দ্বিতীয় অধ্যায় ➤ সংস্কার : বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা

‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার প্রকাশ

ভূমিকা: উনিশ শতকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা। পত্রিকাটির চালু প্রথম প্রবর্তক ও স্বত্বাধিকারী ছিলেন মধুসূদন রায়।
[1] প্রকাশ: 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে চালু হয়। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা ওই বছর ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। এই সময় পত্রিকাটি ছিল সাপ্তাহিক।
[2] সম্পাদক : 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার প্রথম স্বত্বাধিকারী মধুসূদন রায়ের চিঠি থেকে জানা যায় যে, ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
(১৮২৪-১৮৬১ খ্রি.)। হরিশচন্দ্র আড়াই বছর ধরে বিন পারিশ্রমিকে পত্রিকাটি পরিচালনা করেন। পরে তিনি মধুসূদন রায়ের কাছ থেকে পত্রিকাটির প্রেস ও কাগজের স্বত্ব কিনে নেন।
[3] দৈনিকে রূপান্তর : পত্রিকা চালিয়ে প্রথমদিকে আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েও হরিশচন্দ্র বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফের মাধ্যমে বিদেশি সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থা করে হিন্দু প্যাট্রিয়ট’-কে একটি আধুনিক পত্রিকায় পরিণত করেন। এর ফলে বাংলায় বিদেশিদের দ্বারা পরিচালিত
পত্রিকাগুলিও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ে। কিছুদিন পর ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ দৈনিক সংবাদপত্রে রূপান্তরিত হয়।

গ্রামবাৰ্ত্তাপ্রকাশিকা’ পত্রিকায় বাংলার সমাজচিত্র
ভূমিকা: উনিশ শতকে কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’ ছিল বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এই পত্রিকায় তৎকালীন বাংলার সমাজজীবনের যথেষ্ট প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। যেমন-

[1] সরকারের শোষণ: ব্রিটিশ সরকারের শোষণ ও অত্যাচারে বাংলার দরিদ্র প্রজাদের জীবন কীরূপ দুর্বিষহ উঠেছিল কাঙাল হরিনাথ তাঁর ‘গ্রামবাৰ্ত্তাপ্রকাশিকা' পত্রিকায় তুলে ধরেন।
[2] জমিদারদের শোষণ: ব্রিটিশ সরকারের সহযোগী বাংলার জমিদার, জোতদার, মহাজন প্রমুখের শোষণ ও অত্যাচার সাধারণ বাঙালি সমাজে কীরূপ দুর্দশার সৃষ্টি
করেছিল তাও এই পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পত্রিকায় তুলে ধরা হয় যে, পুলিশের কাছে বিচার চেয়েও এর কোনো প্রতিকার মিলত না। বরংঅভিযোগকারীরাই পুলিশের নির্যাতনের শিকার হত।
[3] প্রজাদের সমর্থন : ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে সিরাজগঞ্জে প্রজাবিদ্রোহ শুরু হলে 'গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা' প্রজাদের পক্ষ নেয়। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে দুর্ভিক্ষ শুরু হলে কাঙাল হরিনাথ তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পক্ষে সোচ্চার হন।
[4] নীলকরদের অত্যাচার: কাঙাল হরিনাথ কিছুদিন নীলকুঠিতে কাজ করার সময় কৃষকদের ওপর নীলকর সাহেবদের শোষণ ও অত্যাচারের বিষয়টি স্বচক্ষে দেখেন।
নীলচাষিদের ওপর এই শোষণ ও অত্যাচারের বিবরণ তিনি নিয়মিত তাঁর পত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকেন।
[4] সচেতনতা বৃদ্ধি: বাংলার দরিদ্র প্রজাদের ওপর সীমাহীন শোষণ ও অত্যাচারের ফলে বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন কীরূপ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল তার চিত্র পত্রিকাটিতে নিয়মিত প্রকাশ করে কাঙাল হরিনাথ বাংলার মানুষকে সচেতন করতে থাকেন।

5] অন্যান্য: শোষণ অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি এই পত্রিকায় সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, বিপ্লবীদের শপথ ও বীরত্বগাথা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা থাকত।
লালন ফকিরের গান প্রথম এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়।

ভারতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা-বিষয়ক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপট
ভূমিকা: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অষ্টাদশ শতকেশেষভাগে ভারতের বিস্তীর্ণ ভুখণ্ডে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর কোম্পানি কর্তৃক এদেশে কী ধরনের
শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করা উচিত সে প্রশ্নকে কেন্দ্র করে প্রাচ্য ওপাশ্চাত্য শিক্ষা-বিষয়ক দ্বন্দের সূত্রপাত ঘটে। এই দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপট ছিল নিম্নরূপ —
[1] ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইন: ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জন্য চার্টার অ্যাক্ট বা সনদ আইন পাস করে। এই আইনের একটি ধারায় বলা হয় যে,
কোম্পানি প্রতি বছর ১ লক্ষ টাকা ভারতীয় জনশিক্ষার জন্য ব্যয় করবে।
[2] জনশিক্ষা কমিটি: ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইন অনুসারে ভারতে জনশিক্ষার নীতি নির্ধারণের উদ্দেশ্যে ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে জনশিক্ষা কমিটি বা কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন গঠিত হয়।
[3] রামমোহনের দাবি: জনশিক্ষা কমিটি কলকাতায় একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রামমোহন রায় বড়োলাট লর্ড আমহার্স্টকে এক
পত্র লেখেন। তিনি এই পত্রে সংস্কৃত শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি ও আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাদানের দাবি জানান।
[4] দ্বন্দ্বের সূত্রপাত : ব্রিটিশ কোম্পানি ভারতে প্রাচ্যদেশীয় সংস্কৃত ভাষাশিক্ষার প্রসারের উদ্যোগ নিলেও রামমোহন রায়-সহ কেউ কেউ এদেশে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার
প্রসারের দাবি জানান। এভাবে ভারতে প্রাচ্য না পাশ্চাত্য কোন্ ধরনের শিক্ষার প্রসারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত সেবিষয়ে একটি দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

উনিশ শতকে বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার

ভূমিকা: ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সরকারপ্রথমদিকে এদেশে ইংরেজি ও আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ নেয়নি। কিন্তু উনিশ শতকে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে ও ভারতে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
[1] বিদেশি উদ্যোগ : প্রথমদিকে শোরবোর্ন, মার্টিন, বাউল, ডেভিড হেয়ার প্রমুখ বিদেশি এবং লন্ডন মিশনারি সোসাইটি, চার্চ মিশনারি সোসাইটি, ব্যাপটিস্ট মিশন প্রভৃতির উদ্যোগে কলকাতা-সহ বাংলার বিভিন্ন জেলায়বেশ কয়েকটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘পটলডাঙ্গা অ্যাকাডেমি’, ‘বিশপ কলেজ’, ‘জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউট’, ‘সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ’, ‘লরেটো হাউস স্কুল’ প্রভৃতি।
[2] দেশীয় উদ্যোগ: রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব,দ্বারকানাথ ঠাকুর, তেজচন্দ্র রায়, জয়নারায়ণ ঘোষাল প্রমুখের উদ্যোগে বাংলায় বেশ কয়েকটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল, হিন্দু কলেজ, ওরিয়েন্টাল সেমিনারি প্রভৃতি।
[3] সরকারি উদ্যোগ : ভারতের বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে এদেশে ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা ঘোষণা করেন। এরপর থেকে সরকারি
উদ্যোগে বেশ কয়েকটি ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কলকাতায় কলকাতা মেডিকেল কলেজ, রুরকিতে থমাসোন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (১৮৪৭ খ্রি.), বোম্বাই-এ এলফিনস্টোন ইনস্টিটিউশন (১৮৩৫ খ্রি.) প্রভৃতি।

উডের ডেন্সপ্যাচ
ভূমিকা: লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমল পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কিন্তু এসবপ্রতিষ্ঠানের পাঠক্রম ও গঠনরীতিতে কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। এই পরিস্থিতিতে বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড
১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষা-বিষয়ক একটি নির্দেশনামা প্রকাশ করেন। এটি উডের ডেসপ্যাচ বা উড়ের নির্দেশনামা নামে পরিচিত।
[1] সুপারিশ: উডের ডেসপ্যাচ-এ যেসব সুপারিশ করা হয় সেগুলি হল—[1] সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে ৫টি শ্রেণিতে বিভাজন,

[2] দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও প্রাথমিক স্কুল,মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা,

[3] কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা,

[4] একটি পৃথক শিক্ষাদপ্তর গঠন

[5] উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ কর্তা হিসেবে ‘ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন' পদ সৃষ্টি,
[6] শিক্ষক-শিক্ষণ ব্যবস্থা চালু,

[7] সাধারণ শিক্ষায়মাতৃভাষার ব্যবহার, [৪] উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব বৃদ্ধি,

[9] স্ত্রীশিক্ষার প্রসার প্রভৃতি।
[2] মহাসনদ : উডের নির্দেশনামা বা ডেসপ্যাচের ওপর ভিত্তি করে ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে
ওঠে। এই জন্য এই নির্দেশনামাকে ভারতে পাশ্চাত্যশিক্ষা বিস্তারের ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা ‘মহাসনদ' বলা হয়।

পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারে রাজা রামমোহন রায়েরভূমিকা

ভূমিকা: উনিশ শতকে বাংলায় আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩ খ্রি.) বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন যে,
আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার ওপর ভিত্তি করেই নতুন ভারত গড়ে উঠবে।
[1] বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা : পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে রামমোহন রায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল নামে একটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
[2] সরকারকে পত্র: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য বার্ষিক ১ লক্ষ টাকা ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিলে রামমোহন ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড আমহার্স্টকে দেওয়া পত্রে দাবি জানান যে, এই অর্থ আধুনিক বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের জন্য ব্যয় করা হোক।
[3] পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষে প্রচার : রামমোহন পাশ্চাত্য গণিত, দর্শন, রসায়ন, অস্থিবিদ্যা প্রভৃতি শিক্ষার সপক্ষে প্রচার চালান। তিনি কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন।
[4] বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা: শিক্ষার্থীদের মন থেকে নানা কুসংস্কার ও মূর্তিপূজা দূর করে পাশ্চাত্য সমাজবিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যা শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে রামমোহন রায় ১৮২৬
খ্রিস্টাব্দে বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
[5] অন্যদের সহায়তা : বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের কাজে তিনি ডেভিড হেয়ার, আলেকজান্ডার ডাফ প্রমুখকে নানাভাবে সহায়তা করেন। ডাফ জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন (১৮৩০ খ্রি.) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে রামমোহন তাঁকে বিশেষভাবে সহায়তা করেন। হিন্দু কলেজ (১৮১৭ খ্রি.) প্রতিষ্ঠায় রামমোহনের সহায়তার কথা কেউ কেউ স্বীকার করলেও ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার এই মত স্বীকার করেন না।

বাংলায় সমাজসংস্কারে ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগ
ভূমিকা: পাশ্চাত্য ভাবধারার প্রভাবে উনিশ শতকে বাংলায় ব্যাপক সমাজসংস্কার শুরু হয়। বাংলার সমাজসংস্কারের কাজে অগ্রভাগে ছিলেন ব্রাত্নসমাজের নেতৃবৃন্দ।
[1] ব্রাক্ষ্মসমাজের কাহিনি: রাজা রামমোহন রায় কলকাতায় ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রাত্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এর নাম হয় ব্রাত্মসমাজ। রামমোহনের মৃত্যুর
(১৮৩৩ খ্রি.) পরবর্তীকালে ব্রাহ্ণসমাজের নেতৃত্ব দেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ।
[2] রামমোহনের সময় : রামমোহন রায়ের সময় ব্রাহ্মসমাজএকেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠা, পৌত্তলিকতার সর্বধর্মসমন্বয়সাধন, মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি উদ্দেশ্যে
ব্যাপক প্রচার চালিয়ে বাংলায় সামাজিক আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়।
[3] দেবেন্দ্রনাথের সময় : রামমোহন রায়ের মৃত্যুর (১৮৩৩ খ্রি.) পর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮১৭-১৯০৫ খ্রি.) নেতৃত্বে ব্রাত্ম আন্দোলন আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর
উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ববোধিনী সভা (১৮৩৯ খ্রি.) সংস্কারমুক্ত ধর্ম আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই সভা বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, জাতিভেদ প্রথা প্রভৃতির বিরুদ্ধে এবং অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ, নারীশিক্ষা, নারীস্বাধীনতা, শ্রমিক কল্যাণ প্রভৃতির পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলে।
[4] কেশবচন্দ্রের সময়: কেশবচন্দ্ৰ নেতৃত্বে ভারতবর্ষীয় ব্রাত্নসমাজ সমাজসংস্কারে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। নারীশিক্ষা, অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ, পতিতা মেয়েদের উদ্ধার প্রভৃতির পক্ষে ব্রাহ্মসমাজ প্রচার চালায়। কেশবচন্দ্র বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, মদ্যপান,
পর্দপ্রথা প্রভৃতিরও বিরোধিতা করেন। শ্রমিকদের কল্যাণেও কেশবচন্দ্র নজর দেন।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ব্রাত্মসমাজের সমাজসংস্কার আন্দোলন
ভূমিকা: রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর (১৮৩৩ খ্রি.) ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলনের গতি কিছুদিনের জন্য কমে গেলেও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫ খ্রি.) ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে সমাজসংস্কার আন্দোলন আবার গতিশীল হয়ে ওঠে।
[1] তত্ত্ববোধিনী সভা: সংস্কারমুক্ত ধর্ম আলোচনার উদ্দেশ্যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে তত্ত্ববোধিনী সভা (১৮৩৯ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সভা দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের প্রগতিশীল মানুষের মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামতনু লাহিড়ী, অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ এই সভার সদস্য ছিলেন।
[2] তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা: তত্ত্ববোধিনী সভা থেকে প্রকাশিত'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা' (১৮৪৩ খ্রি.) ব্রামসমাজের আদর্শ ও চিন্তাধারা দ্রুত সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেয়। এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। পরবর্তীকালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন।
[3] শাখা: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ব্রাহ্মসমাজের ভাবধারা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ঢাকা, কুমিল্লা, রংপুর, বাঁশবেড়িয়া-সহ বাংলার বিভিন্ন স্থানে ব্রাহ্মসমাজের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।
[4] আন্দোলন : দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজ হিন্দুসমাজে প্রচলিত নানা ধরনের কুসংস্কারগুলির বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলে। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ,জাতিভেদপ্রথা প্রভৃতি কুপ্রথার বিরুদ্ধে এবং অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ, নারীশিক্ষা, নারীস্বাধীনতা, শ্রমিক কল্যাণ প্রভৃতি সমাজকল্যাণমূলক প্রথার সপক্ষে
ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন গড়ে তোলে।

‘নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী’র কার্যাবলির মূল্যায়ন
ভূমিকা: উনিশ শতকে বাংলার সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে, ডিরোজিও-র নেতৃত্বাধীন ‘নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী'র ভূমিকা সম্পর্কে
বিতর্ক রয়েছে। তাঁদের কার্যাবলির বিপক্ষে ও পক্ষে বিভিন্ন পণ্ডিত নানা যুক্তি দেখিয়ে থাকেন। যেমন—
[1] বিপক্ষে : বিভিন্ন পণ্ডিত নব্যবঙ্গ আন্দোলনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করেছেন। যেমন—
[1] এই আন্দোলন উগ্র ও নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে হিন্দুধর্ম ও সমাজকে আক্রমণ করে।
[2] দেশের দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক ও পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের নিয়ে নব্যবঙ্গরা বিশেষ কিছু ভাবেনি।
[3] শহরকেন্দ্রিক এই আন্দোলন গ্রামাঞ্চলে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি।
[4] ডিরোজিও-র মৃত্যুর পর এই আন্দোলনে দ্রুত ভাটা পড়ে। এসব ত্রুটিবিচ্যুতির
জন্য কেউ কেউ তাঁদের উচ্ছৃঙ্খল, কালাপাহাড়, ভ্রান্ত পুঁথিপড়া বুদ্ধিজীবী প্রভৃতি বলে সমালোচনা করেছেন।

[2] পক্ষে : নব্যবঙ্গ আন্দোলনের পক্ষে বলা হয় যে
[1] তৎকালীন বঙ্গীয় হিন্দুসমাজে তীব্র কুসংস্কার দূর করার জন্য নব্যবঙ্গদের উগ্রতার প্রয়োজন ছিল।
[2] সমাজসংস্কারে নব্যবঙ্গদের নিঃস্বার্থ ও আন্তরিক উদ্যোগ সম্পর্কে কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিল না।
[3] ডিরোজিও-র অনুগামীরা পরবর্তীকালে নিজ নিজ অঞ্চলে ফিরে গিয়ে সংস্কারের ধারাকে সচল রেখেছিল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, নব্যবঙ্গরা ছিলেন ‘বাংলার আধুনিক সভ্যতার প্রবর্তক, তাঁরা আমাদের জাতির পিতা, তাঁদের গুণাবলি চিরস্মরণীয়।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজের সমাজসংস্কার আন্দোলন
ভূমিকা: রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর (১৮৩৩ খ্রি.) ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলনের গতি কিছুদিনের জন্য কমে গেলেও
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫ খ্রি.) ব্রায়সমাজে যোগ দেওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে সমাজসংস্কার আন্দোলন আবার
গতিশীল হয়ে ওঠে।
[1] তত্ত্ববোধিনী সভা: সংস্কারমুক্ত ধর্ম আলোচনার উদ্দেশ্যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে তত্ত্ববোধিনী সভা
(১৮৩৯ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সভা দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের প্রগতিশীল মানুষের মিলনক্ষেত্রে পরিণত
হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামতনু লাহিড়ী, অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ এই সভার সদস্য ছিলেন।
[2] তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা: তত্ত্ববোধিনী সভা থেকে প্রকাশিত ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা' (১৮৪৩ খ্রি.) ব্রাষ্মসমাজের আদর্শ
ও চিন্তাধারা দ্রুত সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেয়। এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন অক্ষয়কুমার
দত্ত। পরবর্তীকালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন।
[3] শাখা: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ব্রাহ্মসমাজের ভাবধারা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ঢাকা,
কুমিল্লা, রংপুর, বাঁশবেড়িয়া-সহ বাংলার বিভিন্ন স্থানে ব্রাহ্মসমাজের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।
[4] আন্দোলন : দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজ হিন্দুসমাজে প্রচলিত নানা ধরনের কুসংস্কারগুলির বিরুদ্ধে
শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলে। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ,জাতিভেদপ্রথা প্রভৃতি কুপ্রথার বিরুদ্ধে এবং অসবর্ণ
বিবাহ, বিধবাবিবাহ, নারীশিক্ষা, নারীস্বাধীনতা, শ্রমিক কল্যাণ প্রভৃতি সমাজকল্যাণমূলক প্রথার সপক্ষে ব্রাহ্ণসমাজ আন্দোলন গড়ে তোলে। একেশ্বরবাদের প্রচার ও পৌত্তলিকতার বিরোধিতা ব্রাহ্মদের মূল আদর্শ হিসেবে ঘোষিত হয়।
[5] শিক্ষার প্রসার: শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে ব্রাহ্ণসমাজ সমাজোন্নয়ন বিধায়নী সুহৃদ সমিতি (১৮৫৪ খ্রি.), ব্রাত্মবন্ধুসভা (১৮৬০ খ্রি.), সঙ্গতসভা (১৮৬০ খ্রি.), ক্যালকাটা কলেজ (১৮৬২ খ্রি.) প্রভৃতি সংগঠন গড়ে তোলে।

‘নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী’র কার্যাবলির সীমাবদ্ধতা/ ত্রুটিবিচ্যুতি
ভূমিকা: উনিশ শতকে হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ডিরোজিও-র নেতৃত্বে তাঁর অনুগামী ‘নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী'র সদস্যরা যে সমাজসংস্কারের কাজ করে, বিভিন্ন পণ্ডিত সেই কাজের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটিবিচ্যুতি উল্লেখ করেন। যেমন—
[1] নেতিবাচক চিন্তাধারা : ‘নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী'র সদস্যরা গঠনমূলক চিন্তাধারার পরিবর্তে নেতিবাচক চিন্তাধারাকে আঁকড়ে ছিলেন। হিন্দুসমাজ ও ধর্মের বিষয়ে তাঁদের
উগ্রতায় আতঙ্কিত হয়ে হিন্দুসমাজের অধিকাংশ মানুষ তাঁদের বিপক্ষে চলে যায়।
[2] দরিদ্রদের প্রতি উদাসীনতা: ‘নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী’ দেশের দরিদ্র কৃষক শ্রমিকদের কল্যাণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তন বা কুটিরশিল্পের ধ্বংসের ফলে সাধারণ মানুষ চরম দুর্দশায় পড়লেও সে বিষয়ে তাঁরা সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন।
[3] দুর্বল ভিত্তি : নব্যবঙ্গ আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি ছিল খুবই দুর্বল। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়, শুধু শহুরে উচ্চশিক্ষিত কিছু তরুণের মধ্যে এই আন্দোলনের প্রভাব
সীমাবদ্ধ ছিল।
[4] মুসলিমদের প্রতি উদাসীনতা: মুসলিম জনগোষ্ঠী বাংলার সমাজের একটি বড়ো অংশ ছিল। কিন্তু মুসলিম সমাজের সংস্কারের বিষয়ে নব্যবঙ্গদের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
[5] আন্দোলনের সমাপ্তি: ডিরোজিও-র মৃত্যুর পরবর্তীকালে তাঁর অনুগামীরা ধীরে ধীরে নিজ নিজ চাকরি ও ব্যাবসায় মনোনিবেশ করলে আন্দোলন গতি হারিয়ে ফেলে।

বিধবাবিবাহ আন্দোলন
ভূমিকা: উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ভারতীয় হিন্দুসমাজে বিধবাবিবাহ স্বীকৃত ছিল না। ফলে বিধবা হিন্দু নারীরা সমাজে সীমাহীন দুর্দশার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হত।
[1] আন্দোলনের সূত্রপাত : বিধবাবিবাহ প্রচলনের উদ্দেশ্যে উনিশ শতকের মধ্যভাগে বিভিন্ন সমাজসংস্কারক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তত্ত্ববোধিনী সভা, ‘নব্যবঙ্গ
গোষ্ঠী', সুহৃদ সভা, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন, সত্যশোধক সমাজ, প্রার্থনা সমাজ প্রভৃতি এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়।
[2] জনমত গঠন : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিধবাবিবাহের সমর্থনে জনমত গঠন করতে থাকেন। তিনি ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক
প্রস্তাব' নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এবিষয়ে তিনি ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায়ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।
[3] বিধবাবিবাহ আইন: বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহকে আইনসম্মত করার উদ্দেশ্যে গণস্বাক্ষর সম্বলিত একটি  আবেদনপত্র সরকারের কাছে জমা দেন। শেষপর্যন্ত বড়োলাট লর্ড ক্যানিং ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে (১৬ জুলাই) বিধবাবিবাহ আইন পাস করে বিধবাবিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেন।
[4] বিধবাবিবাহের প্রচলন: ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন বর্ধমানের কালীমতী নামে জনৈক বিধবাকে বিবাহ করলে কলকাতায় প্রথম বিধবাবিবাহ সম্পন্ন হয়। বিদ্যাসাগর ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে নিজ পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে এক বিধবার সঙ্গে বিবাহ দেন।
[5] আন্দোলনের প্রসার বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহের সপক্ষে বাংলায় যে আন্দোলন শুরু করেন তা শীঘ্রই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলায় শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, বোম্বাইয়ে
প্রার্থনা সমাজ, মহারাষ্ট্রে ডি কে কার্ডে, মাদ্রাজে বিরসালিঙ্গম বিধবাবিবাহকে সাফল্ করে তলেন ।

বাংলার সমাজ ও ধর্মসংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজের অবদান

ভূমিকা: উনিশ শতকে বাংলার সমাজ ও ধর্মসংস্কারের ক্ষেত্রে ব্রাম্সমাজ শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলে। বাংলার সমাজজীবনে ব্রাহ্মসমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। যেমন—
[1] কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আঘাত: বাংলার রক্ষণশীল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকাঠামোয় সর্বপ্রথম জোরালো আঘাত হানে ব্রাহ্মসমাজ। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, অস্পৃশ্যতা, পর্দা প্রথা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কাজে ব্রাহ্মসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
[2] আধুনিকতা: পশ্চাদপদ হিন্দুসমাজের অগ্রগতির জন্য ব্রাহ্মসমাজ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। শিক্ষার প্রসার, নারীস্বাধীনতা, নারীর মর্যাদা, মদ্যপান নিবারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
[3] তিন আইন : ব্রাহ্ণসমাজের আন্দোলনের ফলে সরকার ‘তিন আইন’ নামে একটি আইন পাস করে। এই আইনের দ্বারা বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয় এবং বিধবাবিবাহ
ও অসবর্ণ বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়।4] দুর্দশা লাঘব : ব্রাহ্মসমাজ সাধারণ দরিদ্র শ্রমজীবী
মানুষের দুর্দশা লাঘবের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। কেশবচন্দ্র সেন সঙ্গত সভা (১৮৬০ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করে নিপীড়িত মানুষের জন্য জনসেবার আদর্শ গ্রহণ করেন।
[5] সুমহান আদর্শ : ব্রাহ্মসমাজ ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য প্রভৃতি সুমহান আদর্শ সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার করে জাতীয় জীবনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। ড. এ আর দেশাই বলেছেন যে, “ব্রাহ্ণসমাজ ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ”।

বিবেকানন্দের ‘নব্য বেদান্ত
ভূমিকা: স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২ খ্রি.) ছিলেন উনিশ শতকে ভারতের খাঁটি আধ্যাত্মবাদ ও নিখাদ দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের মূর্ত প্রতীক। ধর্মীয় ক্ষেত্রে তিনি যে আদর্শ প্রচার করেন তা নব্য বেদান্ত’ নামে পরিচিত। জান? স্বামী বিবেকানন্দের ‘নব্য বেদান্ত' সম্পর্কে কী
[1] লক্ষ্য: ব্যক্তিগত জীবনে দারিদ্র্য, দুঃখ, শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ, ভারত পরিক্রমার সময় নিজের চোখে ভারতবাসীর দুর্দশা দর্শন প্রভৃতি বিবেকানন্দের ধর্মচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এজন্য মানুষকে অনুষ্ঠান- সর্বস্ব ধর্মের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে সেবার আদর্শ তুলে ধরাই বিবেকানন্দ তাঁর ধর্মচিন্তার মূল লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেন।
[2] নতুন ধর্মাদর্শ: ভারতের প্রাচীন অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যাকর্তা ছিলেন আদি জগৎগুরু শঙ্করাচার্য (৭৮৮- ৮২০ খ্রি.)। স্বামী বিবেকানন্দ অদ্বৈত দর্শনের নতুন ব্যাখ্যা দেন যা ‘নব্য বেদান্তবাদ' নামে পরিচিত। এই ব্যাখ্যায় তিনি বলেন যে, সর্বত্রই ব্রন্থের উপস্থিতি রয়েছে। সাধারণ মানুষের সেবা করাই হল ব্রহ্মের সেবা করা।
[3] শিকাগো সম্মেলন: স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে (১১-২৭ সেপ্টেম্বর) আমেরিকার শিকাগো বিশ্বধর্ম সম্মেলনে (পার্লামেন্ট অব রিলিজিয়স) যোগ দেন। সেখানে তিনি তাঁর বক্তৃতায় ভারতের সনাতন হিন্দুধর্মের অদ্বৈত বেদান্তের বিশ্বজনীন আদর্শ ও বিশ্বজনীন মানবপ্রেমের আদর্শ ব্যাখ্যা করেন।
[4] সমাধি : প্রাচীন অদ্বৈত দর্শনে সমাধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিবেকানন্দ তাঁর নব্য বেদান্তবাদে মানুষের
মুক্তি অর্জনের জন্য সমাধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। এভাবে স্বামীজি তাঁর ‘নব্য বেদান্তবাদের’ মাধ্যমে মানুষকে মুক্তির নতুন পথ দেখান।

‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকা :
ভূমিকা: হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা ছিল উনিশ শতকের বাংলার একটি উল্লেখযোগ্য সংবাদপত্র। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি প্রথমে সাপ্তাহিক ছিল। কিন্তু পরে এটি দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। এই পত্রিকায় সমকালীন বাংলার সমাজজীবনের বিভিন্ন চিত্র সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
[1] হরিশচন্দ্রের সম্পাদনা: হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার জনপ্রিয়তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পত্রিকাটির প্রথম প্রবর্তক ও প্রথম স্বত্বাধিকারী
মধুসুদন রায়ের চিঠি থেকে জানা যায় যে, ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৮২৪-১৮৬১ খ্রি.)। হরিশচন্দ্র আড়াই বছর ধরে বিনা
পারিশ্রমিকে পত্রিকাটি পরিচালনা করেন। পরে তিনি মধুসূদন রায়ের কাছ থেকে পত্রিকাটির প্রেস ও কাগজের স্বত্ব কিনে নেন।
[2] পত্রিকার অগ্রগতি : হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। ‘হিন্দু
প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকাটি চালিয়ে প্রথম চার বছর যথেষ্ট আর্থিক লোকসানের শিকার হন। তা সত্বেও তিনি এটিকে একটি আধুনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত করেন। বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফের মাধ্যমে বৈদেশিক সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। ফলে স্বদেশের সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদও এই পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। এ ছাড়া
ব্যাবসাবাণিজ্য, বাজারদর, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়েও পত্রিকাটিতে সংবাদ পরিবেশিত হত। হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার প্রবল জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ফলে বাংলায় বিদেশিদের পরিচালিত পত্রিকাগুলিও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ে।
(3) নির্ভীক সাংবাদিকতা: হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নির্ভীক সাংবাদিকতার ফলে 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা প্রথম থেকেই ব্রিটিশ, নীলকর ও জমিদার-বিরোধী পত্রিকায় পরিণত হয়। তিনি তাঁর পত্রিকায় প্রথম থেকেই
সমকালীন বাংলার সামাজিক শোষণ, দরিদ্র শ্রেণির ওপর সীমাহীন অত্যাচার, তাদের দুরবস্থা প্রভৃতির চিত্র তুলে
ধরতে থাকেন। সাধারণ মানুষের ওপর সরকার ও পুলিশের অত্যাচার, বাংলার নীলচাষিদের ওপর নীলকর সাহেবদের অত্যাচার, বাংলার চাল G অন্যান্য
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রপ্তানি করে মদ আমদানি, পুরুষের বহুবিবাহ প্রভৃতির বিরুদ্ধে 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা
[4] শিক্ষিত শ্রেণির সচেতনতা: বাংলার দরিদ্র শ্রেণির ওপর সীমাহীন শোষণ ও অত্যাচারের ঘটনাবলীর কথা 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা থেকে কলকাতা-সহ বাংলার সমাজের শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত মানুষ জানতে পারে। এমনকি ইউরোপীয়রাও এই পত্রিকা থেকে দরিদ্রশ্রেণির ওপর তীব্র শোষণ ও অত্যাচারের কাহিনি জানতে পারে। হরিশচন্দ্র ভারতের সাম্রাজ্যবাদী শাসক লর্ড ডালহৌসির নগ্ন সাম্রাজ্যবিস্তারের নীতির তীব্র সমালোচনা করে। দুঃসাহসের পরিচয় দেন। বিভিন্ন লোভনীয় সরকারি চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি সরকারের বিরোধিতা চালিয়ে যান।
[5] নারী অধিকার: 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ধারাবাহিক প্রচার চালায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহের প্রবর্তন করলে হরিশচন্দ্র তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে বিধবাবিবাহের সমর্থনে জনমত গড়ে তোলেন। নারীশিক্ষাকে সমর্থন করে এই পত্রিকায় ব্যাপক প্রচার চালানো হয়।পতিতাদের নানা সমস্যার বিষয়ে এই পত্রিকায় বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।
[6] শিক্ষা : হরিশ্চন্দ্র বাংলা ভাষার প্রতি বিশেষ অনুরাণ দেখান। তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের গুরুত্ব, বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বিভিন্ন বইপত উদ্ধৃতি তুলে ধরা হয়। সরকারি শিক্ষানীতির বিষয়েও এই পত্রিকায় বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।
[7] সীমাহীন পরিশ্রম : গ্রামবাংলার অত্যাচারিত নীলচাষিদের মধ্যে উদার হৃদয় হরিশচন্দ্রের কথা ছড়িয়ে পড়লে তারা সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে হরিশচন্দ্রের ভবানীপুরের বাড়িতে এসে হাজির হত। হরিশচন্দ্রও চাষিদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতেন এবং তাদের মঙ্গলের জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করতেন। চাষিদের সমস্যার বিবরণ শুনে তা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে দেওয়া, দরখাস্ত লিখে দেওয়া, প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হতে পরামর্শ দেওয়া প্রভৃতি কাজে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করতেন।
উপসংহার: সীমাহীন পরিশ্রম, স্ত্রী ও সন্তানদের মৃত্যুতে মানসিক অবসাদ প্রভৃতির ফলে শীঘ্রই তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। তা সত্ত্বেও ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’-এর কাজ থেকে তিনি কোনোদিন ছুটি নেননি। অবশেষে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু ঘটে। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে যেন বাংলার নীলচাষিরা তাদের অভিভাবক হারালেন। তাই এই সময় বাংলায় এক কবিতা ছড়িয়ে পড়ে—
নীলবানরে সোনার বাংলা
করল এবার ছারখার,
অসময়ে হরিশ ম’ল,
লঙের হ’ল কারাগার।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা-বিষয়ক দ্বন্দ্ব
ভূমিকা: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমদিকে ভারতের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। উনিশ শতকের শুরুতে ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হলে ভারতে কী ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা উচিত সেবিষয়ে সরকারকে চিন্তাভাবনা শুরু করতে হয়। এদেশে সরকারের প্রাচ্য না পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগে নেওয়া উচিত সেবিষয়ে একটি দ্বন্দ্ব শুরু হয় যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা-বিষয়ক দ্বন্দ্ব নামে পরিচিত।
[1] দ্বন্দ্বের সূত্রপাত : ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে চার্টার অ্যাক্ট বা সনদ আইন পাস করে প্রতি বছর ১ লক্ষ টাকা ভারতীয়দের জনশিক্ষার জন্য ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুসারে জনশিক্ষা কমিটি বা কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন কলকাতায় একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু রামমোহন রায় সরকারকে লেখা এক পত্রের দ্বারা সংস্কৃত শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি ও আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাদানের দাবি জানান। এভাবে এদেশে প্রাচ্য না পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ নেওয়া উচিত সেবিষয়ে একটি দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
[2) জনশিক্ষা কমিটিতে বিভেদ: লর্ড উইলিয়াম বেন্টিকের শাসনকালে (১৮২৮-৩৫ খ্রি.) তাঁর আইন সচিব ব্যাবিংটন মেকলে জনশিক্ষা কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। এদেশে প্রাচ্য না পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করা উচিত—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে জনশিক্ষা কমিটির সদস্যরা কার্যত প্রাচ্যবাদী বা ওরিয়েন্টালিস্ট এবং পাশ্চাত্যবাদী বা অ্যাংলিসিস্ট নামে দুটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এভাবে সরকারি শিক্ষানীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে
পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
[3] প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাদী:
(1) প্রাচ্যবাদের সমর্থকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এইচ টি প্রিদেশ, কোলব্রুক, উইলসন প্রমুখ। প্রাচ্যবাদীরা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য বা দর্শন
বিষয়ে শিক্ষাদানের পক্ষপাতী ছিলেন।
[2] পাশ্চাত্যবাদের সমর্থকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মেকলে, সন্ডার্স, কলভিন প্রমুখ। আলেকজান্ডার ডাফ, পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের
পাশ্চাত্যবাদীরা ভারতে দাবি জানান।
[4] মেকলের প্রস্তাব: উগ্র পাশ্চাত্যবাদী মেকলে বলেন যে, ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি তাক ভারত ও আরবের সমগ্র সাহিত্যের সমকক্ষ।” তিনি ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের দাবি জানিয়ে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের (২ ফেব্রুয়ারি) বড়োলাট লর্ড বেন্টিঙ্কের কাছে একটি প্রস্তাব (Minutes) দেন যা মেকলে মিনিট নামে। পরিচিত।
(5) মেকলে মিনিটের বক্তব্য : মেকলে তাঁর 'মিনিট' বা প্রস্তাবে বলেন যে - [1] প্রাচ্যের শিক্ষা বৈজ্ঞানিক চেতনাহীন এবং পাশ্চাত্যের তুলনায় সম্পূর্ণ নিকৃষ্ট।
[2] প্রাচ্যের সভ্যতা দুর্নীতিব্রস্ত ও অপবিত্র। তাই এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তিত হওয়া উচিত।
[3] এদেশে উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটলে ক্রম্ম্্নিম্ম্রে তা ক্রমশ সাধারণ দেশবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
[4] পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারের ফলে এদেশে এমন একটি সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটবে যারা “রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি, মত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিমত্তায় হবে ইংরেজ।"
উপসংহার: ভারতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা-বিষয়ক দ্বন্দ্বে শেষপর্যন্ত পাশ্চাত্যবাদীরা জয়ী হন। বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের (৭ মার্চ) পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষা ণও ইংরেজি শিক্ষার প্রসারকে সরকারের শিক্ষানীতি হিসেবে ঘোষণা করেন। ফলে ভারতের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা সরকারি আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং এদেশে দ্রুত পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে।

 ইংরেজি শিক্ষার প্রসার

ভূমিকা: ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথমদিকে সরকার এদেশে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে বিশেষ উদ্যোগ নেয়নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী চার্লস গ্রান্ট ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে লিখিত ‘অবজারভেশন' নামে এক পুস্তিকায় মত
প্রকাশ করেন যে, ভারতের পশ্চাদপদ সমাজ, ধর্ম ও নৈতিকতার উন্নয়নের জন্য এদেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানো দরকার। যদিও কোম্পানি তখন এবিষয়ে গুরুত্ব দেননি। কেননা, সরকার মনে করত যে, ভারতের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থা এদেশে চাপিয়ে দিলে ভারতীয়রা ক্ষুব্ধ হতে পারে।
[1] ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা : প্রথমদিকে ব্রিটিশ
সরকার ভারতে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ না
নিলেও এদেশে বিভিন্ন কারণে ইংরেজি শিক্ষার চাহিদা
ক্রমশ বাড়তে থাকে।

[1] এদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, ব্যাবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
প্রভৃতির ধারাবাহিক প্রসার ঘটলে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ইংরেজি জানা কর্মচারীর বিশেষ প্রয়োজন দেখা দেয়।
[2] মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকরা চাকরি লাভের আশায় ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

[3] এদেশে আগত খ্রিস্টান মিশনারিরা খ্রিস্টধর্মের প্রচারের জন্যও ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানোর প্রয়োজন অনুভব করে।
[2] প্রাথমিক উদ্যোগ : এদেশে ইংরেজি শিক্ষার চাহিদা ক্রমশ বাড়তে থাকলে প্রথমদিকে কয়েকজন বিদেশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলকাতায় কয়েকটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শোরবোর্ন, মার্টিন, বাউল, অরটুন পিট্রাস, ডেভিড ড্রামণ্ড প্রমুখ।
[3] মিশনারিদের উদ্যোগ: ইউরোপের বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি গোষ্ঠী বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রসারের উদ্দেশ্যে এখানকার বিভিন্ন স্থানে ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে আসে। লন্ডন মিশনারি সোসাইটি, চার্চ মিশনারি সোসাইটি ও শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশনের উদ্যোগে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে এবং কলকাতার বাইরে চুঁচুড়া, বর্ধমান, বহরমপুর ও কালনা মালদহ প্রভৃতি শহরে বেশ কয়েকটি ইংরেজি বিদ্যালয় মার্শম্যান, ওয়ার্ড প্রমুখের উদ্যোগে ১২৬টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। লন্ডন মিশনারি সোসাইটির রবার্ট মে চুঁচুড়ায় একটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শিমিশনের প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার ডাফ-এর প্রচেষ্টায় বাংলায় কয়েকটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হল ১৮৫০
খ্রিস্টাব্দের কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত জেনারেল অ্যাসেম্বলিত প্রথম বিশপ মিডলটন শিবপুরে বিশপ কলেজ(১৮১৯ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন। জেসুইট মিশনারিরা কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ(১৮৩৫ খ্রি.) এবং লরেটো হাউস স্কুল (১৮৪২ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন।
(4) বিভিন্ন মনীষীর উদ্যোগ বাংলায় রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, দ্বারকানাথ ঠাকুর, বাঘ, জয়নারায়ণ ঘোষাল এবং স্কটল্যান্ডের ঘড়ি প্রস্তুতকারকডেভিড হেয়ার প্রমুখ মনীষীও বাংলায় ইংরেজি শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ভবানীপুর এবং ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে চুঁচুড়ায় ইংরেজকলকাতায় অ্যাংলো হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ডেভিড হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ডেভিড হেয়ার পটলতা অ্যাকাডেমি (১৮১৮ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে হেয়ার স্কুল নামে পরিচিত। বিভিন্ন স্থানে ইংরেজি
বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্যে ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি (১৮১৮) প্রতিষ্ঠা হয়। পৌরমোহন আঢ‍্যওরিয়েন্টাল সেমিনারি (১৮২৮ খ্রি.) নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
উপসংহার: বড়োলাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ঘোষণা করেন যে, ইংরেজি ভাষাজ্ঞানকে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকরা সরকারি চাকরি লাভের আশায় ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে উডের ডেসপ্যাচ বা নির্দেশনামায়ও ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের সপক্ষে অভিমত দেওয়া হয়। সরকারি উদ্যোগে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এদেশে ১৫১টি ইংরেজি বিদ্যালয় গড়ে ওঠে।