায়।

কোনো বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ সত্ত্বেও যদি বস্তুটির গতীয় অবস্থার কোনো পরিবর্তন না হয়, তবে বলা হয় যে, বস্তুটির ওপর প্রতিমিত বল প্রযুক্ত হচ্ছে ।  অর্থাৎ এক্ষেত্রে প্রযুক্ত বলগুলি বস্তুর ত্বরণ বা মন্দন ঘটাতে পারে না। প্রতিমিত বলের ক্রিয়ায় বস্তুতে কেবলমাত্র বিকৃতি দেখা যায়।
একটি স্প্রিং দু-হাত দিয়ে চেপে ধরলে স্প্রিংটি কেবল সংকুচিত হয়ে যায়, কিন্তু ওর গতির কোনো পরিবর্তন হয় না । আবার, দুজন ব্যাক্তি  একটি টেবিলের দু-গ্রিক ধরে পরস্পর বিপরীত মুখে টানলে টেবিলটি  যদি না সরে, তাহলে বলা যায় টেবিলের ওপর প্রতিমিত বল প্রয়োগ করা হচ্ছে ।

কোনো বস্তুর ওপর এক বা একাধিক বল ক্রিয়া করলে যদি ক্রিয়াশীল বলগুলির লব্ধি (resultant) শূন্য না হয়, তাহলে ওই বলগুলিকে কার্যকর বল বলা হয়।
কার্যকর বলের প্রভাবে বস্তুর গতীয় ধর্মের (স্থিতি বা গতির) পরিবর্তন ঘটে থাকে।

এক ব্যক্তি বাজার ভরতি ব্যাগ হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এক্ষেত্রে ব্যাগের ওপর পৃথিবীর অভিকর্ষ উল্লম্বভাবে নীচের দিকে ক্রিয়া করছে। আবার ব্যক্তি ব্যাগের ওপর এর ওজনের সমান ও বিপরীতমুখী একটি বল প্রয়োগ করছে।
ব্যাগের ওপর ক্রিয়াশীল বলগুলির লব্ধি শূন্য। তাই ব্যাগের ওজন ও ব্যক্তি দ্বারা প্রযুক্ত বলকে একত্রে বলা হয় প্রতিমিত বল । আর প্রতিমিত বলের প্রভাবে বস্তুতে কোনো ত্বরণ সৃষ্টি হয় না।

টেবিলটিকে দুই বান্ধবী দুই দিক থেকে পরস্পরের বিপরীতে সমান বল প্রয়োগ করে টানলে টেবিলটি সরবে না । এইভাবে বল প্রয়োগ করার অর্থ টেবিলটিতে প্রতিমিত বল প্রয়োগ করা। এর ফলে টেবিলটির ওপর লব্ধি বলের মান শূন্য হয়।

টেবিলটি দুই বন্ধু একইসঙ্গে সমান বল প্রয়োগ করে টেনে সরাতে হলে কখনোই পরস্পরের বিপরীতে বল প্রয়োগ করলে চলবে না। এ ছাড়া অন্য যে-কোনো অভিমুখে তারা বল প্রয়োগ করলেই টেবিলটি সরবে ।

দুই বধু যখন অসমান বল প্রয়োগে টেবিলটিকে টেনে সরায় তখন তারা যে-কোনো অভিমুখেই বল প্রয়োগ করুক না কেন, টেবিলটি সরবে।

কোনো বস্তুর ওপর কার্যকর বল ক্রিয়া করলে বস্তুর ত্বরণ সৃষ্টি হয় অর্থাৎ বেগের পরিবর্তন হয়। বেগের পরিবর্তন বিভিন্নভাবে হতে পারে— (1)স্থির বস্তু গতিশীল হতে পারে (2) গতিশীল বস্তুর বেগের মান পরিবর্তন হতে পারে, (3)গতিশীল বস্তুর বেগের অভিমুখ পরিবর্তন হতে পারে এবং (4) গতিশীল বস্তুর বেগের মান ও অভিমুখ দুই-ই পরিবর্তন হতে পারে।

বাইরে থেকে যা প্রয়োগ করে কোনো বস্তুর বেগের পরিবর্তন ঘটানো হয় বা পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়, তাকে বল বলা হয়। একমাত্র বাইরে থেকে প্রযুক্ত বলের প্রভাবেই বস্তুর বেগের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব । এইভাবে নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে কার্যকর বলের সম্বন্ধে ধারণা জন্মায়।

একটি স্প্রি নিয়ে দুহাতে সমপরিমাণ বল প্রয়োগ করে চেপে ধরলে  দেখা যাবে স্প্রিংটি সংকুচিত হয়ে গেল। এক্ষেত্রে দু হাত দিয়ে স্প্রিং এর ওপর সমপরিমাণ ও বিপরীতমুখী বল প্রয়োগ করা হয়েছে। এটি হল  প্রতিমিত বল। এই প্রতিমিত বলের ফলে স্প্রিং এর কোনো স্মরণ সৃষ্টি হয় না, কিন্তু এই বলের ফলে স্প্রিংটি সংকুচিত হয়ে যায়। স্প্রিংটির এই সংকোচনই হল বিকৃতি।

যে ধর্মের জন্য কোনো বস্তু, স্থিতিশীল বা গতিশীল যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, সেই অবস্থাতেই থাকতে চায় এবং সেই অবস্থার পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে বাধা দেয় তাকে জাড্য বলে।
জাড্য দুপ্রকার- স্থিতিজাড্য ও গতিজাড্য।

কোনো স্থির বস্তুর, সর্বদা স্থির থাকতে চাওয়ার প্রবণতাকে স্থিতিজাড্য বলা হয়।

কোনো গতিশীল বস্তুর, সর্বদা সমবেগে সরলরেখা বরাবর গতিশীল থাকতে চাওয়ার প্রবণতাকে গতিজাড্য বলা হয়।

একটি বাসের ভিতর কিছু যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে। এবার বাসটি হঠাৎ করে চলতে শুরু করলে যাত্রীরা পিছন দিকে হেলে যায়। এর কারণ হল গাড়ি যখন স্থির ছিল তখন যাত্রীরাও স্থির ছিল কিন্তু গাড়ি যখন হঠাৎ চলতে শুরু করল তখন যাত্রীদের নিম্নাংশ গাড়ির সংলগ্ন বলে গতিশীল হয় কিন্তু ঊর্ধ্বাংশ তখনও স্থিতিজাড্যের জন্য স্থির থাকতে চায় ও তাই যাত্রীরা পিছন দিকে হেলে যায়।

বালতিতে কানায় কানায় পূর্ণ জল নিয়ে বালতিকে হঠাৎ করে গতিশীল করলে বালতি থেকে কিছুটা জল পিছনের দিকে চলকিয়ে পড়ে। এর কারণ হল বালতির ওপর সামনের দিকে হঠাৎ বল প্রয়োগ করা হলে
বালতি সামনের দিকে গতিশীল হয় কিন্তু বালতির জল তখনও স্থিতিজাড্যের জন্য স্থির থাকতে চায় তাই পিছন দিকে চলকিয়ে পড়ে।

চলন্ত যাত্রীবাহী একটি বাস হঠাৎ থেমে গেলে, বাসের গতির অভিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এর কারণ হল গাড়ি যখন গতিশীল ছিল তখন যাত্রীরাও একই বেগে গতিশীল ছিল। গাড়ি যখন হঠাৎ ব্রেক কষে থেমে গেল তখন যাত্রীদের শরীরের নিম্নাংশ গাড়ির সংলগ্ন থাকায় সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে যায়। কিন্তু যাত্রীদের শরীরের ঊর্ধ্বাংশ গতিজাড্যের জন্য এগিয়ে যায়, ফলে যাত্রীরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বা হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
[একইভাবে ব্যক্তির জাড্য ধর্ম দিয়ে অনুরূপ প্রশ্নের উত্তরটি ব্যাখ্যা করা যায়।]
চলন্ত গাড়ি থেকে রাস্তায় পা দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তার ঘর্ষণে প স্থির হয়ে যায়। কিন্তু দেহের ঊর্ধ্বাংশের ওপর বাইরে থেকে কোনো বাধা  না আসায় তার গতিজাড্যের দরুন গতিশীল অবস্থা বজায় থাকে। ফলে ব্যালান্স না রাখতে পারলে ব্যক্তি সামনের দিকে পড়ে যেতে পারে।

কম্বল থেকে ধুলো ঝাড়ার সময় কম্বলকে কোনো অবলম্বন থেকে ঝুলিয়ে সজোরে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায় কম্বল থেকে  ধুলো ঝরে পড়ছে। এর কারণ হিসেবে বলা যায় কম্বলকে সজোরে আঘাত  করার ফলে প্রযুক্ত বলের দিকে কম্বল গতিশীল হয়। কিন্তু কম্বলের গা আলগাভাবে লেগে থাকা ধুলোবালি স্থিতিজাড্যের জন্য স্থির অবস্থ থাকতে চায়। এর ফলস্বরূপ ধুলোবালি কম্বল থেকে পৃথক হয়ে ঝরে পড়ে ।

দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীদের লক্ষ্য থাকে সবার আগে সীমারেখা অতিক্রম করা। তাই সীমারেখা স্পর্শ করার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিযোগী কখনোই তার বেগ কমাতে চায় না। সীমারেখায় পৌঁছেই প্রতিযোগী যদি হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়তে চায় তবে তার দেহের ঊর্ধ্বাংশ গতিজাড্য বজায় রাখার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। ফলে প্রতিযোগীর হুমড়ি খেয়ে সামনের দিকে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। পড়ে গিয়ে আঘাত থেকে বাঁচার জন্যই প্রতিযোগী সীমারেখায় পৌঁছেই থামতে চায় না, বরং ধীরে ধীরে তার বেগ কমিয়ে আনার জন্য আরও কিছুটা দৌড়ে তারপর থামে ।

একটি পাখি যখন ভূমি থেকে আকাশে উড়তে চায় তখন দুই ডানার সাহায্যে বায়ুর ওপর বল প্রয়োগ করে। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বায়ুও পাখির ওপর সমান ও বিপরীতমুখী বল প্রয়োগ করে। এই দুই প্রতিক্রিয়া বলের লব্ধি বরাবর পাখি গতিশীল হয় ।

বন্দুক থেকে গুলি ছুড়লে গুলি তীব্র বেগে সামনের দিকে ছুটে যায়। বন্দুক গুলির ওপর যে বল প্রয়োগ করে তা যদি ক্রিয়া ধরা হয়, তবে এই ক্রিয়ার ফলে গুলি সামনের দিকে এগিয়ে যায়। আবার গুলিও বন্দুকের ওপর যে সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া প্রয়োগ করে, তার ফলে বন্দুক পিছু হটে।

আকাশে ওড়ার সময় পাখি ডানার সাহায্যে বায়ুর ওপর একটি বল প্রয়োগ করে এবং বায়ুও পাখির ওপর সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করে। এই প্রতিক্রিয়া বলের প্রভাবে পাখি উড়তে পারে। বায়ুশূন্য স্থানে এইরূপ প্রতিক্রিয়া বলের উদ্ভব হয় না, তাই বায়ুশূন্য স্থানে পাখি উড়তে পারে না।

কোনো আরোহী নৌকো থেকে তীরে লাফ দেওয়ার সময় পা দিয়ে নৌকোর ওপর একটি বল প্রয়োগ করে, সেই বলের প্রভাবে নৌকো পিছিয়ে যায়। আবার ওই মুহূর্তে নৌকোও আরোহীর ওপর সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করে, যার প্রভাবে আরোহী তীরে পৌঁছোয়।

একটি বস্তু যখন অপর একটি বস্তু বা তলের ওপর দিয়ে গতিশীল হওয়ার চেষ্টা করে বা গতিশীল হয় তখন বস্তুর গতিপ্রবণতার বিরুদ্ধে বা গতির বিরুদ্ধে যে বাধাদানকারী বল ক্রিয়া করে তাকে ঘর্ষণ বলা হয়।

পরস্পর সংস্পর্শে থাকা দুটি বস্তুর মধ্যে একটি বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করা হলে, ধরা যাক সেটি অপর বস্তুর ওপর একটি বল প্রয়োগ করে। তাহলে নিউটনের তৃতীয় সূত্রানুসারে, দ্বিতীয় বস্তুটিও প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্রথম বস্তুটির ওপর বিপরীতমুখী সমান বল প্রয়োগ করবে। দ্বিতীয় বস্তু কর্তৃক প্রথম
বস্তুর ওপর লম্বভাবে প্রযুক্ত এই প্রতিক্রিয়াজনিত বলকে লম্ব প্রতিক্রিয়া বা লম্ব বল বলা হয়।