দ্বিতীয় পাঠ ⇒ ধীবর-বৃত্তান্ত

কালিদাসের ‘ধীবর-বৃত্তান্ত’ নাট্যাংশে ধীবরের কাছে রাজার নাম খোদাই করা মণিখচিত আংটি দেখে নগর রক্ষায় নিযুক্ত রাজার শ্যালক এবং দুজন রক্ষী পিছনে হাত বেঁধে তাকে নিয়ে আসেন। ধীবর আংটি চুরি করেনি জানালেও তাঁরা তা বিশ্বাস করেন না। প্রথম রক্ষী বিদ্রূপ করে জানতে চায় তাকে
সদব্রাহ্মান বিবেচনা করে রাজা আংটিটা দান করেছেন কি না। ধীবর এইসময় রক্ষীদের তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রূপের মুখে পড়ে। সে জাল, বড়শি ইত্যাদি দিয়ে মাছ ধরার কথা বললে তা নিয়েও ব্যঙ্গ শুনতে হয়। ধীবর এর প্রতিবাদ করে। সে রুইমাছ কাটার সময়ে তার পেটে আংটি পাওয়ার কথা বলে। রাজশ্যালক ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে রাজার কাছে যান। রক্ষীরা ধীবরকে হত্যার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু শ্যালক ফিরে এসে জানান যে, ধীবর সবই সত্য কথা বলেছে। তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, রাজা খুশি হয়ে ধীবরকে আংটির সমমল্য অর্থ দিয়েছেন। ফলে দিনের কাজ বন্ধ হলেও ধীবরের ক্ষতি পুষিয়ে যায়। এভাবে আংটিকে কেন্দ্র করে বিচিত্র ঘাত- প্রতিঘাতের শিকার হয় ধীবর।

কালিদাসের ‘ধীবর-বৃত্তান্ত’ নামক নাট্যাংশে বন্দি ধীবর রাজার শ্যালক এবং রক্ষীদের জানিয়েছিল যে সে জাল, বড়শি ইত্যাদির সাহায্যে মাছ ধরে সংসার চালায়। তখন রাজার শ্যালক তার জীবিকা খুবই পবিত্র বলে ব্যঙ্গ করেন। এই বিদ্রুপের পরিপ্রেক্ষিতেই ধীবর ('পুরুষ') চরিত্রটি রাজার শ্যালককে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নোধৃত মন্তব্যটি করেছেন।  ধীবর তার এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রখর আত্মসম্মানবোধেরই পরিচয় দিয়েছে। সে রাজশ্যালককে তার পেশা নিয়ে কোনোরকম নিন্দাসূচক কথা না বলতে অনুরোধ
করে। বেদজ্ঞ ব্রাক্ষ্মণের উদাহরণ দিয়ে সে বলে যে এই ব্রাহ্মণ স্বভাবে দয়াপরায়ণ হলেও যজ্ঞের পশুবধের সময় নির্দয় হয়ে থাকে। অর্থাৎ কোনো পেশাই সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার হতে পারে না ।এভাবেই সে নিজের পেশাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কালিদাসের লেখা 'ধীবর বৃত্তান্ত’ নাট্যাংশে রাজশ্যালক ও রক্ষীদের কাছে ধীবর তার আংটি পাওয়ার বৃত্তান্তটি সবিস্তারে জানানোর পর রাজশ্যালক ধীবরের উদ্দেশ্যে উদ্ধৃত উক্তিটি করেন। তিনি জানুক নামে রক্ষীটিকে ডেকে বলেন যে, ধীবরের শরীর থেকে কাঁচা মাংসের গন্ধ আসছে, অতএব সে নিশ্চয়ই
'গোসাপ-খাওয়া জেলে'। এখানে 'গোসাপ খাওয়া জেলে' বলতে অত্যন্ত নীচু জাতের জেলে সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়েছে। যদিও ধীবরের মাছের পেট থেকে আংটি পাওয়ার ঘটনাটি রাজশ্যালক একেবারে নস্যাৎ করে দেননি, তবে তার সত্যাসত্য যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি জানান। রাজার শ্যালক ছিলেন নগররক্ষার কাজে নিযুক্ত। সেদিক থেকে দেখলে তিনি বিশেষ ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী, সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। স্বাভাবিকভাবেই দরিদ্র ধীবর তাঁর অবজ্ঞা ও অবিশ্বাসের পাত্র হয়ে ওঠে। এই অবজ্ঞা শুধু ধীবরের পেশা নিয়েই নয়, তার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সম্প্রদায়গত
অবস্থানও রাজশ্যালকের ব্যঙ্গের বিষয় হয়ে ওঠে। বর্ণবিভক্ত সমাজে উচ্চবর্ণের মানুষ নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি যে ঘৃণার ভাব পোষণ করত তার কথাই এখানে বলা হয়েছে ।

কালিদাসের ‘ধীবর বৃত্তান্ত’ নাট্যাংশে ‘আমাদের প্রভু' বলতে দ্বিতীয় রক্ষী নগর রক্ষার দায়িত্বে থাকা রাজার শ্যালকের কথা বলেছে। রক্ষীরা আংটি চুরির অপরাধে ধীবরকে ধরে নিয়ে আসে এবং রাজার আদেশে তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য মহা- উৎসাহে অপেক্ষা করতে থাকে। রাজশ্যালক রাজার কাছে গিয়েছিলেন আংটি পাওয়ার ঘটনা সবিশেষ জানাতে। তাই রক্ষীরা অপেক্ষা করছিল ধীবরকে শকুনি দিয়ে খাওয়ানো হবে না কি কুকুর দিয়ে খাওয়ানো হবে, সেই নির্দেশ পাওয়ার জন্য। কিন্তু রক্ষীদের অপেক্ষা শেষপর্যন্ত সফল হয়নি। কারণ, রাজার কাছ থেকে ঘুরে এসে রাজশ্যালক জানান যে আংটি পাওয়ার বিষয়ে ধীবর যা যা বলেছে তা সবই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ফলে রাজা ধীবরকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মহারাজ খুশি হয়ে আংটির মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ তাকে
দিয়েছেন বলেও শ্যালক জানান। এভাবে মহারাজের হুকুম বক্তাকে অত্যন্ত হতাশ করে তোলে।